• ধীমান চক্রবর্তী

ধারাবাহিক - একলা পথে



আগেকার পর্ব পড়ার প্রয়োজন হলে নীড়বাসনা'র আগেকার সংখ্যা দেখুন




পর্ব - ১৩


কে ডাকলো? আশেপাশে তো নেই কেউ! দেয়ালের যেখানে ঘড়িটা ঝোলানো.. সেদিকে নজর চলে গেলো! মিষ্টি একটা নরম আলো ফুটে উঠেছে ঘড়ির দুপাশে টাঙানো দুটো ছবির ভেতরে! সেই আলোয় জ্বলজ্বল করছে দুজন মানুষ! দুজনেই তাকিয়ে আছে আমার দিকে! দুজনের ঠোঁটের কোণেই আলতো হাসি! একজন আমার দাদু.. দীনেশ চন্দ্র ব্যানার্জি! আর অন্যজন ঠাকুরদা.. সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তী! অবশ্য এখন দুজনের নামের আগেই 'ঈশ্বর' বসে!


আমি ভয় পেয়েছি কিনা সেটাও বোঝার মতো অবস্থায় আমি নেই! পা দুখানা যেন আঠা দিয়ে কেউ আটকে রেখেছে দালানের মেঝের সঙ্গে! শুধু দুটো আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি! একটা 'খচ্ খচ্'.. আসছে ঘড়ির ভেতর থেকে! অন্যটা আসছে আমার জামার বাঁ পকেটের ভেতর থেকে.. আমার বুকের 'ঢিপ্ ঢিপ্!'


ছবির চেয়ারে বসা দুজন যেন হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে নেমে এলো দালানে.. দাঁড়ালো আমার দুপাশে! দুজনের হাত আমার দুটো কাঁধে রাখা! শুনেছি যারা মরে যায় তাদের ছোঁয়া খুব ঠাণ্ডা হয়। কিন্তু এই দুজনের হাত তো মোটেও ঠাণ্ডা নয়! বেশ গরম.. ঠিক জ্যান্ত মানুষের হাতের মতোই!


আমার আর মোটেও ভয় পাচ্ছে না। বললাম..

"তোমরা!.. তোমরা ছবি থেকে বেরিয়ে এলে কী করে? কেন এলে?"


ধবধবে সাদা ধুতি আর পাঞ্জাবী দুজনের গায়ে! পায়ে চকচকে কালো জুতো! জুতোর নামটা আমি জানি.. নিউকাট। মামা পরে.. মাঝে মধ্যে মেজকাও। দুজনের হাতেই ছড়ি.. হাতলে কাজ করা।


চারদিক ম ম করছে শিউলিফুলের গন্ধে! এই শীতকালে শিউলি ফুটলো কেমন করে! সে তো ফোটে পুজোর সময়!


একটা নরম গলা কানে এলো..

"বুঝলি দাদা! ভালোবাসার লোকজনদের যখন খুব দেখতে ইচ্ছে করে.. তখন তো মেঘের ওপার থেকে নামতেই হয়! কিন্তু নিজের বাড়ি, নিজের লোকেরা আছে কোথায়.. তা বুঝবো কেমন করে?"

বললো ঠাকুরদা।


আমি শুধু তাকিয়ে আছি হাঁ করে.. আর শুনছি!


অন্যপাশ থেকে আরেকটা মিষ্টি সুরেলা গলা বলে উঠলো..

"দাদুভাই! এই শিউলির গন্ধ তখন আমাদের পথ চিনিয়ে নিয়ে আসে.. যেমনি করে মা দুর্গা আসেন তাঁর নিজের বাড়ি!"

দাদু বললো এবার।


কি সুন্দর করে কথা বলছে দুজন! মরে যাওয়া লোকেরা এতো সুন্দর ভাবে কথা বলতে পারে! এটা তো কেউ বলেনি! বরং উল্টোটাই বলেছে যে তারা সবসময়ই নাকি ভয় দেখায়!


দাদু যেন আমার মনের কথাটাই শুনে ফেলেছে। বললো..

".. আর আমরা কেউই তো তোমায় সামনাসামনি দেখিনি! কথাও বলিনি! তাই তো এলাম!"


দাদু বলেই চললো..

"Oh.. Our little angel ! We watched you from the farthest galaxy.. Wanted to feel your tender touch.. Tried to kiss your forehead just to feel the purest fragrance of innocence hovering around your soul !"


এইরকম ইংরেজি তো সাহেবদের বলতে শুনেছি! ক্রিকেটপাগল মেজকা যখন তার 'মার্ফি' রেডিওতে খেলার খবর.. মানে 'রিলে' শোনে.. তখন! কিন্তু সেই ইংরেজি বলাটা এতো সুন্দর নয়!


কি আশ্চর্য! দাদুর এই কঠিন কঠিন ইংরেজি শব্দগুলোর মানে আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি! কিন্তু কেমন করে? আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো!


