• সুস্মিতা

দ্বিচারিণীর প্রেম



(বৈধ অথবা অবৈধ- বিচারের ভার পাঠকের হাতে তুলে দিলাম)



[১]


মিনিবাস থেকে প্রায় লাফ দিয়ে নামল রুমনা। একটু এদিক ওদিক হলেই বড়সড় বিপদ হতে পারত। বাসের কন্ডাক্টর এবং অন্য যাত্রীরা হই হই করে উঠল। রুমনার কোনদিকে হুঁশ নেই। ঘড়ির কাঁটা দৌড়চ্ছে। ঠিক সাড়ে তিনটের সময় টুয়ার স্কুলবাস চলে আসবে বাড়ির সামনে। তার আগে রুমনাকে পৌঁছতেই হবে। বাস থেকে নেমেই মাকে দেখতে না পেলে অস্থির হয়ে কান্নাকাটি করে তিন বছরের টুয়া। আর একটু কাঁদলেই মেয়ের যে কি বমি হয়।

আজ বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছে রুমনার। প্রতিদিনই এই সময়টা রুমনা বড্ড অপরাধবোধে ভোগে। ওর মাথার ভেতরে এক ঘূর্ণিঝড় চলতে থাকে। "ঘূর্ণিঝড় পাপ-পুণ্যের, ন্যায়-অন্যায়ের।" কিন্তু রুমনা নিরুপায়...

বাস থেকে নেমে রুমনা প্রায় দৌড়তে থাকে। টুয়ার স্কুলবাস চলে আসেনি তো? কি হবে তাহলে? টুয়া যদি কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। স্কুলবাসের আয়া তখন "পেরেন্ট কল" করবে। ওরা যদি শৈবালকে ফোন করে অফিসে? যদি বলে দেয় বাচ্চার জন্য কেউ অপেক্ষায় নেই বাড়ির গেটে...কি হবে এবার?

বাসস্ট্যান্ড থেকে বাড়ি প্রায় সাত মিনিটের রাস্তা। মাথার ওপরে চড়া রোদ। কান্না পেয়ে যাচ্ছে রুমনার। দৌড়তে দৌড়তেই ও মনেমনে প্রার্থনা করতে থাকে- "হে ভগবান, টুয়ার স্কুলবাস আজ যেন একটু লেট করে...একটু দেরি করে আসে।"

"মাম্মা"- বলে ডাক দিয়ে দুহাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসছে টুয়া। শেষপর্যন্ত একেবারে ঠিক সময়েই পৌঁছেছে রুমনা। টুয়ার বাসটা সবেমাত্র থেমেছে বাড়ির সামনে।

অন্যান্য দিন টুয়া স্কুল থেকে ফেরার অন্তত আধঘন্টা আগেই ফিরে আসে রুমনা। বাড়ি ফিরেই ও স্নান করে নেয়। নিজেকে সম্পূর্ণ ধুয়ে মুছে পরিস্কার করে নেওয়ার জন্য। "অভিসারের" সব চিহ্ন মুছে ফেলার জন্য।

আজ বড় দেরি হয়ে গিয়েছে। সুন্দর সাজগোজ করা, বাইরে বেরোনোর পোশাক পরিহিতা মাকে দেখে টুয়া প্রশ্ন করে- "তুমি কোথায় গিয়েছিলে মাম্মা? তোমাকে কি সুন্দর দেখাচ্ছে।" ঠিক এই প্রশ্নটাকেই সব থেকে বেশি ভয় পায় রুমনা। টুয়ার নিষ্পাপ মনের এই প্রশ্নটার মুখোমুখি ও হতে পারেনা।


নিজেকে সবসময় দ্বিচারিণী মনে হয় রুমনার। অপরাধবোধের যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে। বারবার নিজেকে প্রশ্ন করে- "স্বামী এবং সন্তানকে কি ঠকাচ্ছে ও? যে সম্পর্ক প্রিয়জনের কাছে গোপন করতে হয়, সেই সম্পর্ককেই কি অবৈধ বলে?

