• চন্দন নন্দী

গল্প গুচ্ছ



কৃষ্ণেন্দু রায় ১১০০


রাজারহাটের মোড় টা পেরিয়েই কিছুদূর গিয়ে সেক্টর ফাইভ এ ঢুকলো দেবযানী। দ্রুত হাতে গাড়ির দরজাটা খুলে এগিয়ে গেলো সামনের দিকে। সামনেই ক্যাফে কফি ডে তে ঢুকলো। বেশ ভিড় , শুধু দুটো চেয়ার ফাঁকা পরে আছে.

বছর ২৯ এর দেবযানী অসামান্য রূপসী না হলেও , সুশ্রী দেখতে। শাশুড়ি বরণ করবার সময় বলেছিলেন ঘরে লক্ষী নিয়ে এলাম।স্বামী আর দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে পূর্ণ সংসার দেবযানীর। এখানেই একটা বন্ধুর সাথে দেখা করতে আসা. সুপর্ণা। ছোটবেলাকার বন্ধু। কাকু আর দেবযানীর বাবা একসাথে চাকরি করতেন। সেইসূত্রে প্রায় পারিবারিক বন্ধুত্ব। সুপর্ণা পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল তাই ইঞ্জিনিয়ারিং পাস্ করে সেক্টর ফাইভ এই একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি তে কাজ করে। বেশ খানিক্ষন আগে ফোন করেছিল দেবযানী , তড়িঘড়ি ফোন তা তুলে সুপর্ণা বলে "তুই একটু বোস, মিটিং টা সেরে আসছি".


"এক্সকিউজ মি , ডিস্ ইস মাই সিট". মাথা তুলে তাকিয়ে দেবযানী দেখলো এক অপরূপ সুন্দরী মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে , বেশ লম্বা, গায়ের রং কাঁচা হলুদের মত ,কোমর অবধি লম্বা চুলের গোছা , পরনে হলুদ রঙ্গের তাতের সারি ,লাল রঙের ঘটি হাতা ব্লাউস । মার্জিত নেইলপলিশ , একপলকে দেখে ফেললো দেবযানী । মেয়েদের এসব নজর এড়ায় না। যাইহোক ভারী মিষ্টি দেখতে। সাক্ষাৎ স্বরস্বতী।


ওর দিকে ইশারা করে জানালো সিটটা সে রিসার্ভ করে রেখেছে। "আসলে আমি একটু ওয়াশরুম এ গিয়েছিলাম , আমার ব্যাগটা রেখে". দুটো চেয়ার। সামনের চেয়ার এ ও ব্যাগ রেখে গেছে সেটা লক্ষ্য করেনি দেবযানী। কিছু না বলেই উঠে যাচ্ছিলো , কিন্তু মেয়েটি ওকে জানালো ওর বয়ফ্রেন্ড এর আসতে এখনো বেশ কিছুটা সময় বাকি আছে, অতএব সে খানিক্ষন বসতে পারে।


"কি নাম তোমার ?" জিজ্ঞেস করতে মেয়েটি জানালো ওর নাম দেবস্মিতা। নামটা খুব চেনা চেনা লাগলো দেবযানীর। কিছুক্ষন কথা হতেই আলাপ বেশ জমে উঠলো। দেবস্মিতা সাউথ কলকাতায় থাকে , এখানে একটা অফিস এ কাজ করে. দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি কথা ও খুব মিষ্টি।


দেবযানী জানালো , তার একটা ছেলে আছে একটা মেয়ে। দুজনেই ডি পি এসে পরে. ভদ্রতা বসতো দেবযানী কফিই অফার করলো কারণ ওকে খানিক্ষন বসতে হবে, এদিকে সুপর্ণার কোনো পাত্তা নেই. দেবস্মিতা জানালো শুধু একটা শর্তেই ও সিটে বসতে পারে যদি কফিই টা দেবস্মিতা খাওয়ায়। মিষ্টি হেসে দেবযানী সম্মতি জানালো। কথায় কথায় দেবযানী জানতে পারলো দেবস্মিতা আসলে wait করছে ওর বয় ফ্রেন্ড এর জন্য। কিন্তু মিটিং এ থাকতে তার আস্তে একটু দেরি হবে. সেই সময় টুকু যদি দুজনে গল্প করা যাই তাহলে সে খুশি হবে.


