• সৌরভ ব্যানার্জী

বড়গল্প - আকাশের বুকে মেঘ (ধারাবাহিক)


( আগের পর্বের লিঙ্ক )


পর্ব :: ৫

আকাশ কর্পোরেট সেক্টরে চাকরি পেতেই পারত , কিন্তু কেন জানিনা তার ওই ইঁদুর দৌড়ে অংশ নিতে কিছুতেই ইচ্ছে হলো না । তবে ওই কর্পোরেট সেক্টরের ঝকঝকে ব্যাপার টা ছোট থেকেই তাকে ভারী টানত ,সেই কারনেই আকাশ নিজের বাইরে টাকে খুব ঝকঝকে করে রাখে । ব্র্যান্ডেড শার্ট ,প্যান্ট , জুতো ঝলমলে গাড়ী । সব মিলিয়ে মিশিয়ে একটা জমকালো ব্যাপার ।গোলমাল টা হলো এই ছেলেটাই যে কি করে নিজের জীবনটাকে ঘেঁটে ' ঘ ' করে ফেলল ।এত ঝলমলে ছেলেটা কি করে অগোছাল হয়ে গেল সেইটা বোঝা সত্যিই খুবই দুষ্কর । মানুষ চায় এক হয় আর এক । একটা মধ্য চল্লিশের মানুষ যার অর্থের অভাব নেই , বরং অতিরিক্ত প্রাচুর্য ... সেইরকম কোন গুরুতর সমস্যাও নেই অথচ তার এইরকম দশা কেন ? কেন আকাশের বাড়িতে ঢুকলেই মনে হয় যে ... কেউ নেই যে এই মানুষটার জীবনটাকে একটু গুছিয়ে দিতে পারে ?? স্টাডি রুমে চারিদিকে বই ছড়ানো ... কিচেনের অবস্থাও তথৈবচ , মাইনে করা লোক দিয়ে কি সংসার চলে ?! বেডরুমে যে কবে শেষ ঢুকেছে আকাশ , তা সে নিজেই বোধহয় ভুলে গেছে । সোফার উপরে দলা পাকিয়ে আছে কতকগুলো দামী শার্ট প্যান্ট !! সারাদিন তো ছাত্র ছাত্রী ... পড়িয়েই সময় চলে যায় মানুষটার । সময়ে খাওয়া দাওয়া টাও করে কি না ... তাও বোঝা যায় না ...জিজ্ঞেস করলে বরং হ্যা হ্যা করে হাসে !! এই হাসিটাই বলে দেয় বাইরে টা যতটাই ঝকঝকে হোক না কেন ভিতর টা একবারে একা হয়ে গেছে এই মানুষটার ।

আমার আজকাল খুব মনে হয় সেইরকম গুরুতর সমস্যা না থাকাটাই বোধহয় আজকের যুগে মানুষের সবচাইতে বড় সমস্যা ... যাক সে কথা , আকাশ আর মেঘনার গল্প লিখতে বসে অন্য সমস্যার জালে জড়াতে আমার মোটেও ইচ্ছে নেই ... চলুন দেখি এর পরের দিন কি হলো?


পরের দিন সকালে স্কুলে ঢুকে প্রথম দুটো পিরিয়ড অন্য দিনের মত ক্লাসের চাপে কেটে গেল ।একটু ফাঁকা হতেই বেলা ১১ টার দিকে হোয়াটস অ্যাপ খুলল আকাশ অনেক গুলো মেসেজ এর সাথে মেঘনার এই গুড মর্নিং মেসেজ ।

- অল প্রব্লেমস আর স্টাক বিটুইন " মাইন্ড" এন্ড " ম্যাটার" ... ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড ... ইট ডাস নট ম্যাটার ... গুড মরনিং ।।


ঠিক কথা , মাইন্ড না করলে কোন কিছুই ম্যাটার করে না এইটা একদম ঠিক কথা ... মুশকিল টা হলো মাইন্ড টা আমরা কোনটা করব আর কোনটা করব না ? কার কথায় করব আর কার কথায় করব না ... এইটা ঠিক করতে পারা টা ।।


