• কুন্তল ঘোষ

জীবনের পাতা থেকে - পুরোনো সেই দিনের কথা







জীবনের অনেকটা পথ অতিক্রম করে শৈশবের অনেক স্মৃতিই এখন বেশ ফিকে পরে গেছে। পড়ন্ত যৌবনে এসে আজ শৈশবের অনেক বিক্ষিপ্ত ঘটনা মনের স্মৃতিকোঠায় ক্ষণিকের জন্য ঝিলিক মেরে আবার মিলিয়ে যায় স্মৃতির অন্তরালে। আজ সেই রকমই কিছু ঘটনা যেগুলি মনকে গভীর ভাবে একসময় ছুঁয়ে গিয়েছিল তা লিপিবদ্ধ করার প্রচেষ্টা করলাম এই প্রবন্ধে।


হুগলি জেলায় এক প্রত্যন্ত গ্রাম ফুরফুরা। মুসলিম বহুল এই গ্রাম যদিও দেশ জুড়ে 'ফুরফুরা শরীফ' নামে বেশ বিখ্যাত তবু সত্তরের দশকে খুব শান্ত ও নিরিবিলি স্থান হিসাবেই পরিচিত ছিল গ্রামটি। আজও দেখতে গেলে জন সংখ্যার ঘনত্ব ছাড়া গ্রামটির প্রাথমিক বৈশিষ্ট্যে বিশেষ কিছু পরিবর্তন হয় নি। আমার বাবা ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মচারী, আর চাকরী জীবনের বেশ অনেকটা সময় ওনার পোস্টিং ছিল ফুরফুরার গ্রামীণ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। আমার মায়ের পিসিমাও ওই স্বাস্থ্য কেন্দ্রের এক নার্স ছিলেন। তদসূত্রেই ষাটের দশকে বাবার সাথে মায়ের পরিচয়, পরে পরিণয় আর তারপর ফুরফুরাতেই আমাদের তিন ভাই বোনের জন্ম। দিদি বড়, মাঝে আমি, আর শেষে বোন। দুই দুই বছরের ব্যবধানে তিনজনের জন্ম তাই অনেকটা বন্ধুদের মতোই আমরা ভাই বোনেরা বড় হয়েছি। মায়ের পিসিমাও আমরণ আমাদের পরিবারের সদস্য ছিলেন আর আমরা আদর করে ওনাকে বুড়িদিদি বলে ডাকতাম।


