• অনন্যা ব্যানার্জি

গল্প - মুক্তি




"ইওর ডেজ আর নাম্বার্ড"

"আই রিপিট, ইওর ডেজ আর নাম্বার্ড"



ঘুম থেকে বিছানায় ধড়মড় করে উঠে বসে অনিন্দ্য। শুধু আজ নয়, গত এক মাস ধরে রোজ রাতে এই এক স্বপ্ন দেখছে ও। আর ছটফট করে ঘুম ভেঙে যায়। পাদ্রী জোসেফ হিউমের শেষ কথাগুলো বড় ভাবিয়ে তোলে অনিন্দ্যকে -"ইওর ডেজ আর নাম্বার্ড"। আগেও কয়েকবার উনি এসেছেন স্বপ্নে আর প্রতিবার যা বলেন, তা অক্ষরে অক্ষরে সত্যি হয়ে যায়।



"কেন বার বার এই স্বপ্ন ঘুরে ঘুরে আসছে?" - এই চিন্তা মনের ভিতরে বার বার ঘুরে আসে আর ওলট পালট করে দিচ্ছে অনিন্দ্যর জীবনটাকে। অনিন্দ্যর ছোটবেলা থেকেই ভূত প্রেত ও প্যারানর্মালের প্রতি বড় আকর্ষণ। আর তার এই কাজ বাড়ির কেউ মেনে না নিলেও তার বন্ধু, তমালের ওর ওপর বড় বিশ্বাস। তমাল বলে -"তোর এত পড়াশুনো কখনো বিফলে যাবে না। দেখবি নতুন কিছু করে তুই সকলকে চমকে দিবি একদিন।" আজকাল এমনকি ফেসবুকের কল্যাণে একটা নিজের পেজ বানিয়েছে ওরা দুজনে। তাতেও নেহাত কম ফলোয়ার নেই অনিন্দ্যর।



অনিন্দ্য খাটের পাশের টেবিল থেকে গ্লাসটা তুলে ঢকঢক করে কিছুটা জল খেয়ে নেয়, তাতে যদি একটু ভাল বোধ করে। কিন্তু তার মাথায় ঘুরতে থাকে ওই বাণী। কে এই পাদ্রী বেশে বয়স্ক ভদ্রলোক যে ক্রস হাতে দেখা দেয় তার স্বপ্নে আর যার বাড়িটা স্পষ্ট স্বপ্নে দেখতে পায় অনিন্দ্য আর ওনার দরজায় বড় বড় গোল্ডেন ফলকে লেখা -"পাদ্রী জোসেফ হিউম"। ওনার ওই ভবিষ্যৎ বাণীর পরে ওনার মিলিয়ে যাওয়াটা ভাবলেই শিহরিত হয় অনিন্দ্য। কেমন যেন পুরো জলজ্যান্ত শরীরটা কর্পূরের মত উভে যায় হাওয়ায়। কিন্তু তখন ও কানে আসতে থাকে সেই কথাগুলো -"ইওর ডেজ আর নাম্বার্ড"।



প্রথম কয়েকবার দুঃস্বপ্ন ভেবে ব্যাপারটাকে তেমন গা করেনি অনিন্দ্য। কিন্তু এখন আরো বেড়ে গেছে এই স্বপ্ন ফিরে আসা আর রীতিমত কষ্ট হয় ওর। মনে মনে ভাবে অনিন্দ্য, এর কিছু অনুসন্ধান করতে হবেই তাকে। ওর মনে পড়ে একটা বিদেশী বইয়ে পড়েছিল অনিন্দ্য -"যে সব মানুষদের কথা আমরা কোথাও পড়েছি, বা শুনেছি, তারাও কখনো কখনো আমাদের স্বপ্নে ফিরে আসে।বাস্তবে তাদের সাক্ষাৎ না হওয়ায় তাদের সচেতন মন মনে না রাখলেও অবচেতনে তাদের ছবি থেকে যায়।"

