• রাহুল দেব লাহিড়ী

গল্প - পুরুষ ও প্রকৃতি





কি যে আনন্দ হচ্ছে আজ পৃথার। সকাল হতেই দেখে ট্রেনটা ফাঁকা ফাঁকা হয়ে গেল। এবার মাল জংশনের দিকে যাবে। কি মজা! তাড়াতাড়ি ব্রাশ করে নেয় পৃথা। এসেই জানলার ধারে বসেছে। একবার ঠেলা দিয়ে তোলার চেষ্টা করে অনিকেত কে- এই অনি, ওঠো। সকাল হয়ে গেছে তো! বেচারা পাশ ফিরে ঘুমোচ্ছে অঘোরে। ঘুমোক। ভাবে পৃথা। কাজের চাপে এই আরামে ঘুমোনোর সময় কোথায় তাদের! চাদরটা অনিকেতের গায়ে টেনে দেয়। তারপর অজান্তেই একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে তার। বাইরে হেঁকে যাওয়া চা ওয়ালার কাছে ডেকে চা খায়। সেই লাল চা, তার মধ্যে লেবু আর হজমলা গুঁড়ো। আহা। চুমুক দিতেই এক লহমায় পিছিয়ে যায় সাতটা বছর।

বিয়ের পর এই প্রথম অনিকেতের সাথে বাইরে বেরোনো পৃথার। বিয়ের দুই বছর পর। বেচারা মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ বরটা! ছুটিই পায়না। সারাবছর তার শুধু ছোটাছুটি আছে, ছুটি নেই। রাত জেগে ভুরু কুঁচকে সিগারেট পুড়িয়ে কানে হেডফোন গুঁজে কাজ, আর বেলা অবধি ঘুম। মায়া, বড় মায়া হয় পৃথার আজকাল মানুষটার জন্য। ছত্রিশ বছরের কাঁধটা চৌষট্টি পাউন্ডের চাপ নিয়ে বেড়ায় চব্বিশ ঘন্টা। পৃথা যখন রেডি হয়ে স্কুলে বেরিয়ে যায়, অনিকেত তখনও গভীর ঘুমে। একটা প্রাইভেট স্কুলে পড়ায় সে।

অনিকেত আর পৃথার ভালোবাসার বিয়ে। সমবয়েসী আর একই ক্লাসে একসাথে পড়া দুজনে দুজনকে মাস্টার ডিগ্রি করতে আসার সময় থেকে চেনে। আজকাল মাঝে মাঝেই পৃথার সেই নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির শালবনে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে হয়। অনিকেতের হাতে হাত ধরে চলা সেই দিনগুলো মনে পড়ে। শেষ বিকেল তখন। শিলিগুড়িতে এত গাড়ি-ঘোড়া, বড় বড় বিল্ডিং নেই। বেশ একটা ঢিলেঢালা পরিবেশ ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের। একটা ভালোলাগা আর প্রশ্রয় ছিল চারদিকের হাওয়ায়। নাকি, কে জানে। পৃথার মনের ভুলও হতে পারে। লাল হয়ে আসছে চারদিক। সূর্য অস্ত যাচ্ছে তখন। অনিকেত আর পৃথা হাত ধরাধরি করে বসে আছে-কারো মুখে কথা নেই। পৃথার বাড়ি এই উত্তরবঙ্গেই। জলপাইগুড়ি। অনিকেতের কলকাতা। বেহালায় চার পুরুষের বাসিন্দা ওরা। এখন একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে সে আর অনিকেত থাকে জোকায়। অনিকেতের বাবা আর মা বেঁচে নেই কেউই। এক দিদি বিয়ে হয়ে বিদেশে থাকে। পৃথার মা জলপাইগুড়ির বাড়িতে থাকেন পৃথার দাদার কাছে। ফেরার সময় বাবা মায়ের কাছে একবার যাবার ইচ্ছে রয়েছে পৃথার। অনিকেতকে বলতে সাহস পায়নি। তিন দিনের ছুটি কোনোমতে ম্যানেজ করে ডুয়ার্স ঘুরতে যাচ্ছে দুজনে। জায়গাটার নাম রকি আইল্যান্ড। কি রোমান্টিক নাম। পৃথার মনটা ভালো হয়ে যায়। কলেজ থেকে একবার পিকনিকে গিয়েছিল, বহুদিন আগে। একটা লোহার ব্রিজ। তলা দিয়ে ঝর্ণা। কি যে ভালো লেগেছিল জায়গাটা! চারিদিকে উঁচু পাহাড় আর সবুজ গাছপালা। তিরতির করে বয়ে যাওয়া পরিষ্কার জল। আবার যাচ্ছে পৃথা সেখানে।

নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে ট্রেন ছেড়েছে এবার। একছুট্টে শিলিগুড়ি জংশন। তারপর থেকে ট্রেনটা যেন একটু নিজের মত চলা শুরু করে। এতক্ষন কেউ যেন তাকে বারবার বলেছে সময়ে পৌঁছতে হবে, শিগগির চলো। শিলিগুড়ি জংশনে থামতেই কয়েকজন যাত্রী হুড়মুড় করে ট্রেন থেকে নেমে প্লাটফর্ম ধরে হনহন করে হাঁটা দিলেন। সব্বার খুব তাড়া। তারপরই সেই কাণ্ডটা শুরু হল। ট্রেনের ড্রাইভার এবার ফ্লাস্কের থেকে চা ঢেলে কাপে নিয়ে যুত করে ইঞ্জিনের জানলার কাছে বসলেন বোধ হয়। ট্রেন নিজের মর্জিতে এবারে চলা শুরু করল। গতি হয়ে গেল মন্থর। কিন্তু অদ্ভুত একটা সর্পিল চলন, আর ছন্দময়। পৃথা এসে দরজায় দাঁড়ায়। মুখে ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা লাগে। মার্চের মাঝামাঝি। কলকাতার প্যাচপেচে গরম উধাও। হাওয়ায় একটা শিরশিরানি টের পাওয়া যায়। খুব ভালো লাগে পৃথার। শিলিগুড়ি জংশন থেকে বাগড়াকোট অবধি সারাটা রাস্তায় ট্রেনটা বাবার হাত ধরা ছোট বাচ্চার মত এঁকে বেঁকে এগোতে থাকে। কখনো ডাইনে, কখনো বাঁয়ে। যেতে যেতে আবার বাচ্চাদের মত মাঝে মাঝে লাফাচ্ছিল। সে লাফ টের পাওয়া যায় দরজায় দাঁড়ালেই। শিরদাঁড়ার পেছনটা দিয়ে ঠান্ডা জল নেমে যায়। অদ্ভুত অনুভূতি। হঠাৎ পেছন থেকে একজোড়া হাত পৃথার কোমর বেষ্টন করে ধরেছে। চমকে উঠেই সামলে নেয় সে। এই স্পর্শ তার খুব চেনা-খুব প্রিয়। জড়িয়ে থাকা হাতের ওপর আলতো করে হাত রেখে পৃথা। একটা হাত ছেড়ে দরজার দিকে ঘেঁষে আসে। মুখে কিছু বলেনা। হাতের স্পর্শে যেন বুঝিয়ে দেয়- পাশে থেকো। অনিকেতের সদ্য ওঠা ফোলা চোখেমুখে আলস্য জড়িয়ে আছে দেখে সে। পাশে পাশে কিছুক্ষণ ন্যারো গেজের রেল লাইনটা চলে, তারপর সেবক থেকে সেটা ঘুরে যায় ঘুমের দিকে।

