• প্রদীপ দে

আধুলির ষোলো আনা




নাম তার আধুলি

বালিকাটির বয়স কত হবে ?

তা দশ বছরের মতোই, তবে দেখলে মনে হবে কতই না বুদ্ধিমতী আর বেশ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এক নারী। মুখের আদল খুব সুন্দর তবে মনে হয় যেন ত্রিশ বছরের কোন নারী। কথা বলে একেবারে গুছিয়ে একেবারে বয়সী মহিলার মতোই সবসময়ই বড়দের সঙ্গে মিশতে চায়। এটা লোকে ভালো চোখে দেখে না। এ এক সমস্যা…।


বাড়িতে বাপ মা বেশ চিন্তাভাবনা করে এই অকালপক্ক মেয়েকে নিয়ে। মেয়ে রূপসী, মেধাবী এবং অবশ্যই নম্র স্বভাবীয়, শুধু অল্প বয়সেই তার বয়স্ক ধ্যানধারণা তাদের ভীষণ ভাবিয়ে তোলে।

দিন যায় রাত যায়। সূর্য চন্দ্র ধারাবাহিক ভাবেই তাদের পথ পরিক্রমণ করে। সময় বয়ে চলে, বয়সও বাড়ে। আধুলির বয়সের চেয়ে বুদ্ধি বেশি বাড়ে। দিন দিন সে একেবারে পরিপূর্ণ এক নারীতে উপলব্ধ হয়।


বাবা হরহরি রিক্সাচালক। দিন আনে দিন খায়। এমতাবস্থায় মেয়ের জন্য বড় চিন্তায় এবং স্ত্রী রুক্মিনির কথায় অল্প পয়সায় ডাক্তার কবিরেজ এমনকি তন্ত্র সাধক এর কাছে পর্যন্ত ছুটে যায় -কিন্তু লাভ তেমন হয় না। অবস্থা তথৈবচ !

স্ত্রী রুক্মিনি কাঁদে। ভগবানের চাতালে মেয়ের অস্বাভাবিক অবস্থা কাটিয়ে স্বাভাবিকের জন্য প্রার্থনা করে।

হরহরি বলে -- কি হবে এসব করে ? কেউ নেই আমাদের কথা শোনার।

রুক্মিণী কাঁদে -শেষ চেষ্টা করে যেতেই হবে।


রিক্সা স্ট্যান্ডে রিক্সার মধ্যে বসেও ভিজে যাচ্ছে হরিহর। আজ যে সকাল থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে চলেছে। কিছু বেশি পয়সার আশায় জল বৃষ্টি মাথায় নিয়েই বেড়িয়ে পড়েছে সে।

দুহাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে অপরিচ্ছন্ন ধুতি ফতুয়া গায়ে মাঝবয়সী একজন এসে বললে --

-- কিরে ? নসীব পাড়া যাবি ? কত নিবি ?

হরিহরের মনে হয় এই লোকটা কোন বাড়ির চাকর। তবুও কায়দা করে জানালে --

উরি বাবা: নসীব পাড়া সে তো অনেক দূর আছে, -ডবল ভাড়া লাগবে !

-- ঠিক আছে চল পাবি - বলেই লোকটা রিক্সার চেয়ারে উঠে বসলো।

লোকটা যেখানে গিয়ে রিক্সা থেকে নামলো, সেটা এই মফস্বল শহরের একেবারে শেষ প্রান্ত। হরিহর মাথা তুলে একেবারে ঘাবড়ে গেল -- এক পুরাতন বিশাল বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সে।

-- খাঁড়া থাক - আমি টাকা দিয়ে পাঠাচ্ছি - নিয়ে নিস - বলেই লোকটা হন হন করে বাড়িতে ঢুকে গেল।


কিছুপরেই এক কালো বোরখায় আপাদমস্তক মুড়ে একজন একটি একশো টাকার নোট এনে ধরিয়ে দিল --- চলেগা -না -আউর দেনে হোগা?