আচমকা ঠাকুরদা বলে উঠলো..

"এই তো বাঁড়ুজ্জেমশাই! আবার শুরু করে দিলেন আপনার ব্রিটিশ পদ্য! ওই আপনার এক দোষ.. কথায় কথায় ইংরেজি লেকচার! তবে বলেন যখন.. শুনতে বেশ লাগে!"


"আর চক্কোত্তিবাবুর হিন্দুস্থানী শেয়ালের অত্যাচার আমরাও কি কম সহ্য করেছি? কথায় কথায় হুক্কাহুয়া!"

জবাব দিলো দাদু।


আমার কিন্তু এবার বেশ মজা লাগতে শুরু করেছে দুই দাদুর এই ঝগড়া দেখে। মামা আর মেজকার যেমন মাঝেমধ্যেই ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান নিয়ে লেগে যায়.. অনেকটা সেরকম!


"সে আর কীই বা করি বলুন! তখন তো আর কাঁটাতার ছিলো না! সারা ভারত চষে বেড়িয়েছি স্টেশনমাস্টারি করে। কোথায় যেতে বাকি রেখেছি? এলাহাবাদ, মির্জাপুর, মোগলসরাই, অমৃতসর, গৌহাটি.. কতো আর বলবো! এমনকি আপনাদের ওখানকার নীলফামারিতেও পোস্টেড ছিলাম.. বাংলোর লন থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যেতো.. আহা!"

কেমন যেন উদাস হয়ে গেলো ঠাকুরদা!


"আহা.. আহা! বড়ো ভালো বললেন কথাটা! কাঁটাতার.. ওই কাঁটাতারের সাপেই আমাদের পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ধরেছে! তার বিষেই আমরা সবাই মরেছি!"

দাদু বলে চলেছে।

"আমার চোদ্দপুরুষের বাস নৈহাটি। কাজের সূত্রে বাবা গেলেন বরিশাল। আর এই দীনেশ ব্যানার্জি হয়ে গেলো কিনা বরিশালের বাঙাল! জন্ম.. লেখাপড়া সেখানে হলেও বাপঠাকুরদা কোথাকার সেটা দেখতে হবে না!

ভালো স্টুডেন্ট ছিলাম.. বুঝলেন! ফুটবল ছিলো নেশা.. গোষ্ঠ পালের সঙ্গে খেলেছিও! আর তার সাথে ছিলো কবিতা লেখার বাতিক!

ম্যাকফার্সন জুটমিলের অ্যাকাউন্ট্যান্ট এর চাকরি পেতে না পেতেই বড়দা বিয়ে দিয়ে দিলেন। লাবণ্য.. মানে ফণীর মা ছিলো মানপাশার মেয়ে। ওদের আদি নিবাস আবার জয়নগর.. ভাবুন একবার!

ঠিকই বলেছেন আপনি! কাঁটাতারের প্যাঁচে নৈহাটির মানুষও 'রিফিউজি' হয়ে যায়!"

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে থামলো দাদু।


"বিলকুল সহি বোলা আপনে! একদম দিল কি বাত! এ ক্ষত সারবে না কোনোদিন! হুগলিতে রাজবল্লভহাটের ভদ্রাসন তো আমাদের ছিলোই। ১৯৩৬ এ রেঞ্জার্স এর লটারির টাকায় কিনলাম ওই হাওড়ার বাড়ি। মার্টিন এর লাইন ছিলো টিকিয়াপাড়ার কাছেই। বাস্তুভিটের সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধা হবে.. সেই ভেবেই।

ডাক্তার মুখার্জির কাস্টডিতে ছিলো সেই বাড়ি.. মানে এই বাড়ি.. যেখানে এই মুহূর্তে আমরা দাঁড়িয়ে।

আপনারা ভাড়া এলেন চুয়াল্লিশে। শিক্ষিত ব্রাহ্মণ ছাড়া কাউকে ভাড়া দিতে বারণ করেছিলাম মুখার্জিকে।"


আমি বেশ মন দিয়ে শুনছিলাম। খুব ভালো লাগছিলো। চোখের সামনে যেন সেই সময়টা আবছা আবছা ভেসে উঠছিলো।


হঠাৎ করেই দাদুর চিৎকারে চমকে উঠলাম!





(পর্ব - ১৪)


ওই আলতো নরম আলোতেও দেখতে পাচ্ছি দাদু বেশ ক্ষেপে গেছে। বলে উঠলো..

"What do you mean by 'শিক্ষিত'.. Mister Chakraborty? আপনার আমার মতো বামুন হলেই 'সজ্জন?' আর তার বাইরে কায়েত মাহিষ্য তেলি কৈবর্ত সবাই আপনার মতে 'দুর্জন!' এই যদি শিক্ষা হয় তো সেই শিক্ষার মুখে দিই এক.. থাক!"

হাঁপাতে লাগলো দাদু।


আমি বলে উঠলাম..

