• কুন্তল ঘোষ

আমি ভগা দা বলছি 






খুব উৎকন্ঠার সাথে বিষ্ণু মিটিং ডাকলেন বৈকুন্ঠে ব্রহ্মার সাথে… বিশেষ কিছু বিষয় নিয়ে নাকি আলোচনা আছে। ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি করে এতদিন হয়ে গেছে…তার কোনো সদ্ব্যবহার হচ্ছে না…!! তাই অনতিবিলম্বে সেখানে কিছু সৃষ্টি করতে হবে! তবে সৃষ্টি বললেই তো আর সৃষ্টি করা যায় না… তার জন্য প্রয়োজন অনেক ভাবনা চিন্তার…!! আর সেই নিয়েই ডাকা হয়েছে আজকের গুরুত্বপূর্ণ মিটিং ..!! 


আসলে সেবার ব্রহ্মান্ড ভিজিটে গিয়ে বিষ্ণুর খুব মুড খারাপ…. যে গ্রহতেই যান ওই পাথর, মাটি, গ্যাস না হলে জ্বলন্ত লাভা … সব কিছুই প্রাণহীন… ব্রহ্মান্ডের এই মৃতপ্রায় রূপ যেন মোটেই আর দেখা যায় না!! 


হ্যাঁ বলুন কি সৃষ্টি করতে চান…একটু বিরক্তির সাথে ব্রহ্মা জিজ্ঞাসা করলেন !! হঠাত করে যে কেন আপনার সৃষ্টির হিড়িক চাপলো ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। আর সৃষ্টি তো ছেলে খেলা না… যে যখন তখন শুরু করে দেবেন!!!! 


ধূত.. তুমি না ব্রহ্মা সেই একই রকম রয়ে গেলে…!! তোমার মধ্যে সৃজন মূলক উৎসাহের সত্যই অভাব দেখছি…এবার একটু পজিটিভ হও তো দেখি..! প্ল্যানটা কিন্ত আসলে দারুণ আছে….যদি সফল হয়ে যাই তাহলে আমাদের জুড়িকে আর ধরে কে !!! 


ঠিক আছে.. ঠিক আছে .. সৃষ্টি তো পরে হবে.. প্রথমে বলুন সেটা করবেন কোথায়…!! আপনার সব গ্রহে হয় খুব ঠান্ডা না হয় খুব গরম… !! সৃষ্টি করতে গেলে আগে তো একটা অনুকূল পরিবেশের দরকার !! 


তুমি ঘর কুনো হয়ে বসে থাকলে আর জানবে কি! এবারের ব্রহ্মান্ড ভিজিটে আমি সৌরজগতে গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে পৃথিবীকে দেখেই আমার খুব ভালো লেগে গেছে…! সব কিছু ওখানে সৃষ্টির জন্য একদম পরিপূরক… তাই ইচ্ছা আছে ওখানেই পরিকল্পনাটা রূপায়ণ করার!! মাধ্যাকর্ষণ বা চৌম্বকত্বের মতো মহাজাগতিক ভৌতিক ধর্ম গুলো তো পুরো ব্রহ্মান্ড জুড়েই আছে… তাই সৃষ্টি চালনা করার জন্য বিশেষ কিছু মেহনত ওখানে করতে হবে না। তবে একটাই সমস্যা যে সেখানে এখনো জল নাই.. আর জল ছাড়া সৃষ্টি চিন্তাই করা যায় না। তবে চিন্তা করো না..জায়গা যখন একবার পছন্দ হয়েছে তখন অন্য গ্রহ থেকে আমি জল আমদানি করেই ছাড়ব… সৃষ্টিটা যেমন তেমন করে ওখানেই করতে হবে। তবে অতি শীঘ্র আমার ইচ্ছা ওখানে 'প্রকৃতি' টা তৈরী করার। প্রকৃতি মানে যার মধ্যে থাকবে জল, হাওয়া আর মাটি। ধীরে ধীরে সেই প্রকৃতিতে তৈরী করব উদ্ভিদ আর প্রাণী !! 


