• পার্থ সেন

গল্প - অ্যানাড্রোম







[ক]


“আমার বয়স কত বলুন তো?”

এ আবার কি রকমের প্রশ্ন? পরিচয়ও হয়নি ভালো করে, দুজনে দুজনের নামটাও জানেন না আর অন্য ভদ্রলোক বলেন কি না “আমার বয়স কতো বলুন তো?”

সুবলবাবু সবে মাত্র ট্রেণে উঠেছেন, এখনো ঠিক করে গুছিয়ে বসেননি! ফাঁকা কামরা, ছ’টা বার্থের একটা ছাড়া সব কটাই খালি ছিল! অন্য দিকে এক ভদ্রলোক বসেছিলেন, সুবলবাবুকে দেখে অবশ্য একগাল হেসেছিলেন, ‘যেন কত দিনের পরিচয়’। সুবলবাবু তেমন পাত্তা দেননি। কোন সন্দেহ নেই ভদ্রলোক বেশ বয়স্ক, তবে বয়স বলা যায় কেমন করে? আমতা আমতা করলেন, “বলতে পারবো না ঠিক করে!”

“আপনার বয়স কতো?”


সুবলবাবু বুঝতে পারছেন না, ভদ্রলোক বয়স নিয়ে পড়ে আছেন কেন? তবে এটা বরং সহজ প্রশ্ন, কথা না বাড়িয়ে উত্তর দিয়ে দিলেন “এই আটত্রিশে পড়লাম”

উত্তরটা দিয়ে হাতের মালটা সীটের তলায় ঢুকিয়ে দিলেন, আর অন্যটা জানলার পাশে রেখে সীটে রেখে বসলেন সুবলবাবু। কূপের আলোটা বেশ উজ্জ্বল, ভদ্রলোকের দিকে একবার তাকালেন সুবলবাবু। কেমন একটা অমায়িক ভাবে ওঁর দিকে তাকিয়ে আছেন। বিশেষ পাত্তা না দিয়ে হাত ব্যাগ থেকে সদ্য কেনা একটা বাংলা পত্রিকা খুলে বসলেন তিনি। ট্রেনের কামরার জানলা দিয়ে বাইরে দিকে চেয়ে দেখলেন, আলো বেশ কমে এসেছে। একটু আগে যে বৃষ্টিটা একেবারেই গুঁড়ি গুঁড়ি হয়ে পড়ছিল জলের ফোঁটাগুলো এখন বেশ বড় আকারের হয়েছে। একটা দুটো ফোঁটা ছিটকে এসে গায়ে লাগে। জানলার কাঁচটা নামিয়ে দিলেন সুবলবাবু। কামরার ভেতরে আলো বেশ উজ্জ্বল, ভালো ভাবেই বই পড়া যায়। হাতে ধরা খোলা পত্রিকায় মনোনিবেশ করলেন। সম্পাদকীয়টা পড়া তখনো শেষ হয়নি, আবার ভদ্রলোকের গলা কানে এলো, “একটা জিনিস দেখেছেন কি?”


ইচ্ছে ছিল না তবু তাকাতে হলো! কি জিনিস? উনি আবার বললেন “আপনি পরে আছেন নীলের ওপর সাদা চেক শার্ট আর আমারটা সাদার ওপর নীল চেক! কেমন অদ্ভূত না!”

এ আবার কি কথা? আর এতে অদ্ভূতেরই বা কি আছে? দুজনের কারুরই পরণের জামা কোন ব্যাতিক্রমী কিছু নয়, এই রং-এর জামা খুবই সাধারণ, এ রকম হতেই পারে! আর তা যদি নাও হয় এ’রকম করে ডিসটার্ব করতে আছে নাকি? কোন উত্তর দিলেন না, আবার পত্রিকা’র পাতায় মনোনিবেশ করলেন। নিশ্চয়ই খুশী হননি, তবে অযথা সেটা কথায় প্রকাশ করেননি। তবে একটা ব্যাপার সেটা সুবলবাবুর বুঝতে অসুবিধা হয়নি, ভদ্রলোক কেমন যেন গায়ে পড়ে আছেন, পারলেই কথা বলেন।


মিনিট দুই-তিন আবার সেই কন্ঠস্বর কানে এলো “আপনি কতদূর যাবেন?”

“জলপাইগুড়ি! আপনি?”

“শিলিগুড়ি! তা আপনি কি ব্যবসার কাজে?”

“হ্যাঁ কতকটা সেই রকমই”

ভেবেছিলেন আর কোন প্রশ্ন আসবে না, কিন্তু এলো। আর যেটা এলো সেটা কিন্তু অস্বস্তিকর! “আপনি শাড়ীর বিজনেস করেন কি?”

ইনি জানলেন কি করে আমার শাড়ীর ব্যবসা? ইতিমধ্যে ট্রেণ বেশ গতি নিয়ে নিয়েছে, রেললাইনের সঙ্গে ট্রেণের চাকার ঘষটানি’র শব্দ এখন বেশ কানে আসে। দেখে মনে হয় বৃষ্টির বেগ ও বেড়েছে। জানলার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা গুলো পড়েই কেমন পিছলে যাচ্ছে! আর এর মধ্যে কূপের আলোটা যেন কেমন একবার কেঁপে গেল! জানিনা মুখে কোন ভাব প্রকাশ পেয়েছিল কিনা, তবে সুবলবাবু এড়িয়ে গেলেন ব্যাপারটা! “হ্যাঁ ঐ রকম!”

