• চন্দন নন্দী

ধারাবাহিক - জীবনের পাতা থেকে - শেষ বয়সে




[১]



আর কিছুদিন পর ফিরে যাবো দেশের বাড়ি , অনেক তো হলো পুনে -বেঙ্গালুরু। শেষ বিচারে আমার বারাসাত ই ভালো। প্রায় চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। আর তো মাত্র কিছুদিন। আর মাত্র কয়েকটা বছর মাঝখানে , তারপর মাম্মা কি করবে সে জানে। আমি আর বৌ ফিরে আসবো বারাসাত এর বাড়ি - জীবনের শেষ কয়েকটা দিন আমি কাটিয়ে দেব যেখানে কেটেছে আমার ছেলেবেলা।


প্রচুর পড়ার ছিল যা পড়া হয়ে ওঠেনি , মানুষের সেবা করার কথা ছিল যা হয়ে ওঠেনি - কিছু চেষ্টা করতে হবে। সক্কাল বেলা বেরোবো প্রাতঃ ভ্রমণে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে, লটারি কালীবাড়ি তারপর কলোনি মোড় সেখান থেকে ছোট বাজার হয়ে ভদ্রবাড়ি হয়ে বাড়ি। মাঝখানে কত লোকের সাথে দেখা , আলাপ আলোচনা।


মাঝে মাঝে কলোনি মোড়ে কচুরি আর ছোলার ডাল খাবো লুকিয়ে লুকিয়ে। গিন্নিকে জানাবো না কিছু। মুখটা গম্ভীর করে খালি বলতে হবে " না হে - আজকে পেটটা ভর্তি ভর্তি লাগছে " .

বারাসাতে অনেকগুলো বাজার আছে। মূল বাজার টা হলো বড়বাজার হরিতলা পেরিয়ে , কলোনি মোড়ে যারা থাকে তারা মূলত হেলাবটতলা এর বাজারে যায়। বড়বাজারে শীতকালে দেখতে পাবেন প্রচুর ভেটকির ফিলে কাটা হচ্ছে। ওগুলো বিয়ে বাড়ির জন্য। আহা কতদিন বিয়ে বাড়ি খাওয়া হয় নি। বিয়ে বাড়িতে ফিশ ফ্রাই মূলত দুরকম হয় - শুধু ফিশ ফ্রাই আর ফিশ বাটার ফ্রাই। ভুলেও ফিশ বাটার ফ্রাই বেশি খাবেন না - ওটা মুখ মেরে দেয় , পরের আইটেম গুলো খাওয়া যায় না। ছেলেবেলায় বিনা নেমন্তন্নে এর ওর বিয়ে বাড়িতে ঢুকে পড়েছি - তখন বয়স কম ছিল , ধরা পড়লে কেউ কিছু বলতো না। এখন সেই সাহস নেই। তবে বিয়ের নেমন্তন্ন না পেলে এখনো ভীষণ অভিমান হয়।

বিয়ে প্রসঙ্গে অবশ্য একটা কথা বলা খুব যুক্তিযুক্ত বলে মনে হয় - মানুষ খাবার খুব সমালোচনা করে। এই একটা দিন মেয়ের বাবা তার যথা সর্বস্য দিয়ে দেন। তাই খুব বেশি সমালোচনা করে তার মুখ ম্লান করে দেওয়াটা মনে হয় না ঠিক।


আজকাল মানুষ যেন বড্ডো কম খায়। আমাদের ছোটবেলায় এ রকমটি ছিল না। এমন মানুষ ছিল যারা একটা পাঠা খেয়ে হজম করতে পারতো। বাঙালিরা অবশ্য সারাজীবন অম্বল - আর সুগার নিয়ে রইলো। পেটরোগা জাত। আগে কে কটা রসগোল্লা খেত - তার প্রতিযোগিতা চলতো - মেয়ের বাড়িতে খাবার শর্ট করিয়ে দেবার জন্য বিশেষ লোক আনা হতো। আবার অনেক বিশেষ খাদ্যরসিক আসতেন , তারা বেশি না খেলেও খাবার সমালোচনা করতেন। কোনটা ভালো হয়েছে , কোনটায় নুন কম পড়েছে ইত্যাদি। সেই দিন আর নেই।

এবার বারাসাত এ গিয়ে ভদ্রবাড়ির বাজারে প্রায় রোজ গিয়েছি। এই বাজারটা একদম গ্রামের দিকে বলতে গেলে , খুব সস্তায় প্রচুর তাজা মাছ আর সবজি পাওয়া যায়। পাশের গ্রামগুলো থেকে যে যার ক্ষেত থেকে তাজা সবজি নিয়ে আসে। তাই রোজ বাজারে যেতুম। তাজা সবজি , মাছ - এবং অত্যন্ত সস্তা।


আমি ফিরলে আস্তে আস্তে পাড়ার আর বাকি ছেলেরাও ফিরবে।অবসর জীবনে খুব একলা হয়ে যেতে হবেনা। আমার খুব শখ - পাড়ার দূর্গা মন্দিরে নিয়মিত কীর্তন - ধার্মিক আলোচনা হোক। রামকৃষ্ণ মিশন (শিবানন্দ ধাম ) থেকে যদি কিছু প্রভুজী আসেন এবং জীবনে বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোকপাত করেন - তবে সাধু সানিধ্যে সেই সময় অপূর্ব কাটবে বোধ করি।


জীবন বড়ো বিচিত্র। মানুষ কি চায় আর ঈশ্বর কি করেন। বেশ ছিলুম জন্মভূমিতে - মায়ের হাতের রান্না খেয়ে , কিন্তু জীবন আর জীবিকার জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছি। সাথে বৌ মেয়ে। মা পরে রয়েছে বারাসাতে। মায়ের জন্য মনটা মাঝে মাঝে ছটফট করে ওঠে কিন্তু সবসময় তার প্রকাশ ঘটেনা। সুগার ইত্যাদি বাড়লে মা অধীর হয়ে ওঠেন। রাতে ঘুম হয়না ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুতে হয়। মায়ের জন্য খুব চিন্তা হয় - তাই বাড়িতে ইন্টারনেট করে দিলুম - যাতে ভিডিও কল করার সুবিধে হয়। মুখটা দেখলে তও একটু আস্বস্ত লাগে।