জানাগেলো দুজনেই নাচ করতে ভালোবাসে। গান গাইতেও। দুজনের প্যাশনই বই পড়া. দেবযানীর অবশ্য দুই বাচ্ছাকে পরিয়ে সময় হয় না আজকাল। দেবস্মিতা নাচের প্রোগ্রাম এ বিদেশেও গেছে। গতমাসে UK তে গেছিলো . কথায় কথায় সময় বেশ খানিকটা পেরিয়ে গেলো। খুব ভালো সময় কাটলো দেবস্মিতার সাথে। ওকে নিজেদের বাড়ি আমন্ত্রণ করলো দেবযানী। কিন্তু এবার না উঠলেই নয়। ওয়েটার কে ডাকতে বিল আর মেশিন টা নিয়ে আসলো ওয়েটার।


বিল তা দেবযানী দিতো কিন্তু দেবস্মিতা কিছুতেই শুনলো না। দেবস্মিতা পার্স থেকে কার্ড টা বার করতেই স্তব্ধ হয়ে গেলো দেবযানী। তবু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ এ রেখে তীক্ষ্ণ চোখে ক্রেডিট কার্ড মেশিন এর কিপ্যাড এর দিকে চোখ রাখলো দেবযানী। চারটে বোতাম আঙ্গুল রাখামাত্র আর অপেক্ষা করতে পারলো না , মৃদু ভাষায় শুধু আসছি বলে তীব্র রাগে আর চোখের জলে বেরিয়ে এলো দেবযানী।


দেবযানী জানে ক্রেডিট কার্ড এর কৃষ্ণেন্দু রায় আর কেউ নয় - ওর স্বামী , কারণ ১১০০ পিন নম্বর এর দুজন কৃষ্ণেন্দু রায় এর হতে পারেনা।








তিখি মির্চি -৯৮.৩



খবরের কাগজটা নিয়ে বসলেন সোমনাথ বাবু। পাশে চায়ের গ্লাস, চিনি ছাড়া চা ।মধুমেহ রোগটি ধরা পড়বার পর থেকে ওটি ছেড়েছেন সোমনাথ বাবু । ল্যাম্প এর আলোয় ব্যালকনি থেকে সামনের পার্ক টি বেশ দেখা যায়. সন্ধে হয়ে এসেছে , শীতকালে খুব তাড়াতাড়ি সন্ধে হয়ে যায় । কোনোদিন ই খুব রাত করে সবার অভ্যেস নেই তার । রাত ৯ টার পর ডিনার সেরে শুয়ে পড়েন। সামনের টেবিল টা তে চা, একটা বই যেটা তিনি সদ্য বইমেলা থেকে কিনে এনেছেন আর একটা রেডিও। বুড়ো বয়েসে একটু FM রেডিও শোনার অভ্যেস হয়েছে তার।

হটাৎ করে ঘর থেকে একটা ক্রিং ক্রিং শব্দ করে মোবাইল ফোন তা বেজে উঠলো। ধরতেই ওপর থেকে একটা ঘসঘসে গলা । মেয়েলি গলা স্পষ্ট বোজা গেলো না প্রথমটায় । খুব সম্ভবত লাইন এ ডিসটার্ব। গলার স্বর টা উঁচু করে সোমনাথ বাবু বললেন "কাকে চান ???"

ওপার থেকে আওয়াজ এলো "তোমাকে" ।গলাটা যেন চেনা চেনা। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলেন নাহ কার গলা । আস্তে আস্তে লাইন তা পরিষ্কার হতে লাগলো। ওপর থেকে এবার স্পষ্ট মেয়েলি গলায় কেউ বললো "চিনতে পারছো না আমাকে ? আমি বর্ষা। ". কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন

চমকে গেলেন সোমনাথ বাবু। এ কেমন করে সম্ভব। তার স্ত্রী বর্ষা মারা গেছেন আজ থেকে মাস ছয়েক আগে । ছেলে প্রায় বছর পাঁচেক বিদেশে। তারপর থেকে একই থাকেন সোমনাথবাবু। "কেমন আছো ?" , এইকথা বলে ওপারের গলা কিছুক্ষনের জন্য চুপ করে রইলো। ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন সোমনাথবাবু। খুব কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন "ভালো আছি.". হটাৎ করে ওই প্রান্ত থেকে সশব্দে হাসির আওয়াজ। গলার স্বর এর পরিবর্তন হলো. ওপাশ থেকে কেউ হটাৎ বলে উঠলো, " সোমনাথ বাবু , ভয় পাবেন না, আমি দুঃখিত , আমি তিখি মির্চি ৯৮.৩ থেকে বলছি RJ সায়ন্তিকা". যেন ধরে প্রাণ ফিরে পেলেন সোমনাথ বাবু। সায়ন্তিকা ক্ষমা চেয়ে বললো "আমি রবীন্দ্র সংগীত এর অনুষ্ঠান করছি আপনি দয়া করে আপনার পছন্দের কোনো একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত বলুন আমরা চালাচ্ছি। বর্ষা খুব ভালো গাইতো "তুমি রবে নীরবে ". ওটাই চালাতে বললেন সোমনাথবাবু।