মর্নিং টা বেশির ভাগ দিনেই গুড হয় না আকাশের । তার রান্নার লোক প্রায় দিনেই না বলে ডুব মারে ... সেইদিনেও মেরেছিল । ভাতে ডালে ভাত ফুটিয়ে নিয়ে কোনরকমে মাখন দিয়ে সেই মন্ড টা গিলে সেইদিন স্কুলে গেছে আকাশ । মনটা এমনিতেই খিঁচড়ে... আছে । পরিশ্রম করার জন্যে মানুষের ভীষণ প্রয়োজন সুষম খাদ্য ও পর্য্যাপ্ত বিশ্রাম । দুটোর একটাও এই মুহুর্তে আকাশের জীবনে ... নেই ।

এই রকম দিন গুলোতে সাধারনত আকাশ কারুর মেসেজের জবাবই দেয় না , সারাদিন ক্লাস ও ল্যাবের মধ্যে ডুবে থাকে ... কিন্তু সেইদিন কি হল কে জানে ... মেঘনা কে সে লিখেই দিল ...

- " দ্য পেন আই ফিল ইস দ্য ওনলি থিং দ্যাট রিমাইন্ডস মি আই 'ম এলাইভ ! "

গুড মর্নিং ...

দুপুরের ব্যস্ততার পরে আবার আকাশ ফ্রি হলো প্রায় সাড়ে তিনটার দিকে । আকাশের অফ টাইম মানেই আমাদের অনেকের মতই ফেসবুক ও হোয়াটস অ্যাপ এর দুনিয়া । এই ভার্চুয়াল জগতেই ঘুরে বেড়ায় আকাশ । নিস্পৃহ ভাবে লক্ষ্য করে মানুষের ভাল থাকার বিজ্ঞাপন আচ্ছা এত মানুষ যে ভাল থাকার ... বিজ্ঞাপন দেয় তারা কি সত্যিই ভাল আছে ? হয়ত আছে , হোয়াটস অ্যাপ খুলতেই মেঘনার মেসেজ ...


- দিনের শুরুতেই এমন একটা কথা কেন ... আপনার ? আমাকে কি বলা যাবে ... কিসের এত যন্ত্রনা ?


আজকের দিন টা আকাশের নয়, এইরকম একটা মেসেজের উত্তরে সে লিখল ...


- কি হবে তোমাকে বলে ? যে প্রবলেম এর কোন সল্যুশন নেই ... তা নিয়ে আলোচনা করে কি লাভ ?

মিনিট কয়েকের মধ্যেই উত্তর এল ...

- ঠিক বলেছেন ... আমি আর কি করতে পারি ? আমার ক্ষমতা কতটুকু ? আমাকে বলবেনই বা কেন আপনি ?

উত্তর টা পেয়ে আকাশের থামা উচিৎ ছিল ... থেমে গেলে হয় তো গোলমাল টা হতো না ।

- দেখলে তুমি কিন্তু মাইন্ড করলে ... তা হলে আমরা সব কথা ছেড়ে দিতে পারি না তো !! কিছু কথায় আমাদের মাইন্ড করতেই হয় ... তাই না ??

- ও ... এইভাবে সেইটা বুঝিয়ে দিতে হয় বুঝি ?

- না গো ... আমি কিছুই বোঝাতে চাই নি । যাকগে ছাড় বাদ দাও ।

- আজকে যদি আমি বলি কেন ছাড়ব ... কেন বাদ দেব ... তখন ??

- তাহলে কি করবো ... আমি বাধ্য । কারণ শুরুটা আমিই করেছি ।

- আপনার আজকে কি হয়েছে বলুন তো ... সব কথাকেই একটা নেগেটিভ দিকে নিয়ে যাচ্ছেন ?

- মানুষের জীবন কি পুরোটাই ... পজিটিভ হয় মেঘনা ? পজিটিভ নেগেটিভ মিলিয়ে মিশিয়ে একটা জগাখিচুড়ি হয়।

- সে হোক না ... তাতে আমার কি ? আমি তো শুধু আপনার সত্যি টা জানতে চেয়েছি । আপনি বলতে পারলে হয়ত আপনারই ভালো লাগবে ...