আবার ভেবেছিলেন আলোচনাটা থেমে যাবে, কিন্তু থামলো তো নাই! বরং আরো বাড়ল, আবার উনি বললেন, “আপনার কি হোলসেলের দোকান?”


এবারে একটু নড়ে চড়ে বসতেই হলো, সব কটা অনুমান কি করে মিলে যাচ্ছে? ভদ্রলোক কি তাঁকে চেনেন? তাহলে? এটা সত্যি সুবলবাবুর ব্যবসা আর ওনার হোলসেলের দোকান আছে! সেখান থেকে উত্তর বঙ্গের অনেক ব্যবসায়ীরা জিনিস নিয়ে এসে তাঁদের দোকানে বিক্রী করেন! কিন্তু ওঁর সঙ্গে এমন কোন জিনিস নেই যা দেখে কেউ অনুমান করতে পারে যে ওনার হোলসেলের ব্যবসা! হাতের খোলা ম্যাগাজিন সীটের ওপর রেখে সোজা তাকালেন উল্টোদিকে বসে থাকা ভদ্রলোকের দিকে। আর সত্য গোপন করলেন না তিনি, “হ্যাঁ আমার হোলসেলের দোকান! কিন্তু আপনি জানলেন কি করে?”

“ঐ অনুমান করলাম আর কি?”

“অনুমান করলেন?”

“হ্যাঁ স্যার”

“আপনি কি করেন?”

“আমারও শাড়ীর ব্যবসা”

“আচ্ছা!”

“তবে আমি কলকাতা থেকে জিনিস কিনে মালদাতে বিক্রী করি!” দু-তিন সেকেন্ডের বিরতির পর একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়ে ভদ্রলোক আবার বললেন, “একটা জিনিস দেখেছেন কি? আমাদের দুজনের মধ্যে মিলের চেয়ে অমিল বেশী”

“কি করে জানলেন? খালি আমরা কি ব্যবসা করি সেটা শুনেই বুঝে গেলেন?”

“তারপর ধরুন এই আপনার মাথাভর্তি কালো চুল। আমার মাথাভর্তি সাদা চুল”

খেয়াল করেননি আগে, এই বারে দেখলেন। ভদ্রলোকের এক মাথা সাদা চুল। এখানেই উনি থামলেন না, আবার বললেন, “আরো আছে!”

“কি রকম?”

“আপনি এখানে একুশ নম্বর বার্থে আছেন! আমার বার্থ নম্বর আবার বারো! দেখেছেন আবার বিপরীত! উল্টো”

“বারো বার্থ তো আপনার তো পাশের কূপটা হওয়া উচিৎ!”

“হ্যাঁ, আসলে ওপাশে আলোটা কাজ করছে না! বড় অন্ধকার! তার এই পাশে এসে বসেছি”

ভদ্রলোককে কেমন যেন ঠিক লাগছিল না সুবলবাবুর! চশমার ওপর দিয়ে চেয়ে আছেন, আর মিটিমিটি হাসছেন! আর হাসিটার মানেও বেশ অস্বস্তিদায়ক, কেমন “সব কিছু জেনে ফেলেছি টাইপের”। তবু কথা বলতেই হলো, “বেশ! আর?”

“তারপর দেখুন আমি দিনে তিন প্যাকেট সিগারেট খাই! আপনি কি অত খান? দেখে তো মনে হয়না!”

সুবলবাবুর মাথার মধ্যে কে যেন সশব্দে একটা হাতুড়ী দিয়ে মারল, সিগারেট তিনি খান। তবে দিনে ঠিক তিনটে! সকালে দোকানে ঢোকার আগে, বিকেলে চা খেয়ে আর শুতে যাওয়ার আগে। তার বেশী তাঁর নিজের ইচ্ছায় নয়। তাহলে? এখানেও অমিল। এবারে প্রশ্নটা মনে বারবার আসা শুরু করে দিল “কি হচ্ছে ব্যাপারটা?” আর তার চেয়েও ইম্পরট্যান্ট এই উল্টোদিকে বসে থাকা বয়স্ক ভদ্রলোক সেগুলো জানলেন কি করে? সম্মোহনের প্রয়োগ নাকি?

“কি ঠিক বলেছি তো?” চশমার ওপর দিয়ে চেয়ে আছেন ভদ্রলোক।

মাথা নাড়লেন, স্বীকার করতেই হল ভদ্রলোক ঠিক বলেছেন! একটু হলেও ভেতরটা কেমন হালকা হয়ে যাচ্ছে সুবলবাবুর। নিজে নিজেই বেশ খানিকটা সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞাসা করলেন, “আচ্ছা আপনার নাম কি?”

“সজল বসু! আপনার?”

“সুবল যশ”

“আরে! কি বললেন? সুবল যশ?”

“হ্যাঁ, কেন?”

“বুঝলেন না! আমরা হলাম গিয়ে অ্যানাড্রোম! অ্যানাড্রোম মানে জানেন তো?”