"আচ্ছা.. তোমরা দুজন কি এরকম ঝগড়া করার জন্য আমার কাছে নেমে এলে? আর দাদু তুমি তো দিদাইয়ের মতো করে কথা বলছো না!"


এইবার একটু হেসে ঠাকুরদা বললো..

"শোন দাদা.. তোকে একটা কথা বলি। এখন আমরা মেঘের ওপারের দেশে থাকি। সেখানে সব ভাষার লোকজন থাকে। তাই আমরা যে যেভাবে বুঝতে পারে তার সাথে সেভাবেই কথা বলি। সবার ভাষাও বুঝি। কিন্তু সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারি মনের ভাষা.. ভালোবাসার ভাষা!

আর যে ঝগড়ার কথা বলছিস.. ওটা যে থেকেই যাবে রে দাদা!"


"কেন? ঝগড়া করে হবেটা কী?"

আমি জানতে চাইলাম।


মিষ্টি করে হেসে আমার চুলে একটুখানি হাত বুলিয়ে ঠাকুরদা বললো..

"ওই যে তোর ঝগড়ুটে দাদু.. সে যদি আমাদের কম ভালোবাসতো তাহলে তোর বাবা আর মেজকা তো বড়োই হতো না রে দাদা।

যাকে যতোটা মন থেকে ভালোবাসবি.. দেখবি তার সঙ্গে ততো বেশি ঝগড়া হবে! সে খুব মিঠে ঝগড়া রে দাদা.. বড়োই মধুর!"


"মধুর তোমার শেষ যে না পাই.. প্রহর হলো শেষ.."

হঠাৎ গেয়ে উঠলো দাদু !

কি সুন্দর গলা.. আর কি সুরেলা! এমন আমি শুনিনি আগে!


তারপরেই বললো..

"এবার যে আমাদের যেতে হবে দাদুভাই।"


"আরেকটু থাকো না গো!"

আমি বললাম।


"না রে দাদা। এবার আমাদের যেতেই হবে.. ভোর হয়ে এলো বলে! তবে যাবার আগে কয়েকটা কথা বলে যাই তোকে! মন দিয়ে শোন.. চোখদুটো বন্ধ করে!"


আমিও ঠাকুরদার কথামতো চোখ বুজে বললাম..

"বলো এবার!"


চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছি আমি। আমার দুটো কাঁধে দুজনের হাত। যারা আমার পূর্বপুরুষ। যারা যাবার আগে আমায় কিছু বলতে চায়। থমথমে শিউলির গন্ধের সাথে ভেসে এলো ঠাকুরদার গলা..

"একটা কথা জেনে রাখ দাদা! কোনো মানুষই পুরোপুরি খাঁটি হয় না। এমনকি তোর মেজকাও নয়। তাই কারোর মুখের কথায় কখনও কিচ্ছুটি মেনে নিবি না।

পড়াশোনা তো আগেই শুরু করে দিয়েছিস.. এর পর থেকে ইস্কুলে যাবি। প্রচুর বই পড়বি। এমনকি ফেলে দেওয়ার আগে কাগজের ঠোঙাটাও একটি বার পড়ে নিবি। কিন্তু একটা বই আছে.. প্রায় সকলেই পড়ে বা পড়তে চেষ্টা করে। সেই বইটা কোনোদিন পড়বি না।"


"কী বই?"

আমি জিজ্ঞেস করলাম।


"বইটার নাম হচ্ছে 'আমি সব জানি!' পড়তে শুরু করলেই মরবি.. ভেতর থেকে শুকিয়ে যাবি! যেমন তোর বাবা.. মানে মোহন! ও যেই বুঝে গেলো যে ও জিনিয়াস.. ওর এগোনোর ইচ্ছেটাই গেলো মরে! অঙ্ক আর সংস্কৃতে ওইরকম দখল আমি আর দেখিনি! নরসিংহ দত্ত কলেজ থেকে অঙ্ক নিয়ে অনার্স পাশ দিয়ে ভর্তি হলো বিদ্যাসাগর কলেজে। নিজে মাস্টার ডিগ্রী পড়তে পড়তেই পড়াতো ওর ক্লাসের অন্য ছাত্রদের! কিন্তু নিজের ডিগ্রীটা আর অর্জন করে উঠতে পারলো না! তাস খেলা, সেতার বাজানো, ইয়ারবন্ধু নিয়ে মাতামাতি করে মাস্টার ডিগ্রী অর্জনের বদলে বর্জন করে বসলো! নাহলে..!"

ঠাকুরদার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলার শব্দ রাতভোরে যেন আমার কানে তিরের মতো বিঁধলো!


এবার দাদুর মিষ্টি গলা ভেসে এলো..

"নেহাত সুরটা ঠিক ঠিক ধরতে পেরেছিলো বলে মোহন ভেসে রইলো.. ডুবলো না! Though a sheer brilliance.. He remained unexplored ! ওই কলেজে নানান স্রোতে ভেসে গিয়েই ওর কাল হলো! সেজন্যই তো আমি বলি দাদুভাই.. A college is a place where pebbles are polished.. and diamonds are dimmed !"


