• সুস্মিতা

গল্প - ওয়ালেট এবং ম্যাজিক





সাংঘাতিক বই পড়ার নেশা সৌরভের। সেই কোন ছেলেবেলায়, বয়স তখন দশ এগারো হবে শুরু হয়েছিল গল্পের বই পড়া। তারপরে বোধহয় ক্লাস সিক্স সেভেন থেকে শুরু পুজোসংখ্যার উপন্যাসের নেশা। এখনও তার বিরাম নেই।


লেখাপড়া, খেলাধুলা, ড্রয়িং ক্লাস, ক্যারাটে ক্লাস এবং টিউশন ক্লাস সামলেও মাত্র তিনচারদিনের মধ্যেই একটা করে মোটা উপন্যাস শেষ করে ফেলত সৌরভ।


সত্যজিৎ রায় হলেন ওর "অল টাইম ফেভারিট" লেখক। এখন তো আর ওঁর নতুন লেখা পাওয়ার উপায় নেই, তাই মাঝেমাঝেই প্রিয় লেখকের পুরোনো বইগুলোই নাড়াচাড়া করে সৌরভ।


শৈশব কৈশোরের কিছু গল্প অনেক মানুষেরই মন ও মস্তিষ্কের মধ্যে একেবারে গেঁথে বসে যায়। সারাজীবনেও সেগুলো ভোলা যায়না।


সত্যজিৎ রায়ের "বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলেনা" সিরিজের কিছু গল্প ঠিক সেইরকমভাবে সৌরভের মনের ভেতরে একেবারে পাকাপোক্ত জায়গা করে নিয়েছে। গল্পগুলো এক মিনিটের জন্যও ওকে ছেড়ে যায়না। গল্পগুলো পড়ার পর থেকেই সৌরভের স্বভাবে একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে। 


মনের অবচেতন কোণে সৌরভ সবসময় যেন কি একটা আশ্চর্য ঘটনার অপেক্ষায় থাকে- "এই বুঝি ওর জীবনে কিছু একটা ম্যাজিক ঘটবে...হয়ত অলৌকিক কোনো ঘটনা... বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলেনা।"


কৈশোরের দিনগুলো থেকেই এইরকম একটা ভাবনা সবসময়ই সৌরভের মনের মধ্যে ঘুরপাক খেত। সেই যখন স্কুলবাসে চেপে স্কুলে যেত, তখন থেকে শুরু করে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার সময় এমনকি বর্তমানে চাকরি জীবনের চার বছর কেটে যাওয়ার পরও সৌরভের মনে কুলকুল করে বয়ে চলে একটা আশা একটা অপেক্ষা- "এই বুঝি ম্যাজিকের মতো একটা কিছু ঘটবে, ঠিক ঘটবে আজই...নিশ্চয় ঘটবে।"


সৌরভের দিন শুরু হয় এই অপেক্ষায়...রাতে স্বপ্নের ঘোরেও...



                               *




সৌরভ মানুষটা একটু ঘরকুনো। স্বভাবে একাচোরা ধরণের। অচেনা পরিবেশ, অচেনা মানুষজনের সঙ্গে খুব সহজে মানিয়ে জমিয়ে নেওয়া ওর স্বভাব নয়। নতুন লোকজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতেও ওর অনেকটা বেশি সময় লাগে।

বরং সৌরভ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে বাড়ির মধ্যে নিজের ঘরের কোণটিতে। বাবা মা এবং ছোট ভাইবোনদুটির সান্নিধ্যেই ও সাবলীল।

একেবারে ছোটবেলার নার্সারি ক্লাসের বন্ধুরাই এখনও ওর বন্ধু। কলেজ জীবনেও খুব বেশি গভীর বন্ধুত্ব সৌরভের কারুর সঙ্গে হয়নি। কলকাতা শহরে ওর যাতায়াতের পরিধি সল্টলেকের সেক্টর ফাইভের অফিস, ছুটির দিনে নন্দন, রবীন্দ্রসদন আর বড়জোর খুব ঘনিষ্ঠ দুএকজন আত্মীয়স্বজনের বাড়ি।


তা এ হেন বর্ণহীন নিস্তরঙ্গ জীবনে ম্যাজিকটা ঘটবে কোথা থেকে? কিন্তু নিজের মনের ওপরে তো মানুষের নিজেরও প্রায়শই  নিয়ন্ত্রণ থাকেনা, তাই চেতনে অবচেতনে সৌরভ অলৌকিক একটা ঘটনার অপেক্ষা করতেই থাকে।