আচ্ছা সৃষ্টি না হয় সেখানে যেমন তেমন করে করে দিলাম.. কিন্তু কিছুদিন পরে সেই একই সৃষ্টি কে বারংবার দেখে আপনি আবার বিরক্ত হয়ে যাবেন না তো? … আর রোজ রোজ তো নতুন নতুন সৃষ্টি করা যাবে না…!!!! তখন কি করবেন শুনি!!


আরে না না… অত কাঁচা কাজ আমি করবো না… এমন একটা প্যাঁচ লাগিয়ে দেবো যে সৃষ্টি নিজেই নিজের সৃষ্টি করতে থাকবে । পুরনো সৃষ্টিও যুগ-যুগান্তর ধরে থেকে যাবে না!! …বয়সের সাথে পুরোনো সৃষ্টির আসবে জরা আর শেষে মৃত্যু…আর নতুন সৃষ্টি এসে জায়গা নেবে পুরোনোর। আর তোমার কাজ হবে শুধু এই সবের তদারকি করা!! 


সে হলে তো মন্দ হয় না… কিন্তু তা হবে কি করে.. ?? 


তুমি সব সময় তাড়াহুড়ো করো না তো ব্রহ্মা!! … সব প্ল্যান করা হবে একটা একটা করে.. তুমি ভালো করে বসো তো দেখি!! দেখো আমাদের পরিকল্পনাটা শুরু হবে খুব ছোটো খাটো সৃষ্টি দিয়ে..। একবার অ্যামাইনো অ্যাসিড টাকে প্রকৃতি যেই জল ও বাতাসের সংমিশ্রণে রাসায়নিক ভাবে তৈরী করে ফেলবে সেই সঙ্গে তৈরী হয়ে যাবে পৃথিবীর বুকে প্রথম ডিএনএ , যেটা হবে প্রোটিন তৈরির নকশা বা ‘জেনেটিক কোড’। আর তা দিয়েই হবে আমাদের প্রথম সৃষ্টি…এই ধরো সৃষ্টি হলো আ্যমিবা!! আর এই ডিএনএ র মাধ্যমেই প্রাণী কুলে বৈশিষ্ট্য গুলো এক প্রজন্ম থেকে হুবহু পরবর্তী প্রজন্মে প্রবাহিত হতে থাকবে। তারপর সেই ছোটো সৃষ্টির ওপর চলতে থাকবে আমাদের গবেষণা, আর গবেষণার ফল অনুযায়ী হতে থাকবে পুরোনো সৃষ্টির বিবর্তন। বিবর্তন মানে বলতে পারো ডিএনএ তে অ্যামাইনো অ্যাসিডের ক্রম পরিবর্তন। যখন যে বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে শুধু ডিএনএ তে উপযুক্ত পরিবর্তন আনতে হবে.. যার ফল হিসেবে ঘটবে বিবর্তন.. আর কালের প্রবাহে এইভাবে আবির্ভূত হবে উন্নততর সৃষ্টি!! শুধু গবেষনাটা তোমাকে অবিরত চালিয়ে যেতে হবে…! এইভাবে তিরিশ হাজার কোটি বছর ধরে গবেষণা করে ধীরে ধীরে সৃষ্টি হবে এক উন্নতমানের জীব…যার নাম হবে 'মানব জাতি'। কালের প্রবাহে পৃথিবীতে সহাবস্থান করবে ভিন্ন সময়ে আবির্ভূত ভিন্ন প্রজাতির জীব.. যেমন ধর জলচর , উভচর, সরিসৃপ, স্তন্যপায়ী ও বিভিন্ন উন্নত জীব জন্তু  … যারা একে অপরের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে থাকবে নির্ভরশীল। তবে কোনো প্রজাতিরই পৃথিবীর বুকে থাকবে না সার্বভৌমত্ব !! কোনো সৃষ্টি যদি নিজের বুদ্ধি ও বাহুবলে তাহা প্রাপ্ত করার চেষ্টা করে তখন তুমি করবে তার বিনাশ। এ বিষয়ে তোমাকে সাহায্যের জন্য তোমার সাথে দেওয়া হবে দেবাদিনাথ মহাদেবকে…..!! 