"পাপ কাকে বলে? পুণ্যই বা কি?" যন্ত্রণায় বিদ্ধ হতে থাকে নিরুপায় নারীটি...


[২]

রুমনার জীবনে সম্রাট এসেছিল কৈশোরের এক অকারণ মনখারাপকরা মায়াবী দিনে। তারপর থেকে রুমনার যত সুখদুঃখ, আনন্দ বেদনা সবকিছুই ভাগ করে নেওয়া শুধুই সম্রাটের সঙ্গে। সম্রাট বহুবার চোখের জল মুছিয়ে আনন্দ ফিরিয়ে দিয়েছে রুমনার জীবনে। তখন থেকেই রুমনার সব থেকে কাছের বন্ধু সম্রাট, অন্য কোনও বন্ধুর আর প্রয়োজনই হয়নি।

স্বামী হিসেবে শৈবালও সত্যিই খুব ভালো। ওর দায়িত্ব, কর্তব্য,আচার ব্যবহারে কোনও ত্রুটি ধরার উপায় নেই। শৈবালদের পরিবারের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল রুমনার বাবার অফিসের এক কলিগের মাধ্যমে। রুমনা তখন মাত্র গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছে। শৈবাল সেই সময়ে বিদেশে।

প্রাথমিক আলাপ পরিচয় কথাবার্তা সবই টেলিফোনে। শৈবালরা প্রবাসী বাঙালি। বেশ কয়েক বছর ধরে দিল্লির অধিবাসী। বিয়ের আগে রুমনার বাবা মা বেশ কয়েকবার শৈবালদের দিল্লির বাড়ি গিয়েছিলেন মেয়ের হবু শ্বশুরবাড়ি দেখার জন্য। তারমধ্যে দুবার তো রুমনাকে সঙ্গে নিয়েই। তাছাড়াও শৈবালের বাবার অসুস্থতার কারণে ওদের পক্ষে কোলকাতায় আসা সম্ভব হচ্ছিলনা। দিল্লিতে বসেই ওঁরা পরিবার এবং রুমনাকে দেখে তাকে পুত্রবধূ করার জন্য পছন্দ করে নিয়েছিলেন।


ফোনে শৈবালের সঙ্গে কথা বলে রুমনারও ভালোই লেগেছিল। অত্যন্ত ভদ্র, শিক্ষিত এবং উদার মনের মানুষ বলেই মনে হয়েছিল তাকে। রুমনার মতো শৈবালকেও ওর বাবামায়ের একমাত্র সন্তানই বলা যায়। তবে ওর ছিল এক যমজ ভাই। মাত্র এগারো বছর বয়সে অদ্ভুত এক ঘটনায় তার মৃত্যু হয়। ভাইয়ের জন্য স্মৃতিকাতরতায় শৈবালের স্বভাবে একটা বিমর্ষ ভাব আছে। সেটা অবশ্য রুমনার খারাপ লাগেনি। শৈবালের সংবেদনশীল মনের পরিচয় বলেই মনে হয়েছিল, যেটা আজকের পৃথিবীতে কিছুটা বিরল।

যাইহোক দুই তরফের বাবামায়ের ভালোলাগার ভরসায় এবং পাত্রপাত্রীর টেলিফোনের আলাপ পরিচয় থেকেই শৈবাল রুমনার বিয়ের কথা পাকা হয়ে যায়।


[৩]


বিয়ের মাত্র দশদিন আগে দেশে এসে পৌঁছোয় শৈবাল। আত্মীয় বন্ধুদের সহযোগিতায় বিয়ের অনুষ্ঠানের সব ব্যবস্থা তখন পুরোপুরি হয়ে গিয়েছে। প্রথম বিপর্যয়ের ধাক্কাটা লাগলো শৈবাল দেশে আসার পরেই। বিয়ের অনুষ্ঠানের ঠিক সাতদিন আগে রুমনা ও শৈবাল পার্কস্ট্রিটের এক রেস্তোরাঁয় দেখা করার প্ল্যান করে। নিরিবিলিতে অন্তত একবার দুজনের গল্পগুজব করার ইচ্ছে।