আমাদের সরকারী কোয়ার্টারটা ছিল হাসপাতালের একদম সংলগ্ন। হাসপাতালের একমাত্র ডাক্তার ডক্টর সিংহরায় নিকটবর্তী সোমনগর গ্রামের বাসিন্দা হওয়ায় নিজ বাড়ি থেকেই রোজ কর্মক্ষেত্রে যাতায়াত করতেন। তবে ওনার বিশাল সরকারী কোয়ার্টারটা ব্যবহারের জন্য আমাদের দিয়ে রেখেছিলেন ভালো সম্পর্কের খাতিরে। বয়স্ক মানুষ হিসেবে উনি আমাদের খুব স্নেহ করতেন আর আমরা ওনাকে আদর করে ডাক্তার দাদু বলে ডাকতাম। কোয়ার্টারে অনেক গুলো ঘর ছিল যেগুলি বিশেষ কোনো কাজে আসতো না। তাই সখ হিসেবে কোনো ঘরে মুরগি, কোনো ঘরে খরগোশ, আবার কোনো ঘরে ছাগল পোষা হতো। ছাগল ছানা আর খরগোশেদের সাথে ছোটো বেলায় সময় কাটাতে খুব মজা পেতাম। আমাদের কোয়ার্টারের অবস্থানটা ছিল বেশ রোমাঞ্চকর। সামনে হাসপাতাল, পিছন দিকে জানালার পাশেই এক ডোবা আর তার ওপারে ঘন জঙ্গলের সাথে এক কবরস্থান। কবরস্থানের পাশ দিয়ে পায়ে হাঁটা সরু রাস্তা চলে গেছে কানা নদীর বাঁকে। সব মিলিয়ে কানা নদী থেকে কোয়ার্টারের দূরত্ব বড় জোর একশ মিটার হবে। জঙ্গল আর কবরস্থান থাকার জন্য ওখানে ছিল খুব শিয়ালের উপদ্রব। সে যুগে ফুরফুরা গ্রামে বিদ্যুত ব্যবস্থা ছিল না। তাই সন্ধ্যের পর হারিকেনের আলোতেই আমাদের রাত কাটত। তবে জন্ম থেকে অভ্যস্ত হওয়ায় আলাদা করে বিদ্যুতের প্রয়োজনীয়তা সে সময়ে অনুভব করতাম না। কোয়ার্টারের ছাদ ছিল অ্যাসবেসটারের, তাই গরম কালে যেমন গরম শীত কালে ঘর গুলো হতো তেমনই ঠান্ডা। গরমের রাতে হাওয়া চলাচলের জন্য পিছনের জানালা গুলো অগত্যা খুলে রাখা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকতো না। তাই সন্ধ্যে হলেই শিয়ালের ডাকের সাথে জঙ্গলের সেই থমথমে অন্ধকার মিলে এক রোমাঞ্চকর পরিবেশ সৃষ্টি হত। আর বর্ষার রাত হলে তো রোমাঞ্চ দ্বিগুণ হয়ে যেত। অ্যাসবেসটারের ছাদে বৃষ্টির অণুরনিত আওয়াজ আর তার সাথে জঙ্গলের পাতায় বৃষ্টির টাপুর টুপুর শব্দ মিশে মনের ভিতর এক অদ্ভুত ছন্দ জেগে উঠত। আর সেই স্বপ্নিল নিঝুম পরিবেশে কিছু উপাদান যদি বাকি থাকত সেটা পূর্ণ করে দিত পাশের ডোবা থেকে আসা ব্যাঙেদের ক্যাঁ ক্যোঁ শব্দ।


আমরা অল্প বড়ো হতে হতে বাবা বদলি হয়ে গেলেন নিকটবর্তী চন্ডিতলা গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। কিন্তু নানান কারণে আমরা স্থানান্তরিত না হয়ে ওই ফুরফুরার কোয়ার্টারেই থেকে গেলাম। বাবা তখন রোজ যাতায়াত করতেন সাইকেলে শিয়াখালা আর তারপর বাসে করে চন্ডিতলা পর্যন্ত। আমরা অবশ্য অন্য এক কোয়ার্টারে শিফট হয়ে গিয়েছিলাম যেটা আগের থেকে দুটি কোয়ার্টার দূরে বাবার এক সহকর্মীর আনুকূল্যে। অবস্থানগত ভাবে বিশেষ কোনো পরিবর্তন না হলেও নতুন বাসস্থান কবরস্থানের আরো একটু নিকটে হয়ে গিয়েছিল। বুড়ি দিদি অবশ্য তখনো ওখানেই চাকরী করতেন, সেই সূত্রে থাকতেন ঠিক পাশের কোয়ার্টারে। প্রসঙ্গ ক্রমে বলে রাখি উনি মায়ের পিসিমা বলে ধীরে ধীরে ওই অঞ্চলের সার্বজনীন পিসিমা হয়ে গিয়েছিলেন। উনি ওনার দীর্ঘ চল্লিশ বছরের চাকুরী জীবনের সমস্তটা ওই ফুরফুরা স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই কাটিয়েছেন। গ্রামীণ হাসপাতাল হিসেবে সে সময়ে ওখানে কোনো রোগী ভর্তির সুবিধা ছিল না। শুধু মাত্র ও.পি.ডি তে রোগীদের চিকিৎসা করা হতো। আর মহিলাদের ডেলিভারি সেই সময়ে বাড়িতেই করতে হতো। আশেপাশের সাত সাতটি গ্রামের সন্তান সম্ভবা মহিলাদের প্রসূতির জন্য বুড়ি দিদিই ছিলেন একমাত্র পরিষেবিকা। স্থান কাল পাত্র ভেদে কতো রাত দেখেছি বুড়ি দিদি ডেলিভারি করাতে গেছেন দূর থেকে দূরান্তের গ্রামে। এলাকার গ্রামের মানুষের প্রতি অক্লান্ত সেবা ও অকৃত্রিম ভালোবাসা ওনাকে এক সার্বজনীন শ্রদ্ধেয় মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। ওনার চাকুরী জীবনের শেষ পর্যায়ে আশেপাশের গ্রামে এমন কোনো মধ্য বয়স্ক মানুষ খুঁজে পাওয়া যেত না যে ওনার পরিচর্যা ছাড়া জন্ম নিয়ে থাকবে। সেই একই ভাবে দীর্ঘদিন ওই অঞ্চলে স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে মানুষ জনের সেবায় নিবৃত্ত থাকায় আমার বাবার প্রতিও স্থানীয় মানুষজনের শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা বোধ ছিল অকল্পনীয়। পেশায় স্বাস্থ্যকর্মী হলেও গ্রামের সরল লোকেরা বাবাকে ডাক্তার বাবু বলে সম্বোধন করতেন। 


