• আশিস চক্রবর্তী

গল্প - সাইকো




বিজন বাবুর নতুন ফ্ল্যাটে এসে এখনো অব্দি সামান্যতম স্বস্তি নেই।দিনটা একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে যেমন তেমন ভাবে কাটলেও , প্রতি রাত্রে ওই একই সমস্যা। পাশের ফ্ল্যাটে বীভৎস চিৎকার , মেঝে তে হাত পা পেটানোর আওয়াজ, আবার কখনও কখনও তীব্র গোঙানির শব্দ। এসব বিভীষিকাময় কর্ম কান্ড শেষ রাত্তির পর্যন্ত চলে রোজই। প্রতিটি মুহূর্ত যেন অসহ্য হয়ে উঠছে। নিরিবিলিতে থাকবেন বলে অনেক খোঁজ খবর নেবার পর এই নতুন ফ্ল্যাট টা নিলেও, আসার পর থেকে একটা রাত্রেও , একবিন্দু শান্তি জুটলো না।বিজ্ঞাপন ব্যাপারটা সব ক্ষেত্রে সত্য গোপন করার একটা পন্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞাপনে , 'নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশে , একান্তে ' এই ধরনের ভারী ভারী শব্দ লেখা থাকলেও , আজ যে তিনি ভাষার মায়ায় আটকে ঠগে গেছেন ,সেটা ভালোই উপলব্ধি করতে পারছেন। বিজন বাবু সেক্রেটারি কে বলে , মিটিং ডেকে এর একটা সুরাহা করবেন ভেবে রেখেছেন, কিন্তু রাবণের স্বর্গের সিঁড়ি নির্মাণ করার মতো , হয়ে উঠছে না। আজ রাত্তিরেও পুনরায় সেই দাপাদাপি আর হুঙ্কার। ক্রোধ জর্জরিত গলার আওয়াজ আর দুম দাম হাতুড়ি পেটানোর শব্দটা মাত্রা ছাড়িয়েছে। বস্তি বাড়ি বলে মনে হচ্ছে আজকে। এভাবে ভদ্রলোকেরা বাস করে না। মনের ভেতর দোলা চাল আর বেজায় অস্বস্তি নিয়ে বিজন বাবু আজ এর একটা ফয়সালা করবেন বলে সেই অত্যাচারী প্রতিবেশীর দুয়ারে পৌঁছে ডোরবেল এ চাপ দিলেন। কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খুলতেই একটা হার জিরজিরে চেহারার অল্প বয়স্ক ছেলে বেরিয়ে এসে রক্ত রাঙা চোখ দেখিয়ে বললো -- কি ব্যাপার ? ছেলেটার গাল ভর্তি দাড়ি । মাথার চুল এলোমেলো। শরীরের ভঙ্গিমায় একটা অসভ্য ভাব। একরাশ বিরক্তি নিয়ে ঢিল ছুঁড়ে মরবার মতো করে যেন কথা টা বললো। বিজন বাবু খানিকটা হকচকিয়ে গিয়ে বললেন -- ইয়ে মানে , প্রতিদিনই এঘর থেকে চিৎকার চেঁচামেচি , অসম্ভব জোরে শব্দ আসে। ওতে আমার ঘুমের ব্যাঘাত হয়। শান্তি নষ্ট হয়। তাই বলছিলাম এসব যদি একটু বন্ধ রাখো কিংবা আস্তে করো ,তাহলে ভালো হয়। বৃদ্ধ মানুষ। কষ্ট হয় ! -- বৃদ্ধ ! বলে তাচ্ছিল্য আর উন্নাসিকতা দেখালো ছেলেটা। বিজন বাবু ওসব এড়িয়ে গিয়ে ফের বললেন -- তুমি তো একাই থাকো ! কার সঙ্গে এতো ঝগড়া মারামারি করো ? ছেলেটা মাথা চুলকে পকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে সেটা জ্বালিয়ে অভদ্ৰর মতো ধোঁয়া ছেড়ে উত্তর দিলো -- আমার ঘরেও একটা আছে ! -- কি আছে ? -- আপনার মতোই অশান্তিতে ভরা বৃদ্ধ ! -- মানে ? -- আমার বাপ ! -- সেকি ! আমি তো ভাবতাম তুমি এ ঘরে একাই থাকো। তুমি বাইরে গেলে , সারাদিন তো দেখি দরজায় বাইরে থেকে তো তালা বন্ধ থাকে ! তারমানে বাবাকে ঘরে বন্দি রেখে বাইরে চলে যাও ? তুমি কি মানুষ ? -- না ! মানুষ না ! রাক্ষস ! জানোয়ার ! তীব্র চিৎকারে গর্জে ওঠে ছেলেটা। চিৎকার করবার সময় ছেলেটার কালো কালো বিশ্রী দাঁত গুলো প্রকট হয়ে পড়ছে। বিজন বাবু খানিকটা ভয় পেয়ে পিছনে সরে গেলেন। এরপর অর্ধেক সিগারেট টা বাইরে ফেলে দিয়ে সে দ্রুত পায়ে ঘরে ঢুকে পড়লো। তারপর একটা মদের গেলাসে ঠোঁট ভিজিয়ে কুৎসিত ঢেকুর তুললো। খোলা দরজা দিয়ে ঘরের ভিতর টা চোখ পড়তেই, বিজন বাবু দেখলেন বিছানায় শুয়ে আছে ওনারই বয়েসী একজন অসুস্থ্য লোক। একটু কাছে এগিয়ে গিয়ে আৎকে উঠলেন। লোকটার মুখ কাপড় দিয়ে বাঁধা। চোখ থেকে জল খসে খসে বালিশ ভিজে গেছে। অশক্ত , অসমর্থ ,অসহায় লোকটাকে দেখে মায়া আসলে বিজন বাবু বললেন --একি করেছো? ওনার মুখ বাঁধা কেন ? শরীরের যে অবস্থা একটা ডাক্তার না ডাকলেই নয় ! হাতের কাঁচের গ্লাসটা মাটিতে আছড়ে ভেঙে ফেলে ছেলেটা বললো -- খবরদার ! মুখ টা খোলার চেষ্টা করলে ভালো হবে না কিন্তু ! আপনারও ওই একি দশা করে ছাড়বো ! কথাটা বিজন বাবুর বুকে গিয়ে লাগে। ভয়ে বিছানা থেকে দূরে গিয়ে দাঁড়ালেন । সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত হয়ে গিয়ে ভাঁজ খাওয়া চোখ মুখ নিয়ে ছেলেটার দিকে তাকালে,ওর গায়ের চামড়া ভেদ করে ওঠা বুকের হাড় গুলো যেন ঝনঝন করে নড়ে উঠতে দেখলেন বিজন বাবু। ছেলেটা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে উঠলো -- এক কালে প্রচুর কথা বলেছে ! এখন কথা না বললেও চলবে ! প্রায় সব খারাপ কোথায় বলা হয়ে গেছে। আর কিসের ডাক্তার ? অসুস্থ্য কে ? ওর চেয়ে আমার ডাক্তার এর বেশি প্রয়োজন ! মাথার ভিতর টা সব সময় খিচিবিচি করে। মাঝে মাঝে গা টা গুলিয়ে ওঠে। জীবনের প্রতি ভয়ঙ্কর রকমের অরুচি এসে গেছে আমার। -- তোমার সমস্যাটা কি বলতো ? নিজের বাবাকে এভাবে অত্যাচার করছো ? প্রতিবেশী কে পর্যন্ত শান্তি দিচ্ছো না ? আশ্চর্য হয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন বিজন বাবু । -- ওই লোকটা আমার সমস্যা। এবারে বিজন বাবু লক্ষ্য করলেন , ছেলেটার হাত পা উত্তেজনায় কেঁপে কেঁপে উঠছে। শান্ত গলায় বললেন-- উনি কি করেছেন তোমার ? বরং আমি তো রোজ শুনি তোমার ভয়ানক ধমকানো মিশ্রিত কথা বার্তা। আগে ভাবতাম তুমি ফোনে কাউকে ধমকাচ্ছো। আজ বুঝতে পারলাম আসল সত্য। তুমি তোমার অসুস্থ্য বাবাকে ঠান্ডার মধ্যে ভোর বেলায় টেনে তুলছো। না উঠলে মারছো ! সারা রাত্রি ওনাকে ঘুমাতে দিচ্ছো না ! ভয় দেখাচ্ছো ! শাসাচ্ছো ! ডাক্তার ওষুধ এর ব্যবস্থা করছো না!

