• ধীমান চক্রবর্তী

ধারাবাহিক - একলা পথে



আগেকার পর্ব পড়ার প্রয়োজন হলে নীড়বাসনা'র আগেকার সংখ্যা দেখুন







(পর্ব - ৯)



আমি এবার চোখের পাতা বন্ধ করে দিয়ে ভাবছি.. এতোক্ষণ ধরে যা যা দেখলাম তা যেন এই কদিন আগেই ঘটে গেছে! এখনও কি তরতাজা ঝরঝরে ছবিগুলো! এমনকি প্রতিটা মুহূর্ত.. নানা জনের বলা নানান কথা.. এমনকি সেসময়ে তাদের মুখের অভিব্যক্তিগুলোও কি আশ্চর্য রকমের স্পষ্ট!


মনের ভেতরে যে আরশিনগর.. সেখানে রাজ্যপাট পেতে সিংহাসনে বসে আছে কে? পড়শি তো প্রতিবেশী.. চারপাশে তাদের বাসা। কিন্তু মনের আয়না জুড়ে যে বসে আছে রাজার মতো.. সে তো আমারই খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসা আমি নিজে!


আমার ফেলে আসা কাঁচা বয়েস তার সব রূপ রস বর্ণ গন্ধ আর অনুভূতির পঞ্চপ্রদীপ জ্বেলে জীবনের ভাঙা দেউলে নিরন্তর আরতি করে চলেছে যে অনাবিল শৈশব কৈশোরের অবিস্মরণীয় অথচ অবধারিত ভুলভ্রান্তির.. তার সবই কি ভুল ছিলো? নাকি এই মাঝদরিয়ায় জীবনের হালভাঙা পালছেঁড়া নৌকোর সওয়ার হয়ে বেঁচে নয়.. যেমন করেই হোক টিকে থাকার আর টিকিয়ে রাখার চেষ্টাটাই একমাত্র ঠিক?


কোথায় আছে উত্তর? মেজকা সব জবাব তো দেয় না.. ওই ধরি মাছ না ছুঁই পানির মতো ভাসিয়ে দেয়। পথ চলতে চলতে কবে যে দেখা পাবো তাঁর.. যিনি স্মিত হেসে বলবেন.. "বালক! পথ তো এখনো শেষ হয় নাই!.. চরৈবেতি..!"


ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করেই আমার হাসি পেয়ে গেলো। সত্যি.. কি ডেঁপোই না ছিলাম আমি ছোটোবেলায়! একটু বেশি বয়সেই স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু তার আগে বাড়িতে বাবা আর মেজকার পাল্লায় পড়ে বইপত্তর নিয়ে নিত্যদিনের রগড়ানি খেতে খেতেই আমার দিন কেটেছিলো। আর সেই সঙ্গে ছিলো গান। হঠাৎ নিজের থেকেই যেন একটা গান বেরিয়ে এলো গলায়..

"পাগলা মনটারে তুই বাঁধ!"


গানটা গুনগুন করতে করতে খেয়াল হলো.. ট্রেনটা তো অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে একই স্টেশনে! মুখ বাড়িয়ে দেখলাম এ স্টেশনও ভারি অদ্ভুত সুন্দর এক নামের.. 'বিরামডাঙা!'


আমি কিন্তু বেশ বুঝতে পারছি.. ট্রেন চলতে শুরু করলেই আয়নাতে আবার ভেসে উঠবে আমার ছেলেবেলার চলন্ত ছবি! আমি আবার ভেতরের সেই পড়শির সঙ্গে গপ্পো জুড়ে দেবো! আর চলে ফিরে জ্যান্ত হয়ে চোখের সামনে খেলে বেড়াবে ফেলে আসা শৈশব আর কৈশোর জড়ানো পুরোনো সময়!


আমি দম বন্ধ করে ট্রেনটা আবার কখন চলতে শুরু করবে সেই আশায় একদৃষ্টে আয়নাতে চোখ রেখে বসে আছি! মেজকা 'ওঁদের' এগিয়ে দিতে গেছে। আর আমি অপেক্ষা করছি মেজকার ফিরে আসার জন্য!



ট্রেনটা একটুখানি যেন দুলে উঠলো! সেই দুলুনির সঙ্গে দুলে উঠলো আমার মনটাও। আবার ছবিগুলো চলতে আরম্ভ করবে! কিন্তু না.. একবার মাত্র ঝাঁকুনি দিয়েও দাঁড়িয়েই রয়েছে 'বিরামডাঙা' স্টেশনে!


আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম বেশ অন্ধকার। প্ল্যাটফর্মে একটা ছোট্ট কেবিন। বোধহয় স্টেশনমাস্টারের ঘর। টিমটিম করে দুটো কি তিনটে আলো জ্বলছে। তাতেই দেখতে পেলাম গোটা দুই কাঠের তৈরি বেঞ্চি.. কিন্তু তাতে কোনো প্যাসেঞ্জারকে বসে থাকতে দেখলাম না। কেবল একটার নিচে কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে আছে একটা নেড়ি কুকুর। নভেম্বরের সন্ধে হালকা পায়ে কুয়াশার চাদর গায়ে দিয়ে নেমে এসেছে স্টেশনে। মনে হলো বহু বছর আগে ঠাকুরদা সতীশচন্দ্র এমনই কোনো জায়গায় হয়তো স্টেশনমাস্টারি করতেন!