শিক্ষা বা অর্থনৈতিক ভাবে সে সময় আশেপাশের গ্রামের মানুষজন বিশেষ সম্ভ্রান্ত ছিল না। তাই কিছুটা অর্থাভাবে আর কিছুটা সঙ্গদোষে বেশ কিছু কুখ্যাত ডাকাত সে সময়ে গ্রামে গজিয়ে উঠেছিল। আর স্বাভাবিক ভাবে তাদের সকলেরই জন্ম হয়েছিল দিদির হাতে। তাদের মধ্যে একজন ডাকাত একবার মাঝরাতে আওয়াজ দিয়ে বাবাকে ঘুম থেকে তোলে। সে কোথাও ডাকাতি করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে, তাই অস্ত্রোপচার করে সেই রাতে তার শরীর থেকে গুলি বের করে দিতে হবে। কিছুটা স্নেহ আবার কিছুটা সমীহ থাকায় বাবা সেদিন ওকে না করতে পারে নি। বাড়িতে সরঞ্জাম না থাকায় বাবা বলেছিলেন পরের দিন চন্ডিতলা হাসপাতালে আসতে, সেখানে অস্ত্রোপচার করে গুলি বের করে দেবেন। কিন্ত পরের দিন জনসাধারণের হাতে সে ধরা পড়ে আর গণধোলাইয়ে তার মৃত্যু হয়। 

আর একবার পুলিশ রেড করেছে দুই কুখ্যাত ডাকাতের বাড়ি। ওরা দুই ভাই পুলিশকে ধোঁকা দিয়ে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যায়। মাঝরাতে বউ কে নিয়ে তাদের একজন বুড়ি দিদির কোয়ার্টারে হাজির হয় - 'পিসিমা আমাদের পিছনে পুলিশ, তাই রাতে আপনার কোয়ার্টারে আশ্রয় দিতে হবে'। আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ হলেও অত্যধিক ভালোবাসা ও স্নেহের ফল হিসেবে বুড়ি দিদি সে রাতে তাদের ঠাঁই দিয়েছিলেন। অনেকটা সময় পরে ঝুঁকি কেটে গেলে সে বউকে বুড়ি দিদির কাছে রেখে দিয়ে নিজে রাতের অন্ধকারে পলায়ন করে। পরের দিন অবশ্য পুলিশ ও জনতার যুগ্ম প্রচেষ্টায় সাতজন ডাকাত সেই অঞ্চলে প্রাণ হারিয়েছিল, যাদের মধ্যে ওই দুই ভাইও ছিল।


