• তন্ময় মালিক

প্রবন্ধ - উপলব্ধি





শুধু আমি কেন? জীবজগতের সবাই চায় ভালো থাকতে। এই ভালো থাকার হয়তো রকমফের আছে, দৃষ্টিভঙ্গি ও আশা আখাঙ্খার প্রেক্ষিতে, তবুও ভালো থাকতে সবাই চায়, আর আমরা যা করি, সব তারই তাগিদে।


এখানেই আমার মনে একটা প্রশ্ন আসে, একা একা কি ভালো থাকা যায়? ভালো নিশ্চয়ই থাকা যায়, তার জন্য কিছু একটা নিয়ে থাকতে হবে, আর তখন তা নিয়েই দিব্যি বুঁদ হয়ে থাকা যায়, আর সেটা যদি নিজেরই সৃষ্টি হয়, তাহলে তো কথাই নেই। নিজেরই সৃষ্টির নেশায়,- সেই সৃষ্টিকে আরও আরও মোহময় করার তাগিদে, তা নিয়ে খুব ভালো থাকা যায়। ব্যাপারটাকে হেঁয়ালি মনে হলেও, হয়তো বা এই থেকেই বিশ্বজগৎ সৃষ্টি।


মহাপুরান অনুসারে আমাদের আদি পিতা ব্রহ্মা। তাঁর সৃষ্টি কিভাবে হয়েছিল? যতটুকু জানতে পারা যায় বা বিভিন্ন ছবিতে যেমন দেখেছি, বিষ্ণু বা নারায়ণ বিশ্রাম করছেন আর তাঁর নাভিহ্রদে সৃষ্ট পদ্মের ওপর বসে রয়েছেন ব্রহ্মা অর্থাৎ কি না ব্রহ্মার সৃষ্টি বিষ্ণুর নাভিপদ্ম থেকে বা আরও সহজ করে বললে বলতে হয়, তিনিও অর্থাৎ ব্রহ্মাই  আদি নন, তাঁরও আদিতে আছে অন্য কেউ। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, ব্রহ্মা নিজে বহু চেষ্টা আর  কঠোর তপস্যা করেও সেই পদ্মের উৎস অর্থাৎ কি বা কোথা থেকে সেই পদ্ম সৃষ্ট হয়েছে তা তিনি জানতে পারেননি, তা তিনি যতই জলের গভীরে যান না কেন , তাঁর মনে হয়েছিল যেন সেই জলরাশির শেষ নেই । আরও তপস্যা করে,  তিনি নির্দেশ পেয়েছিলেন জগৎ সৃষ্টি করার। তারপর কালক্রমে সৃষ্টি হয় এই জগৎ, আসলে সবাই চায় তার সৃষ্টির মাধ্যমেই বেঁচে থাকতে। সৃষ্টি তো হবে, আর তার জন্য চাই সঠিক পরিকল্পনা আর তার বাস্তব রূপায়ন। আমরা দেখি, যেকোন ছোটোখাটো অনুষ্ঠানও একা সফল করা বেশ কঠিন, তারজন্য লাগে সঠিক পরিকল্পনা, আর লাগে কিছু লোকজন যারা সেই পরিকল্পনাকে বাস্তব রূপ দেয়।


আমার তো মনে হয়, এই সৃষ্টির মধ্যেও আছে, অনেক সূক্ষ আর নিখুঁত পরিকল্পনা, আর যথেষ্ট সময় নিয়ে তা বাস্তবায়িত হয়েছে। যেমন শুধু জীব সৃষ্টি করলেই তো আর হবে না, তাদের বেঁচে থাকার জন্য যা কিছু প্রয়োজন আগে তার ব্যবস্থা করতে হবে। বেঁচে থাকার জন্য প্রথম যা দরকার তা হলো  পানীয় ও খাদ্য। আর  সবার প্রথমে যা প্রয়োজন তা হল জল। মানুষ তো আর একদিনে আসেনি, বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে ধীরে ধীরে এসেছে মানুষ। প্রথমে হয়তো এককোষী কোন উদ্ভিদ, ধীরে ধীরে তার বিবর্তন, আরও বিবর্তনের মাধ্যমে জীব, তাদেরও টিকিয়ে রাখার জন্য খাদ্য খাদক সম্পর্ক তৈরি করা, এইভাবে বছরের পর বছর ধরে বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় আজকের মানুষ বা স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। ঠিক যেমন ভাবে, একটা ছোট্ট বাগান তৈরি করে ধীরে ধীরে নিত্য নতুন জিনিস দিয়ে সাজিয়ে নানান পরিবর্তন ও পরিবর্ধন এর মাধ্যমে তাকে আরও আরও সুন্দর করে তোলার চেষ্টা করি, ঠিক তেমন ভাবেই ধীরে ধীরে এসেছে আজকের জীবজগৎ।