ছেলেটা এসব শুনে উন্মাদের মতো হেসে ওঠে।তারপর হাসি হজম করে বলে -- মাত্র এই টুকু বুঝেছেন ! এই দেখুন এই মদ গেলায় জোর করে । অখাদ্য কু খাদ্য জোর করে খাওয়ায়। সারাদিন বন্দি করে রাখি। কারো মুখ দেখা বন্ধ ! আমার যা ইচ্ছে তাই করি। লাগাম এখন আমার হাতে ! জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দেবো ওকে ! নরক যন্ত্রনা দেবো ! -- তুমি কি পাগল ? -- হ্যাঁ আমি পাগল! বদ্ধ উন্মাদ ! কিন্তু আমাকে পাগল বানালো কে ? ওই লোকটা আমার বাপ না পাপ জানি না।আমার অতীত ইতিহাস কিছু জানেন ? আমার শৈশব চুরি হয়ে গেছে। তার মাশুল আজও দিচ্ছি। ওই লোকটা আমাকে তিন বছর বয়সে দূরের একটা স্কুলে ভর্তি করে ছিল। শীতের ভোর বেলা আমাকে জোর করে তুলে ইস্কুলে পাঠাতো। আমার খুব কষ্ট হতো। শুনতো না। আমার কান্নার কোনো দাম ছিল না তখন । ক্লাসে নাম্বার কম আসলে বকাঝকা মারধর করতো। খেলতে দিতো না। কারো সঙ্গে মিশতে দিতো না। শুধু পড় পড় আর পড়ে যা ! কথা না শুনলেই ঘর বন্দি করে মার ! ভয় দেখাতো। ছোট থেকেই ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতাম।এই আপনাদের মতো কিছু লোকজনের কথায় অসম কম্পিটিশনে নামাত আমাকে। মা টাও ছিল ওই দলেই। পাড়া প্রতিবেশী , আত্মীয় সবার কাছে আমাকে করে তুলেছিল তুলনার সামগ্রী। আমি যেন যন্ত্র ! আমাকে জিততেই হবে ! হারলেই শাস্তি।ঠাকুমা টা ভালো ছিল। আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করতো। আদর করতো। আমাকে বুকে জড়িয়ে আমার কষ্ট বুঝতো। কাঁদতো।ঠাকুমার বলা রূপকথার গল্প গুলো এখনো খুব মিস করি। কিন্তু এই লোকটা দেশের বাড়ি ছেড়ে , ঠাকুমা কে একলা ফেলো এই ফ্ল্যাটে এসে উঠলো। আমাকে নাকি ঠাকুমা নষ্ট করে ফেলছে ! খুব একা হয়ে পড়েছিলাম। ভীষণ একা।এখন একা থাকার অভ্যাস হয়ে গেছে আমার । আর কাউকে ভালো লাগে না। একটা গেছে এখন এই টা গেলেই আমি চির শান্তিতে একা হয়ে যাবো। জানেন আমার গান গাওয়ার খুব শখ ছিল ।ছবি আঁকারও। মনে মনে স্বপ্ন দেখতাম শিল্পী হবো। অথচ এরা আমাকে প্রকৃতির রূপ রং চোখ ভরে দেখার আগেই ছুঁড়ে ফেলে দিলো যান্ত্রিক , বিবেকহীন এক পৃথিবীতে। সব ভেঙে চুরমার করেছে ওই লোকটা ! জোর করে ঠেলে দিলো অন্য দিকে । এখন আমি ফেল ! সব দিকেই ফেল ! কিচ্ছু হলো না জীবনে ! তাই বদলা নিচ্ছি। কিন্তু এতো কথা আপনাকে বলছি কেন ? আপনি কে আমার ! বেরিয়ে যান এক্ষুনি। বিজন বাবু বাকি সম্মান টুকু বাঁচিয়ে দরজার বাইরে চলে যেতে যেতে দেখলেন ছেলেটার বুক ভরা প্রতিশোধ আর ঘৃণার বারুদ। চোখ দুটো বসে গিয়েছে অন্ধকারের মতো কোঠরে। শেষ বারের মতো বললেন -- কিন্তু এভাবে উনি তো মারা পড়বেন ! -- মেরে তো ফেলেছে আমাকে ! যেটা দেখছেন এটা আমার লাশ। জীবন্ত জীবাশ্ম বলতে পারেন।

