• অপরাজিতা

গল্প - ভবিতব্য- the gamble




মহামারী এবং অতিমারী নিয়ে বেশ কিছু কালজয়ী লেখা ও সিনেমার সৃষ্টি হয়েছে। তারই কয়েকটি টুকরোর ছায়া অবলম্বনে রচিত এই কাল্পনিক কাহিনী। প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও নির্দেশকদের সাথে সাথে সদ্যপ্রয়াত ঁ সৌমিত্র চট্টপাধ্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি জানালাম এই গল্পটার মাধ্যমে। এই লেখাটির চরিত্র ও ঘটনা সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে কোনও মিল পেলে তা নিতান্তই কাকতালীয়।



প্রথম পর্ব


“আজি রজনীতে হয়েছে সময়/ এসেছি বাসবদত্তা”


সবে সন্ধ্যে হচ্ছে। শরতের মনকেমন করা শিরশিরে বাতাস বয়ে চলেছে একদা ব্যস্ত শহরের কারফিউ লাগা খালি রাস্তায়। হাল্কা কুয়াশার চাদরে শহরের উজ্জ্বল আলোগুলো ম্লান হয়ে আছে। রাস্তায় মাঝে মাঝে টহলরত পুলিশের গাড়ি ছাড়া আর কোনও জীবনের চিন্হ নেই। মহামারীর ভয়ে সারা শহরের জীবনযাত্রা স্তব্ধ হয়ে গেছে। এমনি এক সন্ধ্যায় শহরের শুন্শান্ রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেন স্বামী শুদ্ধানন্দ। আশ্রমের সবাই তাঁকে বলেছিল ভোর হওয়া অবধি অপেক্ষা করতে। কিন্তু তিনি তা মানেন নি।


সন্ধ্যার উপাসনার ঠিক আগে তাঁর মোবাইলে চোখ বোলাতে গিয়ে দেখলেন সেখানে দশটা মিসড কল আর পাঁচটা মেসেজ। অনামিকা তাঁর সাহায্য চেয়েছে!

তাঁর মনে পড়ে যায়- পাঁচ বছর আগে heat stroke-এ অচৈতন্য পথহারানো সন্ন্যাসীকে উদ্ধার করে অনামিকা। সমাজের তথাকথিত এই “পতিতা” তখন শহরপ্রান্তের এক নির্জন ফার্ম হাউজ থেকে ফিরছিল। অচেতন সন্ন্যাসীকে হাসপাতালে ভর্তি করেই স্থির থাকেনি সে- প্রতিদিন খোঁজও নিয়েছে স্বামীজির। কিন্তু তারপরে আর কখনোও যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি সে। স্বামীজি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রসাদী ফুল এবং প্রসাদ পাঠিয়েছিলেন। সেটার ও প্রাপ্তি স্বীকার করেনি অনামিকা। তাই আজ বিকেলে অনামিকার মিস্ড কল দেখে অত্যন্ত আশ্চর্য হয়েছিলেন তিনি।


ইনবক্স খুলে মেসেজগুলো দেখেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে তাঁর কাছে। COVID-এ আক্রান্ত অনামিকা! কোঠির মাসি তাই তাকে বের করে দিয়েছে। ওদিকে কাছের হাসপাতালে বা safe home-এ কোন জায়গা নেই। তাই বাধ্য হয়ে অনামিকা স্বামীজির সাহায্য চেয়েছে।

মেসেজটা দেখেই স্বামীজি বেরিয়ে পড়েন কিছু না ভেবেই। আশ্রমের গাড়ি নিতে পারেন নি, তাই এক ভক্তকে অনুরোধ করে তার ভাড়া খাটানোর গাড়িটা ধার নিয়েছেন তিনি। অনামিকাকে ফোন করার চেষ্টা করেন- কিন্তু নাঃ- switched off! শেষ পাঠানো মেসেজ অনুসারে সে তার কোঠির কাছের সরকারি হাসপাতালের বাইরের lawn-এ বসে ছিল। সেই দিকেই ছুটে চলে স্বামীজির গাড়ি।

রাস্তায় পুলিশ- চেকপোস্ট সব পেরিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা পরে হাসপাতাল চত্বরে পৌঁছন স্বামীজি। অনামিকা তখন অন্ধকারে বেঞ্চে শুয়ে কাঁপছে। স্বামীজিকে দেখে উঠে বসার চেষ্টা করে সে।