দুজনের মনেই দারুন উত্তেজনা। ভারি সুন্দর করে সেদিন সাজগোজ করেছিল রুমনা। ভাবী স্বামীর সঙ্গে প্রথম দেখা। মনেমনে প্রস্তুতি চলছে শৈবালকে নিজের জীবনের সব গল্প বলবে ও, নিজের ভালোলাগা, হবি...সব, সবকিছু। শৈবালের গল্পও শুনতে হবে। আরও একটু ভালো করে চিনে জেনে নিতে হবে তাকে।


টেলিফোনের গল্প থেকেই রুমনা বুঝত যমজ ভাই সমুদ্র আজও শৈবালের বড় দুর্বল জায়গা। তাকে হারানোর শোক সে আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। রেস্তোরাঁর মৃদু আলোয় প্রথমবার হাতে হাত রেখেছিল শৈবাল আর রুমনা। সে যে কি ভীষণ ভালোলাগা...


গল্প করতে করতে দুজনেই সুখের সাগরে ভাসছিল। পরম নির্ভরতায় রুমনা সেদিনই শৈবালকে জানাল সম্রাটের কথা, ওদের দুজনের গভীর বন্ধুত্বের কথা।

ব্যস, কি যে হল ঠিক তারপরেই। শৈবালকে যথেষ্ট আধুনিক এবং উদার মনের মানুষ মনে হয়েছিল আগে। কিন্তু রুমনার কাছে সম্রাটের কথা শুনে শৈবাল সেদিন একেবারে স্তব্ধ হয়ে রইল। তারপরে আর গল্প এগোলো না। মুখটা শক্ত করে মাত্র একটি বাক্যই উচ্চারণ করেছিল শৈবাল- "এবার ওঠা যাক।"

বাড়ি ফিরে আসার পনেরো মিনিটের মধ্যেই ফোনকলটা এসেছিল। ফোন এসেছিল শৈবালদের বাড়ি থেকে। ওরা শৈবাল রুমনার বিয়েটা ভেঙে দিতে চান। এখনও হাতে সাতদিন সময় আছে। বিয়ের পরে অসুবিধা হওয়ার থেকে এখনই সরে আসাই ঠিক হবে। শৈবাল আর এই বিয়েতে আগ্রহী নয়।


[৪]


মাথার ওপরে সহসা ছাদ ভেঙে পড়লে যে অবস্থা হয়, রুমনাদের পরিবারের ঠিক সেরকমই হয়েছিল। সকলে যেন বজ্রাহত। সম্রাটের সঙ্গে রুমনার সম্পর্ক শৈবাল মেনে নিতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও কখনও মানতে পারবেনা। এরকম অবস্থায় বৈবাহিক সম্পর্কের দিকে এগোনো উচিৎ নয় বলেই শৈবালদের পরিবার বিয়ে ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ফোন পেয়ে রুমনাদের বাড়িতে তখন শোকের ছায়া। সামাজিক লজ্জায় ওরা মাটিতে মিশে যাচ্ছে। এদিকে বিয়ের "হল" বুক করা থেকে শুরু করে ক্যাটারার, ডেকোরেটর এবং সমস্ত কেনাকাটার পর্ব শেষ। অনুষ্ঠান উপলক্ষে বাড়িতে আত্মীয়স্বজন আসতে শুরু করে দিয়েছে।


