• সুদীপ দাস

গল্প - যাত্রানামা




শিবময়ী আজ তিনদিন হল মেডিকা হাসপাতালে ভর্তি।যখন হাসপাতালে নিয়ে এল টিনা,তখন একেবারে অচৈতন্য অবস্থা।হাঁপানীর টানটা এবার কেমন যেন বাড়াবাড়ি রকম।এখন এই বেসরকারী হাসপাতালের অনেক রকম নল টল লাগিয়ে একটু যেন ভাল অবস্থা।তবুও কেমন যেন আছ্বন্ন ভাব।আসলে কতরকমের অসুধ চলছে।ঘোরের মধ্যেই শুনেছেন শিবময়ী যে টিনাকে ডাক্তারবাবু বলছেন যে অবস্থা এবার কেমন ভাল নয়,একটা ফুসফুস অকেজো হয়ে গেছে,তাই এখন আর আই সি সি ইউ থেকে বার করা যাবে না।মাস ছয়েক আগেও একবার একটু বাড়াবাড়ি হয়েছিল।তবে সেবার সাত দিন হাসপাতালে থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন শিবময়ী।এবার মনে হয় তা হবার নয়।

শিবময়ী র মনে কত রকমের চিন্তা,স্মৃতি আজ ঘুরে ঘুরে হাতছানি দিচ্ছে।এলোমেলো ছায়াছায়া আলো আঁধার।এই তো মন হয় বছর দশেক আগে,টিনাদের বাবা সুধাময় এর হার্টে অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি অপারেশন হল।তার পর থেকে ওকে কত আগলে আগলে রাখত হত।তারপর আবার ওরই ভোকাল কর্ডে ক্যানসার ধরা পড়ল।নিয়মিত টাটা ক্যানসার সেন্টারে কিমোথেরাপি করাতে হত।ছেলে অতীন বস্টন থেকে সব ব্যবস্থা করেছিল। বেচারা টিনা নিজের দুটো বাচ্চা সামলে বাবা মায়ের যেভাবে চিকিৎসা করায়,তা সত্যি ই ভগবান এর আশীর্বাদ।তারপর এই মাস আটেক আগে ডিসেম্বরে---উনি সকালে চা খেতে খেতে অসাড় হয়ে চলে গেলেন পরপারে।তারপর থেকে এই এতবড় বাড়ি তে একা একা আর দিন কাটে না. শিবময়ী র।কিন্তু কোথা থেকে যে এই হাঁপানীর রোগ ধরল।আগে তো কোনদিন অমন বাড়াবাড়ি হয় নি।আসলে সুধাময়ের শরীর,পথ্য দেখভালে সময় যে কিভাবে কেটে যেত বুঝতে ই পারতেন না শিবময়ী।যেদিন থেকে একা হয়ে গেলেন ,নিজের শরীর নিয়ে আর তল পাচ্ছেন না।সারা জীবন নিজের হাতে সংসার চালিয়েছেন।ছেলে মেয়ের পড়াশুনো, ওনার অফিস,নিজের স্কুল,সবই দেখতেন দশভূজার মতো।এখন দু দুটো কাজের লোকের তদারকিতে থাকা যে কি অসম্ভব তা কাউকে বললে বুঝবে না।তাই এখন মনে হয় কিছুই তো আর বাকী রইল না,শুধু অতীনের ইচ্ছে ছিল, মাকে একবার ইউ এস এ নিয়ে গিয়ে নিজের প্রতিপত্তি দেখায়।শিবময়ীরও মনে এই সাধ ছিল না বলা যাবে না।কিন্তু মানুষের সব সাধ যে সব সময় পূর্ণ হবে অমন কথা তো নেই।এবার হাসপাতালে এসে মনে হচ্ছে, উনি একদিন বলেছিলেন যে," মণি ,তুমি আগে গ্যালে আমি আর বাচুম না।কিন্তু আমি আগে গ্যালে,তোমার কপালে খুবই কষ্ট আছে।"

সত্যি ই এই একাকীত্ব যেন শিবময়ী কে ওনার দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।