যেটা খুব ইচ্ছে করছিলো.. শেষে সেটাই করে ফেললাম।

নেমেই পড়লাম প্ল্যাটফর্মে। একটা ছাতিমগাছের তলায় গোল করে বাঁধানো বসার জায়গা। ছাতিমফুলের ঝিম ধরানো মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে.. কোনো জনমনিষ্যি নেই।


আমি বসলাম ছাতিমতলায়। শীতের সন্ধে হঠাৎ করেই যেন রাত হয়ে ওঠে। বিশ্ব চরাচরে আর কেউ নেই.. কেবলমাত্র আমি আর ছাতিমফুলের নেশাধরানো মিষ্টি গন্ধ!


কতক্ষণ এভাবে বসেছিলাম জানি না.. চমক ভাঙলো ট্রেনের 'ভোঁ' শুনে! দৌড়ে গিয়ে উঠলাম সেই কামরায়।


আয়নাটা আছে তো? এদিক ওদিক খুঁজে বের করলাম সেটাকে দুটো সিটের মাঝখান থেকে। আর চোখ রাখলাম আয়নাতে। একটা হালকা দোলা দিয়ে চলতে শুরু করলো সেই অদ্ভুত রেলগাড়ি।.. আর তার সাথে আমার চলন্ত ছোটোবেলা !


মেজকা সেই যে ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেছে.. এখনো ফেরেনি। চিন্তা হলেও এটা বুঝতে পারছি মাঝখানে আর কিছু ঘটে নি। মেজকার কড়া নাড়ার চেনা শব্দ পেয়ে একটু যেন নিশ্চিন্ত হয়েই চোখ রাখলাম সেই যাদু আয়নাতে।


তখন কি আর জানতাম আরো কতোবড়ো ঝড় অপেক্ষা করে আছে!



(পর্ব - ১০)



বাড়ির মধ্যে তখন বাবার ভাষায় 'পিনড্রপ সাইলেন্স!' মামা কিছু বলতে না পারলেও রাগে গরগর করছে। কিন্তু আমি জানি ওই পর্যন্তই মামার দৌড়!


মেজকা রিকশাগুলোকে গলি পার করিয়ে বাড়ি ঢুকতেই দিদাই আচমকা জোরে কেঁদে ওঠার মতো করে বললো..

"দাশু.. এ তুমি কী করলা! মাইয়াডার ত আর বিয়াই হইবো না! সিরডা কাল এহানে এই ভাড়ার বাড়িতেই কাটাইতে হইবো!"


মামা পাশ থেকে এমনভাবে ফোড়ন কাটলো.. যাতে পরিষ্কার করে না হলেও কথাটা কান অবধি পৌঁছে যায়..

"বাড়িওয়ালায় যেমনডা সায়েন! ওনাগো ইস্যা.. ওনাগোই মর্জি ! আমাগো কিসুই করনের নাই!"


বাবা কিছু একটা বলে উঠতে যাবে.. ঠিক এই সময়েই সকলকে অবাক করে মেজকা চেঁচিয়ে উঠলো! অনেকটা গর্জনের মতো শোনালো..

"হ্যাঁ হ্যাঁ! ইচ্ছে, মর্জি, ভাড়ার বাড়ি.. সে তো বলবেনই! আজকে বুঝলাম বাড়িওলা ছাড়া আপনারা আমাদের অন্যকিছু ভাবতেই পারেন নি কোনোদিন!"


আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না.. মেজকা এসব কী বলছে? তাও আবার দিদাইয়ের সঙ্গে!

দিদাই যখন কথায় কথায় বলে ফেলতো..

"বরিশালে আমাগো ষাইট বিঘা শালি জমি আসিলো.. তার লগে দালান কোঠা আর দুইশোর মতো নাইরকেল গাস.. " মেজকা কেবল মুচকি হেসে নিচু গলায় বলতো..

"ওই আপনাগোদের মতোই আমাদেরও ছিলো বেশি নয়.. লাখ দুয়েক আমবাগান!"

কিন্তু ব্যাস.. ওইটুকুই! মেজকা এর বেশি কোনো কথাই বলতো না দিদাইকে। দিদাইয়ের মুখে মুখে কথা বলেও নি কোনোদিন। কিন্তু আজ এ কী! কী হয়েছে মেজকার?


আমি ভয়ে এককোণে জড়োসড়ো হয়ে পর্দা খামচে দাঁড়িয়ে.. মেজকার এই চেহারা আগে দেখিনি তো!


কারোর মুখেই কোনো কথা নেই.. সবাই যেন আরেকটা ঝড়ের অপেক্ষায় রয়েছে!