আপনি তো মহাশয় সব গুলিয়ে দিলেন দেখছি ! আমি তো কিছু ভেবে উঠতে পারছি না যে আপনি কি বলছেন!! 


হ্যাঁ, তুমি এখনো শুনলে কোথায়!! দেখো প্রত্যেক সৃষ্টির মধ্যে দুইটি প্রধান উপকরণ থাকবে… শরীর ও মন .. আর এই দুই উপকরণকে জুড়ে দেবে আত্মা । শরীরের মৃত্যু হবে কিন্তু আত্মা হবে অবিনশ্বর। আর প্রত্যেক আত্মা হবে ব্রহ্মা মানে তোমার পার্থিব রূপ। এইভাবে বিশ্ব সংসারে তোমার অস্তিত্ব ও কর্তৃত্ব সর্ব জীবে সর্বদা বহাল থাকবে। তবে মনে রাখবে আমাদের পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হবে 'শরীর' আর 'মন' এর গঠন। গবেষণার সাথে সাথে বিবর্তনের মধ্যে দিয়েই হতে থাকবে শরীর ও মনের উন্নয়ন। মানে বিবর্তনের সিঁড়িতে যে প্রাণী যতো ওপরে উঠবে তার শরীর ও মন  হবে ততো উন্নত। তা না হলে হঠাত করে উন্নত সৃষ্টির ডিজাইন করা একসাথে অসম্ভব হয়ে যাবে তোমার পক্ষে!! শরীরকে সুষ্ঠু ভাবে চালনা করার জন্য থাকবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান… ধরো একটি মস্তিষ্ক , কয়েকটি ইন্দ্রিয়, কয়েকটি তন্ত্র, আর তন্ত্রাদির মধ্যে নানান অঙ্গ… যেমন হৃদপিন্ড , ফুসফুস ইত্যাদি ইত্যাদি.. যারা পালন করবে নির্দিষ্ট জৈবিক ক্রিয়া। কোন্ অঙ্গ বা কোন্ তন্ত্র কোন্ ক্রিয়া সম্পন্ন করবে তার সংকেত লুকিয়ে থাকবে শরীরের মধ্যস্থ ডিএনএ-র ভিতর। মস্তিষ্কটা হবে এমন একটা জটিল অঙ্গ যার মধ্যে শরীর ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে আসতে থাকবে অসংখ্য ইনপুট সিগন্যাল। শরীর থেকে সিগন্যাল গুলো মস্তিষ্কে বাহিত হবে স্নায়ু তন্ত্রের মাধ্যমে, আর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে। সেই বিভিন্ন ধরণের সিগন্যালগুলি মস্তিষ্কে প্রসেসিং হবে, আর তারপর সেখান থেকে আউটপুট বের হবে সেই ইনপুট সিগন্যালের প্রতিক্রিয়া হিসেবে। বিভিন্ন অঙ্গের মাধ্যমে শরীর সেই আউটপুট নির্দেশকে অকপটে সম্পন্ন করবে!! 