আবার শিবের মতো আমাদের অনেকে আছে যারা পরিবারের জন্য নিজের কেরিয়ার এর দিকে তাকালো না। কাকু সদ্য মারা গেছেন , বাবা মায়ের জন্য শিবের এই স্যাক্রিফাইস কেউ পরে মনে রাখবে কিনা কে জানে ? চাকরিও করছে আবার সাথে সাথে একটা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিও চালাচ্ছে। আমাদের আশেপাশে এরকম অজস্র মানুষ রয়েছেন যারা সারাজীবন সুযোগ পেয়েও শুধু পরিবারের কথা ভেবে সেই সুযোগের সদ্ব্যাবহার করেন নি।


আমাদের গান্ধী স্কুল এর বন্ধুরা মিলে একটা গ্রুপ খুলেছে। সবাই মিলে নিয়মিত বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে সাহায্য করে। জামা কাপড় - বই পত্র ইত্যাদি। ফিরে গিয়ে গ্রুপে সক্রিয় ভাবে পার্টিসিপেট করতে হবে। আমি দেখেছি অনেক সময় খুব ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র সুযোগের অভাবে বঞ্চিত হয়। অনেকসময় ই অর্থের অভাব প্রধান কারণ হয়ে যায়। সবাই একটু একটু করে চেষ্টা করলে এরকম অনেক ছেলে / মেয়ের উপকার হয়।


আজকাল বড়ো অস্থির লাগে - প্রচুর বই কিনেছি কিন্তু সেগুলো পড়বার অবকাশ হচ্ছে না। প্রচুর বই কিনে না পড়লে মনের মধ্যে একরকম চাপ তৈরী হয়।

দুপুর বেলা রবিবার - জমিয়ে পাঠার মাংস খেতে হবে। ভাবছি একটা রোল এর দোকান দেব , মাম খুব ভালো রান্না করে - রেস্টুরেন্ট খুললে ভালো চলবে। রেস্টুরেন্ট এর বিজনেস করবার ইচ্ছে আমার ছোট বেলা থেকে। আমি লক্ষ্য করেছি নতুন দোকান খোলার পর ভালো চললে মানুষ লোভী হয়ে যায়। খাবারের কোয়ালিটি তে কম্প্রোমাইজ করে। আসলে আমার মনে হয় প্রত্যেক দোকানের একটা সিগনেচার ডিশ থাকা দরকার , সেটা হওয়া কম মূল্যে খাবার মতো খাবার। এই যেমন মিত্র কাফের ব্রেইন চপ , প্যারামাউন্ট এর শরবত , আর্সেনাল এর বিরিয়ানি ইত্যাদি। এর জন্য সময় আর ধৈর্যের প্রয়োজন , একদিনে একটা দোকান সেরা হয় না। আসলে শুধু পয়সা উপার্জন নয় - এর সাথে যে মর্যাদাটা আসে সেটা ভাবা যায় না। চন্দনের - রোলের দোকান / কিংবা মামস রোল সেন্টার কিংবা / জিভে জল ইত্যাদি অনেক রকম নাম ভাবছি। আপনিও আপনার পছন্দের নাম বলুন - ভালো লাগলে অবসসই অবশ্সিডার করবো।




[২]


শেষ বয়েসে বুড়ো বুড়ি মিলে বেড়াতে যাবার পরিকল্পনা রয়েছে। বুড়ির আবার উঁচু সহ্য হয় না। সারাক্ষন খালি খ্যাক খ্যাক করে হাঁচছে, কাশছে আর বমি। উঁচু জায়গা মোটে সহ্য করতে পারেনা। আমার আবার পাহাড় বেশি পছন্দ। বুড়ো হলে তো আবার একা যাবার উপায় নেই - ওকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। অন্তত বিশ রকম বড়ি খেতে হয় - সে আমি মনে রাখতে পারিনে - ওই সব দেখে।


সে যাই হোক - কত আর সমুদ্র দেখবো বলুন তো ? অন্তত বিশ বার পুরি গিয়েছি। দিঘাও কম বার হলো না। গোপনে একটা কথা বলে রাখি - যদি পুরি বা দিঘা যান - তবে বিচ এর ধারে ফ্রেস মাছ ভাজা পাওয়া যায় - ভেটকি , চিংড়ি - গলদা / বাগদা আস্তে করে মেরে দিন। ব্যাটার টা ওরা বেশ ঝাল ঝাল বানায়।


তবে বয়স হয়ে গেলি তো ঐসব চলবে না। সামান্য ভাত - একটু ঘি ভাত - কাঁচা লঙ্কা ডলে , তারপর শাক , লাল শাক বাদাম দিয়ে খেতে খুব ভালো লাগে। বেতো শাক ও খুব ভালো খেতে। খেতে পারেন আলু পোস্ত, পাতলা মুসুরির ডাল - লঙ্কা আর গন্ধরাজ লেবু দিয়ে। খেতে পারেন কুচো মাছ ভাজা - শুকনো লঙ্কা ভাজা দিয়ে। শেষ পাতে টক দই অল্প চিনি দিয়ে খাবেন - এতে হজমের সুবিধে হয়। যা যা। কি সব লিখতে কি সব লিখছি - আপনারা এতো খাই খাই করেন কেন বলুন তো? - মনটা শুধু খাবারের দিকে চলে যায়। সে যাক যে যাক ঘোরার কথা হোক।


আজকাল ঘোরার খুব সুবিধে হয়েছে। হনিমুন বাদ দিলে গ্রুপ এ ঘোরাটাই আমাদের খুব পছন্দ। সমবয়সী হলে ভালো হয়। বাজেট বুঝে খরচা করতে হবে। আগেকার দিনে মানুষ তীর্থ করতে যেত। এরকম অনেক মানুষ ছিল যারা তীর্থে যাবার আগে নিজের শ্রাদ্ধ পর্যন্ত করে যেতেন। ভাবুন জীবনে মানুষের কিই বা প্রয়োজন। পরনের জামা কাপড় - দুবেলা দুমুঠো অন্ন ,পরে রইলো পথ আর পথিক। আমাদের জীবনের সাথে খুব মিল না ? তাই ঘুরতে যাবার আগে বেশি কিছু নেবেন না। লোটা কম্বল নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। খুব বড়ো হোটেল -রিসোর্ট এইসব করে লাভ নেই। থাকতে হবে হলিডে হোম বুক করে - নিজে বাজার করো নিজে রান্না করে খাও। আমিও সেটাই ঠিক করেছি। প্রথমেই যেতে হবে কেদারবদ্রি। উত্তরাখণ্ড নাকি অপূর্ব - লছমনঝুলা গিয়ে বিখ্যাত পুরি খান। নিরামিষ আহার - অত্যন্ত ভালো আবহাওয়া। লোকে একবার গেলে বারবার যেতে চায়।