সে ঝড়ের নাম মেজকা.. শ্রী দাশরথি চক্রবর্তী!


এবার বাবা মুখ খুলতে বাধ্য হলো..

"আঃ দাশু.. কী হচ্ছেটা কী? কন্ট্রোল!"


"আজ আমায় থামাস না বড়দা প্লিজ! বলতে দে! বাধা দিলে বাধবে লড়াই!"

আরো ঝাঁঝালো মেজকার আওয়াজ ..!


বাবা হাল ছেড়ে দেওয়া মুখে মায়ের দিকে একবার তাকালো। মায়ের চোখ ছলছল করছে! মেজমা অন্য দিকে ফিরে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে!


মা একবার খুব নরম গলায় বলার চেষ্টা করলো..

"মেজদা.. আপনি যা বলছেন সেটা বুঝি। কিন্তু সত্যিই তো এটা আমাদের বাপের বাড়ি নয়!"

পাশ থেকে মামা বিড়বিড় করে উঠলো.. "একদিনের লাইগ্যাও এ আমাগো বাপের বাড়ি আসিলো কি?"


এইবার মেজকা যেন ফেটে পড়লো!

"কে বলেছে নয়? আলবাৎ এ তোমাদের বাপের বাড়ি!"

মেজকার ফর্সা কপালে ঘাম। পেছন করে পেতে আঁচড়ানো চুল বেয়ে গড়িয়ে আসা ঘামে হাফহাতা সাদা 'পাঞ্জামা'র গলা বুক সব ভিজে একাকার! নাকের দুপাশ ফুলে উঠেছে.. সেইসঙ্গে কানের পাশের শিরাগুলোও!


"দীনেশ ব্যানার্জি না থাকলে এ বাড়ি তো সেই রায়টের সময়েই হাতছাড়া হতো আমাদের বাবার! তখন আমরা কতোটুকু? তোমাদের বাপ এ ভিটে আগলে না রাখলে আমাদের বাপের ক্ষমতা ছিলো না একে রক্ষা করার! এ আমাদের পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা বাবার বাড়ি! তোমাদের লড়ে পাওয়া দু আনার দাম তোমরা বোঝো কি না বোঝো.. সে আমি জানি না! আর জানতে চাইও না! তবে এটা জেনে রাখো.. 'বাপের বাড়ি' ই যদি হয় তবে আমাদের চেয়ে তোমাদের দাবি অনেক বেশি!"


একনিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে মেজকা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো ঝড়ের মতো!


ঝড়ের পর বৃষ্টি নামার মতো বাবার গলা ভেসে এলো..

"ফণী! জব্বর বলেছো! মর্জিই বটে! তবে সে তোমার মর্জি.. যেভাবে হোক ছোটোবোনকে ঘাড় থেকে নামানো! কিন্তু নিজের বোনের ইচ্ছে, মর্জি, মর্যাদা.. এসবের তো কোনো দামই নেই তোমার কাছে.. তাই না! ওই সেজেগুজে মিষ্টি গিলতে আসা লোহাপার্টির কাছে ঘাড় কাত করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাত কচলাতে ভালো লাগে তোমার! আমার তো ধারণা ছিলো বাঙাল.. স্যরি.. পূর্ববঙ্গীয়দের আত্মসম্মান বোধ খুব হাই নোটে বাঁধা থাকে! এখন তো দেখছি ভুল ভাবতাম!"


মামার মুখে কোনো কথা নেই.. তবে আমি বুঝতে পারছি বাবার বলা কথাগুলো মোটেও পছন্দ হয় নি। মা এবার কেঁদে ফেলেছে.. মেজমা অন্য ঘরে নিয়ে গেলো। দিদাই কাঁপা কাঁপা গলায় বাবাকে বললো..

"মোহন..! তুমি আমার জামাই হইলেও তোমারে আমি প্যাটের সেলের থিগ্যা কিসু কম ভাবি নাই! তুমি ইন্টারমিডিয়েট দ্যাওনের আগে যহন এই বাড়িতে আইসিলা.. আমি তোমারে আউগলাইয়া আউগলাইয়া রাখসি! আইজ আমি তোমার হাত দুইডা ধরসি! কায়ার বিয়া লইয়া তুমি যা ভালো বুঝবা তাই করবা!"


এরপর বাবা খুব কেটে কেটে বললো..

"আজ থেকে এ বাড়িতে 'দেখতে আসার' নোংরামি বন্ধ! কায়ার যদি বিয়ে হয় এমনিই হবে!.. আর যখন হবার তখনই হবে!"


আমার মাথাটা কেমন যেন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে.. কী করবো কিচ্ছু বুঝতে পারছি না! এদিকে খুব খিদেও পাচ্ছে। কিন্তু সাহস করে বলতে পারছি না।



মেজকার এই রূপ আগে কখনো দেখিনি। আর মেজকা যে কথাগুলো বললো সেগুলো তো আমার কাছে এক্কেবারে নতুন! মেজকা গেলোই বা কোথায়?