শুরুতেই তোমায় একটু সতর্ক করে রাখি ব্রহ্মা… সৃষ্টি কে তুমি বুদ্ধি প্রদান কোরো.. কিন্তু ব্রহ্মান্ডের সমস্ত সত্যের টের তাদের পেতে দিও না… কোনোদিন বুদ্ধির জোরে নচেত আমাদেরই তৈরী সৃষ্টি শেষে আমাদেরই মাথায় চেপে বসবে … তখন হবে এক বিপদ!! শতাধিক মহাজাগতিক তরঙ্গ  বিশ্ব ব্রহ্মান্ডে জাল বিস্তার করে রয়েছে … যেগুলি আমাদের জন্য আসলে অতি প্রয়োজনীয়… কিন্তু সৃষ্টির জন্য অতো ধরণের তরঙ্গের প্রত্যেকটিকে অনুভব করার প্রয়োজন হবে না। কোন তরঙ্গ থেকে কখন যে ওরা কি সিগন্যাল টেনে বের করে বসবে.. তখন হবে সামলানো মুশকিল!! তাই ইন্দ্রিয় সংখ্যা খুব বেশী হলে পাঁচের বেশী রেখো না…তাও দিও বিবর্তনের মাধ্যমে…!! দেখার জন্য চোখ , শোনার জন্য কান, ঘ্রাণের জন্য নাক , স্বাদের জন্য জিভ , আর অনুভূতির জন্য ত্বকই যথেষ্ট হবে!! তাও যখন ইন্দ্রিয়ের ডিজাইন করবে খেয়াল রেখো ইন্দ্রিয় থাকা মানেই সংসারে সব ঘটনা সৃষ্টিকে দেখার বা শোনার প্রয়োজন নেই… তাই দেখার আলো বা শোনার শব্দের নির্দিষ্ট কম্পাঙ্ক সীমা ধার্য করে দিও..!! মানে অনেক কিছু ঘটনা বিশ্ব জগতে সৃষ্টির চোখের সামনে ঘটতে থাকবে…কিন্তু কম্পাঙ্ক সীমার বাইরে হলে তার টেরও পাবে না তারা… তবেই সৃষ্টি আমাদের আয়ত্তে থাকবে!!! 


আপনি তো মিটিং ডাকার আগে বেশ অনেকটাই হোম ওয়ার্ক করে রেখেছেন দেখছি !! আমার তো এত কিছু শুনে সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে !! আমি যেটুকু এখনো বুঝলাম যে শরীর আর তন্ত্রগুলোর প্রোডাকশন আপনি বংশানুক্রমে ডিএনএ দিয়ে করাতে চান, যেটা হয়তো একটু সোজা কাজ…, কিন্তু তন্ত্র বা অঙ্গের প্রাথমিক ডিজাইনটা… মানে ডিএনএ-র ক্রম গুলোকে সাজিয়ে প্রত্যেক তন্ত্রের বা অঙ্গের আলাদা আলাদা প্রোগ্রামটা ফিড করাটা শুরুতে তো বেশ জটিল কাজ হবে… আর সেটা তো মনে হচ্ছে আমাকেই করতে হবে !!


তোমাকে তো ব্রহ্মা শুরু থেকেই সেই কথাটাই বলে আসছি যে শুরুটা খুব সাধারন দিয়ে করব… যার মধ্যে তন্ত্র বা অঙ্গ গুলো থাকবে নামমাত্র… আর ধীরে ধীরে তার বিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্টি হবে উন্নততর তন্ত্র… আর তার মাধ্যমে উন্নততর প্রাণী । কিন্তু সেই গবেষণাটা.. মানে ডিএনএ-তে অ্যামাইনো অ্যাসিডের ক্রমটা তো তোমাকেই স্থির করে দিতে হবে ব্রহ্মা!! আর সেটা শুধু একবার না.. যতো বার বিবর্তন চাইবে ততোবার তোমায় করতে হবে। একবার ডিজাইনটা ঠিক হয়ে গেলে কিন্তু প্রোডাকশনের জন্য তোমায় অতো কিছু পরিশ্রম করতে হবে না… ওটা সৃষ্টি নিজেই নিজের মতো করে করতে থাকবে। 


হ্যাঁ, সৃষ্টি নিজেই নিজের মতো করতে থাকবে …!! সব যদি কুঁড়ের দল হয় তাহলে কি করে আপনার সৃষ্টি নিজের প্রোডাকশন টা নিজে করবে শুনি!!! সেই আমার ওপরে ওই বোঝাটাও চাপিয়ে ছাড়বেন দেখছি !! 