“আপনি এসেছেন?”- কান্নায় বুজে আসে তার গলা।

“আসতে যে আমাকে হবেই। আমি তো অকৃতজ্ঞ নই।”

“না না, আপনি আমার কাছে আসবেন না। শুধু একটু থাকার ব্যাবস্থা করে দিন। আমি আপনাকে বিরক্ত করতাম না- আমার জীবন তেমন কিছু মূল্যবান ও নয়--” দ্বিধায় স্বর জড়িয়ে আসে।

এবারে অনামিকাকে ভালো করে দেখেন স্বামীজি। ওঃ- তাইজন্য এই আর্তি! নিজের জন্য নয়- অনাগত সন্তানের সুস্থতার কথা ভেবে মিনতি করছে এক পূর্ণগর্ভা নারী!

সেই রাতটা স্বামী শুদ্ধানন্দের জীবনের সবচেয়ে অসহায় রাত। বহু হাসপাতাল ঘুরে শহর ছাড়িয়ে highway-র ধারে এক বেসরকারি হাসপাতালে অ্যাডমিট করা গেল অনামিকাকে। ভোর রাতে প্রবল জ্বরে অচেতন অনামিকার সাথে নাড়ির বাঁধন কেটে পৃথিবীতে এল তার কন্যাসন্তান। আর সেই নাড়ির টান ছিন্ন হওয়ার সাথে সাথে জীবনের টান ভুলে অনন্তের পথে যাত্রা করলো অনামিকা।

Quarantine-এ থাকা স্বামীজি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে স্বাগতক্তি করলেন- “নিভৃত বাসের শেষে তোমার শেষ স্মৃতি, তোমার আত্মজার সব দায়িত্ব নেব আমি।”



দ্বিতীয় পর্ব

“She had never imagined that curiosity was one of the many masks of love”

বছর পনেরো কেটে গেছে।

ঘড়িতে তখন ঠিক সকাল ৮:৩০। প্রণয় তাদের নতুন মুদিখানার দোকানের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে এটা সেটা নাড়তে থাকে। এখুনি আশ্রম থেকে বেরিয়ে আসবে অস্মি- স্কুলের ব্যাগ নিয়ে দোকানের সামনে দিয়ে চলে যাবে। গত কয়েকমাস ধরে প্রণয় এই যাওয়াটুকুর জন্য অপেক্ষা করে। অস্মি ফিরেও তাকায় না। রোজ প্রণয় ভাবে, আজ হয়ত বা এক মুহূর্তের জন্য দোকানের দিকে তাকাবে সে- কিন্তু না! অস্মি স্কুলে চলে যায় কোনোদিকে না তাকিয়ে।


তারপরে প্রণয় ও স্কুলে যায়- ১০টা নাগাদ। সারাদিনের ব্যাস্ততায়, বন্ধুদের আড্ডায়, বিকেলের খেলায় হঠাৎ করে অস্মির মুখটা মনে পড়ে। আর তখন ই ক্ষণিকের জন্য থমকে যায় সে; পেটটায় মোচড় দিয়ে ওঠে তীব্র ব্যাথা, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। আবার পরক্ষণেই সব স্বাভাবিক। রাতে ডায়েরির পাতায় অস্মিকে চিঠি লেখে সে- সারাদিনের ছোট ছোট মনে পড়ার বিবরণ দিয়ে।

এমনি করে কতদিন চলত কে জানে। বাদ সাধল অস্মির Board Exams। পরীক্ষার তিন মাস আগে থেকে নিয়মিত ক্লাস বন্ধ হয়ে গেল। প্রণয় ছটফট করতে থাকে। ডায়েরিটা ১০০ পাতার বেশী আবেগ নিয়ে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি হয়ে আছে। এমনসময় একদিন দুপুরে দোকানে ফোন এল। আশ্রমে কিছু খাদ্য সামগ্রী তখুনি চাই। কর্মচারীরা সবে খেতে বসেছে। প্রণয় তখন নিজেই জিনিসগুলো নিয়ে যায়। সঙ্গে নিয়ে যায় তার সাধের ডায়েরি। তা ভাগ্যদেবী সেদিন সদয় ছিলেন- আশ্রমের ভাঁড়ারে একা ছিল অস্মি। সেই প্রথম এত কাছ থেকে ওকে দেখল প্রণয়। ঘোরের মধ্যে জিনিসগুলো বুঝিয়ে দিল অস্মিকে। তারপরে সমস্ত সাহস সঞ্চয় করে ডায়েরিটা বের করে তাকের উপরে আলতো হাতে রাখল।


“একটু সময় করে এটা পড়ো please!”

