• শ্রাবস্তী সেন

গল্প - কুষ্ঠি-বিচার





সকাল থেকে বাড়িতে আজ সাজসাজ রব। আজ এই বাড়ীর একমাত্র কন্যা সৃজাকে দেখতে আসছে পাত্রপক্ষ। তাই বাড়ীর সবাই আজ ভীষণ ব্যস্ত। একমাত্র নাতনি সৃজাকে দেখতে আসবে বলে ঠাকুমা রেনুকাদেবিও বেশ উত্তেজিত। বউমা সুলতার সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে গুছিয়ে তুলছেন বসার ঘরটা। ছেলে বরুণ ও নাতি সুনন্দ সকাল থেকে বাজার দোকান করছে খাবার দাবার আনছে অতিথি আপ্যায়নের জন্য। হ্যাঁ এদের নিয়েই রেনুকাদেবির ভরাট সংসার। ওনার এক কন্যাও আছে – বনানী। কলকাতার মধ্যেই বনানীর শ্বশুরবাড়ি। আজ বিকেলে সে ও তার স্বামী অর্থাৎ রেনুকাদেবির জামাই মৃদুলের সঙ্গে আসবে ভাইঝির এই বিশেষ দিনে উপস্থিত থাকতে। সৃজা এখানে একটা কলেজে বট্যানি নিয়ে মাস্টার্স করছে। সেই কলেজের সিনিয়র পীযুষ। কলেজের একটা ফাংশানে পীযুষ সৃজাকে দেখে ও তার ভালো লেগে যায়। এরপর সে তার বাড়িতে কথা বলে, ও দুই বাড়িতে যোগাযোগ হয়ে ঠিক হয় পীযুষ ও তার বাড়ীর লোক আজ আসবে এই বাড়িতে সৃজাকে দেখতে। পীযুষ এখন এক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় চাকরি করে, তাই পাত্র বেশ ভাল। অবশ্য রেণুকার নাতনি সৃজাও কিছু কম যায়না। দেখতে শুনতে যথেষ্ট সুন্দরী। পড়াশুনাতেও সে যথেষ্ট মেধাবী, সঙ্গে খুব ভালো কত্থক নাচ করে। নাতনি কে নিয়ে রেণুকা বেশ গর্বিত।

দেখতে দেখতে বিকেল হয়ে গেল। সুলতা মেয়েকে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে তৈরি করেছে। হালকা তুঁতে রঙের পিউর সিল্কে সৃজাকে অপরূপা লাগছে। ইতিমধ্যে বনানি ও মৃদুলও এসে গেছে। এখন শুধু পীযুষদের আসার অপেক্ষা। কিছুক্ষণ পরে পরপর দুটো গাড়ি এসে দাঁড়ায় বাড়ীর সামনে। পীযুষ তার বাবা, মা, ভাই ও আরও কিছু আত্মীয় নিয়ে সবশুদ্ধ দশজন এসেছেন সৃজাকে দেখতে। এত লোক দেখে রেণুকার বেশ অবাক লাগে। আজকালকার দিনে যেখানে দুই বাড়ীর লোকজন যেখানে বলে পাত্র পাত্রী আলাদা ভাবে কথা বলে আগে দেখে নিক তাদের মতের মিল হচ্ছে কিনা সেখানে কিনা এরা এতজন মিলে এসেছে পাত্রী দেখতে। যাইহোক সবার সঙ্গে রেণুকাও এগিয়ে গেলেন অতিথি আপ্যায়ন করতে। কিন্তু প্রথম থেকেই কথাবার্তা যেন স্বাভাবিক ছন্দে এগোচ্ছে না। পীযুষের বাবা ও জ্যাঠার ব্যবহার বেশ ঔদ্ধত্যপূর্ণ। বাড়ীর বউরা যে পড়াশোনা বা অন্য কিছু ‘না’ করতে পারে সে ব্যাপারে মনে হল ওঁদের বেশ গোঁড়ামি রয়েছে। সৃজাকে দেখে ওরা পড়াশোনা ইত্যাদি নিয়ে কোন কথাই বললেন না। পীযুষের মা, জেঠিমা খালি রান্না জানে কিনা জিজ্ঞেস করলেন , আর সৃজা রান্না সেরকম পারে না বলে একটু যেন অসন্তোষ প্রকাশ করলেন। রেণুকার পুরো ব্যাপারটা একদম ভালো লাগছিলনা। এমনকি সৃজা যে নাচ দেখে পীযুষের ওকে ভাল লেগেছিল , সেই নাচ নিয়েও ওনাদের কোন কিছু জিজ্ঞাসা নেই। বরং পীযুষের এক মাসতুতো ভাই তো বলেই বসলো ওরকম কিছু না কিছু সব বাবা-মাই তাদের সন্তানদের শেখান, তা নিয়ে বেশী ভেবে লাভ নেই। আর সব কিছুর মধ্যে আশ্চর্য রকম চুপ করে আছে পীযুষ। রেণুকার পুরো ব্যাপারটা ক্রমশ অসহ্য লাগছিলো। এমনকি মৃদুল একবার বলল সৃজা ও পীযুষকে আলাদা ভাবে একটু কথা বলতে তাতেও ওরা আপত্তি করলো।


