• ধীমান চক্রবর্তী

ধারাবাহিক - একলা পথে



(পর্ব - ৫)



আমি চোখ তুলে তাকালাম তাঁর দিকে।


বেঁটেখাটো রোগা মানুষ। সাদা ফুলহাতা জামা আর ছাইরঙা প্যান্ট। একটু বুড়ো মতো.. কিন্তু একটুও কুঁজো নন। মেজকার কথায় যাকে বলে "সিনাটান্টানকর্কেখাড়াহ্যায়!" মুখ দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুনি হাসবেন।চশমার ফাঁকে জ্বলজ্বলে চোখের কোণে হাসি।


জিজ্ঞেস করলেন.. "নাম কী তোমার?"


কি সুন্দর মিষ্টি গলার আওয়াজ! নিচু গলায় থেমে থেমে বলেন.. কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারণ।


মা আসার আগে শিখিয়ে দিয়েছিলো যে থেমে থেমে পরিষ্কার করে নিজের নাম বলতে হয়। আমিও সেইরকম ভাবে খুব থেমে থেমে টেনে টেনে বলছি "শ্রীমান...।"


হেসে বললেন.. "শ্রীমান কী? তোমার নামটা কি রেলগাড়ির মতো লম্বা? আর গাড়িটা খুব আস্তে আস্তে চলে বুঝি?"


আমি ফস করে বলে বসলাম.."তুমিও তো থেমে থেমে কথা বলো!" বলেই সাঁই সাঁই করে আমার নাম, বাবার নাম, ঠিকানা.. সব কিছু বলে দিলাম!


পিছনে একটা লম্বা মতো ছায়ার অস্থির দুলুনি আর চাপা গলায় "ইডিয়ট" শব্দ বুঝিয়ে দিলো আমি একটা কিছু ভয়ঙ্কর গোলমাল করে বসে আছি। বাড়ি ফিরে পিঠের কপালে রামঠ্যাঙানি নাচছে! মেজকাও আজ বাঁচাতে পারবে না!


কিন্তু ইন্দু স্যার আমার কথা শুনে রেগে যাওয়ার বদলে ছোটো ছেলের মতো হেসে উঠলেন! কি সুন্দর হাসি.. পথের দেবতা কি এভাবেই হাসেন? আমি আজ বাড়ি ফিরে মেজকাকে এরম করে হেসে দেখাবো!


বাবা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো.. হাত তুলে বাবাকে থামিয়ে দিলেন। তারপর আমায় বললেন..

"আমিই বুঝতে ভুল করেছি ভাই। তুমি ঠিক বলেছো। তবে কি জানো.. নাম কেন.. সব কথাই থেমে থেমে স্পষ্ট করে বলতে হয়।"


বললাম.. "আমি কী করবো? মা বলেছিলো তো সঅঅঅঅব কথা ধীরেএএএ ধীরেএএএ বলবে!"


আবার সেই সুন্দর হাসিটা হেসে বললেন..

"ঠিক বলেছেন তোমার মা। কিন্তু অতো থেমে থেমে বললে তো তোমার কথা শেষ হবে না। আর সেই ফাঁকে অন্য সব খারাপ লোকে নিজেদের কথা বলে দেবে। যেমনটা আমি দিলাম।"


"কই..তোমায় তো খারাপ লোক মনে হচ্ছে না আমার! তুমি তো বেশ..!"


আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলাম.. পিঠে বাবার খোঁচা খেয়ে থেমে গেলাম!


ইন্দুস্যার মিষ্টি হেসে বললেন..

"যাক্ বাবা.. বাঁচা গেলো! আমি তাহলে অতোটা খারাপ লোক নই!"


তারপরে গম্ভীর হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন.. "ও বয়সে ছোটো হলেও ও কিন্তু আমার আপনার মতোই একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ! ওর কথাগুলো ওকেই বলতে দিতে হবে!"


বাবা রে! কি গম্ভীর কথা.. আমি তো কিছুই বুঝতে পারলাম না। কেবল বাবার হাসিমুখে ঘাড় নাড়া দেখে বুঝলুম এযাত্রায় পিঠ টা বেঁচে গেলো!