বলে চলেছে দাদু। মনটা খারাপ হয়ে গেলেও আমি শুনে চলেছি।


হঠাৎ করেই যেন দাদুর মিষ্টি সুরেলা গলাটা কেমন যেন ধারালো হয়ে উঠতে শুরু করলো!

"Listen দাদুভাই! Never stop questioning ! Always be doubtful.. And ask 'Why..Why.. Why!' কেবল মনটাকে হাট করে খুলে রাখো.. অনেকটা তোমার মেজকা দাশুর মতো! আর সবকিছু দেখতে থাকো! সবকিছু!

আর যদি পারো তো মাঝে মাঝে চেষ্টা করে দেখো নিজের শরীরটার বাইরে বেরিয়ে গিয়ে মনের চোখ দিয়ে নিজেকে দেখার! কঠিন কাজ.. দাদুভাই! বড্ডো কঠিন.. অন্তত তোমার বয়সে! কিন্তু চেষ্টা করে গেলে একদিন পারবে তুমি!"


আমার ভেতরে তখন সবকিছু মিলে যে কী একটা হচ্ছে.. সেটা আমি বুঝতে পারলেও কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে আমি বোঝাতে পারবো না! মেজকা মাঝে মাঝে কঠিন একটা শব্দ গলা ছেড়ে বলে ওঠে.. সেই 'অবাংমনসগোচরম্' কথার মানেটা আমি পরিষ্কার করে বুঝতে পারছি!


ঠাকুরদার নরম মোলায়েম গলা ভেসে এলো কানে..

"দাদা! আরো একটা কথা বলি। গানটাকে ধরে থাকিস.. ছাড়িস না কোনোদিন! তোর জিনের মধ্যে গান আছে! কেবল নামে সুর থেকে লাভ নেই.. সুর থাকতে হবে মনে! সেই মনটাকে সুরে ভিজিয়ে রাখ! জীবন একটাই! যেখানে যা পাবি সবটুকু চেটেপুটে খেয়ে নে দাদা! সবটুকু!"


যেন অনেক দূর থেকে দাদুর গলা ভেসে এলো..

"এবার তো আমাদের যাবার সময় হলো দাদুভাই! প্রতিটা দিনের শেষে একবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ো নিজের চোখে চোখ রেখে! নিজেকেই প্রশ্ন কোরো তুমি যা করলে সেটা ঠিক না ভুল! Make a practice of it and take your own decisions.

A correct decision can double your confidence and a wrong one can double your experience. So no need to worry about either of the situations. Each way you grow! "


আমি চোখ বন্ধ করেই শুনতে পেলাম দাদু হঠাৎ করে ছড়া কেটে বলে উঠলো..

"যা কিছু পড়বে চোখে..

নিজে নাও বুঝে,

হয়তো পরশমণি..

পেয়ে যাবে খুঁজে!"


আবছা গলায় ঠাকুরদা এবার বলে উঠলো..

"কেবল আয়না থেকে চোখ সরাস নে দাদা! এবার আমরা আসি !"


আমি প্রাণপণে চিৎকার করে উঠলাম..

"না না এক্ষুনি না! এখনো আমার অনেক কিছু জানার আছে! অনেক অনেক কিছু!"


আচমকা আমায় কে একটা ধাক্কা দিলো! মায়ের গলা..

"বাবাই.. অ্যাই বাবাই! কী হয়েছে বাবা? ভয় পেয়েছিস?"




(পর্ব - ১৫)



সেই ঝাঁকুনির সঙ্গে মায়ের গলা পেয়ে ধড়মড় করে উঠে বসলাম। কিন্তু মা কোথায়? এইমাত্র ডেকে তুলে দিলো যে!


চারপাশে ঘুমচোখেই খুঁজে চলেছি! চোখদুটো ভালো করে রগড়াতে গিয়ে চশমাটা খুলে পড়লো! 'খটাং' শব্দটার সাথেই বুঝতে পেরেছি কোনো ধাতব সারফেসের ওপর পড়েছে চশমা। নেহাত পাওয়ার বেশি নয়। তাই মেঝে থেকে কুড়িয়ে নিয়ে মুখের ভাপ দিয়ে চশমাখানা শার্টের কোণে একটুখানি মুছে নিয়ে নাকের ওপর লাগিয়ে এদিক ওদিক দেখলাম একবার।


শুধু মা কেন.. আমার আশেপাশে কেউ কোত্থাও নেই। ট্রেনটা থেমে গেছে। জানালার বাইরে ভোরের আলো ফুটে উঠছে একটু একটু করে। আর কামরার ভেতরে থমথম করছে টাটকা শিউলি ফুলের গন্ধ। অকালবোধনের শরতে শিউলি ফোটে জানি। কিন্তু এ কোন অকালের শিউলি..