এরপর এটা ওটা কথাবার্তার পরে ওনারা বললেন সৃজার ঠিকুজি কুষ্ঠি নিয়ে আসতে। বরুণ যখন বলল সৃজার কুষ্ঠি করা নেই, সেটা শুনে তো ওনারা হতবাক। ঠিকুজি তৈরি না করে বাবা মা কি করে নিশ্চিন্ত হয়ে থাকে সেটাই ওনারা বুঝতে পারছেননা। যাইহোক আরও কিছুক্ষণ কথা বলে ওনারা বিদায় নিলেন। যাওয়ার আগে পইপই করে বলে গেলেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সৃজার ঠিকুজি তৈরি করে ওনাদের পাঠিয়ে দিতে। ঠিকুজি মিললে তবেই কথাবার্তা এগোবে না হলে নয়। বাড়িতে যেন একটা থমথমে পরিবেশ। সুনন্দ তো রেগে আগুন। সৃজা নিজের ঘরে গিয়ে গুম হয়ে বসে আছে। রেণুকার আর কিছু ভাল লাগছিলনা। নিজের ঘরে চলে এলেন তিনি। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে তাঁর। আর তাছাড়া এই ঠিকুজি কথা তে তাঁর অনেক পুরোনো কথা মনে পড়ে গেছে। টাইম মেশিনে চেপে উনি যেন ফিরে গেছেন ওনার ছোটবেলার দিনগুলোতে।

মেদিনিপুরের এক জমিদার বাড়ীর মেয়ে রেণুকা। পাঁচ বোন ও এক ভাই তারা । বোনদের মধ্যে উনি ছিলেন চতুর্থ। একান্নবর্তী পরিবারে সকল ভাইবোনেরা একসঙ্গে থাকেন। রেণুকারাও সেভাবেই বড় হয়েছেন। রেণুকার যখন সাত বছর বয়স তখন দুরারোগ্য যক্ষ্মা রোগে মৃত্যু হয় রেণুকার মা’র। ওনার ছোটবোন যূথিকা তখন চার বছরের শিশু। বাড়িতে ঠাকুমা, জেঠিমা, কাকিমাদের স্নেহে মার অভাব সেইভাবে বোঝা যায়নি। তাছাড়া বাড়িতে এক বয়সী অনেক বাচ্ছা থাকতে ,ও বড় দাদা, দিদিদের ছত্রছায়ায় আস্তে আস্তে ওনারা বড় হয়ে গেছেন। একে একে রেণুকার তিন দিদিরও বিয়ে হয়ে যায়। রেণুকার পনেরো বছর বয়সে হঠাতই মারা যান রেণুকার বাবা। এমন নয় তারা ভাই বোনরা বাবাকে খুব বেশী কাছে পেতেন, বরং বাবা বেশীর ভাগ নিজের কাজেই থাকতেন, তবু বাবার মৃত্যু যেন একটা বড় ধাক্কা ছিল রেণুকার জীবনে। আস্তে আস্তে সময় এগিয়ে চলে নিজের গতিতে। এক- দেড় বছর কাটতেই বাড়ীর বড়রা এবার রেণুকার বিয়ের জন্য তোড়জোড় শুরু করেন। এরমধ্যে যদিও রেণুকার দাদা শিবতোষের বিয়ের কথা বার্তার কথা কেউ কেউ তুলেছিলেন, কিন্তু শিবতোষ সবাইকে জানিয়ে দেন তিনি বিয়ে করবেননা।