আদিতে তো আর আজকের মত এত উন্নত ব্যবস্থা ছিলো না। একেবারে শূন্য থেকে শুরু করে, বন মানুষের মতো জীবন শুরু করে, প্রাকৃতিক দূর্যোগ বা হিংস্র পশুর আক্রমণ থেকে বাঁচার তাগিদে, প্রাকৃতিক উপাদানের সাহায্যেই তারা ধীরে ধীরে সাবলম্বী হয়েছে তাদেরই বুদ্ধির দৌলতে। অর্থাৎ প্রাণের সৃষ্টির আগেই যথেষ্ট পরিকল্পনা করে, তাদের টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত উপাদান মজুত করে, তবেই এগোনো হয়েছে । তবেই না আজকের পৃথিবীতে এসে পৌঁছেছে। ঠিক যেমন ভাবে, সব বাবা- মা ধীরে ধীরে তার সন্তানকে  নিজের বুদ্ধির বিকাশে সহায়তা করে, তাকে সাবলম্বী করে তোলে।


একটু বিশদে বলা যাক, ইতিহাসের পাতায় আমরা দেখেছি, পাথরে পাথরে ঘসে আগুন জ্বালাতে শেখা, প্রকৃতির উপাদান থেকে তীর ধনুক বানানো, পাহাড়ের গুহায় বসবাস, গাছের  গুঁড়ি সহজে গড়িয়ে যাওয়া দেখে চাকার সৃষ্টি, বিভিন্ন ফলমূল খাওয়া, আগুনে পুড়িয়ে বা ঝলসিয়ে খাওয়া, বরফের এমনি গুন যে প্রচন্ড ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচার জন্য তার তৈরী বাড়ীর ভেতর বাইরের থেকে আরামে থাকা যায় অর্থাৎ কিনা সমস্ত উপাদান আগে থেকেই সাজিয়ে রাখা ছিল, আর শুধুমাত্র সেই উপাদানকে সঠিক সময়ে সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে কাজে লাগানোর উপযুক্ত বুদ্ধি দিয়ে সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন প্রাণীর, যাতে কারোর কোন অসুবিধে না হয়, সবাই নিজের নিজের মতো করে বেশ সুষ্ঠু ভাবে  তাদের জীবন অতিবাহিত করতে পারে।


আমার মনে হয়, সৌন্দর্য, বৈচিত্র্য ও বাধ্য ভাব, এটা সবাই পছন্দ করে। একটু বিশদে বলা যাক, এমন কেউ কি আছে যে সৌন্দর্যের পূজারী নয়? আমরা সবাই সৌন্দর্যের পূজারী। আর এই সৌন্দর্যের কোনও সঠিক মাপকাঠি নেই , অবস্থা এবং সময়ের ফেরে একই জিনিসকে ভিন্ন রূপে দেখা যায়, ফুটে ওঠে আলাদা সময়ের আলাদা সৌন্দর্য, তা দেখে আমরা মুগ্ধ হই, তখন শুধু দুচোখ দিয়ে নয়, দেহ মন স্পর্শ ঘ্রাণ বুদ্ধি দিয়ে তাড়িয়ে তাড়িয়ে তা আমরা উপভোগ করি, যা হৃদয়ে আনে তৃপ্তি, যার রেশ থেকে যায় মনের মণিকোঠায়। 