‘অ্যানাড্রোম’ শব্দের অর্থ সুবলবাবুর জানা ছিল। একটা শব্দ সেটাকে উলটে লিখলে আর একটি অর্থপূর্ণ শব্দ পাওয়া যায়। যেমন ধরা যাক ‘নর্তকী’। উল্টোদিক থেকে সেই শব্দ হয়ে যাবে ‘কীর্তন’। দুটো শব্দই অর্থপূর্ণ, সুতরাং এই দুটো শব্দ ‘অ্যানাড্রোম’। পৃথিবীতে খুবই শব্দ আছে যেগুলো ‘অ্যানাড্রোম’। যা হোক সেটা বুঝলেও প্রসঙ্গটা ঠিক বোঝেননি সুবলবাবু। জিজ্ঞাসা করলেন, “মানে?”

“সজল বসু কে উলটে লিখলে কি হয়? তালব্য শ আর দন্ত স আর ‘জ’ আর ‘য’র ব্যাপারটা হাটিয়ে দিন। সুবল যশ হয় তো! তাহলে?”


অনেকদিন বাদে বা কাঁধের কাছটা কেমন যেন শিরশির করে উঠল সুবলবাবুর! সেই ছোটবেলায় সন্ধ্যে রাতে একা একা ভূতের গল্প পড়ার সময় যেমন হতো! কূপের আলোটা আরো যেন আবার একবার কেঁপে গেল। ট্রেণের পাশ দিয়ে এক প্রচন্ড শব্দ করে একটা দূরপাল্লার ট্রেণ ঝড় তুলে ছুটে বেরিয়ে গেল! বেশ পাঁচ ছয় সেকেন্ড কথা বলতে পারেননি সুবলবাবু, ভদ্রলোক আবার বললেন, “কি সুবলবাবু ভয় পেলেন নাকি?”

পেয়েছেন কোন সন্দেহ নেই! তবে মুখে সেটাকে স্বীকার করলে বোকা হতে হয়। “কেন ভয় পাবো কেন?”

“আচ্ছা আপনাকে একটা জিনিস জিজ্ঞাসা করি? একটু ব্যক্তিগত!”

একটু কুণ্ঠা থাকলেও সুবলবাবু বললেন, “বলুন!”

“আপনি কি বিবাহিত?”

“হ্যাঁ”

“স্ত্রী পুত্র সবাই আছেন?”

“স্ত্রী আছেন, পুত্র নেই! আমার দুইটি মেয়ে”

“দেখেছেন, আবার অমিল”

“কি রকম?”

“আমার আবার দুইটি পুত্র!”

“স্ত্রী?”

“২০১২ সালে গত হয়েছেন”

গলায় কেমন যেন একটা কাঁটা ফুটল সুবলবাবুর। ২০১২ সালেই তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলাম। তার মানে আর একটা অমিল! সুবলবাবুর বিবাহের বছর আর সজলবাবুর স্ত্রীবিয়োগের বছর দুটোই এক! কোনমতে একটা ঢোঁক গিললেন, অপ্রস্তুত যাতে মনে না হয় জলের বোতলটা খুলে গলায় একটু জল ঢাললেন। এই অস্বস্তিকর আলোচনাটা হয়তো আরো খানিকটা এগোত, তবে একটা বাধা পড়ল! ভালোই হল! টিকিট চেকার এসে পড়লেন।

দুজনেই পকেট থেকে নিজের নিজের ‘পরিচয় পত্র’ বার করে টিটিকে দিলেন। ‘পরিচয় পত্র’ ছাড়া এখন ট্রেণে ওঠা যায়না! টিটি সুবলবাবুর পাশের সীটে বসে হাতের চার্ট নিয়ে কিছু দেখছেন, আর তিনি ভাবছি “এরপরে কি বলব?” আড়চোখে তাকিয়ে দেখলেন সজলবাবু পা দুটো মুড়ে সীটের ওপর তুলে বসলেন। পকেট থেকে মোবাইল বার করে নতুন মেসেজের সন্ধান করছেন, এমন সময়ে গলা শুনলেন,

“আপনারা কি করেছেন কি?” টিটি’র গলা, কেমন বেশ উৎফুল্ল গলার স্বর।

“কি ব্যাপার?”

“মিঃ যশ আপনার জন্ম তারিখ ১৪/০১/৮২ আর মিঃ বসু আপনার জন্ম তারিখ ২৮/১০/৪১। একেবারে উলটিয়ে বানানো! এরকম আগে তো কখনো দেখিনি!”

অজান্তে সুবলবাবুর কোলের ওপর থেকে ম্যাগাজিনটা নিচে পড়ে গেল। যখন খেয়াল হল, তখন দেখলেন নিজের আইডেন্টিটি কার্ড ওঁর হাতে ধরা আর সজলবাবু কেমন যেন গুটিসুটি মেরে বসে আছেন আর মিটিমিটি হাসছেন। সেটা নিশ্চয়ই ভয় পেয়ে নয়। তবে সে হাসি আনন্দে কি না, সেটা জানা নেই! এবারে একেবারে সুবলবাবুর মনের কথাটা উনিই বললেন, “কি ব্যাপার বলুন তো?”

মনে একটু জোর এনে সুবলবাবু বললেন, “ভালোই তো! আপনার সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেল! এই রকম সাধারণত তো দেখা যায় না! আমাদের দেখা হয়ে গেল”

“কেন? আপনার কি মনে হয় অমিল শেষ হয়ে গেছে?”

“তা হয়তো নয়, কিন্তু এই রকম জন্ম তারিখের অ্যানাড্রোম ব্যাপারটা তো আর হবে না!”

