• প্রদোষ সেন

গল্প - নিকট দূর



।।১।।

“এবার স্কুলের একশ’ বছর সেলিব্রেশান হচ্ছে। আসছিস তো?”

মেইলটা পড়ে একটু চমকেই উঠল অভ্র। অভ্রজিত।

মেইলটা খুবই সাধারণ। একটাই মাত্র লাইন। ইতি বা ওই ধরণের কিছু বৃত্তান্তও লেখা নেই। কিন্তু মেইলটা যে পাঠিয়েছে তার নামটাই আশ্চর্য হওয়ার কারণ।

অপর্ণা।


শুক্রবার সন্ধ্যেবেলা। অফিসে লোকজন একটু কম। অনেকেই বাড়ি যেতে শুরু করেছে। অভ্রর হাতে এখন একটু সময় আছে। মেইলটা পড়ল একবার, দুবার। বেশ কয়েকবার। কেন লিখল অপর্ণা এই মেইল হঠাৎ এতদিন পরে? বহু বছর, এক যুগ বা তারও কিছু বেশী হবে কোন যোগাযোগ ছিল না। হ্যাঁ ফেসবুক ফ্রেন্ড’র লিস্টে অপর্ণা আছে। মাঝেমধ্যে একটা দুটো পোস্টে লাইকও দেয়। কিন্তু ওই পর্যন্তই। কোনদিন কথাবার্তা বা চ্যাট হয়নি। এইসব ভাবতে ভাবতে উঠে পড়ল অভ্র।

হ্যাঁ দেশে যাওয়ার প্ল্যান ওর আছে, কিন্তু মেইলের উত্তরটা পরে দেবে।

অ্যাটলান্টায় এক মালটিন্যাশানাল কোম্পানির বহুতল অফিস বাড়ীর লিফটে ঢুকে অভ্র আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ল অফিসের কথায়।

মোবাইলে কথা বলতে বলতে লিফট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে বসে কথাটা শেষ করল। তারপর স্টার্ট দিল গাড়িতে।

সাধারণত ড্রাইভ করার সময় মোবাইলে কথা ও বলতে চায় না। হ্যান্ডসফ্রি থাকলেও।

দেবলীনাও ওকে অনেকবার বারণ করেছে।

যদিও অনেক সময়ই সেটা করা সম্ভব হয়না অত্যধিক ব্যস্ততার জন্য।

এই বহুজাতিক কোম্পানির সিনিয়র মার্কেটিং ম্যানেজার হিসাবে অভ্রর হাতে সময় খুবই কম।

শনিবার সকালটা ওদের নিজস্ব সময়।

অভ্র যায় টেনিস কোর্টে। ইদানীং ছেলেকেও ভর্তি করেছে জুনিয়র ক্লাসে। দেবলীনা বারবার বলছিল ছেলের কোন ফিজিক্যাল একসারসাইজ হচ্ছে না।

দেবলীনা এই সময়টা জিমে কাটায়। তার পরেই থাকে সালসা ড্যান্সের ক্লাস।

আজ ফিরে দেখল দেবলীনা তখনো ফেরেনি। টেবিলের ওপর ব্রেকফাস্টের সব সরঞ্জাম গুছিয়ে রাখা গেছে। হয়ত ফিরতে দেরি হবে বলেই।

ছেলেকে খেতে দিয়ে নিজেও ব্রেকফাস্টটা করে নিল অভ্র।

মাল্টিগ্রেন ব্রেড, তার সঙ্গে ডিম সেদ্ধ আর কম ফ্যাটের দুধ।

খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে ওরা দুজনেই খুব ক্যালোরি সচেতন। একদম মেপে খাওয়া। কাজের চাপও খুব বেশী, তাই মেপে খাওয়াটা খুব দরকার। ডায়টিসিয়ানের করে দেওয়া চার্ট অনুযায়ী ওদের মেনু।


দেবলীনাও আগে চাকরি করত।

এখন কিছু দিনের ব্রেক নিয়েছে ছেলের জন্য। শুভ্রজিত এখন ক্লাস ফোরে পড়ে। আর একটু উঁচু ক্লাসে উঠলে আবার কোন জায়গায় জয়েন করবে।

ব্রেকফাস্ট করে নিজের আইপ্যাডটা নিয়ে বসল।

অফিসিয়াল মেইলগুলো একবার দেখে নিল এখুনি উত্তর দেওয়ার মত কিছু আছে কিনা। না সেরকম কিছু নেই। সোমবার অফিসে পৌঁছে উত্তর দিলেই হবে।

এরপর নিজের মেইল বক্সটা খুলল।

অপর্ণার মেইলটায় উত্তর দিতে হবে।

মেইলটা পড়ল আরেকবার। বার দুয়েক।

তারপর টাইপ করল “হ্যাঁ দেশে যাওয়ার প্ল্যান আছে। গেলে ওখানে আসব। তুই আসছিস?”

কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করে ‘সেন্ড’ বাটনটা ক্লিক করল।

অপর্ণার মেইল পড়ে মনে হয়েছে ও আসবে। তা নাহলে মেইল লিখত না। এখন দেখা যাক কি উত্তর দেয়। যদি অবশ্য দেয়।

কিন্তু উত্তর পাওয়ার প্রত্যাশা কেন?