২০১৪ সালে আমরা সবাই মিলে পুরি বেড়াতে গিয়েছিলাম। এক রাতের জার্নি - আগের দিন রাত ৮ তাই জগন্নাথ এক্সপ্রেস / পুরি এক্সপ্রেস এ উঠে পড়লুম। রাতের কোষা মাংস কিংবা ঝাল ঝাল আলুর দম আর লুচি। সাবাড় করে দিলুম। পরের দিন সক্কাল সক্কাল পুরী - " চায়(চা ) চায় গরম চায় " শুনতে শুনতে স্টেশনে নেমে পড়া। আমরা উঠেছিলাম সিন্ডিকেট ব্যাঙ্ক এর হলিডে হোম এ। নামমাত্র ভাড়া - তবে অনেক আগে থেকে বুক করে রেখেছিলুম। প্রায় একসপ্তাহ ছিলাম। ওখানে ভজহরি মান্না খুলেছিলো - কিন্তু এখন সেটা রূপসী বাংলা নাম হয়েছে। খাবার অত্যন্ত সুন্দর। মেসো , আমি আর রতন মামা সকাল ৭ তা নাগাদ বেরিয়ে পরতুম বাজার করতে। মেসো-ই আমাদের মেসি , তার নেতৃত্বে আমরা ঝোলা ধরে পেছন পেছন চলতুম। টাটকা স্থানীয় মাছ - পুকুর থেকে নেওয়া - আর ফ্রেস সবজি। ১১ টা নাগাদ প্রাতরাশ করে সমুদ্রে স্নান। পুরীতে সমুদ্রে স্নান করলে রংটা কালো হয়ে যায়। স্নান করতে করতে মাঝে মাঝে বিশ্রাম - সাথে সাথে মদনমোহন বলে একরকম মিষ্টি পাওয়া যায়। একদম রসগোল্লা - খালি সাইজটা একটু অন্যরকম। অসাধারণ খেতে। ছানাপোড়াটাও খেতে পারেন - কোনো ব্যাপার নয় - রসগোল্লা কলকাতায় পাবেন - ছানাপোড়া টা পাবেন না।


হাসির ব্যাপার ওড়িষ্যা নাকি রসগোল্লা এর আবিষ্কার করেছিল এরকম দাবি করেছে। সবাই জানে নবীন চন্দ্র ময়রা ছানা দিয়ে সর্বপ্রথম রসগোল্লা আবিষ্কার করেন - অবশ্য সময় লেগেছিলো অনেক বেশি - কারণ বাংলায় যে ছানা সেই সময় ব্যবহার করা হতো সেগুলো ছিল মোটা ছানা - ওটা আট বাধতো না। তাই গোল্লা রসে ভেঙে যেত। তিনি পূর্তগীজ সাহেবের কাছথেকে ছানা কাটা জল দিয়ে আবার ছানা তৈরী করা শেখেন যেটা তুলনা মূলক ভাবে অনেক সুক্ষ। শেষ পর্যন্ত তৈরী হয় রসগোল্লা। তবে এখন কলকাতায় যেটা বিক্রি হয় সেটা স্পঞ্জ রসগোল্লা। এটাতে ছানাকে খুব বেশি ফেটানো হয় - তাই রসগোল্লা স্পঞ্জের মতো হয়। আমার কিন্তু স্পঞ্জ রসগোল্লা একদম ভালো লাগেনা। বারাসাত এ বৈশাখী তে রোজ রাত গরম গরম রসগোল্লা করে আমার কাছ সেটাই বেশি ভালো লাগে।


বেশ কয়েকটা দিন সকলে মিলে খুব আনন্দ করেছি। আসলে একটা কথা আছে। যদি হও সুজন তেতুল পাতায় নয়জন। সকলে মিলে যে আনন্দ হয় - ফাইভ ষ্টার হোটেলে একা একা সেই আনন্দ হয়না। এটা অবশ্য আমার ব্যক্তিগত মতামত।


শীতের শেষে প্রত্যেক বছর কলকাতায় বইমেলা হয়। আবার নতুন হয়েছে মৎস্য উৎসব / খাদ্য উৎসব ইত্যাদি।আমি আর পাভেল কিছুদিন আগে আগে ঘুরে এলাম খাদ্য উৎসবে - ব্যাম্বো বিরিয়ানি খেলাম - খুব ভালো হয়নি - আমি অবশ্য একটা ভেটকি মাছের পাতুরি খেলাম - ১০০ টাকায় এক পিস্। আগে আমাদের সুভাষ ময়দানে যাত্রাপালা হতো। মা আর ঘোষ কাকিমা গিয়েছিলো দেখতে যতদূর মনে পড়ে । গোটা রাত জুড়ে চলতো যাত্রা পালা। রাতের খাবার খেয়ে অল্প কিছু চিরে মুড়ি নিয়ে লোকে যাত্রা দেখতে বসতো - এখন অবশ্য হয় না মনে হয়। তবে কলকাতায় এখনো থিয়েটার হয়। অনেক মঞ্চ আছে যেখানে যে ভালো নাটক থিয়েটার হয়। আমার বৌ এর বাড়ি একদম উত্তর কলকাতার মাঝে। ভালো ভালো অভিনেতা তো এই যাত্রা থিয়েটার করেই উঠলো।

আগে আমি অবশ্য সিরিয়াল দেখতাম না - কিন্তু রানী রাসমণি সিরিয়াল টি কিন্তু বেশ হচ্ছে। এইধরণের পিরিয়ডিক ড্রামায় অনেকসময় ঘটনা অতিরঞ্জিত করা হয় কিংবা মূল ঘটনা থেকে সরে যায়। এখানে কিন্তু সেরকমটা হচ্ছেনা। আসলে সিনেমা হল হাইয়েস্ট ফর্ম অফ আর্ট ( সত্যজিৎ রায় ) . সেখানে গল্প যদি সাহিত্য থেকে আসে বা কোনো ঐতিহাসিক সত্যি ঘটনা থেকে আসে তাহলে পরিচালকের কাজ অনেক কমে যায়। আমরা দুজনেই বেশ দেখি। বিশেষ করে রামকৃষ্ণের অভিনয় করছে যে ছেলেটি - তার অভিনয়ে সিরিয়াল টি আরো প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।




