• সৌরভ ব্যানার্জী

ধারাবাহিক বড় গল্প - আকাশের বুকে মেঘ





( আগের পর্বের লিঙ্ক )


: অন্তিম পর্ব ::

:: অ ::

আকাশ মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে , ছোট থেকেই পড়াশুনো তে বেশ ভাল । উচ্চমাধ্যমিক পাস করে সে ভর্তি হল বিশ্বভারতীর পদার্থ বিভাগে । এই অব্দি তো বেশ চলছিল হঠাৎ সে তার একটি জুনিয়ার মেয়ের প্রেমে পড়ল সেও বেশ হল গোলমাল টা হল সেই মেয়েটি আকাশের সাথে প্রেম করার অভিনয় করে গেল টানা চার বছর ধরে এবং শেষ অব্দি চলে যাওয়ার সময় আকাশকে মানসিক ভাবে দেউলিয়া করে দিয়ে গেল । ঠিক এই সময় আকাশের জীবনে মেঘনার প্রবেশ । ছাত্রী ও শিক্ষকের চিরাচরিত প্রচলিত সম্পর্ক কে ছাড়িয়ে দুজনের মধ্যে একটি সুন্দর বন্ধুত্ব গড়ে উঠল । আমার মনে হয় আকাশের সেই মুহুর্তে আবার উঠে দাঁড়ানোর পিছনে একমাত্র মেঘনারই অবদান। সে বেশ কথা এইবারে এই বন্ধুত্ব অন্যদিকে মোড় নেওয়ার কথা... হয়ত তা নিয়েও নিত । সেইখানে অসুবিধে করল আকাশের উদাসীনতা এবং মেঘনার বাড়ির কিছু সদস্যের করা কিছু কটূক্তি । একান্নবর্তী পরিবারে আগে যা খুব হত। এইসময় আকাশ ভুলে গেল যে সম্পর্কটা তে সব থেকে ইমর্ট্যান্ট তার নিজের ও মেঘনার মত । একরাশ মনখারাপ ও তার থেকেও বেশি অভিমান নিয়ে আকাশ বি. এড. করার মাঝপথেই সারাজীবনের জন্য শান্তিনিকেতন ছাড়ল কিন্তু এইটুকু বুঝতে পারল না যে অন্যের কথার উপরে রাগ করে সে যে এই পাগলামি করল তাতে করে মেঘনা বেচারার জীবনে আর আলো বলে কিছুই থাকল না। একটা ষোল বছরের মেয়ে আজীবনের মত প্রাণখুলে হাসতে ভুলে গেল । একটা সাদা কাগজের মত মনে আজীবনের জন্যে একটা নাম লেখা হয়ে গেল , যে নাম কানে গেলে আজকেও মেঘনার মনের কোণে মেঘ উড়ে আসে । কখনও বর্ষার ঘন কালো মেঘ কখনও বা শরতের পেঁজা তুলোর মত মেঘ ।।

কালের নিয়মে মেঘনা বুকের মধ্যে একরাশ আকাশ নিয়েই বড় হল , বিয়ে করল বা হয় তো বাধ্য হল এবংজৈবিক চাহিদার ফলে মা হল কিন্তু আকাশকে একদিনের জন্যেও ভুলতে পারল না। ওইদিকে আকাশের জীবনে যিনি স্ত্রী হয়ে এলেন তাঁর সাথেও আকাশের সংসার টিকল না । ঠিক এই সময় প্রায় ১৯ বছর পরে আকাশকে খুঁজে পেল মেঘনা এই সোশ্যাল মিডিয়াতেই আজ থেকে প্রায় বছর খানেক আগে ... তারপর

২০১৯ জানুয়ারি মাসের গোড়ার দিকের কথা , দিনটা ছিল শনিবার আকাশের শরীর টা আবার বিগড়েছে । হালকা একটা একটা জ্বর নিয়েই আকাশ ক্লাস টুয়েলভের ব্যাচটাকে পড়িয়ে উঠে দেখে মোবাইলে মেসেজ মেঘনার , মিনিট দুই আগে এসেছে ।

" ১০ মিনিট সময় হবে ? হলে ফোন কর ।আমার মন ভাল নেই কত দিন কথা বলিনি তোমার সাথে ! "

আজকে শনিবার মেঘনার বাড়ির কাজে ব্যস্ত থাকার কথা, আকাশের হাতেও বেশি সময় নেই । আধঘন্টার মধ্যে আবার পরের ব্যাচ আসবে পড়তে । আকাশ সরাসরি ফোন করে মেঘনার মোবাইলে ...