আরও অনেক কিছু জানতে হবে।

কারেন্ট কি নিজে নিজেই চলে গিয়েছিলো.. নাকি আমায় পিটুনির থেকে বাঁচাতে মেজকাই একটা কিছু করেছিলো!

ইন্দু স্যারই বা মেজকা কে চিনলেন কী করে?

ইস্কুলে বাথরুমের দেয়ালে পেনসিলে লেখা ওই অদ্ভুত কথাটার মানেই বা কী?

সবচাইতে বড়ো ব্যাপার মেজকা একটু আগেই যে কথাগুলো বলেছে.. ওই 'বাপের বাড়ি', 'বাড়িওলা.. তার মানেই বা কী?


শুধু একটা জিনিস ভালো লাগছিলো ভেবে.. অন্য কোনো' 'ওঁরা'র দল আর হয়তো কায়দাকে 'দেখতে' আসার অসভ্যতা টা করবে না!


অনেক রাত হয়ে গেলো। মেজকা এখনও ফেরেনি। মামা দেখলাম বেমালুম খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়লো! দিদাই আজ নারকোল চিংড়ি দিয়ে বিউলির ডাল করেছে.. মেজকা যাকে বলে 'ওপার ইস্পেশাল।' শুধু মেজকার ই নয়.. আমাদের সবারই দারুণ পছন্দের। কিন্তু মেজকা না ফেরায় সেসব কারোর মাথায়ই নেই।


মা আর মেজমা কায়দার সঙ্গে সদর ঘরে নিচু গলায় কথা বলছে। কায়দার একটু জোরে বলা একটা কথা কেবল কানে এলো..

"আমার জীবন। সেটা কি দাদার কথায় চলবে? মেজদা যা করেছে ঠিক করেছে!"


বাবা আমাদের শোবার ঘরে খাটের ওপর ডাঁই করে রাখা অঙ্কের বই আর স্কুলের পরীক্ষার খাতার দড়িবাঁধা বাণ্ডিলটা পাশের টেবিলে সরিয়ে রেখে সেতার নিয়ে বসেছে। আমি নারকোল তেলে ভেজানো তুলো এনে রেখে দিয়েছি বাবার মেজরাবের কৌটোর ওপরে। বাবা বাঁ হাতের আঙুলগুলোয় ওই তেল লাগায় সেতার বাজানোর সময়। আমি একটা মেজরাব আংটির মতো করে পরেছি আমার বুড়ো আঙুলে। বাবার আঙুল তো মোটা। ওই মাপের মেজরাব আমার তো বড়ো হবেই!


ঠাকুরের থালার নকুলদানার মতো সুর ছড়িয়ে পড়ছে মেঝেতে। সেখান থেকে ধূপের গন্ধের মতো সুর ছড়িয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে বাড়ির কোণে কোণে!


আমি দেখেছি কোনো বড়োসড়ো ঘটনা হলেই বাবা সেতার নিয়ে বসে পড়ে। বলে 'মিউজিক থেরাপি'র চেয়ে ভালো চিকিৎসা নাকি হয় না! এই থমথমে দম বন্ধ করা অবস্থাটা কোনো রোগ কিনা জানি না। তবে বুঝতে পারছি.. একটু একটু করে বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে!


মেজকাটা যদি শুনতো.. হয়তো একটু আরাম পেতো!



(পর্ব - ১১)



দিদাই একবার ঘরে ঢুকে বাবাকে বললো..

"রাইত বাড়সে.. খাইয়া লও না। দাশুডা যে গেলো কোহানে?"


দিদাইয়ের এরকম বাংলা 'জ' আর 'য' কে ইংরেজির 'z' দিয়ে বলাটা আমার খুব মজার লাগে! কিন্তু এখন মজা লাগছে না!


বাবা সেতার থামিয়ে মেজরাবটা আঙুল থেকে খুলতে খুলতে বললো..

"আসবে আসবে! ওর ফেরার টাইম তো জানেনই ! সাধে কি বলি পাগলা দাশু! আপনি বরং গজা আর নন্টেকে খেয়ে নিতে বলুন। ওরা তো ভোরে বেরোবে। হজমের মিনিমাম সময়টা দেওয়া দরকার।"


দিদাই চলে গেলো রান্নাঘরের দিকে। এদিকে আমার খুব খিদে পেয়েছে!

আর থাকতে না পেরে চেঁচিয়ে বললাম..

"মামা, গজাদা আর নন্টেদা ছাড়া বাকিদের কি আজ উপোস?"

অন্যদিন আমিই খাই সবার আগে। আজ যেন সবাই ভুলেই গেছে!


শেষে মেজমা আর কায়দা আমায় নিয়ে গিয়ে খেতে দিলো। তখন সাড়ে দশটা বাজতে চলেছে। আমি খেতে খেতে কায়দাকে বললাম..

"তুমি ঠিক করেছো। কিন্তু ওই লড়াইয়ের গানটা কোথা থেকে শিখলে গো? আমায় শেখাবে?"