জীবনের সকালবেলার গন্ধ মেখে এলো? কার বোধনের জন্য?


আশ্চর্য! আমার কিন্তু একটুও ক্লান্তি বোধ হচ্ছে না!

জানালা দিয়ে চোখ মেলে দেখছি একটু একটু করে ফুলের মতো ফুটে উঠছে অপার্থিব এক ভোর!

কোথাও কোনো মনখারাপের ছায়ামাত্র নেই! অন্যকে টেক্কা দিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছানোর কোনো তাড়া নেই! অনাবিল.. ঘাসের ডগায় শিশিরের ফোঁটার মতোই টলটলে পবিত্র!


ছোট্ট একটা প্ল্যাটফর্ম। কোনো ছাউনি নেই। এমনকি প্ল্যাটফর্মের ধারটুকু ছাড়া আর কোনো জায়গা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানোও নয়.. মধ্যে লালরঙা মাটিতে এখানে ওখানে ঘাস গজিয়েছে। চেনা অচেনা নানান রকম গাছ পরম মমতায় আগলে রেখেছে এই মায়াবি স্টেশনকে! ভোরের পাখির কিচিরমিচির একটা নতুন জন্ম নেওয়া দিনকে যেন আশীর্বাদ করছে!


হলুদ বোর্ডে কালো রঙে লেখা সেই স্টেশনের নাম..

'শেকড়ছাওয়া!


স্টেশনের নামটা বারবার উচ্চারণ করলাম।

"শেকড়ছাওয়া.. শেকড়ছাওয়া!"


একটা আশ্চর্য ভালোলাগা আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ছে ভেতরে!


ভালোলাগার সেই ভাবটা ফুটিফাটা চৌচির হয়ে যাওয়া মাটিতে প্রথম পড়া বৃষ্টির ফোঁটার মতো! অনেকদিন আগে মৃণাল স্যারের শেখানো সেই শব্দটা মনে পড়ে গেলো.. 'Petrichor!' ক্লাস নাইন এর সেই সোঁদা গন্ধ..!

সেই ভালোলাগার আবেশ ছড়িয়ে পড়ছে আরো গভীরে!


অনেকদিন.. হয়তো অনেক যুগ পরে হঠাৎ করে শুনতে পাওয়া কোনো এক প্রিয় মানুষের স্নেহমাখা ডাকের মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে ভেতরে!


কিম্বা ভীষণ চেষ্টা করেও যার দিকে কোনোদিনই চোখ তুলে তাকানোর সাহস হয়নি.. আচমকা বৃষ্টি নামার পর অফিসপাড়ায় একই ছাউনির নিচে দুজনের মুখোমুখি হয়ে যাবার মতো! আর একপলকের সেই চকিত চাউনির সঙ্গে দুতরফেই একচিলতে 'ইশ.. কি কান্ড বলুন তো' গোছের হাসিতেই অনন্তের চাওয়াপাওয়ার হিসেবনিকেশের মতো!


সাদা কুয়াশায় মোড়া গাছের পাতাগুলো নীলচে হয়ে গেছে। আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই নীল আর সবুজের লুকোচুরি খেলায় যোগ দিলো সোনালী রোদ্দুর।

আমি শিশুর বিস্ময়ে শুধু দেখে যাচ্ছি এক অলৌকিক ভোরের ধীরে ধীরে হয়ে ওঠা!


কতোদিন যে খোলা মাঠে গাছের ফাঁকে ফাঁকে ভোরের নরম আলোর ছড়িয়ে পড়া দেখিনি!


যতোটা পারি জোরে শ্বাস নিয়ে বাতাস ভরে নিলাম প্রতিদিনের ক্ষতবিক্ষত.. অনেক চেষ্টা করেও না পাওয়ার ক্লান্ত হতাশ বুকে।

মনে হলো.. যা পেয়েছি তাই বা কম কোথায়!


আরামে চোখ বুজলাম সিটে মাথাটা এলিয়ে। আয়নাটা হাতেই আছে। এখন দেখবো না। ট্রেনটা চলতে শুরু করুক.. তারপর! ততক্ষণ 'শেকড়ছাওয়া'র খোলা হাওয়া ভিজিয়ে দিক আমার ক্লান্ত মন.. ধুইয়ে দিক সে মনের দৃষ্টিকে!


হে পথের দেবতা! জানি না কবে.. কোন রূপে তুমি দেখা দেবে! জানি না! হয়তো চেনা শিউলি বা অচেনা কোনো ফুলের গন্ধে ভরা একঝলক ঠাণ্ডা হাওয়ায় তোমার ছোঁয়া পাবো! নাকি চেনা মানুষের হঠাৎ অচেনা হয়ে যাওয়ায়.. অথবা অচেনাকে চিনে নেওয়ার মধ্যে তুমি এসে হাজির হবে! কিচ্ছু জানি না!