অনিন্দ্য অনেক ভেবেও কোন কূল কিনারা পায়না।



এইসব ভাবতে ভাবতেই কখন চোখ লেগে এসেছে খেয়াল নেই অনিন্দ্যর। সকালে ঘুম ভাঙে ফোনের এলার্মে। উঠে বসে দেখে অফিস থেকে বস জানিয়েছে আজই অনিন্দ্যকে একটা কাজে গোয়া যেতে হবে। অনিন্দ্য মনে মনে খুশী হয়, কিছুদিন বাড়ি থেকে দূরে খোলা হাওয়ায় সমুদ্র সৈকতে গেলে হয়তো তার শরীর ও মন দুটোই ভাল লাগবে। এইসব ভাবতে ভাবতে ব্যাগ গোছাতে লাগে অনিন্দ্য। আর মনে মনে ভাবে গোয়া থেকে একটু দূরে গোকর্ণাতে এবারের প্রজেক্ট ওদের। আর চারিদিক ফাঁকা এই পাথুরে সী বীচটা অনিন্দ্যকে প্রথম দেখায়ই কেমন আকর্ষণ করেছিল। কি যেন একটা আছে জায়গাটায়।





তমালের ফোনটা আসে -"কি রে তুই নাকি আজ ই গোকর্ণা যাচ্ছিস? আমাকেও নিয়ে চল প্লীজ। আগেরবার তোর মুখে জায়গাটার কথা শুনে, দেখার লোভ সামলাতে পারছি না।"

"আর তোর অফিস?" - বলে অনিন্দ্য।

"এবার কয়েকদিন লীভ উইদাউট পে নিয়েছি, বুঝলি। একটু খোলা হাওয়ায় ঘুরে আসা হবে।" - বলে তমাল।

অনিন্দ্য হেসে বলে -"বড়লোক বন্ধু হওয়ার এই এক সুবিধা।"

অন্য সময় হলে তমাল রেগে যেত। এখন বলল -"শোন না, তৃষ্ণাও আসবে বলছে।"

"তোরা আসবি আয়, আমি কিন্তু ওখানে হোটেলের কাজ দেখতে যাচ্ছি। কেমন ব্যবস্থা, থাকা খাওয়ার জানিনা কিন্তু।" - বলে তৃষ্ণাকে এড়াতে চায় অনিন্দ্য। নাছোড়বান্দা তমাল তাও ঝুলে পড়ে এ যাত্রায় অনিন্দ্যর সঙ্গে। বান্ধবীটিকেও সঙ্গে নিয়ে চলে।



গোকর্ণা পৌঁছাতে সেদিন একটু রাত হয়ে যায়। একটা ছোট টিলার ওপর অনিন্দ্যদের কম্পানির হোটেল। রাস্তাটা একটু ঘুরে ঘুরে উঠছে। আর অন্ধকারেও তারা গাড়িতে বসে শুনতে পাচ্ছে সমুদ্রের গর্জন।

অনিন্দ্য বলে -"জানিস্ দিনের বেলা এই রাস্তাটা দারুণ লাগে। একদিকে জঙ্গল আর অপরদিকে সমুদ্র।"

"তোর এ জায়গাটা কেন এত পছন্দ এখন বুঝছি।" - বলে তমাল।

"কেন বল তো?" - একটু ভুরু কুঁচকে বলে অনিন্দ্য।

"এই অন্ধকার, এই নির্জনতা এসব যে তেনাদের অতি প্রিয়।" - বলে একটু হাসে তমাল।

"এই তোরা চুপ করবি? এই রাতে এসব না বললেই নয়?"- বলে তৃষ্ণা।

তাই শুনে দুজনে হেসে ওঠে। নামার সময় হোটেলের আলোতে গাড়ির পেছনের কাঁচে তৃষ্ণা দেখে একটা হাতের ছাপ।

"এটা গোয়াতে তো দেখিনি রে" - ভয়ে ভয়ে বলে তৃষ্ণা।

অনিন্দ্য হেসে বলে -"কোই হ্যায়"

তমালের হাতটা চেপে ধরে তৃষ্ণা ভয়ে আর তখনই হোটেলের আলো চলে যায়।

একজন ওয়েটার এসে বলে -"এই অবস্থা এখানে রোজ। সন্ধ্যে হলেই রোজ লোডশেডিং।"



সেদিন রাতে লন্ঠনের আলোতে খেতে হয় ওদের কারণ এখানে জেনারেটর নেই। খাওয়ারটা রান্না ভাল হওয়ায় আর খিদে খুব থাকায়, তিনজনে ওই আলোতেই পেট ভরে খায়।



