• রথীন্দ্রনাথ রায়

গল্প - ময়না বউ




বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেছে । এতক্ষণ তো ফেরা উচিত ছিল ওর । কিন্তু ফিরছে না কেন? চিন্তাটা ক্রমশ গাঢ় হয় । এদিকে মায়ের যা শরীরের অবস্থা তাতে এই মুহূর্তে হাসপাতালে নিয়ে যেতে না পারলে -- না আর ভাবতে পারছে না ।জানালা দিয়ে একবার পথটা দেখে নেয় । না, ওর চিহ্ন নেই । সামনে নির্বাচন । চিহ্ন রয়েছে সে সবের । গণতন্ত্রের পবিত্র চিহ্ন । এ পর্যন্ত অনেকগুলো নির্বাচন দেখেছে । কিন্তু তাদের মতো অতি সাধারণ মানুষের কাছে মনে এ নির্বাচন বুঝি একটা প্রহসন । সমাজের ওপর তলার মানুষেরা চিরকাল তাদের ওপরে ছড়ি ঘুরিয়েই চলেছে । আর তারা ক্রমশ তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে চলেছে । বেঁচে থাকাটাই যেন তাদের কাছে একটা বিড়ম্বনা মাত্র । মহান দেশের মহান নেতাদের বেঁচে থাকাটাই বড্ড জরুরি । নাহলে গরীব মানুষগুলোর সেবা করবে কে ?

চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে ময়না বউয়ের । যতদূর চোখ যায় রাস্তার দুধারে অজস্র রঙিন পতাকা । বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের । দেওয়ালে দেওয়ালে হাজারো প্রতিশ্রুতি । গরীব মানুষের জন্য কতো প্রকল্প ? কিন্তু তাদের সেই ভাঁড়ে মা ভবানী !

অসুস্থ মায়ের কাছে ফিরে আসে । ক'দিন আগে থেকেই জ্বর একটু একটু করে বেড়েছে । মনে হয়েছিল এমনিই সেরে যাবে । কিন্তু যায়নি ।

হঠাৎ একটা শব্দে সচকিত হয়ে বাইরে আসে । দেখে মুখ ম্লান করে দাঁড়িয়ে আছে গগন ।

-- ডাক্তার কৈ ?

-- আসবেক নাই । ভোটের ল্যেগে মীটিনে যাবেক ।

-- তাইলে মোদের মাটো বাঁচবেক নাই ?

-- সে উরা কইতে লারবে । আর দেরি করা যাবেক নাই । হাসপাতালে নে যাই চল ।

-- কিন্তুক নে যাবি ক্যামনে ? ডাউকোডাঙায় মিটিংটো আছে । উয়ের ল্যেগে রাস্তায় বাসটাস কিছু চলছেক নাই ।

-- তবে?

-- একটা রিকশা ডেইক্যে আন ।

ইতিমধ্যে মাইকের চিৎকার ভেসে আসে ।

" বন্ধুগণ আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে আমার আপনার কাছের নেতা, কাজের মানুষ জনদরদী অমিয় চৌধুরীকে ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করুন ।"

মাইকের চিৎকারে ময়না কি বলল তা শুনতে পেল না গগন ।

মিটিং আর মিটিং । আজ এ দল তো কাল ওই দল । কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর রাগে বিড়বিড় করতে করতে বেরিয়ে যায় গগন । ভোট আসছে তো কি হয়েছে ? এর আগেও তো অনেক ভোট হয়েছে । অনেক প্রতিশ্রুতি ছিল । কিন্তু তাদের জীবনে তো কোনো পরিবর্তন আসেনি ।দুবেলা দুমুঠো ভাতের নিজেদের সুখ- দুঃখ, ভালো লাগা, মন্দ লাগা সব কিছুকে বেচে দিয়েছে । তবু সময়মতো ভাতের যোগাড় হয়না । মাথার ওপরে একটু ছাউনি -- তাও কবে কখন মাথার ওপরেই ভেঙে পড়বে কে জানে ।

কোনো রকমে একটা রিকশাভ্যান যোগাড় করে আনে গগন । যেখানে অন্য সময় কুড়ি টাকা ভাড়া আজ সেখানে একশো টাকা হেঁকে বসেছে । তারপর হাসপাতালেও খরচ আছে । কি যে হবে কে জানে? মাথার ওপরে গনগনে সূর্যের তাপ । মাটিতেও পা দেওয়া যায় না । তবু ওদের বেরোতেই হবে ।