হু ব্রহ্মা… এতক্ষণে ভালো প্রশ্ন করেছ  …তবে শোনো.. কেউ তো আর বিনা প্ররোচনায় কোনো কাজ করবে না.. তাই তোমাকে প্রথমে প্রত্যেক প্রাণীর মধ্যে দুই ভিন্ন ধর্মী প্রকার তৈরী করতে হবে.. যেমন ধরো নারী আর পুরুষ! আর এমন এক অনুভূতি ডিজাইন করতে হবে যেটা অনুভব করার জন্য সৃষ্টির প্রতিটি নারী ও পুরুষ হয়ে থাকবে সদা উৎসুক… আর সেই উৎসুকতা থেকে প্ররোচিত জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফল হিসেবে পৃথিবীতে আসবে নতুন সৃষ্টি…. যে পদ্ধতির নাম হবে প্রজনন!! তোমার তাই কাজ হবে সেই প্রজনন তন্ত্রের ডিজাইনটা সর্বপ্রথম সেরে ফেলা। এটাই হবে জীবের সর্বপ্রথম তন্ত্র!! তবে আগেই বলেছি সময়ের সাপেক্ষে তোমাকে এই সাধারণ প্রজনন তন্ত্রকে করতে হবে উন্নততর!! 


কিন্তু আপনার পরিকল্পিত সৃষ্টিতে একটা জিনিষ বুঝলাম না যে প্রাণীকূলের দিনরাত কর্ম করার অনবরত শক্তির  যোগানটা কোথা থেকে আসবে…!! আমি কিন্তু বলে রাখলাম… শেষকালে সকল প্রাণীকে চলানো ফেরানোর কাজটাও যেন আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়!! সারাদিন ধরে আপনার সৃষ্টির শক্তি জোগাতে… আর তাদের পিছনে আগুন ধরাতে… আমি কিন্তু মোটেই বসে থাকতে পারবো না!! 


আরে না ব্রহ্মা তুমি অযথা ভীত হচ্ছ!! আমার সব প্ল্যান ছকা আছে!! সৌরশক্তিকে এমন ভাবে সৃষ্টির মধ্যে প্রবাহিত করে দেব যে প্রাণী কূলে শক্তির অভাব বলে কিছু থাকবে না! উদ্ভিদেরা সূর্যের আলোর সাহায্যে জল আর হাওয়া দিয়ে এক জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় খাবার বানিয়ে নেবে। সেই খাবারের মধ্যে সঞ্চিত থাকবে সূর্যের শক্তি। আর প্রাণীকূল যখন সেই উদ্ভিদজাত ফলমূল অথবা সেই উদ্ভিদকে সরাসরি বা অন্য প্রাণীকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করবে তখন সেই সৌরশক্তি তাদের শরীরেও প্রবাহিত হয়ে যাবে!! তবে প্রাণীর শরীরে সেই খাদ্যশক্তিকে বিকশিত হতে গেলে প্রয়োজন হবে চারটি তন্ত্রের যেটা কিন্তু আবার তোমাকেই ডিজাইন করতে হবে, 'পৌষ্টিক তন্ত্র,' সংবহন তন্ত্র', 'শ্বসন তন্ত্র' ও 'রেচন তন্ত্র'!! অবশ্য সেটা এমন কিছু মুস্কিল কাজ হবে না…সেই অ্যামাইনো অ্যাসিডের ক্রম দিয়েই নির্ধারিত হবে তন্ত্রগুলির কার্যাদি। পৌষ্টিক তন্ত্রের মাধ্যমে বাহ্যিক খাদ্যকে উপযুক্ত রূপে তুমি সংবহন তন্ত্রে মানে.. রক্তে পৌঁছে দেবে.. যাহাকে রক্ত বহন করে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছে দেবে.. আর তোমার তৈরী শ্বসন তন্ত্র সেই রূপান্তরিত খাদ্যকে প্রয়োজন মতো ভেঙ্গে তার ভিতর থেকে জমা শক্তিকে পরিমিত অনুপাতে মুক্ত করবে শরীরের মধ্যে। সেই শক্তি দিয়ে 'সৃষ্টি' নিজের কাজ কর্ম , চলা ফেরা নিজেই সম্পন্ন করে নেবে!! তবে খাদ্যের সমস্ত অংশটা তো রক্তে শোষিত হবে না.. আবার শোষিত হলেও কিছুটা শরীরের জন্য অতিরিক্ত হয়ে যেতে পারে। তাই অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য পদার্থ শরীর থেকে বের করার জন্য শরীরে থাকবে 'রেচন তন্ত্র' !! 