- সত্যি টা কিন্তু ভয়ংকর নিষ্ঠুর মেঘনা ... হয়ত পৃথিবীর সব সত্যির মতই ... আমার সত্যিটাও ভীষণ রকমের নগ্ন ।

- জানি আপনি সেইসময় আমায় অনেক বার বলতেন ... সত্যি টা যাই হোক তা সুন্দর তাই তার জামাকাপড়ের প্রয়োজন পড়ে না আর মিথ্যা বড্ড কুৎসিত , সবসময় তাকে মায়ার ... মোহের জমকালো কাপড় জামা পরে থাকতে হয়।

- এত কথা মনে আছে তোমার !! মনে রেখ না এত কিছু... ভুলতে শেখ মেঘনা । স্মৃতি সততই বেদনার ।

- হোক ... তবু যে বেদনা কে জয় করতে শিখে নিয়েছে তাকে কি বলবেন আপনি ??

- আমি না সত্যিই তোমাকে ... বুঝতে পারছি না । সেই দিনেও কি বুঝেছিলাম ... আদৌ ?

- আপনার তো বোঝার কথা নয় । আমি তো বুঝতেও দিতে চাই নি ...আপনাকে ?

- কেন ? কেন দাও নি ??

- আমি জানতাম এইটা হয় না । এ এক অসম্ভব ভাবনা । এ যেন আগের যুগের রতন আর পোস্টমাস্টারের গল্প ।

- তুমি কি বলছ ... তুমি জানো ??

- খুব ভাল করে জানি ... আজকে কি এত দিন পরে এসে আপনাকে মিথ্যে কথা বলব ? আজকে এত বছর পরে সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে আবার আমাদের দেখা হয়ে গেল ঠিকই কিন্তু দেখা না হলেও আপনি আমার মনে থেকে যেতেন... ফর এভার ।

- এত কথা সেইদিন বলো নি কেন ... মেঘনা ? কে বারণ করেছিল তোমায় ?

- আবার সেই একই প্রশ্ন করছেন ... উত্তর টা আমি কিন্তু দিয়ে দিয়েছি ... আমি সত্যিই বুঝতে পারি নি আপনি আর এক দিনও আসবেন না । আমাকে মুগ্ধ করে রেখেই আপনি চলে গেলেন ... মুগ্ধতা থেকে নিশ্চিন্ত হতে যতটুকু সময় লাগে তা কি আপনি আমায় দিয়েছিলেন বলুন ?

- অনেক সময় পেয়েছিলে তুমি ... ওই কটা মাস তুমি কি কিছুই বুঝতে পার নি ?

- না বুঝতে পারি নি ... পারলে আপনাকে যেতে দিতাম না । আমি শুধু এই জীবনের শেষ দিনেও আপনাকে একবার চোখের দেখা দেখতে চেয়েছিলাম , দেখতে চেয়েছিলাম আপনি ভালো আছেন , সুখী আছেন , আর কিছু আমার চাহিদা ছিল না ... কিন্তু এইভাবে আপনাকে দেখতে পেয়ে ... আমার যন্ত্রনা ... থাক বাদ দিন । অনেক আজেবাজে বকলাম । আমি আজকে আসি ।

- এসো তোমাকে আটকে রাখি এমন জোর কি আমার আছে ?

- এই কথার কোন উত্তর হয় না... তবু বলে যাচ্ছি জোর যদি কারুর থাকে সে আপ ... না থাক । এখন আসি , কালকে কথা হবে টাটা।

