• সোনালী চক্রবর্তী

এক গুচ্ছ অনুবাদ কবিতা




মার্কিন কবি এজরা পাউন্ডের কবিতা থেকে অনুবাদিত


বিস্ময়ের হলেও সত্যি, বিংশ শতাব্দীর পুরোভাগে, কবিতার আধুনিকতাবাদের অন্যতম প্রবক্তা, "ক্যান্টোস" নামের ৮০০ পাতার মহাকাব্যের রচয়িতা এজরা পাউন্ড দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ফ্যাসিবাদের এক প্রধান স্তম্ভ হিসাবেই ইতিহাসে চিরদিন উল্লেখিত হয়ে থাকেন। ১৮৮৫ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর জন্ম এবং ১৯৭২ সালে ইতালিতে মৃত্যু। টি এস এলিয়ট, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে আর জেমস জয়েসের মত সমসাময়িক কিংবদন্তিদের প্রত্যক্ষভাবে আবিষ্কার আর তাদের সাহিত্যকাজকে বর্তমান রূপদানের জন্য পাউন্ডই যাবতীয় কৃতিত্বের দাবিদার। গ্রেপ্তারের পর বারো বছর তিনি মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্রে কাটান। সাহিত্যে অবদানের কথা বিবেচনা করে তাঁর মুক্তির আবেদনে সরকার সম্মত হয় যদিও তাঁর জীবন ও সৃষ্টি সারাজীবনই থেকে গেছে তীব্র বিতর্কের কেন্দ্রস্থলে।

একটি নারী------------------ একটা গাছ আমার দুই হাতের মধ্যে আশ্রয় নেয়, তার প্রাণশক্তি করতল বেয়ে উঠে ছড়িয়ে যায় সমস্ত শরীরে, ধীরে স্তনের ভিতর দিয়ে পল্লবিত হয়ে নিচের দিকে ঝোঁকে, যে কোনো অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মতই শাখা প্রশাখারা ক্রমেই আমায় ছাড়াতে থাকে। তুমিই সেই গাছ, আবার তুমিই শ্যাওলা। ঝড় এলে সবাইকে অতিক্রম করে আভিজাত্যের দায় তোমারই থাকে। একটি শিশু-অসম্ভব উচ্চতা যার-তুমিই তো সে, আর এই সমস্ত কিছুই এই পৃথিবীর চোখে পাপ। আরেকটা বঁড়শি, একটা প্রস্তাব ------------------------------------------- সকালের কাগজে দেখলাম, আমেরিকার বলিষ্ঠ পুত্রেরা বন্দুকের উৎস নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। কাগজ তো আমায় আরও বললো, জনৈক মন্ত্রী মহোদয় আর বন্দুক শিল্পপতিদের সংবাদমাধ্যমের উপর কোনো প্রভাব আছে কিনা, সেই অনুসন্ধানের জন্য তারা সংসদকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। আমার সব কাজ সারা, একা বসে আছি গোধূলিতে, আর কল্পনা করছি, কীভাবে এই দৈনিক তিন টাকা আট আনার রোজগার দিয়ে একটা বন্দুকের দাম উঠানো যায়। একটা শিশু হিসাবে আমার শুরুটাই কি ভুলভাল হয়েছিলো তাহলে? আর আমার বৃদ্ধ অভিভাবক কি বেশি ভালো করতেন, যদি একটা কেরানী হতে না পাঠিয়ে আমায় মেশিনগান তৈরির কারখানায় কাজ করতে পাঠাতেন? কাব্যিক ডিমগুলো ---------------------------- আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ ছন্দোবদ্ধ মুরগি, কবিতার ডিম পাড়ি। আর আমার ধাতুকে প্রবল করতে হাত পেতে দাঁড়ায়, ছোট্ট নিরীহ কিছু শান্তি। আমরা কুসুমটাকে দর্শন বানাই, যদিও মানি অন্ডকোষটাই প্রকৃত সুন্দর। আর ক্লান্তিকর দীর্ঘ বক্তৃতাদের মানবিক প্রমাণ করতে, প্রাণকে আগলে রাখা যে কোনো খোলার গায়ে প্রাণপণ আঠা লাগাই। ময়নাতদন্ত বিষয়ক ষড়যন্ত্র --------------------------------------- একটা বাদামি রঙের হৃষ্টপুষ্ট বাচ্চা পদ্মের বুকে চড়ে বসেছে, আর তুমি, এই যে তুমি, যথেষ্ট সুখী ছিলে, আর এখনও হাসছ, যে হাসিটা অপার্থিব না হলেও অবাস্তব তো বটেই। জল ছিটকে ছিটকেই যদি বেঁচে থাকা যায়, সে তো ভালোই। আর হাসিই তো সেই অস্ত্র, পৃথিবীর সব যুদ্ধে যা শেষ কথা বলে এসেছে। শিংওয়ালা শুভ্র হরিণটির প্রতি -------------------------------------------- লতাগুল্মের উপর জমে থাকা মেঘে আমি তাদের দেখেছি। দেখো, তারা দ্বিধায় আছে কিন্তু ভালোবাসা বা বিষাদের জন্য নয়। যখন ধবল মরদটি আবরণ ভেঙে ফেলে, আর স্বচ্ছ হাওয়া ভোরের জানান দেয়, তাদের চোখগুলো অবিকল প্রেমিকের অপেক্ষায় থাকা তরুণীর মতই দেখায়। এই তবে সেই বিশুদ্ধ পুরুষ, কীর্তি, আমরা এক অনন্ত মৃগয়ায় আছি। আয়, পৃথিবীর কুকুরেরা, তাড়া কর, আমাদের শিংকে নিলামে চড়া।






নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