রাতে সেদিন ঘুমটাও ভাল হয় তিনজনের। সকালে উঠে তারা বেরিয়ে পড়ে আশেপাশের জায়গাটা দেখতে। জঙ্গলের মধ্যে পায়ে হেঁটে বেরানোর মজাটাই আলাদা। সুন্দর হাওয়া বইছে, আর কানে আসছে পাখির কলকাকলি। কিছুটা এগিয়ে একটা জায়গায় পৌঁছয় ওরা যেখানে জঙ্গল বড় স্তব্ধ।কোন এক স্তব্ধতা যেন গ্রাস করেছে সেই জায়গাটা। অনিন্দ্যর ওখানে পৌঁছেই কিরকম অস্বস্তি লাগতে থাকে -"কি যেন ও জানে এ জায়গার ব্যাপারে।" একটু এগিয়ে চোখে পড়ে এক পরিত্যক্ত চার্চ। দেখেই শিউরে ওঠে অনিন্দ্য। এই চার্চটা তো অনেকবার স্বপ্নে দেখেছে ও। আর এর পেছনের বাড়িটাই তো পাদ্রী জোসেফ হিউমের। অনিন্দ্যর খেয়াল নেই কখন সে চলতে চলতে বন্ধুদের ছেড়ে চলে এসেছে অনেকটা দূরে। বাড়িটার সামনে পৌঁছেই ও বোঝে বাড়িটাও পরিত্যক্ত। কিন্তু কিছুর একটা আকর্ষণ ওকে বাড়ির দরজার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। দরজাটায় একটু হাত লাগাতেই তা বিকট আওয়াজ করে খুলে যায়। ভেতরে একটা ঢুকে অনিন্দ্য অবাক হয়ে যায়। এত পুরনো বাড়ির ভেতরটা কিন্তু যথেষ্ট পরিষ্কার। সেখানে একটা টেবিলে অনিন্দ্য খুঁজে পায় একটা উইজা বোর্ড। এ জিনিস যে তার বড় চেনা। আগে অনেকবার নিজে এটা কিনবে ভেবেও, বাড়ির লোকের আপত্তিতে কিনতে পারেনি। পাশে রাখা একটি বই। বইটা খুলতেই জ্বল জ্বল করছে নাম "টু ফাদার হিউম, ফর ইওর ব্লেসিংস ওন আওর ডটার"।

এতক্ষণে ঘরে এসে পড়েছে তমাল ও তৃষ্ণা।



"একিরে তোরা আবার প্ল্যানচেট করার প্ল্যানে নাকি?" - ভয়ে পেয়ে বলে তৃষ্ণা সামনের উইজা বোর্ডটা দেখে।

তখনই তাদের সামনে এসে দাঁড়ায় ফাদার। অনিন্দ্যকে দেখে বলেন -"তোমার ফেসবুক পেইজ আমি দেখেছি। খুব ভাল লেগেছে তোমার রিসার্চ। এর আগে কখনো করেছো প্ল্যানচেট? আছে অত শক্তি যে আত্মার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারবে?"

অনিন্দ্য খুশী হয়ে বলে -"এ যে আমার এতদিনের স্বপ্ন। আমি পারবো।"

হেসে ফাদার জানান -"সত্যি প্ল্যানচেট করতে চাইলে আজকের মত সুযোগ তারা আর পাবে না, কারণ আজ আমাবস্যা। আমি এর আগে একবার করেছি আর অবশ্যই তাতে সাকসেসফুল হয়েছিলাম। আজ রাতে তাহলে দেখা হবে এখানে তোমাদের সঙ্গে।"



অনিন্দ্য এককথায় রাজি হয়ে যায়। তমাল একটু ভয়ে ভয়ে বলে "আমিও থাকবো তাহলে।"

ফাদার বলেন -"একটা মোমবাতি, একটা কয়েন নিয়ে আসতে হবে রাতে তাদের এই বাড়িতে। এখানেই উনি তাদের জন্য অপেক্ষা করবেন। তাদের শরীরে কোন রকম ভগবানের চিহ্ন থাকা একেবারেই চলবে না। তা না হলে এই পুরো পরিকল্পনাটা নষ্ট হয়ে যাবে‌।"

তিনি বলেন -"চিন্তা নেই। আমার ক্রস আমার হাতের নাগালে থাকবে। কোন বিপদে ওটাই আমাদের রক্ষা করবে। বলে ফাদার তাদের সংক্ষেপে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেয়।" আর বলেন -"এই পরিকল্পনার কথা যেন ঘুণাক্ষরে লোকাল লোক কেউ জানতে না পারে। অশিক্ষা এদেরকে খুব কুসংস্কারে আবদ্ধ করে রাখে, তাই এরা এ ব্যাপারটা মেনে নিতে পারবে না।"