বিজন বাবু চলে গেলেন।মাথার ভেতর জমা অনেক রকম চিন্তা ভাবনা নিয়ে , রাতটা কাটলেই ছুটে গেলেন ফ্ল্যাটের সেক্রেটারি অমিয় বাবুর কাছে। সম্পূর্ন ঘটনা টা বলে বললেন -- এর একটা বিহিত করুন। রাতের ঘুম আমার উড়ে গেছে। ছেলেটা সাইকো ! পুলিশে দেন ! বাপ টাকে মারবে , তারসঙ্গে আমাকেও ! অমিয় বাবু তাজ্জব হয়ে সব টা শুনে বললেন -- কি বলছেন কি এসব ? আমি তো এর কিছুই জানি না। এসব ওই সিকিউরিটি গার্ড টার কারসাজি । নিশ্চয় আমার অজান্তে কারো কাছে উপরী কিছু টাকা নিয়ে ওই ফাঁকা ফ্ল্যাট টাই রাত্রে কাউকে ঢোকায়। বিজন বাবু বিস্ফারিত চোখ নিয়ে বললেন -- তারমানে ? -- মানে ওই ফ্ল্যাট টাই কেউ তো থাকে না ! তালা বন্ধ অনেক দিন। -- আমি কি মিথ্যে বানিয়ে বলছি ? -- না ! তা বলছি না ! তবে আমার সন্দেহ সিকিউরিটি গার্ড টার ওপর। ব্যবসা ফাদিয়ে বসেছে বোধহয়। চলুন তো একবার দেখি। তারপর সিকিউরিটি গার্ড সুরেশ সিংকে হাঁক দিলেন অমিয় বাবু। সুরেশ সিং মিনিট দশকের মধ্যে হাজির হয়ে বলল -- হামাকে ডাকছেন বাবু ? -- হুম ! এসব কি শুনছি ? -- কি বাবু ? -- তুমি টাকা খেয়ে ফাঁকা ফ্ল্যাটে সবার অজান্তে লোক তুলছো ? -- রাম রাম বাবু ! এসব কি বলছেন ! এসব সরাসর ঝুট বাত ! এরপর অমিয় বাবু বিজন বাবুর দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললেন -- ওনার উল্টো দিকের ঘরে কারা রোজ রাতে উৎপাত করছে ! কিভাবে সম্ভব তুমিই বলো ! তাহলে তুমি ফাঁকি দিচ্ছো কাজে ? -- এ ভি বিলকুল ঝুটা আরোপ বাবু। রাতের দিকে কালকে হামার ডিউটি ছিল না। রমেন মল্লিক ছিল। -- হম ! ওর খবর ও নেবো। এখন একবার চাবি নিয়ে চলতো, কি ব্যাপার দেখে আসি। -- জি বাবু জী।