একটি সফটওয়্যার কোম্পানির সল্টলেকের অফিসে সৌরভ আজ প্রায় চার বছর হল কাজ করছে। কলেজের ক্যাম্পাস ইন্টারভিউ থেকেই চাকরিটা পেয়ে গিয়েছিল। কলকাতায় পোস্টিং, মাইনেও মন্দ নয়। অন্তত সৌরভ তো বেশ সন্তুষ্ট।


    ওর ব্যাচের অন্যান্য অনেক সহপাঠীই অবশ্য ইতিমধ্যে দুচারবার চাকরি পাল্টে অনেক বেশি মাইনেতে কলকাতার বাইরে অথবা বিদেশে চলে গিয়েছে। "অনসাইটের" সুযোগ পেয়ে বিদেশে গিয়েও বসবাস করছে সৌরভের বেশ কয়েকজন বন্ধু।


   কিন্তু সৌরভের সেরকম কোনো ইচ্ছে কখনই হয়না। কলকাতা শহর ছেড়ে বাইরে যাবেনা বলেই ও নিজেই অনেকবার প্রমোশন, ট্রান্সফার এবং বিদেশে যাওয়ার প্রস্তাব এড়িয়ে গিয়েছে। 


বন্ধুরা আড়ালে ওকে "ভেতো বাঙালি" বলে হাসাহাসিও করে। যদিও সৌরভের মতো  এরকম চরিত্র নতুন নয়। "ভেতো বাঙালি" নামটা তো আর এমনি এমনি হয়নি।


 চেনা পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে অচেনা জায়গা, অপরিচিত মানুষজনের মধ্যে সৌরভ সহজ হতে পারেনা। ওর সত্যিসত্যি একটু ভয় করে।


কিন্তু শেষরক্ষা আর হলনা।



                                 *



  অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়েছে। আই. টি.সেক্টরের ঊর্ধ্বমুখী রমরমাতে ভাঁটার টান। নিজের ইচ্ছেয় বদলি ঠেকিয়ে রাখার মতো সুদিন আর নেই। বহু ছেলেমেয়েদের হাতে প্রজেক্ট নেই, কর্মজগতের ভাষায় "বেঞ্চে বসে" আছে তারা। কারুরই চাকরি নিরাপদ নয়। কলেজ থেকে পাশ করে বেরিয়েই সকলে চাকরিও পাচ্ছেনা।


এরকম একটা অবস্থায় কোম্পানি সৌরভের হাতে ধরিয়ে দিল -"দিল্লিতে বদলির চিঠি"...


  একেবারে ছেলেমানুষের মতো মনখারাপ হয়ে গেল সৌরভের। সব জায়গা ছেড়ে শেষপর্যন্ত সেই দিল্লি? কে জানে কেন ছোটবেলা থেকেই দিল্লি নামটা শুনলেই মনে হয় যেন ভারতবর্ষের যত ঠগ জোচ্চর আর চোর ডাকাতরা ঘাপটি মেরে বসে আছে ওই শহরে। বাইরের লোক সেখানে পৌঁছলেই তাদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে সকলে। অনেক বাঙালিই এরকম ভাবেন। দিল্লি শহরের নাম শুনেই তাদের ভয় করে, বুক কাঁপে। ইংরেজি ভাষায় এটাকেই বলে "প্রি কনসিভড্ নোশন।" 


কিন্তু এখন আর এসব ভেবে কোনো লাভ নেই। বর্তমানে বাড়িতে একমাত্র রোজগেরে পুরুষ সৌরভ। বাবা দুবছর হল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের চাকরি থেকে রিটায়ার করেছেন। ছোট ভাইবোনদুটো এখনও কলেজে, ওদের পড়াশোনা শেষ হয়নি। সুতরাং মন্দার বাজারে ট্রান্সফার না নিয়ে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার মতো বিলাসিতাও মধ্যবিত্ত পরিবারে সম্ভব নয়।


অতএব ব্যাজার মুখে ব্যাগবাক্স গোছাতে শুরু করল সৌরভ। 


অল্পবয়সী ব্যাচেলর ছেলে। ওর আর কতই বা জিনিস নিতে হবে। রান্নাবান্নার ঝামেলায় সৌরভ যাবেনা, সেটা ঠিক করে নিয়েছে। বাইরেই খাওয়াদাওয়া সারবে। খাটবিছানার ব্যবস্থা দিল্লিতেই করা যাবে। কাজেই জামাকাপড়, শীতের পোশাক আর নিজের কিছু প্রিয় বই ও প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে নিতে অসুবিধা বিশেষ হলনা।


   শুধু এই সবকিছুর সঙ্গে সৌরভ বড় যত্নসহকারে ব্যাগের কোণে গুছিয়ে নিল ভারি অদ্ভুত একটা জিনিস...