“কি ওটা?” – অবাক হয়ে তাকায় অস্মি।

“কিছু কথা- যা তোমার জানা দরকার”- এক নিঃশ্বাসে বলে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে যায় প্রণয়।

অস্মি ডায়েরিটা তুলে নিজের ঘরে নিয়ে যায়। তার জন্মরহস্য কিছুদিন আগেই সে জেনেছে- কিভাবে স্বামীজি অতিমারীর কালে তাকে আশ্রয় দিয়েছেন সে কাহিনীও তার জানা। “আরও কত গল্প আছে আমার জীবনে”- এই ভেবে ডায়েরিটা সযত্নে লুকিয়ে রাখে। সামনেই পরীক্ষা- তার আগে কোনো চিত্তবিক্ষেপ চাই না তার।

মাস দেড়েক কেটে যায়। খুব ভালভাবে পরীক্ষা শেষ হয় অস্মির। শেষ পরীক্ষার পরে দরজা বন্ধ করে ডায়েরিটা খোলে সে। দুই ঘণ্টা পরে যখন বাইরে বেরোয় তখন সম্পূর্ণ অন্য অস্মি সে।

সেই রাতে কাঁপা হাতে প্রথম প্রেমপত্র লেখে অস্মি।

ওদিকে কোন উত্তর না পেয়ে প্রণয় তখন ধৈর্যের শেষ সীমায়। তখনি এক সকালে দোকানে আসে অস্মি।

“আরে, কেমন আছ? পরীক্ষা কেমন হল?”- স্বাভাবিক কথোপকথনের চেষ্টা করে প্রণয়।

“ভালো। আমাকে একটা বড় খাতা আর একটা পেন দিন।“

জিনিসগুলো নিয়ে দাম দেওয়ার জন্য টাকা বের করে সে। নোটের সাথে ভাঁজ করা চিঠিটাও দেয়।

“আগামী সপ্তাহে আমার আরও খাতা লাগবে”- বলে মুচ্কি হেসে চলে যায় অস্মি।

চিঠির আদানপ্রদানের সাথে গোপনে দেখা করা শুরু হয় দুজনের। ভালো রেজাল্ট করে কলেজে ভর্তি হয় অস্মি। প্রণয়ের কলেজও কাছেই। তাই কখনো অফ পিরিয়ডে, কখনো ক্লাস পালিয়ে একে অপরের সান্নিধ্য উপভোগ করে ওরা। একদিন প্রণয় একটা ছোট্ট চিঠি পাঠায়- “আমার সাথে সারাজীবন কাটাবে?”

খুশি হয়ে উত্তর দেয় অস্মি- “কাটাবো- যদি আমাকে কখনো বেগুন খেতে না বল।”


ভালই কাটছিল ওদের দিনগুলো – বাদ সাধল নিয়তি। খাতা থেকে অনবধানে পড়ে যাওয়া চিঠি দেখতে পান স্বামী শুদ্ধানন্দ। চিঠি পড়েই বুঝতে পারেন মেয়ের অন্যমনস্কতার কারণ। সেই রাতে সবাই শুতে গেলে অস্মিকে লাইব্রেরীতে ডেকে পাঠান স্বামীজি।

“সুমি, আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না মা, কোন জীবন তুই চাস। কখনো মনে হয়েছে তুই প্রব্রজ্যা নিবি, আবার কখনো ভেবেছি তুই গার্হস্থ্যে সুখী হবি। আজ আমি নিশ্চিত যে তুই সংসার ধর্ম পালন করতে চাস। তাই তোর বিয়ের ব্যাবস্থা করছি আমি।“

অজানা আশঙ্কায় চুপ করে থাকে অস্মি।

“কাল ভোরে তোকে আমাদের আশ্রমের প্রধান শাখায় পাঠিয়ে দেব। একমাস তৈরি হয়ে নে, এক মাস পরে তোর বিয়ে দেব।“