পর্ব ::৬ রবিঠাকুর বলেছেন ... " পৃথিবীতে বালিকার প্রথম প্রেমের মত সর্বগ্রাসী প্রেম আর কিছুই নাই। প্রথম যৌবনে বালিকা যাকে ভালোবাসে তাহার মত সৌভাগ্যবানও আর কেহই নাই। যদিও সে প্রেম অধিকাংশ সময় অপ্রকাশিত থেকে যায়, কিন্তু সে প্রেমের আগুন সব বালিকাকে সারাজীবন পোড়ায় " । আমাদের গল্প কতটা আকাশের আর কতটা মেঘনার বা কতটা তাদের দুজনের সেইটা সময় বলবে , এখন এই পোড়ার কথাই যখন উঠল তখন এইটাও বলতে হয় যে ... এর দরকার ই বা পড়ল কেন ? শুধু শুধুই কি কেউ পুড়তে চায় ? না কি পোড়াটা পূর্বনির্ধারিত ! আকাশ ও মেঘনা কি নিষ্ঠুর সময়ের হাতের পুতুল মাত্র? তাদের কি সত্যিই কিছু করার ছিল না ? শণিবার দিনটা আকাশের প্রায় ফাঁকা ই কাটে ।এই সপ্তাহে প্রতি দিনই মেঘনার সাথে ...তার কথা বার্তা চলছে কিন্তু সেইরকম দীর্ঘ সময় ধরে কথা হয় নি । আকাশের বেশ ফাঁকা ফাঁকা লেগেছে এই কদিন ! নিজেরই তাতে বেশ অবাক লাগছে আকাশের ... কি হচ্ছে এইসব !! দুপুর বেলায় হোয়াটস অ্যাপ খুলে সেইদিন মেঘনা কে অনলাইন পেল আকাশ । - কি করছ ? - সংসার ...আর কি করব বলুন ? একটা কি কাজ আমার ? আপনি কি করছেন ? - কিছুই না সেইরকম ...ওই টাইম পাস করছিলাম , ল্যাবের কিছু কাজ করছিলাম এতক্ষন... বলো তোমার কি খবর । - আমার কথা তো অনেক বললাম আপনি বলুন ! আপনি তো কিছুই বলছেন না !! কেন বলছেন না বলুন তো ? সেইসময় তো কিচ্ছু জিজ্ঞেস করতে হতো না কি সুন্দর সব বলে দিতেন। - বলার মত যেগুলো আছে সেইগুলো বড্ড গোলমালের কথা যে মেঘনা ! কোনভাবে সেই কথা গুলো শুনে তুমি যদি আহত হও তা হলে তো ... সেইটা ভাল ব্যাপার হবে কি ? - থাক...আমার ভাল মন্দ নিয়ে যেন কত ভেবেছিলেন সেইদিন মশাই !! আজকে আর নাই বা ভাবলেন । - আবার সেই কথা ! তুমি কি সত্যিই আমায় বোঝাতে চেয়েছিলে কিছু ? বলত ? - না চাইনি তো...চাইলে কি আমি বুঝতে দিতাম না আপনাকে ?? আমি জানতাম আপনাকে বেঁধে রাখতে আমি পারব না ... তাই !! - তাই ?? -তাই আপনার সাথে বন্ধনহীন প্রেম করেছি আপনাকে মুক্ত করে দিয়ে ভালোবেসেছি , আর সেইজন্যেই তো আপনার প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই ... সেইদিনেও ছিল না আজকেও নেই । মেঘনা দেখতে পেল না ঠিক সেই মুহুর্তে আকাশের কোথাও একটা আবার রক্তক্ষরণ হলো । - কথাটা আবেগের দিক দিয়ে চমৎকার মেঘনা , কিন্তু বাস্তবের মাটিতে দাঁড়ালে এই কথার কোন জোর থাকে কি ? - না থাকে না । জানি তো ... থাকার দরকার কি বলুন তো ? আমি তো কারুর উপরেই কোন জোর করি নি । আপনিও কি আমাকে কিছু বলতে চেয়েছিলেন ? - অনেককিছু ...