অপর্ণা তো শুধু একটা বন্ধুই ছিল।

তাহলে এই মেইলটা নিয়ে এত ভাবার কি আছে? কিন্তু ভাবনাটা মনের ব্যাপার। আর মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ সব সময় থাকে না।

অভ্র না ভাবলেও অপর্ণা-ই বা লিখল কেন? তাও আবার এত বছর পরে! নিশ্চয় কোন কারণ আছে। যেটুকু ও অপর্ণাকে চিনেছিল, না ভেবে-চিন্তে কাজ করার মেয়ে ছিল না।

কয়েক মিনিট কেটে গেছে এইসব ভাবতে ভাবতে।

দরজায় কলিং বেলের আওয়াজে ভাবনায় ছেদ পড়ল।

দেবলীনা ফিরল বোধহয়।

আজ শনিবার হলেও ওদের ব্যস্ততা থাকেই। অভ্রর ছুটি। ব্যস্ততাটা বেশীরভাগ ক্ষেত্রে দেবলীনার জন্য।

দেবলীনা ওদের বলেই দিয়েছে সেকথা। “সপ্তাহে পাঁচদিন তোমরা নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাক। শনিবার দিনটা কিন্তু আমার।“

এই সময় ব্যস্ততাটা একটু বেশীই। কিছুদিন পরেই পুজো। বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশনের। দেবলীনার ব্যস্ততাটা অনেকটাই সেই নিয়ে। আর অনেক মেয়ের মত ও নাচ-গান নিয়ে ব্যস্ত নয়। সত্যি কথা বলতে ওগুলো ওর আসেও না। কদর করতে জানে। ওই অবধি।

দিল্লীতে লেডি শ্রীরাম কলেজ থেকে পাশ করে দেবলীনা কয়েকদিন কাজ করেছিল একটা বিজ্ঞাপন সংস্থায়। তারপরে কিছুদিন আর একটা জায়গায় ব্র্যান্ড প্রোমোশনে।

এখানে পুজোতে ওর দায়িত্বটাও অনেকটা কাজের মতই।

বিজ্ঞাপন যোগাড় করা। সঙ্গে পুজোর প্রচার বাড়ানো, পাবলিক রিলেশনটা ঠিক রাখা।

এই ব্যস্ততা চলবে পুজো শেষ হওয়া অবধি।

সংসারের বন্ধন আর তার দায়িত্বর পরেও ওদের নিজস্ব একটা জগত আছে। সেখানে একটা নিজের জায়গা তৈরি করে নিয়েছে দুজনেই। যেটা দুজনের কাছেই গ্রহণযোগ্য। তাই সপ্তাহে পাঁচদিনও যদি অভ্র ট্যুরে থাকে তাতে দেবলীনার কোন অভিযোগ নেই, ঠিক যেরকম অভ্ররও নেই যদি শনিবার দিনটা দেবলীনাকে কাছে না পায়।

অভ্রর একেক সময় মনে হয় দেশে ফিরে যায়।

সেখানে আর পাঁচটা লোক আছে মেশার। সুদূর আটলান্টায় বৈভব আছে, স্বাচ্ছন্দ্যও আছে। কিন্তু মন খুলে মেশার মত লোক খুব কম। এই কথায়-কথায় হাই-হ্যালো আর কিছু মেকি হাসির পিছনে আন্তরিকতা বস্তুটা প্রায় নেই বললেই চলে।

কিন্তু ফিরব বললেই কি ফেরা যায়?

সবে বছর দুয়েক হল এসেছে। এত তাড়াতাড়ি কোম্পানি ট্রান্সফার করবে না। নিজের ক্যারিয়রের একটা ব্যপার আছে।

তার থেকেও বড় কথা শুভ্র আর দেবলীনা দুজনেই এখানে বেশ মানিয়ে নিয়েছে। ওরাও চাইবে না এখুনি ফিরতে।




।। ২।।

ভোরবেলার ফ্লাইট অভ্র পারতপক্ষে ধরতে চায় না। যদি সোমবার সকালেও কোন কাজে বাইরে যেতে হয়, রবিবার সন্ধ্যের ফ্লাইট ধরে।

কিন্তু এবার উপায় ছিল না।

বাড়িতে একটা লাঞ্চের অনুষ্ঠান ছিল। দেবলীনার এক মাসতুতো বোন এখানে পড়তে এসেছে। লাঞ্চ হলেও শেষ হতে হতে বিকেল হয়ে যায়। তাই সন্ধ্যের ফ্লাইটের ঝামেলা রাখতে চায়নি।

ফ্লাইটে উঠে বসে আইপ্যাডে ইমেইল গুলো দেখছিল অভ্র।

অফিসের কয়েকটা মেইলে উত্তর দিল।

তারপর আবার চোখ পড়ল ও যে মেইলটা অপর্ণাকে পাঠিয়েছিল, সেটায়।

বেশ কয়েক সপ্তাহ কেটে গেছে এর মধ্যে।

অপর্ণা মেইলটা দেখেওছে। কিন্তু কোন উত্তর দেয়নি।

ক্লাস টেন বোর্ড পরীক্ষার ফলাফল বেরিয়েছে কয়েকদিন আগে। প্রত্যাশামতই অভ্রর রেসাল্ট খুব ভাল হয়েছে। একই স্কুলে সায়েন্স নিয়ে পড়বে।

সেদিন তখন ফর্ম জমা দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে। দুটো লাইন হয়েছে। একটা স্কুলের পুরোনো স্টুডেন্টদের। অন্য লাইনটা যারা অন্য স্কুল থেকে ভর্তি হতে আসছে।

অভ্রদের লাইনটা বেশ তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে।ওরা যেহেতু এই স্কুলেই পড়ত ওদের ডকুমেন্ট পরীক্ষা করার সময় কম লাগছে।কিন্তু পাশের লাইনটা এগোচ্ছে শম্বুক গতিতে। অনেক স্টুডেন্ট আর তাদের অভিভাবকরা বেশ বিরক্ত।কেউ কেউ আবার কলকাতার বাইরে থেকে এসেছে। তাদের ট্রেনে বা বাসে ফিরতে হবে। চারটে অবধি ফর্ম জমা নেওয়ার সময়। আজ না হলে আবার কাল আসতে হবে দূর থেকে।

