• রঞ্জন কুমার সেন

বড়গল্প - ন উদ্বিজতে



রেডিওতেশোনা নাটকের ডায়লগগুলো এখন রেখার কানে পরিষ্কার বাজছে । পিতৃসত্য পালনের জন্য তিনি বনবাসে যাবেনই , এরকম সংকল্প আর সৎসাহস নিয়ে রামচন্দ্র এসে সীতাকে বলছেন " প্রিয়ে, সবই তো শুনেছ ? এবার আমায় বিদায় দাও । বনবাসে যাওয়ার জন্য আমি মনে মনে প্রস্তুত "।

সীতা -------" হে আর্য, আপনি কি একাই বনবাসে যাবেন বলে স্থির করেছেন ? "

রাম -------" হ্যাঁ, একাই । পিতৃসত্য পালনের দায়িত্ব তো কেবল আমার একার "।

সীতা ------" নাথ, বেশ বললেন তো --------আমার একার । আমার কথা আপনার একবারও মনে এলো না ?"

রাম ------"এর মধ্যে তুমি কেন নিজেকে জড়াতে চাইছ ?"

সীতা -------" ধর্মত আমার অধিকার আছে বলে । আপনার মনে নেই, আমাদের বিবাহের সময় যজ্ঞের অগ্নি , পুরোহিত , মুনি , ঋষি ও গুরুজনদের সাক্ষী রেখে শপথ নিয়েছিলাম যে আমরা জীবনে চলার পথে , সুখে , দুঃখে , সম্পদে , বিপদে একসাথে থাকব ? "

রাম -------" হ্যাঁ , মনে আছে "।

সীতা ------" তবে সেই শপথ পালন করার সুযোগ দিন আমায় ?"

রাম ------" কি বলছ সীতা ? তুমি ধারণা করতে পারছ নাযে বনবাসে কত কষ্ট। রাজপ্রাসাদের এই বৈভব ছেড়ে গভীর অরণ্যের মধ্যে অন্ন, জল, বাসস্থান হারাহয়ে ভিখারিনীর মত দিনযাপন তুমি করতে পারবে ?"

সীতা -----" রঘুকুলতিলক শ্রীরামচন্দ্র আমার পাশে থাকলে, আমি সবই পারব । আর শুধু কষ্টের কথা কেন বলছেন ? বনের ফল খেয়ে আর ঝর্ণার জল পান করে আমরা জীবন ধারণ করব । কুটির বেঁধে বাস করব । অরণ্যের উন্মুক্ত আকাশে প্রভাতসূর্যের উদার প্রসন্ন হাসি দেখে মুগ্ধ হব । নবীন আশায় বুক বাঁধব । বনফুলের মালা গেঁথে আপনাকে পরাবো । সরোবরের পদ্ম চয়ন করে এনে আপনাকে উপহার দেব ।"

রাম " আর যখন রাত্রির অন্ধকারে বনভূমিতে হিংস্র জন্তুরা দাপিয়ে বেড়াবে, কোনো দুর্বল প্রাণীকে বধ করে বাঘ সিংহ ইত্যাদি শ্বাপদেরা উল্লাসে গর্জন করবে, তখন তা সহ্য করতে পারবে ? বনভূমির বিভীষিকায় কাতর হয়ে পড়বেনা ? "

সীতা ------" কাতরতা ? হে নাথ আপনি তো জানেন যে আমি ধরিত্রীকন্যা। তাই আমার সহনশীলতা ধরিত্রীদেবীরই মতো । আর, বিভীষিকা ? আমি রাজা জনকের নন্দিনী , ভয় কি বস্তু তা আমি জানিনা । এতদিন জানতাম , আপনি একজন পরাক্রান্ত বীর পুরুষ । এখন মনে প্রশ্ন জাগছে , পিতা কি তবে এক পুরুষরূপী স্ত্রীলোকের সঙ্গে আমার বিবাহ দিয়েছেন ?"

রাম ------" প্রিয়ে , আমি এতক্ষণ তোমার মনোবল পরীক্ষা করছিলাম মাত্র । তোমার আত্মবিশ্বাস দেখে আমি অনুপ্রাণিত ।"

এর পরের ডায়লগগুলো রেখার আর স্মরণে আসছেনা । আসবেই বা কি করে ? বছর তিনেক আগে রামায়ণের অযোধ্যাকান্ড অবলম্বনে এই বেতারনাটক ও শুনেছিল। অভিনেতা - অভিনেত্রীদের আবৃত্তি কত নিখুঁত হলে একটা শ্রুতিনাটক জীবন্ত হয়ে ওঠে , মনে রেখাপাত করে , একথা ভেবে রেখা একটু একটু করে নাটকের অনুরাগী হাতে শুরু করেছিল । অবশ্য তখন ওর বিয়ে হয়নি ।