“হ্যাঁ, তা হবে না! সত্যি ইউনিক” ভদ্রলোক পকেট থেকে কি একটা বার করলেন, তারপর বললেন “স্যার এই আমার কার্ড, যদি কখনো শিলিগুড়িতে আসেন শাড়ী কিনতে!”

অন্ধকারে সিঁড়ির সব কটা ধাপ ঠিকঠাক শেষ করার পরে যেন আর একটা ধাপ ছিল, না জেনে পা ফেলায় সেটাই বড় একটা ঝটকা দিল। আর তাতে সারা শরীর ঝনঝন করে উঠল। সুবলবাবুর বাবা ওঁর মায়ের নামে দোকানের রেখেছিলেন, “আদি ঊষা বস্ত্র নিকেতন”। সেই দোকান আজ চালিয়ে আসছেন সুবলবাবু। আর হাতে ধরা কার্ড যেটা কয়েক সেকেন্ড আগে সজলবাবু ওঁকে দিয়েছেন সেখানে লেখা রয়েছে “আধুনিক গোধূলী ড্রেস”। আবার বিপরীতার্থক শব্দ! ‘আদি’ হয়ে গেল ‘আধুনিক’, ‘ঊষা’ হয়ে গেল ‘গোধূলী’।


বিস্ময়ে বিমূঢ়, হতবাক সুবলবাবু অবাক চোখে চেয়ে আছেন হাতে ধরে থাকা কার্ডটার ওপর। কতক্ষণ জানা নেই, যখন ঘোর ভাঙল ট্রেণ বোলপুর স্টেশনে ঢুকছে।


[খ]




ট্রেনের দুলুনিতে ঘুম এসে গেছিল সুবলবাবুর। ‘চা’ ‘চা’ করে এক টানা শব্দে তন্দ্রাটা ভেঙে গেল। চায়ের ঝোলা নিয়ে বিক্রেতা ওঁদের কূপ ছাড়িয়ে চলে গেলেন। ওঁদের কূপটা এখনো অবশ্য খালিই আছে। সজলবাবু টিটি কে ম্যানেজ করে ‘১২’ নম্বর বার্থ থেকে ‘১৭’ নম্বরে চলে এসেছেন। টিটি বলছিলেন বাকীরা আজিমগঞ্জ থেকে উঠবেন। কেমন যেন মনে অস্বস্তি একটা। উল্টোদিকে বসে সজলবাবু, কেন যেন সুবলবাবু’র মনে হচ্ছে, সজলবাবু যেন তাঁর ঠিক বিপরীত আইডেন্টিটি’র একটি মানুষ। আর এই যে মিটিমিটি হাসছেন সর্বক্ষণ সেটাই সবচেয়ে বিরক্তিকর!

সুবলবাবু অন্যদিকে তাকিয়েই ছিলেন, আড়চোখে একবার তাকালেন সজলবাবুর দিকে। তাকিয়ে দেখলেন সজলবাবু কাঁধের ঝোলা থেকে একটা ফ্লাস্ক বার করলেন। সম্ভবত চা’এর ফ্লাস্ক! তারপর ব্যাগ থেকে কাগজের কাপ বার করলেন, তাতে খানিকটা চা ঢেলে নিলেন। পাছে চোখাচুখি হয়ে যায় তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিলেন সুবলবাবু, বন্ধ করে ফেলা ম্যাগাজিনটা আবার খুললেন। তবে সেটার প্রচ্ছদের মলাট ছাড়া আর কিছু দেখার জন্য মনঃসংযোগ করতে পারছেন না তিনি! আবার গলা শুনলেন, “এই দেখেছেন জিজ্ঞাসা করা হয়নি! আপনি চা খাবেন?”

“না!” সংক্ষেপে উত্তর দিলেন সুবলবাবু।

“স্যার কি রেগে গেলেন আমার ওপর?”

সুবলবাবু চুপ করেই আছেন, সজলবাবু আবার বললেন, “কি করবেন বলুন! আসলে কি ব্যাপার জানেন অ্যানাড্রোম আমাদের জীবনের একটা অঙ্গ! খুব আনকমন, কিন্তু পাওয়া গেলে এই রকম জুটি আপনি পাবেন না! এটাকে মানতেই হবে”

আচ্ছা মুশকিলে পড়া গেল তো! সুবলবাবু এবারে বেশ কড়া গলায় বললেন, “আচ্ছা! এই অ্যানাড্রোম ছাড়া কি আপনার আর কোন প্রসঙ্গ নেই?”

“নিশ্চয়ই আছে! কিন্তু কি ব্যাপার জানেন! আপনার সঙ্গে কথা বললেই সব উল্টো বেরিয়ে যাচ্ছে! আর তাতে আপনি অপ্রস্তুত হচ্ছেন আর আমারও খারাপ লাগছে! আপনি একটু চা খান বরং!”

না বলতে গিয়েও সুবলবাবু বলতে পারলেন না, কেননা সজল বাবু কাপ বার করে তাতে চা ঢালা শুরু করে দিয়েছেন! “আসুন স্যার” বলে চায়ের কাপ দিতে গিয়েও সজল বাবু হাত সরিয়ে নিলেন, “না থাক!”