অভ্রর পাশের লাইনেই দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি।বাবার সঙ্গে।কথা শুনে মনে হল, পরশু রাতে কোলকাতা এসেছে।গতকাল অন্য কোন একটা স্কুলে ফর্ম জমা দিয়েছে। আজ এখানে জমা দিয়ে সন্ধ্যের দিকের ট্রেনে ফিরে যাবে।বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে। কথাবার্তাতেই বোঝা যায়।

খানিকক্ষণের মধ্যেই অভ্র নিজের ফর্ম জমা দিয়ে দিল।

ওরা তখনো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। কলকাতার বাইরে থেকে এসেছে বলে কিনা জানেনা, কেউই একবার অফিসে গিয়ে অসুবিধের কথাটা বলছে না। একটা ইতস্তত ভাব।

“আপনাদের ট্রেন কখন?” অভ্রর কথায় মেয়েটির বাবা তাকালেন।

অভ্র আবার বলল “না আপনারা কথা বলছিলেন শুনলাম যে আপনাদের আজ সন্ধ্যের ট্রেনে ফিরে যেতে হবে। তাই জিজ্ঞাসা করছি কটার ট্রেন?”

“ও আচ্ছা।“ ভদ্রলোক একটু আশ্বস্ত হয়ে বললেন “ছটার ট্রেন।এখান থেকে তো ঘণ্টা খানেক লাগবে স্টেশনে পৌঁছতে। কিন্তু এখানে যা সময় লাগছে জানিনা ট্রেন ধরতে পারব কিনা।“

“হ্যাঁ, আপনাদের অন্তত দুঘণ্টা সময় হাতে রেখে বেরনো দরকার।“

তারপর অভ্র নিজের থেকেই বলল “আমি কি একবার কথা বলে দেখব?”

ভদ্রলোক অমায়িক স্বভাবের।

বললেন “হ্যাঁ একটু বললে তো খুবই ভাল হয়।তুমি কি এদের চেন?”

অভ্র আর দাঁড়ালো না।ও এখানে প্রায় সব স্টাফকেই চেনে। গিয়ে একটু রিকোয়েস্ট করতে কাজ হল।

ফর্ম জমা দিয়ে ফেরার সময় ওরা পরস্পরের নাম জিগ্যেস করল।

অপর্ণাই তারপর প্রথম কথা বলল “দুটো জায়গায় ফর্ম জমা দিলাম। এটাই প্রথম চয়েস।“

সেটাই স্বাভাবিক। অভ্র ভাবল। দক্ষিণ কলকাতার এই স্কুলে চান্স পাওয়া খুব সহজ নয়। আর চান্স পেলে কেউ সচরাচর ছেড়ে দেয় না। মুখে কিছু বলল না। শুধু বলল “ওকে বাই। পরে দেখা হবে।“

“চান্স পেলে।“ একটু হেসে বলল অপর্ণা

……

মাস তিনেক পরের কথা।

স্কুলে পূজার ছুটি পরবে পরের সপ্তাহ থেকে। ঠিক হল কয়েকজন একসঙ্গে পূজাপ্যান্ডেল ঘুরতে বেরোবে।অপর্ণা প্রথমেই বলল “আমার হবে না।বাড়ি যেতে হবে।“

সায়ন জিগ্যেস করল “কবে বাড়ি যাবি?”

“ষষ্ঠীর দিন।সকালের ট্রেন।“

“তো ঠিক আছে।আমরা পঞ্চমীর দিন ঘুরে আসব।“

“নারে তোরা যা। রাত করে ফিরে আবার পরের দিন সকালের ট্রেন – অত চাপ নিতে পারব না।“

“অত চাপ নিবি কেন? পরের দিন একটু লেট করে ট্রেন ধর।“ অভ্র বলল।

“আচ্ছা ঠিক আছে একটু ভেবে বলছি।“

অভ্র আবার বলল “আরে অত ভাবার কি আছে? বাড়িতে একবার জানিয়ে দে।কয়েক ঘণ্টার তো ব্যাপার।“

হ্যাঁ, কয়েক ঘণ্টারই ব্যাপার।তাও রাজি হচ্ছিল না অপর্ণা।

অবশেষে রাজি হয়ে গেল।

পঞ্চমীর দিন বিকেলবেলার দিকে বেরোনোর প্ল্যান হল।

কিন্তু ঝামেলা বাঁধল শেষ বেলায়।

রোদ ঝলমলে পঞ্চমীর সকালটা মেঘে ঢেকে গেল একটু বেলা এগোতেই।দুপুরের দিকে আকাশের মুখ বেশ ভার। একটা গুমোট পরিবেশ, মাঝে মাঝে চলছে জোলো হাওয়া। বোঝা যাচ্ছে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে কাছাকাছি কোথাও।

পূজার সময় কলকাতায় বৃষ্টি কিছু নতুন নয়।

আজ হলে ওদের প্রোগ্রামটাই ভেস্তে যাবে।

যেখানে ওদের মিট করার কথা সেখানে পৌঁছে অভ্র দেখল ওই প্রথম।আর কেউ আসেনি।

ইতিমধ্যে ঝির-ঝির করে শুরু হয়েছে বৃষ্টি।আকাশের যা অবস্থা, যে কোন সময় মুষলধারে নামতে পারে।

ভাবল একবার দু-একজনকে ফোন করবে।

সেটা করতে হল না।

অপর্ণা আর সংলাপ এসে গেল।প্রায় পরপর।

আরো বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে আর কেউ যখন এল না, ওরা তিনজনই বেরল।প্রথম গন্তব্য দেশপ্রিয় পার্ক। তারপর ত্রিধারা।

দু-তিনটে প্যান্ডেল দেখার পর বৃষ্টিটা এল মুষলধারে।

এরপর ঘোরা সম্ভব নয়।

একটা রেস্টুরেন্টে বসে চা-কফি খেয়ে খানিকটা সময় কাটালেও বৃষ্টি থামার কোন সম্ভাবনা নেই। খুব যে জোরে হচ্ছে তা নয়। কিন্তু এই বৃষ্টি মাথায় করে ঘোরা অসম্ভব।

“এইভাবে সময় নষ্ট করার মানে হয় না” বলে সংলাপ হঠাৎই উঠে পড়ল বাড়ি যাওয়ার জন্য।

অভ্র কিছু বলতে যাচ্ছিল। সংলাপ তার সুযোগ দিল না।

সংলাপের এই হঠাৎ চলে যাওয়াতে ওরা দুজনেই একটু আশ্চর্য হয়েছিল।

অপর্ণা বলল “এইরকম করে চলে গেল কেন?”