একই ভাবে দেখা যায়, বৈচিত্র্যও আমাদের মজ্জাগত। আর এই বৈচিত্র্য আমরা পছন্দ করি, জীবনের প্রতি ক্ষেত্রেই, তা সে থাকা খাওয়া পোশাক পরিচ্ছদ যাই হোক না কেন। তাই শুধুমাত্র বৈচিত্র্যের খোঁজেই, আমরা সময় সুযোগ পেলে তল্পিতল্পা গুছিয়ে বেড়িয়ে পড়ি পাহাড়, পর্বত, সমুদ্র, মরুভূমি, মালভূমি, ঝরনা বা ঘনসবুজের উদ্দ্যেশ্যে, চেনা পরিবেশ ছেড়ে অচেনাকে দেখতে, জানতে ও তাড়িয়ে তাড়িয়ে তা উপভোগ করতে। যারা আবার একটু ক্ষমতা রাখেন, এবং সৌখিনতা যাদের মজ্জাগত, তারা তো আবার  ভিন্ন জায়গায়, ভিন্ন পরিবেশে, আলাদা আলাদা ধরনের আবাস বানিয়ে রাখেন এবং একটু একঘেয়েমি কাটাতে সেখানে কিছুদিন সময় কাটিয়ে আসেন।


 আমরা যদি আজ সারা পৃথিবীর দিকে চোখ মেলে তাকাই, দেখবো সেখানেও  হাজারো বৈচিত্র্য। প্রতিটা মহাদেশ, তার অন্তর্গত প্রতিটা দেশ, তার ভিতরের প্রতিটা রাজ্য,.... যাই বলি না কেন, সব একে অপরের থেকে স্বতন্ত্র, কি কৃষ্টি সংস্কৃতি প্রাকৃতিক ভৌগলিক সবদিক থেকেই। কোথাও রুক্ষ মরুভূমি তো কোথাও হিমশীতল মরুভূমি, কোথাও গভীর তো কোথাও সুগভীর সমুদ্র, কোথাও হিমশীতল বরফ, ঘন সবুজ বনানী,ছোট ছোট পাহাড় বা মালভূমি, দিগন্ত বিস্তৃত পর্বতমালা, সমতল উর্বর জমি, হরেক রঙের মাটি ও তাদের স্বতন্ত্র গুণমান, ছোট বড়ো মাঝারি নদী, নদীর জলের আলাদা আলাদা রং, পাহাড়ী ঝরনা কি নেই সেথা, কোথাও বা চারিদিকে জল মাঝখানে ছোট্ট একটা দ্বীপ… বৈচিত্র্যের শেষ নেই। এ তো শুধুমাত্র বিভিন্ন সৃষ্টির কথা বলা হল। এর আবার প্রতিটা ভাগকে আলাদা আলাদা করে দেখলে দেখা যায়, সেখানেও আছে হরেক বৈচিত্র্য। সেটা নদ নদী, গাছ পালা, পাহাড় পর্বত সমুদ্র , ফুল ফল জীবকুল এদের সবারই ভিন্ন রূপ; ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আবার তাদের সেই রূপেও  আসে আলাদা বৈচিত্র্য । দুচোখ দিয়ে একটু দেখলেই বোঝা যায়, দেখতে বা প্রকৃতিতে একই প্রজাতির হলেও তারা সবাই স্বতন্ত্র বা পৃথক সত্তা, একের সাথে অন্যের কোন মিল নেই, সেটা জীবজগৎ বা জরজগৎ, যাই হোক না কেন। এই বৈচিত্র্য শুধুমাত্র সেইজন্যই যাতে কোন কিছুতে কারও একঘেয়েমি না আসে । 