[৩]



আসলে যাত্রা/নাটক/থিয়েটার /সিনেমা যেকোনো মাধ্যমেই মূল হচ্ছে গল্প আর সংলাপ। সবসময় বিদেশে শুটিং - দামি কস্টিউম পরে নাচ এর দরকার হয় না। গল্পটা বলতে জানা চাই। অন্তত ২-৩ ঘন্টা পর্দার সামনে বসে যেন বিরক্ত না লাগে।


আমি আর মাম দুজনেই সিনেমা ইত্যাদি দেখতে খুব ভালোবাসি। আমি খুব বেশি থিয়েটার দেখিনি। তবে আমার শশুর বাড়ি শ্যামবাজার আর শোভাবাজার এর মাঝখানে হবার কারণে ও অনেক থিয়েটার দেখেছে। তবে কলকাতা খুব পলুটেটেড - আমাদের বারাসাত এর নবপল্লী এলাকা অনেক শান্ত আর কম পলুশন।


মনে পরে আগে যখন আমাদের বাড়ির সামনে মন্ডল কাকুদের বাড়ি হয়নি - তখন ওখানে একটা খেজুর গাছ ছিল। খেজুর গাছে রাতের দিকে হাড়ি বেঁধে দেওয়া হতো আর সারা রাট টুপ্ টুপ্ করে রস হাড়িতে ভরতো। এই রস কিন্তু এখন সকাল সকাল খেয়ে নিতে হবে - গেলাস প্রতি ২ টাকা না ৫ টাকা দাম ছিল। বেশি দেরি করলে আবার সেই রস তাড়ি হয়ে যাবে। এখনো ভদ্র বাড়ির মোর গেলে খেজুরের রস নিশ্চই পাওয়া যাবে।


আমি অনেক খেজুরের রস খেয়েছি - মাম কেও খাইয়েছি। তখন ও আমার সুগার ধরা পড়েনি। কলকাতায় এখন কিন্তু অনেক খাবার দোকান খুলেছে , এই যেমন ধরুন প্যারাডাইস এর বিরিয়ানি। এটা কিন্তু কোনো ফ্রাঞ্চাইজি নয় , ওদের নিজস্য ব্রাঞ্চ। যারা হায়দ্রাবাদে গিয়ে হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি খেতে পারেন নি বা সুযোগ হয় নি তাদের জন্য পারফেক্ট। ওদের বিরিয়ানি টা একটু স্পাইসি হয় - আর সাথে ওরা একটা চাটনি মতো দেয় সেটা বেশ খেতে। টেস্ট একটু ট্যাঙ্গি।


তবে বুড়ো বয়েসে এসব আমরা খাবোনা। বুড়ো বয়স হলো স্মৃতি চারণার সময়। ওই হলুদ বাড়িতে আমার জীবনের অনেক স্মৃতি রয়ে গেছে । ক্লাস ১১ এ কেমিস্ট্রি তে ফেল করবার স্মৃতি - ১২ এর পরীক্ষায় সাংঘাতিক ভাবে ছড়ানোর স্মৃতি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিক্স এ ফার্স্ট ক্লাস পাবার স্মৃতি , আমার ঘরে কাঠের ব্যাট নিয়ে বল পেটানোর স্মৃতি। আমার প্রথম চাকরি - বিয়ে - মনু হবার স্মৃতি। মাম্মার প্রথম হাটবার স্মৃতি। প্রত্যেক তা ইট কাঠ পাথরে - প্রতিটি ধূলিকণায় আমার স্মৃতি রয়ে গেছে। দোতালা হলো - অনেক যত্ন নিয়ে - বাবা আলজাইমারে আক্রান্ত হলেন - প্রত্যেক দিন মায়ের ফোন এলে একটা খারাপ খবর শোনার ভয় - এর স্মৃতি। বাবার মৃত্যু।


ওপরের ইজি চেয়ার টায় বসে সেই সব স্মৃতি রোমন্থন করবো। মাম্মার জন্য উপরে একটা ঘর করা হয়েছিল , তাতে আবার মা খুব শখ করে ছোটাভীম- ওয়ালা ফ্যান লাগায়। বাড়ি করা হলো বটে কিন্তু সেরকম করে থাকা হলো না। খালি দৌড়ে চলেছি। শখ আছে ওটাকে আমার স্টাডি করবো। বইয়ের সংগ্রহ আমার কম নয় - কিন্তু সংরক্ষণ করবার উপায় কম। অবসরের পর ওই ইজি চেয়ার টায় বসে বসে পড়বো। বলে রাখি ওই ইজি চেয়ার তা আসলে আমার দাদুর , প্রায় ১০০ বছর বৈ কম নয়। ওটাকে সাড়িয়ে নতুন করে পালিশ করে আমাদের বাড়িতে মা নিয়ে আসে , বাবা ওটাতে খুব আরাম করে বসতেন।


মাম্মা হয়তো তখন কোনো দূর দেশে পড়াশোনা করতে যাবে - আমাদের ফোন করবে - আমি আর বৌ অধীর হয়ে থাকবো ওর একটা ফোনের জন্য। রোজ খোঁজ খবর নেবো। তবে ছেলে মেয়ে বোরো হয়ে গেলে তাদের ব্যক্তি জীবনে ইন্টারফেয়ার করা উচিত নয়। আমরা বাবা মা এর ভাবনা থাকে এই বুঝি ভুল করলো - এই বুঝি বিপদ হলো। কিন্তু ওদের কে সিদ্ধান্ত নেবার সুযোগ করে দিতে হবে, সারা জীবন তো আমরা থাকবো না। ভুল করুক - আর সেখান থেকে শিখুক। বোরো হোক - মানুষ হোক - এটাই কাম্য।




[৪]


যারা রানী রাসমণি সিরিয়াল দেখছেন তারা জানেন গদাই ঠাকুরের দাদা রামকুমার চট্টোপাধ্যায় এর আর বেশিদিন নেই। এবার তিনি বিদায় নেবেন। মা স্বয়ং নিজে এসে তার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন। মন্দিরের কোনে ওই জবা গাছে যেদিন আর একটিও জবা থাকবেনা সেদিন তিনি বুঝবেন যে এই ধরাধামে তার অন্তিম লগ্ন এসে উপস্থিত হয়েছে।