কানা নদীর পার ঘেঁষে দক্ষিণে কিছুটা এগিয়ে গেলে প্রায় আধা মাইল দূরে অবস্থিত ছিল তালতলা হাট। হাসপাতালের সামনের বড়ো রাস্তা দিয়েও অবশ্য যাওয়া যেতো হাটে, তবে সে পথে দূরত্বটা একটু বেশী পড়ত। নদী পারে কিছু পাকা মনিহারী ও মিষ্টির দোকান দিয়ে ঘেরা হাটের পরিসর। কিছু স্বল্প লোকের আনা গোনা থাকত সারাদিন। তবে পুরো মহিমায় হৈ হট্টগোলের সাথে সেথায় হাট বসত প্রতি শুক্রবারে, অনেকটা রবি ঠাকুরের বক্সিগন্জে পদ্মা পারের 'হাট' এর আদলে। যদিও মঙ্গলবারেও একটা হাট বসত, কিন্তু ওটা ছিল গরু হাটা, মানে ওইদিন মূলত গরুর ক্রয় বিক্রয় হতো। শুক্রবার সকাল থেকেই দূরের দূরের গ্রাম থেকে বিক্রেতারা টাটকা আনাজ, বিভিন্ন মশলা, চাল, ডাল, তাজা মাছ, শুটকি মাছ, বেতের বোনা ধামা, কুলো ইত্যাদি নিয়ে রওনা হতো হাটের উদ্দেশ্যে। ছোটো ছোটো চালা ঘর বানানো ছিল হাটের মাঝে কেনা বেচা করার জন্য। দুপুর থেকে শুরু হয়ে যেত মালপত্র সাজানোর পালা। ধীরে ধীরে বিকেল হতে হতে দূর দূরান্ত থেকে আসা শতশত ক্রেতার ভিড় উপচে পড়ত সেই চালা গুলোতে।  আর সন্ধ্যার আগেই সব মালপত্র শেষ হয়ে যেত, আর সাথে কেনা বেচার পর্বও। বাবা অফিস থেকে বাড়ি ফিরতে নিয়মিত দেরী হওয়ায় আমাদের পরিবারের বাজার হাটের দায়িত্বটা ছিল বুড়ি দিদির ওপর। আর বুড়ি দিদির সাথে প্রতি শুক্রবার হাটে যাবার সুযোগটা কোনোদিন আমি হাতছাড়া করতাম না। ওটা ছিল আমার কাছে সাপ্তাহিক মেলা যাবার মতো। কেনা কাটার পালা শেষ হয়ে গেলে আমার জন্য বরাদ্দ ছিল দশ নয়া পয়সা, আমার পছন্দের কিছু খাবার খাওয়ার জন্য। যেটা দিয়ে কখনো সনপাপড়ি, কখনো চানাচুর, আবার কখনো বা গুড়কাঠি কিনে খেয়েছি। গোধূলি তে ভাঙ্গা হাটের সেই ছন্দহারা রূপ টা দেখে আমার খুব মন খারাপ হয়ে যেত। অগত্যা দিদির হাত ধরে কানা নদীর পার ধরে ফিরতে হতো বাড়ি। পথে সেই কবরস্থানের পাশ দিয়ে সন্ধ্যার সময়ে ফেরাটা ছিল আরো এক গাছমছম করা অনুভূতি। 


