• রুমি

গল্প - পাভলোপেত্রি





বিরাট শহরের প্রশস্ত রাজপথ, প্রাসাদোপম অট্টালিকার সারি , অতিথিশালা, প্রমোদ উদ্যান, সুখী প্রজাদের সুসজ্জিত প্রাকার দেওয়া হর্ম‍্য, প্রাচীন বৃক্ষের বিস্তৃত বাহুডোর! কিন্তু সব প্রাণহীন! প্রশস্ত রাজপথের মোড়ে মোড়ে সুসজ্জিত বাতিদান ম্রিয়মাণ! শেষ প্রহরে দমকা ভারী বাতাসের ঝটকায় একেবারে নিভে যাওয়ার আশঙ্কায় দোদুল্যমান। শহরের প্রতিটা গলিকে গিলে ফেলছে নরকের অন্ধকার! এ যেন মৃতের শহর! নরকের পূতিগন্ধময়তায় চাপা বোঁটকা দূর্গন্ধ বাতাসে ভর করে মাঝে মাঝে, শহরের প্রতিটা দেওয়ালে ঝাপটা মেরে ফিরে আসছে মন্দির চত্বরে ! এ শহরের কোন ঘরে প্রসবযন্ত্রণাকাতর নারীর আত্মসুখমুখর চিৎকার শোনা যায় না! শিয়রে বিনিদ্র প্রহরায় জাগে মৃত্যু ফাঁদ! মৃত্যু নিঃশব্দে থাবা ফেলে হেঁটে চলে প্রতি অমাবস্যার রাতে! সদ‍্যজাত শিশুর জন্মক্রন্দন জন্মের ঠিক পর মূহুর্তেই থেমে যায় অব‍্যক্ত যন্ত্রণায় ! কখনও শহরের প্রশস্ত রাজপথে, কখনও অলিতে গলিতে, কিংবা ঘরের দেওয়ালে, নিকষ কালো হিংস্র নেকড়ের ছায়া ওঁৎ পেতে থাকে!


শহরের শেষ প্রান্তে কালো পাথরের ত্রিশশটা স্তম্ভ দেওয়া তিনকোনা পেডিম‍্যান্ট যুক্ত বিরাট মন্দির প্রাঙ্গণের ঠিক মাঝখানে একটা ভয়ঙ্কর নেকড়ে মূর্তি আরেসের মন্দিরের রক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নেকড়ের চোখ আরেসের ক্রূর দুটি চোখের একেবারে সোজাসুজি মিলিত হয়েছে। প্রতি অমাবস্যায় নেকড়ে মূর্তির কপালের মাঝখানে জ্বলে ওঠে নীলকান্ত মণির চোখ ধাঁধানো দ‍্যুতি! তখন নীল আলোর দ‍্যুতি ঠিকরে আরেসের মুখের উপর গিয়ে পড়ে! সেই রাতে আরেসের মূর্তি যেন সাক্ষাৎ বিষজ্বালাময় হয়ে ওঠে! জেগে ওঠে হিংস্র রক্তলোলুপ নেকড়ে মূর্তি! স্থবির, স্থানুময়তা কাটিয়ে পরিণত হয় সাক্ষাৎ বিভীষিকায় ! ঠিক এই স্থানেই এককালে ছিল রোমান সম্রাট মার্সের উপাস্য দেবতা অ্যাপোলোর মন্দির ! রক্ষী ছিল অ্যাপোলোর পোষ‍্য বিরাটকায় পাইথন। তার দুচোখ থেকে ছড়িয়ে পড়তো আহ্লাদী চুনির লালিমা! তখন মন্দির ছিল শ্বেতকায়া, জ্ঞানের দেবতা অ্যাপোলোর অন্তরের মত। ভবিষ্যত বক্তা অ্যাপোলো তাঁর উপাসকদের উদ্দেশ্যে ভবিষ‍্যবাণী করেছিলেন


―কখনও ভুলবে না,'পাভলোপেত্রি' র অর্থ 'ডুবন্ত শহর'.....


