• অরুণাভ দত্ত

প্রবন্ধ - মুখ ও মুখোশ : করোনা ফ্যাশন






দিল্লী এয়ারপোর্টে বসে আছি কলকাতার ফ্লাইট ধরব বলে, মাস্ক পরা একজনকে চেনা চেনা মনে হল । ছটফটে তরুণী একটি, নিজের স্বামীকে কিছু উপদেশ দিচ্ছে। সঙ্গে একটি ছোট বাচ্চাও রয়েছে। আরে!পিয়ালী না? চলাফেরা রকমসকম দেখে তো তাই মনে হচ্ছে।পিয়ালী আমার পুরনো প্রজেক্টের চেনা একজন। এমনিতেই আমাকে বহুদিন পরিবার ছাড়া বিদেশ বাস করতে হয়েছে। তার ওপর বাংলা কথা শুনে মনে হল কলকাতা অব্ধি সময় কাটানোর জন্য ভালোই যোগাযোগ পাওয়া গেছে। 'পিয়ালী,চিনতে পারছিস?',নিজের মুখোশটা নামিয়ে একগাল হাসি দিলাম।মেয়েটিও এগিয়ে এসে সামনে এসে দাড়ালো। কিন্তু মাস্ক খুলতেই দেখি ওমা অন্য লোক! কোনরকমে সরি-টরি বলে পার পাওয়া গেল।তবে মেয়েটি,যার নাম মোটেই পিয়ালী নয়, স্মিতমুখে জানিয়ে গেল যে মুখোশ পরার ফলে এরকম ভুল হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক।খেয়াল করে দেখলাম তাই তো, এর আগেও একটি মাস্ক-পরিহিত ছেলেকে আমার পূর্বপরিচিত ভেবে ভুল করেছিলাম। নাহ!মুখোশধারী মানুষ চিনতে এবার থেকে আরও সতর্ক হতে হবে দেখছি ।

সত্যি ২০২০ মার্চের আগে মাস্ক হাসপাতালের ডাক্তার বা গুরুতর রুগি ছাড়া তেমন দেখা যেত না,ভেনিসিয়ান মাস্কের কথা পড়েছিলাম ছোটবেলায় – আর এই বছরটা মুখোশ ছাড়া ভাবাই যাচ্ছে না । আমার বেশিক্ষণ মাস্ক পরে থাকতে অসুবিধা হয়,এই নিয়ে এর আগে বিমানে এক (খুব সম্ভবত) জার্মান দম্পতির বকুনিও খেয়েছি । অদ্ভুত ব্যাপার আমি ওলন্দাজদের দেশে দেখেছি ওরা মাস্ক পড়ছেই না-আমার মত কেউ মাস্ক পড়ে বেরোলে বরং সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকাছে । কিছু বীরপুঙ্গবকে বাদ দিলে এব্যাপারে ভারতের লোকজন অনেক বেশি নিয়মানুবর্তি। পথচারী ও বাহনচালকদের বিনা মাস্কে জরিমানা ছাড়াও বেশীর ভাগ জায়গাতেই ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’।এয়ারপোর্টে ও কিছু গয়না বিপণিতে মাস্ক খুলিয়ে ছবি তুলে রাখছে, মুখোশধারী দুষ্কৃতীদের থেকে ক্রেতাদের তফাৎ করার জন্য । তবে ইউরোপে করোনার দ্বিতীয় প্রবাহ আসার পরে সব দেশেই মুখোশ নিয়ে কড়াকড়ি বেড়েছে।