গলার স্বর বলে দিল উনি মহিলা।

হরিহর টাকা ট্যাকে গুঁজে রিক্সা ঘুরিয়ে নিল। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে অবাক ! কি কান্ড ! পুরানো বাড়ি কোথায় গেল ? এযে একেবারে ঝাঁ চকচকে রঙ করা নতুন বাড়ি। বোরখা পরা মহিলার বদলে একেবারে কড়কড়ে তাঁতের শাড়িতে দাঁড়িয়ে এক মহিলা। ডেকে বললে -

-- সমস্যা থাকলে ভিতরে আসুন -সমাধান আছে।


হরিহর ভয়ে ভয়ে মহিলার পথ অনুসরণ করলো। বাড়ির তিনতলার এক‌টি কক্ষে তখন জ্বলছিলো এক অগ্নিকুন্ড। হরিহর দেখলো এক শুভ্রকেশী বছর সত্তরের মহিলা ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে আছে। যে মহিলাটি ওকে নিয়ে এসেছে সে ধ্যানস্থ মহিলার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কিছু বলতেই ধ্যানস্থ মহিলা চোখ খুললেন, ইঙ্গিত করলেন বসতে।

হরিহর বসে পড়লো। মহিলা জানতে চাইলেন --

-- কি সমস্যা?


হরিহর সুযোগ বুঝে নিজের মেয়ের অল্প বয়সেই অকালপক্কতার কথা সব খুলে বললে।

ধ্যানে ডুব দিলেন মহিলা। চোখ খুলতেই অগ্নিকুন্ডের পাশে রাখা একট বড় আয়নায় আধুলির ছবি ভেসে উঠলো। হরিহর চমকে উঠলো। একি করে হলো?


শুভ্রকেশী মহিলা মুচকি হেসে তার পাশে রাখা থলি থেকে হাত ঢুকিয়ে একটা মরা কাক বার করলেন।

হরিহর ভয়ে আর বিষ্ময়ে চমকে উঠলো। আরো চমকে গেল যখন অগ্নিকুন্ডের আগুনে ধরতেই কাক জান্ত হয়ে গেল। কা -কা শব্দে তা জানানোও দিল। কাক মাথা নীচু করে প্রনাম জানালো।

মহিলা এবার কাকটিকে আয়নার ছবি দেখিয়ে ওর কানের কাছে গিয়ে কিছু মন্ত্র দিল -আর কাকটা কর্কশ স্বরে ডাকতে ডাকতে উড়ে চলে গেল।


ইশারায় হরিহর তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে বসে রইলো। কিছু বাদেই অবাক করে দিয়ে কাক আধুলি কে পিঠে বহন করে নিয়ে এল।

তপস্বী ধ্যান করে, জল ছিটিয়ে, কিযে সব করতে লাগলো তা হরিহরের মাথায় ঢুকলো না।

-- নে বাড়ি যা, তোর মেয়ে ঠিক হয়ে গেছে। এই বদমাশটাই তোর মেয়ের মধ্যে প্রবেশ করেছিল। আমি বের করে দিলাম। তোর মেয়ের অকালপক্কতা দূর হয়ে গেল। ও খুবই মেধাবী তাই এই শয়তান রূপী কাক ওকে ধরে রেখেছিল। এখন সব আগের মতোই ভালো হয়ে গেল। এবার তোর মেয়ের গুনে তোর সব অভাব দূর হয়ে যাবে আর তোরা খুব আনন্দেই থাকবি ----

কথা গুলো বলেই ওই শুভ্রকেশী মহিলা কাকটিকে ছুঁড়ে অগ্নিকুন্ডে ফেলে দিলেন। বিকট শব্দ করে চিৎকার করে উঠলো ওই মানুষ রূপী শয়তান। সঙ্গে সঙ্গে সে পুড়ে ছাই হয়ে গেল।

হরিহর চমকে উঠলো - আরে এ যে সেই লোকটিই যে একটু আগে বাজার হাতে তার রিক্সার সওয়ারী হয়েই এখানে এসেছিল। হরিহর ভয়ে জ্ঞান হারালো।

এরপর হরিহরের যখন জ্ঞান এল তখন সে দেখলো বিছানায় শুয়ে আছে সে, স্ত্রী আর মেয়ে মিলে তাকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছে।


হরিহরের স্ত্রী রুক্মিনি আনন্দে হেসে জানালো --

-- জানোতো একজন সাধু এসে আমাদের মেয়ের মাথায় হাত বুলাতেই মেয়ে আধুলি একেবারে দশ বছরের বালিকা হয়ে গেল। আর সেই লোকটিই তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেল।

আধুলি ফিক্ করে মুচকি হেসে ফেললে -- জানো বাবা, - মা না সারাদুপুর রূপকথার গল্পের বই পড়েছে ! এতো বেশি করে আর সব সময় রূপকথা আর রহস্যের গল্প পড়লে যা হয়, তাই আর কি !


কে জানে সত্যিটা কি …?



নীড়বাসনা  আশ্বিন ১৪২৮