তালতলা হাট থেকে আরো দক্ষিণে নদীর পার ধরে অনেকটা এগিয়ে রামপাড়া গ্রাম, আর সেখানেই আমাদের স্কুল নারায়ণী বালিকা বিদ্যালয়। বাড়ি থেকে প্রায় মাইল খানেক হাঁটার পথ। নামের সাথে 'বালিকা' জোড়া থাকলেও স্কুলের প্রাইমারী সেকশনটা ছিল কোয়েড। ছবির মতো সুন্দর সেই গ্রামটি প্রকৃতি যেন নিজ হাতে অকৃপণ ভাবে সাজিয়ে ছিলেন। যাবার পথে হাট পার হলেই নদীর পারে সারি সারি তাল গাছ আর তারই মাঝ দিয়ে স্কুলে যাবার সরু এঁটেল মাটির মন ভোলানো পথ। যে পথে বাহণ বলতে কিছু সাইকেল বা কখনো দু একটা গরুর গাড়ি। বর্ষার দিনে সেই এঁটেল মাটির পথে বৃষ্টি পড়ে হাঁটু পর্যন্ত কাদা হয়ে যেত। গরুর গাড়ির বিশালাকার চাকা সেই কাদাকে আরো ঘেঁটে দিয়ে যেত। আর সেই পথে বর্ষার দিনে হাওয়াই চপ্পল জোড়া হাতে নিয়ে স্কুল যাওয়ার সে ছিল এক নিদারুণ অভিজ্ঞতা। স্কুলের রাস্তা বরাবর নদীর ওপারে ছিল অনেক কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়ার গাছ। শরতের শেষে গাছ গুলি লাল হলুদ রঙের ফুলে ভরে যেত, আর সাথে আমাদের শৈশবের মনকেও রাঙিয়ে দিত লাল হলুদের রঙে। প্রকৃতির সেই উপচে পড়া রঙকে উপভোগ করতে সেখানে জমা হতো কতো দোয়েল, কোয়েল, বউ কথা কও, কাকাতুয়ার দল। যাই হোক ওই পথেই মাঝে পড়ত একটি সাঁওতালদের ছোট্ট গ্রাম। বিকেলে স্কুল থেকে ফেরার পথে অধিকাংশ দিনই সেখানে চলত আদিবাসীদের নাচ ও গান, মহূয়ার তালে তালে, সম্পূর্ন নিজেদের ছন্দে। রোজের ঘটনা হওয়ার জন্য সেগুলি অনেকটাই চোখ সওয়া হয়ে গিয়েছিল। 


আমাদের স্কুলের অবস্থানটা ছিল অসাধারণ। সামনে পাকা রাস্তা, আর পিছন দিকে যতো দূর দৃষ্টি যায় নয়নাভিরাম সবুজ ধানের ক্ষেত। স্কুলের কোনো বাউন্ডারি দেওয়াল ছিল না। ঢেউ খেলান সেই ধানের শীষের সাথে অনতিদূরে ক্লাসে বসে লেখাপড়া করার সে ছিল এক অনাবিল অভিজ্ঞতা। অনেক সময় ক্লাসে বসেই আনমনা হয়ে অপুর মতো হারিয়ে যেতাম সেই তেপান্তরের মাঠে। একটা মজার ঘটনা খুব মনে পড়ে। আমাদের হাসপাতালের কোয়ার্টারের এক বন্ধু প্রথম দিন স্কুলে গেছে। আমার কিছুদিন পরে ভর্তি হয়েছে সে ক্লাস ওয়ানে, তাই আমার পাশেই বসেছে প্রথম দিন হিসেবে, কিছুটা সাহস পাওয়ার জন্য। ক্লাস ওয়ানে আমাদের মেঝেতে চেটাই পেতে বসতে হতো। সেদিন ক্লাসে আমার এক পাশে বুড়ো আর অন্য দিকে সহপাঠী অঞ্জনা বসেছে। নিলীমা দিদিমণি ক্লাস নিতে এসেছেন। বুড়ো প্রথম ক্লাসে দিদিমণিকে দেখে এতো ঘাবড়ে গেছে যে খুব জোরে ওর পটি পেয়ে গেছে। আমাকে চুপি চুপি বলে মিঠু (আমার বাড়ির নাম) আমার পটি পেয়ে গেছে। আমি বকা দিয়ে ধীরে বলি ধুর চুপ করে বস। কিছুক্ষণ বাদে আবার বলে মিঠু আর চাপতে পারছি না। আমি ঘাবড়ে গিয়ে কিছু বুঝে না পেয়ে আবার বলি চুপ আরো একটু চাপ। আর শেষে যা হলো তা আশাকরি আর বর্ণনার প্রয়োজন নাই। পর দিন থেকে বুড়ো লজ্জায় আর কোনো দিন ওই স্কুলে আসেনি - অন্য স্কুলে ভর্তি হয়ে গিয়েছিল। 