যাইহোক রেণুকার বিয়ের জন্য অনেক জায়গা থেকে সমন্ধ আসতে লাগলো। এই ভাবেই এক ঘটকের মাধ্যমে সমন্ধ এসেছিলো কলকাতা শহরের বনেদি পরিবারের ছেলে রনেন্দ্রনাথের । রনেন্দ্রনাথেরও বাবা মা দুজনেই গত হয়েছেন, তাঁরা তিন ভাই, তিনজনেই পেশায় ডাক্তার। এখন পরিবারের কর্তা ওনার বড় দাদা বিপত্নীক সুরেন্দ্রনাথ। যাইহোক যথাসময়ে শিবতোষ ও দু একজন কাকা জ্যাঠা গিয়ে কথা বলে এলেন। সুরেন্দ্রনাথ ও ওনার মেজভাই বিরেন্দ্রনাথ দুজনেই বললেন আগে রেণুকার কুষ্ঠি পাঠাতে, যদি কুষ্ঠির মিল হয় তবেই তাঁরা পাত্রী দেখবেন। এর মধ্যে কি ভেবে কে জানে রেণুকার ছোটকাকা ওনাদের কাছ থেকে রনেন্দ্রনাথের জন্ম তারিখ ও সময়টা কথায় কথায় জেনে নিয়েছিলেন। যাইহোক রেণুকার কুষ্ঠি যখন ওই বাড়ীতে পাঠানো হয় তখন সবাই জানত এখানে কথা এগোবে না, কারণ দুজনের কুষ্ঠির মিল হয়নি। রনেন্দ্রনাথদের বাড়ি থেকেও সেই কথা জানিয়ে চিঠি আসে। এরপর প্রায় তিনমাস কেটে যায়, এরমধ্যে আরও দুএক জায়গায় কথাবার্তা হলেও রেণুকার তখনও বিয়ের ঠিক হয়নি। হটাত একদিন সেই ঘটক এসে বলে সুরেন্দ্রনাথ তাকে তলব করে বলেছেন মেদিনীপুরের যে কন্যার কুষ্ঠি এসেছিলো সেটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, আর এত সমন্ধের মধ্যে ওনাদের মনে নেই কুষ্ঠিটা মেলানো হয়েছিলো কিনা। ওনারা বারবার করে ক্ষমা চেয়ে বলেছেন পাত্রীর বাড়ীর লোক যদি অনুগ্রহ করে আরও একবার কুষ্ঠিটা পাঠান তাহলে খুব উপকার হয়।

ঘটকের কথায় বাড়িতে শোরগোল পড়ে গেছিলো। তখনকার দিনে পাত্র বা পাত্রীর মতামত কেউ নিতনা। বিয়ের ব্যাপারে,তাই রেণুকারও এখানে কোন ভূমিকা ছিলোনা। বাড়িতে দাদা, জ্যাঠা, কাকারা মিলে এবার গভীর আলোচনায় বসেন। এই আলোচনায় ঠিক হয় এই সুযোগ বারবার আসেনা, তাই এই সুযোগের সদব্যবহার করা উচিত। সবাই ছোটকাকার উপস্থিত বুদ্ধির প্রশংসা করে কারন সে রনেন্দ্রনাথের জন্মসময় ও তারিখ টা জেনে এসেছিলো। অতএব এখুনি ওই তারিখ ও সময় ধরে একটা কুষ্ঠি তৈরি করে তার সঙ্গে মেলানো আরেকটা কুষ্ঠি তৈরি করা হোক রেণুকার বলে ও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেটা পাঠিয়ে দেওয়া হোক ওনাদের বাড়িতে। যেমন ভাবনা তেমন কাজ। ওই নকল কুষ্ঠিই পাঠানো হল রনেন্দ্রনাথদের বাড়িতে। তাঁরা সেখানে মিলিয়ে দেখলেন এ একেবারে রাজযোটক। এরপর দুই বাড়ির গুরুজনদের মধ্যে কথা বার্তা শুরু এবং সবশেষে চার হাত এক হোল। আজও কথাগুলো ভাবতে বসে ঠোঁটের প্রান্তে হাল্কা হাসি ফুটে ওঠে রেণুকার। আচ্ছা ওনার বাবা বা মা একজনও কেউ যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে কি এই ঘটনায় সায় দিতেন? বিয়ের অনেক বছর পরে ঠিক এই প্রশ্নটাই একবার দাদাকে করেছিলেন রেণুকা। দাদা উত্তর দিতে পারেননি, শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন ‘ কেন তুই কি জীবনে সুখী হসনি ?’ রেণুকার ভাবনায় ছেদ পরে। বনানী ও মৃদুল বাড়ি যাওয়ার আগে ওনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। বনানী সোজাসুজি বলল তার পীযুষদের বাড়ীর লোকজনকে একদম ভালো লাগেনি, সে সেটা বরুণকে সরাসরি জানিয়েও দিয়েছে , বলে এসেছে এখুনি ওদের জানিয়ে দিতে যে এই বাড়িতে ওরা মেয়ের বিয়ে দেবেনা। বরুণও অত্যন্ত বিরক্ত পুরো ঘটনাতে শুধু সুলতা ইতস্তত করছে বলে কিছু বলতে পারছে না। রেণুকা জানেন তাঁর মেয়ে বরাবরই স্পষ্টবক্তা, যা বলার মুখের ওপর বলে দিতে পিছপা হয়না। এখানেও রেণুকাকে যখন সে তার মতামত জানাচ্ছে তখন তার কথায় তার বিরক্তই প্রকাশ পাচ্ছে। সেই তুলনায় মৃদুল অনেক মার্জিত, এখানেও মৃদুল বনানীকে বোঝানোর চেষ্টা করছে তাড়াহুড়ো করে কোন হতকারিতা করার মানে হয়না, যা বলার একটু সময় নিয়ে ভেবে চিন্তে বলাই ভালো। যাইহোক কিছুক্ষণ কথা বলে ওরা রওনা দিল। ওদের যাওয়ার পরেই ঘরে এল সুনন্দ। আজ প্রথম থেকেই সে ভীষণ বিরক্ত, সে এসে ঠাকুমাকে বলল, তার মা ইতিমধ্যে কান্নাকাটি ও কপাল চাপড়ানো শুরু করেছে, কিন্তু রেণুকাকে সে স্পষ্ট জানিয়ে দিচ্ছে যদি এই বাড়িতে শেষ পর্যন্ত তার বোনের বিয়ে ঠিক হয় , তাহলে সে বোনের বিয়ে বয়কট করবে। নাতির মেজাজ রেণুকা বিলক্ষণ চেনেন। সুনন্দ অনেকটা ওর ঠাকুরদার মতন এক কথার মানুষ। সে যেটা বলে সেটাই করে, ফাঁকা বুলি আওড়ায় না। না, আর বসে থাকা যাবে না, এবার রেণুকাকে উঠতেই হবে।