শৈবালদেরও কি কষ্ট হয়নি? হ্যাঁ হয়েছিল...খুব বেশিরকমই হয়েছিল। জাঁকজমক করে প্রস্তুতি তো ওরাও নিচ্ছিল। এক ছেলের মৃত্যুশোকের পরে এতদিন বাদে বাড়িতে একটা আনন্দের অনুষ্ঠান। পার্কস্ট্রিট থেকে ফিরে বহুবছর বাদে সেই রাতে শৈবাল তার মৃত ভাইয়ের জন্য হাউহাউ করে কেঁদেছিল। ভাইটার কথা খুব মনে পড়ছিল সেদিন।

শৈবাল আর সমুদ্র। সর্বক্ষণের ছায়াসঙ্গী ছিল ওরা একে অপরের। ওদের তখন এগারো বছর বয়স। সেদিন জ্বরের জন্য শৈবাল স্কুলে যেতে পারেনি। সমুদ্র একাই স্কুল থেকে ফিরছিল। হঠাৎ রাস্তায় এক ষন্ডাগুন্ডা পাগলা কুকুরের কামড়। কুকুরের কামড়ের তো আজকাল কত আধুনিক চিকিৎসা বেরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু বিধির অদ্ভুত বিধানে সমুদ্রকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।


আজ রুমনার সঙ্গে ব্রেকআপের পরে ভাইটার কথা বড্ড মনে পড়ছে। শৈবালের সব সুখদুঃখের সাথী ছিল ওই ভাইটাই। "অনুষ্ঠানের সাতদিন আগে বিয়ে ভেঙে দিতে চাইছে পাত্রপক্ষ"- এই সামাজিক লজ্জা বহন করা কঠিন হয়ে পড়ল রুমনার বাবার পক্ষে। তার ওপরে একমাত্র সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তা। কিছু একটা ব্যবস্থা করতেই হবে। শৈবাল সত্যিই ভালো ছেলে। ওদের মতো সজ্জন পরিবারও বিরল। অতএব পিতামাতা চেপে ধরে রুমনাকে বোঝাতে শুরু করলেন। প্রথমে অনুনয় বিনয়...তারপরে মায়ের আত্মহত্যার ভয় দেখিয়ে শেষপর্যন্ত কড়া আদেশ- "সম্রাটকে ভুলে যেতে হবে, মুছে ফেলতে হবে সম্পূর্ণভাবে মন থেকে। কিন্তু শৈবালের সঙ্গে বিয়ে ভাঙা চলবেনা, কোনও ভাবেই নয়। মেনে নিতেই হবে ওদের শর্ত।"


অনেক নাটকীয় ঘটনার পরে রুমনার মা বাবা মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে শৈবালদের বাড়ি গিয়ে কথা দিয়ে আসলেন- "রুমনা সম্রাটের সঙ্গে আর কোনোদিন কোনও রকম সম্পর্ক রাখবেনা, ভুলে যাবে...একেবারে ভুলে যাবে তাকে।"

সম্রাট এবং রুমনার যেন আর কখনও দেখা না হয়, তার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা রুমনার বাবাই নিলেন। পরিস্থিতির নাটকীয়তায় সব কিছু গুলিয়ে গিয়েছিল রুমনার। দুটি পরিবারের সম্মান, মা বাবার জীবনের সুখ শান্তি...সবকিছু ওর ওপরেই নির্ভর করছে। একটাও কথা বলেনি রুমনা। "শর্ত মেনে" বিয়েতে মত দিয়েছিল।

বিয়ের দিন বিকেলে পার্লার থেকে সাজাতে এসেছিল রুমনাকে। চোখের জলে কতবার যে চন্দন ধুয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। পার্লারের মেয়েদুটির অবাক প্রশ্নের উত্তরে "চোখে ইনফেকশন হয়েছে" - অজুহাত দিয়েছিল কনে।

তার মন বলছিল- "ওই যে বাজছে সানাইয়ের সুর, ঠিক রুমনার কান্নার সুরে...সেই সুর কি পৌঁছচ্ছে সম্রাটের কানে? কতদূর সরিয়ে দেওয়া হল সম্রাটকে? কতখানি দূরত্ব তৈরি করা যায় দুটি হৃদয়ের মধ্যে? সম্রাটও কি আজ ঠিক এভাবেই কাঁদছে? একেবারে একা?"