- বলুন ম্যাডাম হঠাৎ তলব!

- কোথায় এখন ??

- দুর্গাপুরে নিজের ফ্ল্যাটে কোথায় আর যাব বল ? তোমার বাড়িতে তো আর ডাকলে না কোনদিন ?

- বাব্বা আজকে তো মুড খুব ভাল আছে মনে হচ্ছে ।এই কি ব্যাপার গো ? কোন সুন্দরী ছাত্রীকে এক্ষুনি পড়িয়ে উঠলে মনে হচ্ছে ?

- হিংসে হচ্ছে ??

- বয়ে গেছে ...

- সত্যিই বয়ে গেছে ??

- হুমম একদম কারণ আমি জানি আমার জায়গা কেউ ...আর তুমি কারুর দিকে তাকাও ? আমার দিকে তাকিয়েছিলে কোন দিন ? নাহ্ এত কথা বলব না ... ও তুমি বুঝবে না । আচ্ছা শরীর কেমন গো তোমার ?

- সকাল থেকে একটু জ্বর আছে বলে শুনেছিলাম যেন ।

- উফফ ভগবান আমাকে তুমি মেরে ফেল ...তোমার এই দশা আর দেখতে পারছি না আমি ।

- কেন গো ?? কি হল ?

- একটু সুস্থ থাকতে পার না ? জান না তুমি সুস্থ থাকলেই আমার শান্তি । আর কিছুই দরকার নেই আমার ।

- তোমার কি ধারণা আমি ইচ্ছে করে অসুস্থ হই তোমাকে জ্বালানোর জন্যে ।

- জানি না চুপ কর ।

- বেশ একবারে চুপ করে যাব এইবারে ।

- আবার !! প্লিস ।

- আচ্ছা বাদ দাও ঐসব কথা বল তোমার কথা ।

- আমি পরের সপ্তাহে যাব বোলপুরে ।১২ তারিখ দুপুরে ফ্লাইট । এই তুমি বোলপুরে আস ?

- নাহ আসি না । কে আছে বোলপুরে আমার ?

- সেই তো আমি আর কে বল ??

- এটা তুমি খুব ভাল জান মেঘনা তুমি কে আমার ? বোলপুরে এলে কি হবে ?

- দয়া করে একদিন দেখা করলে আমি খুশি হব । যতটুকু সময় দেবে তুমি তাতেই আমি খুশি । আসবে ? যদি আস তাহলে আমরা একবার সিংহ সদনের পাশের ছাতা টায় বসে আড্ডা মারব ...কি গো বল কিছু ??

- দেখা করবে ? আচ্ছা এইটাই যদি শেষ দেখা হয় ?

- আবার !! কি পাও এগুলো বলে ?

- কিচ্ছু পাই না ।

- তাহলে বল কেন ? মরে যাওয়া টা খুব বাহাদুরির কাজ বুঝি ?

- বেশ বলব না একদম চুপ করে থাকব এইবারে!

- আবার ! কি গো তুমি ? প্লিস !! দ্যাখ কোন দিন তো তোমার কাছে কিছু চাই নি আমি আজকে শুধু এইটুকু চাইছি ... এইটুকু তুমি আমাকে না দিয়ে পারবে বল ?

আকাশ চুপ করেই থাকে । মেঘনা আবার বলে ...

- কি গো ইচ্ছা নেই আমার সাথে দেখা করার ? আচ্ছা তাহলে আর কোনদিন বলব না । তুমি শুধু সুস্থ থেক তাহলেই হবে।

অনেক কাল পরে আজকে আকাশের মন খারাপের মেঘ কেটে যাচ্ছে তার আকাশে ঝলমলে রোদ কেন যে এত ভাল লাগছে শুধু এই টুকু কথা !!

আকাশ ধীরে সুস্থে বেশ কিছুটা সময় নিয়ে মেঘনা কে বলে ...

- যাব মেঘনা নিশ্চয় যাব । একদিন নিশ্চয় দেখা করে আসব তোমার সাথে ।

মেঘনার চোখে হু হু করে জল চলে এল ! এত জল কোথায় ছিল তার ? গলাটা ধরে আসছে মেঘনার । কোনরকমে ঢোঁক গিলে আকাশকে সে বলে ...

- সত্যি বলছ ?