কায়দার চোখে যেন বিদ্যুতের ঝিলিক খেলে গেলো। কিন্তু গলাটা গম্ভীর করে বললো..

"মেজদা একটা রেকর্ড এনেছিলো অনেকদিন আগে। জর্জদার গাওয়া। তাতে ছিলো।"


আমার আবার অবাক হবার পালা। এ তো দেখছি অচেনা দাদার ছড়াছড়ি! ফেলুদার পরে জর্জদা! এটা আবার সাহেব দাদা.. জর্জ!

আমি খেতে খেতেই জিজ্ঞেস করলাম..

"ওই জর্জদাও তোমার সঙ্গে গান শিখতো বুঝি?"


এবার কায়দা আর গম্ভীর থাকতে পারলো না। হেসে বললো..

"সে সুযোগ যদি পেতাম রে..!"


"মেজকা তাহলে ওই সাহেবের গাওয়া বাংলা গান পেলো কোথায়?"


"সে তোর মেজকাকেই জিজ্ঞেস করিস।" মিষ্টি হেসে বললো মেজমা।


আমি শুধু এটুকুই বুঝলাম.. ওই জর্জ সাহেব বাংলায় গান গাইতে পারে বলেই এ বাড়ির লোকে তাকে বেশ ভক্তিটক্তি করে। তাই বলে এত্তো ভক্তি! ওই পথের দেবতার মতো কেউ একটা হবে হয়তো! মনে মনে ভাবতে চেষ্টা করলাম তার চেহারা। সাহেব যখন নিশ্চয়ই খুব ফর্সা হবে। আর নীল চোখ। মাথায় সোনালী রঙের চুল। কোটপ্যান্ট আর টাইও পরে নিশ্চয়ই। কিন্তু সে বাংলা শিখলোই বা কীভাবে.. আর গানটাই বা কেমন গায়? এটা জানতে গেলেও ভরসা সেই মেজকা।


কিন্তু মেজকা কোথায়? রাত্তির তো বেড়েই চলেছে! অন্য কোনো দিন হলে এতক্ষণে তো ঘুমিয়েই পড়তাম। আজ কিছুতেই ঘুম আসছে না। বাবা আবার সেতার নিয়ে বসে গেছে। এবারের সুরটা অন্যরকম.. কেমন যেন মনে হচ্ছে এই বুঝি সূর্য উঠবে! চোখ বন্ধ করে শুনতে শুনতে মনের ভেতর দেখতে পাচ্ছি.. আস্তে আস্তে আলো ফুটে উঠছে! রায়দের বাগানে পাখিগুলো কিচিরমিচির শুরু করলো বলে!


"ইয়েব্বাৎ! কেয়াব্বাৎ! মাঝরাতে আহিরভৈরোঁ ! মোহনদা তুমি পারোও বটে!"

.. একটা কম চেনা গলা শুনে চমকে উঠলাম!



আচমকা এমন একটা কথা শুনে চমকে যাবারই কথা। দেখি অ্যাটমকাকা! একগাল হাসি নিয়ে বাবাকে সেলাম করার মতো একবার হাত তুললো।

আর তার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে মেজকা! মুখে মিটিমিটি হাসি.. যেন কিছুই হয়নি!

বললো..

"সিংহেন্দ্রমধ্যম শুনলেই কি সবার গা ছমছম করে নাকি? তুইও এমন আনাড়ির মতো একেকটা কথা বলিস না অ্যাটম!"

বলে একটা 'কেমন দিলাম' মার্কা হাসি হাসলো আমার দিকে চেয়ে।


বাবার বাজনা থেমেছে। একটু রেগে যাওয়ার মতো মুখ করার খুব চেষ্টা করে.. শেষে না পেরে হেসে ফেললো।

"তা অ্যাটম.. এই রেয়ার আর্থ এলিমেন্টটিকে কোত্থেকে পাকড়ে আনলি বাবা? একটু আগে তো বাড়িতেই অ্যাটম বোম চার্জ করে হাওয়া হয়ে গেলো!"


পুরু চশমার ভেতরে ঝকঝক করে উঠলো অ্যাটমকাকার চোখ। হাসতে হাসতে বললো..

"রেয়ার আর্থ ই বটে! হঠাৎ উদয় হয়ে আমায় বাড়ি থেকে বের করে টানতে টানতে নিয়ে গেলো আমার কারখানায়! সেখানে ঝাড়া একঘন্টা ওস্তাদকে বেহালা শোনাতে হলো! শুধু শোনালেই কি নিস্তার আছে? সে এক অদ্ভূত অত্যাচার! এমনকি খাম্বাজের সঙ্গে 'কুছ তো লোগ কহেঙ্গে'.. 'ও ললিতা' কিম্বা পূর্বীর সাথে মিলিয়ে 'অশ্রুনদীর সুদূর পারে' অবধি বাজাতে হয়েছে না খেয়েদেয়ে!"


রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট কী জিনিস সেটা না জানলেও এটা বুঝেছি কথাটা বলা হয়েছে মেজকাকে নিয়েই। বিকেল থেকে যা সব ঘটছে.. যা যা দেখছি আর শুনছি.. আমার মাথা আর কাজ করছে না!