“কিন্তু-“

“কোন কিন্তু নয় সুমি, তোর মাকে কথা দিয়েছি আমি। তোর জন্মকাহিনী জেনেও যে উদারমনস্ক শিক্ষিত যুবক এবং তার পরিবার তোকে সসম্মানে গ্রহণ করবে, তেমন একজনের সাথেই বিয়ে হবে তোর। যা এখন- অনেক রাত হল, শুয়ে পড়।”

হতভম্ব অস্মি ধীর পায়ে ফিরে যায় নিজের ঘরে। চোখের জলে বালিশ ভিজিয়ে ঘুমিয়েও পড়ে এক সময়।

একমাস পরে ডাঃ অশোক গুপ্তের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় সে।




তৃতীয় পর্ব


“আমি ডাক্তার – সমাজের প্রতি আমার একটা কর্তব্য নেই?”

বিয়ের পরে অস্মি তার ছোটবেলার শহর ছেড়ে চলে যায় দূরের এক ছোট্ট পাহাড়ি উপত্যকা শহরে। সাথে নিয়ে যায় একরাশ স্মৃতি, প্রণয়ের ডায়েরি আর বিদায়কালে তার কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রণয়ের চিঠি- “অপেক্ষা করব।”

ডাঃ অশোক গুপ্ত মানুষটা খুবই স্থিতধী। তাই নববিবাহিতা কিশোরী স্ত্রীকে সময় দেন পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য। ধীরে ধীরে পরিণত যুবতী হয়ে ওঠে অস্মি। ডাঃ গুপ্ত তার মনে সশ্রদ্ধ ভালোবাসার জায়গা করে নেন। সুগৃহিণী অস্মি সুখেই সংসারধর্ম পালন করে। শুধু মাঝে মাঝে কোন উদাস দুপুরে বা বিষণ্ণ সন্ধ্যায় জানলা দিয়ে কঠিন পাহাড়টার দিকে তাকিয়ে মনটা কেমন করে ওঠে। প্রণয়ের মুখটা হঠাৎ মনে পড়ে যায়- কিশোরীর প্রেম- সেটা সত্যি ই প্রেম ছিল নাকি মোহময় ভাললাগা?

এক মায়াময় গোধূলিতে বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে স্বামীকে প্রশ্ন করে অস্মি- “তুমি আজকাল এত আনমনা থাকো কেন?”

“আসলে একটা ব্যাপারে খুব চিন্তায় পড়ে গেছি। চার পাঁচ দিন ধরে রোজ প্রায় ২০-২৫টা একই ধরণের রুগী দেখছি। এটা ভালো লাগছে না। সবাইকার জ্বর এবং শ্বাসকষ্ট, সবাই কিছুদিন আগে বড় শহর থেকে ঘুরে এসেছে- নাঃ- সবটা কাকতালীয় হতে পারে না।“

“তুমি বেশী ভাবছ। শীতের শুরুতে এরকম হতেই পারে।“

“না গো, আমি দেখছি, যেখানেই বড় জমায়েত হচ্ছে, সেখান থেকেই রোগটা ছড়াচ্ছে।“

“তো তুমি ভালো করে একটা article লেখো আর আজকের বার্তায় পাঠিয়ে দাও। ওরা তোমার মতামতকে গুরুত্ব দেয়।“

“সেটা তো জানি। কিন্তু সামনেই শীতের মেলা, অনেক লোক আসবে, প্রচুর বেচা কেনা হবে। আমার আশঙ্কা সত্যি হলে অনেক লোক মারা যাবে। আবার আমার যদি রজ্জুতে সর্প ভ্রম হয়ে থাকে তাহলে প্রচুর লোকসান হবে। দুটোর কোনটাই কাম্য নয়।“

“হুঁ- বুঝলাম। কিন্তু সন্ধ্যে হতে চলল, চা খেয়ে চটপট হাসপাতাল থেকে ঘুরে এস। রাতে পরোটা আর কষা মাংস করতে বলেছি। তুমি আর দেরি করোনা- পাহাড়ে ঝপ করে সূর্য ডুবে যাবে আর ঠাণ্ডা পড়ে যাবে। “