                                *



           বছর তিনেক আগের কথা। ছোটবেলার বন্ধু প্রিয়াংশু অফিসের কাজে গিয়েছিল ইউরোপ। খানিকটা চেষ্টাচরিত্র করে এবং অনেকটাই ভাগ্যের জোরে চাকরি জীবনের শুরু থেকেই বেশ কয়েকবার বিদেশ ভ্রমণ করল প্রিয়াংশু। ও ভালোও বাসে খুব দেশবিদেশ ঘুরে বেড়াতে। সেবারে ইউরোপ গিয়ে ভেনিস, জার্মানি, ইতালি, রোমসহ বহু জায়গায় ঘুরে এসেছে সে।


   প্রতিবারই বিদেশ থেকে ফিরে এসে সৌরভ আর অনীকের সঙ্গে আড্ডায় বসে প্রিয়াংশু। বন্ধুদের সঙ্গে বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে ভালো তো লাগবেই, সঙ্গে একটু গর্বের সুরও মেশানো থাকে সেই গল্পে। সৌরভের  অবশ্য মন্দ লাগেনা। অনীকটা যদিও মাঝেমধ্যেই একটু তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দিতে চায় প্রিয়াংশুর গল্প। কে জানে হয়ত সেখানে কাজ করে প্রচ্ছন্ন ঈর্ষা...


  সৌরভ কিন্তু দারুণ উপভোগ করে। অন্যের চোখ দিয়ে পৃথিবীটা দেখতে দেখতে ওর মনে হয় ঠিক যেন গল্পের বই পড়ছে, ঠিক যেন কোনো ভ্রমণ কাহিনী।


যাইহোক সেবার রোমের ভ্যাটিকান সিটির একটি গল্প বলতে বলতে চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল প্রিয়াংশুর..."নিজের চোখে পোপকে দেখে এসেছে সে।" পোপ জনসাধারণকে দর্শন দেন বছরে মাত্র বিশেষ একটি দিন। বিরাট সৌভাগ্যের অধিকারীরাই এই বিরল দর্শনের সুযোগ পায়। প্রিয়াংশু যে শুধু সেই সুযোগ পেয়েছে তাই নয়, পোপ নিজের হাতে তাকে উপহার দিয়েছেন তার নিজের মুর্তিখচিত তিনটি মুদ্রা।


পৃথিবীর প্রায় সব দেশের মতো রোম ইটালিতেও ধার্মিক মানুষদের মধ্যে একটা গল্প প্রচলিত আছে যে- "পোপের হাত থেকে পাওয়া ওই তিনটি মুদ্রা নাকি ম্যাজিক তৈরি করতে পারে মানুষের জীবনে।" সত্যিই নাকি মুদ্রা তিনটে অলৌকিক ঘটনা ঘটায়...যেন অনেকটা আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপের মতো...


প্রিয়াংশু নিজে অবশ্য সেসব গল্পে বিশ্বাস টিশ্বাস করেনা।  তাই একটা মুদ্রা নিজের কাছে রেখে বাকি দুটো ও উপহার দিয়ে দিলো সৌরভ এবং অনীককে। 


অনীক সেটা হাতে নিল ঠিকই, কিন্তু কিছুটা ইচ্ছে করেই তাচ্ছিল্যের ভাব দেখিয়ে মুদ্রাটিকে আলাদা কোনো গুরুত্ব না দিয়ে বাকি খুচরো পয়সার সঙ্গে পকেটে ঢুকিয়ে রাখল।


