• রঞ্জন কুমার সেন

গল্প - আহ্বান





এই তো গত ১৫ ই মার্চ, সোমবারের কথা। সন্ধ্যে বেলা খবর শুনবো বলে একটা প্রথম সারির বাংলা চ্যানেল সিলেক্ট করে বসেছি । এমন সময়ে তন্ময়দা এসে উপস্থিত। তন্ময়দা আমার থেকে বছর দুয়েক আগে রিটায়ার করেছেন ভারত সরকারের ডিফেন্স অ্যাকাউন্ট বিভাগ থেকে।

বললেন " সময়টা কাটছিলো না ভাই ,তার উপর তোমার বাড়ি অনেকদিন আসা হয় নি, তাই ভাবলাম গিয়ে একটু খবর নিয়ে আসি,তোমরা সব কেমন আছো ? ”

“ বেশ করেছেন দাদা, এত আমাদের সৌভাগ্য ”

আসুন বসুন ইত্যাদি বলে দাদা কে ড্রয়িং রুমে এনে বসালাম। আমার স্ত্রী ও শুনতে পেয়ে তন্ময় দা কে অভ্যর্থনা করলো। বাড়ীতে গরম সিঙ্গারা আনা ছিল ,তার সঙ্গে গরম চা খাইয়ে আপ্যায়ন করলো।

আগামী ২৭ শে মার্চ থেকে ২৯ শে এপ্রিল ,২০২১ এই দীর্ঘসময় জুড়ে ৮ দফায় পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন ।তাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তরজা ,আক্রমন,প্রতি আক্রমণ একেবারে তুঙ্গে।আর তার আঁচ পড়ছে প্রতিটি নিউজ চ্যানেল এ।যে চ্যানেল টি ধরা ছিল ,সেখানে রাজনৈতিক তর্ক রীতিমত ঝগড়াই পরিণত হল।তার সঙ্গে চীৎকার , কোনো পক্ষই তার প্রতিপক্ষকে বক্তব্য প্রকাশ করতে দিতে রাজি নন। একে অপরকে দাবিয়ে রাখতে চায় ।এক দলের দাবি –অপর দলের দাবী ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি করছে। আবার দ্বিতীয় পক্ষের দাবী - প্রথম পক্ষ ,বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীকে তোষণ করছে।পরিস্থিতি সঞ্চালকের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে গেল।


চুপ করে থাকতে না পেরে,তন্ময় দা বললেন, ” এইসব দেখে দেখে শুনে শুনে ঘেন্না ধরে গেছে ভাই,আমার তো আর নিউজ চ্যানেল দেখতে ইচ্ছাই করে না। শান্তিতে দেখা যায় এমন কোন চ্যানেল ধরো তো।“।

আমি সঙ্গে সঙ্গে দূরদর্শনের একটা চ্যানেল ধরলাম। এই চ্যানেল গুলো তে সংবাদ বরাবর শান্ত ভাবে পরিবেশন করা হয়।সেরকম টা দেখে মন অনেক শান্ত হল। কিছু পরে খবর পড়া শেষ হল। তারপর শুরু হল বিশিষ্ট জনদের আলোচনা , বিষয় –শ্রী রামকৃষ্ণদেবের বানী ‘যত মত তত পথ’ এর প্রাসঙ্গিকতা ও সর্ব ধর্ম সমন্বয়।


টপিক টা শুনে তন্ময় দা ,একটু নড়ে চড়ে বসলেন। বললেন “ আরে ভাই ,আজই তো ঠাকুরের জন্মতিথি। একদম খেয়াল করিনি। ছিঃ ছিঃছিঃ এই সন্ধ্যায় শ্রীরামপুরে ভক্তাশ্রমে গেলে বড় ভাল হতো গো ।আর কোন উপায় নেই । এতক্ষণে ওখানকার ভজন পাঠ সব শেষ হয়ে গেছে। ছিঃ ছিঃ ছিঃ। বললাম –“ তন্ময় দা এ লজ্জা একা আপনার নয়, আমারও ।“

সঙ্কুচিত হয়ে দুজনেই আলোচনা টা শুনলাম ।বক্তারা অল্প সময়ের মধ্যে একটা মনোজ্ঞ বিশ্লেষণ উপহার দিলেন।তন্ময়দা বললেন – “ এরপর আর অন্য কিছু ভাল লাগবে না। টিভি টা বরং বন্ধ করে দাও ।“ টিভি বন্ধ করে দিলাম।