কিন্তু মোড়ের মাথায় আসতেই পুলিশ ওদের ভ্যানটাকে আটকে দেয় । আর যাওয়া যাবে না । কিছুক্ষণ পরেই কোনো এক কেষ্টবিষ্টু নেতার কনভয় এই রাস্তা অতিক্রম করবে । তাই তাঁর নিরাপত্তার কারণেই যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে । কে সে নেতা -- জানেনা গগন ।পুলিশের সামনে হাতজোড় করে বললে , বাবু, মাটোর শরীল বড্ড খারাপ । হাসপাতালে না নে গেইলে বাঁচবে নাই গ।

-- যা ভাগ শূয়োরের বাচ্চা । জানিস, কে আসছে ? আমাদের নেত্রী সুজাতা ব্যানার্জি । যদি কিছু একটা হয়ে যায় না, তাহলে চাকরি থাকবেনা ।

রিকশাওয়ালা তাগাদা দেয় , দেরি করা যাবেক নাই গ । মীটিন পিতিদিন হবেক নাই, আর এমন বাজারও পিতিদিন হবেক নাই ।

ঠিক তখনই একটা হুটারের আওয়াজ ভেসে আসে । কর্তব্যরত পুলিশবাহিনী পজিশন নেয় । রাস্তার দুপাশের লোকেরা শ্লোগান দেয় , তোমার নেত্রী আমার নেত্রী সুজাতা ব্যানার্জি জিন্দাবাদ । এবার ভোটে জিতছে কে?

-- সুজাতা ব্যানার্জি ছাড়া আবার কে?

একে একে লাল নীল আলোওয়ালা গাড়িগুলো গগনদের অতিক্রম করে যায় । জনতা উর্ধশ্বাসে ছুটতে থাকে গাড়িগুলোর পিছনে ।

অসুস্থ মায়ের কাছে ফিরে আসে গগন । ঝুঁকে পড়ে অনেক কাছে -- না নিশ্বাস পড়ছে না ।

-- ময়না ইদিকে আয়, দ্যাখ মাটো কথা বুলছে নাই ।

ময়না ঝুঁকে পড়ে । বলে , মা কথা বোলো কেন ।

ওরা তো জানেনা যে মৃতদেহ কখনো সাড়া দিতে পারেনা ।

ময়না কাঁদতে থাকে । রিকশাওয়ালা বলে সে মৃতদেহ বইতে পারবেনা । মৃতদেহ টাকে নামিয়ে নিতে বলে সে ।

গগন ওর ভাড়াটা দিতে যায় । সে বলে লাগবে না । চলে যায় সে । প্যাসেঞ্জার ধরতে হবে । তার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে পাঁচ পাঁচটা প্রাণী ।

এগিয়ে আসে একজন পুলিশ ।বলে, অই এতক্ষণ যে বড় ফ্যাঁচড় ফ্যাঁচড় করছিলি, বল এবার --

-- মাটো মরে গেইচে বাবু ।

-- মরে গেইচে? আহারে ! কিন্তু কিভাবে ?

-- আপনাদের ল্যেগেই । আপনারা আটকে না দিলে মাটো মরতো নাই ।

অবাক হয়ে যায় পুলিশবাবুটি । শ্লা ছোটোলোকটার সাহস আছে বলতে হবে । পুলিশের বিরুদ্ধে নালিশ ? ভাবা যায় ?

-- শ্লা দেব এক রদ্দা । কি বলছিস হুঁশ আছে? চল শ্লা থানায় । দলাইমলাই না দিলে হুঁশ হবেনা ।

-- বাবু, আমাগো কুনো কসুর হইছে ?

-- মেরে চোয়াল ভেঙে দেব শ্লা শূয়োরের বাচ্চা । ডেডবডি থাক এখানেই পড়ে । তোরা থানায় চল । রিপোর্ট লেখাতে হবে ।

মৃতদেহটা সেখানেই পড়ে থাকে । গগন ও ময়না থানায় যায় রিপোর্ট লেখাতে ।

সুনসান থানা । দেওয়ালে টাঙানো কাদের সব হাসি হাসি মুখের ছবি । ওই সব মুখগুলোকে চেনেনা গগন ।

থানার বাবুটি চেয়ারে বসে বলে, তখন যে বড্ড চেল্লাচ্ছিলি। শালার ছোটলোক । ভগবান তোদের ছোটলোক করেছে তা তোরা ভদ্দরলোকদের বুঝবি কি করে ?

