• পার্থ সেন

গল্প - রক্তের স্বাদ মিষ্টি






মঙ্গলবার


“কি বলছেন কি?”

অফিসে সাধারণত উঁচু গলায় কথা বলেন না ধারাপাত বাবু। কিন্তু এটা শোনার পর আর নিজেকে স্থির রাখতে পারেননি। অফিস থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির কাছে চলে এলেন তিনি।

একা মানুষ বয়স প্রায় আটান্ন, বছর দুয়েক বাদে রিটায়ারমেন্ট, পয়সাও করেছেন অনেক। বউবাজারে পৈতৃক বাড়িতে সারা জীবন কাটিয়েছেন, বিয়ে থাওয়া করেননি, নেশা বলতে দুটো। প্রতি পুজোয় আর শীতে ঘুরতে যাওয়া আর দ্বিতীয়টা অবশ্য স্বাস্থ্যকর নেশা নয়। তবে অযথা ধূমপান তিনি করেননা, পরিমিত দিনে ঠিক তিনটে। গত একত্রিশ বছর ধরে দিনে চারটের বেশী হয়নি, কম হয়েছে কিন্তু বেশী কখনো না। আর শখ বলতে ধারাপাত বাবুর একটাই শখ – সেটা হল পুরোনো পেন সংগ্রহ করা। পেন মানে চলতি কথায় আমরা যাকে ‘ডট পেন’ বা ‘বল পেন’ বলি সেটা আবার তাঁর বড় অপছন্দের। তাঁর পছন্দ হল ‘ঝর্ণা’ মানে ‘ফাউন্টেন’ পেন। যে জিনিসটা এখনকার দ্রুত পৃথিবীতে একেবারেই চলে না। কিন্তু তিনি ব্যতিক্রম। আসলে কলমের নিব এখন বেশ দুষ্প্রাপ্য জিনিস, বেশীর ভাগ পেনের কোম্পানী যাঁরা আগে পেন বানাতেন তাঁরা হয় বাণিজ্যিক চাহিদার জন্য এখন অন্য ধরণের পেন বানান। অথবা ফাউন্টেন পেন বানানো বন্ধ করে দিয়েছেন। তা নিয়ে ধারাপাত বাবুর মতো কিছু মানুষ পড়েছেন মহা মুশকিলে। বাড়িতে তাঁর সংগ্রহে প্রায় দেড়শ’র ওপর পেন। তাঁর মধ্যে কিছু পেন অনায়াসে মিউজিয়ামে রাখা যায়। যেমন পুনেতে জেলে থাকাকালীন মহাত্মা গাঁধি সেখানকার জেলারের কাছ থেকে একটি পেন নিয়ে একটি চিঠি লিখেছিলেন, সেই পেন নানা হাত ঘুরে ধারাপাত বাবুর সংগ্রহে এসেছে। নাগপুরে এক মারাঠি ভদ্রলোকের কাছ থেকে একেবারে জলের দরে পেনটি কিনেছিলেন তিনি। এছাড়া বিজ্ঞানী সত্যেন বোসের ব্যবহৃত পেন, যেটা বিজ্ঞানী সত্যেন বোস তাঁর কোন ছাত্রকে উপহার দিয়েছিলেন, সেই পেন তাঁর সংগ্রহে আছে। দিল্লী থেকে বেশ বছর পনের আগে সংগ্রহ করেছিলেন র‍্যাটক্লিফ সাহেবের ব্যবহার করা একটা পেন, যেটা নাকি খোদ লন্ডনের ‘মেরিজ’ কোম্পানীর তৈরি, সোনার জলে পালিশ করা নিব। এই রকম আর কি! সংগ্রহ তো অনেককার থাকে কিন্তু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য যে, তাঁর সংগ্রহে থাকা প্রায় সব কটি পেনই কিন্তু চালু।

যাহোক, ধারাপাত বাবু যখন অফিসে নিয়মিত যান পকেট থেকে উঁকি দিতে থাকে তিনটে ভিন্ন রংয়ের ঝর্ণা কলম। এখনো পাড়ার ভ্যারাইটি স্টোরস তাঁর জন্য ফাউন্টেন পেনে ঢালার কালী নিয়ে আসে। আর এটা তাকে প্রায়ই শুনতে হয়, ‘তিনি ছাড়া আর নাকি কোন ক্রেতা তাঁদের নেই’। এ’ছাড়া নিয়মিত অনলাইনের মাধ্যমে পেন চালু রাখার কালী বা অন্যান্য সরঞ্জাম তিনি কিনতে থাকেন। পার্ক স্ট্রীটের এক পুরোনো পেন সারানোর দোকানে তিনি প্রায়ই যাতায়াত করেন পেন সারাতে। বলে রাখা দরকার, সেই পেন সারানোর দোকান এখন ঘড়ি সারানোর দোকান হয়ে গেছে, কিন্তু যিনি পেন সারাতেন তিনি এখনো আছেন। আর তাই, ধারাপাত বাবুর সেখানে যাওয়া বন্ধ হয়নি। আর হ্যাঁ, এমনিতে ধারাপাত বাবু কিন্তু খুব হিসেবী। অতিরিক্ত কোন খরচ করা তাঁর স্বভাব বিরুদ্ধ। এই যেমন, গত বছর কেদারনাথ গেছিলেন, সাতান্ন বছর বয়সে সহজেই পারতেন হেলিকপ্টারে চেপে পাহাড়ে উঠে মন্দির দর্শন করতে কিন্তু করেননি, সেই হেঁটেই উঠেছেন। সঙ্গে অমিতাভবাবু ও তাঁর পরিবার ছিল, তাঁরা হেলিকপ্টারেই গেলেন, বারে বারে ওনাকে বললেন, “তুমি তো একা, কতো আর খরচা হবে তোমার? আর হেঁটে উঠলেই যে পুণ্য বেশী হবে কে বললে তোমায়?”

“না পুণ্য টুণ্য কিছু নয়! তোমরা ওঠো! আমি হেঁটেই যাই, হেঁটে পাহাড়ে চড়ার মজাই আলাদা”

কিন্তু সব হিসেব গণ্ডগোল হয়ে যায় এই পেনের ব্যাপারে। বছর দুয়েক আগে মাদুরাই গেছিলেন, সেখানে কোন দোকানে একটি পেন দেখেছিলেন, ‘মেড ইন অস্ট্রেলিয়া’, আগাগোড়া রুপোয় তৈরি আর সোনার জলে পালিশ করা, প্ল্যাটিনামের নিব, অস্ট্রেলিয়া থেকে সেই পেনের কালী নিয়মিত কিনতে হয়। তিনি কিন্তু পিছিয়ে আসেননি। সাড়ে এগারো হাজার টাকা দিয়ে সে জিনিস তিনি কিনেছিলেন। আবার বছরে একবার সেই কলমের কালিও আসে সিডনী শহর থেকে।