“কি করে বলব বল। ও অবশ্য বরাবরই একটু মুডি টাইপের। তোরা তো ওকে এই কয়েকমাস দেখছিস। আমি তো আগে থেকেই চিনি। ক্লাস থ্রি থেকে পড়ছে আমাদের সঙ্গে।“

“যা হোক বাদ দে ওর কথা। আর এক কাপ কফি খেলে হয়না?“

অভ্র বলল “হ্যাঁ, শুধু কফি কেন? আর কিছু একটা বল।“

দু কাপ কফি আর চিকেন কাটলেট অর্ডার করল।

অভ্র বলল “তো কাল তোর ট্রেন কখন?”

“ট্রেন নয় রে, বাসে যাব। ট্রেনে টিকিট পাইনি। বাস শুনে তো প্রথমেই বাড়িতে বলল ‘না’। তারপরে বললাম ডিলাক্স। খুব কম স্টপ। শুনে রাজি হল।“

“আজ কখন তোকে ফিরতে হবে?”

“ফেরার এখন অনেক সময় আছে। তোদের সঙ্গে টাইম কাটাবো বলে তো এসেছি।“

“কিন্তু আমাদের প্রোগ্রামটা তো ভেস্তে গেল।“

“তাতে কি হয়েছে? এখন তোর সঙ্গে গল্প করছি।“

এক সেকেন্ড থেমে অপর্ণা একটু হেসে বলল “তোর কি খুব তাড়া আছে?”

অভ্র মাথা নেড়ে ‘না’ বলাতে, অপর্ণা বলল “ব্যাস তাহলে এখন বস।“

অনেকক্ষণ কথা বলেছিল ওরা।

সময় যে কিভাবে কেটে গেছে সেটা খেয়াল ছিল না ওদের কারুরই।

ঘড়িতে তখন প্রায় নটা বাজে।

অপর্ণা বলল “চল এবার ওঠা যাক।“

“হ্যাঁ চল। তুই কোন দিকে যাবি?”

“কসবা। তোর কোথায়?“

“আমার ঢাকুরিয়া। চল একটা ট্যাক্সি নি, তোকে নামিয়ে দিয়ে যাব।“

অভ্র বাড়ি ফেরার সময় শুধু ভেবেছিল আর একটু সময় থাকলে বোধহয় ভাল হত। অনেকদিন পরে কারুর সঙ্গে এতক্ষণ কথা বলে সময়টা যে কোথা দিয়ে কেটে গেল বুঝতে পারেনি। অবচেতন মনের খোঁজ নিজেও পায়নি অভ্র।




।।৩।।


ঝিমলি আজ বিকেলে বাড়িতে এসেছে।দেবলীনার মাসতুতো বোন।

এখানে জর্জিয়া ইন্সিটিউটে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট কোর্স করতে এসেছে পরিবেশবিজ্ঞান নিয়ে।

আজ ওকে দেবলীনাই ডিনারে আসতে বলেছিল।

দেবলীনা জানে ঝিমলির একটা অ্যাফেয়ার চলছে।আর সেটা নিয়ে বাড়িতে একটু অশান্তিও।

একথা-সেকথার পর সেই প্রসঙ্গটা উঠলই।

নিজেই কথাটা তুলল ঝিমলি।

“তোমরা তো জানোই বাবা একটু বেশী স্ট্যাটাস সচেতন।হি ডাস নট লাইক আবীর। লাইক না করার কারণ হচ্ছে ও হাই-ফ্লাইং নয়। ওর নাকি অ্যামবিশন কম।“

একটু থেমে আবার বলল “আমিও পরিষ্কার বলে দিয়েছি।ওকেই বিয়ে করব, দ্যাটস মাই ফাইনাল ডিসিশন।“

দেবলীনা জিগ্যেস করল “আবীর এখন একটা এনজিও-তে আছে তো?”

“হ্যাঁ।দিল্লিতে।“

অভ্র শুনছিল ওদের দুজনের কথা।

ঝিমলির বাবা যে সে লোক নন।সিনিয়র ব্যুরোক্র্যাট বলে কথা। স্ট্যাটাস, ক্ষমতা সবই আছে। আরো বেশী আছে সেগুলো দেখানোর প্রবণতা। তার মেয়ে যদি তার স্ট্যাটাস অনুযায়ী বিয়ে না করে মেনে নেওয়া খুব কঠিন। কিন্তু ঝিমলি আজকের দিনের ইয়ং জেনেরেশান। যা ভাল লাগে সেটাই করার ইচ্ছে। কে কি ভাবল, কারুর স্ট্যাটাস থাকল কিনা সেই নিয়ে বিন্দুমাত্র চিন্তিত নয়।

অভ্র বলল “আমি তোমার সঙ্গে একমত ঝিমলি। বিয়ে তাকেই করবে যেখানে তুমি হ্যাপি হবে। কারণ লাইফটা তোমাকে তার সঙ্গে কাটাতে হবে, অন্য কাউকে নয়।“

“একদম ঠিক বলেছ অভ্রদা। এই কথাটা আমিও বলেছি। অনেকবার।“ কয়েক সেকেন্ড থেমে আবার বলল “এনিওয়ে যদি না শোনে আমার আর কিছু করার নেই। আমি ডিসিশন নিয়ে ফেলেছি।“