-- বাবু?

-- মালকড়ি আছে ? ফেল তাড়াতাড়ি । নাহলে পাঁচ হাজার পাঁচশো পঁচিশ ধারায় জেল হয়ে যাবে । পাঁচ বছর জেলের ঘানি টানতে হবে ।

-- মাপ করি দ্যান বাবু । মোরা মুখ্যুসুখ্যু মানুষ--

পুলিশবাবুর পায়ের নিচে বসে পড়ে গগন ।

ওঠ শ্লা, ওঠ । মামদোবাজি পেয়েছিস ? চুলের মুঠি ধরে হিড় হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে যায় লকআপের দিকে ।

এগিয়ে আসে ময়না । বাধা দিয়ে বলে, কুত্থাকে নে যেছো ?

-- আবে হঠ শ্লা মাগী ।

ময়নাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় পুলিশবাবুটি ।

চিৎকার করে ওঠে গগন । বলে, মেয়াছেলের গায়ে হাত দিবে নাই ।

-- তাই নাকি অ্যাঁ ? বড্ড টাটানি তাই নারে ?

গগন এগিয়ে আসতেই ওর চোয়ালে একটা ঘুঁসি মারে পুলিশবাবুটি । চোয়ালে হাত দিয়ে বসে পড়ে গগন । কিছুক্ষণ পরে হাতটা তুলতেই দেখে কিছুটা রক্ত । উঠে দাঁড়ায় গগন । এবার পাল্টা একটা ঘুঁসি মারে সে । শুরু হয় ধ্বস্তাধ্বস্তি । কিন্তু দুধ ঘি খাওয়া পুরুষ্টু পুলিশবাবুর সঙ্গে পেরে ওঠেনা । একটা বেতের লাঠি দিয়ে গগনকে পেটাতে থাকে শান্তিরক্ষক ।

গগন আর্তনাদ করে । কিছুক্ষণের মধ্যেই তার আর্তনাদটা গোঙানিতে পরিণত হয় ।এরপর গগনকে লকআপে ভরে দিয়ে ময়নার দিকে এগিয়ে আসে পুলিশবাবুটি ।

-- এইবার তোর পালা । বড্ড ফ্যাঁচড় ফ্যাঁচড় করছিলি তখন থেকে ।

ভয়ে পিছোতে থাকে ময়না । চেয়ারে ধাক্কা লেগে পড়ে যেতেই চুলের মুঠি ধরে তোলে শান্তিরক্ষক ।

-- বল মাগী এবার তোর কোন ভাতার বাঁচাবে ?

যণ্ত্রণায় মুখটা বিকৃত হয়ে ওঠে ময়নার । কোনোরকমে ছাড়াবার চেষ্টা করেও পারেনা ।

পুলিশবাবু এগিয়ে আসে । চোখে নেকড়ের হিংস্রতা ।

এখন বস্ত্রহরণ পালা চলছে । শ্লীলতা হারাচ্ছে ভারতীয় নারী । দেওয়ালের ছবিগুলো তখনও স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে হেসেই চলেছে, হেসেই চলেছে, হেসেই চলেছে । ধর্ষিতা হলো ময়না । যেখানে লেখা রয়েছে "সত্যমেব জয়তে " -- ঠিক তারই নিচে ।

লকআপ থেকে ছাড়া পায় বিধ্বস্ত গগন । স্ত্রীর ইজ্জতের বিনিময়ে ।

সারাদেহে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে ময়না এগিয়ে এসে গগনের হাত ধরে । শান্তিরক্ষকের থাবায় ওর ব্লাউজটা ছিঁড়ে গেছে । কপালে সিঁদুরের টিপটাও ঘষটে গেছে ।

-- ময়না ?

-- কাঁদছিস কেনে ?

দূরে একটা মিছিল এগিয়ে চলেছে । বড্ড অস্পষ্ট শোনাচ্ছে মিছিলের শব্দগুলো ।

কাঁদতে পারছেনা ময়না । চোয়ালদুটো আজ ওর বেশ শক্ত ।

নীড়বাসনা  বৈশাখ ১৪২৯