শুধু এইটুকু বুঝতে পারছি চলাটা চালিয়ে যেতে হবে.. নিজের সঙ্গে মনের আয়নায় কথা বলার মতোই!


কখন যে একটা গান ভেতর থেকে নিজেই বেরিয়ে এসেছে আমার গলায়.. জানিনা!


"পথে চলে যেতে যেতে কোথা কোনখানে

তোমার পরশ আসে কখন কে জানে..!"


মগ্ন হয়ে গিয়েছিলাম গানের মধ্যে। চমক ভাঙলো একটা মৃদু দুলুনিতে! ট্রেন আবার চলতে শুরু করেছে! কেউ যেন বলে উঠলো..

"আয়না থেকে চোখ সরাস না!"



(পর্ব - ১৬)



তড়িঘড়ি ঘুম থেকে উঠেই দৌড়ে গেলাম মেজকার ঘরে। মেজকা নেই। কোথায় গেলো? টেবিলের ওপর বন্ধ করে রাখা 'ইস্পাত' থেকে উঁকি দিচ্ছে পালকের ডগাটুকু। খুলবো? নাহ্ থাক। তার চাইতে অনেক বেশি দরকার মেজকাকে।


মেজমা কলতলায় ডাঁই করে রাখা জামাকাপড় কাচতে বসেছে। চৌবাচ্চার পাশ দিয়ে সাবধানে পা ফেলে ফেলে নর্দমার কাছে যাচ্ছি হিসি করতে। মনে পড়ে গেলো রাত্তিরের স্বপ্নটা। এখান থেকে ফেরার সময়েই তো সেই অদ্ভুত ব্যাপারটা হলো! গা টা একটু যেন শিরশির করে উঠলো!


"শ্যাওলাতে হড়কাস না যেন। অন্যমনস্ক হয়ে আছিস তো। যাকে খুঁজছিস সে বাজার গেছে।"

মেজমা বললো কাচা না থামিয়েই।


"তুমি কোত্থেকে বুঝলে আমি অন্য কিছু ভাবছি?"


আমার কথায় একটুখানি হেসে মেজমা বললো..

"এটা বুঝতে কি হাত গুণতে লাগে? আটটার আগে যার ঘুম ভাঙে না.. সেই ছেলে ভোর ছটার সময় মেজকার ঘরে ছোটে কেন? আগে দাঁত মেজে বাথরুম টাথরুম সেরে কিছু খেয়ে নিগে যা। তার মধ্যে মেজকা এসে যাবে বাজার আর তোর প্রশ্নের উত্তর নিয়ে।"


কলগেটের সাদা টিনের কৌটো থেকে সাদা গুঁড়ো বাঁহাতে ঢাললাম। তার থেকে একটু একটু নিয়ে ডানহাতের আঙুল দিয়ে প্রথমে দাঁতের সব জায়গা রগড়াতে হবে। তারপর 'বিনাকা সফ্ট' ব্রাশ দিয়ে 'আপ-ডাউন-আপ' তালে তালে সামনের দিকে 'মাঝ-ডান-বাঁ' হিসেবে তিন-দশ্কে তিরিশ বার। আবার ভেতরের দিকেও ওই একই ভাবে হাঁ করে তবে শেষ হবে ব্রাশ করা। এরপরে কুলকুচি। তারও পরে নুনজল মুখে আকাশের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে 'সারেগামাপাধানি' সুরে আওয়াজ বের করে যেতে হবে যতক্ষণ না কিছুটা নুনজল গলায় ঢুকে যাচ্ছে!

এবার টিউকলের.. ভুল বললাম.. 'টিউব ওয়েল' এর জলে আবার কুলকুচি করে শেষ অবধি শেষ হবে আমার দাঁত মাজা! এটা মেজকার শেখানো নিয়ম.. মেজকার ভাষায় 'বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত মতে নিত্য কর্ম দন্ত পদ্ধতি!' ছোট করে.. 'বিসিমনিকদপ!'

মেজকার মাথায় আসেও বটে এইসব আজগুবি নাম!


এই 'বিসিমনিকদপ' করতে করতেই কানে এলো দিদাইয়ের সেই আজব ভাষায় সুরের ছড়াগান.. যেটা শুনে বুঝতে পারলাম আজ বেস্পতিবার। দিদাই অবশ্য 'বিষ্যুইদবার' বলে.. যেটা নিয়ে নন্টেদা দিদাইকে মাঝেমধ্যেই ক্ষেপিয়ে দেয়।


আমার কিন্তু এই ছড়াগানটা শুনতে বেশ ভালো লাগে।..

"লক্ষ্মীমাতা লক্ষ্মীবারে

লক্ষ্মীপেসায় সড়ে,

মত্ত হৈয়া মর্ত্যে আইলেন

গোলক থিগ্যা উড়ে!"