মৃত্যু যে এক চরম সত্যি। একদিন আমাদের সবাইকে বিদায় নিতে হবে। এই বোধোদয় একেবারে শেষ জীবনে কেন আসে ? তাও যেন মানুষের প্রবৃত্তি থেকে নিস্তার নাই । তাও ক্রোধ , লোভ , মোহ - মাৎসর্য এর থেকে মুক্তি নেই।


ধরুন আমার নিজের দোতলা রয়েছে - বেশ শান্তিতে ছিলাম - হঠাৎ করে দেখলাম পাশের বাড়ির কাকু দোতলা করছে। মনটা কষ্টে ভোরে উঠলো। কুচুটে মনটা বললো এইতো বেশ ভালো ছিলাম - কেন যে আবার দোতলা করলো ? কিংবা পাশের বাড়ির ছেলে কোটি টাকা দিয়ে দুর্মূল্য ফ্লাট কিনলো - এতে যে মনটা কিরকম অশান্তিতে ভোরে যায় সে তো আর বলে বোঝানো যাবে না। আসলে কথাতেই আছে পরের ছেলে পরমানন্দ - যত ভোগে যায় ততই আনন্দ। এইযে অন্যের ছেলে বা মেয়ের উন্নতিতে একটা যন্ত্রনা কাজ করে - যাতে একটা হতাশা বোধ তৈরী হয় - মুখটা ম্লান হয়ে যায় - এটাই মাৎসর্য। অর্থাৎ হিংসে। এইযে পাড়ার মেয়ে দিব্য নিত্যনতুন হোটেল এর ফটো দিচ্ছে - এতে কি আমার হিংসে হচ্ছেনা ? নিজের ক্ষমতা বা যোগ্যতা নেই সেটা বড়ো কথা নয় - কিন্তু পাড়ার ছেলের/মেয়ের সাফল্য -এ যেন নিজের ব্যার্থতা শতগুনে প্রতিভাত হয়। এই দুঃখ আমি রাখি কোথায় ?


আসলে মানুষের ভালো থাকা বা মন্দ থাকা - পুরোটাই মানসিক ব্যাপার। ফ্লাট /গাড়ি /বাড়ি/পদমর্যাদা/আরো শত মাপকাঠি যা দিয়ে মানুষের সাফল্যের বিচার করে সমাজ সেই ধারণা নেহাতই পশ্চিমি। ধার করে গাড়ি/বাড়ি/ফ্লাট ইত্যাদি কেনা এই ধারণা এসেছে মার্কিনি।আমাদের ছোটবেলায় দাদু বলতেন "ধার করে ঘি খেয়ো না". তবে মানুষের প্রয়োজনে ধার নেবার ইতিহাস ভারতবর্ষে কম নয়। স্বয়ং ত্রিপুরার রাজা রানীর কাছে থেকে টাকা ধার নিচ্ছেন -সেইটে দেখবার জন্য প্রথম আলোর কয়েক পাতা পড়লেই চলবে।





[৫]


আমাদের বাড়ির খুব কাছেই ভদ্রবাড়ির বাজার। যখন আমরা প্রথম এসেছি নবপল্লীতে তখন সৃজন পার্কের সবে নামকরণ হয়েছে। দূর দূর শুধু মাঠ দেখা যায়। দু একটা বাড়ি। নতুন উঠেছে। তখন আমি ক্লাস সিক্স। এখন বছর তিরিশ পরে এলাকার বেশ শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে। বিশেষ করে ভদ্রবাড়ির যে বাজারটি ছিল তার অনেক উন্নতি হয়েছে। হ্যা , বারাসাতে এর বড়ো বাজার এর সাথে তুলনা করছিনা। নিতান্তই ছোট।



আমি প্রায় সকাল সকাল উঠে পড়ি। সাড়ে সাতটা পর্যন্ত একটু হাঁটাহাঁটি। তারপর ব্যাগ নিজে সোজা বাজারে। অত সকালে সবসময় পুরো মাছের বাজার বসেনা। কিন্তু আমার রয়েছে অন্য আকর্ষণ। বা দিক করে একটা এক্সিস ব্যাঙ্ক এর এটিএম আছে। একটু এগিয়েই কাকার চায়ের দোকান। বেশ প্রশস্ত জায়গা। সকালে সুন্দর বাতাস বয়। বিভিন্ন মানুষেরা সকালে আসেন , আলোচনা করেন। ইদানিং ভোটের সুবাদে বিজেপি না তৃণমূল , আড্ডা টা ভালোই জমে ওঠে। এক কাপ চা , বুড়ো মতো মানুষটা এগিয়ে দেন , আলাদা করে বলতে হয়না। কিছুক্ষন আড্ডা দিতেই বাজার বেশ সরগরম হয়ে ওঠে।


ভদ্র বাড়ির বাজারের বিশেষত্ব হলো আর কিছু দূরেই এগোলেই প্রত্যন্ত গ্রাম। গ্রামের চাষীরা তাদের জমিতে চাষ করা একদম তাজা সবজি নিয়ে আসেন। কাছেই বাংলাদেশ , তাই সেখান থেকে মাছ আসে। নানারকম মাছ। তবে সোম আর বৃহস্পতিবার আসে না। সেই সময় বর্ডার বন্ধ থাকে। আমি অবশ্য এতো কিছু জানতুম না, মাছওয়ালাদের কাছ থেকেই শোনা।


আমি এবার যখন এলাম সেপ্টেম্বর মাস। কিছুদিন বাদেই বেশ জাকিয়ে শীত পড়লো। শীতের মরসুমে খাওয়া দাওয়া বেশ জমে ওঠে। নতুন সবজি - যেমন ফুলকপি , বাধাকপি, নতুন আলু ইত্যাদি। শীতের মাছ হচ্ছে পারসে আর চারা ভেটকি। অনেকে আবার চারা ভেটকি কি জানেন না। এটা ভেটকি মাছের ছোট সংস্করণ। প্রায় ৩০০-৪০০ গ্রাম ওজনের হয় এক একটা। কাকার চায়ের দোকানের উল্টো দিকে বসে যে মাঝারি উচ্চতার কালো করে লোকটি , তার কাছে পাওয়া যায় প্রায় নিয়মিত , বাংলাদেশ থেকে আসে। পাওয়া যায় কাঁকড়াও। কাঁকড়ার লাল লাল করে ঝোল , টোম্যাটো দিয়ে অপূর্ব স্বাদ।