এই সেবকের ক্রসিং টা পার হলেই আসল মজা শুরু। একের পর এক ব্রিজ। আবার ট্রেনের দুলুনি। এবার বেশ জোরে জোরে। দুটো টানেল। দুজনে ট্রেনের হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। কয়েক মুহূর্তের অন্ধকার গ্রাস করে ট্রেনটাকে। গিলে নিয়েই আবার উগরে দেয়। গা ছমছম। এরপর সেবক স্টেশন পুরোনো প্রেমিকার মত বিদায় জানায় হাত নেড়ে। এগিয়ে আসে ডামডিম। সবচেয়ে রোমান্টিক নামের স্টেশন। ট্রেন এখান দিয়ে এগোলেই অবিকল ডাম-ডিম, ডাম-ডিম আওয়াজ হয়। কান পেতে শুনতে হয় আওয়াজটা। ট্রেনের চাকা থেকে শুরু হয়ে এই ডামডিম আওয়াজ পৌঁছয় জঙ্গল তক। সদ্যতরুণ গাছের পাতা শিউরে উঠছে আনন্দে। ডামডিম পেরোলেই নিউ মাল জংশন। একেবারেই সাদামাটা আর ছিমছাম। একটুও নোংরা নেই চারপাশে। সাজানো গোছানো ধোয়া মোছা চকচকে স্টেশন। ট্রেন থামতেই নেমে পড়ে দুজনে। তারপর সদ্যবিবাহিত দম্পতির মত হাত ধরাধরি করে এগিয়ে যায়। চলো, গাড়িতে ওঠো। রামসিং গাড়ি নিকালো, সামসিং যানা হ্যায়। ড্রাইভারের নাম অবশ্য রামসিং নয়, অশোক। বাঙ্গালী হাসিখুশি তরুণ। আগে থাকতেই তার সাথে যোগাযোগ করেছে অনিকেত। গাঢ় সবুজ রঙের মারুতি ওমনি ভ্যান এগিয়ে চলে সামসিং এর রাস্তায়।

হোলির ছুটিতে ঢিলেঢালা ভাব সর্বত্র। গাড়ি মেটেলি বস্তি পার হওয়ার সময় অশোক সতর্ক করে- গাড়ির কাঁচ তুলে দিন। যে কোনো মুহূর্তে বাচ্চারা রং ছুঁড়ে মারতে পারে। অবুঝ বাচ্চার মত জেদ করে পৃথা। কাঁচ তোলেনা কিছুতেই। দীর্ঘদিন পর তার শহুরে চোখ সবুজ দেখে আনন্দ পেয়েছে। মনের প্রশান্তি বুঝি নষ্ট হবে কাঁচ তুললেই। চোখেমুখে মুগ্ধতা নিয়ে আশেপাশের সৌন্দর্য শুষে চলে অবিরাম। অনিকেত আর অশোকের স্মিত হাসিতে চোখাচুখি- প্রশ্রয়ের আভাস যেন। একবার একদল তরুণী ছুটে যায় খিলখিল করে হাসতে হাসতে। পেছনে দুজন তরুণ তারা করেছে তাদের রং নিয়ে। আজ হোলি। মাঝে মাঝে 'হোলি হ্যায়' আওয়াজ আর ডিজের ধক ধক শব্দ টের পাওয়া যায় কান পাতলেই। বেলা দেড়টা বাজে। গাড়ি সামসিং চা বাগান পার করে লালিগরাস এর দিকে এগোয়। চারিদিকে সবুজ চা বাগানের ঢাল। সবুজের গালিচা উঠে গেছে যেন। তার মাঝে মাঝে স্কুলের বাচ্চার অভিভাবকের মত ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা শেড ট্রি। ঠিক দুটো পনেরো। গাড়ি লোহার ব্রিজ পার করে ডানদিকে হোটেলের গেটে এসে দাঁড়িয়েছে।

কিছু কিছু জায়গা আছে গেলে মনে হয় তুমি কোনো না কোনোভাবে এই জায়গাটায় সম্পর্কিত। রাস্তায় হাঁটলে মনে হয় কতবার হেঁটেছি এই রাস্তায়। একেকটা ফুল, পাখি, ঝর্ণা এমনকি কাছাকাছি মানুষকেও খুব কাছের মনে হয়। এমনিতেই শহুরে জীবন পৃথার অপছন্দের। এসব জায়গায় গেলে আরো বেশি করে মনে হয় আমার কোনো গাঁট আছে এখানে গভীরে গোপনে। যেন সেই স্কুল জীবনের উচ্ছল তরুণী ফিরে এসেছে নিজের জায়গায়। বয়েস বাড়েনি তার।