হঠাৎ আমায় বললেন.. "একটা গান শোনাবে?"


"আমি গান গাইতে পারি আপনি জানলেন কী করে?"


হেসে বললেন.. "যার নামেও সুর থাকে তার গলাতেও সুর থাকে। এটা আমার কথা নয়.. ফেলুদার কথা।"


আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি দেখে বললেন.. "তোমার মেজকা কে বোলো 'সমাদ্দারের চাবি' গল্প টা জোগাড় করে দিতে। ফেলুদা তো আমার খুব প্রিয় দাদা। দেখো তোমারও তাকে পছন্দ হয়ে যাবে। .. এবার তো একটা গান শোনাও!"


আমি মাসির কাছে আমার প্রথম শেখা গান.. যেটা গাইতে আমার সবচাইতে বাজে লাগে.. "হে সখা মম হৃদয়ে রহো" গেয়ে ফেললাম। গানটা ভালো না হলেও ছোটো.. সেজন্যে।


"বাহ্.. খুব সুন্দর! কার কাছে শিখেছো?"


"আমার মাসি তো বাড়ি বাড়ি গান শিখিয়ে বেড়ায়.. তার কাছে।"


"তুমি মাসির বাড়ি যাও?"


"না তো।.. মাসি, মামা, দিদাই, গজাদা.. সকলেই তো আমাদের বাড়িতে থাকে। সেই সঙ্গে আমার মেজকা, মেজমা আর মেজপিসির ছেলে নন্টেদা।"


এইরেঃ! পিঠে বাবা হাত রেখেছে! চুপ করে গেলাম।


"বড়ো হয়ে কী হতে ইচ্ছে করে?" সেই সুন্দর হাসি হাসতে হাসতে বললেন।


বললাম.."কিচ্ছু না। আমার তো কেবল বড়ো হতেই ইচ্ছে করে!"


"খুব সুন্দর ইচ্ছে। তবে বড়ো হয়ে যাওয়ার পর দেখো.. আবার ছোটো হতে ইচ্ছে করছে। হযবরল র উধো আর বুধোর মতোই!"


আমার খুব জোর হিসি পেয়েছিলো। সেটা বলতে উনি তেওয়ারি বলে একজনের সাথে আমায় বাথরুম পাঠিয়ে দিয়ে বাবার সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন।

আমি হিসি টিসি করে ফিরে আসতে আসতে শুনতে পেলাম..

"ওকে সোজা ক্লাস ওয়ান এ দিয়ে দে। ও ধরে নেবে।"


কাকে 'তুই' বলছেন?.. বাবাকে? কিন্তু আমার সামনে তো 'আপনি' বললেন! আবার মেজকাকেও চেনেন!


আমি ওই ঘরে ঢুকতে আমায় বললেন.. তাহলে সোমবার থেকে তোমার সাথে স্কুলে রোজ দেখা হবে।.. কেমন?"


বাবার সঙ্গে বাড়ি ফেরার সময় সারাক্ষণ ওই ইন্দুস্যারের কথাগুলো মনে হচ্ছিলো।


মেজকাকে বলতেই হবে। সেই সঙ্গে মেজকাকে পগিয়ে 'সমাদ্দারের চাবি' টা হাতাতে হবে। আর নামে সুর গলায় সুর, হযবরল, উধো-বুধো বড়ো হয়ে গিয়েও আবার কেন ছোটো হতে চায় জেনে নিতে হবে।


ও হ্যাঁ! আরেকটা জিনিসের মানে জানতেই হবে। ওই ইস্কুলে বাথরুমের দেয়ালে পেনসিল দিয়ে লেখা ছিলো!

'বোকা' কথাটার মানে জানি.. কিন্তু তার পরের শব্দটার মানে কী?





(পর্ব - ৬)


ইন্দুস্যারের কথাটা যদি সত্যি হয়.. তাহলে আরেকটা দাদা বাড়লো। গজাদা.. কায়দা.. নন্টেদার পর এই ফেলুদা!