আচ্ছা এতো কিছু প্ল্যান শুনেও আমি কিন্তু এখনো বুঝে উঠে পারলাম না যে আপনি সৃষ্টির মধ্যে উদ্ভিদ আর প্রাণী দুটোই আলাদা করে কেন সৃষ্টি করতে চান!! শুধু প্রাণী বানিয়ে দিলেই কি হতো না? মানে আমার কাজ অনেকটা সোজা হয়ে যেতো না তাতে?? 


আমি জানতাম এটা তোমার বোধগম্য হবে না। তুমি কি ভাবছো এতো সোজা কাজ সৃষ্টির সৃষ্টি করা!! শোনো, প্রাণীকূল 🦬 শ্বসনের জন্য বাতাস থেকে অনবরত ভালো গ্যাস অক্সিজেনকে গ্রহণ করতে থাকবে, আর বিষাক্ত গ্যাস কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে ত্যাগ করবে। তাই কিছুদিনের মধ্যেই প্রকৃতির ভারসাম্য যাবে নষ্ট হয়ে । আর সেই ভারসাম্য বজায় রাখতে উদ্ভিদ নিজের খাদ্য তৈরী করার জন্য ওই বিষাক্ত গ্যাসকে শোষণ করে নেবে.. আর বদলে ভালো গ্যাস মানে অক্সিজেন নির্গত করবে পরিবেশে। এইভাবে প্রাণী আর উদ্ভিদ হবে পৃথিবীতে একে অপরের পরিপূরক!! কেউ একা অন্য কে ছাড়া বাঁচতে পারবে না!! কি ঘটে ঢুকলো কিছু!! এবার তাহলে তুমি বুঝলে আমার পরিকল্পনার গভীরতা !!


এই ভাবে গঠিত হবে প্রাণীকূলের 'শরীর'। চলো ব্রহ্মা এবার আমরা 'মন'টা কেমন করে গঠন করা হবে সেটা ফাইনাল করে ফেলি!! মন ছাড়া শুধু শরীর থাকলে কিন্তু সৃষ্টি হয়ে থাকবে অসমাপ্ত!! শরীর যেমন রক্ত মাংস দিয়ে তৈরী হবে… মনটা কিন্তু তা না.. ওটা হবে ভার্চুয়াল!!! কারণ মন হবে সুদূর প্রসারী… কোনো সীমায় তাকে বাঁধা যাবে না!! এই মনই প্রাণীকূলকে ভাবুক করবে… বেঁধে দেবে একে অপরকে ভালোবাসার বন্ধনে.. আর শরীরকে আধার করেই হবে তার অস্তিত্ব!! তবে বিবর্তনের শুরুতে মনের বিস্তারটা রাখব খুবই সীমিত। শুধু খাওয়া, ঘুম আর প্রজননের চিন্তায় তখন মন থাকবে মত্ত। বিবর্তনের উচ্চ সিঁড়িতে 🪜 এসে সৃষ্টির মধ্যে ঘটবে মনের বিকাশ। একাধারে মন তখন জায়গা দেবে দয়া, দান, সততা, মমতা, সেবা ও ভক্তির মতো মহৎ গুণের.. আবার অন্যদিকে মনের ভিতরই জন্ম নেবে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, অহংকার ও পরশ্রীকাতরতা মতো অসৎ রিপুর। কে কোন্ গুণ বা কোন্ রিপুকে প্রাপ্ত করবে সেটা নির্ভর করবে মন পরিচালনার উৎকর্ষতার উপর। আর তার সাথে জুড়ে থাকবে প্রত্যেক জীবের কর্মের ব্যালান্স-ষিট্…মানে পাপ-পুন্যের হিসাব। এই ব্যালান্স ষিটটা কিন্তু আমি তোমার অধীনে রাখব না ব্রহ্মা.. ওটা আমি বৈকুন্ঠে রাখব চিত্রগুপ্তের তত্ত্বাবধানে!! আর কোনো সৃষ্টির মৃত্যুর পরে যখন যমরাজ আত্মাকে শরীর থেকে বৈকুন্ঠে নিয়ে আসবে তখন চিত্রগুপ্ত ওই ব্যালান্স-ষিট চেক করে সিদ্ধান্ত নেবে কি সেই আত্মা স্বর্গে জায়গা পাবে না নরকে!! 