কিছু হয়ত বলেও ছিলাম তোমার মনে নেই। - আপনার কথা আমি ভুলে যাব !! হিঃ হি‌ঃ ... হাসালেন আপনি !! যাক আমি যা জিজ্ঞেস করেছি তার কিছু তো বলুন । - তাহলে যে একেবারে প্রথম থেকেই শুরু করতে হয় মেঘনা ! - বেশ তো তাই হোক না আপত্তি কোথায় ? আমি তো সেই ৯৯ এই পড়ে আছি ।আপনি বলে যান আমি ঠিক সময় করে পড়ে নিয়ে ...উত্তর দেব । মেঘনা বলে তো গেল কিন্তু আকাশ ? ... বলুন বললেই কি বলা যায় ? সবাই কি সবটা পারে ? লিখতে গিয়ে এটা লেখে ওটা কাটে ... এই করে বাড়ি যাওয়ার আগে এইটুকুই লিখতে পারল আকাশ । - জানো মেঘনা , আমাদের ছোটবেলায় খুব লোডশেডিং হত, লোডশেডিং হলেই বাবা আমায় মহাভারতের গল্প বলতেন,আর রেল কোয়ার্টারের বারান্দায় বসে বসে আমি কল্পনায় কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে চলে যেতাম । মহাভারতের এত রথী মহারথীদের মধ্যে আমার সবচাইতে প্রিয় চরিত্র কে ছিল জানো ? ... অভিমন্যু । একটি ষোড়ষ বর্ষীয় কিশোর অকুতোভয়ে শত্রুর চক্রব্যুহে প্রবেশ করছে যেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথটি তার অজানা তবু কি নিশ্চিন্তে... নিশ্চিৎ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছে সে ! ! একেবারে আদর্শ ক্ষত্রিয়ের ধর্ম ! একে ভাল না বেসে কি উপায়... বলো ? আমার মাঝে মাঝে মনে হয় আমার এই মহাকাব্যের নায়কের মত আমিও সময়ের চক্রব্যুহে ঢুকে পড়েছি , ঢুকে তো পড়েছি , কিন্তু বেরিয়ে আসার রাস্তাটি বোধহয় কোনদিনেই বের করতে পারলাম না । প্রশ্ন করবে নিশ্চয় ...কেনো ? এর উত্তর বোধহয় আমারও জানা নেই । তবে একটা চেষ্টা করে দেখতে পারি । আজকে এইটুকুই থাক ... আগামী কাল আবার কিছু বলার চেষ্টা করা যাবে । বাড়ি ফিরেই আকাশের টিউশন আবার সে মোবাইল খোলে রাত্রি বেলায় তখন প্রায় ১০ টা ... মেঘনার জবাব এসেছে সন্ধ্যে ৭ টার দিকে । - অপেক্ষায় থাকলাম । আবারও বলছি কোন তাড়া নেই আমার । ধীরে সুস্থে লিখুন ... অন্যেরা যে যাই করুক আমার কাছ থেকে আপনার কোন রক্তপাতের ভয় নেই ... এই একটি বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন । পর্ব ::৭ শান্তি জিনিস টা আকাশের জীবনে বহুদিন ধরেই অধরা । আজকাল রাত্রে ঘুম টাও ভালো হয় না তার ! সারাদিন এত খাটা খাটনি করে ... তাও কেন যে ঘুম আসতে চায় না ... কে জানে ? ঘুমের জন্যে মানুষের ক্লান্তির থেকে শান্তির বোধহয় বেশি প্রয়োজন ... অথচ এইরকম হওয়ার কথা ছিল কি ? কত আশা নিয়ে তো মানুষ সংসার সাজায় কিন্তু সেই সংসার টা ভেঙ্গে যাওয়া টা কি কোনদিন কাম্য হতে পারে ? কথায় আছে মানুষ মাত্রেই ভুল করে কিন্তু কিছু ভুল এর বোধহয় কোন ক্ষমা নেই ... নিজের কাছেও নেই , জীবনের কাছেও নেই । আকাশ ও ইতির বিবাহিত জীবন টা মাত্র ৬ বছরের ; একটা মানুষের গোটা জীবনের কাছে এই সময় টা কি আদৌ কোন সময় !!