গজাদা আমার পাগল হয়ে যাওয়া বড়োমাসির ছেলে। লক্ষ্মী দাসের আখড়ায় বডিবিল্ডিং করে। আমার মা আর ছোটোমাসি.. যাকে আমি 'কায়দা' বলে ডাকি.. তাদেরকে তুইতোকারি করে। আর দিদাইকে বলে 'মা!' আমাদের বাড়িতেই থাকে। সকালে ছখানা ডিম খায় আর সন্ধেবেলা ইয়াব্বড়ো একটা সসপ্যান ভর্তি মোষের দুধ!

'হাওড়াশ্রী' প্রাইজও পেয়েছে বডিবিল্ডিং করে। আগে অনেক জায়গায় গুলি-ফোলানোর শো করতে যেতো.. এখন রেলে চাকরি করে।

চান করে যখন ডোরাকাটা তোয়ালে দিয়ে গা আর মাথা মোছে.. আমি হাঁ করে তাকিয়ে দেখি!

'যুগবাণী' ক্লাবের মহিষাসুরটাও হেরে ভূত হয়ে যাবে গজাদার কাছে.. এমন গুলি ফোলায়!


আমার ছোটোমাসিকে পাড়ার সবাই 'কায়াদি' বলে ডাকে। আমি অতো শক্ত নাম বলতে না পেরে 'কায়দা' বলেই ডাকি।


মায়ের কাছে শুনেছি আমার বড়োমাসি নাকি দারুণ গান গাইতো আর ছবিও আঁকতো। বড়োমেসো হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ায় মাসি পাগল হয়ে গেলো। কিন্তু গান আর আঁকা ভোলেনি পাগল হয়ে যাবার পরেও। পাগলামি বেড়ে যাওয়ায় আমার দাদু 'ঈশ্বর শ্রী দীনেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়' বাধ্য হয়েই মাসিকে লালগোলার এক পাগলা গারদে রেখে এসেছিলেন। সেখানেই মারা যায় বড়োমাসি.. গজাদার মা।


কায়দা যেমন বাড়ি বাড়ি গিয়ে গান শেখাতো.. তার কাছে অনেকে গান শিখতেও আসতো।

মায়ের কাছে শোনা..

আমি কথা বলতে শেখার সময় প্রথম যেটা বলেছিলাম, সেটা নাকি একটা গোটা বাক্য..

"কায়া, গান গা!"


নন্টেদা হচ্ছে আমার মেজোপিসির ছোটো ছেলে.. আমাদের বাড়িতেই থাকতো। বেলুড়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তো। এখন চাকরি করতে যায়। মেজকার পরেই আমার সবচেয়ে পছন্দের লোক। পড়ার বই খাতা নিয়ে আমার সঙ্গে মাঝে মাঝেই খেলতে বসে। আবার 'রাম-হনুমান' খেলার সময় হনুমান হয়ে লঙ্কায়.. মানে দিদাইয়ের ঘরের অশোকবনের টেবিলের তলায় ঝুড়িচাপা ডিমপোস্ত থেকে বেছে বেছে ডিমভাজা গুলো তুলে তার প্রভু রাম.. মানে আমার জন্য নিয়ে আসে।


বাবার সাথে বাড়ি ফেরার সময় মনে করতে চেষ্টা করছি আমার সবচাইতে পুরোনো দিনের কোন কথাটা মনে আছে। কিন্তু মনে আর পড়ছে না।


কেবল মনে পড়ে যাচ্ছে ওই স্যারের কথাগুলো। কি সুন্দর করে কথা বলা.. আর নামে সুর গলায় সুর..বড়ো হয়ে ছোটো হবার ইচ্ছে করা.. সব কিছু মিলিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে চলছিলাম হয়তো!


একটা রামখ্যাঁকানি খেতেই চমক ভাঙলো!..

"উজবুক! কোথায় থাকে মনটা? বাড়ি এসে গেছি তো!"


সত্যিই বাড়ি এসে গেছি! গলির মোড়ে মামা.. যাকে আমি 'ফণীদা' বলে ডাকি.. পায়চারি করছে আর ঘড়ি দেখছে।


"কী ফণী.. ওঁরা এলেন?"


"উঁহুঁ!" মামা চিন্তা চিন্তা মুখে মাথা নাড়লো।


"দাশু ফেরেনি এখনো?"