ব্যাগ রেখে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে লাঞ্চ এর কথা বলেই একটু চা খেয়ে হাঁটতে বেড়িয়েছে দুজনে। দুটো পাখি। বাঁদিকের ঢালের গায়ে বড় গাছটার ডালে বসা। গায়ে আকাশি রং। ল্যাজগুলো লাল। ঝোলা। গায়ে লাল খয়েরি ডোরাকাটা দাগ। দুটোয় পুরোনো ঝগড়া শুরু করেছে। একজন বলছে টিনা, টিনা। আরেকজন উত্তর দিচ্ছে তাই তাই? বোধ হয় কোনো যুবতীর বেভুলে চরিত্র হননের গল্প শোনাচ্ছিল। তারপর রীতিমত সওয়াল জবাব শুরু হল। একজন বলল, সত্যি সত্যি সত্যি। তিনসত্যি দিল বুঝি। আরেকজন বোধ হয় মহিলা। সে বলল না না নাঃ। এক ব্যাটা কালো রঙের মাতব্বর, অন্য একটা গাছে বসে দুজনের কথার মাঝখানে টুঁই টুঁই টুঁই টুঁ ই ই ই বলে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। তারপর একটা ঝিঁ ঝিঁ সর্দার কররর করে ডাক দিল। তার অনেক ভক্ত। তারা সমস্বরে সায় দিল ঝিঁ ই ই ই ই। তারা এটুকুই জানে। পাখি তিনটে কেমন যেন ঘাবরে গিয়ে টুহ্হঃ বলে আরেক জঙ্গলে উড়াল দিল। পৃথা হেসেই কুটিপাটি। অনেকক্ষণ ঘুরে বেড়ায় দুজনে হাত ধরাধরি করে। কালো পিচ রাস্তার ঢাল বেয়ে ওপরে ওঠে। তারপর নেমে আসে।

ঘরে ফিরে এসে বাইরে একটু বসেছে দুজনে। হা ক্লান্ত হেঁটে ফিরে। পৃথা অনিকেতের ডাকে চোখ তুলে তাকায় সামনে বয়ে চলা ঝর্ণার দিকে। দেখে, ঝর্ণার ওপারে একটা ভুলু কুকুর তরতর করে নিখুঁত দক্ষতায় নেমে এল। একটা পানকৌড়ি বসে ছিল সামনের পাথরটায়। কি বুঝলো কে জানে। সোজা ঝাঁপ দিল জলে। দুজনে হাঁ হাঁ করে উঠেছে। দেখে কিছুদূর গিয়ে আবার সেটা ভেসে উঠল। মুখে একটা মাছ! চকচকে। ওর বউ আরেকটা পাথরে বসে পাথুরে চোখে দেখছিল পুরো ঘটনাটা। এবার ডানা নাড়িয়ে ডানাতালি দিল ফট ফট ফটটাস। কুকুরটা অবাক হয়ে দেখছিল। পৃথাদের দিকে তাকালো এবার। তারপর টুকটুক করে পাথর বেয়ে ওপরে উঠে গেল।

