• অমৃতা চক্রবর্তী

গল্প - অফিসের সেই রাত




সকালে ঘুম ভেঙেই মুড্ টা অফ হয়ে গেলো অভিষেকের। কাল রাত্রি ২টো তে বাড়ি ফিরেছে। এখন আবার ৭.৩০টায় উঠতেই হোলো, কারন ৮ টা থেকে আবার ইউ এস এ তে যুবরাজের সঙ্গে কল আছে। আগের কোম্পানিতে অভিষেক ভালোই ছিলো, কেনো যে মরতে এই ফরেন ব্যাংঙ্কে জয়েন করলো?

অভিষেক একটি বিদেশী ব্যাংঙ্কে বেশ উঁচু পোস্টে চাকরি করে। অভিষেকের বউ হিয়া একজন শিক্ষিকা। সে আজ সব পরিস্থিতিতেই নিজেকে মানিয়ে নেয়।কিন্তু বেচারা তোজো, সে সবে ক্লাস টু তে পড়ে।সে সবসময়ই পাপার সংঙ্গ চায়, যেটা অভিষেক দিতে পারে না।

অভিষেক আজ সকাল ১০ টার ক্যাব টা ধরলো।ওরা পুনে তে ওয়াকাডে থাকে। আর ওর বাড়ী থেকে অফিস প্রায় দেড় থেকে দুঘন্টা পৌঁছাতে লাগে, আবার ফিরতেও প্রায় একই সময় লাগে। এত যাতায়াতের পরিশ্রমের ওপর আবার অফিসের এতো চাপ।

দুপুর ৩টে নাগাদই অভিষেক বুঝতে পারলো আজ রাতটা অফিসেই কাটাতে হবে। হিয়াকে জানিয়েও দিলো।রাত্রি ১০.৩০ এ সবাই বেরিয়ে গেলে অফিসে অভিষেক, ওর জুনিয়র ঋষভ ও আশপাক রয়ে গেলো। ওরা অফিসের সিক্সথ ফ্লোরে কাজ করছিলো। বাকী সব ফ্লোর ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে গেলো। যদিও এটা পুনে শহর, তাও সাধারণ মানুষ আর কতক্ষণ জেগে থাকবে?চারপাশ টাও ধীরে ধীরে চুপ হয়ে যাছিলো।

রাত্রি যখন ২.৩০ অভিষেক তখন একটা ক্যাচক্যাচ আওয়াজ শুনতে পেলো,কিন্তু একেবারেই পাত্তা না দিয়ে সে কাজ করতে লাগলো। ওদের তিন জনের মদ্ধে অভিষেক ই বাঙালী।ঋষভ হিমাচল ও আশপাক ইউ পি র ছেলে। ওরা অভিষেক কে দাদা বলে ডাকে। ঋষভ হঠাৎ বললো,'দাদা আপনে কুছ শুনা?'তখন আশপাক ও বললো,'হা দাদা আপনে কুছ আওয়াজ শুনা?'

অভিষেক তখন জানালো,যে সে ও একটা আওয়াজ শুনেছে। অভিষেক বললো,'এতো চিন্তার কি আছে? ইঁদুর হবে। চলো আমরা খুঁজে দেখি।'আওয়াজ কিন্তু একটা ছন্দে হয়ে চলেছে। মনে হচ্ছে যেনো কেউ আওয়াজ টা তৈরী করছে।ওরা তিন জনে তখন কাজ ফেলে আওয়াজের কারন খোঁজা শুরু করলো।ওরা সবাই অভিষেকের কেবিনে ছিলো। সেখান থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো। কোথাও কিছু না পেয়ে ওরা যখন হতাশ হয়ে ফেরত আসছে, ওরা দেখলো অভিষেকের কেবিনের বাইরে একটা স্প্রিং দেওয়া চেয়ার ছিলো, যেটা আপনা থেকেই দুলে উঠছে একটা ছন্দে। ওরা যেই সামনে গিয়ে পৌছালো, তাতে পরিষ্কার দেখলো চেয়ারে বসে কেউ যদি পা দোলায় যেভাবে চেয়ার টা ক্যাচক্যাচ আওয়াজ করবে,একদম সেইরকম ই আওয়াজ হচ্ছে এবং থেকে থেকে হয়েই যাচ্ছে। চেয়ারে পা দিয়ে ধাক্কা মারলে যেমন অল্প অল্প এগিয়ে আসে,চেয়ার টাও ওদের দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে।ওদের মধ্যে ঋষভ ই চেঁচিয়ে উঠলো, "ভাগো দাদা"। এবারে তিন জনেই কোনোরকমে ব্যাগ উঠিয়ে দৌড়াতে লাগলো। আশপাক ও ঋষভ লিফটে গেলো।অভিষেক সবসময়ই সিঁড়ি ব্যবহার করে, তাই এবারে ও সেই অভ্যাসমতো সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলো। অভিষেকের মনে হতে লাগলো, যে সিঁড়িতে অনেক লোক কথা বলতে বলতে পিছনে পিছনে নামছে। ও যতো জোরে পা চালাচ্ছে, ততোই আওয়াজ বাড়ছে।

শেষে যখন আগে থেকে বুক করা 'ওলা ক্যাবে' উঠলো তখন অভিষেকের অবস্থা খুব খারাপ।

পরেরদিন তিন জনে অফিসে এসে ওদের পুরোনো কলিগ 'আজিত' কে সব জানালো।সে একটি রোমহষর্ক ঘটনা জানালো।

এই ব্যাঙ্কটি যখন আজ থেকে ২০ বছর আগে এই বিল্ডিং এ শুরু হয়েছিলো তখন মিঃ শচীন বলে একজন কাজ করতো। একদিন সে তার নিজের বউয়ের সাথে ভুল বোঝাবুঝিতে, ঝগড়া করে অফিসে এসেছিলো এবং সবাই চলে গেলে সে এখানেই সুইসাইড করে।

এখনো যারা বেশি রাত অব্ধি কাজ করে,তারা কেউ কেউ তার উপস্থিতি টের পায়।সে বোধহয় চায় না,এখানে বেশী রাত অব্ধি জেগে কেউ কাজ করুক।




নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