গ্রীষ্মের দিন গুলি ছিল আমাদের বেশ উপভোগ্য। স্কুলে পড়ত দীর্ঘ এক মাসের গরমের ছুটি। গ্রাম বাংলায় সে সময়ে গরমও পড়ত তালে তাল মিলিয়ে। আর তা থেকে বাঁচার জন্য দিন একটু গড়ালেই বন্ধুরা মিলে চলে যেতাম দিঘিতে স্নান করতে। বেশ কয়েক ঘন্টা জলে কাটিয়ে শেষে বাড়ি ফিরতে হতো দুপুরে খাবার তাগিদে। বিদ্যুৎ না থাকায় মধ্যাহ্নের তপ্ত প্রদাহ থেকে নিজেদের নিবারণ করার একমাত্র উপায় ছিল তাল পাতার হাতপাখা। তবে আমাদের সাথে ছিল আরো এক প্রাকৃতিক আশীর্বাদ। হাসপাতালের সামনে ছিল জলে ভরা একটা বড় পুকুর আর বিশাল দুটি বট ও অশ্বত্থ গাছ। দুপুরে গাছের ছায়ায় মাদুর পেতে প্রাকৃতিক হাওয়ার মধ্যে গল্প করে আমাদের বেশ সময় কেটে যেত। ওপরে গাছের ডালে এক জোড়া চাতক-চাতকী অধীরে অপেক্ষা করে থাকত এক অতি আকাঙ্ক্ষিত কালবৈশাখীর। ওরা ডাকলে মা বলতেন দেখ ওরা বলছে 'মেঘ হ জল খাই'। আর মন দিয়ে শুনলে সত্যই যেন মনে হতো তাই বলছে। যাই হোক অল্প বেলা পড়লে সবাই মিলে তৈরী করা হতো বাতাবী লেবু বা কয়েত বেল নতুবা কাঁচা আমের চটপটে চাট্। আমাদের কোয়ার্টার পরিসরে একাধিক আম, জাম, বাতাবী লেবু, কয়েত বেল ও কাঁঠালের গাছ ছিল। তাই ফল মূলের কোনোদিন অভাব অনুভব করিনি। একবার মনে পড়ে স্বাদ বদলাতে আমি আর এক বন্ধু দুপুরে পাশের এক শশা ক্ষেতে শশা চুরি করে খাচ্ছিলাম। ভাগ্য খারাপ ছিল যে সে সময়ে ক্ষেতের মালিক আবু চাচা ক্ষেত পরিদর্শনে এসেছেন। আমরা দূর থেকে আবু চাচাকে দেখে ভয়ে কি করব ভেবে না পেয়ে শশা ক্ষেতের নীচে সোজা হয়ে শুয়ে পড়লাম। চাচা কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে চলে গেলেন - আমাদের কিন্তু দেখতে পাননি। খুব জোরে বেঁচে গিয়েছিলাম সেদিন।