বসার ঘরে এসে দেখলেন বরুণ গম্ভীর মুখে বসে টিভি দেখছে। সুলতার কথা জিজ্ঞেস করায় বলল ঘরে শুয়ে আছে, মাথার যন্ত্রণা হচ্ছে বলে মাথায় বাম লাগিয়ে শুয়ে আছে। সুলতা আসলে বড্ড নরম মনের মানুষ, অল্পেই উতলা হয়ে পরে, কোন সমস্যা হলে কান্নাকাটি করে নিজেই অসুস্থ হয়ে পরে । রেণুকা আর কথা বাড়ালেন না, সুলতার সঙ্গে পরে কথা বলবেন , আগে ওনার সৃজার সঙ্গে কথা বলা দরকার। নাতনির ঘরে গিয়ে দেখলেন মুখ বেশ থমথমে, মোবাইল নিয়ে খুটখুট করছে। ঠাকুমাকে দেখে উঠে বসলো। রেণুকা বুঝতেই পারলেন সবকিছু দেখে মেয়েটা বেশ ঘাবড়ে গেছে। ‘ কি রে মা চুপচাপ বসে আছিস? ঘরে এরকম মুখ কালো করে বসে আছিস ? কিছু বলছিস না তো? ‘ ঠাকুমাকে পেয়ে সৃজা যেন ধরে প্রান পেল। পীযুষরা চলে যাওয়ার পর থেকে বাড়ীর পরিবেশ টা এমন হয়ে গেছে যে সে আর কাউকে কিছু বলতেই পারছে না। বিশেষ করে তার মা – কিছু হলেই কান্নাকাটি করে এমন করে যে একটু বড় হওয়ার পর থেকে সৃজা নিজের কোন সমস্যার কথা মাকে চট করে কিছু বলতে চায়না। তার চেয়ে ঠাকুমার কাছে সে অনেক খোলামেলা ভাবে কথা বলতে পারে। আজকের এই ঘটনা টা যে তার জীবনে কোনদিন হতে পারে তা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। কলেজের ফাংসানের পরে পীযুষ নিজে এসে আলাপ করেছিল। সেরকম কিছু না, শুধু বলেছিল সৃজার নাচ তার খুব ভালো লেগেছে। এরপর ওদের বাড়ি থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসে সৃজাদের বাড়িতে আর তার পর আজকের এই ঘটনা। আচ্ছা পীযুষ তো জানতো সৃজা নাচ করে, তাও তার বাড়ীর লোকজনকে সে কিছু বলেনি কেন? ভীষণ বিরক্ত লাগছে সৃজার। ‘ কি রে মা? কিছু বল’। ‘ ঠাম্মা, এসব কি হল বলতও? পীযুষ যেখানে আমার নাচ দেখে আমার সঙ্গে এসে আলাপ করেছিল, সেখানে কিনা ওর বাড়ীর লোকজন আমাকে নাচ ছেড়ে দেওয়ার কথা বলছে আর সেখানে ও চুপ করে বসে শুনছে? তার মানে তো ওরও এই মত? কেন আমি নাচ ছেড়ে দেবো বল ঠাম্মা? নাচ করা কি খারাপ? খারাপ হলে কি তোমরা ছোট বেলা থেকে আমাকে নাচ শেখাতে ঠাম্মা,’ অনেকক্ষণ ধরে জমিয়ে রাখা কথা গুলো এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলে সৃজা। নাতনির মাথায় স্নেহের হাত রাখে রেণুকা। ঠাম্মা কে জড়িয়ে ধরে সৃজা। ‘ঠাম্মা, মা যেভাবে কান্নাকাটি করছে , মা কে এখন কি করে বোঝাবো বলতো।‘ ‘ তোর মার সঙ্গে আমি কথা বলবো, তুই চিন্তা করিস না।‘