আর হ্যাঁ, আর একটা অভ্যাস ও আছে ধারাপাতবাবুর। ধারাপাতবাবু নিয়মিত ডাইরী লেখেন। এই যে প্রায় কুড়ি বছর ধরে এতো পেন তিনি সংগ্রহ করেছেন সমস্ত পেনের ইতিহাস তাঁর ডাইরীতে লিখে রেখেছেন। যাহোক, পার্ক স্ট্রীটে তিনি যেখানে পেন সারাতে যান তার পাশেই ‘রয় অ্যান্ড সন্স’এর দোকান। সেটা মূলত উপহার সামগ্রীর দোকান, তবে তাঁরা পুরোনো মানে ‘অ্যান্টিক’ জিনিস পত্রও রাখেন। আগেই বলেছি পুরোনো কলমের ব্যাপারে ধারাপাত বাবুর আগ্রহের কথা, তাই চেনাশোনা হতে সময় লাগেনি। তা সেখান থেকেই ফোন এসেছিল। ধারাপাত বাবু প্রথমটায় বুঝতে পারেননি। যাহোক, কথা বলে যেটা বুঝলেন, বারমিংহ্যাম থেকে সোয়ান কোম্পানীর তৈরি ১৮০৫ সালের মডেল সেফটি পেন কোনভাবে রয় অ্যান্ড সন্সের হাতে এসেছে, সেই কারণেই ফোন।


‘১৮০৫’ মানে দুশো বছরের পুরোনো পেন, ভেবেই ভালো লাগছে ধারাপাত বাবুর। অফিস শেষ হতেই দৌড় লাগালেন পার্ক স্ত্রীটের উদ্দেশ্যে। পৌঁছতে প্রায় সাতটা হল। বাদামী রঙের লম্বা নীচের অংশটা, ওপরের অংশটা স্টীল রঙের আর পেনের সোনালী রঙের ঢাকনা। স্ক্রুয়ের মতো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঢাকনা পেনের ওপরের অংশে লাগাতে হয়। সোনালী রঙের খাপে সোয়ান কোম্পানীর ছাপ। কোম্পানীর নাম সোয়ান হলেও কোম্পানীর ছাপ ‘একটা বাঘের হাঁ করে থাকা মুখ’। কলমের নিবেও সেই ছাপ রয়েছে। আর হ্যাঁ, কলমের নিব, ধবধবে সাদা রঙয়ের। চিন্ময়বাবু যিনি এই সব পুরোনো জিনিসের ব্যবসাটা দেখেন তিনি বলনেন, কলমের নিব নাকি হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি। আসলে হাতির দাঁতের ওপর ধাতব আস্তরণ, একটু বাঁকা করলেই দেখা যায়। যাহোক, চিন্ময়বাবু এও বললেন, এই মডেল নাকি ১৮০৫ সালের। বারমিংহ্যামের দক্ষিণ পূর্বে কভেন্ট্রি শহরে ছিল সোয়ানদের পেন তৈরির কারখানা, সেখান থেকেই তৈরি হয়েছিল এই ঝর্ণা কলম। হাতীর দাঁত দিয়ে কলমের নিব তিনি শুনেছিলেন কিন্তু কখনো দেখেননি। সোয়ান কোম্পানী নাকি এই ধরণের কলম বানানো বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তাই কলমটা দেখে সেটাকে পছন্দ না করার মতো কারণ ছিল না। এক প্রকার জলের দরেই পেয়ে গেলেন ধারাপাতবাবু, দু’শ বছরের একটি পুরোনো পেন। মাত্র দেড় হাজার টাকা!

একটা প্রশ্ন সকাল থেকেই মাথায় ঘুরছিল ধারাপাতবাবুর, করেই ফেললেন এবারে, “আপনি কোথা থেকে পেলেন এটা?”

“আমাদের সোনারপুরে যে ব্র্যাঞ্চ আছে সেখানে এটি সংগ্রহ করা হয়েছে, কেউ বোধহয় বিক্রী করেছেন। ঐদিকে এই জিনিসের তেমন কোন ক্রেতা নেই, তাই ওরা কাল আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল।”

“বাহ! খুব ভালো করেছেন! আচ্ছা কালি কি স্পেশাল কিছু ব্যবহার করতে হবে?”

“সাধারণ নীল বা কালো কালি ব্যবহার করবেন, আমি দেখে নিয়েছি ভালো চলছে। আপনিও একটু লিখে দেখে নিন না।”

লিখে দেখলেন, খুব সুন্দর! মন ভরে গেল। একে, এই রকমের ভারী নিব তার ওপর এই রকম অভিজাত দর্শন, তার ওপর কলমের সোনালী রঙের ঢাকনার ওপর ‘বাঘের হাঁ করা মুখ’, সেটা পকেটের সামনে থেকে উঁকি মারছে, ধারাপাতবাবুকে আর পায় কে? শার্টের পকেটে পেনটা গুঁজে বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন ধারাপাতবাবু।


মঙ্গলবার ভোররাত


কেমন একটা অস্বস্তিতে ঘুম ভেঙে গেল ধারাপাতবাবুর। মাথার কাছে মোবাইল রাখা থাকে, বোতাম টিপতেই কেমন আলোকিত হয়ে উঠল জায়গাটা। সময় দেখাচ্ছে তিনটে সাতান্ন। গলাটা বড্ড শুকিয়ে গেছে, পাখাটাও কেমন যেন আস্তে হয়ে গেছে। অযথা একটু বেশী আওয়াজ করে ঘুরছে। হয়তো কারেন্ট নেই, ইনভাটারে পাখার গতি একটু কমে যায়। বেড সুইচটা জ্বালানোর চেষ্টা করলেন, যা ভেবেছিলেন তাই! কারেন্ট নেই। যা জল তেষ্টা পেয়েছে এখন না উঠলেও হবে না! আসলে জলের বোতলটা রাখা থাকে ঘরের ওপর প্রান্তে রাখা একটা টেবিলের ওপর। কিন্তু সেখানে পৌঁছতে গেলে আগে ঘরের আলোটা জ্বালানো দরকার। উঠে একটু এগোতেই কেমন পায়ে একটা স্পর্শ পেলেন। অস্কার! ধারাপাতবাবুর বাড়ির একমাত্র সঙ্গী অস্কার। অস্কার বারো বছরের ধপধপে সাদা রঙের ল্যাব্রাডর, ধারাপাতবাবু বাড়ী না ফিরলে অস্কার ঘুমোয় না। বসন্তদা রান্না করে চলে যান, অস্কারকে খেতে দিয়েও যান। অস্কার খুব বাধ্য, খেয়ে নিয়ে চুপ করে দরজার কাছে বসে থাকে। ধারাপাতবাবু বাড়ী ফিরলে তবে নিশ্চিন্ত হয়ে শুতে যায়। বারো বছর বয়স হয়ে গেলেও অস্কার কিন্তু খুব সজাগ। কোন গোলমাল দেখলেই সে ঘুম থেকে উঠে পড়ে, অবশ্য বেশী চেঁচামেচি করেনা। অবস্থার গুরুত্ব বুঝে রিঅ্যাক্ট করে।