"না। দেখলাম তো মনোরমা থেকে মিষ্টি কিনছে। এসে যাবে।"


মেজকা মিষ্টি কিনছে কেন? কোনো বড়োমাপের কেউ আসবে বলে মনে হচ্ছে.. ওই যে বাবা বললো "ওঁরা"..!


কিন্তু সবার এতো চিন্তা কেন? 'ওঁরা' কারা.. আর আসছেনই বা কীজন্যে?



বাড়ি ঢুকে দেখি সবাই থমথমে মুখে কারোর আসার জন্য অপেক্ষা করছে। উঠোনের যে কোণে খাটা পায়খানা সেদিকটা একটা পুরোনো বিছানার চাদর দিয়ে আড়াল করা। তারপর মাঝের ঘরে ঢুকে দেখি রংচটা পর্দাগুলোর বদলে নতুন ফুলফুল পর্দা.. ঠাকুরদার পুরোনো মিনে করা পেতলের ফুলদানিতে রজনীগন্ধার তোড়া।


বুঝতে বাকি রইলো না আজ আবার সেই বিচ্ছিরি কান্ডটা হতে চলেছে। 'ওঁরা' মানে আরো এক পাল বদলোক সেজেগুজে আসবে কায়দাকে 'দেখতে।'


এরকম কতো দেখতে আসা যে দেখলুম! প্লেটভর্তি সিঙাড়া কচুরি মিষ্টি গপগপিয়ে গিলবে। তাদের সামনে কায়দাকে এসে বসতে হবে.. মনে রাগ আর মুখে হাসি নিয়ে। হেঁটে চলে দেখাতে হবে। ইচ্ছে না করলেও গান গাইতে হবে। অসভ্য অসভ্য কতগুলো লোকের বিটকেল বিটকেল প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে বানিয়ে বানিয়ে। তারপর 'ঘেএএউ.. ঘেএএএএউ' ঢেকুর তুলতে তুলতে লোকগুলো চলে যাবে।


একবার তো একটা লোক.. সেটাই বোধহয় বিয়ে করবে.. একদল বন্ধু নিয়ে এসেছিলো। বন্ধুগুলো কী বিচ্ছিরি ভাবে কায়দার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলো! আর সেই হুমদো লোকটা কায়দাকে জিজ্ঞেস করেছিলো.. "আচ্ছা বলুন তো!.. সোনা আর সিঁদুরের মধ্যে কোনটা আপনার পছন্দ?"


কায়দার চোখ বন্ধ.. বুঝতে পারছিলাম লোকগুলোকে সহ্য করতে পারছে না। কিন্তু কিছু বলতেও পারছে না। আর লোকগুলো এ ওর দিকে তাকিয়ে 'হ্যা হ্যা' হাসছে.. মজা করছে!


আমার আর সহ্য হয়নি! বলে বসেছিলাম.. "জেঠু! আগে তুমি বলোতো.. কাটাপোনা আর ইঁদুর.. দুটোর মধ্যে তোমার কোনটা পছন্দ?"


লোকগুলো আমায় 'ডেঁপো'.. 'এঁচোড়েপাকা' আর আমাদের বাড়িটাকে 'আনকালচারাল' বলে চলে গিয়েছিলো।


মেজকা শুধু হাতজোড় করে বলেছিলো.. "মাপ করবেন! ওটা 'আনকালচার্ড' হবে!.. আর ওটার সঠিক মানে জানতে হলে ডিকশনারি নয়.. আপনাদের আয়নার প্রয়োজন.. অশিক্ষিতরা যাকে দর্পণ বা মিরর বলে!"


আজ আবার কী নাটক হতে চলেছে.. সেটা ভেবেই রাগে আমার গা রি রি করছিলো!


মেজকা টাও যে মনোরমা থেকে এখনও পর্যন্ত ফিরছে না! আর কতো মিষ্টি খাওয়াবে!



(পর্ব - ৭)


মেজকা খাবার দাবার নিয়ে বাড়ি ঢুকতেই আমার মুখোমুখি পড়ে একটু যেন থমকে গেলো। সহজ হতে গিয়েও সেই মেজকা-মার্কা সহজ হাসিটা হাসতে পারলো না।

"কী রে.. কেমন লাগলো ইস্কুল?" বলেই মিষ্টি টিষ্টি নিয়ে চলে গেলো রান্নাঘরের দিকে।


শেষ বার এইরকম 'ওঁরা'দের একজন কায়দাকে তার গান শুনে বলেছিলো..