আমাদের চারপাশের গাছপালার দিকে তাকালেই আমরা দেখতে পাই, বছরের ভিন্ন সময়ে কেমন ভাবে তাদের চেহারার পরিবর্তন হয়, গাছের পাতা ঝরা থেকে শুরু করে, নতুন কচি পাতা গজানো, সময়ের সাথে পাতার রঙের নানান পরিবর্তন, হালকা সবুজ থেকে ধীরে ধীরে গাঢ় সবুজ হওয়া, ফুলের মুকুল থেকে সম্পূর্ণ ফুল হওয়া, এরপর সেই ফুল থেকে ছোট্ট ফল হয়ে পরিপূর্ণ  ফল হওয়া,  একই অঙ্গে নানা রূপ শুধুমাত্র সময়ভেদে। একই ভাবে প্রতিটা পশু পাখির ক্ষেত্রেও তাই। আমরা নিজেদের নিয়ে একটু ভাবলেও  দেখতে পাই, আমরা প্রতিটা মানুষও কিভাবে একে অপরের থেকে পৃথক, আর তা রূপগুন, কথাবার্তা, ভাবভঙ্গি, আদবকায়দা , চলন বলন, বিচার বিশ্লেষণ, ভাবের আদানপ্রদান,  বুদ্ধি সবকিছুতেই। একইভাবে নদী সমুদ্র পাহাড় পর্বতের দিকে তাকালে, সেখানেও দেখি ছয় ঋতুতে তাদেরও রূপ বৈচিত্রয় একই রকম থাকে না, ঋতুভেদে তাদের রূপের পরিবর্তনও বেশ মনোরম। আমাদের চারপাশের প্রকৃতিও দেখি বছরের ভিন্ন সময়ে ভিন্ন রূপের পসরা সাজিয়ে আমাদের মনকে মাতিয়ে রাখে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে। বসন্তকালে প্রকৃতি সেজে ওঠে রং বেরঙের ফুলে, আর সেই ফুলের সুমধুর গন্ধে আকাশ বাতাস ম ম করে ওঠে, সেই গন্ধে ধেয়ে আসে মৌমাছি, প্রজাপতি , তাদের দ্বারাই হয় ফুলের পরাগমিলন, ফুল থেকে হয় ফল, এই ফলের ভিতরেই থাকে বীজ, যা থেকে নতুন চারা গাছ হয়। 


চারিদিকে শুধু গাছ হলেই তো আর হবে না, তাদের টিকে থাকার ব্যবস্থাও করতে হবে। তাই সূর্যের প্রখর তাপে জল বাষ্প হয়ে ওপরে ওঠে, সেখানে মেঘ হয়ে আকাশে ভেসে বেড়ায়, রংবেরং এর নয়নাভিরাম সেই দৃশ্য আমরা যেমন উপভোগ করি, পশুপাখিরাও তা করে, তাই তো ময়ূর পেখম মেলে নাচতে থাকে ময়ুরিকে আকর্ষণ করতে, এই আকর্ষণের মধ্যেই আবার লুকিয়ে আছে সৃষ্টি রহস্য, সৃষ্টিকে টিকিয়ে রাখার কি অদ্ভুত কৌশল। মেঘ থেকে বৃষ্টি হলে, সেই বৃষ্টির জল মাটিতে পড়ে,  গাছেরা তখন সহজেই তার মূলের সাহায্যে মাটি থেকে প্রয়োজনীয় খাবার সংগ্রহ করে তাদের রুপ লাবন্য বাড়িয়ে তোলে। আবার মাটিতে পড়ে যাওয়া গাছের বীজ থেকে নতুন চারা গাছ জন্মায়, যেগুলো পরে মহীরুহে পরিনত হয়ে, মরে যাওয়া গাছের বিকল্প হয়ে ওঠে।  এই বৃষ্টির জলে নদী প্লাবিত হলে , তার সাথে বয়ে আসা পলিমাটিতে আশপাশের জমি উর্বর হয়, চাষের উপযোগী হয়, তাতে ফসল ফলিয়ে মানুষ তার বেঁচে থাকার জন্য খাবার সংগ্রহ করে। 