কিন্তু অস্কার কি করছে এতো রাতে? আর অস্কার তো শোয় অন্য ঘরে! অবশ্য রাতে ঘরের দরজা খোলাই থাকে। কিন্তু সে ঢুকল কেন ঘরে? তাহলে চোর টোর এলো নাকি? তাহলে অস্কার চুপ করে বসে আছে কেন? তাড়াতাড়ি আলোটা জ্বালালেন ধারাপাতবাবু। একরাশ অন্ধকার কাটতে একটু সময় লাগল। টেবিলের ওপর রাখা জলের বোতলটা নিতে গিয়েও নিতে পারলেন না ধারাপাতবাবু! খাটের পাশে অস্কার জেগে বসে আছে! আশ্চর্য! কাছে ডাকলেন অস্কার কে। অস্কার কিন্তু এলো না, সেই জায়গায় বসেই মাথাটা মাটির ওপর রাখল সে। ঢকঢক করে বেশ খানিকটা জল খেলেন ধারাপাত বাবু। আবার অস্কারর দিকে চোখ গেল! অস্কার কেমন যেন জবুথবু হয়ে বসে আছে। ঘরের দরজা দিয়ে তাও একবার বাইরে গেলেন ধারাপাত বাবু। ঘরে সোনাদানা হয়তো নেই, তবু একবার দেখা দরকার। মিনিট খানেকের পর্যবেক্ষণের পর বুঝলেন সব কিছু ঠিক আছে! যাক! তাহলে চোর আসে নি! বাড়ির দরজা ঠিক ভাবে বন্ধ আছে, অন্য ঘরের আলো নেভা, রান্নাঘরও বন্ধ আছে! তাহলে অস্কার এই ঘর থেকে অন্য ঘরে গেল কেন? ঘরে ঢুকে নিজের খাটে বসলেন ধারাপাত বাবু, অস্কারকে কাছে আনতে গেলে সে কিন্তু কেমন দূরে চলে গেল! মনে হচ্ছে কেমন যেন ভয় পেয়েছে সে! জোর করে কাছে টেনে নিলেন তাকে। অস্কার অন্যদিকে মুখ করে বসে আছে, তার কপালের বলিষ্ঠ বলিরেখা গুলো যেন জানান দিচ্ছে তার মনের অযথা চিন্তা! বারো বছর ধরে তাকে লালন করছেন তিনি, অস্কারর প্রতিটি অভিব্যক্তি নিজের হাতের তালুতে দেখতে পান তিনি। তাকে জোর করে খাটে একে বসালেন, এবারে ডান হাতের দুটো আঙ্গুল কেমন চটচট করে উঠল! লাল রঙের কি যেন লেগেছে! কি ব্যাপার? চোখে দেখলেও ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে ধারাপাত বাবুর একটু সময় লাগল। অস্কারর গলার বাঁদিকে একটা সুক্ষ ক্ষত হয়েছে, সেখান থেকে ফোঁটা ফোঁটা করে রক্তক্ষরণ হচ্ছে আর তাতে ধবধবে সাদা গলার বাঁদিক টা কেমন যেন গোলাপী হয়ে উঠেছে।


বুধবার সকাল


“দেখুন আমার কি মনে হচ্ছে, খুব শার্প কিছু দিয়ে এটা হয়েছে! বাড়ীতে সব কিছু ঠিকঠাক ভাবে রাখা থাকে তো!” বেশ মিনিট তিনেক ধরে অস্কারকে পরীক্ষার পর ডঃ অজাতশত্রু সরকার বললেন। ডঃ সরকার গত পাঁচ বছর ধরে অস্কারকে দেখছেন। প্রায় ষাটের কাছাকাছি বয়স, ভেটান্যারী সার্জেন হিসেবে খুব নামডাক ওনার। নাকের ওপর ঝুলে পড়া আধখানা চশমার ওপর দিয়ে টেবিলের উল্টোদিকে বসে থাকা ধারাপাতবাবুর দিকে তাকালেন।

ধারাপাতবাবু’র নিজের সংসার নেই, অস্কার ছাড়া নিজের বলতে ওনার তেমন কেউ আর নেই। সেই সকাল পৌনে ন’টায় চলে এসেছেন হাসপাতালে। প্রবল উৎকণ্ঠায় কাটিয়েছেন সকাল থেকে। অসাবধানতা বা দায়ীত্বহীনতা দুটোই তাঁর স্বভাববিরদ্ধ, “ঠিকঠাক ভাবে মানে?”

“এই ধরুন, কাঁচি বা ছুরি এই ধরণের কোন জিনিস! নিশ্চয়ই উল্টোপালটা জায়গায় রাখা ছিল!”

“কেন আপনার কি মনে হচ্ছে ঐ সব কিছু দিয়ে হয়েছে?”

“বাড়িতে শার্প জিনিস বলতে আমরা প্রধানত ঐ দুটোই বুঝি! আর যদি না কোন অ্যাসল্ট হয়ে থাকে”

“অ্যাসল্ট? মানে মার ধোর করা?”

“হ্যাঁ! এখন সেটাকে যদি আপাতত সরিয়ে রাখি, ছুরি কাঁচি ছাড়া এতো গভীর ক্ষত হয় কি করে?”

“আচ্ছা কিছু কামড়ায়নি তো?”

“ভেরি আনলাইকলি! পোকামাকড় কামড়ালে এতো ডিপ ইনিজুরি তো হওয়া উচিত নয়”

“আচ্ছা ওখানে কোন ইনফেকশন হবে না তো!”

“আমি মেডিসিন দিয়ে দিচ্ছি! ওকে একটা ইনজেকশনও দেব! একটু ব্লাড লসও হয়েছে অবশ্য সেটা নিয়ে খুব একটা চিন্তা নেই, তবে দেখবেন! এই রকম জিনিস যেন আর না হয়! কুকুর যখন ঘরে রেখেছেন এইটুকু নিরাপত্তা তো আপনাকেই নিতেই হবে!” ডঃ সরকার কেমন যেন ধারাপাতবাবুকেই দায়ী করছেন।

ধারাপাতবাবু শান্ত, নরম স্বভাবের লোক। কিন্তু এইরকম বিনা কারণে দোষারোপে একটু দিশেহারা লাগছিল। যদিও এখন মেজাজ গরম করার সময় নয়, তবু ঠাণ্ডা মাথায় ভাবার চেষ্টা করলেন। বাড়ীতে ছুরি ব্যবহার করে বসন্তদা, রান্নাঘরে থাকে। এছাড়া আর কোন ছুরিতো বাড়ীতে নেই। কাঁচি তো তিনি ব্যবহার করেন না! সেই ছোটবেলা থেকেই দাড়ি কামানো বলতে তিনি গোঁফ দাড়ি দুটোকেই সাফ করা বোঝেন। ছোটখাটো কাগজ বা পার্সেল প্যাকেট কাটাকাটি করার জন্য একটা কাঁচি আছে বটে তবে সে তো একেবারেই ছোট! তা দিয়ে এতো বড় ক্ষত হতে পারে কি? বলা যায় না, কি থেকে কি হয়ে যায়? সাবধানে রাখতে হবে সব কিছু! সবচেয়ে বড় কথা ঐ রকম একটা ক্ষততে অস্কারর শরীরে কি কম ব্যাথা লেগেছে? কিন্তু একটা জিনিস সবচেয়ে বেশী অবাক করছে। অত বড় একটা ক্ষত হবার পড় অস্কার একবারও চেঁচাল না! তার স্নায়বিক অনুভূতি গুলো এখনো আছে! তাহলে?