বছর পঁচিশেক আগে মার্সের জমজ সহোদর ভাই ডিং ফ্রে, শহর থেকে পশ্চিমে কয়েক যোজন দূরের মরুপর্বতের দূর্গম ডোহান গুফায় বহু বছরের তপস্যায় তার উপাস্য দেবতা আরেসকে তুষ্ট করে কালোযাদুর শক্তি প্রাপ্তির পর মহাবলীয়ান হয়ে ওঠে ! আরেসের আশীর্বাদে, তপস্যা পরবর্তী তিরিশটি অমাবস্যা পর্যন্ত তার জীবনে কালযাদুর শক্তি হয়ে উঠলো অমোঘ ফলবতী ! ডিং বুঝতে পারে এই তিরিশটি অমাবস‍্যাই তার জীবনের ধারাল হাতিয়ার! কন্টকাকীর্ণ পথ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে, সুপরিকল্পিত ভাবে ছেঁটে সুখের পুস্পরথ চালনার দায়ভার নিজের বলিষ্ঠ কাঁধে তুলে নিতে হবে ! জমজ হওয়া সত্ত্বেও জীবনের কয়েকটা ক্ষণ তাকে পরাজিত করেছিল। মার্সের জন্মের কয়েক সেকেন্ড পর জন্ম হয়েছিল ডিং এর। আর তাই আজ রোমান সম্রাট মার্স আপন আধিপত্যে বলশালী! ক্ষণকে আপন হাতের মুঠোর মধ্যে বন্দী করে স্বঘোষিত সম্রাট হয়ে মার্সের মুকুট ছিনিয়ে নিতে তৈরী ভাবি রোমান সম্রাট ডিং। প্রথমেই ডিং শ্বেতকায়া অ্যাপোলো মন্দিরকে কালোযাদুর বশবর্তী করে কালো মন্দিরে রূপান্তরিত করে আরেস আর তার প্রিয় পোষ‍্যের অধিষ্ঠান সম্পন্ন করে। অ্যাপোলো আর তার অধীন পোষ‍্য পাইথনকে গ্রীসের দক্ষিণ পেলোপনেশিয়ার সমুদ্র তলদেশে নিমজ্জিত রাখে। সতর্ক পাহাড়ায় রাখে কিছু হিংস্র শিকারী কুকুর।



ডিং আর মার্স জমজ হওয়ার কারণে দুজনের প্রাণ স্পন্দন একে অপরের পরিপূরক ছিল। তাই ডিং কখনও মার্সকে আঘাত করেনি, বা প্রাণে মেরে ফেলবার কথা চিন্তাও করেনি। সেই কারণে অ্যাপোলো উপাসক রোমান সম্রাট মার্সকে আরেস মন্দিরের প্রধান পেডিম‍্যান্টের ঠিক উপরে গাঁথা বল্লম থেকে নেমে আসা একটা শিকলে আবদ্ধ করে রেখেছে দু যুগ পেরিয়ে গেছে। প্রতি মাসের একটি নিরঙ্কুশ অন্ধকার রাতে গোটা শহরে চলে বেড়ায় নেকড়ের ছায়া, শুরু হয় নিধনযজ্ঞ! রক্ত লোলুপ দীর্ঘ জিহ্বা থেকে ঝরে পড়া টাটকা রক্তে ডিং তার কালোযাদু বলে ফুটিয়ে তোলে নারকীয় চিত্র সম্বলিত যাদু পুস্তক যার ঠিক ডানদিকে রাখা আছে সুবিশাল এক বিষপাত্র ! কিন্তু প্রতি অমাবস‍্যায় নেকড়ের নীলকান্ত মণি থেকে নীলহলাহল নিস্কাশনের দ্বার উন্মুক্ত করতে চাই একজন পবিত্র প্রাণের! যে এই পুস্তক পাঠ করবে শেষ পর্যন্ত আর ধীরে ধীরে বিষপাত্র উপছে ছড়িয়ে পড়বে গোটা শহর ব‍্যাপী, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে সম্রাট মার্সের অগনিত প্রজাকুল, নির্বাপিত হবে অ্যাপোলোর জ্ঞানের আলো! জন্ম হবে অগনিত আরেস উপাসকের, শয়তানের উপাসকের! সমস্ত দিক ভেবে এই পুস্তকের নামকরণ করলেন ' দ‍্য পাভলোপেত্রি' !