- আমি মিথ্যে কথা খুব একটা বলি না মেঘনা অন্তত তোমাকে তো কোনদিন বলিনি ...

- কবে ?

- সেটা পরে ঠিক করি । যে কোন শনি বা রবিবার হতে পারে । গাড়িতে ঘন্টা দেড়েকের তো রাস্তা । একি মেঘনা তুমি কাঁদছ কেন ? কি হল তোমার ?

- সেইটুকু যদি বুঝতে তাহলে আমাকে আজকের দিনটা দেখতে হত না আকাশ । একবার তোমাকে দেখতে পাওয়ার জন্যে এত আকুলি বিকুলি করতে হত না আমাকে ... রাখলাম এখন ।

:: আ::

২০১৯ এর জানুয়ারির মাঝামাঝিরবিবার , সকাল বেলা আকাশকে অনলাইন পেয়ে মেঘনা লিখল ...

- কবে আসবে বোলপুরে বললে কই ?

- আসতে হবেই ।

- হবে না... !! কিচ্ছু করতে হবে না ।যাও আড়ি ...

- ব্যাস অমনি রাগ হয়ে গেল ।

- সেইটাই কি স্বাভাবিক নয় ?

- কি জানি ?

- তা কেন জানবে তুমি ? আমার কিসে খুশি তা কেন জানবে বল ?

- ওমা তা কেন জানব না ?

- কচু জান তুমি ! কিচ্ছু বোঝ নি আমায় কোন দিন ।

- বেশ বুঝনি । তুমি বুঝেছিলে ?

- না বুঝিনি বুঝলে তোমাকে যেতে দিতাম ? আঁকড়ে ধরে রেখে দিতাম ।

- অথচ দ্যাখ কতবার বলার চেষ্টা করেছি আমি !!

- বেশ করেছেন এইবারে দয়া করে একবার দেখা দিন ।

- দেখা করলে সত্যি তুমি খুশি হবে ?

- হ্যাঁ হব ... এইটাও মুখে বলে দিতে হবে ।

- তারপর ??

- তারপর আর কি ... মন খুলে কথা বলব অনেকদিন পরে ।

- তারপর ?

- আশা করব তোমার আমার এই বন্ধুত্বের সেতু আমাদের নতুন করে বাঁচতে রসদ দেবে আর এই সেতু কোন দিন ভেঙে পড়বে না ।

- আমার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলেও না ।

- জানি না যাও ... কথা বলব না । একটা জঘন্য লোক তুমি !!

- হা হাহা হা হা ...

- হাসবে না একদম । আমি খুব রেগে যাচ্ছি কিন্তু !

- যাঃ হাসাও চলবে না ! এত শাস্তি দিলে কি করে চলে মেঘনা ?

- চলতে হবে না । কিচ্ছু চলতে হবে না । আমি চলে যাচ্ছি আগামী ৩১ তারিখে । আর কোনদিন আসবো না বোলপুরে।

- উরিবাবা এত রাগ !

- রাগ না অভিমান , এত বছরের জমানো অভিমান । এই অভিমান তুমি কি বুঝবে ?

- নাহ সেই তো আমি আর কি বুঝব ? আচ্ছা ওইটুকু সময় আমাকে দেখলেই তুমি খুশি ??

- হ্যাঁ খুশি । গোটা তুমিটাকে পাওয়ার আশা আমি সেই ছোটবেলায় করতাম । এখন এই তুমি টা শুধু সুস্থ থাক আর কিছু চাওয়ার নেই আমার । সবটা পাওয়ার আশা আমি সত্যি করি না গো ।

- এখন সেই চাহিদা যদি আমার থাকে মেঘনা তাহলে ... থাক ছি ছি এ কি বলছি আমি !!

- না ছি ছি কেন বলছ ? তোমার চাওয়ার রাস্তাটা অনেক পরিষ্কার আকাশ ... তাই চাহিদাটাও বাড়তে বাড়তে আকাশে উড়তে পারে । আর আমার সব পথ বন্ধ । তাই চাহিদা এলেও তাকে বার বার গলা টিপে মারতে হয় আমাকে ।

- সত্যি এটা হয় তোমার !

- তোমায় মিথ্যে বলে কি পাব আমি ?

-বেশ আগামী ২৭ তারিখ আমার একটা সুযোগ আছে বোলপুর যাওয়ার । তুমি ওইদিন আসতে পারবে ?

- কখন আসবে ?