গলার ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে একটা ব্যান্ডেজ করে দিলেন ডঃ অজাতশত্রু। আঘাতের জায়গাটাকে ঢেকে রাখার জন্য একটা কলার পরিয়ে দিলেন। তাকে কি বলে সেটা আগে জানতেন না ধারাপাত বাবু, সেটাকে নাকি ‘এলিজাবেথান কলার’ বলে। এদিকে ধারাপাতবাবুর গাড়ী নেই, সকালে হাসপাতালে আসার সময় কোন মতে পাড়ার একটি ছেলেকে ম্যানেজ করে অস্কারকে নিয়ে এসেছিলেন কিন্তু এখন ফেরার সময় কোন উপায় নেই। হেঁটেই ফিরতে হবে। সেই ভোর রাত থেকে যা ধকল যাচ্ছে বাড়ী গিয়ে একটু বিশ্রাম নেবেন ভেবেছিলেন, ঠিক এই সময়ে ফোন বাজল। অফিস থেকে মিত্রসাহেব, মিত্র সাহেব ওঁদের ব্র্যাঞ্চ ম্যানেজার, ধারাপাতবাবুর বস।

“হ্যাঁ স্যার”

“কি হল? শুনলাম আপনার কুকুরের নাকি কি অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে?”

“হ্যাঁ স্যার! কি করে যে হল বুঝলাম না! গলার কাছে একটা ডিপ কাট! খুব রক্ত বেরিয়েছে!”

“সে কি? কি রে হল?”

“জানি না! কাল রাতে যখন বাড়ী ফিরেছি তখন তো কিছু দেখিনি”

“বাইরের কেউ ইনভলভড নেই তো! মানে কেউ ধরুন ওকে মারতে চেয়েছিল”

“মারতে চেয়েছিল? মারবে কেন ওকে? আর এমন তো নয় ও রিসেন্টলী এসেছে। বারো বছর ধরে এখানে আছে! বাড়ীতেই কিছু একটা হয়েছে!”

“আচ্ছা সে যাক! তারপর এখন কেমন আছে?”

“এই তো ডাক্তার দেখিয়ে আসছি! ডাক্তার অবশ্য বললেন তেমন চিন্তার কিছু নেই!”

“তা আপনি কি আসছেন আজ?”

“স্যার বলছিলাম কি বড্ড টায়ার্ড হয়ে পড়েছি! আজকের দিনটা বিশ্রাম নিতে পারলে ভালো হতো”

“ঠিক আছে, কোন প্রবলেম নেই! খালি একটা ফাইল আপনার বাড়িতে পাঠাচ্ছি, খোকন গিয়ে দিয়ে আসবে! সেটা একটু করে রাখলে খুব সুবিধা হয়! অসুবিধা হবে?”

“কোন অসুবিধা হবে না! আমি কাল সকালে অফিসে আসার সময় নিয়ে আসব”


বৃহস্পতিবার


আগের দিনের খোকনের দিয়ে যাওয়া ফাইলে কাজ করতে করতে ‘সোয়ান’ কোম্পানীর মডেল সেফটি পেনের মাহাত্ম্য বুঝলেন ধারাপাতবাবু। কি সুন্দর লেখা পড়ল, মন ভরে গেল! কোন অতিরিক্ত কালির ছটা নেই আবার কালির গতিতে কোন অভাবও নেই। ঠিক যতটা দরকার ততটাই! কারা যে ডট বা বল পেন নিয়ে এলো কে জানে! ধারাপাতবাবু খালি ভাবছিলেন এমন ঝর্ণা পেনে লিখলে যার হাতের লেখা সবচেয়ে খারাপ তাঁর হাতের লেখা সুন্দর হয়ে যাবে। মানে এই পেন ধরলেই লিখতে ইচ্ছে হবে! এমন অসাধারণ এর রূপ এবং তেমনই এর গুণ! তবে খালি একটা জিনিস। লেখাটা একটা কালচে নীল রঙের। সেটা হয়তো অনেকদিন ব্যবহার না করার জন্য।

বাড়ীতে অবস্থা আবার আগের মতো। ডঃ অজাতশত্রুর চিকিৎসা খুব ভালো, এমন ওষুধ দিয়েছেন যে চার পাঁচ ঘন্টার মধ্যে অস্কার আবার চাঙ্গা হয়ে উঠেছে, সব কিছু আগের মতো। বসন্তদা বলছিলেন রান্না ঘরে একটা ক্যাবিনেট ভেঙে গেছে, সেখান থেকে একখানি পেরেক বেরিয়ে পড়েছে, সেখান থেকেই হয়তো অস্কারর অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে। সেটাকে কাল রাতের মধ্যেই মেরামত করেছেন ধারাপাতবাবু। কাল রাতে অনেক দিন বাদে অস্কারকে নিজের ঘরেই শুইয়েছিলেন, সেও খুব ঘুমিয়েছে আর ধারাপাতবাবুও নির্বিঘ্নে ঘুমিয়েছেন। সেই যে এগারোটা দুই মিনিটে আলো নিভিয়েছেন ঘুম ভাঙ্গল তখন দেওয়াল ঘড়িতে ঘড়ির কাঁটা প্রায় ছটায় পৌঁছেছে।

ধারাপাতবাবু অফিসে কাজের ব্যাপারে কিন্তু খুব সিরিয়াস। কাজে অবহেলা অথবা ফাঁকি দেওয়া এইসব তাঁর স্বভাব বিরুদ্ধ। আর দশ মাস বাদে তাঁর রিটায়ারমেন্ট, কিন্তু মিত্র সাহেব বারে বারে অনুরোধ করছেন যাতে ধারাপাতবাবু আরো বছর দুই কাজ করেন। আসলে এই অফিসটা নতুন, এর ব্যবসা এবং পরিকাঠামো পরিণত করতে আরো বছর দুই তো লাগবেই, তাই মিত্রসাহেবের সেই অনুরোধ। ধারাপাতবাবু অবশ্য এখনো কিছু ঠিক করেননি। কাজ করছিলেন বেশ মন দিয়ে। সব কিছুই ঠিক ছিল! বিকেল সাড়ে তিনটের সময় তিনি যখন দিনের দ্বিতীয় সিগারেটের বিরতি নিচ্ছেন সে সময়ে সুদীপবাবু বললেন, “কি ব্যাপার ধারাপাতবাবু? শরীর খারাপ নাকি?”

“কেন শরীর খারাপ হবে কেন?”

“কেমন যেন দুর্বল লাগছে আপনাকে?”

“না আমি তো ঠিকই আছি”

“তাহলে সব ঠিক আছে! কেমন যেন রক্তশূন্য লাগছে তাই বলছিলাম”

রক্তশূন্য! ধারাপাতবাবু কোনদিন রক্তাল্পতায় ভোগেননি। তবে শুনেছেন রক্তাল্পতায় ভুগলে নাকি মানুষ দুর্বল হয়ে পড়ে, মাথা ঘোরে। সেরকম কিছু সমস্যা তো তাঁর নেই। তাহলে? তবু তাড়াতাড়ি সিগারেট শেষ করে বাথরুমে গেলেন। নিজে ডাক্তার না হলেও এইটুকু তিনি জানেন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের নীচের অংশটা টেনে নীচের দিকে নামালেন, একটু কম লাল লাগছে কি? বোঝা গেল না! নিজেকেই নিজে বোঝালেন, সুদীপবাবু কি ডাক্তার নাকি? কি করে বলে দিল আমি অ্যানিমিক! যত বোগাস! নাহলে জেলাসি! মিত্রবাবু আমাকে থাকতে বলছেন তো, তা শুনে হিংসায় জ্বলে পুড়ে মরছে!