অনিন্দ্য ফোন আনতে চাইলে উনি বলেন, "কোনরকম ইলেকট্রনিক জিনিস আনা যাবে না কারণ ইলেকট্রনিক জিনিসের যে তরঙ্গ তা আত্মার সংযোগ স্থাপনের রাস্তায় বাঁধা হতে পারে।"



সন্ধ্যায় তাই সেদিন ওরা তিনজন খাওয়ার খেয়ে তৈরি হয়ে নেয় রাতে জঙ্গলে যাবে বলে‌। সারা গায়ে ওডোমস ও হাতে একটা এসিডের বোতল ও হাই পাওয়ারের টর্চ রাখে পাছে শাপ খোপ বেরোয়। রাত এগারোটার সময় বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনজনে ওই চার্চের কাছে পৌছায় ঠিক পনেরো মিনিটে। আবার ও ওরা তিনজন অনুভব করে অন্য জায়গার তুলনায় এই জায়গাটা যেন কেমন দম আটকানো পরিবেশ। উত্তেজনায় অনিন্দ্যর আজ আর মাটিতে পা পড়ছে না। দ্রুত পদক্ষেপে সে এগিয়ে যায় চার্চ পেরিয়ে পাদ্রীর বাড়ির দিকে। তৃষ্ণা একটু ভয় ভয় করলেও ও একা হোটেলে থাকার থেকে এখানে বন্ধুদের সঙ্গে আসাটাই ঠিক মনে করে। দরজার কাছে পৌঁছালে ফাদার দরজা খুলে তাদের ভেতরে স্বাগত করে।



ভেতরের ঘরে তখন পুরো অন্ধকার। সকালে দেখা গোল টেবিলটা একটু চোখ সওয়া হলে দেখতে পায় তারা সকলে। ওর চারদিকে চারটে চেয়ার আর টেবিলের ওপর রাখা ওই বোর্ড। ফাদার উঠে ঘরের জানালাগুলো সব বন্ধ করে দেন। সঙ্গে সামনের দরজাটাও বন্ধ করে দেন।

তৃষ্ণা বলে -"ফাদার, আপনার ক্রসটা বলেছিলেন রাখবেন।"

ফাদার হেসে বলেন -"হ্যাঁ, ওই যে রাখা বলে পাশের ছোট টেবিলের দিকে দেখান।"

এবার তারা চারজন গোল টেবিলের চারদিকে বসে পড়ে ও ফাদারের আদেশ মত সবকিছু করতে থাকেন।

ফাদার বলেন -"একজন এই পরিকল্পনাতে প্লেয়ার হবে, যার শরীরে আত্মা আসবে। তোমাদের কেউ কি সেটা হতে চাও?"

অনিন্দ্য চেঁচিয়ে বলে -"ফাদার, আমি হবো, সেই প্লেয়ার।"

ফাদার মৃদু হাসেন। এবার বাকি সকলকে বলেন -"এই প্ল্যানচেট চলা অবস্থায় কেউ যেন না নড়ে, কথা না বলে। ব্যাপারটা সমাপ্ত হলে সেই আত্মাকে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করার ব্যাপারটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে কোন অতৃপ্ত বাজে আত্মা হলে মানুষের মধ্যে থেকে সে ক্ষতি করবে অন্য সকলের। তাই চারজনের সহযোগিতাই একান্ত কাম্য।"

তৃষ্ণা একটু ভয় পেয়ে বলে -"ফাদার একটু দাঁড়ান। একটু জল খাবো।"

তৃষ্ণাকে দেখে একটু হেসে ফাদার বলেন -"ডোন্ট ওয়ারি, মাই চাইল্ড। গড ইজ উইথ আস।" বলে উনি আবার ও একবার তাকান পাশের ক্রসটার দিকে।





এবার সকলে নিজের আঙুল বোর্ডে রেখে সামনের মোমবাতির শিখার দিকে তাকিয়ে ফাদারের সঙ্গে মন্ত্র উচ্চারণ করতে থাকে। ঘরে সব জানালা দরজা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও তারা যেন হঠাৎ অনুভব করে একটা হাওয়া যা এসে নিভিয়ে দেয় সামনের জ্বলা মোমবাতিটা।

ফাদার তাড়াতাড়ি জ্বালিয়ে দেন মোমবাতিটা আর সঙ্গে সঙ্গে সামনের বোর্ডে তারা লক্ষ্য করে কিছু নড়ছে।

ফাদার প্রশ্ন করেন -"হ্যালো, আপনি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন?"