“কেন? থাকবে কেন? দিন”

“আপনার তো কালো চা চাই। তাই না! আমারটা তো দুধ চিনি দিয়ে তৈরি”

ঠাণ্ডা একটা সরীসৃপ যেন হাতের ওপর দিয়ে চলে গেল। মাথা ঘুরে গেল সুবলবাবুর, তিন বছর হল ডায়াবিটিসের রুগী তিনি, চা তিনি চিনি ছাড়া খান। এর আগে পর্যন্ত ব্যাপারটা নামে আর জন্মতারিখে সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু এখন তো জীবনের প্রাত্যহিক অভ্যাসের মধ্যে ঢুকে পড়ছে ব্যাপারটা! চোখের পাতা কেমন যেন একবার দপদপ করে উঠল। পরক্ষণেই মন শক্ত করলেন তিনি, আর ভয় পাওয়া চলবে না! আর এটাও জানা দরকার ‘আমার ব্যাপারে ঠিক কতোটা ব্যাপার সজলবাবু জানেন?’


যথাসম্ভব স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করলেন সুবলবাবু। “না সেরকম কিছু নয়। দিন! খাচ্ছি!”

হাত থেকে কাপটা নিতে গিয়ে, আবার বুক ছ্যাঁক করে উঠল। কেমন যেন ধড়াস করে একটা ধাক্কা বুকের ভেতরে, সজলবাবুর হাত একেবারে বরফের মতো ঠাণ্ডা! কোনমতে চায়ের কাপ নিলেন, ঘটনার আকস্মিকতায় হাতটা কেঁপে গেছিল সুবলবাবুর। তবু সামলে নিলেন, একটু চা চলকে পড়ে গেল পায়ের ওপর। তবে তেমন বাড়াবাড়ি কিছু হয়নি। কোথায় যেন পড়েছিলেন ভয় পেলে সেটাকে আক্রমণ করতে হয়, তার তাতেই সবচেয়ে ভালো সমাধান হয়। তাই এবারে নিজেকে আর গুটিয়ে নেননি,

“আপনার হাতটা অতো ঠাণ্ডা কেন? শরীর ঠিক আছে তো!”

“হ্যাঁ, শরীর ঠিক আছে। আশি বছর বয়স হলো, আমার আবার শরীর! আর আমার হাত একটু ঠাণ্ডাই থাকে!”

“আপনার ব্যাপারে তো কিছুই জানা হলো না! আপনি কোথা থেকে আসছেন?”

“আমি আসছি কলকাতা থেকে! মাসে একবার করে যেতে হয়! মালপত্তর কিনে আনি”

“তা এই আশি বছর বয়সে আপনি নিয়মিত কলকাতা যাতায়াত করেন? আপনাকে সাহায্য করার লোক নেই?”

“সাহায্যের লোক আছে। কিন্তু ভরসার লোক তো নেই!”

“তা আপনার মাল পত্তর কোথায়?”

“এই তো সীটের তলায়!” সীটের তলায় বেশ বড় আকারের তিনটে ব্যাগ।

বেশ মিনিট দশ – বারো কথা হচ্ছিল, ব্যাপারটা আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হচ্ছিল সুবলবাবুর জন্য। কিন্তু বেশীক্ষণ সেটা স্থায়ী হলো না। সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল। কথা হচ্ছিল উত্তর বাংলায় এই বারে ঠাণ্ডা কেমন পড়েছিল। হঠাৎ করে সজল বাবু বলে বসলেন, “আপনার ঠাণ্ডা ভালো লাগে না! তাই না”

“কেমন করে বুঝলেন?”

“বলা তো খুব সহজ, আসলে আমার ঠাণ্ডা খুব ভালো লাগে, সুতরাং অমিল ধরলে আপনার ঠাণ্ডা খারাপ লাগা উচিৎ! তাই নয়?”

সুবলবাবু চুপ করেই ছিলেন, সজলবাবু আবার বললেন, “ঠাণ্ডায় হিল স্টেশন গেছেন কখনো? এতো এনজয় করবেন বলে বোঝাতে পারব না!”

আস্তে আস্তে করে গরম হয়ে আসতে থাকা শরীর আবার কেমন এক মুহূর্তে ঠাণ্ডা হয়ে গেল সুবল বাবুর। ছোটবেলা থেকেই ঠাণ্ডা ওনার অপছন্দ। তবু বিয়ের পর শীতকালে বেড়াতে গেছিলেন সিমলা। স্ত্রী’র পছন্দ ‘শীতকালে হিল স্টেশন’ তাই ‘না’ করেননি। দুই বছর আগে, থাকতে পারেননি, তিনদিনের মাথায় ফিরে এসেছিলেন। ভীষণ ঠাণ্ডা গেছিল, প্রথমে ভেবেছিলেন নিমোনিয়া, পরে অবশ্য ডাক্তার বলেছিলেন অত বাড়াবাড়ি কিছু নয়। কিন্তু সুবলবাবুর ব্যক্তিগত প্রতিটা পছন্দ অপছন্দ ভদ্রলোক জানতে পারছেন কি করে? শুধু কি অ্যানাড্রোম? নাকি অন্য কিছু? এই ভদ্রলোককে তিনি কোনদিন দেখেছেন বলে মনে করতে পারছেন না! ইনি এতো কিছু জানলেন কি করে?

কেমন করে যেন সজলবাবু জানতে পেরে গেছেন সুবলবাবুর মনের কথা। নিজেই বললেন, “আপনি অবাক হচ্ছেন তাই না?”

“কি ব্যাপারে?”