নাতনির ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সুলতাকে ডাকেন রেণুকা। কান্নাকাটি করে চোখ মুখ ফুলে গেছে সুলতার। জোর করে তাকে নিয়ে আসেন খাবার টেবিলে রেণুকা। সবাইকে বসিয়ে নিজে সবাইকে খাবার সাজিয়ে দেন আজ। প্রথম কথা বলে সুলতাই। মেয়ের বিয়ে ভাঙার কথা সে ভাবতেও পারেনা। তাই বরুণকে বলে ছেলের বাড়ীর কথা মতন সৃজার ঠিকুজি তৈরির ব্যবস্থা করতে। বরুণ কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু তাকে থামিয়ে দেন রেণুকা। সবাইকে চুপ করিয়ে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলে ওঠেন, ‘ ঠিকুজি তৈরি করার কোন প্রয়োজন নেই বৌমা, এখানে বিয়ে হবেনা সৃজার।‘ আঁতকে ওঠে সুলতা। তার শাশুরিমা যে দৃঢ়চেতা সেটা সে জানে, তাই বলে এইভাবে বিয়ে ভেঙ্গে দিতে বলবেন তা সে কোনোদিন ভাবতেও পারেনি। ‘ এসব আপনি কি বলছেন? মেয়ের বিয়ে দিতে গেলে পাত্রপক্ষর কিছু আবদার তো মানতেই হবে মা।‘ “ না বউমা, আমি যা বলছি ঠিক বলছি। আর এটা শুধু আমার মত নয়, আমার নাতি, নাতনিও এটাই চায়।‘ এবার কথা বলে বরুণ। ‘ মা, মানছি ওরা কিছু কথা বলেছে যেগুলো আমাদের মানতে একটু অসুবিধে হচ্ছে, কিন্তু আমার মনে হয় সটান না বলে দেওয়া টা ঠিক হবে না। আমরা বরং ঠিকুজিটা তৈরি করাই ,তার পরে না হয় দেখা যাবে।‘ ‘ না, আমার বাড়িতে আমারই নাতনীর বিয়েতে কক্ষনোই এইসব কোন কিছু হবে না, কারণ আমি এটা মানিনা।‘ একসঙ্গে এতগুলো কথা বলে চুপ করলেন রেণুকা। ‘ কিন্তু মা, দেখো তোমার মানা না মানা টা তো ওরা শুনবে না,’ বলল বরুণ। সুলতা কোন কথা বলতেই পারছে না, গলার কাছে একটা কান্নার দলা আটকে আছে, কিন্তু সে না পারছে কাঁদতে না কোন কথা বলতে।