অভ্র একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল।

ঝিমলিকে যে কথাগুলো শুনতে হচ্ছে আজ সেগুলো কি ও নিজেও শুনেছে আগে? ঠিক এইভাবে হয়ত নয়। দেবলীনার সঙ্গে ভালবাসা, বিয়ে এসব নিয়ে ওদের কোন বাড়িতেই কোন আপত্তি ছিল না। মোটামুটি একই রকম স্ট্যাটাস দুজনের পরিবাবের। কিন্তু তারও আগে স্কুলে অপর্ণার সঙ্গে একটু ঘনিষ্ঠতা হয়ত লক্ষ্য করেছিল অভ্রর বাড়িতে। ওটা ছিল নিছকই বন্ধুত্ব। অন্তত ওর ঠিক থেকে। কিন্তু বাড়িতে সেটাও ঠিক পছন্দ ছিল না।

“বন্ধুত্ব, মেলামেশা একটু বুঝেশুনে কব্রবে। আমরা তো তোমার পেছনে দৌড়ে বেড়াবো না।“ বাবার এই কথা শুনে অভ্র একটু আশ্চর্যই হয়েছিল।

ওর মা-ও পাশে বসে।

“হঠাৎ একথা? তোমরা কি অপর্ণাকে মীন করে কথাগুলো বলছ?” অভ্র সরাসরি প্রসঙ্গে চলে এল।

বাবা-মা কেউই কিছু বললেন না। তবু চোখের দৃষ্টিতেই বোঝা যায় ওর অনুমান ঠিক।

“দ্যাখো ও আমার একজন ভাল বন্ধু ছাড়া কিছু নয়। আর তার থেকেও বড় কথা ওর সঙ্গে মেশায় ভুলটা কি?”

অভ্রর বাবাই আবার কথা বললেন “বন্ধুত্ব ইত্যাদি সমান স্ট্যাটাসে করাই ভাল। একটা কথা আছে জানিস তো? এ ম্যান ইস নোন বাই দ্যা কোম্পানি হি কিপস।“

“বাবা স্ট্যাটাস বলতে তুমি কি বলছ? হ্যাঁ ও হয়ত আমাদের মত ওয়েল-অফ ফ্যামিলি থেকে আসেনি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ওর কোন কোয়ালিটি নেই বা ওর সঙ্গে মেশা যাবে না।“

অভ্রর বাবা ছিলেন কলকাতার নামকরা হার্ট-স্পেশালিষ্ট। মা এক নামকরা কলেজের প্রফেসর।

অভ্র জানেনা সেদিন ওর কথাগুলো শুনতে ওদের কেমন লেগেছিল। তবে ওনারা আর কথা বাড়াননি।

অভ্রর মনে কিন্তু সেদিনের কথাগুলো একটা গভীর দাগ কেটে গিয়েছিল।

কখনও একটা কথা বারবার বলার থেকে একবার বললেই মনে বেশী ধাক্কা দেয়।

সেদিন ওর বাবার বলা কথাগুলো ছিল সেইরকম।

এরপর থেকে যখনই অপর্ণার সঙ্গে কথা বলেছে ওই কথাগুলো মনে পড়েছে।

তারপর একদিন এল স্কুলে বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে কাটানোর শেষ দিন।

যারা ক্লাস থেকে বোর্ডের পরীক্ষায় ভাল ফল করেছে কি জয়েন্ট-এন্ট্রান্সে চান্স পেয়েছে তাদের স্কুল থেকে প্রাইজ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। এটাই এই স্কুলের রীতি। বহু বছর ধরে চলে আসছে। এর জন্য স্কুলের প্রাক্তন স্টুডেন্টরা একটা ফান্ড তৈরি করেছে।সেখান থেকেই আসে এই পুরস্কারের টাকার বেশিরভাগ অংশ।

অভ্র দুটো প্রাইজ পেয়েছে।

দুটো পরীক্ষাতেই ওর রেজাল্ট খুব ভাল হয়েছে।

বিরাট হলঘরের পিছন দিকে একটা চেয়ারে বসেছিল ও।স্কুলের লাইফ শেষ।এরপর যাচ্ছে অনেক বড় জায়গায়।বড় ক্ষেত্র।

হঠাৎই অপর্ণা এসে দাঁড়ালো ওর সামনে।

“কনগ্র্যাচুলেশন্স” বলে হাতটা বাড়াল।

হাতটা ধরে হ্যান্ডশেক করে অভ্র পাশের চেয়ারটা দেখিয়ে বলল “বস।এত দেরিতে এলি?”

অপর্ণা হেসে বলল “আমরা তাড়াতাড়ি এসে কি করব বল? আমরা তো আর প্রাইজ পাব না।“ অভ্র ওর দিকে তাকাতে বলল “নারে আমি এসেছি খানিকক্ষণ আগেই।তোকে প্রাইজ নিতেও দেখলাম।“

অভ্র কোন কথা বলল না।

অপর্ণাই আবার কথা বলল “ফাইনালি কোথায় ভর্তি হচ্ছিস?”

“ইচ্ছে তো আছে বম্বে, না হলে দিল্লী বা খড়গপুর। দেখি কোথায় ইলেকট্রনিক্স পাই।“

“গ্রেট! ওখান থেকে পাশ করে কি প্ল্যান? দেশে থাকবি নাকি বিদেশ?”

“জানিনা অতদূর এখনো ভাবিনি।তবে জানিসই তো বাইরে গেলে লোকে একটু অন্য চোখে দেখে। আই মীন গ্ল্যামার, স্ট্যাটাস…”

অপর্ণা কোন কথা বলেনি।

ওর মুখের দিকে শুধু তাকিয়েছিল।

অভ্রকে সত্যিই কি ও বুঝতে পেরেছে?