“হ্যাঁ- যাই…” একরাশ চিন্তা নিয়ে বেরিয়ে যান ডাঃ গুপ্ত তার evening round সারতে।

সপ্তাহ দুয়েক পরের কথা। ব্যাস্ত ডাঃ গুপ্ত লাঞ্চ করতে বাড়িতে আসেন। কয়েকদিন ধরেই অস্মি ওনার পরিবর্তন দেখছিল। আউট হাউজের সাথে লাগানো বাথ্রুমে জামা কাপড় ছেড়ে ঘরে ঢুকছেন উনি। বাড়িতে sanitizer আর handwash-এর ছড়াছড়ি। বাড়ির কাজের লোকেদের বাইরে যাওয়া মানা, ঘরে সব জিনিস আনানো হচ্ছে।

একদিন নিজে থেকেই অস্মিকে বললেন- “আমার আশঙ্কাই বোধহয় সত্যি হচ্ছে গো। আমি একদম sure যে এটা একটা নতুন virus, যা খুব সহজেই human to human transmitted হতে পারে। তৃতীয় বিশ্বের কিছু দেশে বিছিন্ন ভাবে রোগটা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এখন এটা না রুখলে শীগগির এটা মহামারী বা অতিমারীর আকার ধারন করতে পারে।”

“তা তুমি আজকের বার্তায় লেখো না!”

“লেখা পাঠিয়েছিলাম- মেলার আগে ওরা ছাপবে না বলে দিয়েছে।“ দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেন ডাঃ গুপ্ত। একটু চুপ করে থেকে বলেন- “ একটা কথা বলি অস্মি? তুমি বরং আশ্রমে গিয়ে থেকে এস কিছুদিন। এখানে পরিস্থিতি ঠিক হলে তোমায় নিয়ে আসব।“

“ তা আবার হয় নাকি? তোমাকে এর মধ্যে ছেড়ে আমি কোথাও যাব না। আর তুমি জানলে কি করে যে ওই শহরে এই রোগের প্রকোপ পড়েনি?”

“শোন- প্লীজ- যে আসছে তার কথা ভাবো। বড় শহরে চিকিৎসার সুবিধা অনেক বেশী।“

মৃদু হাসে অস্মি- “”আমি তো অতিমারীর সন্তান, তার মাঝেই জন্মেছি, মাতৃহারা হয়েও বেঁচে থেকেছি। ওতে আমি ভয় পাইনা। আর তুমি যেখানে থাকবে সেখানেই আমি শ্রেষ্ঠ চিকিৎসার সুবিধা পাব। তুমি ওই নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না। এই শহরের মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করো তুমি। তোমার নাটকের দলের সদস্যদের ডাকো। Awareness video বানিয়ে পোস্ট করো। আরও উপায় খোঁজো মানুষকে সাবধান করার।“

“ঠিক বলেছ, খুব ভালো আইডিয়া দিলে! মানুষের মাঝে সচেতনতা গড়তেই হবে।“

কিন্তু চেষ্টা শুরুর আগেই মেলা শুরু হয়। তার হাত ধরেই শুরু হয় আরেক মহামারী।



চতুর্থ পর্ব


“In order to get scared, all you have to do is come in contact with a rumour or the television or the internet.”

মহামারীর প্রকোপে অস্মি এখন গৃহবন্দী। ডাঃ গুপ্ত আজকাল রোজ বাড়ি ফেরেন না। আর ফিরলেও আলাদা ঘরে থাকেন।

অস্মির অলস দিনগুলো কাটতে চায় না। TV দেখে আর মোবাইল নিয়ে কতক্ষণ থাকা যায়? আর এগুলো খুললেই ভয় করে। যেভাবে দাবানলের মতন ছড়িয়ে পড়ছে রোগটা সেটা অত্যন্ত ভয়াবহ। আর মিডিয়ার ঘোরানো প্যাঁচানো অর্ধ সত্যের ঠেলায় সাধারণ মানুষ ভীত ও বিভ্রান্ত। আজ যদি সরকারি আদেশ আসে মাস্ক পরার দরকার নেই তো কাল বলা হয় মাস্ক পরা খুবই জরুরি। আর নানা তান্ত্রিক, হাতুড়ে, বাবারা তাদের নিজেদের রোগনিবারণ পদ্ধতি বা সামগ্রীর নির্লজ্জ বিজ্ঞাপণ দিয়ে চলে। এরই মাঝে মহামারী অতিমারীতে রুপান্তরিত হয়।