শিবময়ী র ঘুম আসছে।কেমন যে আবছায়া ছবি ছবি দেখতে পাচ্ছেন।এই তো সেদিন বুবলা যাদবপুর ইউনিভর্সিটি থেকে মেকানিকান ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করল।একদিন সটান এক বান্ধবীকে নিয়ে এল বাড়ি তে।পরিচয় করিয়ে বলল,",মা,--এই হল জোয়ী --ভালো নাম জয়িতা ---ও যাদবপুরে র ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ বিই পাস করেছে।আমরা মা বিয়ে করব।"

তারপর যে কত জায়গায় ঘুরল চাকরীতে,হিসাব নেই---আজ ওমাহা,তো কাল কানসাস সিটি,তো আবার বস্টন, হাভার্ড আবার চলে গেল টরেন্টো। শিবময়ী সুধাময়কে বলতেন--," ছেলে এত চাকরী র মধ্যে ঘুরে বেড়ালে,বিয়ে থা করে সংসার করবে কি করে?উনি বলতেন----"বুঝলে হে মণি,যেমন চাকরী তার কেন দস্তুর।এখনকার এই সফটওয়ার চাকরী এমন।" তবে হ্যা,অতীন ওমাহা থাকার সময় একবার কলকাতা এল।জয়িতার সঙ্গে বিয়ের ব্যাবস্থা হল।এ এক আজব কল।একজন থাকবে সূদুর আমেরিকায়,আর একজন কলকাতা য় চাকরী করবে।সেরকমও চলল বছর দুই।অতীন মাঝে মাঝে আসত।কিন্তু বউমারা স্বামীছাড়া শ্বশুর ঘর করতে চায় না আজকাল,বেশিরভাগ সময় মা বাবার সঙ্গে ই থাকত।সুধাময় এই ব্যাবস্থা কিছুতেই মানতে চাইতেন না।ওর ইচ্ছে সুদীপা---ও কলকাতা র চাকরী ছেড়ে অতীনের সঙ্গে আমেরিকা পাড়ি দেয়।ইঞ্জিনিয়র মেয়ে নিজের ক্যারিয়ার ছেড়ে স্বামী র সঙ্গে অনিশ্চিতের দিকে চলে যাবে,শিবময়ী একদম মানতে চান নি।কিন্তু সুধাময় ব্যাপারে স্ট্রিক্ট ।সোজা পূত্রবধূকে বসিয়ে 'বলে দিলেন যে,তার চাকরী ছেড়ে আমেরিকা যেতে হবে।প্রথমে একটু মন খারাপ হলেও, জোয়ী শেষমেষ মেনেই নেয়,কেননা তারও ওই দেশটার প্রতি একটা আকর্ষণ ছিল।এরপর সেদেশের এ শহর,ও শহর চলছেই।এখন হাভার্ড একটি বাড়ি কিনে থিতু।নাতনী ছোট।তাই জোয়ী এখন হোমমেকার।

শিবময়ী র রাত্রিদিন :--

এই হাসপাতালে দিনরাত বোঝার উপায় নেই।আই সি সি ইউ র হরেক রকম মেশিনের মধ্যে জীবন কেটে যায়।তবে অনেক ভিজিটর এর আনাগোনা দেখে বোঝা যায় এখন বিকেল।আজ শরীর টা আরও খারাপ হয়েছে।কি একটা নাম -- যেন বাইপাপ না কি? সেই মেশিন লাগিয়েছে।খুউউ--ব কষ্ট হয় ।মনে হয় প্রাণটা বুঝি বেরিয়ে যাবে এবার,কিন্তু কেন যে বেরিয়ে যায় না।টীনা আর দেবু এসেছে।খুব চিন্তিত লাগছে ওদের।ওরা ডাক্তারবাবু র সঙ্গে কথা বলছে।কেন এভাবে পড়ে থাকা? আবছায়া স্মৃতি ঘুরে ঘুরে আসছে।হটাৎ মনে হয় কেমন যেন তৎপরতা শুরু হয়ে গেল।সব নল টল খুলে নিল।টিনা কানের --কাছে ফিস ফিস করে মা কে 'বলে,"মা তোমাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে।"