অন্যদিকে মুদ্রাটা হাতে নেওয়া মাত্র সৌরভের শরীরে যেন বিদ্যুতের তরঙ্গ খেলে গেল। এই ধরণের গল্প ওকে বড্ড টানে। এই গল্পগুলোর রহস্যময়তাই ওর জীবনের প্রধান আকর্ষণ। মনে মনে দারুণ লোভ হল সৌরভের, ও ভাবলো-"ইশ প্রিয়াংশু যদি তিনটে মুদ্রাই ওকে দিয়ে দিত...একেবারে তিনটেই...কে জানে হয়ত এই মুদ্রাগুলোই ঘটাতে পারত কোনো অলৌকিক ব্যাপার ওর জীবনে।" যাইহোক প্রিয়াংশুর দেওয়া একটা কয়েনই খুব  আগ্রহ সহকারে গ্রহণ করল সৌরভ।


দিল্লি যাওয়ার সময় পোপের সেই মুদ্রাটিকে যত্ন করে সঙ্গে নিয়ে নিলো সৌরভ। 


দিল্লি পৌঁছে সবসময় ওটাকে ওয়ালেটের মধ্যে রাখবে ও...



                            *



 প্রায় তিনমাস কেটে গিয়েছে সৌরভ দিল্লিতে এসেছে।


 ওর মনখারাপ একটুও কমেনি। প্রত্যেকটা মুহূর্ত কলকাতাকে মিস্ করে ও। সারাক্ষণ হিন্দি আর ইংরেজিতে কথা বলতে একটুও ভালো লাগেনা। অফিসের কলিগরা এখনও কলিগই। কেউ বন্ধু হয়ে ওঠেনি। একাকীত্বের জ্বালায় রাস্তার কুকুর বাচ্চাগুলোকে আদর করতে গিয়েও থেমে যায় সৌরভ, মনে মনে ভাবে- "কি ভাষায় আদর করবে ওদের? ওরা বাংলায় আদর বুঝবে তো? নাকি হিন্দিতে আদর করতে হবে?"


  আসলে এতটা এরকম হওয়ারও কথা নয়। কিন্তু কলকাতাপ্রেমী সৌরভ যেন মনেমনে প্রতিজ্ঞা করে বসে আছে "কিছুতেই নতুন কোনো শহর, নতুন কোনো জায়গাকে ভালোবাসবে না ও...কিছুতেই না। যেন তাহলেই প্রেমিকা কলকাতার সঙ্গে দ্বিচারিতা করা হয়ে যাবে।"


এইভাবেই গোমড়ামুখে দিনগুলো কাটছিল কিংবা কাটছিল সৌরভের...



ঘটনাটা তারমধ্যেই ঘটল।




                               *



 সেটা ছিল দিল্লি শহরের এক হিমেল শীতের রাত। তারিখ ছাব্বিশ ডিসেম্বর। 

রাত সোয়া ন'টা নাগাদ অফিসের বাস থেকে নেমে প্রায় মিনিট পাঁচেক হেঁটে ভাড়া করা এক কামরার ফ্ল্যাটবাড়িতে ঢুকল সৌরভ। দরজার পাশেই রাখা থাকে ডাব্বাওয়ালার টিফিন কেরিয়ার। সন্ধে আটটার মধ্যেই খাবারটা দিয়ে যায়। হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসে প্রতিদিনই ঠান্ডা ভাতরুটি আর উত্তর ভারতীয় স্বাদের তরকারি দেখে মেজাজটা খিঁচড়ে যায় সৌরভের। মনে পড়ে যায়  কলকাতার বাড়িতে মায়ের বেড়ে দেওয়া গরম ভাত আর মাছের ঝোলের কথা। কান্না পেয়ে যায় সৌরভের।


 যাইহোক সেদিনও ব্যাজার মুখে খাওয়া সেরে নিয়মমাফিক রুটিন কাজকর্ম সেরে রাত প্রায় সাড়ে দশটা নাগাদ বিছানায় শুতে যায় সৌরভ। হিজিবিজি চিন্তায় কেটে যায় বেশ খানিকটা সময়।রোজই এমন হয়।।     


সাড়ে এগারোটা নাগাদ ঘুমটা যখন সবেমাত্র আসছে...হঠাৎ সৌরভের সেলফোনটা বেজে উঠল...


 চমকে উঠল সৌরভ...এত রাতে কার ফোন? অসময়ের ফোনকলে প্রথমেই মনে এসে যায় নানারকম আশঙ্কার কথা..."কলকাতায় মা বাবা ভালো আছেন তো?"