"তোমার কারখানায় বেহালাও আছে নাকি?" আমি আর থাকতে না পেরে বলে ফেললাম।


আমার দিকে তাকিয়ে ভুরু তুলে ভীষণ অবাক হওয়ার মতো মুখ করে অ্যাটমকাকা বললো..

"আরে.. হ্যারিসন যে! এখনো ঘুমোসনি?"


এবার আমার মুখে হাসি ফুটলো।

'হ্যারিসন' নামে ওই একজনই আমায় ডাকে! আমি হাসলাম ওই নামের মানেটা মনে পড়ে যাওয়ায়!



অ্যাটমকাকা আমায় 'হ্যারিসন' বলেই ডাকে। বাবার নাম হরিমোহন। 'হরি' কে ইংরেজিতে ছোট্ট করে 'হ্যারি।' আর আমি হ্যারির ছেলে 'হ্যারিসন!'

বেশ মজার লোক। সবসময়ই মুখে হাসি। মেজকার সঙ্গে দারুণ ভাব। বাবার কাছে শুনেছি অ্যাটমকাকা নাকি লেখাপড়ায় দারুণ ভালো ছিলো। শিবপুরের কী একটা কলেজ থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেও নাকি চাকরি করেনি! নিজেই একটা আস্ত কারখানা বানিয়ে ফেলেছে! বাবা বলে 'সেল্ফলেস সেল্ফমেড'.. যদিও মানে জানি না কথাটার।


আমার দিকে ফিরে বলে উঠলো অ্যাটমকাকা..

"শুধু বেহালা কেন? আমার কারখানায় যা চাইবি সব পাবি। একটা বড়ো হলঘর আছে কারখানার ভেতর.. সেটা হলো মিউজিক রুম কাম লাইব্রেরি। সেখানে দশ পনেরো জন একসাথে গানবাজনা করতে পারে। বেহালা, তবলা, পাখোয়াজ, হারমোনিয়াম তো আছেই। আরো অনেক মজার মজার বাজনা আছে। তোর এই পাগলা দাশু মেজকা তো প্রায় রোজই হামলা করে। অনেক গানের মহড়াও হয়। এমনকি যুদ্ধের মহড়াও..!"


আমার বেশ অবাক লাগছিলো! কারখানায় লাইব্রেরি, গানের ঘর, গানের মহড়া বুঝলাম.. কিন্তু যুদ্ধের মহড়া? কী সব যে বলে না অ্যাটমকাকা!


আমি সেটাই জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছি.. ঠিক এই সময় দিদাই এসে বেশ কড়া গলায় বললো..

"তোমাগো মতলবডা খুইল্যা কও দেহি! সারাডা রাইত কি হাওয়া খাওনের তাল করো?"


মেজকা একদম বাধ্য ছেলের মতো বললো..

"হ্যাঁ হ্যাঁ! এবারে সত্যিসত্যিই খেয়ে নেওয়া উচিত! আর অ্যাটম তুইও দুটি খেয়ে যা!"


অ্যাটমকাকা একগাল হেসে বলল..

"আমাদের জীবন তো 'ভোজনং যত্রতত্র, শয়নং হট্টমন্দিরে।' আমায় যতোবার বলবেন ততোবার খেতে পারি।"


অ্যাটমকাকার এই মন্ত্রের মতো কথাটার মানে কী সেটা না জানলেও কথাটা বেশ পছন্দ হয়ে গেলো




(পর্ব - ১২)



সবাই খেতে বসলো। দিদাই রাত্তিরে খই আর দুধ খায়। মেজকা মেজমাকে বললো..

"তোমরাও একসঙ্গে বসে যাও না। হাতে হাতে সবাই ইন্ট্রাপংক্তি ডিস্ট্রিবিউশন করে নিলেই তো হয়!"


মেজকা মাঝে মাঝে কি ভয়ংকর কঠিন কঠিন কথা বলে.. মাথা মুন্ডু কিচ্ছু বোঝা যায় না! আজকে তো মেজকা একদম জ্যান্ত ধাঁধা হয়ে বসে আছে! কখন যে কী করছে, কাকে কী বলছে.. বাবারাই বুঝে উঠতে পারছে না! আর আমার কথা তো বাদই দিলাম!


অ্যাটমকাকা বললো..

"দাশু! প্রস্তাবটা শুনতে ভালো হলেও ইমপ্র্যাক্টিকাল! এইটুকু জায়গায় এতোজন একসাথে বসতে পারবে না। নিজেরটা তাড়াতাড়ি শেষ করে অন্যদের বসার সুযোগ করে দেওয়াটা অনেক সহজ হবে।"


"মোর ডেমোক্রেটিক! ইয়েস.. আই এগ্রি মিলর্ড!" বলেই মেজকা প্রায় হামলে পড়লো কাঁসার থালার ওপরে!


"কৈ? কোথায় আমার ওপার ইস্পেশাল?"