অনিন্দ্যর দিকে তখন দৃষ্টি সকলের। ওর চোখ দুটো কেমন যেন বন্ধ হয়ে আসছে‌। বোর্ড ইঙ্গিত করে "হ্যাঁ"

তৃষ্ণা আর ভয়ে নড়তে পারছে ন। শুধু চোখের তারা নাড়িয়ে দেখছে একবার ফাদারকে, একবার অনিন্দ্যকে, একবার তমালকে আর একবার বোর্ডে।

ফাদার জিজ্ঞেস করেন -"আপনি কি আমাদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি আছেন?"

তৃষ্ণার মনে হয় যেন কত দূর থেকে আসছে ফাদারের আওয়াজ। এদিকে মানুষটা একদম পাশে বসে আছে তার।

এবার ও বোর্ডে জবাব -"হ্যাঁ"

সঙ্গে আরো লেখা আসে -"আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।কেন আমাকে ডাকলি?"

এবার তৃষ্ণা লক্ষ্য করে অনিন্দ্য কেমন যেন কেঁপে উঠল। আবার একটা হাওয়ায় সবকিছু কেমন ওলটপালট হয়ে গেল।

এবার বোর্ডে লেখা এল -"আই ওয়ান্ট রিভেঞ্জ।"

এই কথাটা ফুটে ওঠা মাত্র আবার একটা দমকা হাওয়ায় সামনের মোমবাতিটা নিভে গেল এক নিমেষে। এতক্ষণ আঙুলগুলো তাদের রাখা ছিল ওই বোর্ডের ওপর। হঠাৎ তারা অনুভব করল -"আর কোন কথা আসছে না। ফাদার ও হঠাৎ একদম চুপ। একটা অস্বস্তিকর দম বন্ধ করা পরিবেশে বসে তারা আর অনিন্দ্য কেমন যেন ছটফট করে উঠছে আর তার মুখ দিয়ে একটা গোঙানির আওয়াজ বেরোচ্ছে। আর কোন এক ভাষায় সে কথা বলছে তার মধ্যে হেল্প ছাড়া আর কিছু বোধগম্য হচ্ছে না।

তমাল এবার নিস্তব্ধতা ভেঙে চেঁচায় -"ফাদার, অনিন্দ্যর কি হল?"

কোন উত্তর না পেয়ে তৃষ্ণা তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে পাশের টেবিলে রাখা ক্রসটা তুলে নেয় নিজের মুঠিতে আর তার অন্য পাশে বসা অনিন্দ্যর ওপরে তা ছুঁইয়ে দিয়ে জোরে জোরে ভগবানের নাম জপতে থাকে।



তারপর আর কিছু মনে নেই ওদের। পরেরদিন সকালে গাঁয়ের লোকরা এসে তাদের তুলে নিয়ে আসে হোটেলে। একটু সুস্থ বোধ করলে তমাল দেখে পাশে উঠে বসেছে তৃষ্ণা। গরম দুধ খাচ্ছে সে‌। কিন্তু অনিন্দ্য এখনো আচ্ছন্ন হয়ে ঘুমাচ্ছে। কাছে গিয়ে ওর কপালে হাত রেখে দেখে জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে ছেলেটার। হোটেলের লোক উৎসুক হয়ে তৃষ্ণার কাছে জানতে চায় "অত রাতে কিভাবে তারা জঙ্গলের ভেতরে পৌছুলো?"

তমাল চোখের ইশারায় সব বলতে মানা করে। তমালের মনে পড়ে ফাদারের কথাগুলো -"এরা খুব কুসংস্কারাচ্ছন্ন। বুঝবে না এই পরিকল্পনা।"

"আমরা একটু রাতের জঙ্গল উপভোগ করতে গিয়েছিলাম।" - বলে তৃষ্ণা -"কি করে ওখানে পড়ে যাই কিছু মনে নেই।"

হোটেলের মালিক জানায় -"যে জায়গায় আপনাদের পাওয়া গেছে, ওই জায়গাটা অভিশপ্ত। কিছু বছর আগে এই অঞ্চলের এক পাদ্রী ওইখানে গিয়ে এক মৃত লোকের আত্মাকে প্ল্যানচেট করে ডাকবেন বলে গিয়েছিলেন এক সাথীর সঙ্গে। তিনি মনে করেছিলেন ওই অতৃপ্ত আত্মাকে মুক্তি দেবেন। কিন্তু দুজনের কেউ আর ফিরে আসেননি। পরেরদিন সকালে দুজনের মৃতদেহ উদ্ধার হয় জঙ্গল থেকে। তাদের চেহারা দেখে মনে হয় কোন এক আতঙ্কে তাদের মৃত্যু হয়েছে।"



এতক্ষণে উঠে বসেছে অনিন্দ্য। প্রশ্ন করে -"কি নাম ছিল ওই পাদ্রীর?"