কৌতূহল নিয়ে দরজার তালা খুলতেই বিজন বাবুর মুখটা শুকিয়ে গেল। ফাঁকা ঘরটা যেন ওনাকে গিলতে আসছে। চুপসে গিয়ে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। সুরেশ সিং আর অমিয় বাবু ভুরু কুঁচকে বিকৃত মুখ নিয়ে বিজন বাবুর দিকে তাকালেন। বিজন বাবু ছুটে ঘরে ঢুকে বললেন -- বিশ্বাস করুন কাল রাত্রে এখানে একটা খাটে সেই অসুস্থ্য ভদ্রলোক শুয়ে ছিল। আর ওখানে দাঁড়িয়ে সেই ছেলেটা রাগ ক্ষোভ ঘৃণা উগলে অসহ্য করে তুলেছিল পরিবেশ টা। অমিয় বাবু মাঝখানে ওনাকে থামলেন -- দাঁড়ান ! কি ঘটেছিল সেটা দেখতেই পাচ্ছি। ভোর রাতে স্বপ্ন দেখে এভাবে আর আমাদের ডাকবেন না। এই সুরেশ ঘরটা বন্ধ করে নিচে এসো।

ওরা চলে গেলে বিজন বাবু নিজের ঘরে এসে ভাবতে বসলেন।নিজেকে মিথ্যা বাদী গাঁজা গুলি খোর হিসেবে মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে ওনার। এতো টাটকা তাজা উজ্জ্বল অনুভূতি কি স্বপ্নের হতে পারে ? না ! কখনও না ! তাহলে কি ভূতের উপদ্রপ ? নাকি তিনিই মানসিক বিকার গ্রস্থ হয়ে পড়ছেন দিন কে দিন একাকীত্বে বাস করে। হুট করে ঘটনাটার জায়গায় নিজেকে বসিয়ে একটা অদ্ভুত মিল খুঁজে পেলেন। আর সেই মিলের কারণেই এবারে বুঝতে পারলেন , কেন তার ছেলে বিপিন তার বাপকে ছেড়ে আলাদা থাকে !





নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