- স্কুলে একটা মিটিং আছে ।মিটিং সেরে এই ১১ টা নাগাদ রওনা দেব । এরাউন্ড সাড়ে বারটা পৌঁছাব বোলপুরে। একটা নাগাদ তুমি চলে এস উত্তরায়নের সামনে ।

- তুমি কি বাসে আসবে ?

-না গো নিজের গাড়িতে ?

- ড্রাইভার আনবে তো ?

- নো ... নিজেই চালিয়ে যাব ।

- এতটা রাস্তা !! আমার টেনশন হবে খুব !

- এই রাস্তা টা আমার কাছে কোন দূরত্ব নয় মেঘনা । সুস্থ থাকলে আমি একাই মাঝে মাঝে লং ড্রাইভে বেরিয়ে পড়ি ।

- বেশ করেন ।ওইদিন আপনি দয়া করে তাড়াতাড়ি এসে আমায় উদ্ধার করবেন স্যার ।

- হা হা হা হা হা ... বেশ আসব ।

- হাসছ কেন বোকার মত ?

- বেশ হাসব না !! এখন হাসিও বারণ!!

- হুমম... একদম হাসবে না আমার গা জ্বলে যাচ্ছে ।

- কেন ?

- সে আপনার বোঝার ক্ষমতা নেই... স্যার ।

- বেশ তাই । আমি হেরে গেলাম তুমি জিতলে খুশি ।

- না খুশি না ... কেন জিতিয়ে দেবে আমাকে ? হারিয়ে

দিতে পার না গো হারা করে ??

- আচ্ছা হারতে হারতেও ঠিক একদিন জিতে যাব আমি ।

- উফফ এই কথাগুলোই তো পাগল করছিল আমাকে ।এই শোন ওইদিন তুমি শুধু কথা বলে যাবে আর আমি চুপচাপ বসে থেকে তোমার কথা শুনে যাব ।

- বেশ তাই হবে... তবে তুমি চুপচাপ বসতে পারবে ?? কি জানি ?

- আবার !!

মাঝের দিনগুলো ঝড়ের মত কেটে গেল আকাশের । ২৭ তারিখ সকালটা হল তার খুব সুন্দর মনে । স্নান করে ব্রেকফাস্ট সেরে এসে ঠিক সময়ে স্কুলে গেল । আজকে মিটিং টাও শুরু হল একদম ঘড়ি ধরে ...এবং শেষ হল প্রায় মিনিট ১৫ আগে !! রাস্তাও আজকে বেশ ফাঁকা ইলাম বাজার থেকে বোলপুরের দিকে যখন বাঁক নিল আকাশ ঘড়িতে ১২ টা ৩০ । কালিসায়রের পাশ দিয়ে এগিয়ে বিনয় ভবন কে ডান দিকে ফেলে এগুতেই শিক্ষাভবন । মনটা কেমন করে উঠতেই গাড়িটা বাঁ দিকে ঘোরাল আকাশ ! শিক্ষাভবন অফিস পের হতেই একটা বড় গেট ও সিকিউরিটি । আকাশ এক ঝলকে দূরের ফিজিক্স ডিপার্ট মেন্টটা দেখল ... একটা মিশ্র অনুভূতির দীর্ঘশ্বাস ফেলল ও গাড়িটা ব্যাক করে নিল । নাট্যঘর পেরিয়ে ভিড় টা বেশ বেশি , আকাশ সাবধানী হাতে গাড়ির গিয়ার নামিয়ে ড্রাইভ করে আর একটু এগুতেই বুকের মধ্যে খুশির উচ্ছাস !! আকাশী শাড়িতে মেঘনা ... ঠিক উত্তরায়নের গেটের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে আছে । উত্তরায়নের পাশেই এখন একটা বড় গাড়ি রাখার জায়গা হয়েছে । আকাশ সেইখানেই গাড়িটা রাখে , লক করে ও গাড়ি থেকে নেমে আসে ... বেড়ার কাছে আসতেই দেখে মেঘনা খুব ধীর পায়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে । আকাশও এগিয়ে যায় । দুজনে কাছাকাছি আসতেই আকাশের ভিতর থেকে অনেক দিন পরে একটা ঝকঝকে হাসি বেরিয়ে আসে । মেঘনা কিন্তু কোন কথা বলে না ... একদৃষ্টিতে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে। ৩০ সেকেন্ড পরে সে প্রায় না শুনতে পাওয়ার মত স্বরে আকাশকে বলে ....