আপনি তো আপনার সমস্ত জ্ঞান ঢেলে দিয়েছেন দেখছি এই সৃষ্টিকে সৃষ্টি করার পরিকল্পনায়!! আমি কিন্তু একটা কথা বলে রাখি স্পষ্ট করে….যাই বলুন… আমার ওপর এতো কিছু চাপিয়ে দিলে আমি কিন্তু একা এতো সামলাতে পারবোনা…।! আমাকে সহকারী দিতে হবে 'সংসার', 'শরীর' আর 'মন'কে তদারকি করতে!! 


হ্যাঁ হ্যাঁ পাবে.. আমি জানি তুমি একা এতো কিছু সামলাতে পারবে না…!! আমার মুখ্য পরিকল্পনার ভিতর আমি রেখেছি তোমার সহকারী দেরও ব্যবস্থা !! তোমাকে দেওয়া হবে এগারো জন চালিকা শক্তি যারা তোমাকে 'শরীর' চালিত করতে সাহায্য করবে - যাদের গন্য করা হবে দেব দেবী  হিসেবে… যেমন সূর্যদেব দৃষ্টিশক্তিতে, বায়ুদেব নাসিকায় , প্রজাপতি যৌনাঙ্গে, লোকপালগণ কর্ণে, চন্দ্রদেব মনে, বরুণ নিশ্বাসে, মিত্র প্রশ্বাসে, ইন্দ্রদেব বাহুদ্বয়ে , বৃহস্পতি বাকে, বিষ্ণু পদদ্বয়ে ও মায়া হাস্যে অবস্থান করবে!! সাথে 'মন' কে চালনা করার সহকারী হিসেবে থাকবে একাদশ রুদ্র 'আত্মা'!! আর দ্বাদশ আদিত্যের অধিপতি হয়ে আমি 'বিষ্ণু' স্বয়ং থাকব সদা তোমার পাশে!!


আপনি সত্যই মহান… সৃষ্টির প্রত্যেক সদস্য অনন্তকাল ধরে আপনাকে ভগবান হিসেবে পুজো করবে… আর আদর করে আপনি হবেন সকলের 'ভগা দা' !! যাবার আগে শুধু একটা প্রশ্ন থেকে গেল… আপনার উপদেশ মতো যদি প্রাণীর শরীরে একই অঙ্গকে একাধিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার যোগ্য করে ডিজাইন করা হয় তাহলে সৃষ্টি উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপিয়ে দেবে না তো…!! তা হলে কিন্তু আমায় যেন দোষারোপ করা না হয় !! থাক সময় খারাপ না করে যাই এবার আপনার স্বপ্নের সৃষ্টির রূপায়ণ করতে. দুর্গা দুর্গা..!!

নীড়বাসনা  আশ্বিন ১৪২৮