অমাবস্যার রাতে নেকড়ে মূর্তির কপাল থেকে বের হওয়া নীল দ‍্যুতির তেজদীপ্তীতে জোর করে অভুক্ত মার্সের মৃত‍্যুকে ঠেকিয়ে রাখে, কারণ সম্রাটের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই ডিং এর জীবনের স্পন্দনও থেমে যাবে! মার্সের সামনে একটা কালো বেদীর উপর রাখা ডিং সৃষ্ট বিরাটকায় পুস্তক 'দ‍্য পাভলোপেত্রি'! অ্যাপোলো উপাসক সহোদর মার্সই সেই পবিত্রপ্রাণ পুরুষ, তাই তাকেই অমাবস্যার রাতগুলোতে পাঠ করতে বাধ্য করা হয় ' দ‍্য পাভলোপেত্রি' ! প্রতিবার পাঠ শেষে পুস্তকের চিত্রের ডানদিকে রাখা বিরাট বিষ পাত্র একটু করে পূর্ণ হতে থাকে আর শহর একটু একটু করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে !


নিশ্ছিদ্র তমসাবৃত রাত, গ্রিক দেবতা অ্যাপোলোর জমজ সহোদরা বনদেবী, চিরহরিৎ কুমারী আর্টেমিস তার বিশ্বাসী হলুদ ঈগলকে পাঠাল ভবিষ্যত বক্তা অ্যাপোলোর বিচরণ ক্ষেত্র পাভলোপেত্রি শহরে। হলুদ ঈগল কর্কশ স্বরে রাতের নৈশব্দ বিদীর্ণ করতে করতে উড়ে এসে বসল ঠিক মন্দিরের প্রধান পেডিম‍্যান্টের উপরে গাঁথা বল্লমটার উপরে! আজ তিরিশ অমাবস্যার শেষ অমাবস্যার রাত! ডিং এর অঙ্গুলি হেলনে সম্রাট মার্সকে পূর্ণ দিন পিপাসার্ত রেখে, বাধ্য করা হচ্ছে সম্পূর্ণ পুস্তক পাঠ সমাপন করার জন্য। সম্রাট মার্সও বিরামহীন পুস্তক পড়ে চলেছেন! নিকষ কালো রাতে, মার্সের গমগমে স্বরে পুস্তক পাঠে জীবিত বা মৃত আত্মা আরষ্ঠ হয়ে থমকে গেছে কালের নিয়ম লঙ্ঘন করে! চিত্রে বিষপাত্র উপছে পড়তে লেগেছে! হঠাৎ সম্রাট পাঠ থামিয়ে নিমেষে সম্পূর্ণ বিষপাত্র নিঃশেষ করে, পিপাসার্ত হৃদয়ের পরিতৃপ্তিতে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে মৃত‍্যুকে বেছে নিলেন! সম্রাট মার্স বুঝেছিলেন তাঁর নিজের জীবিত থাকা ততটা আবশ্যক নয়, যতটা ডিং এর মৃত্যু! সঙ্গে সঙ্গে কালো মন্দিরের প্রধান পেডিম‍্যান্টের উপরে গেঁথে থাকা বল্লম প্রবল ভাবে নড়ে উঠল হলুদ ঈগলের আসমুদ্রব‍্যপ্ত ডানাদ্বয়ের অস্বাভাবিক আলোড়নে! বল্লমের সঙ্গে যুক্ত বিরাট শিকল সহ সম্রাট মার্স ধীরে ধীরে কালের গর্ভে তলিয়ে গেলেন সঙ্গে আরেসের মন্দির আর নেকড়ের ভয়ংকর মূর্তি সহ ডিং ! অদৃশ‍্য হল হিংসার পরাকাষ্ঠা শিকারী কুকুরের দল! মুক্ত হলেন গ্রিক দেব অ্যাপোলো, তাঁরই নির্দেশে সমগ্র 'পাভলোপেত্রি' শহরকে আপন গর্ভে স্থান করে দিল দক্ষিণ পেলোপনেশিয়ার সমুদ্র তলদেশ! অ্যাপোলোর পোষ‍্য পাইথন তার সুবিশাল দেহাধারের পূর্ণ বেষ্টনীতে ঘিরে ধরলো সম্পূর্ণ শহরকে! সুরক্ষিত রাখল বর্হিবিশ্ব থেকে! জ্বলে উঠল তার চোখের আহ্লাদী চুনির জীবনী শক্তি! পাভলোপেত্রি আজ দীপান্বিতা…….







নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