- আমাকে একা ফেলে আপনি কোথায় চলে গেছিলেন বলুন তো ??

:: ই ::

আকাশ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মেঘনার দিকে । কুড়ি বছর ! কুড়ি বছর পরে সেই দুটি চোখ যে দুটি চোখ কি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত কখন আসবে আকাশ ? তখনকার সেই তন্বী টি বয়েসের কারণে একটু ভারী চেহারার অধিকারিণী হয়েছে তাতে আরো মিষ্টি দেখাচ্ছে মেঘনা কে । আকাশের বুক থেকে কোথাও একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল ।

- কি দেখছেন অমন করে ?

- তোমাকে মেঘনা ।

- দেখেন নি যেন কোনদিন ?

- না তা দেখেছি কিন্তু এখন তুমি অনেক ব্যক্তিত্বময়ী মেঘনা । আগের মত আর ছোট টি নেই ।

- আপনিও কি সেই আগের আপনি আছেন ? কত্ত পাল্টে গেছেন বলুন তো ?

- তুমি আবার কবে থেকে আমায় আপনি বলতে শুরু করলে ?

- আপনিই তো বলতাম ।

- বলতে কিন্তু আপনি টা তো বাদ দেওয়া হয়েছিল না বল ?

- হয়েছিল বুঝি ?

আকাশ হেসে ফেলে ...

- দুষ্টুমি করছ ... বেশ কর ।

- হাসবে না একদম ... গা জ্বলে যাচ্ছে আমার ।

- কেন মেঘনা ? গা জ্বলে যাওয়ার কি হল শুনি ??

- সে আপনি কি বুঝবেন ? আপনার বোঝার ইচ্ছে থাকলে সেই সময়েই বুঝতেন ।

আকাশ আর কথা বলে না । মেঘনাকে সঙ্গে নিয়ে সাবধানে রাস্তা পার হয় ।

- কোথায় যাবে ?

- যেখানে আপনি নিয়ে যাবেন ...

- আজকেও এত ভরসা আমার উপরে ?

- সেদিনও ছিল , আজকেও আছে আর আজীবন থাকবে ।

- বেশ চলো তাহলে একটু সিংহ সদনের পাশের ছাতাটা তে ... বসি ।

এই দেড়টা দুটো সময় টা একটা অড টাইম । টুরিস্ট দের ভীড় এইসময় একটু কম থাকে । একটা ছাতায় দুজনে বসলে । বেশ কিছুক্ষণ কারুর মুখেই কোন কথা নেই । আকাশই প্রথম কথা বললে ...

- বল কেমন আছ ?

- কেমন দেখছ ?

- খুব ভাল ... সুখী একজন ঘরণী , দায়িত্বশীল মা এছাড়া ও বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে তোমাকে ।

- ওইটা তো বাইরে ... ভিতর টা বোধহয় কেউ দেখতে পায় না ... তুমিও পেলে না ।

মনে মনে আকাশ বলে

- ভেতরের কথা ভেতরেই যে থেকে যায় মেঘনা , বাইরে আসে না যে ! আর তুমিও কি পাও আমার ক্ষত গুলো দেখতে ?? যে ক্ষত গুলোর দায় অবশ্যই আমার কিন্তু সেইগুলো দিন দিন বিষিয়ে উঠছে এইটা আমি বেশ বুঝতে পারি ।

আবার একটা নিস্তব্ধতা ... কিছু পরে মেঘনাই বলে ...

- কি ভাবছ ??

- সেইরকম কিছু ভাবিনি মেঘনা । অবশ্য আমার এই মুহুর্তে সেইরকম ভাবনা চিন্তা করার অবকাশ ও নেই । শারীরিক সমস্যা আমাকে এতটাই বেহাল করে রেখেছে যে আমি কিছু নতুন করে ভাবতেও পারি না ...আর।

মেঘনা একবার আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকায় , এত কাছে আকাশ ! তবু সে খুশি হতে পারছে কই ? আকাশ কে দেখে তার বড্ড মায়া হচ্ছে । এই তার ভালবাসার মানুষ অথচ আজকে বিধাতার উপহাসে ... এর জীবনে এত টুকু আদর যত্ন নেই । কাঁটার উপরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আকাশ যেন বড্ড ক্লান্ত । মেঘনা প্রাণপণে স্বাভাবিক রাখে নিজেকে ... সে জানে তার এত টুকু চোখের জল আকাশ কে আরো দুর্বল করে দেবে । মেঘনার খুব ইচ্ছে করছে নিজের হাতে রান্না করে সে আকাশে কে খুব যত্ন করে খাইয়ে দেয়.. কিন্তু উপায় নেই কোন রাস্তা নেই যে আজকে !