টীনা দেবুর বিয়ে হয়েছে বছর কুড়ি ।দেবু সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ।বিয়ের সময় নামী রিয়েল এস্টেট কোম্পানী তে কাজ করত আর বন্ধুদের নিয়ে প্রোমোটারীও করত।পরে সেই চাকরী ছেড়ে এখন আরও বড় চাকরী নিয়ে মহারাস্ট্রের রায়গড়ে পোস্টেড।দেবু শ্বশুর শাশুড়ীর প্রতি খুবই কর্তব্যপরায়ণ।সুধাময় তো দেবুকে খুবই পছন্দ করতেন।সবই ভাল, কিন্তু দেবুর লাইফস্টাইল এর সঙ্গে টীনা খাপ খাওয়া তে পারে না।টীনা ওই সব মদ,ক্লাব ,পার্টীর, হুল্লোড় এর সঙ্গে সবসময় সায় দিতে চায় না।ফলে মাঝে মাঝে ই গন্ডগোল ,মেয়ের নামে জামাই এর অভিযোগ শ্বশুরের কাছে।তবে ইদানিং ছেলেমেয়ে বড় হয়ে যাওয়ার পর শ্বশুর এর মৃত্যু র পর সেই গন্ডগোলে ভাটা পড়েছে।এবার ওরা শিবময়ী কে ফর্টিস হাসপাতালে ভর্তি করাল।এই সব হাসপাতাল গুলো র ব্যাবস্থা খুব ভাল।কিন্তু শিবময়ী আর যেন ভাল হতে পারছেন না।এই দিনে তিরিশ চল্লিশ হাজার খরচ চালিয়ে আর কতদিন এমন চিকিৎসা চলবে?অতীনকে খবর দেওয়া হয়েছে।ও দিন দুয়েকের মধ্যে ই আসবে আমেরিকা থেকে।সুধাময়ের মৃত্যু র পর অতীন একাই এসেছিল।বৌমা আসতে পারে নি মেয়ের পড়ার জন্য।এবারও অতীন এল, একটু যেন মোটা হয়ে গেছে।শিবময়ী আবছা দেখতে পাচ্ছেন যে,দুই ভাই বোন অত্যন্ত চিন্তিত মুখে ডাক্তারের সঙ্গে কি সব আলোচনা করছে।শরীরটা কেন যে শেষ হয়ে যায় না।আর যেন সেই কাঁটাছেড়া , চারিদিকে নল সহ্য হয় না। শিবময়ী র।অতীনকে বল্লেন "আমায় বাড়ি নিয়ে চল,ওখানেই যা হওয়ার হোক।"কিন্তু কিছুতেই লাইফ সাপোর্ট খোলা যাচ্ছে না।আজ শরীরটা একটু ভাল তো কাল অত্যন্ত খারাপ।এরই মধ্যে শিবময়ী খুব বুঝতে পারছেন যে যতদিন যাচ্ছে রেস্তর জোর কমে আসছে,জমানো টাকা তো একদিন শেষ হবেই।

অনেক পীড়াপিড়ী করে অতীন ডাক্তারের অনুমতি নিয়ে শিবময়ী কে হাসপাতাল থেকে রিলিজ এর ব্যাবস্থা করাল।ওদের নিজে দের বাড়িতে দ্বিতীয়টি কোন লোক নেই,তাই টীনার বাড়িতে আসা , নার্স,অক্সিজেন নেবুলাইজার সব ব্যবস্থা করা গেল।

অতীন সব ব্যবস্থা করে,মাকে বোনের বাড়িতে রেখে আবার আমেরিকা পাড়ি দিল।এবার যাওয়ার সময় শিবময়ী খুব বুঝতে পারলেন যে,ছেলের সঙ্গে এই শেষ দেখা।জীবন যে কি অদ্ভুত,এই তো এগিয়ে নিয়ে যেতে কত কষ্ট,কিন্তু শেষও হয়ে যাচ্ছে না।

এর মধ্যে একদিন টীনা এসে বলল--' মা, আজ ষষ্ঠী,দুর্গাপূজোর শুরু।আয়াকে একটি নতুন নাইটি দিয়ে বলল--' মাকে পরিয়ে দিও।"

শিবময়ী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে ।কথা বলতেও যেন কত কষ্ট।মনে পড়ে যখন ছেলে মেয়ে বড় হয়ে নিজের নিজের বন্ধুদের সাথে পূজো য় ঘুরতে বেরোত, তখন সুধাময় বলতেন--," চল মণি,আমরা এবার নতুন কাপড় পরে কটা ঠাকুর দেখে আসি।" এই কাছেপিঠে যোধপুর পার্ক,সেলিমপুর,বাবু বাগানের ঠাকুর দেখে বাড়ি ফিরতেন ষষ্ঠীর র দিন।বলতেন-" অন্য দিন পর না পর,ষষ্ঠীর দিন নতুন জামা কাপড় পরতেই হবে,বচ্ছরকা দিন।"