অভ্র ভেবেছিল ওর-ও একবার জিগ্যেস করা উচিত অপর্ণা কি করবে।শুধু নিজের কথাই বলে যাচ্ছে।

“তোর কি প্ল্যান?” তাড়াতাড়ি জিগ্যেস করল।

ওর কথায় সম্বিৎ ফিরল অপর্ণার। “আমার ইচ্ছে ইকনমিক্স নিয়ে পড়ার।গ্র্যাজুয়েশন তো কোলকাতা থেকেই করব। কয়েকটা কলেজ থেকে ফর্ম তুলছি। তারপর যেখানে চান্স পাব।“

তারপর একটু মজা করার জন্য বলল “আমরা কি তোমার মত ভাল স্টুডেন্ট?”

“বাজে বকিস না তো” প্রসঙ্গটা ঘোরাতে চেয়েছিল অভ্র।

সেই দিনটাই অপর্ণার সঙ্গে শেষ দেখা।

যোগাযোগ-ও আর হয়নি।

দিল্লী আইআইটি-তে পড়ার সময় মনে হয়েছে কথা বলবে। কিন্তু কি ব্যাপারে বলবে? এইসব ভাবতে ভাবতে আর হয়ে ওঠেনি।

সেকেন্ড ইয়ার সেকেন্ড সেমিস্টারে পড়ার সময় দেবলীনার সঙ্গে পরিচয়। ওদের কলেজে এসেছিল অ্যানুয়াল ফেস্তে। লেডি শ্রীরাম কলেজে ফার্স্ট ইয়ারের স্টুডেন্ট তখন দেবলীনা। প্রথম দেখাতেই দুজনের প্রেম। তারপর অভ্র শুধু ওকে আর নিজের ক্যারিয়র নিয়ে ভেবেছে। পিছন ফিরে তাকানোর কোন ইচ্ছে হয়নি।

এতদিন পরে হঠাৎ-ই মনে পড়ছে পুরনো কথাগুলো।

ভাবনায় ছেদ পড়ল ঝিমলির কথায় “কি অভ্রদা, তুমি তো একবারে চুপ হয়ে গেলে। কথাই বলছ না।“

“আরে না না, তোমাদের কথা শুনছিলাম।“

“আমাদের কথা শুনছিলে, নাকি নিজেদের টাইমটা মনে পড়ছিল?”

অভ্র কিছু বলার আগে দেবলীনা উত্তর দিল “ওর এখন কি মনে পড়বে? মনে শুধু কাজ আর কেরিয়ায়ের চিন্তা।“

ঝিমলি বলল “ওসব বল না তো। অভ্রদার মধ্যে এখনো একটা বেশ রোমান্টিক ভাব আছে।“

তিনজনেই হেসে উঠল ঝিমলির কথায়।




।।৪।।

গতকালই ওরা এসে পৌঁছেছে কলকাতায়।

এবার প্রায় তিন সপ্তাহের ছুটি। তাড়াহুড়ো অতটা নেই। তাও বেশ কিছু প্রোগ্রাম রয়েছে। স্কুলের প্রোগ্রামটা আসছে রবিবার। কয়েকজন বন্ধু যোগাযোগ করেছিল। তারা আসবে। অপর্ণা কোন উত্তর দেয়নি। ঢাকুরিয়ার বাড়িতে নিজের বেডরুমে শুয়ে অভ্র ভাবছিল।

পাশ ফিরে দেখল শুভ্র আর দেবলীনা দুজনেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।

খুব স্বাভাবিক। জেট-ল্যাগ কাটতে সময় লাগবে।

ঢাকুরিয়ার এই বাড়িতে ওরা ছোটবেলা থেকে আছে। দোতলায় এই ঘরটা ছিল ওর পড়ার ঘর। ঘরের পূর্বদিকে জানলাটা এখন খোলা। সকালের এক-চিলতে রোদ্দুর এসে পড়েছে পাশের টেবিলে। ঠিক যেভাবে এসে পড়ত অভ্র যখন ওই টেবিলটায় বসে পড়ত।

পাশের ঘরটা ছিল ওর দিদির। দিদি বিয়ের পর চলে গেল ব্যাঙ্গালর। তারপর থেকে ওই ঘর আর নিয়মিত ব্যবহার হয়না। মাঝেমধ্যে কলকাতায় এলে ওই ঘরে থাকে।

বাবা-মা ঘর একতলায়।

বাবা আর নেই, প্রায় বছর তিনেক হল।

মা এখন একাই থাকেন।

অভ্র অনেকবার মাকে বলেছে এই বাড়ি বিক্রি করে একটা ফ্ল্যাটে চলে যেতে। অনেক সুবিধা।দিদিকে দিয়েও কয়েকবার বলিয়েছে।কিন্তু মা রাজি নন।

উঠে পড়ল বিছানা ছেড়ে। নিচে গিয়ে মার সঙ্গে একটু কথা বলবে। এই সময়টা মার চা খাওয়ার টাইম। অন্তত আগে তাই অভ্যাস ছিল। এখন জানেনা সেই অভ্যেসে কোন পরিবর্তন হয়েছে কিনা। বাবা চলে যাওয়ার পর অনেক কিছুই আর আগেকার মত নেই।

নিচে নেমে এল অভ্র।

ডাইনিং টেবিলে বসে চা খেতে খেতে মা অনেক কথাই বলছিলেন অভ্রকে।

দিদির ছেলেটা খুব দুরন্ত হয়েছে। মেয়েটার মত শান্ত নয়। মামার শরীরটা একেবারেই ভাল যাচ্ছে না, সময় করে অভ্র যেন একবার দেখা করে আসে।বাবার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু শুভাশিস-কাকুর কয়েকদিন আগে সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়েছে, তবে এখন একটু ভাল আছেন।

সব কথা শুনতে অভ্রর যে আগ্রহ আছে তা নয়। কিন্তু শুনে যাচ্ছিল।

আরও কিছু কথার পর বললেন “তোর স্কুল থেকে একটা চিঠি এসেছে। ওই ড্রয়ারে রেখেছি। নিয়ে যাস।“

চিঠিটা মানে একটা খাম। হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখল। তারপর খুলে পড়ল। যা ভেবেছিল তাই।

স্কুলের একশ বছর-পূর্তির যে অনুষ্ঠান হবে এটা তার নিমন্ত্রন পত্র। দিন, সময়সূচী দেওয়া রয়েছে। সেগুলো ওর জানা। কার্ডটা যেখানে ছিল সেখানেই রেখে দিল অভ্র।

…….