নিস্তব্ধতার একটা নিজস্ব ভাষা আছে ... সেই ভাষা নীরবে দুজনের মনের ভিতরেই কি যেন বলে যায় ? কিছু পরে আকাশ আবার বলে ...

- কি গো কিছু বলছ না কেন ?

- কি বলব ?

- সেটা আমি কি জানি বলবে তো তুমি ??

- বলেছি তো এই এত বছর ধরে তুমি শুনতে পাও নি ?

- পেলে কি আর ?

- পেলে কি আর ... বল শেষ কর কথাটা ?

- পেলে কি আর বলতে পারি না ... তোমাকে ?

- সে তো তুমি ইচ্ছে করে বল নি । চলে গেছিলে আমায় একা ফেলে ।

- থাক মেঘনা ওই কথা থাক ... এ বড় গোলমালের কথা ... ওই প্রসঙ্গ বাদ থাক না ।

- বেশ তাই থাক তবে । অন্য কথা বলি আমরা ।

- কেমন লাগছে বল আমায় এত দিন পরে আমায় দেখে ??

মেঘনা মনে মনে বলল ...

' যন্ত্রনা হচ্ছে তো তোমায় দেখে । এত কেন করুন মুখ তোমার ?কেন আমার অধিকার নেই তোমার ক্ষত বিক্ষত বুকে হাত বুলিয়ে দেওয়ার ? '

মুখে বলল ...

- চুল গুলো পেকে গেছে সব বাকি টা সেই আগের মত যার পথ চেয়ে আমি বসে থাকতাম ...

- আর এখন ?

- এখনও থাকি ... সারাজীবন থাকব ... জানি এই অপেক্ষা টাই সার ... তবু থাকি তোমার জন্যে অপেক্ষা করতে আমার আজকেও ভাল লাগে ।

সময় চলে যায় ... কি করে যে দু ঘণ্টা কেটে যায় কে জানে ? ঘড়ি দেখে আকাশ ...

- চলি মেঘনা । সন্ধ্যে হবার আগে দূর্গাপুর পৌঁছতে হবে এই বারে রওনা না হলে দেরি হয়ে যাবে গো ।

- আবার কবে আসবে ?

- জানি না তো !

- এস ... আর হ্যাঁ শোন সুস্থ থেক তুমি ।আমি জানি না কিভাবে থাকবে ? কিন্তু সুস্থ তোমাকে থাকতেই হবে তোমাকে , মনে কর শুধু আমার জন্যেই তোমাকে সুস্থ থাকতে হবে ।

গাড়ি চালানোর সময় আকাশ অন্যমনস্ক হয় না কিন্তু আজকে সে যেন বারবার অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিল তাকে বারবার পিছু ডাকছিল দুটো অনেক কথা বলতে চাওয়া চোখ ।

ইলামবাজার পেরিয়ে বসুধা আসব আসব এই সময় সূর্য্যটা একেবারে পশ্চিমে ঢলে গেল । সেই সোনা গলা আলোতে আকাশ গাড়িটা রাস্তার একধারে দাঁড় করাল একটু গলাটা ভিজিয়ে নেবে বলে । চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিতে দিতে ও একমনে গোধূলির আকাশ দেখতে দেখতে আকাশ ভাবছিল ... কি হল আজকে ? একটা নতুন গল্পের শুরু না সেই পুরনো গল্পের শেষ ? চা শেষ করে ... গাড়িতে উঠতে যাবার আগে হোয়াটস আপে মেঘনা ।

- বাড়ি পৌঁছেই আমায় একটা মেসেজ করে দিও ...প্লিস , খুব টেনশন হচ্ছে আমার ।প্লিজ সাবধানে গাড়ি চালিও। তোমাকে দেখার পরে আমি আবার কুড়ি বছর পিছিয়ে সেই সময়ে চলে গেছি ।

আকাশ একদৃষ্টে চেয়ে থাকে তার মোবাইলের দিকে । নিজেকেই তার প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে ... আকাশের বুকে কি মেঘ থেকেই গেল সারাজীবনের মত ?

:: সমাপ্ত ::

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