• ইন্দিরা বন্দ্যোপাধ্যায়

অণু-গল্প - চড়ুই




অফিস থেকে ফিরতেই শালিখ আর তিতি ছুটে আসে হৈ হৈ করে, জানো আজ কী হয়েছে? ঐ পাখি..


এই পর্যন্ত বলার পরই আন্দাজ করতে পারি কী হতে পারে। এ বাড়িতে আসা ইস্তক ওদের জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনা হল 'ঐ পাখি'। পাখি মানে এক ঝাঁক চড়ুই। উত্তর কলকাতার অনেক পুরোনো একটা বাড়ি। ভাড়ায় এসেছি সদ্য। পুরোনো বাড়ির ঘুলঘুলি আর কড়িবরগা দেখে তিতি , শালিখ অবাক। ওরা পাঁচ বছরের ক্ষুদে জীবন ছোট্ট ফ্ল্যাটে এমন দেখেনি তো! এখানে এসে এত পাখি, তাদের বাসা, তাদের কিচকিচ শুনে ভয়ানক উত্তেজিত। ওরা কী করে, কোথায় যায়, কী খায়, ওদের মা বাবা কে এই চলছে সারাদিন ।


'ঐ পাখি' শুনেই বুঝেছি, আবার কিছু একটা হয়েছে। দেখি রাজীবেও হাসছে। বললাম, হাত পাটা ধুয়ে এসে শুনি।

সে হবে না। এখনি শুনতে হবে।


জানা গেল, আজ বাসা থেকে একটা ছোট বাচ্চা পড়ে গিয়েছিল। ঠিক সেই সময় একটা বিরাট চিল এসে উপস্থিত আলসেতে। তাকে তাড়িয়ে কোনো মতে বাবা আর দুই বীর পুত্র মিলে বাচ্চাটিকে স্বস্থানে ফিরিয়ে দিয়েছে।

- হ্যাঁ রে, তোরা চিল দেখলি? চিল চিনিস?

-- বাবা তো বলল, চিল। এই অ্যাত্ত বড়। বিচ্ছিরি মুখটা মা।

-- তাই নাকি? তা বাবা আর কি বলল?

-- বলল, চিল ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে বাচ্চাটাকে। ইনোসেন্ট বাচ্চাটাকে দুষ্টু চিলের হাত থেকে বাঁচাতে হবে।


চুলটা একটু ঘেঁটে দিয়ে উঠে পড়ি।


চাকরিটা হঠাৎ না জুটলে এই বাড়িতে আসা হত না। এমন রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি এত কমে পাবো তাও ভাবিনি। তবে পাড়াটা খুব ঘিঞ্জি। নীচতলাটায় সারি সারি ভাড়াটে। সকালে বেরোনোর সময় গাদা লোকজন শুয়ে থাকে সিঁড়িতে। একটু রাত বাড়লে আবার তাদের চোখের ভাষাও কেমন বদলে যায়। চারদিক থুতু, গয়েরে ভর্তি। একতলায় বারোয়ারী বাথরুমটায় সকাল থেকে ঝগড়া চলে। সদরের পর থেকেই বাজার। হট্টগোল, গালি গালাজ লেগেই আছে।

এই পরিবেশে ছেলেদের নিয়ে এসে কি ভুল করলাম? মাঝে মাঝেই ভাবি।

রাজীব বলে, অত ভেবো না। এখানেই মানুষ করবো।


অফিসটাও নতুন। কাজে স্বচ্ছন্দ নই। তার ওপর বসের ব্যবহারটাও... হঠাৎ হঠাৎ গায়ে ঘেঁষে দাঁড়ায়।

রাজীব বলে, সব ঠিক হয়ে যাবে। সব কি মনের মতো হয়? কত পালাবে? তার চেয়ে ফেস করাই তো ভালো ?


সারাদিনের ক্লান্তি, অপমান গায়ে আঠার মতো লেগে থাকে। তারপর যখন ঘরে ফিরি , শালিখ, তিতি ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে, মা জানো আজ পাখিরা .... তখন মনে হয় স্বর্গে এলাম - পরম এক বন্ধু আর দুই দেবশিশুকে নিয়ে গড়া আমার স্বর্গ।


ঘরের দরজা বন্ধ করলে বাইরে থেকে যায় যত চিল, বাজ, শকুন। ঘরের কড়িবরগায় নিশ্চিন্তে ঘুমোয় চড়ুই এর সংসার। আমাদের পরিবার।


চাকরিটা হয়তো ছেড়েই দিতে হবে...। আসলে সবাই এত আনন্দ করছিল... রাজীবকে আর বলে ওঠা হয় নি। আজ খুব খারাপ একটা ঘটনা ঘটেছে। আমি প্রতিবাদ না করে পারিনি। আমাকে বলা হয়েছে - হয় ক্ষমা চাও নয় বেরিয়ে যাও। অগত্যা... রাজীবের একার ঘাড়ে আবার সব এসে পড়বে।


বারান্দা থেকে ঘরে আসি। অঘোরে ঘুমুচ্ছে তিনজন। চড়ুই এর ঘরও শান্ত। সারাদিনের চেঁচামেচির পর ওরাও নিশ্চিন্ত ঘুমে। শালিখের মাথার কাছে বসি। কপালে হাত রেখে বলি, তোরা চড়ুই ই থাক। কখনো চিল হয়ে যাস না।


নীড়বাসনা  বৈশাখ ১৪২৯