ডাঃ গুপ্তকে দূর থেকে লক্ষ্য করে অস্মি- দুশ্চিন্তায় আর কাজের চাপে শুকিয়ে যাচ্ছেন যেন। মধ্যরাতে চাপা গলায় অনেকক্ষণ ফোন করতেও শোনে সে- বুঝতে পারে কিছু গবেষণা নিয়ে কথা চলছে।

একদিন সন্ধ্যায় বারান্দার অপর প্রান্ত থেকে অস্মিকে ডাকেন ডাঃ গুপ্ত।

“শোনো- কয়েকদিন আমি বাড়ি ফিরব না। একা থাকতে পারবে তো তুমি?”

“হ্যাঁ- কাজের লোকেরা তো আছে সবাই। কিন্তু তুমি কোথায় যাচ্ছ?”- অস্মির গলায় আশঙ্কা।

“তোমাকে বেশ কিছু কথা বলা হয়নি। আমাদের হাসপাতালের microbiologist ডাঃ বীক্ষণ রুদ্রের নিজের একটা ল্যাব আছে। এই যে ভাইরাসটা মারণখেলায় মেতেছে, ওটাকে কিছুতেই cell culture-এ বৃদ্ধি করানো যাচ্ছিল না। সরকার এই গবেষণা বেসরকারি ল্যাবে নিষিদ্ধ করেছে। আমরা গোপনে ডাঃ রুদ্রের ল্যাবে কাজ চালিয়ে গেছি। আর সফলও হয়েছি।”

“এতো ভালো খবর। কিন্তু এখন তুমি নিভৃতবাসে যাচ্ছ কেন?”

“আমরা killed virus দিয়ে একটা vaccine–ও বানিয়েছি। কিন্তু আমাদের গবেষণা এখনও স্বীকৃত নয়। তাই নিজেদের ওপরে এটা প্রথমে টেস্ট করব।”

“সেকি! এটা তো বিপজ্জনক হতে পারে।“ চাপাস্বরে আর্তনাদ করে ওঠে অস্মি।

“বিশ্বাস রাখো আমার ওপর। মানুষগুলোকে বাঁচাতে হবে তো। দেখো, আমি সুস্থভাবে রোগের সমাধান নিয়ে তোমাদের কাছে ফিরে আসব।“

“অপেক্ষা করব”- শেষরাতের শিউলির মতন ভালোবাসা ঝরে পড়ে অস্মির কণ্ঠে।


পঞ্চম পর্ব


“ইহা কূটবাক্য (paradox) বলিয়া মনে হইতে পারে, কিন্তু পৃথিবীর জনসংখ্যা কমানোই মানুষকে বাঁচাইয়া রাখিবার একমাত্র উপায়।“

সপ্তাহ কয়েক একই রকম ভাবে কেটে যায়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে হই হই করে বেড়ে চলে সংক্রমণ। প্রথম বিশ্বেও রোগটা ছড়ায়- কিন্তু মূলতঃ non-Caucasian-দের মধ্যে।

সেদিন ছিল অমাবস্যার রাত। অস্মির শরীরটাও ঠিক জুত লাগছিল না। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছিল সে। মাঝরাতে কর্কশ landline-এর শব্দে ঘুমটা ভেঙে যায় তার। উঠে ফোনটা ধরার আগেই রিং বন্ধ হয়ে যায়। অস্মি চেয়ার টেনে ফোনের পাশেই বসে পড়ে। পরক্ষণেই আবার রিং হয়। কাঁপা হাতে ফোন ওঠায় অস্মি। অপরপ্রান্তে সুদূর আমেরিকা থেকে তার দেওরের ভয়ার্ত গলা শোনা যায়- “বৌদি- দাদাকে পাচ্ছি না, তাই তোমাকে অসময়ে বিরক্ত করলাম। আমি দাদাকে কয়েকটা ভিডিও পাঠিয়েছি ইমেইলে। এখানের সরকার আমার পিছনে পড়েছে- যে কোন মুহূর্তে আমাকে গ্রেফতার করবে। তুমি প্লীজ দাদাকে এখুনি দেখতে বলো…” আকস্মিক ভাবে কেটে যায় ফোনটা।