কিছুক্ষণের নীরবতা ভেঙ্গে তন্ময় দা বললেন – “ একটু মন খুলে কথা বলা যাক ভাই। ঠাকুর ছিলেন ,মহামানব ,ক্ষণজন্মা পুরুষ স্বয়ং অবতার।উনি যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যত-মত- তত পথের সাধনা করছেন– সর্ব ধর্ম সমন্বয় এবং সহিষ্ণুতার শিক্ষা দিয়েছেন।ওনার ত্যাগী শিষ্য ও ভক্তরা বাদে সাধারণ মানুষের পর্যায়ে আর কেউ সেই দৃষ্টিভঙ্গির কনামাত্র আয়ত্ত করতে পেরেছেন ? আমি তো এরকম দৃষ্টান্তের কথা একটুও শুনিনি, পড়িওনি। তুমি কি কখনও পড়েছ ?


এরকম অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে আমি কিন্তু মোটেই বিচলিত হলাম না। আমি নীরবে স্থির দৃষ্টিতে তন্ময়দার মুখের দিকে খানিক্ষন তাকিয়ে রইলাম। আমার মুখের অস্ফুট হাসি এবং প্রশান্তি দেখে উনি অবাক হয়ে গেলেন। বললেন – “ তবে কি তুমি কোন সাকসেস স্টোরির কথা জানো ?” হাত জোড় করে বললাম –“ হ্যাঁ দাদা , জানি “।

“ জানো ; তুমি সেকথা জানো শুনেই মনটা নেচে উঠেছে। আহা, ঠাকুরের কি কৃপা ; উনিই তবে আজ আমাকে তোমার কাছে পাঠিয়েছেন ।তাহলে দেরি না করে বলে ফেলো ,শুনে প্রাণটা জুড়বে “।

বললাম – “একটু যে সময় লাগবে ? এখানে আসার কথা বৌদিকে বলে এসেছেন তো ?”বললেন – “ অবশ্যই ; তুমি শুরু কর।“

শুরু করলাম –“তবে আপনাকে একটা চুরি করে শোনা গল্প শোনাই । জি-টি রোডের মোড় থেকে আমাদের পাড়ায় ঢোকার মুখে ‘ নিমন্ত্রন ’ নামে একটা বাড়ি আছে। ওনারা প্রকৃতই ভক্ত। নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব কাকে বলে,সেটা ওনাদের দেখলেই ঠাহর হয় ।প্রতিদিন সকাল সাড়ে পাঁচটায় একতলার উঠোন –সংলগ্ন প্রশস্ত ঘরে ওনারা নাম গানের আসর বসান। স্থানীয় ভক্তদের জন্য সেই আসরে অবারিত দ্বার ।এ পাড়ায় আসার পর থেকে ওই বাড়ীর মানুষ গুলোর সঙ্গে সহজেই আমাদের হৃদ্যতা জমে গেল। “ নিমন্ত্রন “ এর দেবতুল্য ,কত্তা মশাই একটি বিদেশী ব্যাঙ্কের অবসর প্রাপ্ত কর্মী ছিলেন। ওনাকে আমরা মেসোমশাই বলতাম। সেই মেসোমশাই –মাসীমা তাঁদের দুই প্রতিষ্ঠিত ছেলে ,ছেলের বউ এবং নাতি – নাতনিদের নিয়ে ভরা ভর্তি সংসার ,সে বাড়ীর সর্বত্র লক্ষ্মীশ্রী স্পষ্ট ।প্রত্যেক বছরই পৌষ মাসে একটা ছুটির দিন দেখে ওনারা বাড়ীতে ভাগবত পাঠের আয়োজন করতেন আর সেই উপলক্ষ্যে ঘনিষ্ঠ আত্মীয় স্বজন বন্ধু –বান্ধব ও পাড়া –প্রতিবেশীদের নেমন্তন্ন করে পরিতৃপ্তি সহকারে খাওয়াতেন । আমার সৌভাগ্য হয়েছিলো কয়েকবার সে রকম নেমন্তন্ন পাওয়ার।