"শুধু এর তার বাড়ি বাড়ি টং টং করে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে হবেটা কী? ওই তো গানের ছিরি!"


কায়দার চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছিলো.. যদিও কিছু বলেনি। আমি কিন্তু জানতাম কায়দা ইচ্ছে করে বাজে গেয়েছে।


এমনকি দিদাই অবধি বলে ফেলেছিলো..

"কয়েন কী?.. এ্যাতোজনায় তো আইলো! কিন্তু অর গাওয়া গান লইয়া ত কেউ কিসু কয় নাই!"


সেবার ওই 'ওঁরা' র দল.. বিচ্ছিরি লোকগুলো চলে যাবার পরে মেজকা আমায় কথা দিয়েছিলো যে এই অসভ্যতা আর হবে না। তাও আবার!


আর সেজন্যই মেজকা আজকে যেন পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে আমার থেকে! আমার সামনাসামনি দাঁড়াতে পারছে না! এমনকি সোজাসুজি আমার চোখে চোখ রেখে কথা বলতেও পারছে না! এটা যেন অন্য কোনো একটা মেজকা.. যাকে আমি চিনি না!


মনে মনে ঠিক করে নিলাম.. আমাকেই কিছু একটা করতে হবে। কিন্তু কী করবো সেটাই তো বুঝতে পারছি না!


'ওঁরা' কখন আসবে.. তার জন্যে ওত পেতে রইলাম!


এলেন 'ওঁরা'.. তিনজন ধুমসোমতো লোক আর দুই মোটা মহিলা। যখন হাজির হলেন তখন প্রায় সন্ধে সাতটা বাজতে চলেছে।


ফণীদা.. মানে মামা লোকগুলোকে "আসুন.. হেঁ হেঁ.. আসুন আসুন.." করে মাঝের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালো।


আমি দেখে চলেছি। তিন বুড়োর একজনের মাথায় আমাদের পাড়ার মাস্টার মশাই ব্যোমকেশ বাবুর মতো টাক.. যেমন বিশাল তেমনি চকচকে। দেখেই হাসি পেয়ে গেছে আমার! টাকলু টাকে দেখে নন্টেদার বলা একটা কথা মনে পড়ে গেলো।


আর অমনি দুম করে বলে বসলুম..

"দাদু.. আপনার নাম কি ব্যোমকেশ?"


একটু আগেই মা আর মেজমা ডিশে করে পাঁচজনের জন্যে সিঙাড়া, রাজভোগ, জলভরা সন্দেশ রেখে গেছে। 'ওঁরা' র দল প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে! আর সেগুলো গপাগ্গপ উড়ে যাচ্ছে বিশাল বিশাল হাঁয়ের মধ্যে!


ওগুলো গেলার আগে পাঁচজনেই এতক্ষণ ঘরের ফাটধরা মেঝে, চৌকাঠ, নোনা ধরা দেয়াল, নতুন পর্দা, ঠাকুরদার পেতলের ফুলদানি.. এমনকি ছাদের কড়ি-বরগা গুলোকেও চোখ দিয়ে গিলছিলো। আর মামা একপাশে ঘাড় কাত করে হাত কচলেই যাচ্ছিলো।


আমার কথাটা শুনে সেই হুমদো টাকলু একটা বিষম খেয়ে সন্দেশ ঠাসা মুখে আমার দিকে হাসি হাসি মুখ করার চেষ্টা করেও শেষমেশ না পেরে বললো.. "ক্কী ক্কয়ে গুঘলে গাগা?"


আমি বললুম..

"কী করে বুঝবো আবার! কেউ বোম মেরে আপনার সব কেশ বুঝি উড়িয়ে দিয়েছিলো?"


লোকটা "অ্যাঁ" বলতে গিয়ে "ঘ্যাঁঘ্" করে বিষম টিষম খেয়ে চিবোনো মিষ্টি ঘরের এদিক ওদিক ছিটিয়ে নোংরা করে দিলো!


