• সৌরভ ব্যানার্জী

ধারাবাহিক - হরিপদর পালা গান





পর্ব : ১ ...

- নমস্কার আমি কি বিজয় চক্রবর্তীর সাথে কথা বলছি ।

- আজ্ঞে ... আপনি কে কথা বলছেন ?

-ভবানী ভবন থেকে সি. আই . ডি. ইন্সপেক্টর তন্নিষ্ঠা চ্যাটার্জী ।

- আজ্ঞে ... মানে ... ইয়ে

- ভয় পাবেন না । আপনার সাথে আমাদের কিছু দরকার আছে ... কোথায় গেলে আপনাকে মিট করতে পারব ?

- আপনি বলুন ম্যাডাম কোথায় যেতে হবে ?

- আগামী সোমবার বিকেলে চারটে ... আকাশবাণী ভবনের সামনে ... আমি ঠিক চিনে নেব আপনাকে । চিন্তা করবেন না আপনি কোন ফাঁদে পড়ছেন না । আপনার সাহায্য পুলিশের দরকার । পুলিশকে সাহায্য করলে আপনার লাভই হবে ।

- চিন্তা আর লাভ ক্ষতির হিসাব করা আমি বহুকাল ছেড়ে দিয়েছি ম্যাডাম ওতে শুধু রাত্রের ঘুম নষ্ট হয় ।

- বাহ খুব ভাল... আর একটা কথা

- জানি পালাবার চেষ্টা করে কোন লাভ নেই । আপনাদের জাল চারিদিকে পাতা আছে ।

- আপনি খুব বুদ্ধিমান লোক ... সোমবার বিকেল চারটে ।

- মনে থাকবে ম্যাডাম ... রাখছি ।

পর্ব :: ২ ...

সেই কোন সন্ধ্যে বেলায় লাইন গেছে এখনো এলো না ! অবিশ্যি তাতে করে হরিপদ বেরার ভারী বয়েই গেছে । পিদিমের বা লণ্ঠনের আলোতে বেশ কষে ভাবা যায় । ওস্তাদ বলে ... " ওরে হরে মানুষের দুঃখের দিন গুলোই আসল দিন ... দুঃখে থাক হরে দুঃখে থাক । দুঃখ কথা যোগায় ভাবতে শেখায়।"

তা বাপ ঠাকুর্দার আশীর্বাদে হরিপদর জীবনে দুঃখের যোগান নেহাৎ কম নেই । সেই কোন ছোটবেলা থেকে আজ অব্দি দিন মোটেই বদলালো না । ছেলে বেলায় বাপ টা কলেরায় মরে গেল । মা টা আজ আছি কাল নেই করতে করতে হরিপদ কে বছর পনেরোর করে দিয়ে কাশতে কাশতে একদিন দুম করে চোখ বুজল । হরিপদর থাকার মধ্যে ছিল গ্রামের ইস্কুলে ক্লাস নাইন অব্দি লেখাপড়া আর একটা ছোট্ট কুঁড়ে ঘর । মা বেঁচে থাকতে বিজয় দাদা বাবুদের ঘরে ঠিকে ঝি এর কাজ করত ।মা চলে যাবার পরে কর্তামার কথায় হরিপদ দাদাবাবুদের ঘরেই উঠে এল একদিন।দিনে দিনে সে হয়ে উঠল বিজয় দাদা বাবুর ছায়াসঙ্গী । দাদাবাবু মাছ ধরতে যাবে ...ছিপ কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাবে কে ... না হরিপদ , মাছের চার ,টোপ তৈরী করবে কে ? কে আবার সবেতেই ... হরিপদ । দাদাবাবুর বন্ধুরা মাঝে মধ্যে বোতলের নেশায় হরিপদকে দিয়ে গা হাত পা মালিশ করিয়ে নেয় বটে এমনকি বেমক্কা চাপ দিয়ে ফেললে ... উপরি চড় থাপ্পড় টাও পাওনা হয় তার। তা হরিপদ দের মত গরিবদের অত ধরলে চলে না । হরিপদ কে ওস্তাদ বারবার বলে দিয়েছে দুঃখে থাকতে ... দুঃখে থাকলে ভাব আসে ভাব এলে হাতে লেখা আসে । দুঃখে থাকতেই হরিপদ ভারী ভালবাসে ।

ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় হরিপদ প্রথমবার ওস্তাদের লেখা পালা দেখেছিল ।আহা ... নিত্যানন্দ গোঁসাই এর সেকি লেখা আর বিবেকের ভূমিকায় অভিনয় চোখে জল চলে এসেছিল হরিপদর ! দিন দুই কেমন একটা ঘোরের মধ্যে থেকে সে সটান গিয়ে গোঁসাই এর বাড়িতে হাজির । বলা কওয়া আলাপ পরিচয় কিছুই নেই তবু হরিপদর মনে খুব বিশ্বাস ছিল যে তেমন করে বুঝিয়ে বললে ওস্তাদ কি দলে নেবে না ? অবিশ্যি নিত্যানন্দ গোঁসাই লোক ভালো ... হরিপদকে বেশ খাতির করেই জিজ্ঞেস করলে ।

- বলি বাপু তোমার আসা হচ্ছে কোত্থেকে ?

