• ব্রততী চক্রবর্ত্তী

অণু গল্প - বিটি



নিঃশব্দে দরজার আগল খুলে বাইরে বেরিয়ে এল তারা । মধ্যযামের চাঁদরাত তখন মজলিসে বসেছে । বাতাবিলেবু ফুলের মাতাল করা সুবাস উঠেছে বাইরে । অমন মাতাল সুবাসের জোৎস্না আর কখনো দেখা যাবে না । চারদিক একবার দেখে বুকভরে বাতাবিফুলের ঘ্রাণ নিল তারা । ওদের ভিটে পার হয়ে গঙ্গামাসির ভিটে ; তারপর আরো পাঁচটা ভিটের পর বড় পুকুর পদ্মদের । তারপরেই ধানক্ষেত আর চষা জমি শুরু । আর বাড়ি ঘর নেই । ওখানেই দাঁড়ানোর কথা চাঁদুর । পুকুরপাড়ের ঘন জঙ্গল খানিক ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে জ্যোৎস্নায় । তারমধ্যেই পুকুরের ওপারে টিমটিমে হ্যারিকেনের আলোটা দেখা যাচ্ছে । আগুনের আলো বলে কথা ! যত ছোটই হোক, জোৎস্না তাকে এতটুকু ম্লান করতে পারে না । একটা বড় টর্চও আছে চাঁদুর । কিন্তু সেটা নিয়ে আসা যাবে না আজ, আগেই কথা হয়েছিল । লোক জানাজানির আগেই সরে পড়তে হবে গেরামের সীমানা থেকে । পাঁচমাসের পেট নিয়ে সাবধানে আলোটা লক্ষ্য করে তারা এগিয়ে গেল চাঁদুর কাছে । পেটের জীবটা ঠিক টুক টুক করে নড়ে উঠল সেই সময় । কিছু কি ও বুঝতে পেয়েছে ? কে জানে ! দু' হাতের পোড়া ঘা-গুলোতে চুনহলুদ দিয়ে ন্যাকড়া জড়ানো বেশ করে । আসার সময়ও তারা উনুনপাড়ে দেখেছে, এক সপ্তাহ আগের চ্যালাকাঠটা পড়ে আছে একইরকম । ওই চ্যালাকাঠই তারার হাতে চেপে ধরেছিল সঞ্জু সেদিন ।


সঞ্জুর বাবারে সাপে কেটেছিল । মরার আগে গ্যাজলা ওঠা মুখে তারার দিকেই নাকি আঙুল তুলেছিল ওর বাপ । সেই থেকেই সঞ্জুর মাথাটা কেমন যেন হয়ে গেল । তারার গায়ে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে সঞ্জু একেকদিন খুব কাঁদত সারারাত । আবার সকাল হলেই সে অন্য মানুষ । জ্বলন্ত দৃষ্টিতে, জন্তুর মতো ঘড়ঘড়ে গলায় কাছে ডাকত তারাকে, "মরিস না ক্যান তুই ? শালার বিটি । আমার বাপরে খেয়ে লকলকাস ? তোর জিব্বাই কাটাই দেব আমি ।" তারপর তারার চুলের মুঠি ধরে দেওয়ালে ঠুকে দিত কোনো দিন, আবার কোনো দিন চেলে ফেলে দিত দাওয়া থেকে উঠোনে । দুপুরের পর জমি থেকে ফিরে ঘরের দাওয়ায় বসে তারার সঙ্গে মশকরা করত কখনো, আবার কোনো কোনো দিন চান করে ভাত খেয়ে বেপাড়ায় চলে যেত তারাকে শাপশাপান্ত করতে করতে । সেবার একই গেরামে পর পর তিনজনারে সাপে কাটল । কান্নার রোল উঠল বাড়ি বাড়ি । সবাই বিহিত করতি ওঝা ডাকল । ওঝার ঝাড়ফুঁকে নাকি বড়বিটি গেরামের বার হয়ে যাবে । কিন্তু কোনো কাজ হলো না । বিটিরে নাকি তবুও এদিক সেদিক দেখা যায় । সেকথা মনে পড়তেই পদ্মদের পুকুরপাড়ের জঙ্গলটা দেখে তারা শিউরে উঠল একমুহূর্ত । ওধারে চাঁদুর হ্যারিকেনের আলোটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এবার । ধীরে ধীরে হাঁটলেও ভোরের আগে আগে ইস্টিশনে পৌঁছে যাওয়া যাবে ঠিক ।


পরদিন ভোর ভোর স্টেশনে ঢোকার মুখে মানুষজনের জোর আলোচনা কানে এলো চাঁদুর,

"লাউডুগা লাউডুগা ! লাউডুগায় কাটিসে সঞ্জুরে ।"

"না না । বড় ঠাউরেই নিসে । নাহলি ওরম কেউ শান্ত হতি পারে নাকি ? মুখিচোখি কোনো কষ্ট নাই ! দেখিসনি ?"

"তোরে কইসে ! বিটি আর এহানে আসে না এহন জানস ? ওঝায় ফুঁকসিল না ! ওরে লাউডুগায়ই কাটিসে ।"

"হুর ! লাউডুগায় কাটলি আসকাসাইতো অনেক । ওরম ঠান্ডা হতি পারত না । কিন্তুক কী কপাল দ্যাখছস, বাপ ছেলে দুইজনরেই সে'ই নেলো ।"

কথাগুলো কানে যেতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল চাঁদু । ঘুরে দেখল একবার তারার দিকে । তারার শ্রান্ত ডাগর চোখ দু'টোতে তখন বিষণ্ণ একফালি হাসি...

নীড়বাসনা  বৈশাখ ১৪২৯