হাঁক পাড়লো মেজকা। পাশে বসে থাকা বাবা একটু যেন বিরক্ত হয়েই বললো..

"এই রাতবিরেতে হাল্লারাজার রণহুঙ্কার ছেড়ে কোনো লাভ আছে কি?"


মেজকার মুখে যেন উত্তর তৈরি করা ছিলো আগে থেকেই। বাবার দিকে একটা অদ্ভুত মুখ করে খ্যাঁকখ্যাঁকে গলায় বললো..

"ফিসফিস করছো কেন? কানে বাতাস লাগে জানো না? যা বলবে উচ্চৈস্বরে বলবে! আমি হাল্লারাজা? আর রাত দুটো আড়াইটে পর্যন্ত যখন সেতার সরোদ তবলা পাখোয়াজ নিয়ে এই বাড়িতেই 'ডেরেড্যাঁও কেড়ে ন্যাও, মেরেকেটে দে না ঘেঁটে, তেরেনানা ছেড়ে দেনা' রবে পাগলবন্দি চালিয়েছো.. তার বেলা! তোমাদের জন্য এই বাড়ির নামই হয়ে গেলো 'গানবাড়ি'! আর আমি একটু গলা ছাড়লেই সেটা হুঙ্কার? যতো দোষ, দাশু ঘোষ !"


বাবার গলাও চড়লো..

"অ! তা বেরাদর! ওই 'মেরেকেটে দে রে ঘেঁটে' বোল কে তুলতো তবলায়? তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ..!"


মেজকা হঠাৎ একদম অন্যরকম গলায় বলে উঠলো..

"আমিই সে পাপিষ্ঠ হে রাজন! কৃপা করো বেরাদরে, হাহাকার এ উদরে ছুঁচো ডন!"


মেজকার কথায় সবাই মিলে হেসে উঠলো! আমিও। কেবল মনের মধ্যে আরো কয়েকটা প্রশ্ন বেড়ে গেলো।


ফিসফিস করে কথা বলতে অসুবিধে কোথায়.. আর তাতে কার কানে বাতাস লাগে? সেটা মেজকা অমন আজব গলা করেই বা বললো কেন? কারোর গলা নকল করলো কি? হাল্লারাজা কে? রাত পর্যন্ত পাগলবন্দি ব্যাপারটাই বা কী জিনিস? নাহ্! মেজকাকে ছাড়া যাবে না। একের পর এক আজগুবি কথা.. না পারছি বুঝতে.. না পারছি ভুলতে!


এদিকে সবাই চেটেপুটে খাচ্ছে। মেজকা একবার বললো..

"গালকা ক্যায়োন এঁগেকে গল অ্যাঁকং!"

উত্তর দিলো অ্যাটমকাকা। পাত থেকে মুখ না তুলেই।..

"অঁকুঁজ্ঞ! অঁকাঁঘাঙং!"


আমি দেখছি আর হেসেই চলেছি। বাকিরাও।


খেতে খেতেও নিচু গলায় নিজেদের মধ্যে টুকটাক কথা চলছে সবার। এবার আমি বলে উঠলাম..

"ফিসফিস করছো কেন? কানে বাতাস লাগে জানো না?"


অ্যাটমকাকা হো হো করে হেসে উঠলো..

"ব্র্যাভো হ্যারিসন ব্র্যাভো! তোকে কালটিভেট করতে হবে রে ব্যাটা!"


মা মশারি টাঙাতে টাঙাতে বললো..

"অতো আশকারা দিও না গো অ্যাটমদা! বাঁদরামো আরো বাড়বে! ইদানিং খুব মুখে মুখে চোপা করতে শুরু করেছে!"


অ্যাটমকাকা সেই একই রকম হাসিমুখে বললো..

"আশকারা দেওয়া যেতেই পারে.. তবে সেটা পদার্থের গুণাগুণ বুঝে।"


সঙ্গে সঙ্গেই মেজকা বলে উঠলো..

"আর অপদার্থে হলে ফাইনালি একটি মশকরা হয়ে উঠবে। তবে বুঝলি অ্যাটম.. এ মক্কেল বেগুন নয়! ঠিক ছাঁচে ফেললে মন্দ হবে না।"


আমার এবার ভয়ানক রাগ হয়ে গেলো। বলে দিলাম..

"বেগুন বাঁদর যাই বলো.. এতো ধাঁধা করে বলার কী আছে? ছাঁচফাঁচ বুঝি না। শুধু এটা জানি দিদাই বলেছে সন্ধের পরে ছাঁচতলায় দাঁড়িয়ে হিসি করতে নেই!"


সকলের খাওয়া শেষ হয়ে গেছে। মেজকা আবার একটা বিটকেল মতো হাসি দিলো আমার দিকে তাকিয়ে। কিন্তু অ্যাটমকাকা আমার চুলটা একটু ঘেঁটে দিয়ে বললো..

"তাহলে কালকে হ্যারিসনকেও নিয়ে আয় দাশু। আশা করি শ্রীহ্যারি তাতে আপত্তি করবেন না!"