এরকম এক ভাগবৎ -পাঠের অনুষ্ঠানে সকাল দশটার সময় নিমন্ত্রন-এ উপস্থিত হয়ে দেখি গোটা বাড়ী অতিথি – অভ্যাগত গমগম করছে । সে কি আন্তরিক অভ্যর্থনা ; সারাজীবন মনে রাখব।দাদারা দুহাত বাড়িয়ে টেনে নিয়ে বাড়ীর ভিতরের সিঁড়ির কাছে নিয়ে গিয়ে বললেন – দোতলার ছাদে ভাগবৎ পাঠ হচ্ছে বসে পড়ুন। সাল টা ছিল ইংরাজি বছরের ১৯৯৬।প্রকাণ্ড ছাদ জুড়ে প্যান্ডেল বাঁধা হয়েছে।চতুর্দিকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এবং রাধা গোবিন্দের ছবিগুলো ফুলের মালায় সুসজ্জিত। একপাশে গালিচা ঢাকা একটা বড়চৌকির উপর ভাগবৎ পাঠক আসন গ্রহণ করেছেন।পাশে একটা টবে সুসজ্জিত তুলসীগাছ নিয়ে একটা জলচৌকির উপর “শ্রীমদ্ভাগবত ” গ্রন্থ রেখে তিনি পাঠ করেছেন।মাঝে মাঝে ব্যাখাও করছেন।পরিবেশ ধূপের সুগন্ধে ভরপুর। জানুয়ারি মাসের ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা দুপুরে সেই মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানের মুগ্ধতায় দেহ-মন-প্রান ভরে উঠেছিলো । নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হচ্ছিলো । এভাবে চলতে চলতে দুপুর একটার সময় ভাগবত পাঠ শেষ হল।


তারপর দাদারা ছাদে উঠে এসে সকলের উদ্দেশ্যে করজোড়ে জানালেন যে একতলায় পঙক্তি ভোজনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, অতিথিরা যেন এক এক ব্যাচে গিয়ে সেবা গ্রহণ করেন। সেই মত বেশ কিছু ভক্ত নিচে নেমে গেলেন। আমার সামনা সামনি সাত আট জন বয়স্ক ভদ্রলোক বসে ছিলেন।তাদের কথা বার্তার থেকে বুঝলাম যে ওনারা মেসোমশাই এর গুরুভাই। ওনারা নিজেদের মধ্যে মেসোমশাই ও মাসিমার সম্বন্ধে উচ্চ প্রশংসা সূচক কথা বলছিলেন।যাঁদের এত স্নেহ আশীর্বাদ পেয়েছি তাঁদের প্রশংসা শুনলে আনন্দ তো হবেই।আমি আবিষ্টের মত ওনাদের পিছনে বসে রইলাম।

এবার ওনারা ওনাদের গুরুদেব এর সম্বন্ধে আলোচনা শুরু করলেন। আমি উৎকর্ণ হয়ে আলোচনা শুনতে থাকলাম ।একজন বললেন যে ওনাদের গুরুদেব কাউকে দীক্ষামন্ত্র দেওয়ার আগে তার এক মুসলমান বন্ধুর গল্প ওনাদের বলতেন –“ঐ বন্ধুটিই আমার জীবনের প্রথম গুরু। তোমাকে দীক্ষা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি তো তোমার দায়িত্ব নেবই এবং তোমার কল্যানের জন্য জপ ধ্যান করব।কিন্তু প্রথম নির্দেশ মত তোমাকেও নিয়মিত কিছু করতে হবে।আর একজন গুরুভাই বললেন – ‘গল্প টা আর একবার শোনাও না,তুমি বেশ ভাল বলো।