ভদ্র বাড়ির বাজারে যেহেতু আশেপাশের কৃষকরা বা মাছওয়ালারা সবজি ও মাছ নিয়ে আসেন তাই এগুলি তাজা পাওয়া যায়। বাজারে গিয়ে আমি প্রথমেই কিছু কিনিনা। ঘুরে ফিরে দেখি কি কি পাওয়া যাচ্ছে। প্রথম পাতে ধরুন একটু কচু খাবেন , তা দেখে কিনতে হবে। এক্সিস ব্যাঙ্ক এর এটিএম এর ধরেই একটু এগিয়ে একজন বসেন প্রচুর শাক নিয়ে। বললে নিজে কচু খেয়ে টেস্ট করে তারপর আপনাকে দেবে। ঠিক মতো দেখে না নিলে গলা জ্বলার আশঙ্কা রয়েছে। ওখানেই পেতে পারেন , লাল শাক , লাউ শাক , থানকুনি পাতা , গন্ধরাজ লেবু ইত্যাদি। লেবুর কথায় মনে পড়লো , পাতলা মুসুর ডালের সাথে কিন্তু গন্ধরাজ লেবু লঙ্কা দিয়ে , ঝুড়ি আলুভাজা - দারুন লাগে। কিনতে পারেন লাউ - তাহলে

ভেতরের দিকে বাসুদার দোকানে সুকুমারকে বলুন - চিংড়ি দিতে। চিংড়ি একটু দামি পরে এখানে তবে বাসুদা মাছের কোয়ালিটি বজায় রাখে। কিনতে পারেন কুমড়ো - ওপরে সুন্দর সবুজ রং আর ভেতরে কমলা রং। আলু কুমড়োর ঘন্ট একটু ছোলা ভাজা করে জমে যাবে একঘর।


অনেকে আবার নাক উঁচু। এই বাজার তাদের পছন্দ নয়। তারা সেরা জিনিসটি কিনতে চায়। তা যেকোনো দামেই হোক না কেন। বড়ো বাজারে বাজার করে সেই মজা আছে। তবে ওখানকার বেশিরভাগ মাছ ই চালানি মাছ , দীর্ঘদিন আড়তে থাকে। ফ্রেসনেস টা নষ্ট হয়ে যায়। তাজা মাছের ঝোলের কদর আলাদা। ধরুন আপনি পারসে বা কাতলা মাছ কিনলেন , একদম জ্যান্ত - বেশি ভাজবেন না কিন্তু - অল্প ভেজে তুলে রেখে দিন - এরপর ঝোল করুন , আস্তে করে অল্প ভাজা মাছগুলো ছেড়ে দিন মাছের ঝোলে , নামানোর আগে একটু ধনেপাতা ( দেশি - হাইব্রিড না কিন্তু ) দেখুন মাছের গায়ের স্বাদে , ঝোলের স্বাদ কেমন শতগুনে বেড়ে গেছে।


তবে পাকা ৪-৫ কেজির মাছ আবার আলাদা। সেখানে পাতলা ঝোল না করে কালিয়া করুন। তবে আমি ১-২ কেজির বেশি বড় মাছ পছন্দ করিনা। বেশি পাকা মাছ তেমন ভালো লাগেনা। তবে পাকা মাছের ভেতরে যে মাছের তেল থাকে সেটা বেশ সস্তায় নিয়ে নেই। চালের গুঁড়ো দিয়ে সেই তেলের বড়া অপূর্ব। কি বলছেন ? কোলেস্টরেল ? না না সেই ভয় নেই। বরং ডাক্তাররা এখন বলছেন বেশি করে মাছের তেল খেতে। কারণ মাছের তেলে থাকে অসম্পৃক্ত ফ্যাট। যাতে থাকে ওমেগা - যা শিশু এবং বয়স্কদের মস্তিস্ক বিকাশে সহায়তা করেন।


আমরা এসেছি সেই সেপ্টেম্বর মাসে। তারপরেই জাঁকিয়ে শীত পড়লো। আমরা যখন প্রথম এখানে আসি তখন সামনে মন্ডল কাকুদের বাড়ি ছিল না। শুধু রায় কাকুদের বাড়ি। আর সব জমিগুলো এমনি পড়েছিল। মন্ডল কাকুদের জমিতে ছিল একটা খেজুর গাছ। সারা রাত একটা হাড়ি ঝোলানো থাকতো। খুব ভোরে খেজুরের রস খেতাম তখন। মাম ও খেয়েছে। নলেন গুড়ের মোয়া আর ফুলকপির সিঙ্গারা পাওয়া যেত বৈশাখীতে। তবে ছোটবেলায় শীতকালে যে ফুলকপির সিঙ্গারা পাওয়া যেত তার স্বাদ যেন ভোলা যায় না। সিঙ্গারাটা ভাঙলেই তার ভেতরে একদম গরম গরম আলুর পুরের মধ্যে কিছু ভাজা বাদাম আর ফুলকপি। আহা সে যেন স্বর্গ।


শোনা যায় ১৭৬৬ সালে কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের রাজসভার রাজ-হালুইকর, কলিঙ্গ তথা বর্তমান ওড়িষ্যা থেকে আগত গুণীনাথ হালুইকরের ষষ্ঠপুত্র গিরীধারী হালুইকরের স্ত্রী ধরিত্রী দেবী আবিষ্কার করেছিলেন সিঙ্গাড়া। শাক্ত সাধক, পরবর্তিকালে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি রামপ্রসাদ, স্বয়ং সন্ধ্যাহ্নিক সেরে প্রতিসন্ধ্যায় বসতেন একথালা সিঙ্গাড়া নিয়ে। দোলপূর্ণিমার সন্ধ্যায়, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের দরবার থেকে বাইশটি সুসজ্জিত হস্তী ভেট নিয়ে গিয়েছিলো উমিচাঁদের কাছে - বাইশটি স্বর্ণথালা ভর্তি বাইশশোটি সিঙ্গাড়া।

ভারতীয় খাদ্য হিসেবে সিঙ্গাড়ার সাথে রবার্ট ক্লাইভের প্রথম সাক্ষাৎ হয়, এই মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রেরই সৌজন্যে।

সিঙ্গাড়ার জন্য ইতিহাস স্বীকৃতি দিয়েছে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রকে। নাম ভুলে গেছে তাঁর প্রধান হালুইকরের স্ত্রী ধরিত্রী বেহারার।