দুপুরে খেয়েদেয়ে একঘুম দিয়ে উঠে এসে হোটেলের সামনের বাঁধানো চাতালটায় বসেছে দুজনে। সামনে টেবিলে বিকেলের চা। বেশ একটা ঢিলেঢালা ভাব চারিদিকে। হোলির রং লেগেছে যেন। এত সবুজ! সবুজের কত ভ্যারাইটি। হালকা সবুজ, গাঢ় সবুজ, কচি কলাপাতা সবুজ, কালচে সবুজ। একদিকে ঢালের নিচে অবিরল ঝর্ণার বয়ে যাওয়ার শব্দ। এদিকে আবার মেঘ ঘনিয়ে আসছিল। সূর্য মাঝে মাঝে উঁকিঝুঁকি দেয়ার চেষ্টা করছিল কয়েকবার। মেঘ ধমক দিয়ে আবার আড়াল করছিল তাকে। আওয়াজ হচ্ছিল ঘরর ঘরর গুমম। একদিকে সুউচ্চ সুবিশাল পুরুষালি পাহাড়। প্রেমিকার চান করা কাউকে দেখতে দেবেনা বলে বুঝি ঝর্ণা সুন্দরীকে আড়াল করেছে। সে আবার উদ্ভিন্ন যৌবনা, পাথরের গায়ে ধাক্কা দিয়ে শ্যাম্পেন-ফেনা জল ছিটিয়ে খিলখিল করে নেমে আসছিল। অত ধ্যান গম্ভীর প্রেমিকের সমস্ত নিষেধ আর ধমক অবহেলায় উড়িয়ে দিয়ে খিলখিল করে। মেঘ দেখা গেল ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নিয়েছে। সে পূব দিক থেকে ঝাঁজরি হাতে ভিজিয়ে দেবে বলে এগিয়ে এল। গাছে পাথরে জল পড়ছিল না ঠিকঠাক। বেশিরভাগ জলকণা হাওয়ায় উড়ে এসে ঝর্ণার সাথে মিশছিল। পাহাড় আরেকবার ভ্রুকুটি করে থাকবে বোধ হয়। এবার মেঘ বড় বড় ফোঁটা ফেলা শুরু করল। যেন বোঁদে ভাজা হচ্ছে তেলে ফেলে। শব্দ হচ্ছে অবিকল ঠক ঠক। ঝর্ণা কি খুশি। পাথরগুলো ভিজে গেল নিমেষে। গাছগুলো হঠাৎ কালার আর কন্ট্রাস্ট বাড়িয়ে দিয়ে গাঢ় সবুজ হয়ে উঠল। ঝকঝকে উজ্জ্বলতা চারিদিকে। দুজনে মুগ্ধ হয়ে দেখছে। ওপরের কোকাকোলা ছাতা এলোমেলো। এলোমেলো দুজন প্রেমিক অনেকটা কাছাকাছি সরে এসেছে অবাক হয়ে। তাদের শহুরে চোখে এই সৌন্দর্য অধরা ছিল এতকাল।এদিকে একটা কালো সাদা প্রজাপতি বেরোলো বৃষ্টি কতটা হয়েছে দেখতে। গাছের পাতাগুলোয় বসে বসে মেপে নিচ্ছিল কতটা ভিজেছে। একটা চিল বোধ হয় অনেকদিন চান করেনি। সে উড়ে উড়ে মেঘের তলায় চান করছে। পৃথা আর অনিকেত নিশ্চুপ হয়ে বসে। তাদের কথা ফুরিয়েছে।

তারপর সন্ধ্যা নেমে আসছিল নিঃশব্দে কিন্তু নিশ্চিন্তে। সে জানে তার এটাই পরিণতি। প্রতিদিন নামতে হবে গোধূলির চোখ চাপা দিয়ে। এটাই ভবিতব্য তার। ধীর পায়ে লাজুক কিশোরীর মত পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে এসে ঝর্ণায় মিশলো সন্ধ্যা। এবার দুজনের গল্প শুরু হল কলকল। ভাষা বোঝা যায়না। কিন্তু দুজনের হৃদ্যতা বোঝা যাচ্ছিল বেশ। ঝর্ণা সারা দিনের গল্প শোনালো অন্ধকারকে। কৌতূহলী কয়েকটা জোনাকি নেমে এল নিশ্চুপ। কয়েকটা জঙ্গল ধুঁঢ়ে অন্ধকারের খবর আনছিল। বাকিরা ঘুরে ঘুরে ঝর্ণার সাথে সন্ধ্যার আলাপ শুনতে মগ্ন। কারেন্ট চলে গেল। গোটা পাহাড় অন্ধকার। শুধু ঝর্ণার খিলখিল হাসির কয়েকটা দাঁত চোখে পড়ছিল। একটা জোনাকি খুব বোকা। পৃথার শহুরে মোবাইল এর মাথায় জ্বলা সবুজ আলো দেখে কি ভাবলো কে জানে। তার পাশে এসে বসলো। সে আর মোবাইল সরাতে সাহস পায়নি। গল্প করছে দুটোয়। আর একদল জোনাকি ঘোঁট পাকাচ্ছে ঈশান কোণে নির্জনতায়। টুপটাপ। চুপচাপ। নৈঃশব্দ্য ধীরে ধীরে গ্রাস করছিল সত্তা।