- আজ্ঞে সেই হিরাপুর থেকে ।

- বল কি হে হিরাপুর তো অনেক দূর !

- আজ্ঞে গরীবের কি অত দূর দেখলে চলে ?

- হুমম তাও বটে । তা এইখানে কি মনে করে ...হে ?

- আজ্ঞে গত পরশু দিন আমাদের গাঁয়ে আপনার দলের পালা হয়েছিল । আপনার লেখা পালা আর আপনার অভিনয় দেখে আমি আপনাকে আমার ওস্তাদ বলে মেনেছি । এখন দয়া করে গরীবকে যদি শ্রীচরনে ঠাঁই দেন ।আপনার কাছে আমি পালা লেখা শিখব ।

- হাহা হাহা হাহা .. ওরে পাগল অমন করে কি কিছু হয় রে !! যা দুটি খেয়ে দেয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যা ।

গোঁসাই এর পরিবার হরিপদ কে খুব যত্ন করে খাইয়েছিল । গরম ভাত , বিউলির ডাল , কুমড়োর ছক্কা আর মাছের ঝাল আহা যেন অমৃত ! বড় মানুষের মনও বড়ো হয় ।।

সেদিন ফিরে গেলেও হরিপদ হাল ছেড়ে দেয় নি । গরীবের হাল ছাড়লে চলবে কেন ? বছর দুই ঘোরাঘুরির পরে গোঁসাই একটু আধটু তাকে পালা নিয়ে গল্প করতে শুরু করল । হরিপদ ওতেই খুশি তার কোন তাড়া নেই । বিজয় দাদা বাবু তাকে বলেছে তার হবে ... লেগে থাকলেই হবে । হ্যাঁ লেগে হরিপদ থাকবেই তাকে একটা জমজমাট পালা লিখতে হবে । পালা দেখে লোকে যেন চোখের জল মুছতে মুছতে বাড়ি ফেরে । তবে হ্যাঁ হরিপদ লিখলে একটা পৌরাণিক পালা লিখবে আধুনিক পালা তার দু চক্ষের বিষ । প্রথম পালায় সে গোঁসাই কে বলবে পালার গান গুলো লিখে দিতে একসাথে সব হবে না । ধীরে ধীরে এগুতে হবে হড়বড় করলে সব জলাঞ্জলি । সে বেশ বুঝছে পালা লেখা অত সোজা কাজ না । বাগদেবীর অনেক কৃপা থাকলে তবে পালাকার পালা ফাঁদতে পারে । এই যেমন এক্ষুনি তার একটা জব্বর ভাব আসছে । খেরোর খাতা টা বের করবে ভাবছে হরিপদ এমন সময় ...

- বিজে ওরে ও বিজয়

পা থেকে মাথা অব্দি জ্বলে গেল হরিপদর । সুতনু দাদা বাবু। দাদা বাবুর সব বন্ধুদের মধ্যে সব চাইতে বদ ।কথায় কথায় হাত চালায় হরিপদর গায়ে । দাদা বাবুর মত ভাল ছেলে কেন যে এদের সাথে মেশে ?আসলে বিয়ের পরেই দাদা বাবু কেমন যেন হয়ে গেল ! কি করে যে এমন হলো? যাকগে তার কি ? মা বলত গরীবদের সব ব্যাপারে মাথা ঘামাতে নেই । শুধু বিজয় দাদা বাবুর শুকনো মুখ টা দেখলে হরিপদর বড়ো কষ্ট হয় । অমন একটা কাঁচা কার্তিকের মত চেহারাটা কেমন শোকে তাপে পুড়ে কালোপারা হয়ে গেলো গা ...

(ক্রমশঃ )

চিত্র ঋণ :: গুগল ।।

সৌরভ ব্যানার্জী ... কোলাঘাট ... ২১/৭/২০২০হরিপদর পালা গান ...

পর্ব : ৩....