আবার মাস্কের অনেক প্রকারভেদও দেখা হয়ে গেল এই কয়েক মাসে । বাড়িতে পুরনো টিশার্ট কেটে বানানো বা রুমাল বেঁধে বানানো মাস্ক ধরছি না;এন-৯৫ মাস্ক বা ডিস্পোসেবল সারজিকাল মাস্ক ব্যবহারকারির সংখ্যা কিন্তু নেহাৎ কম নয় । এছাড়া রয়েছে নাকে পিন লাগানো ’কোন্‌’ মাস্ক(যা আমার বেশ যন্ত্রণাদায়ক মনে হয়েছে),থ্রি-প্লাই মাস্ক,ভাল্বযুক্ত মাস্ক,পলিকার্বনেট,রেক্সিন ইত্যাদি মাস্ক ।এছাড়া বিভিন্ন সংস্থার ছাপমারা,দুর্গা ঠাকুর আঁকা মুখোশ তো আছেই।সর্বশেষ চোখে পড়ল বিয়ের মেনু লেখা মাস্ক,ভাগ্যবান ৫০ জন নিমন্ত্রিতের জন্য ।এখনও সঠিক জানিনা কোন মুখোশটা বেশী কার্যকরী তবে হোয়াটস্যাপের দৌলতে এটুকু বুঝেছি যে মাস্কের ভেতর দিয়ে ফুঁ দিয়ে যদি জ্বলন্ত লাইটার নিভানো যায়,সেই মাস্ক কোন কাজের নয়। একটা মুখোশে না হলে দুটো মুখোশ পরতেও বাধা নেই । মুখোশের সহচর হিসেবে স্কাল ক্যাপ,ফেসশিল্ড বা গ্লাভস এর বিস্তারিতে আর গেলাম না এই লেখায়, ওটা পরে কোনদিন আলোচনা করা যাবে না হয় ।

বাজার অর্থনীতিও বসে নেই । মাস্ক নিয়েই চলতে হবে তাই এটা নিয়ে ফ্যাশন দুনিয়ার বেপরোয়া মার্কেটিং শুরু হয়ে গেছে । জামা বা স্যুটের সাথে রঙ মিলিয়ে তো বটেই, মোজা আর অন্তর্বাসের সাথে সামঞ্জস্যযুক্ত মাস্ক,মহিলাদের জন্য বড় আকারের প্রিন্টেড মাস্ক,সুন্দর কারুকার্য করা বা জালিকাটা,ডিজাইনার মাস্ক এমন কি রত্ন-খচিত মাস্ক সবই বিক্রি হছে পুরোদমে। ফেলো কড়ি পরো মাস্ক । চিত্রতারকা বা সেলিব্রিটিরাও বলা বাহুল্য পিছিয়ে নেই।সেলিব্রিটি জগতে ব্যাতিক্রমী ফ্যাশন স্টেটমেন্ট দেওয়ার জন্য সুপরিচিত লেডি গাগাকে যেমন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা গেছে বা্‌ব্‌ল বা ফিশবোওল মাস্ক(মুখকে ঢেকে রাখে রকম একটি বিশাল প্লাস্টিকের বুদবুদ),ভিনগ্রহীদের আদলে এলিয়েন মাস্ক,দুপাশে শিংযুক্ত ‘হর্ন’ মাস্ক,এস্ট্রনট বা মহাকাশচারী হেলমেট সদৃশ মাস্ক এবং এলইডি আলো লাগানো মাস্ক পরতে।অভিনেত্রী টিল্ডা সুইনটন ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘স্টিং-রে’ আকৃতির একটি সোনালী মুখোশ পরে সবার চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছেন।এতটা না হলেও ধনী দেশগুলোতে সাধারণ জনতার মধ্যে স্বচ্ছ বা ট্রান্সপারেন্ট মাস্ক,হাসিমুখ অর্থাৎ স্মাইলি মাস্ক বা কোন ক্যারিকেচার/ব্যাঙ্গাত্মক থিম(যেমন ‘সুপার কিস’ থিমে বিশাল পুরুষ্টু ঠোট এর ছবিযুক্ত) মাস্ক বেশ জনপ্রিয়। পকেটে আরও রেস্তওয়ালা্রা বানিয়ে নিতে পারেন অবিকল মুখের আদলে থ্রিডি প্রিন্টেড মাস্ক যাতে মনেই হবে না আপনি মাস্ক পরে আছেন।রয়েছে ইচ্ছে অনুযায়ী দাড়ি গোঁফ লাগানোর জন্য কাস্টম মাস্ক।নিয়মিত শেভ করার ব্যাপার নেই। সেদিন এক দাদার কাছে শুনলাম মোহময়ী ‘লিপস্টিক ঠোট’ মাস্কের মেহেরবানীতে নাকি আসল লিপস্টিক আর ব্লাশারের বিক্রি কমে যাচ্ছে!এদিকে মুখ ঢাকা থাকায় কালো হরিণ চোখের আকর্ষণ হয়ে উঠেছে আরো দুর্বার!ফ্যাশনিস্তাদের (মানে ওই ফ্যাশনে যারা ওস্তাদ আর কি) হালফিল পছন্দ ‘মাস্ক-ম্যানি’ ট্রেন্ড অর্থাৎ ম্যানিকিওর বা হাতের নখের নানারকম কারুকার্যের সাথে মুখোশের যুগলবন্দী।এই আলোচনায় দাঁড়ি টানবো আর্মানী,গুচি ও এরকম আরো কিছু বিখ্যাত ডিজাইনার ব্র্যান্ডের ‘ট্রাইকিনি’ অর্থাৎ বিকিনির সাথে রঙ-মিলান্তি মুখোশ সম্ভারের কথা উল্লেখ করে।সমুদ্র সৈকত রঙিন হয়ে উঠছে এই ট্রাইকিনি পরিহিত ফ্যাশন দুরস্ত ললনাদের ভিড়ে।