অতএব প্রথমোক্ত গুরুভাই বলতে শুরু করলেন – তখন ১৯৩৬সাল হবে।দেশ তখনও স্বাধীন হয়নি। আমাদের গুরুদেব তখন দশ কি এগারো বছরের বালক , নিতান্ত ছেলেমানুষ ।( নামটি ধরা যাক রাম ) গ্রামের ইস্কুলে পড়ে। রামের সহপাঠী ও খেলার সাথীদের মধ্যে তিনজন মুসলমান বালক ও ছিল।এদের একজন ছিল বেশ শান্ত প্রকৃতির ।(নামটি ধরা যাক রহিম) এই ছেলেগুলো সকলেই মিলেমিশে প্রত্যেকদিন বিকেল্ বেলা গ্রামের মাঠে খেলাধুলো করতো ।হৈ হুল্লোড় করত।কিন্তু রহিম একটা অন্য ভিন্ন রুটিন মেন টেন করতো।প্রত্যেক দিন সূর্যাস্তের কিছু আগে ও খেলা ছেড়ে একটা গাছতলায় এসে দাঁড়াত ।পরনের পাঞ্জাবীর পকেট থেকে একটা ছোট গামছা বার করে তাই দিয়ে ঝেড়ে গাছতলাটা পরিষ্কার করে নিতো ।তারপর বার করতো একটা ছোট চাদর ।গাছতলায় সে টা পেতে পশ্চিমদিকে মুখ করে বসে নামাজ পড়া শুরু করতো।নামাজ পড়ার সময় যেমন টা হয় রহিম ও বিভিন্ন ভঙ্গীতে কখনও মাটিতে বসতো কখনও উঠে দাঁড়াত ।ওর খেলার সাথীদের প্রায় সকলেই হিন্দুঘরের ছেলে ।তাঁদের কাছে রহিমের এই বিভিন্ন ভঙ্গীতে ওঠা বসা নামাজ পড়া একটা ভীষণ কৌতুকের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। রহিম যখনই গাছতলায় এসে নামাজ পড়া শুরু করতো ,তখনই ঐ ছেলেগুলো খেলা ছেড়ে এসে রহিমকে দেখিয়ে হাসাহাসি করতো আর মিমিক্রি অর্থাৎ ভাঁড়ামো করত।এই ছেলেগুলোর দলে রাম ও ছিল।সে ও রহিম কে উত্যক্ত করার চেষ্টা করত।কিন্তু রহিমকে একদিনের জন্যও কেউ টলাতে পারতোনা ।ও নিষ্ঠার সঙ্গে নামাজ পড়া শেষ করে ধীর গম্ভীর পদক্ষেপে বাড়ি ফিরে যেত ।খেপে গিয়ে বিরক্ত হয়ে কাউকে গালমন্দ করা বা বাড়ি থেকে বড়দের ডেকে এনে তাঁদের শাসানো –এসব তো দুরস্থান।আসলে ঐ ছেলেমানুষ বয়সেই রহিমকে ঈশ্বর এমন এক গাম্ভীর্য ও ব্যাক্তিত্ব দিয়েছিলেন যে ঐসব ভাঁড়ামি তার একাগ্রতায় চিঁর ধরাতে পারতো না।এইভাবেই চলছিলো দিনের পর দিন।

একদিন ঘটনা গুলো একটু অন্য খাতে বইলো । সেদিন বিকেলবেলা খেলার মাঠে রাম আর রহিম ছাড়া কেউ খেলতে এলোনা ।সেদিন ও খেলার পর রহিম গাছ তলায় নামাজ পড়া শুরু করল। এদিকে রোজকার অভ্যাস মত রাম শুরু করলো ভাঁড়ামি , চেষ্টা করলো রহিমকে বিচলিত করতে। যথারীতি ব্যার্থ হল।সঙ্গী সাথী কেউ ছিলনা।তাই হতোদ্যম হয়ে বসে পড়লো ।চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলো ,কীরকম ধীর স্থির ভাবে রহিম নামাজ পড়ে। যথাসময়ে নামাজ পড়া শেষ হল। মাটিতে পাতা চাদর টা তুলে তাকে ঝেড়ে পরিষ্কার করে পকেটে পুরল।এরপর ধীর পায়ে এগিয়ে এসে শান্ত স্বরে রামকে বলল –“ আমি তো কিছু করছি,তুই ও কিছু কর না “।বন্ধুর মুখ থেকে এমন একটা কথা শুনে রাম প্রথমে হতচকিত হয়ে গেল। খানিক পরে রাম উঠে দাঁড়ালো। এদিকে রহিম তার বাড়ীর পথে পা বাড়িয়েছে দেখে –“রাম এগিয়ে এসে বললো –“ ভাই ,রাগ করিস না,আমি তোকে কথা দিচ্ছি , আর কোনোদিন বিরক্ত করবো না।“ মৃদু হেসে রহিম বাড়ি চলে গেল।