“এই আমি কি করে সব বলে দিচ্ছি! এটা খুব সহজ হিসেব। আমার যেগুলো ভালো লাগে সেগুলো আপনার খারাপ লাগবে আর আপনার যেগুলো ভালো লাগে সেগুলো আমার খারাপ লাগে”

“আপনি জানলেন কি করে?”

“এতো জানার প্রয়োজন নেই! খুব সহজ! যেমন ধরুন, আমার মাছ মাংস ছাড়া চলে না, কিন্তু আপনি বোধহয় নিরামিষাশী! তাই তো?”

আবার বিস্ময়। আজ পনের বছর হয়ে গেল সুবলবাবু মাছ-মাংস ছেড়ে দিয়েছেন। এখানেই থামলেন না সজলবাবু, আবার বললেন “আবার ধরুণ, আমার জল ভীষণ পছন্দ! মানে সাঁতার কাঁটা, মাঝসমুদ্রে চান করা। আপনি...”

মাঝপথে থামিয়ে দিলেন সুবলবাবু, “এই আলোচনাটা বরং আপাতত থাকনা! আমরা বরং অন্য কথা বলি!”

কিছু বলতে গিয়ে যেন থেমে গেলেন সজলবাবু, “বেশ, ঠিক আছে। থাক তাহলে”

কি বলবেন ভাবছেন, এমন সময়ে সজলবাবু বললেন, “আপনি বসুন, আমি একটু আসছি”

“কোথা থেকে?”

“দেখি টিটি সাহেবের কাছে পারমিশান নিয়ে যদি একটা সিগারেট খাওয়া যায়!”

“ট্রেনে খেতে দিচ্ছে আজ কাল?”

“না মানে আইনত কখনোই নয়। ঐ যদি দরজা খুলে টুলে আর কি! কোন মতে ম্যানেজ করা! দেখি চেষ্টা করে!”

ভদ্রলোক চলে গেলেন, কেমন কুঁজো হয়ে হাঁটছিলেন, আবার হাঁটাও কেমন বেশ পা টেনে টেনে। সেটা বয়সের ভারে কি অন্য কোন কারণে বোঝা গেল না। সুবলবাবু’র কেমন অস্থির লাগছে। এমন এক সহযাত্রীর পাল্লায় পড়লেন যে বৈপরিত্য’র ডেফিনিশন যেন নতুন করে লিখতে হবে। এখনো সুবলবাবু বুঝতে পারছেন না, সত্যিই কি অ্যানাড্রোমের মহিমা নাকি অন্য কিছু ব্যাপার আছে এর মধ্যে। একজনের মতো একেবারে হুবহু দেখতে আর একটি মানুষ পৃথিবীর অন্য প্রান্তে নাকি পাওয়া যায়। সে জিনিস বইএ পড়েছেন, সিনেমায় দেখেছেন কিন্তু এই রকম বিপরীত পছন্দের মানুষ, যেখানে দুটি মানুষের প্রতিটা অভ্যাস, পছন্দ একে অপরের বিপরীত, সে কি সম্ভব? তার চেয়েও বড় কথা দুটি মানুষের নাম এবং জন্ম তারিখ একে অপরের অ্যানাড্রোম! সেকি নেহাতই কাকতালীয় নাকি তার কি কোন ব্যাখ্যা আছে! হঠাৎ চোখে পড়ল সজল বাবুর হাতের ঝোলাটা সামনের সীটে পড়ে আছে! মাঝে মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কি সব দেখছিলেন সেখানে! একবার দেখা যায়! এখনো তাঁর মন বলছে অ্যানাড্রোম ব্যাপারটা পুরো বোগাস। কিছু একটা চালাকি লুকিয়ে আছে এর মধ্যে। ঝোলার মধ্যে কিছু পাওয়া যেতে পারে কি?


[গ]



হাত ঘড়িটা জ্বলজ্বল করছে, সময় দেখাচ্ছে রাত বারোটা সাতাশ। মাঝের বার্থে শুয়ে আছেন সুবলবাবু। মাঝের বার্থে এমনিতেই জায়গা একটু কম লাগে। খালি মনে হয় ওপরের বার্থটা যেন আরো নিচে নেমে আসছে। আর ব্যবধান যেন ক্রমেই কমে আসছে। এ’পাশ ওপাশ করাটাও বেশ সমস্যাদায়ক। ভেবেছিলেন টিটিকে বলে পাল্টে নেবেন কিন্তু অন্য সব কটাই ভর্তি। কোথাও খালি কিছু পেলেন না। অঘোরে ঘুমোচ্ছে গোটা কূপ। খালি সুবলবাবু’র চোখে ঘুম নেই। নীচের সতের নম্বরে দিকে চোখ গেল, মুখ দেখা যাচ্ছে না। তবে দেখে মনে হচ্ছে তিনিও ঘুমোচ্ছেন! নড়াচড়া করলে বুঝতে পারতেন। খালি মনে পড়ছে সজলবাবু’র শেষ কথাটা! তিনি কি সত্যিটা জানেন? তাই ইচ্ছে করেই বললেন? নাকি এটাও কাকতালীয়? নাহলে এমনি এমনি কথাটা তুললেন কেন?