সুদীপ বসু ‘বোগাস’ নাকি ‘জেলাস’ সেটা নিয়ে ধারাপাতবাবু আর ভাবেন নি, তবে কিছু একটা সমস্যা যে আছে সেটা কিন্তু নিশ্চিত! সেটা বোঝা গেল ধারাপাতবাবু বাড়ি ফিরে বাথরুমে যাবার পড়। বাড়ি ফিরেই বাইরে পরা জামা কাপড় ধুয়ে ফেলা তাঁর গত তিরিশ বছরের স্বভাব। আজও তাঁর ব্যতিক্রম হয়নি। গেঞ্জি যখন কাচছেন তখন নজরে এলো গেঞ্জির সামনের দিকে একটা অংশে একটা বেশ বড় আকারের বৃত্ত হয়েছে, যার রং লাল। ঠিক ছোটবেলায় জামায় কালি পড়ে গেলে যেমন সেই কালির রঙের একটা বৃত্ত হয়ে যেত, ঠিক তেমন! জামার ওপর লাল দাগ হলে তাও বোঝা যেত কিন্তু জামার ভেতরে গেঞ্জির ওপর? সেই লাল দাগ এলো কি করে? নিশ্চয়ই বাইরে থেকে আসেনি, তাহলে উৎস কি শরীরের ভেতরে থেকে? তাড়াতাড়ি আবার আয়নার সামনে দাঁড়ালেন নিজের শরীরের সামনের অংশটা পরীক্ষা করতে! যা ভেবেছিলেন তাই! বুকের একটু বাঁদিক ঘেঁষে একটা ছোট ক্ষত, অবশ্য তা থেকে এখন আর রক্ত বেরোচ্ছে না, রক্ত জমাট বেঁধে গেছে।


শুক্রবার


অনেকদিন ডাইরী লেখা হয়নি, আর এই সোয়ান কোম্পানীর পেনের ব্যাপারেও লেখা হয়নি। তাই ধারাপাতবাবু ঠিক করেছেন আজ রাতে খেয়ে দেয়ে লিখবেন। কাল অফিস বন্ধ, সকালে ওঠার তাড়া নেই। আর আজ শরীরও বেশ সুস্থ। ডঃ অনীশ সোম ধারাপাতবাবুর দূর সম্পর্কের ভাই হন। বেহালায় থাকেন, আজ সকালে ওনার বাড়ীতেই গিয়েছিলেন। ডঃ সোম ওষুধ দিলেন, বললেন তেমন চিন্তার কিছু নেই। কোন কারণে ক্ষত হয়েছে, আর সেটা অনেক কারণেই হতে পারে। আর তাঁর জন্য রক্তক্ষরণ হয়েছে। রক্তচাপ ঠিক আছে, শরীরে অন্য কোন সমস্যাও নেই। তবে সুদীপবাবু সবজান্তার মতো যে ‘রক্তাল্পতা’র কথাটা বলেছিলেন ডঃ সোম বললেন “তোমাকে দেখে একটু লাগছে! তেমন কিছু নয়। তবে একবার হিমোগ্লোবিনটা করিয়ে নাও, নিশ্চিন্ত হতে পারবে। আর একটা কথা বুক পকেটে কিছু রেখোনা! ইনিজুরির জায়গাটাকে একটু রিলিভ দাও” একটা ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিলেন। অফিসের কাছেই একটা ল্যাবোরেটরীতে রক্ত স্যাম্পেল দিয়ে এসেছেন। তাঁরা সন্ধ্যের দিকে ফোন করেছিলেন। হিমোগ্লোবিনের মাত্রা ঠিক আছে। সুতরাং আজ অনেকটাই আশ্বস্ত।

আজ বুক পকেটে কোন জিনিস রাখেননি। দুঃখ খালি একটাই! রাজকীয় সোয়ান কোম্পানীর ঝর্ণা কলম আজ আর বুক পকেট থেকে উঁকি দিচ্ছে না। বরং হাতে ধরা একটা ব্যাগের মধ্যে বন্দী করে রেখেছিলেন তাকে। অফিসে দীপ বলে একটি ছেলে আছে, একটু ‘ফক্কড়’ টাইপের, তার নজর এড়ায়নি। লাঞ্চের বিরতিতে জিজ্ঞাসা করেছিল

“কি হল ধারাপাতবাবু? আপনার বাঘ ছাপা মার্কা পেন কি হল?”

“আছে! আসলে পেনটা খুব ভারী তো! যদি শার্টের পকেট ছিঁড়ে যায় সেকারণে ব্যাগের মধ্যে রেখেছি”

“আচ্ছা! এতো ভারী? পাঁচ কেজির জিনিস দিয়ে হাতুড়ী হয় লেখার জিনিস হয় নাকি?

“তুমি কি করে জানলে পাঁচ কেজি কি ছ’ কেজি? তাছাড়া আগেকার দিনের পেন তো! একটু ভারী তো হবেই”

“এতো ভারী জিনিস দিয়ে কি করে লেখেন বলুন তো?”

“লেখার স্টাইল জানতে হবে ভাই”

“বুঝিনা, কি এতো পান বলুন তো! কমপিউটার এসে পেন ব্যাপারটা তো উঠেই গেছে! আমার তো মনেই পড়ে না লাস্ট কবে পেন ব্যবহার করেছি”

“যে বোঝে না, তাকে কি করে বোঝাই বলো দেখি”

বেশী তর্কে যাওয়া ধারাপাতবাবুর কোনদিন পছন্দ নয়। নিজের পছন্দ নিজের কাছে। জোর করে অন্য কাউকে প্রভাবিত করা তাঁর স্বভাব নয়।

যা হোক রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করে বিছানায় কাত শুয়ে লেখা শুরু করলেন। অস্কার এখন তাঁর সঙ্গেই শোয়। তবে একটা জিনিস অস্কার কেমন যেন অস্থির হয়ে আছে এই কদিন। বারো বছরে ল্যাব্রাডরকে ধরা হয় একজন প্রায় সত্তর বছরের মানুষের সমতুল্য। সুতরাং তার অস্থির ভাব ধারাপাতবাবুকে একটু বিব্রত করছিল, তবে তিনি তেমন পাত্তা দেননি। বেশ মিনিট তিরিশ লেখার পড় কখন ঘুমিয়ে পড়েছেন খেয়াল নেই। খালি খেয়াল হতে বেড সুইচে চাপ দিয়ে আলো নিভিয়ে দিয়েছেন।