কিন্তু শিবময়ীর তো আর দিন কাটে না।সেই অক্সিজেন,স্যালাইন এর নল ,দিনে কয়েরবার নেবুলাইজার,প্রাণটা যে কেন বেরিয়ে যাচ্ছে না।অষ্টমীর দিন টীনার মেয়ে হিয়া, নতুন ড্রেস পরে এসে দাঁড়াল।আয়া জিজ্ঞেস করলেন,-" দিদা একে? চিনতে পারছ?"

নিজের নাতনীকে চিনবেন না।শিবময়ী বলেন,-" বাঃ,বেশ সুন্দর লাগছে।"

মনে পড়ে যায় অতীন আর টীনা ,দুই ভাই বোন কে ছোটবেলায় যখন নতুন জামা পরিয়ে পাড়ার পূজো য় নিয়ে যেতেন অষ্টমী তে অঞ্জলী দেওয়ার জন্য।কিন্তু এখন সবই বিস্বাদ।নবমীর দিন সকাল থেকেই শিবময়ীর অবস্থা আরও খারাপ হল।শরীরটা বার বার নেবুলাইজার দেওয়ার পরও আর উন্নতি হচ্ছে না।বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেমন যেন একটা উলটো শ্বাস এর ঘড় ঘড় আওয়াজ আসছে বুকের ভেতর থেকে।নার্স এসে টীনা কে বলায় ,টিনা ডাক্তারকে ফোন করল।ডাক্তার বললেন--"ফর্টিস এর অ্যাম্বুলেন্স ডেকে আই সি সি ইউ তে ভর্তি করে দিন"

আবার শিবময়ী কে আই সি সি ইউ তে ভর্তি করা হল।এবার টীনাকে একটি প্রতিবেদনে সই করে হল যে,তাদের স্ব-ইচ্ছায় রোগীকে ভেন্টিলেশন এ দেওয়া হল না।

দশমীর দিন সকাল থেকে আকাশের মুখ ভার।মাঝে মাঝে হালকা বৃষ্টি হচ্ছে।শিবময়ীকে হরেক রকম নল ,অক্সিজেন,স্যালাইন এর সাহায্যে আই সি সি ইউ তে রাখা হয়েছে।বিকেলে ডাক্তারদের চাহিদা অনুযায়ী দু বোতল রক্ত র ব্যাবস্থা করতে কালঘাম ছুটে যায় টীনা আর দেবু র।একে দশমীর ছুটি ব্লাডব্যাঙ্ক পর্যন্ত বন্ধ,তায় উৎসবের মরসুমে এমনিতে ই রক্ত অপ্রতুল।বিশেষ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তার ব্যবস্থা করতে রাত নটা বেজে গেল।দেবু ঠিকই আশঙ্কা করেছিল , ব্যাবস্থা তো হল,কিন্তু সেই রক্ত রোগীর শরীরে দেওয়া যাবে তো?

শিবময়ী র এখন যেমন অবস্থা,তাতে মনে হয় শুধুই কিছু সময়ের অপেক্ষা।কাঁচের ঘরে শিবময়ী অসংখ্য নল লাগানো অবস্থায় শুয়ে।মনে হয় মুখে চোখে কি নিদারুন যন্ত্রনা র ছাপ।মুখটা কেমন যেন ফুলে উঠেছে।শরীরের সব রক্ত যেন মুখে এসে জমেছে।শিবময়ীর অচেতন শরীরের থেকে প্রাণ যাওয়ার আগে স্থির চোখে সুধাময় ,আরও অনেকেই ফটোফ্রেমে কেমন ভেসে ভেসে আসছে,ঘুম আসছে-- কে যেন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে---ঘুম আসছে-- -- --

রাত তখন বারোটা বেজে পাঁচ।শিবময়ীর দেহ নিথর হয়ে এল,যেন সে কোন এক অনন্ত যাত্রায় চলেছেন,দশমীর মধ্যরাতে।

কোথায় যেন বেজে চলছিল সেই গানের কলি -" মা , বুঝি মোর কৈলাসে চইলাছে-------++"







নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