[৫]


বিয়ের মাত্র দুমাসের মধ্যেই বিদেশের পর্ব শেষ হয়ে শৈবালের পোস্টিং হয়ে গেল কলকাতায়, সল্টলেকের সেক্টর ফাইভে। বাবা মা দারুণ খুশি। একমাত্র মেয়ে জামাই এক শহরেই থাকবে। শৈবালের বাবা মাও দিল্লির পাট তুলে দিয়ে কলকাতায় ফেরার ব্যবস্থা করছেন। রুমনাও দারুণ খুশি, তবে তার খুশির মধ্যে মিশে রইল অন্য আর এক গোপন খুশি। সম্রাটের সঙ্গে এক শহরে থাকার খুশি।

দেখতে দেখতে প্রায় সাড়ে চার বছর পেরিয়ে গিয়েছে। রুমনা শৈবালের সংসারে এসেছে ছোট্ট পরী টুয়া। শৈবালও তার স্ত্রী-সন্তানকে ভালোবাসায় এবং যথাসম্ভব প্রাচুর্যে ভরিয়ে রেখেছে। কোথাও কোনো ত্রুটি রাখেনি।

কিন্তু এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও সম্রাটকে এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারেনি রুমনা। সম্রাটকে একেবারে একা করে দিয়েছে ও নিজে। রুমনার তবুও সংসার হয়েছে, সন্তান আছে। কিন্তু সম্রাট তো নিঃসঙ্গ। সবসময় এক তীব্র অপরাধবোধ, পাপবোধের যন্ত্রনায় ভোগে রুমনা। একদিকে সম্রাটের প্রতি সে নিজে এবং তার বাপের বাড়ির পরিবার যে আচরণ করেছে, তার জন্য অপরাধবোধ। অন্যদিকে মনের মধ্যে সম্রাটকে ভুলতে না পারার গোপনীয়তার বোঝা...। মেয়ের বিয়ের ঠিক আগে রুমনার বাবা নিজে দায়িত্ব নিয়ে সম্রাটকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। রুমনার জীবন থেকে দূরে...অজ্ঞাতবাসে। রুমনাও প্রতিজ্ঞা করতে বাধ্য হয়েছিল- "জীবনে আর কোনোদিন, কখনও সম্রাটের সঙ্গে দেখা করবেনা।"


কিন্তু মন তো শেষপর্যন্ত কারুরই শাসন মানেনা। তাকে আর কে কবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে?


সম্রাটের অজ্ঞাতবাসের ঠিকানা শেষ পর্যন্ত ঠিক খুঁজে বের করে নিয়েছিল রুমনা। কিভাবে? সে এক অন্য গল্প। সম্রাটের ভালোবাসার টান ও উপেক্ষা করতে পারেনি। ভুলতে পারেনি সম্রাটকে। গত চার বছর ধরে তাই সম্রাট রুমনার দুপুরবেলার গোপন অভিসার। শৈবাল অফিসে বেরিয়ে যাওয়ার পরে এবং টুয়াকে প্লে স্কুলে ঢুকিয়ে দিয়ে মাত্র ঘন্টা দুয়েক সময়ের জন্য হলেও রুমনাকে যেতেই হবে সম্রাটের কাছে। এক আকাশ অপেক্ষা বুকের মধ্যে নিয়ে পথ চেয়ে থাকে সম্রাট...কখন আসবে তার রুমনা তার কাছে...

মানসিক টানাপোড়েনে এক একদিন সারারাত ঘুম আসেনা। আধো অন্ধকার শোওয়ার ঘরে ঘুমন্ত শৈবালকে একবার ছুঁয়ে দেখে রুমনা। বড্ড কান্না পায়, ও কারুকে ঠকাতে চায়না... ও কারুকে কষ্টও দিতে পারেনা... কারুকেই না...