বিনিকে দিব্যি লাগে হরিপদর ঢলঢলে মুখ কোমর ছাপানো চুল, রং টা অবিশ্যি একটু চাপার দিকে তা গরীবের কি সবকিছু দেখলে চলে নাকি ? বিনির মা মোক্ষদা মাসীকে মা সই ডাকত । জাতপাতের দিকটাও ঠিক আছে একেবারে হরিপদদের পাল্টি ঘর । গোলমাল টা হচ্ছে লোকে বলে বিনির নাকি বোধবুদ্ধি এখনো একেবারেই কম আর হরিপদ পালা লেখাটাও তেমন করে শুরু করতে পারে নি ।এখন কথা হচ্ছে লোকের বলা কথা হরিপদ অত ভাবে না , বুদ্ধিশুদ্ধি ভগবান কি সবাই কে সমান দেন । যার যতটুকু দরকার ততটুকু মাপ করেই দেন ... আচ্ছা কথার কথা ধরায় যাক এই বিনি ই যদি বেশ করে পড়াশুনো করে দু চারটে পাস দিয়ে জিন্স টিন্স পরে চোখে রোদ চশমা লাগিয়ে কায়দা কানুন করে নেকিয়ে টেকিয়ে হরিপদর সাথে কথা কইত তা হলে গল্প টা কেমন হত শুনি ? হরিপদ এঁটে উঠতে পারত সেই বিনির সাথে ? তার কেমন সব তালগোল পাকিয়ে যেত না ? তার থেকে এই ভালো বাবা যেমন ঢাক তার তো তেমনই কাঁসি হবে নাকি ? আর পালা তো হরিপদ লিখবেই ... একটা জম্পেশ পালা লেখা শুধু সময়ের অপেক্ষা । পালা লেখা হলে সে একবার সবাইকে ... নাহ মনে অহং আনবে না হরিপদ । ওস্তাদ তাকে বলেছে মনে অহং এলে বিদ্যার দেবী কূপিত হন । তবে হরিপদ ইদানিং এইটে বেশ বুঝতে পারছে যে বিনির সাথে তার একটা সম্পর্ক ঠেকিয়ে রাখে কে ? এই তো গত বোশেখে বিনিকে দেখতে এয়েছিল পাত্রপক্ষ ... তা কেউ পারলে ঘরের দোর খুলে সে মেয়েকে ঘরের বার করতে ! জেদ বলিহারি বাপু মেয়ের ! দিন দুই পরে মোক্ষদা মাসী চক্রবর্তী দের পদ্মপুকুরে বাসন মাজার সময় কার কাছে যেন আক্ষেপ করে বলছিল " আমার মেয়েটার আর বিয়ে থা হবেনি গা !! " সেই সময় হরিপদর কি ইচ্ছে করেনি বলতে যে ... " অমন ভাবছ কেন গা মাসী ! আমি কি মরে গেলুম নাকি ? " নাহ আজকাল হরিপদ হসফস করে কিছু একটা বলে দিচ্ছে না । ইচ্ছে হলেই কথা না বলে চেপেচুপে থাকছে । ওস্তাদ তাকে কম কথা কইতে আদেশ করেছে । কথা কম কইলে নাকি ভাবটা বেশ চেপে আসে ।

আজকে অবিশ্যি হরিপদর কোন কিছুতেই তেমন গা নেই বিজয় দাদা বাবু বেলা বারোটার দিকে দুটি মুড়ি খেয়ে কলকাতা গেছে বলে গেছে ফিরতে দেরি হবে ।রান্না বসাই বসাই করতে করতে বেলা গড়িয়ে গেল ঢের । পদ্ম পুকুরের কালো জলের দিকে তাকিয়ে বেশ একটা জুতসই সিন ভাবছিল হরিপদ ।খিদের পেট হলেও ভাবনাটা কিন্তু আসছিল বেশ খেলিয়ে হঠাৎ পিছন থেকে ...

- ঘাট জোড়া করে বসে আছো যে বড় ... তোমার কি কাজকম্ম নেই নাকি গা ?

আহা হরিপদর বুকে যেন যাত্রাদলের ফ্লুট বেজে উঠল ।

- কাজকম্ম নেই কিরে ? রান্না করব ... ভাত বাড়ব ... খাব অনেক কাজ ।

- হায় পোড়া কপাল আমার ! এই অবেলায় রান্না করবে কি গা ? এত বেলা অব্দি কি রাজকার্য করছিলে শুনি ?

- পালা ভাবছিলাম রে বিনি একটা জব্বর সিন ভেবেছি শুনবি ।

- থাক বাপু আমার এখন আর পালা শুনে কাজ নেই ...টপ করে পুকুরে দুটো ডুব দিয়ে আমাদের ঘর দিয়ে এস দেখি । দেখি তোমার জন্যে কি ব্যবস্থা করতে পারি ....