আজ অবশ্য নন্টেদা নেই। আমি ওঠার আগেই বেরিয়ে গেছে কোথায় কী এক ইন্টারভিউ না কী সব দিতে। গজাদা এখনো আখড়া থেকে ফেরেনি। মা আর কায়দা রান্নাঘরে। তার মানে আজকে কায়দা 'রেওয়াজ' করেনি।


অন্যদিন আমার ঘুম ভাঙে হয় "জাগো মোহন প্যারে.." নয়তো "অবতোরি বাঁকে রে মনোহারে.." এই দুটোর যেকোনো একটা শুনে।

প্রথমটার নাম ভৈরব.. যেটা নাকি রাগ, মানে ছেলে গান।

আর অন্যটা হলো ভৈরবী.. সে আবার মেয়ে গান রাগিনী।


রাগই বটে। এটা কায়দা গাইলেই মেজকা বাবাকে রাগায় "ভাগো মোহন প্যারে" বলে। আর ভৈরবীটা নিয়ে মজা করে বলে.. "ওটা এই দাশু চক্কোত্তির নাম। এই যে সবাই আমায় পাগলা দাশু বলে.. আমি কিন্তু কখনোই রাগিনি!"


তবে ছেলে গান কি মেয়ে গান না বুঝলেও এটা আমি বেশ বুঝতে পারি.. দুটো গানের সময়েই "আলো হয়.. গেলো ভয়, চারি দিক.. ঝিকমিক.." সহজ পাঠের এই ছড়াটা খুব দুলে দুলে বলতে ইচ্ছে করে।


মেজকার আসতে হয়তো দেরি হবে। একবার মামার ছোট্টো ঘরটাতে উঁকি দিলাম। দেখি মামার ঘর জুড়ে সে এক আশ্চর্য কান্ড!



মামার ঘরটাই এই বাড়ির সবচেয়ে ছোটো ঘর। একজন বড়ো মানুষ যদি লম্বালম্বি শোয়.. তাহলে পায়ের আঙুল আর হাতের আঙুল দিয়ে‍ দুদিকের দেয়াল ছুঁতে পারে!


এককোণে একটা মাটির কুঁজো। মাথায় একটা কাঁসার তৈরি গেলাস উল্টো করে চাপানো। বেঞ্চির থেকে একটু চওড়া একটা তক্তপোশ দুদিকের দেয়াল অবধি টানা চলে গেছে। তার চারটে পা এমনই উঁচু যে আমায় কেউ ধরে না তুলে দিলে আমি তক্তপোশে উঠতে পারি না।


ওপরের দিকে ছোট্টো একটা জানালা। দেয়ালে ছজন লোকের ছোটো ছোটো ছবি.. মামার নিজের হাতে সুন্দর করে বাঁধানো। রবীন্দ্রনাথ, নেতাজী আর স্বামী বিবেকানন্দ.. এই তিনজনকে আমি চিনি। বাকি তিনজনের নাম কী জানতে চেয়েছিলাম একদিন। মামা পুরো নাম বলেনি। গাল তোবড়ানো বুড়োমতো চশমাপরা লোকটাকে দেখিয়ে বলেছিলো 'কাকাবাবু!' দুর্দান্ত সুন্দর দেখতে ঝকঝকে হাসিওয়ালা লোকটার নাম নাকি 'মহানায়ক!' আর হাফ প্যান্ট পরে ফুটবল পায়ে কালো লোকটা হলো 'পেলে!' কী সব নাম!


তক্তপোশের নিচে বসে আছে মামা! চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে প্রচুর বই। ছুরি, কাঁচি, কাঠের রুল, পেনসিল, বাদামি আর নীল রঙের কাগজ, কালো কাপড়। সঙ্গে বিরাট একটা জামবাটি ভর্তি আঠা। অ্যারারুট, ময়দা আর তুঁতে সেদ্ধ করে তৈরি।

একমনে বই বাঁধাচ্ছে মামা। একটা দুটো নয়.. এক মেঝে ভর্তি বই!


কোনো আওয়াজ না করে ঘরে ঢুকে দেখছি। কি যত্ন করেই না একটা বই বাঁধাই করছে মামা!

আমি যে ঘরের মধ্যে ঢুকেছি বুঝতেই পারেনি!


"কী বই বাঁধাচ্ছো গো ফণীদা?"

আমার কথায় একটুখানি নড়েচড়ে বসলো মামা। আমি মামাকে ওই নামেই ডাকি। তাই রেগে গেলো না। গলাটা একটুখানি গম্ভীর করে বললো..

"কী বই আর হবে মামু! তোমার মেজকার লাইব্রেরির বই। ওনার তো আবার আমার ছাড়া অন্য কারোর বাঁধাই পছন্দই হয় না।"


এটা অবশ্য আমিও দেখেছি যে মলাট করা, বই বাঁধানো, ঘুড়ি তৈরি, বড়ো কাগজে আলতা দিয়ে সুন্দর করে লেখা.. যাকে পোস্টার বলে.. এসব জিনিস মামা দারুণ করতে পারে। একদম দোকানের মতো।


কিন্তু কালকে অতো ঝগড়া হবার পরও আজকেই মেজকার লাইব্রেরির বই বাঁধাচ্ছে! তাও আবার এত্তো যত্ন করে! এমনভাবে কাজ করছে.. যেন ওগুলো মেজকার নয়.. মামার নিজের বই!