বড় খাটের পাশেই একটা বেবিকটে ঘুমায় টুয়া। ওর মাথার কাছে মৃদু একটা আলো জ্বলে। নীলাভ সেই আলোয় নিষ্পাপ টুয়াকে ঠিক দেবদূতীর মতো মনে হয়। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করে রুমনা। নিজেকে প্রশ্নবাণে ক্ষতবিক্ষত করে- "পাপ কাকে বলে? পুণ্যই বা কি?" নিজের সন্তানের কাছে যে কাজ গোপন করতে হয়, সে কাজই কি পাপ? সম্রাটের কথা টুয়াকেও বলতে পারেনা রুমনা। ওর কাছে একেবারে গোপনে যেতে হয় রুমনাকে। টুয়া যদি বলে দেয় শৈবালকে...


তবে কি সে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত? নিঃশব্দ কান্নায় কেটে যায় রুমনার রাত...

[৬]


শৈবাল অফিসের জন্য বেরিয়ে যায় সকাল সাড়ে ন'টার মধ্যে। ফিরতে সেই সন্ধে।

টুয়াকে বেলা এগারোটা নাগাদ স্কুলে পৌঁছে দিয়েই রুমনার গন্তব্য সম্রাটের বাড়ি। শনি রবিবার সম্ভব নয়। তবু সপ্তাহে তিনদিন তো যেতেই হবে। সম্রাটের অবশ্য এত অল্প সময়ে মন ভরেনা। ও প্রতিটি মুহূর্ত রুমনাকে কাছে পেতে চায়। সম্রাটের অজ্ঞাতবাসের ঠিকানা রুমনার বাড়ি থেকে প্রায় একঘন্টার রাস্তা, মিনিবাসে। বাস থেকে নেমে দৌড়তে থাকে রুমনা। প্রতিদিনই সম্রাটের বাড়ির বৃদ্ধা মহিলা দরজা খুলে দেন। সম্রাট যেন বাতাসে ঠিক টের পায় রুমনার আসার খবর। ও যে কান পেতে শোনে রুমনার পদধ্বনি। দরজা খুলে ড্রয়িংরুমে পা রাখামাত্র সম্রাট নিঃশব্দে সামনে এসে দাঁড়ায়। দুটো হাত রাখে রুমনার কাঁধে, ওকে বুকের মধ্যে টেনে নেয়। রুমনাও একমুহূর্ত দেরি না করে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে সম্রাটের পুরুষালী লোমশ বুকে। পরম নির্ভরতায় গভীর আশ্লেষে রুমনাকে বুকে চেপে আদরে ভরিয়ে দেয় সম্রাট। বিশ্বাস, বন্ধুত্ব আর ভালোবাসায় ভাসতে থাকে দুই নারীপুরুষের হৃদয়।

এরপরের দেড়ঘন্টা সময় ঠিক স্বপ্নের মতো। দুজনে মিলে স্বর্গ রচনা করে ওরা। সম্রাট রুমনাকে এক মুহূর্তের জন্যও ছাড়তে চায়না। কি অপার্থিব সেই প্রেমের দৃশ্য।


সম্রাটকে ছেড়ে বাড়ি ফেরার দৃশ্যটি প্রতিদিনই বড় করুণ এবং অবর্ণনীয়। চোখের জলের বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ফিরে আসে রুমনা... ফিরে আসে তার বৈধ সংসারে।



[৭]


গত বেশ কয়েকদিন ধরে সম্রাটের শরীরটা বেশ খারাপ। রোজই জ্বর আসছে। বড় দুর্বল হয়ে পড়েছে ও। খাওয়াদাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছে। একমাত্র রুমনা গিয়ে নিজের হাতে কিছু খাওয়ালে সামান্য কিছু মুখে দেবে। ক্রমশ যেন নির্জীব হয়ে যাচ্ছে।