এই বলে অ্যাটমকাকা চলে গেলো।


কাল আবার কোথায় যেতে হবে রে বাবা? এটা জানার জন্য মেজকার ঘরে একবার ঢুঁ মারলাম। কলতলার পাশে ছোটো একটা টালির চালের ঘর। ছোট্টো একটা টেবিল। দেয়াল ঘেঁষা একটা তক্তপোশ আর দেয়াল জোড়া তাকে ঠাসাঠাসি বই। তক্তপোশের নিচে একটা টিনের ট্রাঙ্ক.. সবসময় তালাবন্ধ।


কারেন্ট চলে গেছে। হ্যারিকেনের আলোয় মেজকা একটা বই পড়ছিলো। মেজমা তখন ঘরে নেই। আমায় দেখে বিরাট একটা হাই তুলে বললো..

"জানি বৎস.. তুমি তেত্রিশ কোটি প্রশ্ন নিয়ে এসেছো। তবে আজ নয়.. সব কথা কালকে হবে। আজ একটা জমিয়ে ঘুম দিতে হবে। তুইও শুয়ে পড়গে যা।"


এই বলে বইটার যে পাতাটা পড়ছিলো তার ফাঁকে একটা পায়রার পালক গুঁজে বইটা মুড়ে রেখে দিলো।


বইটা বাংলায় লেখা। আর বইটার নাম 'ইস্পাত।'


গুটিগুটি পায়ে আমাদের ঘরে ঢুকলাম। ঘুমোতে হবে। দালানে একটা বিরাট ঘড়ি আছে। পেন্ডুলাম দোলা ঘড়ি। মামা রোজ দম দেয়। ঘড়িটা তিনবার গম্ভীর গলায় যেন বকুনি দিলো..

কী হলো? এখনও ঘুমোসনি কেন?


আমি বাবা মায়ের সঙ্গেই শুই.. কিন্তু খাটের ধারে ফাঁকা দিকটায়। বারবার হিসি করার জন্য উঠতে হয় তো।


বাবা চিৎ হয়ে বুকের ওপর দুহাত জড়ো করে ঘুমোচ্ছে। মাও দেখলাম ঘুমিয়ে পড়েছে! অন্যদিন এমন হয় না। আমি না ঘুমোলে মায়ের ঘুম আসে না। কিন্তু আজকে আর জেগে থাকতে পারে নি।


আজ সবই যেন উল্টো হয়ে যাচ্ছে! রাত্তির দশটা বাজলেই আমার চোখ জ্বালা করে। কিন্তু আজ তিনটে বেজে গেলেও আমার ঘুম আসছে না কিছুতেই। গুটিসুটি মেরে পড়ে আছি।


বাবা ঘুমের মধ্যেই লেপটা আরেকটু টেনে নিলো বুকের ওপর। আমি একটা ছোটো চাদর মুড়ি দিয়ে জেগে জেগে ভাবছি আমার দাদু আর ঠাকুরদার কথা। এই দুজনের কাউকেই আমি নিজে দেখিনি। কিন্তু আজ মেজকার কথা শোনার পর থেকেই মনে হচ্ছে এরা হয়তো পায়চারি করছে এই বাড়িতেই.. ঘর থেকে ঘরে! দেখছে তাদের ছেলেমেয়েরা কেমন আছে, কী করছে!


ভেবেই আমার বেশ ভয় ভয় পেতে শুরু করেছে.. গরম লাগছে! কিছুতেই মশারির মধ্যে শুয়ে থাকতে পারছি না.. দম আটকে আসছে! অনেকক্ষণ এপাশ ওপাশ করেও কিচ্ছু হলো না।

আর থাকতে পারলাম না ঘরের মধ্যে। পা টিপে টিপে বেরিয়ে এলাম উঠোনের লাগোয়া দালানে। ঘড়িটা এবারে একবার বেজে উঠলো। মানে সাড়ে তিনটে।


উঠোন থৈ থৈ করছে চাঁদের আলোয়। এই সময়েই নাকি স্বর্গ থেকে বড়োরা দেখতে আসে তাদের বাড়ির লোকজনকে.. দিদাইয়ের কাছে শুনেছি।

হিসি করতে যাবার জন্য শ্যাওলা ধরা কলতলায় সাবধানে পা ফেলে ফেলে চৌবাচ্চার পাশে নালাটার কাছে এলাম। চৌবাচ্চার জলে টুকরো টুকরো চাঁদ। মুখার্জি ডাক্তারের বাড়ির ছাদে একটা লক্ষ্মীপেঁচা থাকে। সেটা একবার ডেকে উঠলো।


কলতলা থেকে ওই ঠাণ্ডার মধ্যেই মুখেচোখে জল দিয়ে সবে মাত্র দালানে উঠেছি তিনধাপ সিঁড়ি পেরিয়ে। পরিষ্কার শুনতে পেলাম খুব মিষ্টি গলায় একটা ডাক..

"দাদুভাই! এখনো তোমার ঘুম আসেনি?






নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