• রাণা চ্যাটার্জী

প্রবন্ধ - রঙ বদলানো পৃথিবী





ভিড়ে ঠাসা জবজবে ঘামে, তিল ধারণের জায়গা না হওয়া রামপুরহাট হাওড়া শহীদ সুপারফাস্ট ট্রেন, সবে দুলকি চালে শান্তিনিকেতন স্টেশন ছাড়লো। একটু এগিয়ে অজয় নদের বিস্তীর্ণ খোলা জায়গায় ঠাণ্ডা মৃদু হাওয়া এসে প্রাণটা যেন জুড়িয়ে দিলো ।



কানে এলো হালকা সেই বিখ্যাত গানের সুর,শ্রদ্ধেয় ও কিংবদন্তি গায়ক ভূপেন হাজারিকার । "মানুষ মানুষের জন্য জীবন জীবনের জন্য " গাইতে গাইতে ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসছিলেন অন্ধ স্বামী স্ত্রী, দাদা বৌদি। এমন একটা পরিস্থিতিতে এই গান ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ। সিটে বসে থাকা ,কপালে চওড়া সিঁদুর লাগিয়ে তারাপিঠের ভক্তবৃন্দ, নিজেদের মধ্যে পা তুলে বসে। কেউ স্যান্ডো গেঞ্জি ,বারমুডা পরিহিত আপন ফুরফুরে মেজাজে ।এরই মাঝে দেখলাম, এক বৃদ্ধা ঠাকুমা বয়স ভারে আর দাঁড়াতে না পেরে ওই ভিড়ের মাঝেই মেঝেতে বসে পরলেন ।



দূর থেকে একটু অনুরোধ করলাম ,"এই যে দাদা একটু পা গুলো গুটিয়ে বয়স্কা ঠাকুমা কে বসতে দেবেন? বলতেই চার-পাঁচ জন ওদের এমন ভাবে ঘুরে আমার বদন দেখতে লাগল যেন ,ওদের আমি অসুস্থতার মুখে জ্বরের কুইনাইন গুলি খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছি !

তখনো কানে বাজছে "একটুকু সহানুভূতি, কি মানুষ পেতে পারে না,ও বন্ধু...! মানুষ মানুষের জন্য " অন্ধ দিদি ভাগ্যিস চোখে দেখতে পায় না,কেবল অনুভব করতে পারে , নইলে এই পুণ্য করতে আসা মানুষগুলোর চেনা দৃশ্য, ভাব ভঙ্গি দেখে নিশ্চয়ই গান গাইতে গাইতে ওনার গলা কিছুটা হলেও কেঁপে যেতো।



মনে পড়ে গেলো আর একটা দিনের কথা। সেদিন এই ট্রেনটি বাতিল হওয়ায় ,এ লাইনের সবথেকে নির্ভরযোগ্য গণ দেবতা এক্সপ্রেসে করে বাড়ি ফেরার পালা। বাইরে কাজ করতে যাওয়ার ও রাতে হাওড়া থেকে ট্রেন ধরার সুবিধার জন্য মুর্শিদাবাদের শ্রমিক ভাই ,দাদাদের সাথে তারাপিঠ ফেরৎ প্যাসেঞ্জার দের বেশ ভিড় ছিল সেদিনও।



একটি বৃহৎ পরিবারের প্রায় চোদ্দ পনের জন মানুষ শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে বহাল তবিয়তে ছিলেন ওই কামরায়। সিদ্ধ ডিম বিক্রি করতে এসে হকার দাদার কাছ থেকে ওনাদের ১২ জন মিলে ২৮টা ডিম উদরস্থ করল। চিপস নিয়ে হকার হাজির হতেই বাচ্চা কাচ্চা সহ সকলকে একটা করে চিপসের প্যাকেট ধরিয়ে দিলেন গ্রুপের তদারক কারী ব্যক্তি।বিক্রি করতে কিছুক্ষণ পর বাচ্চাগুলোর সবকটাকে চিপস কিনে দেওয়া হলো। যিনি দায়িত্ব করে কেনাকাটা করছিলেন তিনি আর দুটো চিপস বেশি কিনে এক আদরের ধন কে ধরিয়ে দিলেন । এরপর তিনি ধূমপান না করার নিষেধ নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মস্তিষ্কে ধোঁয়া দিতে লাগলেন বহাল তবিয়তে।



এতক্ষণ সব কিছু ঠিকঠাকই ছিল ।আমরা একটু দূরে গেটের কাছে অপেক্ষা করছিলাম।হঠাৎ দেখি একটি বাচ্চা ছেলে ন্যাড়া মাথা, কোথা থেকে যেন উড়ে এসে চিপসের প্যাকেটটা ছোঁ মেরে উধাও। অনেকে রে রে করে উঠলো বটে কিন্তু তাতে কি! ততক্ষণে সে,প্যাকেটটা ছিঁড়ে খেতে শুরু করেছে মহার্ঘ্য খণ্ড চিপস।আর তার সপ্রতিভ চোখ যেন উত্তর দিচ্ছে বেশ করেছি ,খেয়েছি ,ইচ্ছা করলো তাই নিয়েছি।

ভীরু মন বলে উঠলো, না জানি, না পেতে পেতে এই আমাদের উন্নত সমাজ তাকে কি তৈরি করবে আগামীতে! এ যেন"বেশ করেছি কেড়েছি,আমারও খেতে ইচ্ছে হয়"- ভাবনার জোরালো প্রতিবাদ।ততক্ষণে অন্ধ দাদা ,বৌদি গান গাইতে গাইতে আবার আসছেন,"ভাগ্যের চাকাটা তো ঘুরছে, ভাগ্যের চাকাটা তো ঘুরবেই" সেই দুর্দান্ত জনপ্ৰিয় গান আমিও অজান্তে গুন গুন করে দুকলি গেয়ে ফেললাম।



একটু পর যা দেখলাম,আশ্বস্ত হলাম ওই স্মার্ট পুঁচকেটা বাইরের কেউ না,স্বয়ং অন্ধ ভিখারি দাদা বৌদির আদরের ধন।




নীড়বাসনা  বৈশাখ ১৪২৯