এখানে মনে রাখা দরকার যে সব ফ্যাশন মাস্কই যে করোনা প্রতিরোধে কার্‍্যকর বা ডাক্তার অনুমোদিত তা নয়, কিন্তু তাতে কি – মেজাজটাই তো আসল রাজা !আবার সঠিক মাস্ক পরা সত্ত্বেও মুহূর্তের অসত্‌র্কতায়(হয়ত বা নিয়তিরই লিখনে)কত মানুষ যে অসুস্থ হয়েছেন বা মৃত্যু মুখে ঢলে পড়েছেন তা ২০২০ তে বিশ্বব্যাপী করোনা মৃত্যুর হার এবং বিশিষ্ট ব্যাক্তির মৃত্যু তালিকা দেখলেই বোধগম্য হবে।আমাদের আটপৌরে চেনা পরিচিত গণ্ডির মধ্যেও এর ব্যতিক্রম নেই।


পরিশেষে বলতেই হচ্ছে যে অপরিহার্য এই মাস্ক বা মুখোশের যথেষ্ট জোগান তো রয়েছে এখনো পর্যন্ত - কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন সামাজিকতা,মানুষ-মানুষের কাছে আসা ইত্যাদির মুখ থেকে যে ভদ্রতা বা মনুষ্যত্বের মুখোশগুলো উঠে যাচ্ছে তার কি হবে? লোকজনের বাড়ি যাতায়াত তো ক্রমশ কমেই আসছিল বহুবিধ ব্যস্ততার কারনে,এবার তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে । নিজের প্রতিবেশীকে এক কাপ চা খেতে ভেতরে ডাকতে পারি না ।ভাইফোঁটা,জন্মদিন,বিবাহবার্ষিকী মায় বিয়ের অনুষ্ঠান পর্যন্ত ভারচুয়াল ।ছুটিতে বেড়াতে যাওয়া নিয়ে গৃহযুদ্ধ।ইলেক্ট্রিশিয়ান বা প্লাম্বার বাড়িতে ঢোকার অনুমতি পাচ্ছে,কিন্তু বন্ধুবান্ধব নয়।ভীতি আর অবিশ্বাসের একটা কালো মুখোশ ছায়া ফেলেছে সর্বত্র।আত্মীয়স্বজন করোনা তে মারা গেলে ফোনেই শেষকৃত্য সম্পাদিত হচ্ছে।এমন কি বাবা মা মারা গেলেও শেষ দেখা হচ্ছে না। আমার একাধিক পরিচিত যারা বিদেশে বাস করেন, পিতা বা মাতার মৃত্যুসংবাদ পেয়েও দেশে না আসার আপাত বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।আমার নিজের পিসিমা মারা গেলেন করোনায়, পিসতুতো দাদারও করোনা হয়েছিল। সেরে গেছে শুনেছিলাম কিন্তু ভয়ে দেখা করতে যেতে পারি নি।মুঠোফোনেই সমবেদনা জানিয়েছি।করোনার মৃত্যুভয়,চিকিৎসার বিপুল অর্থনৈতিক চাপ,কালোবাজারি ও তৎসংলগ্ন আতঙ্ক তো আছেই। আরও ভয় হয় যে আমাদের নিজেদের বা কোন নিকটাত্মীয়ের করোনা হলে,সম্পর্কের কঙ্কালগুলো ঢাকার জন্য উপযুক্ত মুখোশ আমরা খুঁজে পাব তো?





নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