পৃথিবীর ঘূর্ণন, সূর্য চন্দ্র সৃষ্টি সবই সেই আগাম পরিকল্পনারই ফসল। সারাদিন সূর্যের প্রখর রোদ অসহনীয় লাগতে পারে, তাই রেখেছেন পৃথিবীর ঘূর্ণন, যাতে সবসময় একই উত্তাপ সহ্য করতে না হয় আবার সূর্যের আলো সমভাবে সমবন্টনও করা যায়। একই সাথে চাঁদের কথাও বলতে হয়, চাঁদে কি হয়? সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়, তাই তারও আলো আছে কিন্তু তা স্নিগ্ধ শীতল, যাতে দিনেরাতে আলো থাকে অথচ দিন রাতের তাপমাত্রা ও আলোর তারতম্য ঘটিয়ে, প্রাণীকুলের বিশ্রামের ব্যাবস্থা করে দেওয়া, যাতে সারাদিনের কাজের শেষে বিশ্রাম নিয়ে চাঙ্গা হয়ে পরদিন আবার নতুন উদ্যমে কাজ করতে পারে এবং প্রাণশক্তিও অটুট থাকে। 


এবার আমাদের ঘিরে থাকা বায়ুমণ্ডলের দিকে আলোকপাত করা যাক, সেখানে আমরা দেখি জীবকুলের প্রয়োজন অক্সিজেন, অন্যদিকে উদ্ভিদ কুলের খাদ্য তৈরীর জন্য প্রয়োজন কার্বন ডাই অক্সাইড। এখানেও সেই অদ্ভুত ব্যালান্স জীবকুল বাতাস থেকে অক্সিজেন নেয় আর কার্বন ডাই অক্সাইড বাতাসে ছাড়ে, উদ্ভিদ কুল আবার তাদের বেঁচে থাকার জন্য যে খাবার তৈরী করে, তার জন্য বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড নেয় আর বাতাসে অক্সিজেন ছাড়ে। এতে বাতাসে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই অক্সাইড এর ভারসাম্যও  বজায় থাকে।


এসব নিয়ে একটু বিচার বিশ্লেষণ করলেই  বোঝা যায়, কি নিখুঁত পরিকল্পনা, যেখানে এতটুকুও ফাঁক খুঁজে বের করা যায় না। আর এই সবকিছুর একটাই উদ্দেশ্য সৃষ্টির সবাই যেন ভালো থাকে, কারোর যেন কোন অসুবিধে না হয়। এটা কিছুটা আমাদের বাগান তৈরির মতো, সেখানে যেমন বিচিত্র রকমের ফুল ফলের গাছ লাগানোর আগে, তাদের বৃদ্ধির কথা মাথায় রেখে সেই উপযোগী জল সার দিয়ে  মাটি তৈরী করে, বীজ বপন করি বা চারা গাছ লাগাই।  আবার ভিন্ন প্রজাতির পশু, পাখি পুষলেও একই ভাবে, যাতে তাদের কোন অসুবিধে না হয়, তাদের কারো যেন কোন সমস্যা না হয়, সেসব মাথায় রেখে, নিজের মতো পরিকল্পনা করে, সবকে ভালোভাবে রাখার কথা ভেবে এগোলে তবেই না তাদেরকে ভালো রাখা যায়। আর তারা ভালো থাকলে তবেই তো সেই সৃষ্টি হবে  সর্বাঙ্গ সুন্দর । কেননা সৃষ্টির কিছু হওয়া মানে, নিজেরই কিছু হওয়া, সৃষ্টির ভালোমন্দ মানে নিজেরই ভালোমন্দ। ঠিক যেমনভাবে সন্তানের আনন্দে মা বাবার আনন্দ আবার সন্তানের কষ্টে মা বাবার কষ্ট।


এবার দেখা যাক খাবারের দিকে। রোজ কি আর এক বা একই ধরনের খাবার খেতে ভালো লাগে? নিশ্চয় না। আর সেখানেও সেই বৈচিত্র্য বছরের ভিন্ন সময় ভিন্ন স্বাদের সবজি, ফল মূল সেও আমরা সেই প্রকৃতি থেকেই পাই এবং সবই সময়োপযোগী। শুধুমাত্র তাই নয়, এদের প্রতিটার স্বাদ, বর্ণ গন্ধ সর্বোপরি গুণাবলী একে অপরের থেকে আলাদা । এখানেই মনে হয় স্রষ্টার কি নিখুঁত পরিকল্পনা, সমস্ত খুঁটি নাটি বিবেচনায় রেখে তার সঠিক বাস্তবায়ন। 