স্তম্ভিত অস্মি একটু ধাতস্থ হয়ে ডাঃ গুপ্তের মোবাইল নম্বর ডায়াল করে। অতিমারীর দীর্ঘ বিজ্ঞপ্তির পরে জানা যায় যে নম্বরটা আপাতত বন্ধ। অগত্যা ডাঃ রুদ্রের ল্যাবে ফোন করে অস্মি। ডাঃ গুপ্ত জেগেই ছিলেন। সব কথা মন দিয়ে শোনেন তিনি। অত্যন্ত বিচলিত হলেও তা প্রকাশ করেন না তার স্ত্রীর কাছে। শান্তস্বরে অস্মিকে ঘুমিয়ে পড়তে বলেন।

এরপরে ল্যাপটপ খুলে ভাইয়ের মেইল খোঁজেন। ইনবক্সে নেই! স্প্যামে খুঁজে পান অজানা আইডি থেকে attachment সহ বেশ কিছু মেইল। বিভিন্ন আইডি থেকে ভিডিও পাঠিয়েছে তার ভাই বীতশোক গুপ্ত।


কি ভয়ানক চক্রান্ত এই অতিমারী! প্রথম ভিডিওতে দেখা যায় প্রথম বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের গোপন বৈঠক। বিলীয়মান প্রাকৃতিক সম্পদ আর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা নিয়ে সবাই চিন্তিত। এরই মাঝে জন্ম নেয় সম্মিলিত সমাধান- ‘Mission Lullaby- put the third world to sleep.’ প্ল্যানটা সহজ- ল্যাবে তৈরি ভাইরাস ছড়িয়ে দেওয়া হবে তৃতীয় বিশ্বে।

পরের ভিডিওগুলো বীতশোকের কথা। Mission Lullaby-র ছক অনুযায়ী তৃতীয় বিশ্ব থেকে আসা চাকুরিরতদের সবেতন ছুটি দেওয়া হয়।নিজের দেশে ঘুরে আসতে উৎসাহ জানায় নিয়োগ কর্তারা। তারপরে airport-এর কিছু নির্দিষ্ট বদ্ধঘরে droplets দিয়ে সংক্রামিত করা হয় তাদের। এরপরে তারা নিজেদের দেশে গিয়ে রোগটা ছড়িয়ে দেয়।

বীতশোক ছুটি নিয়ে আসতে চাননি- আরও বহু ভিনদেশী অধিবাসীদের মতো। যখন তৃতীয় বিশ্ব রোগটা সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে- তখনই প্রথম বিশ্বের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকদের সংক্রামিত করা হয়। কিন্তু এই সংক্রমণের জন্য ব্যাবহ্রিত হয় একই ভাইরাসের অনেক কম ক্ষতিকর এক strain. এরফলে বিশ্বের কাছে তুলে ধরা যায় যে প্রথম বিশ্বও আক্রান্ত!

ক্লান্ত বিধ্বস্ত ডাঃ গুপ্ত শোকে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকেন।


পৃথিবীর নিয়ম মেনে ভোর হয়। ডাঃ রুদ্র চায়ের কাপ নিয়ে এসে বসেন তার পাশে। “দেখেছেন- আজ সব website-এ একটাই breaking news- ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এই ভাইরাসে আক্রান্ত। অসুস্থতার ঘণ্টা কয়েকের মধ্যে I.C.U-তে নিয়ে যেতে হয় তাকে। তারপরে শুরু হয় তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি। এই ভাইরাস যেন বহুদিনের উপবাসীর মতো শরীরের সব কোষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। শেষ খবর অনুযায়ী তিনি এখন কোমায়।“


আবেগহীন শীতল রিক্ত দৃষ্টিতে যেন নিদারুণ ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকেন ডাঃ গুপ্ত। তারপরে অস্ফুট স্বরে বলে ওঠেন- “the virus has started mutating!”


যে বিখ্যাত সৃষ্টিগুলোর ছায়া লেখাটায় আছে, সেগুলো হলো-

· অভিসার – কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

· Love in the Time of Cholera - Gabriel García Márquez

· গণশত্রু – নির্দেশনা সত্যজিৎ রায়

· Contagion- directed by Steven Soderbergh

· সাদা পৃথিবী- শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়







নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