আজ রবিবার।

দেবলীনা ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি গেল।সকালে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়েছে।

অসীমদা গাড়িতে করে পৌঁছে দিয়ে আসবে।

অসীমদা অভ্রদের বহু পুরনো ড্রাইভার।মাঝবয়সী লোক।আজ পনেরো বছরের ওপর হয়ে গেল ওদের গাড়ি চালাচ্ছে। দিনকাল এখন যা পড়েছে নতুন লোকের ওপর ভরসা করা মুশকিল। তাই ওকে দিয়ে পাঠানো।

আজ অভ্রও বেরোবে।

দেবলীনা সেকথা বলতে ও বলল “তোমরা গাড়ি নিয়ে যাও। আমি ট্যাক্সি করে চলে যাব। আমার তো কাছেই”

.........

দুপুরের দিকে স্কুলে পৌঁছল অভ্র।

মনের মধ্যে একটা আনন্দ আর চাপা উত্তেজনা দুটোই রয়েছে।

এতদিন পরে আবার পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে।

আর অপর্ণার মেইলের ব্যাপারটা তো আছেই।

প্রচুর ভিড় হয়েছে স্কুলে। সেটাই স্বাভাবিক।

তার মধ্যে থেকে নিজের ক্লাসমেটদের খুঁজে পেতে একটু অসুবিধাই হল।

প্রথম দেখা হল সংলাপ, সায়ন, প্রতীকের সঙ্গে।

তারপর পারমিতা, অনিন্দ্য, আরও অনেকে।

সংলাপের কথাবার্তা এখন পুরো আলাদা।আগেকার মত মুডি ব্যাপারটা মনে হল আর নেই। বেশ মেপে কথা বলে। অনেক পরিনত।

দু-একজন আগেকার কথা তোলাতে সংলাপ বলল “সে একটা সময় ছিল।এখন একদিকে চাকরি, অন্যদিকে ফ্যামিলি – দুটিকে সামলাতে গিয়ে পুরো চেঞ্জ হয়ে গেছি।আর উপায় কি?”

প্রতীক বলল “তো ভালই হয়েছিস চেঞ্জ হয়ে”

“সেটা তোরা বল, ভাল কি খারাপ”

এতদিন পরে দেখা। গল্পের কোন শেষ নেই।মাঝে পারমিতা একটা প্রস্তাব দিল।

“আমাদের প্রতি বছর একটা মিট করলে হয় না? আই মীন আমরা নিজেরা ব্যবস্থা করব।“

দু-তিনজন এই প্রস্তাবে রাজি।

অভ্র বলল “তোরা যারা কলকাতায় থাকিস তারা তো করতেই পারিস।আমাদের পক্ষে…”

“কেন তোর আবার কি হল?”

“প্রায় দুবছর পরে কলকাতায় এলাম।এরপরে কবে আসব, না আসব তার ঠিক নেই।“

গল্পে মেতে উঠলেও অভ্রর দৃষ্টি সমানেই এদিক ওদিক চলে যাচ্ছিল।বেশ ভিড় থাকলেও অপর্ণা যদি আসে ওদেরকে খুঁজে পেতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।কারণ ওদের দলটা এখন বেশ বড় হয়ে উঠেছে।

ভাবল কাউকে জিগ্যেস করবে ওর কথা। কোথায় আছে, কেউ জানে কিনা।

কথাটা তুলেই ফেলল।

প্রতীক বলল “আমি শিয়র নই, কিন্তু মনে হয় দিল্লীতে থাকে।এর বেশী জানিনা। কেন ওকি আসবে বলেছে?”

অভ্রর ‘হ্যাঁ, মনে হয় আসবে’ উত্তরটা আরও অনেক কথার মধ্যে চাপা পড়ে গেল।

এখন অনেকে একসঙ্গে কথা বলছে। তাই কথার থেকে হট্টগোলটাই বেশী। শুধু তো ওদের দল নয়। এইরকম আরও অনেকেই জটলা পাকিয়ে কথা বলছে। অনেকদিন পরে দেখা হলে যা হয়।

এর মধ্যে হঠাৎ লাউডস্পিকারে ঘোষণা করা হল “সকলকে একটু নিজেদের জায়গায় বসতে অনুরধ করা হচ্ছে। আজকের প্রধান অতিথি রাজ্যের মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বেন।“

মন্ত্রী আসবে শুনে অনেকেই বিরুপ মন্ত্যব্য করল।

“আগে তো এইসব মন্ত্রীদের নিয়ে আসা ছিলনা। এখন এসব শুরু হয়েছে।“ ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ মন্ত্যব্য করল।

তার উত্তরে আর একজন বলল “আরে এখন এখানে কিছু চালাতে গেলে মন্ত্রী, পলিটিশিয়ান এদের খুশী রাখতেই হবে। কিছু করার নেই।“

অভ্রর এইসব কথায় মন নেই।

অপর্ণা কি তাহলে আসবে না?