এবার আসা যাক, বাধ্যতা বা শৃঙ্খলতার কথায়। আমরা নিজেরা অনেক সময় বাধ্য না হলেও, আমরা কিন্তু সকলেই চাই, আমার চারপাশের সবাই যেন আমার মনোমত বাধ্য হয়। আর সেটা নিজের সন্তান, পশু পাখি হলে তো কথাই নেই। সহজ বাংলা করে বললে বলতে হয়, যে একটু বেশী ন্যাওটা তার প্রতি নিজের অজান্তেই একটা আলাদা টান তৈরী হয়ে যায়, সবক্ষেত্রেই আমরা তার খেয়াল রাখি, যাতে সে কোন সমস্যায় না পড়ে। আর যে কিছুটা হলেও অবাধ্য, তাকে সঠিক পথে আনার জন্য, সে ঠোক্কর খাবে বুঝতে পেরেও তাকে ঠোক্কর খেতে দিই, বারবার হোচট খেতে খেতে যাতে ঠিক পথে ফিরে আসে। আমরা সবাই যখন কিছু করতে যাই, আমরাও চাই তা মনোমত হোক, আর সেই সৃষ্টি, নিজের বাড়ী, গাছ, বাগান যাই হোক না কেন। সবাই চায় তার সৃষ্টির মাধ্যমেই বেঁচে থাকতে, আর স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হল মানুষ। 


মানুষ বেঁচে থাকে, তার সন্তানের মধ্যে। তাই সদাই তার খেয়াল রাখে। ভূল ত্রুটিগুলো শোধরানোর জন্য মাঝে মাঝে তাকে যে শাসন করে, তা তাকে সঠিক পথ দেখানোর উদ্দেশ্যেই। আমরা পিতৃ ও মাতৃ হৃদয়ের মধ্যেও দেখি, ভিন্ন সন্তানের প্রতি ভিন্ন ভাব, আর সেটা কিন্তু তাদেরকে সঠিক পথের দিশা দেখাতেই, কেননা সব সন্তানের মধ্যে তো তাঁরাই বর্তমান। তাই সব সন্তানের কষ্টই তাঁদেরই কষ্ট, তাদের দুঃক্ষ হতাশা তাঁদেরকে ব্যথিত করে তোলে। একই ভাবে, জগতের সব সৃষ্টিই স্রষ্টার, সব সৃষ্টির মধ্যেই স্রষ্টা আছেন, কিন্তু তাঁকে জানা যায় না। 

 

এখন সবার মানে প্রশ্ন আসতে পারে, সবার মধ্যেই যদি তিনি থেকে থাকেন, তাহলে তাঁর মধ্যেও এত বৈরী ভাব কেন। সবই তো তাঁরই সৃষ্টি, তবুও কেন এই পৃথক আচরণ? এ প্রসঙ্গে একটা ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যাক, আমি আমার বাগানে একটা কলাগাছ লাগলাম। সেই কলাগাছে কলাও হলো, সেই কলাগাছ কেটে ফেললাম। পাশ থেকে আরও কিছু গাছ, তার থেকে আরও কিছু গাছ হবার পর দেখা যায়, গাছের আর ফলন সেভাবে হচ্ছে না। তখন আমরা কি করি, কিছু গাছ কেটে ফেলে দিই আর আশপাশে জায়গা থাকলে আবার একটা একটা করে গাছ লাগাই, এতে গাছের ফলন আবার আগের মতো হয়। একই ভাবে নিজের তৈরী বাগানকে আরও দৃষ্টিনন্দন করার জন্যও তা থেকে আগাছা সাফ করে দিই। বা বাগানকে আরও সুন্দর করে তোলার জন্য বা আগাছা মুক্ত করার জন্য আমরা নানান রকম ওষুধের প্রয়োগ করে অপ্রয়োজনীয় জঞ্জাল সাফ করি। স্রষ্টাও  হয়তো সেই রকমই কোন নিয়ম মেনে চলেন, সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষা করতে।