এইভাবে বিনিদের ঘরে যেতে প্রথমটায় কেমন একটা ঠেকছিল হরিপদর । চান করার পরে গায়ে ফতুয়া আর লুঙ্গি টা চাপাতে চাপাতে সে বেশ ভেবে দেখলে... নাহ অত ভাবলে তার চলে না । গরীবদের অত ভাবতে নেই ।

অভাবের সংসার হলেও খাওয়া টা মন্দ হল না । ভাতটা ঠান্ডা হয়ে গেলেও রসুন, শুকনো লঙ্কা দিয়ে পাট শাক ভাজা আর তেঁতুল দিয়ে চুনো মাছের গরগরে টকের সাথে দিব্যি হড়হড় করে নেমে গেল । খিদেটাও পেয়েছিল জোর । ভরপেট খেয়ে একটা বেশ জুত করে ঢেঁকুর তুলবে কি তুলবে না ভাবছে হরিপদ

- আমার বিয়ে থা হয়ে গেলে তোমাকে কে নজর করবে গা ?

উঠে আসা ঢেঁকুর টা অমনি বুকে আটকে গেল হরিপদর ।

- তুই মানে তোর আবার কবে... কার সাথে বিয়ে রে বিনি ?

- ওমা ছেলের কতা দ্যাখো দিকি ! হেঁসে বাঁচিনি বাপু ! চিরকাল কি আমি বাপ মায়ের সংসারে থাকব গা ? লোকে কি বলবে বল দিকিনি ? যাই বাপু পুকুরে বাসন গুলো পড়ে আছে মা এসে যদি দ্যাখে এখনও বাসন মাজা হয় নে তাইলেই হলো । আমায় বিরাট মুখ করবে ।।

বুকের কাছটায় কেমন জ্বালা জ্বালা করছে হরিপদর । অবেলায় খাওয়াতে অম্বল করল ? নাহ এই বেশ হয়েছে । বিনির বিয়ের কথাটা ভাবলেই তার বেড়ে রকমের দুঃখ আসছে মনে । ব্যাস এইবারে পালা লিখতে বসবে সে । বেশ একটা অশ্রুসজল পালা লিখে ফেলবে সে আজ ।

পর্ব : ৪ ...

কলকাতায় বিজয়ের দুটো ঠেক আছে । এই দুটোর কোনটাতেই আজকাল থাকে না সে । প্রথম ঠেকটা আমহার্স্ট স্ট্রিটের বড় রাস্তা ছেড়ে গলির ভিতরে একটা মেস বাড়ির একেবারে উপরের তলায় আর দ্বিতীয়টা রুবি হসপিটালের পিছন দিকে একটা তিন কামরার আধুনিক ফ্ল্যাট ।তার বিয়ের পরে জেঠুমনি তাকে গিফ্ট করেছিল । আর বিয়ে ! অমন করে বিয়ে যেন কাউকে না করতে হয় । নিশা তার জীবন টা শেষ করে দিয়েছে । নাহ শেষের আর কি আছে এই বেশ ভাল আছে সে দিব্যি আছে খাচ্ছে দাচ্ছে ঘুরছে আবার কি চাই ? চারটে বাজার মিনিট তিনেক আগেই বিজয় আকাশবাণী ভবনের মেন গেটের সামনে এসে দাঁড়াল । ঠিক চারটে বাজতেই চোখে রে ব্যানের কালো চশমা, ফেডেড জিন্স ও শার্ট পরিহিত পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির যে মহিলাটি সাদা স্করপিও থেকে নেমে তার সামনে এসে দাঁড়াল তাকে কলেজ পড়ুয়া বলে অনায়াসে চালিয়ে দেওয়া যায় ।

- আসুন বিজয় বাবু । আমিই তন্নিষ্ঠা ... এই আমার আই কার্ড ।

- না না ঠিক আছে ম্যাডাম ?কোথায় যেতে হবে বলুন ...

- আসুন গঙ্গার দিকটায় যাই । আপনাকে ভবানী ভবনে ডাকাই যেত কিন্তু খোচড় রা খবর পেয়ে যাবে !আমি সেইটা চাইছি না ।

- আমি না কিছুই ...

- বুঝতে পারছেন না তো ! বুঝিয়ে বলি আমরা একটা খুনের তদন্তে নেমেছি আর এই তদন্তে আপনার জানা কিছু তথ্য আমাদের অনেক সাহায্য করতে পারে ।

- কে খুন হলো কার খুনের তদন্ত ম্যাডাম ।

- খোকন ভট্টাচার্য ... চেনেন ? শেয়ার কেনাবেচার মাস্টার খোকন ভট্টাচার্য ... চেনেন ?

- সে কি ! কবে কখন কোথায় ?

(ক্রমশঃ )

নীড়বাসনা  বৈশাখ ১৪২৯