• অনন্যা ব্যানার্জি

গল্প - আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে







আমি মহাশ্বেতা। একা মেয়েকে নিয়ে কিছুদিন হল দিল্লীতে থাকতে এসেছি কাজের সূত্রে। এখানেই একটা করপোরেট অফিসে কাজ করি আমি। মেয়েকে ভর্তি করেছি বাড়ির কাছে একটি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে। আমি সিংগল মাদার। তাই ময়েকে নিয়ে এবারে দিল্লীতে স্থায়ীভাবে থাকার অভিপ্রায় আমার। সকাল থেকে অফিস ও বাড়ির নানা কাজের ব্যাস্ততা থাকায় তেমনভাবে এখানে কোন বন্ধুবান্ধব বা পরিচিতি হয়নি আমার এখনো। তার ওপরে আজকাল আবার করোনার সংক্রমণের ভয়ে সবাই আমরা বাড়িতে। অফিস স্কুল সবকিছু হচ্ছে অনলাইন।


পুণা থেকে দিল্লী আসার পর থেকেই লক্ষ্য করছিলাম, আমার ছোট পাঁচ বছরের মেয়ে, তিতলি বড় একা হয়ে পড়েছে। পুরনো বন্ধু ও পুরনো বাড়ির কথা হয়তো মনে পড়ছে কিন্তু প্রকাশ করতে পারছে না। আমি নিজের কাজে ব্যাস্ত থাকি ফলে ও কোনরকম সঙ্গী পাচ্ছে না খেলার। বাড়িতে বসে বসে ওর মধ্যেও যেন নেমে এসেছে অবসাদ। নিয়ম করে কিছু সময় ওর সঙ্গে কাটাবো ঠিক করলেও, কিছুদিনেই বুঝলাম অফিস, বাড়ি সব কাজ সামলে আমি ওকে সময় দিতে পারছি না‌।


এই সময়ে ওর বন্ধু হয়ে ওঠে আমাদেরই কাজের মেয়ে সুমনার ছোট মেয়ে, সরিতা। সুমনার স্বামী ওদের ছেড়ে চলে গেছে, তাই সুমনা আর সরিতাও থাকে একা। সারাদিন লোকের বাড়িতে কাজ করে সুমনা সরিতাকে দিতে চায় একটা সুন্দর জীবন। সরিতা মায়ের সঙ্গে আমাদের বাড়িতে আসে নিয়মিত। যতক্ষণ সুমনা সব কাজ করে, ততক্ষণ সরিতা তিতলির সঙ্গে খেলা করে। আমিও এই ব্যাবস্থায় বেশ খুশী, কারণ কিছুক্ষণ হলেও তিতলির মুখে হাসি ফোটে এই সময়ে‌। আর সুমনা গরীব হলেও মেয়েটাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখে খুব। এর মধ্যে লক্ষ্য করলাম, তিতলি সকালে উঠে স্নান খাওয়া তাড়াতাড়ি সেরে অপেক্ষা করে তার নতুন বন্ধুর জন্য। কখন দুজনে খেলা করবে। আর সরিতার মধ্যেও উৎসাহে কোন ঘাটতি নেই।


হঠাৎ একদিন সুমনা কাজে না আসায় বেশ একটু অসুবিধায় পড়ি আমি। তবে আমার থেকেও বেশী ব্যাকুল হয়ে পড়ে তিতলি। তার যেন কতদিনের বন্ধুর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়েছে হঠাৎ। স্নান, খাওয়া বন্ধ করে বসে থাকে তিতলি। ফোন করে জানতে পারি সুমনা অসুস্থ হয়ে পড়েছে আর তার ফলে তাকে চোদ্দ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলেছে ডাক্তার। আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে সুমনা।

"আমার মেয়েটা কি করবে বৌদি? কে ওকে দেখবে?" - সুমনার স্বরে যেন এক অসহায় মায়ের আর্তি।

"চিন্তা করো না, সুমনা‌। দেখছি কি করা যায়। তুমি সুস্থ হয়ে ওঠো তাড়াতাড়ি‌।" - বলে ফোনটা রেখে দিই।

"মুখে তো বললাম সুমনাকে চিন্তা না করতে, কিন্তু অতটুকু বাচ্চাকে দেখবে কে?" - এইসব ভাবছি তখন তিতলি এসে বসে আমার পাশে। আস্তে করে হাতটা আমার হাতের ওপরে রেখে ওইটুকু মেয়ে আমাকে বুঝিয়ে বলে -"মাম্মা, সুমনা মাসীর জ্বর হয়েছে? তাহলে সরিতাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসবো আমরা?তা না হলে ও একা কি করে থাকবে?"