সাধারণত সন্তান চার ধরনের হয়ে থাকে:

প্রথম : এরা মা বাবা ছাড়া কিছুই বোঝে না, সবকিছুতেই মা বাবা, এদের ধারণা তাঁরাই তাকে তার ঠিক পথে নিয়ে যাবে । এরা মা বাবা অন্ত প্রাণ, আর মা বাবাও তাদের ছেড়ে থাকতেই পারে না।


দ্বিতীয়: এরা সবকিছু নিজেরাই নিয়ম নিষ্ঠা সহকারে করে। কি করে আরও ভালো থাকা যায়, তা নিয়ে মা বাবার সাথে  পরামর্শ করে, তাঁদের উপদেশ মতো এগিয়ে যায়। এতে তাঁদেরও ভালো লাগে, আর সেই সন্তানের প্রতিও তাঁদের দায়িত্ব পালন করেন।


তৃতীয়: এরা সবকিছু নিজেরাই করে, সেইভাবে হয়তো মা বাবার সাথে আলোচনা করে না, কিন্তু নিজেদের মতোই থাকে, আর কোন সমস্যায় পড়লে পড়ে মা বাবার স্মরনাপন্ন হয়। এদেরও কিন্তু বাবা মা ফেরান না, নিজেদের মতো করে নিজ সন্তানকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন এবং উদ্ধারও করেন।


চতুর্থ: এদের সব কিছুতেই মা বাবার প্রতি একটা বৈরী ভাব, যেন মা বাবাকে সহ্যই করতে পারে না। সবকিছুতেই মা বাবার বিরুদ্ধাচারণ। মা বাবা সবই বোঝেন, তবুও তাঁরা নির্বিকার চিত্ত থাকেন। আসলে সবাই তো তাঁদেরই সন্তান, সন্তানদের ভালো রাখাটাই মা বাবার আসল আনন্দ, যার মধ্যে এতটুকুও ভেজাল নেই।


তাই যে যেভাবে থাকতে চায় বা যেভাবে থাকলে সে ভালো থাকে, তাঁরাও তাদেরকে সেই ভাবেই রাখেন, ঠিক যেমন ভাবে শিশু যেটা পেলে হাসিখুশি থাকে, তাকে আমরা সেটা দিয়েই ভুলিয়ে রাখি। পক্ষান্তরে যে নিজে কিছু চায় না, মা বাবার ওপর ছেড়ে দেয়, তারাও তাদের যেটা পেলে ভালো হবে ঠিক সেটাই তাদের দেন। ব্যাপারটা অনেকটা নিজে চাইলে ভূল হতে পারে, যেহেতু আমরা তার পরিণাম সম্বন্ধে কিছু জানি না, কিন্তু বাবা মা দিলে তাঁরা সবদিক বিচার বিবেচনা করে তবেই তা দেন। আর সব সন্তানের মধ্যেই থাকে তাদেরই জিন বা রক্ত বা আত্মা, আমরা যে যেভাবেই তাকে ব্যাখ্যা করি না কেন। কিন্তু আমরা কি সেটা সবসময় উপলব্ধি করতে পারি যে, আমার ভিতরেও রয়েছে আমারই মা বাবার অংশ। অনুভবে কিন্তু আমরা ঠিকই বুঝতে পারি যে, আমার ভিতরেও তাঁরা আছেন। আর অনুভবের জন্য রয়েছে আমাদের পাঁচটা ইন্দ্রিয় অর্থাৎ চোখ কান নাক জিভ আর ত্বক। এই পাঁচ ইন্দ্রিয় দিয়েই দেখে শুনে শুঁকে স্বাদ নিয়ে আর স্পর্শ করে আমরা উপলব্ধি করি সমগ্র জগৎটাকে, কেননা এরাই নিয়ন্ত্রণ করে মনকে। এই মনের ওপরে থাকে বুদ্ধি, এই বুদ্ধিই মনকে আলোড়িত করে উদ্বুদ্ধ করে কোন পথে যাবে। এই বুদ্ধিরও ওপরে আত্মা, যে সবকিছুতেই অবিচল, এই রহস্য ভরা জগৎ তাকে বিন্দুমাত্র আলোড়িত করে না, সে সম্পুর্ণ নির্বিকার। আর তাকে জানাটাই হলো আসল জানা, আর সেই জানাটাই যে সবথেকে কঠিনতম। এই জানার জন্য চাই, সংযম, নিষ্ঠা, অধ্যবসায় আর  বিশ্বাস বা ভক্তি। তবেই জানা যাবে আমি কে, আর এই জন্যেই বোধহয় কবি বলেছেন,

"ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে"।


ঘুমন্ত পিতাকে জাগিয়ে তোলাই হল পূর্ণতা প্রাপ্তি। এই উপলব্ধি হলেই মানুষ জানতে পারে যে, সেও অনন্ত শক্তির অধিকারী। কিন্তু এই জানার প্রতি পদক্ষেপে থাকে নানান প্রলোভন, অনেকেই সেই প্রলোভনের ফাঁদে পা দিয়ে, সামান্য একটু বিভূতি পেয়েই সব জেনে গেছি ভেবে, মূল জানার অদূরেই থেমে যায়। এই প্রলোভনবহুল পথ অতিক্রম করে, সংযম নিষ্ঠা ভরে এগিয়ে গেলে তবেই উপলব্ধি করা যায় যে আমার মধ্যেও আছে সেই একই সত্তা। তখন আর কিছুই চাইবার থাকে না, সব সেথা পূর্ণ। ঠিক যেমন ভাবে বাবার সব কিছুই তাঁর সন্তানের, কিন্তু তাঁরা সেটা অত সহজে তাকে বুঝতে দিতে চান না, তার আগে বিভিন্ন ভাবে বাজিয়ে দেখে, যখন দেখেন যে তার আর একদমই ভুলপথে যাবার কোন সম্ভাবনা নেই, একমাত্র তখনই তাকে তাঁর সব ঐশ্বর্য্যের সন্ধান নেই আর তখনই দুজনে একাত্ম হয়ে যান, দুজনের মধ্যে তখন আর কোন তফাৎ থাকে না, দুজনেই একই  ঐশ্বর্য্যের অধিকারী হয়ে যান। কারণ তিনি তো আর অন্য কারো জন্য করেন না, যা করেন সবই তো তাঁরই সন্তানেরই জন্য। আসলে সবাই চায়, তাঁর সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে অর্থাৎ সৃষ্টি বা সন্তানকে ভালো রাখার জন্য পরমপিতা আর জাগতিক পিতার কি অপূর্ব মেলবন্ধন। অনন্য সৃষ্টির অধিকারী হয়েও নির্বিকার ভাবলেশহীন হয়ে নিজ কর্মে সদাব্যস্ত শুধুমাত্র তাঁর সব সৃষ্টির মঙ্গলার্থে, যেটা শুধুমাত্র উপলব্ধিই করা যায়, যা  করলে মানব জমিন আর পতিত থাকে না, সোনা ফলায়।


এই উপলব্ধির কথাই রবি ঠাকুর তাঁর "কৃপণ" কবিতায় তুলে ধরেছেন।  বিশ্বাস বা ভক্তিভরে সবকিছু তাঁর কাছে সঁপে দিলে, তিনিও তাঁর ঐশ্বর্য ভান্ডার তার কাছে মেলে দেন, সেই ঐশ্বর্য্যের কাছে জাগতিক সমস্ত ঐশ্বর্য সম্পূর্ণ ম্রিয়মান, তাই  জাগতিক কোন বৈভব তখন আর তাকে আলোড়িত করে না, সদানন্দে বিভোর হয়ে থাকে। এটাই পরম পাওয়া, যা ব্যাখ্যার অতীত, শুধুমাত্র অনুভবেই তা উপলব্ধি করা যায় ।

নীড়বাসনা  বৈশাখ ১৪২৯