ঘুম ভাঙ্গল কলিং বেলের শব্দে। ঘড়িতে দেখাচ্ছে আটটা বাজতে তিন বা চার মিনিট বাকী। রাতে যখনই শোন অ্যালার্ম ছাড়াই নিয়মিত ছটার আগে ঘুম ভাঙে তাঁর, এতো দেরী হয় কি করে? দুধের প্যাকেট দিয়ে যাবার সময় ছেলেটি বেল বাজিয়ে যায়। দুধ তাড়াতাড়ি করে নিতে হয়। আসলে পাশেই একটা বড় হুলো ঘোরাফেরা করে। কাজেই বেশী দেরী করার অবকাশ নেই। তাড়াতাড়ি করে উঠে পড়লেন ধারাপাতবাবু! অস্কার এখনো অকাতরে ঘুমোচ্ছে! আশ্চর্য! সে তো কখনো দেরী করে না! আজ কি হলো? দুধ নিয়ে ফ্রিজে রেখে আর শুতে গেলেন না। বাইরের বেসিনের সামনে দাঁড়ালেন, বড্ড দেরী হয়ে গেছে, তাড়াতাড়ি বাকী কাজ সারতে হবে! আর তখনই চোখে পড়ল, নিজের চেহারার দিকে। আবার রক্ত! বাম হাতের ওপর লাল রঙের ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় আট নয়টা ভিন্ন আকারের ছোপ। দৌড়ে ঘরে গেলেন, তারপর যেটা দেখলেন সেটা আরো ভয়ঙ্কর! বিছানায় জায়গায় জায়গায় রক্তের ছোপ, তার মধ্যে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আছে অস্কার, তাঁর শরীরেও রক্তের ছোপ রয়েছে। তাড়াতাড়ি করে অস্কার কে ডেকে তুলতে গেলেন আর যেটা দেখলেন এক লহমায় তার শরীরের সমস্ত রক্ত যেন এক নিমেষে নিঃশেষ হয়ে গেল। অস্কার বাঁদিক ফিরে ঘুমোচ্ছিল, ওকে দুতিন বার সে উঠলো, তবে একটু টেনেও হল। আর টেনে তুলতে গিয়ে দেখলেন ওঁর পেছনের বাম পা’র ওপরের দিকে যেন এক তীক্ষ্ণ ছুরির মতো গেঁথে আছে দুদিন আগে কেনা ধারাপাতবাবুর অসম্ভব প্রিয় সেই রাজকীয় সোয়ান কোম্পানীর ঝর্ণা কলম!


রবিবার


আর দেরী করেননি ধারাপাতবাবু। শনিবার সকাল এগারোটার মধ্যে পৌঁছে গেলেন রয় অ্যান্ড সন্স এর দোকানে, উদ্দেশ্য সোনারপুরের ব্র্যাঞ্চ অফিসের ঠিকানা। তাঁকে জানতেই হবে সোয়ান কোম্পানীর সেই পেনের উৎস! কে তিনি? যিনি সেই পেন ছেড়ে গেছিলেন? আর তারপর সেই পেন চলে আসে পার্ক স্ট্রীটের দোকানে। তারপর তাঁর হাতে! কি এমন আছে তাতে? মনে হচ্ছে ব্যাপারটা বুঝেছেন তিনি। এই এমন একটা পেন, যার সংস্পর্শে শরীর থেকে রক্তপাত শুরু হয়! মানে ঠিক রক্তপাত নয়! তবে ক্ষত তো বটেই। ছোট বড় মিলিয়ে তাঁর শরীরে চারটে ক্ষত হয়েছিল, আর অস্কারর শরীরে তিনটে। অথচ এক ফোঁটা ব্যাথা নেই। ছোট বেলায় খুব ফুটবল, ক্রিকেট খেলতেন ধারাপাতবাবু, হাতে পায়ে প্রচুর আঘাত পেয়েছেন, ক্ষতও হয়েছে অনেকবার। কখনো দেখেননি রক্তক্ষরণ হয়েছে অথচ এক ফোঁটা ব্যাথা লাগেনি। কিন্তু কাল রাতে একবারও বুঝতে পারেন নি। বরং রাতে এমন গভীর ঘুম ঘুমিয়েছেন অনেক দিন সেই রকম ঘুম হয়নি। তাহলে? কোন বিজ্ঞান লুকিয়ে আছে এর মধ্যে? নাকি অন্য কোন রহস্য?

অস্কারকে আর ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার সাহস হয়নি, কোনমতে নিজেই তার চিকিৎসা করেছেন, ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছেন, খালি ভয় ছিল যদি কোন কারণে ইনফেকশন হয়ে যায়। সেও অন্য একজন ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে ওষুধ নিয়েছেন, কিন্তু হাসপাতালে যাননি। পাছে কোন অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়তে হয়। নিজের ব্যবস্থাও নিজেই করেছেন। কোন মতে বসন্তদা’র চোখ ফাঁকি দিয়ে সবকিছু নিজের হাতে পরিষ্কার করেছেন। আর একটা জিনিস, সোয়ান কোম্পানীর সেই পেন তুলে রেখেছেন একটা সাতফুট লম্বা আলমারীর মাথার ওপর। যাতে কোনমতেই কারোর শরীরের সংস্পর্শে না আসে।

যাহোক ঘন্টা খানেকের চেষ্টায় জেনেই ফেললেন যেটা তাঁর জানার দরকার ছিল। অবনী আচার্য, পুরোনো জিনিস নিয়ে কেনা বেচা করেন। কিন্তু একটা সমস্যা হলো। অবনী বাবু নাকি অসুস্থ, হাসপাতালে রয়েছেন, ওনার ছেলে দীপ্যমানের সঙ্গে কথা হলো। কায়দা করে তাঁর সাথে দেখা করার একটা সময়ও বার করে ফেলেছেন, পেনের কথাটা অবশ্য বলেন নি।


কলকাতার এই দিকটায় ধারাপাতবাবু কখনো আসেননি। গড়িয়া ছাড়িয়ে আরো মিনিট পনের যাবার পড় সে জায়গা এলো। বাড়ী খুঁজে পেতে অসুবিধা হয়নি। দোতলা বাড়ি, বাড়িতে ঢুকতে গিয়ে একফালি বাগান চোখে পড়ল। দীপ্যমানের বয়স তেইশ – চব্বিশ, পড়াশোনা শেষ করে চাকরীর চেষ্টা করছে। একটা বেশ বড় কাপে কফি এনে দিল ধারাপাতবাবুকে।

“হ্যাঁ বলুন কি ব্যাপার?”

“আচ্ছা আপনার বাবা কি করেন?”

“কিউরিও নিয়ে ব্যবসা আছে ওনার! আগে আমাদের ধর্মতলায় একটা দোকানও ছিল! এখন আর দোকান চালাতে পারেন না, তাই বাড়ীতেই ব্যবসা করেন!”

“আচ্ছা আপনার বাবা দিন দশেক আগে সোনারপুরে ‘রয় অ্যান্ড সন্স’এর দোকানে একটি পেন বিক্রী করেছিলেন। আপনি কিছু জানেন?”

“বাবা তো করেন নি! সেটা তো আমি করেছিলাম!”

“আপনি করেছিলেন?”

“হ্যাঁ, বাবা তো তখন হাসপাতালে!”

“আপনি পেনটা দেখেছিলেন?”

“হ্যাঁ, বাঘের ছাপ মার্কা, সোনালী রঙের পেনের খাপ তো! হ্যাঁ, বাবা তো ব্যবহার করছিলেন!”