কেউ তো ভাবেনি আমি এমন একটা কথা বলে বসবো!


(পর্ব - ৮)


মামার তখন পাগল পাগল অবস্থা!

"অ্যাই ন্যাতা.. ওরে ঝাড়ু".. করতে করতে লাফাতে লেগেছে ! আর মাঝে মাঝেই বলে উঠছে..

"সিইই সিইই! দেহেন দেহি! কী কাইণ্ড!"


বাবা আমায় নড়া ধরে সদর ঘরে টেনে নিয়ে গিয়ে সবে একটা বিরাশি সিক্কা হাঁকাবে বলে হাত তুলেছে!.. আমি চোখ বুজে ফেলেছি!.. ঠিক এই সময়ে কারেন্ট চলে গেলো! মেজকা জানিনা কোথায় কী করছে! কেবল অন্ধকারে মামার চিৎকার টা বদলে গেছে.. "অ্যাই হ্যারিকেন.. ওরে হাতপাখা.. অ্যাই লম্ফ..!"


আমি কিন্তু বেঁচে গিয়েও খেয়াল করেছি আশপাশে ঘোষ বাড়ি, মুখার্জি বাড়ি, কুণ্ডু বাড়িতে কারেন্ট আছে! কারেন্ট তো রোজই যখন তখন যায়.. কিন্তু একসঙ্গে সবকটা বাড়িই অন্ধকার হয়ে যায়! আর আজকের আরো অবাক করা কান্ডটা হলো মিনিট পাঁচেক পরেই কারেন্ট আবার চলেও এলো!


দেখলাম ঘরদোর এর মধ্যে পরিষ্কার হয়েও গেছে। মেজকা এসব কাজে একাই দুশো! 'ওঁদের' এক মহিলার বেশ জোরে জোরে..মানে সবাই যাতে শুনতে পায় সেরকম গজগজানোর আওয়াজ কানে এলো..

"কি বাঁদর ছেলে রে বাবা! ঈশশশ্.. এত্তো গুলো মিষ্টি..!"


মেজকা খুউউউব মিষ্টি করে হেসে বললো..

"একদম ঠিক বলেছেন.. ভারি দুষ্টু! এমন একটা কথা বলে দিলো.. আপনাকেও পূর্বপুরুষের কথা মনে করতে হচ্ছে!"


মেজকা যা বললো সেটা 'ওঁদের' দল তখনো বুঝে উঠতে পারেনি.. মিষ্টির দুঃখে পাগল! কেবল দেখলাম বাবার গম্ভীর মুখেও একটা হালকা হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেলো। রায়দের পুকুরে ব্যাঙবাজি খেলার সময় যেমন ঢেউ গুলো ওঠে.. অনেকটা সেইরকম।


গলা খাঁকারি দিয়ে বাবা বললো..

"এবার তাহলে..!"

মেজকা সঙ্গে সঙ্গে তাল মেলালো..

"হ্যাঁ হ্যাঁ সেই ভালো! এহ্হে.. আপনার আদ্দির পাঞ্জাবিটা! আর মিষ্টি নিয়ে একদম চিন্তা করবেন না! ওগুলো আপনাদের আজ না খাইয়ে ছাড়বোই না!"


আমার কিন্তু বেশ মজা লাগতে শুরু করেছে! সেই সঙ্গে আরেকটা কথা মনে হচ্ছে। ওই পাঁচ মিনিটের কারেন্ট যাওয়াটা কেউ ইচ্ছে করে করেছে! আমায় ঠ্যাঙানির হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে!


এবার কায়দাকে 'আনা হবে' এই ঘরে। আরো কী কী অসভ্যতা হবে কে জানে? আর সেটা ভেবেই বুকের ভেতরে শুরু হয়ে গেছে ঢিপঢিপানি!



বিরক্তিকর লোকগুলোর ব্যাজার মুখের সামনে মা আর মেজমা কায়দাকে নিয়ে এলো। কেউ বসতেও বললো না। কায়দা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে হাত তুলে নমস্কার করলো। সঙ্গে সঙ্গেই দিদাইয়ের আর্তনাদ..

"অরে অ ছেমড়ি! করস কী? পায়ে হাত থুইয়া প্রণাম কর মা!"