সুনন্দ কি একটা বলতে যাচ্ছিল , তাকে হাত তুলে থামতে বললেন রেণুকা। ‘ দেখো আমি কোনদিন তোমাদের কাছে এই ঘটনার কথা বলিনি, আসলে কোনদিন বলতে হবে সেটাই ভাবিনি। তোমাদের বাবা অবশ্য সবটাই জানতেন, কিন্তু তোমাদেরই বলা হয়নি বা বলার প্রয়োজন হয়নি। যখন তোমাদের বাবার আর আমার বিয়ের ঠিক হয়, তখন তোমাদের এই বাড়ি থেকে অভিভাবকরা কুষ্ঠি বিচার করেই তাদের ছেলের বিয়ে দেবেন ঠিক করেন। কিন্তু তারপরে কি হয়েছিল সেটা আজ তোমাদের বলার সময় হয়েছে। এবার সবার সামনে আদ্যপান্ত সমস্ত খুলে বলেন রেণুকা। সবাই হতভম্ব হয়ে শুনতে থাকে ।

‘হ্যাঁ তোমরা হয়ত বলবে যে তখনকার দিনে সমাজ ব্যবস্থা অন্য রকম ছিল, বিশেষ করে যৌথ পরিবারে যেহেতু অনেক বিবাহ যোগ্য মেয়ে থাকত , বাড়ীর অভিভাবকরা সোজা কথায় মেয়ে পার করার জন্য এইসব ছলনার আশ্রয় নিতেন। বা, হয়তো বলবে আমার মা বেঁচে থাকলে তিনি এটা কক্ষনোই মেনে নিতেন না। জানিনা, কি হলে কি হতে পারতো, শুধু এটুকু জানি এই বিয়েতে আমরা কেউ অসুখী ছিলাম না। বরং তোমাদের এই পরিবারে সবার চেয়ে বেশী দিনের দাম্পত্য জীবন কাটিয়েছি আমরা। চুয়াল্লিশ বছরের দাম্পত্য জীবনে বহু ওঠা পরা এসেছে, কিন্তু আমরা দুজনে একে অপরের পাশে অবিচল ভাবে থেকে সব ঝড় ঝাপটা সামলে গেছি। কালের নিয়মে এক জন কে আগে যেতে হবে, এ ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে , কিন্তু তার জন্য দুঃখ থাকলেও, কোন আক্ষেপ বা অভিযোগ আমার নেই।‘ এক টানা কথা গুলো বলে এবার থামলেন রেণুকা।

ঘরের মধ্যে সবাই চুপ। কারুর মুখে কোন কথা নেই। প্রথম কথা বলল সুনন্দ। চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে ঠাম্মার গলা জড়িয়ে ধরে বলে উঠল ‘ ঠাম্মা, এতো বইয়ের গল্পকেও হার মানায়।‘ উঠে এসেছে সৃজাও, ঠাম্মার দুটো হাত জড়িয়ে ধরে সে। সৃজার মাথায় হাত রেখে রেণুকা বললেন, ‘ বরুণ, তোমার মেয়ে এই পরিবারের রত্ন, তাকে এই অস্নমানের হাত থেকে রক্ষা করা তোমার কর্তব্য। তোমাদের বাবা সব জানতেন, আর তাই আমরা দুজনে মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে আমাদের পুত্রকন্যার ক্ষেত্রে আমরা এই পুরনো মান্ধাতার আমলের এই প্রথা আমরা কিছুতেই মানবো না। আমরা আমাদের সেই কথা রেখেছিও।‘ এবার সবাইকে থামিয়ে দিয়ে কথা বলে সৃজা। ‘বাবা, আমি নাচ ছাড়বো না। আর ঠাম্মার সঙ্গে আমি একমত, এই পরিবারে বিয়ে হলে আমি ভালো থাকবো না, আমার সমস্ত স্বপ্নকে আমি শেষ করে দিতে পারবো না।‘ মেয়ের মাথায় হাত রেখে এবার কথা বলে বরুণ, ‘তুই কিছু চিন্তা করিস না, আমি কাল সকালেই ওদের ফোন করে বলে দেবো এই বিয়েতে আমাদের মত নেই। তোর স্বপ্নগুলো ভেঙ্গে যেতে আমি দেবো না। সুলতা, আর চোখের জল ফেলো না, আমার কথা মিলিয়ে নিয়ো, আমাদের মেয়ের অনেক ভালো বিয়ে দেবো আমরা, যেখানে সে তার যোগ্য সন্মান নিয়ে থাকতে পারবে।‘

শেষ পর্যন্ত সুনন্দ বলে ওঠে , ‘থ্রি চিয়ার্স ফর ঠাম্মা , সবাই একসঙ্গে বলে ওঠে হিপ হিপ হুররে।‘


নীড়বাসনা  বৈশাখ ১৪২৯