ফোন টা রেখে একটু মুখ ধুয়ে চেয়ার এ বসলেন। কিছুক্ষন বাদে হটাৎ মনে পড়লো অরে গান তা তো শোনা হলো নাহ । কি যেন চ্যানেল টা ? তিখি মির্চি ৯৮.3 । হ্যা ওটাই. তো । টেবিল থেকে রেডিও টা নিয়ে চ্যানেল টা দিলেন।


কিন্তু এটা কি ? এখানে তো হিন্দি গান এর একটা প্রোগ্রাম হচ্ছে। আর হ্যা RJ রবি বলছে ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত চলছে তার প্রোগ্রাম। যেকোন তো ঘড়ি তা ৮.৩০ বাজে। বিস্ময়ে চেয়ার বসে পড়লেন সোমনাথবাবু। আস্তে আস্তে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে।


সেই রাতে সোমানাথ বাবু মারা যান. পাশের টেবিল এ তখনো চলছে তিখি মির্চি ৯৮.৩।







অর্ক শুভ্র ব্যানার্জী



এ'বছর 'মাম' মানে দেবযানী , আবার বাপের বাড়িতে এসেছে । ৭ নম্বর যতীন দাস লেন, খাস উত্তর কলকাতা। একটু এগিয়েই মোহাম্মদ আলী পার্কের বিশাল পূজা। তবে পাড়ায় বন্ধুদলের পুজোটাই ভালো হয় বেশি। সারাদিন পাড়ার বন্ধুদের সাথে মণ্ডপে আড্ডা মারা, দাদাদের বার্ড ওয়াচিং কিছুই বাদ যায় না। অর্কদা এসেছে এবছর। গাড়ি চালাচ্ছিলো রিপ। রিপ মানে - 'অন্তরীপ' ওর বর , পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। ওরা আমেরিকায় থাকে। অনেক বছর পর আবার পুজোতে বাপের বাড়ি এলো দেবযানী । গড়িয়াহাটের মোর পেরোতেই অর্ককে দেখতে পেলো সে , গাড়ি থামিয়ে উঠে আসতে বললো। অনেকদিন পর আবার দেখা , প্রাথমিক উচ্ছাস কাটিয়ে বেশ কিছুক্ষন একটা অস্বস্তিকর নীরবতা। গাড়িটা জ্যাম এ আটকে গেছে। দেবযানীর মনে হলো অর্কদা কে দেখে এতটা উচ্ছসিত না হলেই ভালো হতো। ওর নিজেরও অস্বস্তি লাগছে , অর্কদাও আর কথা খুঁজে পাচ্ছেনা, প্রথম থেকেই খুব লাজুক ছেলে ছিল ও। দেখা গেলো অন্তরীপ খুব গুছিয়ে পরিস্থিতিটাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিলো। একটা দুটো কথা বলেই আলাপ জমিয়ে ফেললো। বেশ খানিকক্ষণ পর গাড়িটা পাড়ায় ঢুকতেই স্বস্তির নিঃস্বাস ফেললো দেবযানী। অর্ক পুজো মণ্ডপে নামবে , ওর সাথে দেবযানীও নেমে পড়লো , ছোট গলি থাকায় গাড়িটা অনেকটা ঘুরিয়ে পার্কিং করতে হবে। যাবার আগে অন্তরীপ বললো "আসছি তাহলে শুভ্র বাবু , আসা করি মণ্ডপে দেখা হবে। "


গাড়ি থেকে নেবে দুজনে বেশ খানিক্ষন চুপচাপ মণ্ডপের দিকে হেটে গেলো। অর্ক বললো " আমাদের ব্যাপার টা তোমার বর কে না জানালেই পারতে।"

"জানাই নি তো" - বললো দেবযানী।

"কিন্তু আমি তো ওনাকে বলিনি যে আমার নাম অর্ক শুভ্র ব্যানার্জী , আমি বলেছি আমার নাম অর্ক ব্যানার্জী - মাঝখানে শুভ্র নামটা বহুদিন ব্যবহার করা ছেড়ে দিয়েছি।

শুধু তুমি আমাকে একান্তে শুভ্র বলে ডাকতে"



তাহলে?








নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