"পারুম না.. কোমরে সোট পাইসি।" কায়দার জবাব শুনে লোকগুলো নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বললো..

"আহা.. থাক থাক মা!.. বসে আর কাজ নেই! তা তুমি রান্নাবান্না করতে পারো তো? আচ্ছা বলো তো.. শুক্তোয় কী ফোড়ন দেবে?"


নন্টেদা আমার মুখ চেপ্পে ধরে আছে! আমার গা পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে! কায়দা একটুখানি থেমে.. অনেকটা ইন্দুস্যারের মতো শান্ত অথচ স্পষ্ট গলায় কেটে কেটে বললো..

"আমি যা পারি সেটা হলো গান। আপনাদের শুক্তোর ফোড়ন কী তা জানলেও আমি বলবো না! গান শুনুন..!" বলেই খোলা গলায় গান ধরলো..

"বাধা দিলে বাধবে লড়াই মরতে হবে..

পথ জুড়ে কি করবি বড়াই সরতে হবে..!"


সকলে হতভম্ব! কায়দা এ আবার কী নাটক শুরু করলো!..আর কেন?

আমি এই গানটা আগে কখনো শুনিনি।


আশপাশে তাকিয়ে দেখি বাবা আর মেজকার চোখ জ্বলজ্বল করছে। দিদাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। মামা সুযোগ পেলে আলমারিটার পেছনে লুকিয়ে বাঁচে! মা আর মেজমা গম্ভীর.. কিন্তু লজ্জা পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে না।

শেষবার "বাধা দিলে বাধবে লড়াই মরতে হবে" লাইন টা কায়দা খুব জোর দিয়ে গাইলো। তারপর কাউকে কিছু না বলেই হনহন করে অন্য ঘরে চলে গেলো!


'ওঁদের' দলকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই মেজকা হঠাৎ তার 'পাঞ্জামা'.. মানে 'জামা' র মতো কলার আর বোতাম ওলা 'পাঞ্জাবি'.. নামটা মেজকারই দেওয়া.. সেটার হাতা গুটিয়ে হাত জোড় করে 'অ্যানাউন্স' করার মতো বলে উঠলো..


.. "তাহলে পাত্রীকে আপনারা দেখলেন আর আমরাও পাত্রপক্ষকে! আমাদের পছন্দ হয়েছে কিনা পরে জানিয়ে দেবো! আপনাদের জন্য তিনটে রিকশা দাঁড় করিয়ে রাখা আছে! আর রাজভোগের হাঁড়ি, সন্দেশের বাক্স, গরম সিঙাড়ার চ্যাঙাড়ি সবকিছু আনিয়ে আরেকটা রিকশায় তুলে দেওয়া হয়েছে!"


পাঁচজনের মুখের অবস্থা তখন দেখার মতো! আমার ভেতরটা আনন্দে টগবগ করছে! তাদের একজন মিনমিন করে যেই না বলেছে "বাড়ি ডেকে এনে অপমান".. অমনি মেজকা হাতজোড় করে বললো..


.. "না না সে কী? সে স্পর্ধা যেন জীবনে না হয়!.. তবে ভালো লাগলো এটা জেনে যে 'মান' 'অপমান' এই শব্দ গুলো আপনাদের জানা আছে!.. যাই হোক আর দেরি করবেন না। চারটে রিকশার ভাড়া যদিও মেটানোই আছে.. কিন্তু আর দেরি করলে সিঙাড়াগুলো যে ঠান্ডা হয়ে যাবে!"


মেজকা বেরিয়ে গেলো 'ওঁদের' বিদায় করতে।


ঝড়ের মতো বেরিয়ে যাওয়া মেজকার 'পাঞ্জামা' র ঝটকায় একটা কাঁচের গ্লাস টেবিল থেকে পড়ে 'ঝনঝনন্' করে ভেঙে গেলো!


আর সেই শব্দের সঙ্গে আমার ঘুমটাও গেলো ভেঙে!


দেখি ট্রেনটাও গেছে থেমে!.. সেই সঙ্গে থমকে গেছে আয়নার মধ্যে চলতে থাকা ছবিগুলোও!



(চলবে)




নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