মুশকিল টা হলো এই সময়ের কথা মনে পড়লেই আকাশের মনের কোথাও আজকেও উথাল পাথাল হয়... নিজেকে সেই মুহুর্তে গোটা পৃথিবী থেকে আলাদা করে নিতে হয় তাকে । আকাশের এখন কেমন মনে হয় একসাথে থেকে সংসার করতে গেলে সমমনস্ক মানুষের বড় প্রয়োজন । দুটো বিপরীত মনের মানুষ এক ছাদের নিচে একটা সংসারে প্রবেশ করলে ... সংসার টা আর সংসার থাকে না , যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়ে যায় । যুদ্ধক্ষেত্রে কি কোনদিন শান্তি থাকে ? যুদ্ধ শেষ না হওয়া অব্দি ?? বাস্তবজীবনে সুখের থেকেও মানুষের শান্তির বেশী প্রয়োজন ... গোলমালের কথাটা হলো সুখ থাকলেই শান্তি থাকবে এমন নিশ্চয়তা বোধহয়... স্বয়ং বিধাতাও দিতে পারেন না । আকাশের তথাকথিত শুভানুধ্যায়ী রা বলে যে তাদের একটা সন্তান থাকলে হয়ত এই বিচ্ছেদ হত না ... কে জানে হত কি হত না ? যা ভাঙার তা তো ভাঙবেই ... কোনভাবেই কি তাকে আটকে রাখা যায় ? সন্তানের আকাঙ্খা কি আকাশের ছিল না ...? ইতির সাথে বিয়ের আগে ... কত দিন সে স্বপ্ন দেখেছে তাদের একটা ফুটফুটে মেয়ে হবে । রাজকন্যার মত ... পরীর মত ফ্রক পরে ঘুরে বেড়াবে সারা বাড়িতে । আধো আধো স্বরে আব্দার করবে আকাশ কে ।জীবনের কাছে কি খুব বেশি কিছু চেয়েছিল আকাশ ? কে জানে ? এইরকম দিন গুলোতে আকাশ প্রচণ্ড অন্যমনস্ক থাকে , গাড়ি চালাতে গিয়েই সে টের পেল আজ তার গোলমাল টা বেশ উঁচুদরের ... মনটা আজকে তার একদমই বশে নেই । গুড মর্নিং মেসেজ পাওয়া টা বা পাঠানো টা একটা অভ্যেসের মত , আজকের এই ডিজিটাল দুনিয়ায় একটা মেসেজ মুহুর্তের মধ্যে দুটো মানুষ এর মন কে কাছাকাছি এনে দেয়... এই ব্যাপার টা আকাশের বেশ লাগে । সেইদিন কিন্তু সকালে স্কুলে পৌঁছে আকাশ মোবাইল খোলেই না , কারন টা সহজেই অনুমেয় , কেউ কেউ জীবনের মঞ্চে অভিনয় টা একেবারেই করে উঠতে পারে না । ফার্স্ট হাফটা ক্লাস করার পরে একটু মেজাজটা ...তার ঠান্ডা হলো । পড়ানোটা আকাশের সবসময়ই কমফর্ট জোন । মানুষের কমফর্ট জোনের সাথে তার মানসিক স্থিতাবস্থার একটা সুন্দর সদ্ভাব আছে । কিছুটা চাঙ্গা হয়ে টিফিনের সময় নিজের ল্যাবে বসে মোবাইল খুলে সকাল থেকে আসা মেসেজ গুলো দেখছিল সে ... ঠান্ডা টিফিন টা খেতেও ইচ্ছে করছে না আর আজকে । হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল মেঘনার করা এই মেসেজ টায় । - ট্যকিং এবাউট আওয়ার প্রবলেমস ইস আওয়ার গ্রেটেস্ট অ্যাডিকশন , ব্রেক দ্য হ্যাবিট , ট্যক এবাউট ইয়োর জয়েস .... গুড মর্নিং । প্রথমে আকাশ ভাবল আজকে কিছু লিখব না তবু কেন জানিনা তার হাত থেকে বেরিয়ে গেল ... - ওয়ান অফ দ্যা মোস্ট ডিফিকাল্ট টাস্কস ইন লাইফ ইস রিমুভিং সাম ওয়ান ফ্রম আওয়ার হার্ট । মেসেজ টা পাঠানোর বেশ কিছুক্ষন পরে জবাব এল ... - আবার সেই মন খারাপের রোগ ! সেই আগের মতই ! আচ্ছা আপনার কি এখন সময় আছে ? ** হুমম তা আছে । এই আধঘন্টা মত ... চলবে ? - খুব চলবে ... এইবারে বলুন তো এইটা কি হচ্ছে ?