"ফাদার জোসেফ হিউম, বড় ভাল মানুষ ছিলেন ফাদার।"

এবার তিনজন চমকে ওঠে ভয়ে। একে অপরের দিকে তাকায়। একটা শীতলতা যেন স্পর্শ করে যায় তাদের।

তৃষ্ণা তমালকে বলে -"গতকালের মন্ত্র গুলো শুনেও কিন্তু আমার বার বার মনে হচ্ছিল এ আত্মা ডাকার মন্ত্র নয়। ফাদার বলছেন তাঁর মুক্তির মন্ত্র।"

অনিন্দ্য বলে -"তৃষ্ণা, গতকাল শুধু তুই ছিলি বলে আজ আমি তোদের সঙ্গে বসে আছি। তা না হলে আমার জীবন সংশয় হতো অবশ্যই, কারণ ফাদার আমার মধ্যে দিয়ে মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন। তোর আমার শরীরে সঠিক সময়ে ওই ক্রস লাগানোর জন্য কাজটা হতে হতেও সমাপ্ত হল না।"

ম্যানেজার কিছু না বুঝে বলেন -"অল ওয়েল,স্যার? ডাক্তার ডেকেছি। একটু পরে আসছেন।"

"ইয়েস, অল ওয়েল।" - বলে মুচকি হেসে তাকায় অনিন্দ্য তমালের দিকে।

তৃষ্ণা বলে -"অল ওয়েল, দ্যাট এন্ডস ওয়েল। চল্ আজ এই পাহাড়ের নীচের চার্চে গিয়ে আমরা ফাদারের আত্মার জন্য শান্তি কামনা করবো আর আজই ফিরে যাব কলকাতা। এনাফ ইজ এনাফ।"

"যথা আজ্ঞা" - বলে হাসে অনিন্দ্য ও তমাল দুজনে। অনিন্দ্য এখন একটু সুস্থ বোধ করছে। অনিন্দ্য গাড়িতে বসে ফেরবার পথে বলে -"স্পিরিটদের ক্ষমতাতে আমি অভিভূত আজ। গতকাল নয়, ফাদার আমাকে টার্গেট করেছিলেন মুক্তির জন্য আজ থেকে প্রায় একমাস আগে। তাইতো ঘুরে ঘুরে স্বপ্নগুলো আসছিল বারবার। কোন ওষুধ খেয়েই আমার শরীর ঠিক হচ্ছিল না। কিন্তু হয়তো বন্ধুত্বের টানটা ও প্রিয়জনের টান উপেক্ষা করতে পারে সকল অশুভ শক্তিকে, তাইতো আজ আমি বসে গাড়িতে তোদের সঙ্গে।"



তৃষ্ণা বারবার পেছনে দেখছে বলে তমাল বলে -"কি রে তুই কি ভাবছিস্, ফাদার আমাদের পেছন পেছন আসছেন?"

তৃষ্ণা একটু হেসে কথাটা চেপে যায়। গাড়ির পেছনের কাঁচে আবার ও কার ও হাতের ছাপ স্পষ্ট। এবার কিন্তু গাড়িতে ওঠার আগেই তৃষ্ণা দেখে নিয়েছিল কোন ছাপ নেই। আস্তে করে তৃষ্ণা বলে -"এই শোন, এসিটা বন্ধ করে জানালাগুলো খুলে দিই আমরা। বাইরের হাওয়াটা উপভোগ করা যাবে।"

"ওকে, ম্যাম" - বলে তমাল ড্রাইভারকে অনুরোধ করে সেইমত।

তৃষ্ণার কপালে তখন বিন্দু বিন্দু ঘাম।সেইদিকে লক্ষ্য যায় না কিন্তু দুই বন্ধুর। হাতের মুঠিতে শক্ত করে ধরে তৃষ্ণা ঠাকুরের লকেট। চোখ বুজে প্রার্থনা জানায় সেই অদৃশ্য শক্তির কাছে। একমাত্র উনিই পারেন আবার সবকিছু ঠিক করে দিতে।










নীড়বাসনা  বৈশাখ ১৪২৯