“আপনার বাবা ওটা ব্যবহার করছিলেন?”

“হ্যাঁ। করছিলেন তো! আমি তো বেশ কয়েকবার সেটা দিয়ে ওনাকে লিখতেও দেখেছি! বলেছিলেন নাকি দেড়শ দুশো বছর আগেকার পেন, অনেক অ্যান্টিক ভ্যালু আছে! সেই কারণেই বাবা অসুস্থ হতে আমি সেই পেনটা সোনারপুরের দোকানে গিয়ে দিয়ে আসি!”

“আপনার বাবা ওটা পেলেন কোথা থেকে কিছু জানেন?”

“কোন এক হোটেলে নিলাম হচ্ছিল, সেখান থেকে কিনেছিলেন!”

“কোন হোটেল?”

“সেটা ঠিক জানিনা!”

“আচ্ছা! আপনার বাবাকে হাসপাতালে দিতে হল কেন? কি হয়েছে ওঁর?”

“বাবার আসলে খুব হাই প্রেসার! তো মাস খানেক আগে প্রথম ব্যাপারটা আমাদের নজরে আসে। বেশ পরপর তিন চার দিন। বাবা’র শরীরে কেমন যেন অনেকগুলো ইনজুরির মতো হচ্ছিল, আর সেখান থেকে হাল্কা হাল্কা রক্ত বেরোচ্ছিল!”

“জামার ওপর রক্তের ছোপ পড়ছিল?”

“হ্যাঁ ঠিক বলেছেন, কিন্তু আপনি কি করে জানলেন?”

“না মানে মনে হল আর কি, তাই বললাম। তারপর?”

“ডাক্তার সন্দেহ করছিলেন কোন ইনফেকশন বলে। কিন্তু প্রায় রোজই হচ্ছিল সে জিনিস”

“বেশ! তা হাসপাতালে দিতে হল কেন?”

“সপ্তাহ তিনেক আগে থেকে একটা অদ্ভূত জিনিস শুরু হল। বাবা সারা দিন ধরে ঘুমোচ্ছেন, সকালে ঘুমোচ্ছেন, খেতে বসে ঘুমিয়ে পড়ছিলেন, টিভি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ছেন। আসলে বাবা’র ঘুম এমনিতেই কম। আর যেহেতু সারা সকাল ঘুমোচ্ছেন তাতে কি হচ্ছে? সারা রাত জাগা! আর রাতে একেবারেই ঘুম নেই। সারা রাতে পায়চারী করছেন! ব্যালকনীতে বসে আছেন, আর মাঝে মাঝে অন্ধকার আকাশের দিকে কি সব বিড়বড় করছেন। আর সবচেয়ে আশ্চর্যের বাবা’র হল খুব মাথা ঠাণ্ডা! কিন্তু এই এক-দেড় মাস রাতের বেলায় বাবা যেন অন্য মানুষ হয়ে যাচ্ছিলেন! কিছু বললেই রেগে যাচ্ছিলেন! আমাদের দিকে রক্তচক্ষুতে তাকাচ্ছিলেন! খুব বাজে ভাবে আমাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন! সবচেয়ে কেমন যেন একটা অদ্ভূত অবস্থা!”

“তারপর?”

“তারপর, পনেরদিন আগের শুক্রবারের কথা!”

“কি হয়েছিল সেদিন?”

“বাইরে একটা আওয়াজ হতে আমি ঘুম থেকে উঠে পড়ি। আসলে বাবার শরীর খারাপ যাচ্ছিল একটু চিন্তায় ছিলাম, ভালো ঘুম হচ্ছিল না! তারপর সেদিন দেখি এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার!”

“ভয়ঙ্কর? কি জিনিস?”

“বাবা আসলে গত পাঁচ বছর ধরে নিরামিষাশী। মাছ, মাংস মুখে দেন না, মা’র অনেক অনুরোধে ডিম খান তবে সেও খুব মাঝে মধ্যে। সেই বাবাকে দেখলাম, ফ্রিজ থেকে কাঁচা মাংস বার করে খাচ্ছেন! একে তো ঠাণ্ডা তারপর ধরুণ সেই বরফ শীতল ঐ শক্ত রকম মাংস, উনি আরামসে চিবিয়ে খাচ্ছেন! বাবা’র বয়স প্রায় পঁয়ষট্টি, দাঁতের জোরও আগের মতো নেই! কিন্তু কি সহজে খাচ্ছিলেন! আর চোখের সে কি দৃষ্টি! ঠাণ্ডা, অথচ কি হিংস্র! কি ভয়ংকর!”

ধারাপাতবাবুর মুখে কোন কথা ফুটল না।

“খুব ভয় পেয়ে যাই, জানলেন! তখনই মনে হল বাবা’র মাথাটাই বোধহয় বিগড়েছে! তাই সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারের সঙ্গে সকালে কনসাল্ট করলাম, উনিই বললেন হাসপাতালে ভর্তি করাতে। তো পরেরদিনই হাসপাতালে দেওয়া হল”

“তারপর এখন কি অবস্থা?”

“আগের চেয়ে একটু ভালো! নিয়মিত ঘুমের ওষুধ দেওয়া হচ্ছে, ইনজেকশন চলছে, তবে উল্টোপাল্টা কথা বার্তা বলছেন এখনো। আর সব নিয়ে উনি যেন ঠিক আগের মতো আর নেই! মানুষটাই যেন পাল্টে গেছেন!”

“বলছিলেন উল্টোপাল্টা কথা বলছেন! কি রকম উল্টোপাল্টা কথা?”

“মাঝে মাঝেই একটা নাম খালি বলছেন! জোনাথন ব্লেডস!”

“আপনি বা আপনার মা কাউকে চেনেন সেই নামে”

“কখন শুনিনি”

“কি বলছেন ওনার ব্যাপারে?”

“যেটা বলছেন সেটা একেবারেই অসংলগ্ন কথা!”

“আপনি বলুন না, উনি কি বলছেন?”

বেশ কয়েক সেকেন্ড বাদে বেশ কাটা কাটা উচ্চারণে কথা গুলো শোনা গেল “ব্লাড ইজ সুইট!”

“মানে?”

“মানেটাতো আপনি বুঝতেই পারছেন, ‘রক্তের স্বাদ মিষ্টি’! তবে এ’রকম একটা অদ্ভূত কথা বলার কোন কারণ আছে কি না সেটাই বুঝতে পারছি না”

“আচ্ছা আপনি তো বললেন উনি পুরোনো জিনিসপত্র নিয়ে কেনা বেচা করতেন, তো ওনার ঘরে বা দোকানে নিশ্চয়ই অনেক পুরোনো জিনিস পত্র আছে”

“দেখুন আমাদের দোকান আর নেই! গ্যারেজ ঘরটাকেই বাবা স্টোর রুম বানিয়েছেন”

“তা সেখানে খুঁজে দেখেছেন কি? কিছু যদি পাওয়া যায়!”

“দেখিনি! আর খুঁজবই বা কি?”

“আমাকে একবার নিয়ে যেতে পারেন সেখানে! আমি একবার চেষ্টা করে দেখতাম, যদি কোন ভাবে কিছু পাওয়া যায়”

“দেখুন নিয়ে যেতে আপত্তি নেই! তবে আপনি কি খুঁজবেন?”