খুব মন দিয়ে কাজ করলে মামা ঠিক গান নয়.. আবার গুনগুন করার মতোও নয়.. একটা আজব সুরেলা শব্দ করতে থাকে!

"হুঁউঁঊঁ.. হুঁউঁঊঁ.. হুঁউঁঊঁ.." অনেকটা এরকম আওয়াজ। সেজন্য মেজকা মামাকে মাঝে মাঝে 'হামিং বার্ড' বলে রাগায়।


আমি দাঁড়িয়ে আছি.. তাতেও যেন কিছু যায় আসে না মামার! কি সাংঘাতিক যত্ন করে কাজ করা.. বাপরে!

একটা বই বাঁধানো শেষ করে সেটার ওপর যেভাবে কয়েকবার হাত বোলালো.. মাঝে মাঝে আমার মাথায় সেরকম করে হাত বোলায়।


আমি ইচ্ছে করেই একটা ইয়া মোটকা বই যেই তুলে ধরতে গেছি.. মামা খপাৎ করে বইটা আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বললো..

"আর যে কোনো বই নিয়ে দেখতে পারিস মামু.. কেবল এইটা নয়!"


আমি তো অবাক! বইটার মধ্যে কি সোনা রুপো লুকিয়ে আছে নাকি!


আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মামা বললো..

"এটা তোর মেজকার সবচাইতে প্রিয় তিনটে বইয়ের একটা। লাইব্রেরির নয়.. দাশুর নিজের বই.. ওর ট্রাঙ্কের মধ্যে থাকে।"


"কী বই?"


"কাশীরাম দাসের মহাভারত.. প্রায় একশো বচ্ছরের মতো বয়স ওই বইয়ের! ওটা নাকি দাশুর জ্যাঠার.. ওকে দিয়ে গেছেন। দাশু বলে যে পলিটিক্স, সোশিওলজি, এথিক্স আর মেটাফিজিক্স শেখার জন্যে ওই একটা বই ই যথেষ্ট!"


"উরিব্বাস.. এক-শো বছরের পুরোনো! তাহলে তো ওটার বয়েস তার চেয়েও বেশি!

তবে যেসব বিটকেল জিনিস ওতে আছে.. বাবা রে! ওইসব মেজকাই শিখুক। আর দুনম্বর প্রিয় কোনটা?"


মুচকি হেসে বললো মামা..

"কথামৃত!"


"সে আবার কী বই? মৃত মানে তো মরা! মরে যাওয়া কথা?"


এবার মামা বেশ জোরে হেসে উঠলো..

"খাসা বলেছিস মামু! তবে তোর মেজকা বলে এই বইটা নাকি একদম জ্যান্ত কথায় লেখা! পড়তে পড়তে নাকি নেশা লেগে যায়! আর তিন নম্বর প্রিয় বই হলো..."


আমি মামাকে থামিয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম..

"ইস্পাত! আমি জানি!"


মামা বেশ চমকে উঠে বললো..

"তুই জানলি কী করে?"


"আমিও জানি কিছু কিছু! আচ্ছা ফণীদা.. একটা কথা বলো.. এই তো তোমাদের অতো ঝগড়া হলো কালকে। আর আজ তুমি এতো যত্ন করে তার সব বই বাঁধাচ্ছো!"


সুন্দর করে হেসে মামা বললো..

"পারলে লোকটাকেই বাঁধাই করে রাখতাম রে মামু! শুনলি তো তার তিনটে প্রিয় বই কী কী। এই যার কম্বিনেশন..সে কী সব জায়গায় পাবি? ওকে ভালো করে চিনতে পারা চাই! ওর সাথে ঝগড়া করে হেরে যেতেও ভালো লাগে রে মামু! সে তোকে বোঝাই কীভাবে?"


ভালোবেসে ঝগড়া করার কথাটা যে আমি জানি.. সেটা মামাকে আর বললাম না। তবে এটুকু বুঝলাম মামা বাইরে মেজকার সঙ্গে যতোই ঝগড়াঝাঁটি করুক না কেন.. মেজকা আর মামার মধ্যে কোনো একটা ব্যাপার নিয়ে বেশ ভালোই.. ধ্যাত্তেরি.. মনে পড়ছে না ওই ইংরেজি কথাটা.. কী যেন.. তলায় তলায়.. ওহ্.. মনে পড়েছে.. আন্ডারস্ট্যান্ডিং রয়েছে!


কিন্তু কী সেই ব্যাপার ? সেটাই জানতে হবে। জানতেই হবে!


(চলবে)

নীড়বাসনা  বৈশাখ ১৪২৯