রাতের খাওয়া দাওয়া হয়ে গেছিল, শোবার তোড়জোড় চলছিল। কাল সকালে হয়তো আর কথা হবে না, এইসব সময়ে শেষ বেলায় যেমন কথা হয় আর কি! এমন সময়ে সজলবাবু বলে বসলেন, “সুবলবাবু জানিনা আপনাকে সারা ট্রেন বিব্রত করলাম কি না! আসলে কি বলি ট্রেণ জার্নির তুলনা নেই। এই কলকাতা যাবার সময় আমার স্কুল লাইফের বন্ধু’র ভায়ের সঙ্গে দেখা। প্রায় পঞ্চাশ বছর বাদে দেখা হলো। আমার বন্ধু খুব ভালো সাঁতার কাটত! সাঁতারে ছিল একেবারে চ্যাম্পিয়ন। সব ফর্মে, ফ্রী স্টাইল, বাটার ফ্লাই, বেস স্ট্রোক মানে সবেতেই। কিন্তু লাইফে খুব ট্র্যাজিডি! তো স্কুল শেষ হয়ে যাওয়ার ন্যাশানালে সিলেক্টেড হয়েছিল! তারপর হঠাৎ করে মারা গেল। অ্যাকসিডেন্টে! তো সেই বন্ধুর ভায়ের সঙ্গে দেখা হলো!”

কেন জানেন না, সুবলবাবুর মুখ থেকে প্রশ্নটা আপনা আপনিই এসেছিল, “আপনার বন্ধুর নাম কি?”

“বিপ্লব রায়”


আর বেশী কথা বলতে পারেননি সুবলবাবু, শুয়ে পড়েছিলেন। নিজেও খারাপ সাঁতার কাটতেন না তিনি। স্কুলের কম্পিটিশনে বরাবর দ্বিতীয় স্থান বাধা ছিল তাঁর। পারতেন না খালি একজনের সঙ্গে। ক্লাসের সহপাঠী, তার নাম ও ছিল বিপ্লব রায়। বারে বারে হেরে যেতেন তিনি। ঈর্ষার জ্বালায় ছটফট করতেন কিন্তু পারতেন না। ক্লাস টেনে অ্যানুয়াল স্পোর্টসে পঞ্চাশ মিটার টার্ন করার সময় বিপ্লবের পা টেনে দিয়েছিলেন। আর ধরা পড়ে গেলেন সাথে সাথে। খেলার শিক্ষক ছিলেন অমিয়বাবু, খুব কড়া! আগে মিলিটারী সার্ভিসে কাজ করতেন। ব্যাস! সাঁতারের লিস্ট থেকে সেবারের মতো সুবলবাবুর নাম কেটে দিলেন, আর ইন্টার স্কুলের প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পরে গেলেন সুবলবাবু। আর না জিতেও বিপ্লব চলে গেল সেখানে। মানতে পারেননি তিনি।

তারপর সেই ভয়ংকর দিন! জলপাইগুড়ির অদূরে সামসিং-এ স্কুল থেকে পিকনিকে গেছিলেন বন্ধুরা মিলে। ক্লাস টেনে টেস্ট পরীক্ষার পর। সেখানে সুযোগ বুঝে পাহাড়ের ওপর থেকে ধাক্কা দিয়ে...। বিপ্লবের ছিন্নভিন্ন দেহ পুলিশ খুঁজে পেয়েছিল তিনদিন বাদে। জঙ্গলের মধ্যে কোন বন্যপ্রানী নাকি ওর দেহটাকে নিয়ে নাড়াচাড়াও করেছিল।

তেইশ বছর হয়ে গেল সেই ঘটনার। কিন্তু ভুলতে পারেননি। টাটকা স্মৃতির মতো সব কিছু মনে আছে তাঁর। ফুটবল নিয়ে কথা হচ্ছিল ওঁদের, ফুটবল পাগল ছিল বিপ্লব। আগের রাতে দেখা খেলা নিয়ে কথা হচ্ছিল। তবে কেউ কিছু প্রমাণ পায়নি। অমিয় স্যার স্কুল পরিবর্তন করে অন্য কোন স্কুলে চলে গেছিলেন। সুবলবাবু কাউকে কিছু বলেন নি। খালি একটা জিনিস। তারপর থেকে আর কোনদিন জলে নামতে পারেননি সুবল বাবু। জলের কথা শুনলেই শরীর গুলিয়ে আসে। আর জলে নামলেই বিপ্লবের শরীরের গন্ধটা নাকে আসে। সহ্য করতে পারেন না। চিন্তার জাল এসে জড়িয়ে ফেলছে তাঁকে! সজলবাবুর বন্ধু বিপ্লব – মানে বেঁচে থাকলে তাঁর বয়স আজ আশি হতো কিন্তু তাঁর বন্ধু বিপ্লব সে তো তাঁর বয়সী! সুবলবাবুর বন্ধু বিপ্লবের বয়স তো মাত্র আটত্রিশ! তাহলে? কিন্তু এতো মিল হয় কি করে? সেই পুরোনো গন্ধটা খালি নাকে আসছে কেন?

চিন্তা, ভয়, উৎকণ্ঠার জালে জড়িয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছেন সুবলবাবু। ঘুম ভাঙল, কে যেন ডাকছে। ধড়মড় করে উঠে বসলেন, দিনের আলো ফুটেছে। তবে ট্রেন দাঁড়িয়ে পড়েছে। দেরী হয়ে গেল ভেবে তাড়াতাড়ি করে উঠতে গিয়ে অবশ্য মাথাটা একটু ঠুকে গেছিল কিন্তু তেমন কিছু হয়নি। পাশের বার্থের ভদ্রলোক বলছেন

“উঠুন দাদা! তাড়াতাড়ি উঠে পড়ুন”

“কেন কি হলো? এসে গেছে জলপাইগুড়ি?”