শীতের দিন গুলো আমাদের কাটতো একটু ভিন্ন ভাবে। প্রায় পুরো ডিসেম্বর মাসটা থাকতো স্কুলের ছুটি। সে যুগে আজকালকার মতো শীতের ছুটিতে বাইরে বেড়াতে যাবার হিড়িক ছিল না। না ছিল গ্রামের মানুষদের ব্যায় করার মতো আর্থিক সঙ্গতি। তাই ছুটি মানেই নিজেদের মতো করে বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করে দিন গুলোকে উপভোগ করা হতো। কখনো গুলি খেলে, কখনো ঘুড়ি উড়িয়ে, আবার কখনো বা সাইকেল চালিয়ে। শীতের বেশীর ভাগ সকাল ঢাকা থাকত ঘন কুয়াশায়। আর মাঝে মধ্যেই তার মাঝে ভোরের বেলায় কেনা হতো তাজা খেঁজুরের রস। ডিসেম্বরের হিমেল সকালে ঠান্ডা ঠান্ডা সেই খেঁজুরের রসের সাথে পরিবারের সকলে বসে আড্ডাটা বেশ উপভোগ করতাম। প্রসঙ্গত বলি এই রস পাওয়া যেত শুধু শীতের দিনের ভোরের বেলায়। খেঁজুর গাছের মাথায় সামান্য অংশের ছাল কেটে সেখানে বাঁশের বানানো চামচ ঢুকিয়ে গাছের থেকে বের করা হত রস। আর সেই চামচের নীচে সন্ধ্যা থেকে মাটির হাঁড়ি বেঁধে ফোঁটা ফোঁটা করে সারা রাত ধরে সেই রস জমা করা হত। ভোরের বেলায় গাছ থেকে সেই হাঁড়ি নামিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেই রস বিক্রি করা হত। রস শেষ হয়ে গেল হাঁড়ি ফেরত দিয়ে দিতে হতো। সে যুগে ফ্রিজের ব্যবহার না থাকায় রোদ চড়ার আগে সেটা খেয়ে শেষ করতে হত। না হলে তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে গেঁজে যেত। যাই হোক দিন বাড়ার সাথে সাথে কুয়াশা বিদায় নিলে শুরু হত আমাদের গুলি খেলার পর্ব। জাতি ধর্ম বয়েস নির্বিশেষে গ্রামের সমস্ত ছেলে মেয়েরা মেতে উঠতো গুলি খেলার নেশায়। বুড়ো, সমু, অহাব, নাসো, সাইফুল্লা, গফুর, বাবলু, হুনো, তহা দের সাথে কাজল, শিখা, নেসিমা আরো কতো কে!! মনে পড়ে ছুটির দিন গুলোতে বাবাও আমাদের সাথে সমানে গুলি খেলতেন তালে তাল মিলিয়ে। কিভাবে যেন সকাল গুলো দুপুরে আর বিকাল গুলো সন্ধ্যায় পরিবর্তিত হয়ে যেত কিছু বুঝে ওঠার আগেই। শীতের শেষে পর্নমোচী গাছেদের পাতা ঝরে গেলে গাছগুলো হঠাত করে কেমন শুষ্ক হয়ে যেত, আর প্রকৃতির সেই শুষ্ক রূপ মনটাকে যেন বিষণ্ন করে দিত। পরক্ষণেই বসন্ত এসে প্রকৃতির সাথে মনকেও তরতাজা করে দিত। 


বড়ো হয়ে ক্লাস ফাইভ থেকে পড়েছি দক্ষিণডিহি স্কুলে। রামপাড়া স্কুল থেকে স্বল্প দূরে মাত্র। নতুন স্কুলে এসে অনেক বন্ধু বেড়েছে সাথে বেড়েছে পড়াশোনার চাপও। তবে আমাদের গ্রামীণ স্বচ্ছ সরল জীবন প্রণালীতে বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয় নি। ক্লাস এইট পর্যন্ত আমরা ফুরফুরায় ছিলাম সেই ভূস্বর্গে। তারপর ক্লাস নাইন থেকে চলে আসি শিয়াখালায়। সেখানে নতুন করে শুরু হয়েছিল স্মৃতিতে ভরা জীবনের আরো এক সুখময় অধ্যায়।


নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