ভাষাবিদদের মতে, সমভুজা--> সম্ভোজা--> সাম্ভোসা--> সামোসা।।। এই মুখরোচক খাদ‍্যটি বাঙালি / অবাঙালি সবারই প্রিয়। এক এক জায়গায় ভিন্ন নামে পরিচিত। কোথাও সামোসা ... কোথাও আবার সিঙারা।


মা ছোটবেলায় একটা কবিতা বলতেন -


“ সিঙ্গারা রে সিঙ্গারা - তোর যে দেখি শিং খাড়া ।

গাটা বেজায় খসখসে - হাঁটুর উপর ওঠ বসে ।।

ফাটিয়ে দিলে তোর ভুরি - জড় মজাদার তরকারি ।।”



তবে হ্যা , আগে মিষ্টি আনতে কলোনি মোড় যেতে হতো , কিন্তু এখন আর কলোনি মোড় যেতে হয়না। বিকাশ কাকুর দোকানের পাশেই লক্ষী মিষ্টান্ন ভান্ডার। খুব ভালো রসগোল্লা আর লেডিকেনি পাওয়া যায় এই দোকানে। রসগোল্লা তো নবীন চন্দ্র দাস এর আবিষ্কার , কিন্তু তার আগে ভীম নাগ আবিষ্কার করেন লেডিকেনি। বাংলার বড়লাট তখন লর্ড ক্যানিং আর তারই স্ত্রীর জন্মদিনে বানাতে হবে নতুন মিষ্টি। ফরমান করলেন বড়লাট স্বয়ং। সেই সুবাদে বানানো হলো নতুন মিষ্টি ভাজা গোল , রসে ভরপুর। লেডি ক্যানিং এর নামানুসারে মিষ্টির নামকরণ হলো লেডিকেনি।


লক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে , বিকেলে ছয়টার মধ্যে সিঙ্গারা শেষ হয়ে যায়। বেশ বানায় কিন্তু। আমি প্রায়ই আমার মায়ের জন্য মেয়ের জন্য নিয়ে আসি। তবে আমি সবচেয়ে ভালো সিঙ্গারা খেয়েছি উত্তর কলকাতার ভবতারিণীতে। খুব ছোট সাইজের সিঙ্গারা , উপরের আস্তরণ খুব পাতলা , ভেতরে গরম গরম আলুর পুর। এরকম পুর মাখা সোজা কথা নয়। গোটা দশ না খেলে পেট ভোরে , কিন্তু মন ভোরে কি ?



ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মদিন গেল কিছুদিন আগে । ঠাকুর ভালবাসতেন যদু ময়রার হাতের ক্ষীরের সন্দেশ আর জিলিপি খেতে । ৬১ এর কেশব চন্দ্র স্ট্রীট এ এখনও যদু ময়রার সেই দোকান আছে । কিন্তু সেতো গেল কলকাতার কথা । কামারপুকুরে সবচেয়ে বিখ্যাত মিষ্টি ছিল সাদা বোঁদে । আতপ চালের গুঁড়ো আর রমার বেসন (রম্ভা কলাইয়ের বেসন) মিশিয়ে তৈরি হয় ঘন তরল মিশ্রণ। তা ঝাঁঝরিতে ফেলে ছোট ছোট দানা করে ভেজে নেওয়া হয় ঘিয়ে।তার পর চিনির রসে ডুবিয়ে তুলে নিলেই তৈরি সাদা বোঁদে। ‘‘এক মাস পর্যন্ত রেখে দেওয়া যায় এই বোঁদে। তবে ঢেঁকিতে গুঁড়ো করা চাল না হলে স্বাদ হয় না,’’


ঠাকুরের জিলিপি প্রীতির কথা জানেনা এরকম কেউ নেই । তবে সেকথা হবে আরেকদিন ।





[৬]


আর একটু পরেই বেলা পরে যাবে। বৈশাখ মাসেই সূর্যদেবের চোখরাঙানি বেড়েই চলেছে। আমি ঘুম থেকে একটু সকাল সকালই উঠি। প্রথম প্রহর - মানে সকাল ছয়টা থেকে নয়টা এর মধ্যেই সব প্রাত্যহিক কাজ সারার চেষ্টা করি। সকাল সকাল বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি , বেশি দূরে নয় , ভদ্রবাড়ির বাজার।

সৃজন পার্ক থেকে পোনে এক মাইল মতো দূরত্ব তাই হেঁটেই মেরে দেই। সে প্ৰাতঃভ্ৰমণ ও হলো আবার বাজার করাও হলো। প্রথম কাজ হলো বাজারটা একবার ভালো করে ঘুরে দেখা। কোথায় কোনটা সস্তায় ভালো বিক্রিবাটা হচ্ছে সেটা একবার দ্রুত চোখ বুলিয়ে নেওয়া। ধরুন একই তেলাপিয়া মাছ আপনি ডানদিকের ফুটপাতে বসা দোকানির কাছ থেকে ১৫০ টাকা কেজিতে পাবেন আবার সেই মাছ ই যদি ভিতরে বাসুদার দোকান থেকে কেনেন তাহলে ১৮০ টাকা কেজি। তবে সে বলে তার মাছটি সতেজ , বিশুদ্ধ দেশি তেলাপিয়া , লায়লনটিকা নয়। ১৩০ এর মাছ সেও দিতে পারে। তবে এটা ঠিক বাসুদা একটু বেশি দর নিলেও মাছ খানি বেশ দেয়।

তবে শুধু তো মাছ কিনলেই হবে না , কিনতে হবে শাক সবজিও। তাই বাজারের বাঁদিকে যেখানে ল্যাম্পপোস্টের নিচে মুরগি কাটে , তার থেকে দুহাত এগিয়ে গেলেই , রোগা পৌর এক জন প্রচুর সবজি নিয়ে বসে। সে ভারী চমৎকার লোক। তার কাছে কিছু কিনে আমি ঠকিনি। আমার গিন্নি আবার কচু খেতে ও খাওয়াতে খুব ভালোবাসে। দুধ মানকচু হলো গিয়ে সবচেয়ে সেরা। কিন্তু সে কচু কি আর রোজ পাওয়া যায়। সব্জিবাবু আমাকে সেই মানকচু নিজে কেটে , খেয়ে পরীক্ষা করে তবে দেন। তাই খারাপ কচু কোনোদিন পাইনি তার কাছে থেকে।