"হ্যালো" বলতেই ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে একটি অপরিচিত কন্ঠস্বর...


তিনি সৌরভের নাম জানেন, এমন কি ঠিকানাটিও।


নাম ঠিকানা মিলিয়ে নেওয়ার পরে তিনি আচমকা জানতে চান- "সৌরভ তার তিনটি ব্যাঙ্কের ক্রেডিট কার্ড হারিয়ে ফেলেছে কিনা?" প্রশ্নের আকস্মিকতায় সৌরভের মাথাটা একেবারে গুলিয়ে যায়। একেবারে হতভম্ব হয়ে যায়...


তারপরে একটু ধাতস্থ হয়ে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে ফোনটা কানে রেখেই সারা ঘর খুঁজে সৌরভ উপলব্ধি করে যে তার ওয়ালেটটি বাড়ির কোথাও নেই। আর ওই ওয়ালেটের মধ্যেই ছিল ওর তিনটে ক্রেডিট কার্ড।


ভয়ে, আতঙ্কে, দুশ্চিন্তায় মাথার চুল খাড়া হয়ে যায় সৌরভের। দিল্লির মতো শহরে এ কি সাংঘাতিক বিপত্তি।


অপরপ্রান্ত সৌরভের অবস্থাটা যেন বেশ কিছুটা বুঝতে পারেন। কোমল কণ্ঠস্বরে অভয় দেওয়ার মতো করে তিনি বলেন অবশ্যই হিন্দিতে- "বেটা, এত চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই।" 


অপরিচিত মানুষটি আরও জানান যে- তিনি ও তার এক সঙ্গী রাস্তার ধারে কুড়িয়ে পেয়েছেন তিনটি ক্রেডিট কার্ড এবং সেইসঙ্গে একটি পরিচয় পত্র। সেখান থেকে সৌরভের নাম ও ফোন নম্বর জেনেছেন।


তাদের মনে হয়েছে- যে মানুষটি এই অতি গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলি হারিয়ে ফেলেছেন, তিনি নিশ্চয় বড় দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকবেন, সুতরাং যত রাতই হোক এখুনি তাকে বিষয়টি জানানো দরকার। তাছাড়া আগামীকাল ভোরের ট্রেনেই ওরা অমৃত্সর চলে যাচ্ছেন, অতএব আজ রাতেই সৌরভকে তার হারিয়ে যাওয়া জিনিস সংগ্রহ করে নিতে হবে।


 একটি বিশেষ রাস্তার নাম করে সৌরভকে সেখানে পৌঁছে যেতে বললেন অপরিচিত কন্ঠস্বরটি। তিনি ও তার সঙ্গী ক্রেডিট কার্ড নিয়ে অপেক্ষা করছেন সেখানেই। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পৌঁছে গেলেই সৌরভ তার জিনিস ফেরত পেয়ে যাবে।


চিন্তার গতি সবথেকে দ্রুত। দুশ্চিন্তার গতি বোধহয় তার থেকেও বেশি। সৌরভের মস্তিষ্ক জুড়ে তখন ভয়, আশঙ্কা আর দুশ্চিন্তার ঘূর্ণিঝড়।

প্রথমেই মনে হল ক্রেডিট কার্ড কুড়িয়ে পেয়ে নিমেষের মধ্যে এ. টি. এম থেকে প্রচুর টাকা চুরি করার কায়দা এখন চোর ডাকাতের কাছে জলভাত।


 যদি বা ওই লোকদুটি এখনও সেটা না পেরে থাকে তবে সৌরভ পৌঁছনো মাত্র নিশ্চয় ওর মাথায় বন্দুকের নল ঠেকিয়ে ওকে দিয়েই সব টাকা বের করিয়ে নেবে দিল্লির ডাকাতরা।


  সৌরভের পাঁচ বছরের চাকরির  যাবতীয় সঞ্চয়ের সঙ্গে প্রাণটাও বেরিয়ে যাবে আজ রাতেই। বাবা মা ভাইবোনের মুখগুলো পলকে ভেসে উঠল চোখের সামনে।


কি করবে এখন সৌরভ? দিল্লির এই প্রচন্ড শীতের রাতে সঙ্গে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার মতো বন্ধুও কেউ নেই এই শহরে। কেনই বা কেউ নেবে জীবনের ঝুঁকি তার জন্য...