অনিন্দ্যর গলা শুনতে পেল “মন্ত্রী এসে গেল বোধয়। গাড়িটা তো মনে হচ্ছে ওনারই।“

হ্যাঁ ঠিকই।

দু-তিনজন পুলিশ গেটের কাছে রাস্তাটা পরিষ্কার করে দিল। স্কুলের প্রধান শিক্ষক হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে তাড়াতাড়ি এগিয়ে গেলেন।

অভ্র আরও একবার চারদিকে খুঁজল। এবার বেশ কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে।

না অপর্ণা আসেনি।

নিশ্চিত।

তখনই প্রতীকের গলা শুনতে পেল।

“অপর্ণা না?”

সামনে ঘুরে প্রতীকের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাল অভ্র।

ডায়াসের ওপর।

ঠিকই বলেছে প্রতীক। প্রধান শিক্ষক, শিক্ষামন্ত্রী, তার পাশেই দাঁড়িয়ে অপর্ণা। তখনো নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না অভ্র।

অপর্ণাকেই দেখছে তো?

ডায়াসের ওপর গেল কি করে? মন্ত্রীর সঙ্গে এসেছে মনে হয়।

স্কুলের একজন বয়স্ক শিক্ষক মন্ত্রীর পরিচয়টা করিয়ে দিলেন আজকের প্রধান অতিথি হিসেবে।

এরপর প্রধান শিক্ষক বলতে উঠলেন।

আজকের বিশেষ অতিথি হিসেবে আমরা পেয়েছি আমাদের স্কুলের পুরনো ছাত্রী অপর্ণা রায়চৌধুরীকে। কবে স্কুল থেকে পাশ করেছে ইত্যাদি বলার পর বললেন অপর্ণা লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স থেকে ডক্টরেট করে এখন ইউ এন-এ কর্মরত, দিল্লী অফিসে। ইউ এনের এই প্রজেক্টটি দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্ত ছেলে-মেয়েদের সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট নিয়ে। কিছু স্কুল এই প্রজেক্টএ অংশ নিয়েছে। আমাদের স্কুলও এর মধ্যে পড়ে। অপর্ণাকে আজ এখানে পেয়ে আমরা অত্যন্ত গর্বিত। শুধু আজকের এই অনুষ্ঠানের জন্য নয়, আমাদের স্কুলকে এই প্রজেক্টের অংশ করার জন্য। তাই যখন শুনলাম রাজ্য-সরকারের সঙ্গে কিছু কাজের সূত্রে অপর্ণার কলকাতায় আসার কথা আছে, অনুরধ করেছিলাম আজ এখানে আসার জন্য। ওনার অত্যন্ত ব্যাস্ত কর্মসূচি থাকলেও মধ্যে সময় করে যে এখানে এসেছেন তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।

অভ্রর কানে সব কথা ঢুকছে না।

অপর্ণাকে দেখে যাচ্ছিল।

অনেকটা আগের মতই। পাতলা, বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা। শুধু একটু ভারিক্কি ভাব এসেছে। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। যেটা আগে ছিল না। অপর্ণা ওকে দেখেছে কি? খুব দূরে তো নয়।

এরপর মন্ত্রী বলতে উঠলেন। তার কথাতেও ইউ এন এর প্রজেক্টের প্রসঙ্গ উঠল।

কে একজন পিছন থেকে বলল “অপর্ণা এখন তো হাই-ফাই পজিশনে আছে মনে হচ্ছে। বিগশটদের সঙ্গে ওঠা বসা।“

প্রতীক বলল “তাতে কোন সন্দেহ নেই।“

খানিক পরে অপর্ণাকে কিছু বলতে অনুরধ করা হল।

সংক্ষিপ্ত কিন্তু সুন্দর গুছিয়ে কথা বলে।

বলার স্টাইল-টা অনেকটা আগের মতই আছে।

শেষ করার আগে বলল “আমি দেখছি আমার অনেক বন্ধু আজ এখানে উপস্থিত রয়েছে। যাদের সঙ্গে এই স্কুলে অনেক সময় আমি কাটিয়েছি। ইচ্ছে করছে আজও ওদের সঙ্গে একটু সময় কাটানোর। কিন্তু আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আজ আমার সময় একদমই নেই। এখান থেকে এয়ারপোর্ট যেতে হবে। কোন না কোন ভাবে পরে যোগাযোগ করব নিশ্চয়ই।“

প্রায় সকলেই হাততালি দিলেও, অভ্র আশা করেনি এইরকম হবে।

ওর সব কিছু গুলিয়ে গেছে।

অপর্ণা না আসলে ঠিক ছিল।

কিন্তু এসেও ওর সঙ্গে দেখা হল না। কথা বলা তো দূরের ব্যপার।

এটা কি অপর্ণার প্ল্যানেই ছিল? নিজের স্ট্যাটাস দেখানোর জন্য?

ও তো জানতই ওকে এইভাবে আসতে হবে। একটা সময় অভ্র ওকে গ্ল্যামার, স্ট্যাটাসের কথা বলেছিল।

অভ্রর বাবাও ওকে সেইভাবে বুঝিয়েছিলেন। মনে হল আজ ওর বাবা বেঁচে থাকলে ও বাড়িতে গিয়ে ঠিকই বলত দ্যাখো একদিন তোমরা স্ট্যাটাস দেখিয়ে আমাকে ওর থেকে দূরে থাকতে বলেছিলে। আর আজ কি সেটাই অপর্ণা ওকে দেখিয়ে দিয়ে গেল?

এগুলোর উত্তর অভ্র হয়ত কোনদিনই পাবে না।

শেষবারের মত একবার স্কুলের গেটের দিকে তাকাল।

অপর্ণার গাড়িটা ততক্ষণে গেট দিয়ে রাস্তায় বেড়িয়েছে।

কয়েক মিনিট কোন কথা বলেনি অভ্র। খেয়াল পড়ল পিছন থেকে প্রতীক বলছে “চল লাঞ্চটা করে আসি। আরও অন্য কাজ আছে।“

“হ্যাঁ চল” বলে উঠে পড়ল।





নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