যাইহোক বাজারখানি ঘুরে , হালকা চালে একটু এগিয়ে বাঁদিকে ঢুকে পড়লাম চায়ের দোকান এ। সামনে চায়ের দোকান , পেছনে বাড়ি। বয়স্ক একজন চা বানান , হাতে হাতে এগিয়ে দেন গরম চায়ের কাপ , অন্য একজন - সম্ভবত তিনিই মালিক - পৌঢ় - ক্যাশ বাক্স সামলান। নিয়মিত যাই বলে আর বাড়তি কথা বলতে হয়না। আসবার সাথে সাথেই চলে আসে এক কাপ গরম গরম দুধ চা। হ্যা চিনি সহ। ডায়াবেটিস থাকার নিদারুন যন্ত্রনা কে উপেক্ষা করে আমি নিজেই নিজেকে কিছু কিছু বিষয়ে ছাড় দিই । তার মধ্যে এই দুধ চা একটি।


চায়ের দোকান বলতে যেরকম একটা গুমটি বোঝায় - এটা ঠিক সেরকম নয়। প্রায় ১২/১৪ এর প্রশস্ত ঘর। পেছনে খোলা দরজা দিয়ে ভেতরের বাসা খানা বেশ স্পষ্ট দেখা যায়। বৈশাখ মাসে সকালের দিকে বেশ ভালোই মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। সেরকম গরম তো লাগছেই না , বরং বেশ সুখানুভূতি হচ্ছে। চারপাশে বেঞ্চ। নিয়মিত কিছু মানুষের দর্শন পাওয়া যায়। শুরু করি একটা ধরতাই দিয়ে। নির্বাচনেএর বাজারে , " কি দাদা কি বুঝছেন? " এইটুকু বললেই হলো। কিছুক্ষনের মধ্যে আলোচনা বেশ জমে ওঠে। মনটা ভালো হয়ে যায়। জানি মানুষ সব জায়গায় - সব বিষয়ে আলোচনা করতে উৎসাহী হয়না। কিন্তু ঠান্ডা শীতল ঘরে - রিপোর্টিং ভিপি এর ঠান্ডা শীতল কণ্ঠস্বরের থেকে এ অনেকগুণে ভালো। এতে প্রাণের পরশ রয়েছে।

আড্ডা জমে উঠলেও বেশিক্ষন বসা যায় না। এগিয়ে গেলুম সেই বাসুদার দোকানে , দেখি কি মাছ পাওয়া যায়। অনেক দিন পর বড়ো বড়ো কই মাছ দেখে মনটা আনন্দে নেচে উঠলো। কই মাছ আজকাল আর বেশি দেখা যায় না। সব মাছ কি বিদেশে চালান হয়ে যাচ্ছে নাকি ? ওরা পাউন্ড/ডলার দিয়ে বড়ো মাছগুলো নিয়ে যায়। বাংলাদেশেও শুনি ইংলিশ মাছের নাকি দারুন দাম। বেশিরভাগই বিদেশে চালান হয়ে যায়। সে যাক। সুকুমার হলো বাসুদার কর্মচারী। সে ব্যাটা উৎসাহ নিয়ে ড্রাম খুলে দেখালে। মাছের সাইজও বড়ো কিন্তু হাইব্রিড না তো ? হাইব্রিড কই খুব বড়ো হয় কিন্তু স্বাদ থাকে না। বাসুদা নিশ্চিত করলে -যে এটা দেশি কই - ভেতরে ডিম্ আছে। চিন্তার কিছু নেই। আমি অনেক মাছের ডিম্ খেয়েছি কিন্তু কচই মাছের ডিমের মতো এতো সুস্বাদু মাছের ডিম্ আমি কখনো খাইনি। ডিমওয়ালা কই গুলোর বুকের দিকটা হলুদ থাকে , তাতে পাকা মাছ কিনা বোঝা যায়। কই মাছ রান্না করে আমার মা। তেল কই। সে স্বাদ ভোলাবার নয়। এমন অপূর্ব তেল কই পৃথিবীর আর কেউ কোথাও বানাই নি , বানাতে পারবেও না। এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।


পাশেই আবার চিকেন। চিকেন বিক্রি করে টিনটিন। হ্যা ও নিজেই আমায় বললো।

ওর অবশ্য আসল নাম সঞ্জু। কিন্তু সবাই ওকে টিনটিন বলে ডাকে। প্রায় ৫ ফিট ১১ ইঞ্চি লম্বা , খুব ফর্সা রোগা মতো ছেলে - হাসলে বেশ মিষ্টি দেখায়। আমি আবার তাকে টিনটিন এর ছবি দেখালাম। এর আগে সে টিনটিন এর ছবি দেখেনি কখনো। ছোট বেলা আমাদের টিনটিন , হার্জ , কুট্টুস সব আনন্দ প্রকাশনী থেকে পেতাম। আর ছিল এস্টেরিক্স ও ওবেলিক্স। এদের মজাদার কাহিনীতে বুঁদ হয়ে থাকতাম ছোটবেলায়। এছাড়াও বাংলায় নন্টেফন্টে , হাঁদাভোঁদা ইত্যাদি কত পড়েছি।নারায়ণ দেবনাথ এর এখন অনেক বয়েস।

দুঃখের বিষয় আমাদের সরকার বাহাদুরের ওনার প্রতিভার স্বীকৃতি দিতে বড়ো দেরি করে ফেললো। এই কিছু দিন হলো উনি পদ্মশ্রী পেয়েছেন।


আস্তে আস্তে সূর্যদেব উপরে উঠতে শুরু করেছেন। সকালের প্রাতরাশের বন্দোবস্তটিও করে নিয়ে যাই। ডানদিকে আছে , পেটাই পরোটার দোকান। দাদা - বৌদি দুজনে মিলে চালান। দারুন খেতে হয় এই পেটাই পরোটা। আমি অবশ্য মজা করে ধোলাই পরোটা বলি। "মাম্মা ধোলাই খাবি আয় " শুনলেই আমার কন্যা ছুটে চলে আসে। সাথে মাঝে মাঝে থাকে লক্ষী ভান্ডারের লেডিকেনি। অসাধারণ খেতে। একবার নিশ্চই খেয়ে দেখবেন।


এক প্রহর - শেষ হতে হতেই আবার কাজে বসে যাই। কিছু পরেই রান্না ঘর থেকে কই মাছের ঝোলের ঘ্রান আসে। আহা - বাড়ী নয় - এ যে স্বর্গ।






নীড়বাসনা  বৈশাখ ১৪২৯