“জলপাইগুড়ি আসতে অনেক দেরী! ট্রেণ দাঁড়িয়ে গেছে! পুলিশ আসছে”

“পুলিশ? কেন পুলিশ আসছে কেন?”

“সতের নম্বরের ভদ্রলোক তো মারা গেছেন!”

“কি? কে মারা গেছেন?”

“এই সতের নম্বরের! ডাক্তার এসেছিল একটু আগে, চেক করে গেল”

“এই নীচের বার্থের ভদ্রলোক! সজলবাবু?”

“নাম জানতেন নাকি?”

“হ্যাঁ, কাল সারা সন্ধ্যে তো কথা বলতে বলতে এলাম!”

“হ্যাঁ, উঠুন। রেল পুলিশ আসছে! হয়তো আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে। উঠে পড়ুন”



উঠতেই হল, সতের নম্বর বার্থে সজলবাবুর দেহটা মাথা পর্যন্ত সাদা চাদরে মোড়া। মুখটা দেখা যাচ্ছে না! সুবলবাবু আস্তে আস্তে নিজের জিনিস গুলো ব্যাগে ভরা শুরু করলেন। পুলিশ আসবে, প্রশ্নও করবে। হয়তো পোস্ট মরটেম হবে। তবে সুবল বাবু জানেন, মৃত্যুর কারণ বেরোবে ‘হার্ট অ্যাটাক’। সাইকোলজিক্যাল ভয় থেকে দূরে থাকার জন্য নিয়মিত হোমিওপ্যাথি ওষুধ খান সুবলবাবু। আর একটা শিশিও সঙ্গে থাকে। সেটাতে থাকে কনসেন্ট্রেটেড অ্যাকোনাইট! উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, রাশিয়া এমনকি হিমালয় পার্বত্য এলাকায় জম্নানো পাহাড়ী সে গাছ। সে গাছ থেকে যেমন হোমিওপ্যাথি ওষুধ তৈরি হয়, তেমনই এটা একটা মারাত্মক বিষ। শরীরে যাওয়ার পর কয়েক সেকেন্ডের পর থেকেই কাজ শুরু করে। যে কাজ আজ থেকে তেইশ বছর আগে করেছিলেন সেটাকে তিনি ধামাচাপা দিয়েই রাখতে চান। কোন রকম আঁচ পেলেই তার ব্যবহার করতে হতে পারে। একটু আঁচ করেছিলেন সজলবাবুকে দেখে। তাই অ্যাকোনাইটের শিশিটা খালি করে দিয়েছিলেন সজলবাবুর জলের বোতলে। তারপর যেটা হবে সেটা তিনি জানতেন। খালি অভিনয়টা ঠিকঠাক করা দরকার।


তবে সুবলবাবু একটা জিনিস জানতেন না, সেটা বুঝলেন সব জিনিস ব্যাগে ভরার সময়। কালকের কেনা বাংলা ম্যাগাজিনে কভারের নিচে স্বযত্নে রাখা একটা সাদা কাগজ, আর তাতে পরিষ্কার হরফে হাতে লেখা,


প্রিয় সুবলবাবু,

জন্মতারিখ হিসাবে আমরা তো অ্যানাড্রোম! আজ থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগের ব্যবিলনের সভ্যতার সময়ে অ্যাস্ট্রোলজী’র শুরু হয় সেখানেই কি বলা আছে জানেন! দুজন ‘অ্যানাড্রোম’ মানুষের জন্ম এবং মৃত্যু তারিখ দুটোও অ্যানাড্রোম হয়! মানে আমাদের জন্ম তারিখ যেমন অ্যানাড্রোম আমাদের মৃত্যু তারিখও তো অ্যানাড্রোম হবে!

মানে টা, বুঝতে পারলেন না বোধহয়! আজ আমি মারা যাচ্ছি! আজ হলো তিরিশে জানুয়ারী ২১। মানে আমার মৃত্যু তারিখ হল ৩১/০১/২১। তাহলে আপনার মৃত্যু তারিখ হবে ১২/১০/১৩। এটা কিন্তু রসিকতা নয়, নম্বরশাস্ত্র। নিউমারোলজী!

আপনি বাঁচবেন ১২’ই অক্টোবর ১৩। এখন এই শতাব্দীতে তো আর তেরো সাল আসবে না! ২০১৩ তো চলে গেছে। মানে মৃত্যুর জন্য আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে পরের শতাব্দী পর্যন্ত। এখনো বিরানব্বই বছর আপনি বাঁচবেন! তার আগে চেষ্টা করেও মৃত্যু সম্ভব নয়! ১৩০ বছর পর্যন্ত বাঁচবেন আপনি!


আর একটা কথা! ‘অ্যাকোনাইট’এর কথাটা কিন্তু আমি জানি, পুলিশও জানতে পারবে! আপনার হাত ব্যাগে অ্যাকোনাইটের শিশিটা কি পেয়েছেন? পাবেনও না! সেটা কিন্তু পুলিশ পাবে। আপনি মিলিয়ে নেবেন! তারপর...



আপনার আরো দীর্ঘ বিরানব্বই বছরের জীবনের শুভ কামনা জানিয়ে,

আপনার জনৈক অ্যানাড্রোম বন্ধু!


নীড়বাসনা  বৈশাখ ১৪২৯