ফিরে আসার সময় তলপেট থেকে উঠে আসা ব্যথাটা টের পাচ্ছিল পৃথা। প্রতিমাসে এটা তার ভবিতব্য। অভ্যাস হয়ে গেছে তাই। কিন্তু এ মাসের টা অপ্রত্যাশিত। অনভিপ্রেত তো বটেই। গত তিনমাস ধরে পৃথা বিখ্যাত গাইনোকলজিস্ট ডা. বসুর চিকিৎসাধীন। এ মাসে পিরিয়ড এর দিন পেরিয়ে গেছে দিন পনেরো আগেই। অনিকেত কে জানায়নি। খুব খুশি ছিল মনে মনে। একটা চোরা ভয়ও ছিল। যদি কনসিভ না করতে পারে এবারও!

ব্যথায় মুখ কুঁচকে গেছে পৃথার। ঘরে ফিরেই তড়িঘড়ি হাতব্যাগটা নিয়ে বাথরুমে ঢোকে। টের পায়, অনিকেত ভুরু কুঁচকে দেখছে তাকে।

বাথরুম থেকে বেরোতেই রাগে আর ক্ষোভে ফেটে পড়ে অনিকেত। 'ডাক্তার কতবার বলেছেন একটু সাবধানে থাকতে? কয়েকটা দিন অপেক্ষা করা যেতনা? কি দরকার ছিল, এতদূর ঠেঙিয়ে আসার'? রাগে আর ক্ষোভে ফেটে পরে পৃথার প্রেমিক পুরুষ। তার চোখেমুখে রাগ আর বিরক্তি। পৃথার মনটা দুঃখে ভরে যায়। সেও কি চায়নি কনসিভ করতে! সব দোষ যেন তার। অনিকেত নিজেই তো প্ল্যান করে এসে পৃথাকে চমকে দিল। অনিকেত বলে চলে অবিরাম। ভদ্রতার মুখোশ ছেড়ে বেরিয়ে আসে। কুকথার ফুলঝুড়ি ছোটায়।

রাতের খাবার খায়না কেউই। মনটা খারাপ হয়ে গেছে দুজনের। অনিকেত একপাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে কখন যেন। পৃথার চোখে ঘুম আসেনা। হোটেলের ছেলেটাকে ডেকে কাঁচের বোতলে গরম জল দিতে বলে। তারপর অনিকেতের মাথার কাছে এসে বসে।

তারও পর। বাইরে বৃষ্টি নামে আবার। একদল ঝিঁঝি ক্লান্তিহীন ভাবে ডেকে চলে। ঘরের ভেতর পৃথার চোখেও বৃষ্টি নেমেছে তখন। মনের ভেতর হোলির সারাদিনের জমা রং গলে নামছে চোখ দিয়ে। পরম মমতায় সন্তান স্নেহে অনিকেতের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় সে। হায়রে অবুঝ পুরুষ! প্রকৃতিকে চিনলেনা আজও! বাইরে ঝর্ণার খিলখিল বয়ে চলার শব্দ পাওয়া যায় কান পাতলেই।

নীড়বাসনা  বৈশাখ ১৪২৯