 ভাবতে ভাবতেই স্কুটারের চাবিটা হাতে তুলে নেয় সৌরভ। হেলমেটটা পরতে গিয়েও থেমে যায়- "আর কিছুক্ষণের মধ্যে মাথার খুলিটাই তো উড়ে যাবে, হেলমেটের আর কি প্রয়োজন..."


স্কুটার স্টার্ট দেয় সৌরভ। গন্তব্য খুব দূরে নয়...



                            *



 দূর থেকে এগিয়ে আসতে দেখা গেল মাথায় পাগড়ি বাঁধা দুজন সর্দারজীকে...


 একটু কাছে আসার পরে বোঝা গেল একজন সর্দার প্রৌঢ় এবং অপরজন নিতান্তই কিশোর। তাদের হাতে সৌরভের তিনটি ক্রেডিট কার্ড এবং পরিচয় পত্রটি ছাড়া আর কিছুই নেই। সৌরভ অবশ্য চোরা চোখে দেখার চেষ্টা করল বন্দুক অথবা ছুরি পাঞ্জাবি লোকদুটি কোথায় লুকিয়ে রেখেছে...


সৌরভের মুখচোখের অবস্থা দেখে বয়স্ক সর্দারজী তার পিঠে আলতো হাত রাখলেন। অত্যন্ত নম্র কণ্ঠে তার নিজের ভাষায় প্রায় ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গীতে বললেন- "আগামীকাল ভোরবেলাই অমৃত্সর যাওয়ার প্রয়োজন না থাকলে তিনি এই শীতের রাতে সৌরভকে কষ্ট দিতেন না। নিজে গিয়েই তার জিনিস পৌঁছে দিয়ে আসতেন।"


যাইহোক বাড়ি থেকে বেরিয়ে সর্দারজীদের কাছ থেকে হারিয়ে যাওয়া জিনিস নিয়ে আবার বাড়ি ফিরে আসা...। পুরো ঘটনাটা ঘটতে সময় লেগেছিল মোটামুটি সোয়া একঘন্টা মতো।


সৌরভ যেন একটা ঘোরের মধ্যে বাড়ি ফিরেছিল। ওর সবকিছু গুলিয়ে গিয়েছিল। ভীত, হতভম্ব সৌরভ সর্দারজীদের প্রতি একটা ধন্যবাদসূচক বাক্যও উচ্চারণ করে উঠতে পারেনি।


ওর মাথা ঘুরছিল..."এও তবে দিল্লি শহর, এরকম লোকজনও থাকেন দিল্লি পাঞ্জাবের মতো জায়গায়।" 


তবুও পুরোপুরি বিশ্বাস হচ্ছিল না। বাড়িতে ঢুকেই সৌরভ উদভ্রান্তের মতো ল্যাপটপ খুলে মিলিয়ে দেখল-"ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে একটা টাকাও এদিক ওদিক হয়নি।"


এতক্ষণের টেনশনের পরে একলা ঘরে মাঝ রাত্তিরে একেবারে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল ছাব্বিশ বছরের পূর্ন যুবকটি। 


 কলকাতাকে ছেড়ে আসার মনখারাপ, মা বাবা, ভাইবোন, বন্ধুদের ছেড়ে থাকার যত কষ্ট এবং জীবনের সব অভিমান শ্রাবণের বৃষ্টিধারার মতো নেমে আসলো সৌরভের দুচোখ বেয়ে...


 কাঁদল, একলা ঘরে সৌরভ অনেকক্ষণ ধরে কাঁদল...কেউ জানল না, কেউ স্বান্তনাও দিল না। সাক্ষী রইল দিল্লির ডিসেম্বরের হিমেল রাত...


ঘটনাটা কিন্তু এখানেই শেষ হলনা।



                            *



  রাতটা প্রায় জেগেই কেটে গেল। ভোরের দিকে সৌরভের খেয়াল হল- ক্রেডিট কার্ডগুলো পাওয়া গেলেও, ওয়ালেটেটা হারিয়ে গিয়েছে ওর, আর সেখানেই ছিল সদ্য পাওয়া ড্রাইভিং লাইসেন্সটা। দিল্লি শহরে লাইসেন্স ছাড়া একবেলাও স্কুটার চালানোর সাহস হয়না। বড় ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল এই লাইসেন্স পেতে।