এদিকে সূর্য অস্ত গেছে, আলো কমে গেছে দেখে রাম ও তার বাড়ীর পথে পা বাড়াল ।কিন্তু তার পা দুটো আজ একটু বেতালে পড়ছে। মনের মধ্যে কিছু কথা তোলপাড় করছে -“আমি তো কিছু করছি, তুই ও কিছু করনা ”। আচ্ছা এর মানে কি ? ও আমায় কি করতে বললো ? এই এক প্রশ্ন রামকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াতে লাগলো দিনের পর দিন।অথচ মন খুলে এই প্রশ্নের উত্তর কার ও কাছে চাইতে ও পারলো না। কোথা থেকে এক রাশ লজ্জা এসে যেন চেপে ধরে।এভাবে কিছুদিন চলার পর রামের মনের অস্থিরতা ধীরে ধীরে কমে এলো ,পড়াশুনায় মনোযোগ বাড়তে লাগলো।চেষ্টা শুরু করলো ,পড়াশুনার মধ্যে দিয়ে যদি ঐ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়।


এদিকে ব্রাহ্মণ বৈষ্ণব ঘরের ছেলে ,উপনয়নের সময় হয়ে গেছে।উপনয়ন দেওয়া হল। শুরু হল নিয়মিত সন্ধ্যা আহ্নিক করা । ক্রমে মন আরও অন্তর্মুখী হল। বাল্যকালের চপলতা সরে গিয়ে যত বুদ্ধির উন্মেষ হতে থাকলো ,রামের কাছে তত স্পষ্ট হতে থাকলো তার বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া উপদেশের গভীর অর্থ এইভাবে দিনে দিনে সে স্কুলের গণ্ডী পার হল।কলেজ জীবনে ফিলজফি নিয়ে পড়াশুনা করলো এবং সসম্মানে উত্তীর্ণ হল।কিন্তু সমান্তরাল ভাবে জপ,ধ্যান, ঈশ্বর উপলব্ধির চেষ্টা চলতে থাক্ল,তত সে উপলব্ধি করলো –কি অপরিসীম উদার প্রেম ভাব এবং সহিষ্ণুতা নিয়ে মুসলমান বন্ধুটি জীবনের সঠিক পথটি তাকে চিনিয়ে দিয়েছিলো।


তাই সেই পথ প্রদর্শককে জীবনের প্রথম গুরু রুপে আনন্দে স্বীকার করতে কোন দ্বিধা রইলো না।ক্রমে ঈশ্বর কৃপায় রামের সদ্গুরু লাভ হল ও বৈষ্ণব মতে দীক্ষা লাভ হল।শ্রদ্ধা ভক্তি তো ছিলই ,এবার তিনি সাধক হলেন। ঈশ্বর প্রেমের শতদল বিকশিত হল এবং সৌরভও ছড়ালো।

এ পর্যন্ত বলে আমি থামলাম । হঠাৎ তন্ময়দার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি চোখ দুটি অশ্রুতে ভরে গেছে। আমি চুপ করে রইলাম।


খানিক পরে চোখ মুছে ধাতস্থ হয়ে তন্ময় দা বললেন, আমাদের সংবিধান অনুযায়ী আমাদের রাষ্ট্র ব্যাবস্থা সেকুলার অর্থাৎ ধর্ম নিরপেক্ষ । Not concerned with religion ,পলিটিকাল সায়েন্স এর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে একথা আমি মানি। কিন্তু ধর্ম অর্থাৎ ঈশ্বরের প্রতি অনুরাগের যে চর্চা ,সেটা কিন্তু আমাদের মাতৃভূমি র প্রানের সম্পদ ।তাকে বাদ দিয়ে ভারতের কথা ভাবা যায় না। কিছুদিন আগে রবীন্দ্রনাথের “তপোবন “ প্রবন্ধ টি পরছিলাম। সেখানে তিনি বলেছেন – “ ভারতবর্ষ যে সাধনাকে গ্রহণ করেছে ,সে হচ্ছে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সাথে চিত্তের যোগ। আত্মার যোগ অর্থাৎ সম্পূর্ণ যোগ ,কেবল জ্ঞ্যানের যোগ নয়, বোধের যোগ “।

“ভারত বর্ষ যদি খাঁটি ভারতবর্ষ হয়ে না ওঠে তবে পরের বাজারে মজুরিগিরি করা ছাড়া পৃথিবীতে তার আর কোন প্রয়োজনই থাকবে না।“

নীড়বাসনা  বৈশাখ ১৪২৯