আজকে প্রায় একমাস হল জিজ্ঞেস করেছি ... তাতে না বলছেন নিজের কষ্টের কথা গুলো না সব কিছু ভুলে যেতে পারছেন ! - সবকিছু কি ভোলা যায় মেঘনা ? তুমি পার ... সব কিছু ভুলতে ? - না পারি না... কিন্তু যদি কেউ আমায় ঠকায় তাহলে আমি তাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করি ... বা বলা ভাল ভুলে থাকার অভিনয় করি । - বাবা ...এত ম্যাচুরিটি কবে এল তোমার ? - আপনি ই করে দিয়ে গেছেন আমায় এত ম্যাচিওরড ! শুধু কি তাই ...আমার অনেক কিছু পসিটিভ এটিটিউড ই আপনার কাছে শেখা । আজকে তাই ভাবতে খুব খারাপ লাগে ... যে মানুষটার আমার জীবনে এত অবদান সে নিজেই আজকে কিছু একটা ভয়ানক পরিস্থিতির স্বীকার !! যেদিন আপনাকে খুঁজে পেয়েছিলাম সেদিন ঘুনাক্ষরেও জানতে পারিনি যে আপনার জীবন টা এত ওলোট পালোট হয়ে গেছে !! আকাশ লিখতে গেল ... খুঁজে পেয়ে কি খুব ভাল লাগল তোমার আমাকে দেখে ? এত কথা বলেছিলাম তার...একটা কথাও না বোঝার মত বোকা তো তুমি ছিলে না মেঘনা ! কেন বোঝনি বল তো ... বুঝলে কি আজকে ?? আধখানা লিখে ... সে আবার মুছে লিখল ... - মেঘনা তোমাকে আমার কিছু কথা বলার আছে বা বলতে পার জিজ্ঞেস করার আছে ... হয়ত কথা গুলো আজকের নিরিখে সেইরকম অর্থবহ নয় ... তবু জিজ্ঞেস করি ? তুমি অনুমতি দিলে করব ... - নিশ্চয় করবেন কেন করবেন না ? যেদিন ইচ্ছে সেইদিন জিজ্ঞেস করবেন ... আপনাকে তো বলেছি আপনি আমার কাছে ... থাক বার বার এক কথা বললে সেই কথার ওজন কমে যায় । - আমি তোমার কাছে কি মেঘনা ? বল ... - নিজেকে জিজ্ঞেস করুন । এই প্রশ্নের উত্তর ... আমি দেব না । আজকে রাখি ...ছেলে ,মেয়েকে নিয়ে পার্কে যাব । তবে এইটুকু বলতে পারি ...আমি আমার জীবনের প্রথম ভালবাসা কে বিসর্জন দিয়েছিলাম , তাকে অন্যের হাতে তুলে দিয়েছিলাম সে সুখী থাকবে বলে ... নইলে ... - নইলে কি মেঘনা ... বলে যাও ... - নইলে আজকের এই অলোচনা করার কোন দরকার ই পড়ত না হয়ত !! - কি বলছ ... কিচ্ছু বুঝছি না আমি । - বুঝতে হবে না , সেদিনই বোঝেন নি ... আজকে বুঝে কি করবেন । আসি...বাড়ি ফেরার সময় সাবধানে গাড়ি চালাবেন আর পারলে বাড়ি গিয়ে একটা মেসেজ করে দেবেন । মেঘনা দেখতে পেল না ... সেইদিন আবার আকাশের রক্তক্ষরণ হল এবং হয়েই চলল । কারণ টা কি ? নাহ্ কারণ টা কিছুটা বুঝতে গেলেও আমাদের একবার ফ্ল্যাশব্যাকে যেতেই হবে সেই ...১৯৯৯ ... আকাশ তখন শান্তিনিকেতনের বিনয়ভবনের ছাত্র । (চলবে)





নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