তিতলির কথায় যেন মনের রুদ্ধ দ্বারগুলো এক এক করে খুলে যায় আমার। সত্যিই তো মানবতাবোধ যেন এতদিন থেকেও হেরে যাচ্ছিল স্বার্থপরতার কাছে। ভাবি যে করে হোক সুমনার মেয়েকে এই কয়েকদিন দেখে রাখার দায়িত্ব যে আমার ও। উঠে তৈরী হয়ে তিতলিকে নিয়ে গাড়ি বের করি। এখন গন্তব্য সুমনাদের বাড়ি। ওখানে পৌঁছে তিতলিকে গাড়িতে বসতে বলে আমি এগিয়ে যাই সুমনার বাড়ির দিকে। আমাকে দেখে ছোট্ট সরিতা দৌড়ে আসে পাশের এক বাড়ির বারান্দা থেকে। চোখটা লাল। দেখেই বোঝা যায় মায়ের থেকে দূরে থাকার জন্য মনটা বড় খারাপ বাচ্চাটার। ওকে একটা চকোলেট দিয়ে জিজ্ঞেস করি -"যাবি আমাদের সঙ্গে? তোর মা বলেছে কয়েকদিন তিতলির সঙ্গে থাকতে। খুব তাড়াতাড়ি মা ফিরে আসবে।"


তিতলির নাম শুনে যেন আর আনন্দ ধরে না ছোট বাচ্চাটার। যাদের বাড়িতে সুমনা ওকে রেখেছিল, তারাও যেন আমার কথায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। সরিতার হাত ধরে আমি হাঁটা লাগাই গাড়ির দিকে। সেখানে দুই বন্ধুর আনন্দ না দেখলে বিশ্বাস হবে না কারুর। দুজনের চোখে খেলে যাচ্ছে না বলা খুশী‌।


আমি গাড়িতে বসে ফোন করি সুমনাকে। সুমনার কান্নাও আর বাধা মানছে না। ওকে বুঝিয়ে বলি -"সুমনা, তুমি নিজের শরীরের যত্ন নাও, তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠো। কিছু দরকারে আমাকে ফোন করো। ততদিন আমার মেয়ের সঙ্গে সরিতাও থাকবে আমার বাড়িতে আমার মেয়ের মত। রোজ ফোনে কথা বলিয়ে দেবো তোমার সাথে।"

সুমনা হঠাৎ যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। বলে -"দিদি তোমার ঋণ এ জীবনে শোধ করতে পারবো না।"

বাড়ি পৌঁছে স্নান করিয়ে তিতলির জামা পরিয়ে দিলাম সরিতাকে। দুই বন্ধু আনন্দে খেলায় মেতে উঠল। খাওয়া, খেলা, ছবি আঁকা দিয়ে সারাদিন ভুলিয়ে রাখি সরিতাকে। কিন্তু রাতে শোয়ার সময় দেখি মেয়েটার চোখে জল। হয়তো মায়ের কথা মনে পড়ে ওর।


আজ দীপাবলির সন্ধ্যায় তিতলি ও সরিতাকে নিয়ে সারা বাড়ি সাজিয়ে তুললাম প্রদীপমালায়। স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি হল‌ বাড়িতে। কিন্তু আজ সরিতার চোখে জল। তেরোদিন হয়ে গেছে মাকে ছাড়া মেয়েটা আছে আমাদের বাড়িতে। আমার ও বুকের ভিতরে কেমন যেন চিনচিন করে উঠল মেয়েটার জন্য। সরিতা বলল -"আগের বছর মা আমার জন্য নিজের হাতে লাড্ডু বানিয়েছিল। আর তো একটা দিন, বলো। কাল মা এসে যাবে, ঠিক?"


আমার চোখটা জ্বালা করছে কেমন। দুঃখ লুকিয়ে, ছোট্ট সরিতার হাত ধরে আজ একটা আকাশ দীপ জ্বালিয়ে উড়িয়ে দিলাম আকাশে। সরিতাকে বললাম -"এই আলো খুব তাড়াতাড়ি ভগবানের কাছে পৌঁছে তোমার মাকে সুস্থ করার তোমার আর্তি পৌঁছে দেবে তাঁর কাছে।"


মেয়েটা কি বুঝলো জানি না। অবাক হয়ে হাত জোড় করে আকাশের পানে তাকিয়ে রইল ওই আকাশ দীপের দিকে, যতক্ষণ তা দেখা যায়। তিতলিও আজ হাত জুড়ে চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করল তার বন্ধুর মায়ের জন্য। দুঃখের মাঝেও ওই আলো জ্বালালো এক আশার দীপ। রাত পোহালেই মা মেয়ের মিলন পালা। রিপোর্ট নেগৈটিভ এসেছে আগেই খবর পেয়েছি সুমনার থেকে। আমার ও আজ রাতে হয়তো ঘুমটা হবে একটু শান্তিতে, সরিতার আনন্দের কথা ভেবে।





নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