আবার মনটা খারাপ হয়ে গেল সৌরভের। এই সপ্তাহেই থানায় গিয়ে এফ.আই. আর করতে হবে। ব্যবস্থা করতে হবে ডুপ্লিকেট লাইসেন্সের। আগামীকাল আবার অফিসে প্রচুর কাজ।


সৌরভের জীবনে কলিগরা সকলেই কেবলমাত্র কলিগই। বন্ধু কেউ নয়।


 পরদিন সকালে অফিসে এসেও চুপ করে নিজের টেবিলে বসে নিজের কাজ করে যাচ্ছিল ও। গতকালের ঘটনাটা কারুকে কিছু জানায়নি, ইচ্ছে করেনি বলতে।


লাঞ্চব্রেকের মিনিট দশেক আগে

অফিসের পিওন এসে জানাল- "একজন কাঠের মিস্ত্রী এসেছে সৌরভের সঙ্গে দেখা করতে।" সত্যিসত্যি যেন একেবারে আকাশ থেকে পড়ল সৌরভ। সারাজীবনে কোনোদিন কোনোরকম কাঠের কাজ করায়নি ও। তাছাড়া দিল্লির ভাড়াবাড়িতে তো সেই প্রশ্নই ওঠেনা...ওর সঙ্গে কি দরকার থাকতে পারে লোকটির? তবুও ভেতরে নিয়ে আসতে বলল তাকে...




                              *



ভেতরে ঢুকে মুখোমুখি চেয়ারে বসে সৌরভকে একেবারে চমকে দিয়ে মনসুর রহমান তার পকেট থেকে বের করল গতকাল রাতে হারিয়ে যাওয়া সৌরভের খয়েরি রং চামড়ার ওয়ালেটটি, সঙ্গে ড্রাইভিং লাইসেন্স...


 সৌরভ তখন একেবারে হতবাক।


অত্যন্ত বিনীতভাবে কাঠের মিস্ত্রীটি জানাল- গতকাল রাতে বাড়ি ফেরার পথে চামড়ার ওয়ালেটটি কুড়িয়ে পেয়েছিল সে। বাড়িতে দেখানোমাত্র তার আম্মীজান হুকুম দিয়েছেন- "ওয়ালেটের ভেতরের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখে, খোঁজখবর করে আজ সকালেই ফেরত দিয়ে আসতে হবে যার জিনিস তার কাছে। তা নাহলে বড় গুণাহ হয়ে যাবে আল্লার কাছে। আল্লার কোনো বান্দা নিশ্চয় খুব অসুবিধায় পড়বে গাড়ির লাইসেন্স হারিয়ে।"


 সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ সৌরভ..."এটা কি স্বপ্ন নাকি সিনেমা?"-  বিস্ফারিত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে সে...


  না, কাল রাতের মতো ভুল অবশ্য এবার আর সৌরভ করেনি। 


ঘোর কাটতে না কাটতেই চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে মনসুর রহমানকে দুহাত বাড়িয়ে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল সৌরভ। 

মনেমনে প্রতিজ্ঞা করছিল- "আর কোনোদিন মানুষকে অবিশ্বাস করবেনা ও। দিল্লি হোক, কলকাতা হোক, চীন, জাপান, আমেরিকা, আফ্রিকা, হনুলুলু যেখানেই হোক...মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখতেই হবে। বিশ্বাস করবে ও...। সৌরভের বুকের ভেতরে কিসের যেন ঝড়...


আসল "ম্যাজিকটা" সৌরভ টের পেল মনসুর রহমান ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরে...


হ্যাঁ সত্যিকারের ম্যাজিক কিম্বা অলৌকিক কিছু...


খয়েরি চামড়ার ওয়ালেটটা খোলামাত্র সেখান থেকে বেরিয়ে এল পোপের মূর্তিখচিত তিনটি মুদ্রা...।

হ্যাঁ কোনও এক মন্ত্রবলে সৌরভের ওয়ালেটে তখন  সত্যিই চকচকে তিনটি মুদ্রা। 

ওরা যেন নতুন করে সৌরভকে শিখিয়ে দিয়ে গেল- "মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখার মন্ত্র, মানুষকে ভালোবাসার মন্ত্র।"


এই ঘটনাটির ব্যাখ্যা বুদ্ধি দিয়ে কিভাবে করা যায়, সৌরভ আজও জানেনা...




    ****




সুস্মিতা

নীড়বাসনা  বৈশাখ ১৪২৯