সম্রাটের বাড়ির বৃদ্ধা মহিলা বাড়িতেই ডাক্তার আনানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনিও কোনও আশার কথা শোনাতে পারেননি। সময় হয়ে গিয়েছে, এই পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার সময় এগিয়ে আসছে সম্রাটের। এই অমোঘ সত্যকে মেনে নিতেই হবে।


রুমনা আর পারছেনা... বড় কষ্ট...আর কিছু ভাবতে পারছেনা ও। এই মানসিক টানাপোড়েন আর যন্ত্রণার বোঝা বহন করা বড্ড কঠিন। শেষের মাত্র কয়েকটা দিন সম্রাট রুমনাকে সবসময় কাছে পেতে চায়। অন্যদিকে সম্রাটকে একটু সেবা যত্ন করার জন্য রুমনার বুকের ভেতরটা ছটফট করতে থাকে। কিন্তু রুমনা জানেনা কি করবে ও এখন? শৈবালকে এসব কথা খুলে বলা যাবেনা। কিছু বুঝবেনা ও। ভাই সমুদ্রের কুকুরের কামড় থেকে মৃত্যুর শোক ও আজও ভুলতে পারেনি। টুয়াকে নিয়েও সাংঘাতিক আতঙ্কে থাকে শৈবাল। মেয়েকে এক মুহূর্ত একা রাখতে দেয়না। আর টুয়াকে সঙ্গে নিয়ে সম্রাটের বাড়ি? সেটাও অসম্ভব ব্যাপার। শৈবাল জানতে পারলে...


[৮]


আজও টুয়াকে স্কুলে পৌঁছে দিয়েই রুমনা রুদ্ধশ্বাসে রওনা দেয় সম্রাটের বাড়ির দিকে। গতকালই দেখে এসেছে সম্রাটের শরীরের অবস্থা খুব খারাপ। অন্তিম লগ্ন ঘনিয়ে আসছে। রুমনার ইচ্ছে করে এই সময়ে প্রতিটা মুহূর্ত সম্রাটের পাশে থাকতে। রুমনার কোলে মাথা রেখেই যেন সম্রাট পৃথিবীকে বিদায় জানাতে পারে। এইটুকু স্বীকৃতি যেন ওদের দুজনের ভালোবাসা পায়। মিনিবাসটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।

পথ যে এত দীর্ঘ হতে পারে...

বাড়ির দরজা যথারীতি খুলে দিলেন সেই বৃদ্ধা মহিলা।

কিন্তু কোথায়...আজ তো সম্রাট তার পেছন এসে দাঁড়ালো না? ঝাঁপিয়ে পড়ে রুমনাকে বুকে টেনে নিয়ে চুমোয়, আদরে ভরিয়ে দিলো না? একটু অবাক হয় লাগে...


ভেতরের ঘরের দরজায় পা দিয়েই থমকে দাঁড়ায় রুমনা...ওর মুখ থেকে কোনও শব্দ বের হয়না। ঘরের এক কোণে সম্রাটের নিথর দেহ। পূর্ণবয়স্ক গোল্ডেন রিট্রিভার কুকুর সম্রাট ঘুমিয়ে পড়েছে...চিরদিনের জন্য, শেষ ঘুমে। ওদের আয়ুষ্কাল এরকমই হয়।


সম্রাট আর নেই। রুমনা এসে পৌঁছনোর আগেই ও চলে গিয়েছে। ওকে শেষ বিদায়টুকুও জানাতে পারেনি রুমনা।

মাটিতে বসে সম্রাটকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে রুমনা। "বৈধ-অবৈধ, পাপ-পুণ্যের" সব প্রশ্ন ওর কান্নার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়..

নীড়বাসনা  আশ্বিন ১৪২৮