“একটাই জিনিস! জোনাথন ব্লেডস! ওনার ব্যাপারে কোন তথ্য পাওয়া যায় কিনা?”


সোমবার


রবিবার সারা রাত এক অজানা আতঙ্কে কাটিয়েছেন ধারাপাতবাবু। অস্কারকে নিরাপদে নিজের খাটে শুইয়ে রেখেছিলেন আর নিজে কোনমতে রাতটা কাটিয়েছেন। ঘরের কোণার সাত ফুটের আলমারির ওপর পড়ে ছিল ওঁর সাধের সোয়ান কোম্পানীর বাঘ ছাপ মার্কা ঝর্ণা পেন। সেদিকে তাকাতেও ভয় লাগছিল ধারাপাতবাবুর। তবে মনে হচ্ছে ব্যাপারটা তিনি বুঝতে পেরেছেন। আর সেটা আরো পরিষ্কার হল জোনাথন ব্লেডসের ডাইরী পড়ে। সম্ভবত বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে লেখা সেই ডাইরী। অবনী বাবুর স্টোর রুমে অনেক জিনিসের মধ্যে সেটাকে খুঁজে পেতে সময় লাগেনি ধারাপাতবাবু’র। আসলে তাঁরও পুরোনো জিনিসের শখ, তাই খুঁজতে জানার স্টাইলটা তাঁর জানা আছে।

সাল লেখা ছিল না, খালি তারিখ লেখা। জানুয়ারী মাসের কোন এক তারিখ দিয়ে লেখা,

“আমি জানি, আমার ঠোঁটে রক্তের স্বাদ লেগেছে। রক্তের স্বাদ যে এতো মিষ্টি হয় জানতাম না! আজ আমি স্যামসনের রক্তের স্বাদ পেয়েছি। স্যামসন আমার তৃতীয় শিকার। ডেইসি, রবার্টের পর এবারে স্যামসন। বেচারা বুঝতেই পারেনি। আচ্ছা ও কি বুঝতে পারবে? পারলে পারবে! আবার সময় বুঝে! রক্তের স্বাদ কি মিষ্টি! সোয়ান কোম্পানীর পেনের যে কি মাহাত্ম্য তা যে দেখেনি সে জানবে কি করে? সবাই জানে সেই কলমের নিব হাতীর দাঁতে তৈরি, না ভুল! মানুষের দাঁত দিয়ে তৈরি, আর সেই দাঁত ছিল রাজা ফ্রান্সিসের। ক্যারিবিয়ান দ্বীপে দাসদের পাচারের আগে তিনি মানুষের রক্তের স্বাদ নিতেন। যার রক্ত যত মিষ্টি সেই দাসের দাম তত বেশী! বলেছিলেন ছেলেকে, তাঁর মৃত্যুর পর যেন তাঁর দাঁত দিয়েই সেই কলমের নিব তৈরি করা হয়। জেনেছি বাইশটা পেন তৈরি হয়েছিল ফ্রান্সিসের দাঁত দিয়ে! আর সেই পেনের মধ্যেই লুকোনো আছে ফ্রান্সিসের অদম্য ইচ্ছাশক্তি! রক্তমাংসের শরীরের স্পর্শ খোঁজে সেই পেন, আর পেলেই হল। আর সেই থেকেই নেশা হয়ে যায় সেই মানুষটির।

আমি কি প্রথমদিন বুঝেছিলাম? যেদিন আমার কোর্টের পকেট ভিজে গেছিল আমার নিজের রক্তে! ভয় পেয়েছিলাম! তারপর একদিন গেল, দুইদিন গেল, তিন, চার, পাঁচ তারপর এক সপ্তাহ বাদে বুঝলাম আমার আর রান্না করা মাংস ভালো লাগে না, শাকসব্জী তো একেবারে অসহ্য! এখন খালি কাঁচা রক্ত! আগের পাখী, কুকুর, বেড়াল ভালো লাগত, কিন্তু আর নয়! এখন খালি মানুষ! খালি অবশ করতে জানতে হয়, সঙ্গে এখন একটা ক্লোরোফর্মের বোতল নিয়ে ঘুরি। অজ্ঞান করে ফেলতে পারলেই হলো, রক্তের স্বাদ কি মিষ্টি! আমি এখন রক্তের গন্ধ পেতে শুরু করেছি”

আর পড়তে পারেননি ধারাপাতপবাবু।


আর অপেক্ষাও করেননি তিনি। পরের দিন অফিস যাওয়ার আগে শোভাবাজারে গেলেন ধারাপাতবাবু। মামারবাড়ী ছিল গঙ্গার একেবারে কাছে। কতবার এসেছেন আগে! এর চেয়ে ভালো জায়গা আর কিছু মনে পড়েনি। জল থেকে চারটে সিঁড়ি দূরে দাঁড়িয়ে সজোরে ছুঁড়ে দিলেন নিজের সাধের কলম। একেবারে মাঝ গঙ্গায় – “ঝপাং”!








এক বছর পরের কথা


সংগ্রামের হাত ছেড়ে কেমন বেরোতে চাইছে ব্রুনো। সংগ্রামের ডান হাতে এমনিতে একটু জোর কম। আসলে বছর দুই আগে একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল, চলন্ত বাইক বর্ষার রাস্তায় পিছলে গেছিল। হাতে দুটো ফ্র্যাকচার হয়েছিল, সে এক যাচ্ছেতাই ব্যাপার। তারপর অপারেশন করার পর থেকে হাতে জোর করে গেছে। ব্রুনো কেমন একটা আওয়াজ করছে, আর হাত থেকে বেরোতে চাইছে। দুবার ঝটকা দিল, সংগ্রাম এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল। ‘কি ব্যাপার?” কোন রাস্তার কুকুরও নজরে এলো না, তাহলে ব্রুনো এমন করছে কেন? ব্রুনো ছয় বছরের জার্মান শেপার্ড, একটু অবাধ্য তবে এমন তো সাধারণত করেনা। তৃতীয় ঝটকাটা একটু বেশী জোরেই দিল, আর সংগ্রাম পারল না। ব্রুনো দৌড়ে চলে গেল প্রায় তিরিশ মিটার একেবারে ঘাটের কাছে। গলা থেকে মাটিতে লটকাচ্ছে ব্রুনোর লম্বা চেন, সংগ্রাম পেছনে দৌড়ল। ঠিক গঙ্গার ঘাটের সিঁড়ি যেখান থেকে শুরু হয় তার বাঁদিক ঘেঁষে যেখানে একটা জঞ্জালের ভ্যাট রাখা রয়েছে ব্রুনো সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে, আর ঘনঘন নিঃশ্বাস ফেলছে। কার দিকে চেয়ে আছে সে? নাকি কিছুর গন্ধ পেয়েছে? সংগ্রাম ভালো করে তাকায় সেদিকে, বেশ কয়েক সেকেন্ড বাদ নজরে এলো। সোনালী রঙয়ের কি একটা জিনিস, জঞ্জালের গাদায় পড়ে আছে। কি ওটা? কি রকম বাদামী রঙের নীচের অংশটা! পেন মনে হচ্ছে যেন!






নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