এখন চোখের জলে ভেসে যেতে যেতে রেখার মনে হচ্ছে যে ------তবে কি ভাগ্যের পরিহাসে নাটকে বর্ণিত কাতরতা আর বিভীষিকাই শুধু জীবন্ত হয়ে উঠলো ? চৈত্র মাসেরশুক্লপক্ষের চাঁদের আলোয় ও একটু আগে স্পষ্ট দেখেছে গভীর বনের ভেতর থেকে এক জোড়া জ্বলন্ত সবুজ চোখ ওদের দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে । প্রচণ্ড ভয়ে ওর বুক ধড়ফড় করতে লাগলো । তড়িৎও জানোয়ারটাকে দেখতে পেয়েছিলো । তড়িৎ ভয়ে কাঁপছিলো । রেখা আর পারেনি , পশে বসা তড়িতের কোলে মুখ গুঁজে দিয়ে ভাবছিল, ওদের আয়ু বোধ হয় আর কয়েক মিনিট মাত্র । তারপরেই জানোয়ারটা ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে শরীর দুটোকে ছিন্ন - ভিন্ন করে দেবে । স্বামীর চাকরি গেছে , আশ্রয় থেকেও বিতাড়িত , অন্ন - জল ও জুটছেনা । জীবনের সব রং মুছে গেছে । এবার শুধু প্রাণ দুটো যাওয়া বাকি ।

ভয় আর উদ্বেগের এক একটা মুহূর্ত যেন এক এক বছর । জানোয়ারটা খুব কাছাকাছি চলে এসেছে । প্রতিরোধ করবে ? ক্ষিদেয় তেষ্টায় অবসন্ন দেহমন নিয়ে কি বা প্রতিরোধ করা যায় ? বুকফাটা আর্তনাদ যেন নীরবে দলা পাকিয়ে তড়িতের গলার কাছে এসে জড়ো হয়েছে ।

সুতীব্র বেদনায় ক্ষীণস্বরে একবার "ঠাকুর " বলে উঠে তড়িৎ এবার ওর কোলে রাখা রেখার মাথার ওপরনিজের মাথাটা ঝুঁকিয়ে দিল । " ঠাকুর " শব্দটা রেখার কানেও গেল । আর তা যাওয়া মাত্রই রেখার মানসপটে একটি মুখচ্ছবি ফুটে উঠল । সেটি আদ্যাপীঠের আদ্যামার । এক ঝটকায় তড়িতের কোলের ওপরথেকে নিজের মাথাটা তুলে , রেখা তড়িৎকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরল।

তড়িতের গায়ে হাত দিয়ে রেখা দেখল ওর শরীর ঠান্ডা হয়ে এলিয়ে পড়েছে । রেখা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল । ওর চোখ - নাক দিয়ে জল ঝরছে । দৃষ্টি আচ্ছন্ন হয়ে গেছে । অস্বস্তি কাটাতে ওড়নার কাপড় দিয়ে চোখ - মুখ মুছল । পরক্ষণেই সামনের দিকে দৃষ্টি পড়তেই চাঁদের একফালি উজ্জ্বল আলোয় রেখা দেখল কিছু দূরে একটা ছোট ঝোপ দুলে দুলে উঠছে আর সেখান থেকে একটা সর-সর শব্দ উঠে আসছে । সেই শব্দটাকে অনুসরণ করে জানোয়ারটা ওই ঝোপের দিকে এগিয়ে গেল।


বিপদ কি তবে কাটলো ? না কি সাময়িক বিরতি ? দুর্ভাগ্যের আঘাত আবার যদি আসে ? কি হবে ? চিন্তাশক্তির আর কিছুমাত্র অবশিষ্ট নেই । তড়িতের মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরে , রেখা আদ্যামার মুখটা শুধু স্মরণ করতে থাকল ।

কেঁদে কেঁদে রেখার চোখের জল শুকিয়ে গেছে । গলাও শুকিয়ে কাঠ । খাবার জল একটু পেলে ভাল হতো । তার আগে তো তড়িৎকে একটু জল খাওয়ানোর দরকার । কিন্তু জল কোথায় ? আজ দুপুরবেলা ফরেস্টের ঝর্ণা থেকে দুটো বোতল জলে ভরে দিয়েছিল তড়িতের সহকর্মী বন্ধু দীপক আর তিমির । তার থেকে এক বোতল জল খরচা হয়ে গেছিল । কিন্তু আর একটা বোতল কোথায় ? খুঁজে দেখা দরকার । রাত কত হলো , সেটাও জানা দরকার ? বুকের ভেতর গোঁজা মোবাইল ফোনটা রেখা বার করল । ফোনটা চালু করতেও ভয় করছে । ফোনের আলো অনুসরণ করে যদি অন্য কোনো জানোয়ার কাছাকাছি চলে আসে ? যা হয় হোক ! মনে মনে আদ্যামাকে প্রণাম করে মোবাইলটা কোলের ভেতরে নামিয়ে একবার চালু করে দেখল রাত্রি সাড়ে তিনটে বাজে , তারিখ ৩০ শে মার্চ , ২০২০ । ওই চাপা আলোতেই আন্দাজ পেল তড়িতের ব্যাগটা কোথায় । অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে জলের বোতলটা বার করলো । সামান্য একটু জল নিয়ে তড়িতের ছোখে মুখে বুলিয়ে দিল । তড়িতের সম্বিৎ একটু ফিরতে ওকে একটু জল খাওয়ালো , নিজেও একটু খেল ।


এভাবে মুহ্যমান অবস্থায় দুজনে কিছুক্ষনকাটানোর পর, দেখল চাঁদের আলো ম্লান হয়ে আসছে আর আকাশের কোলে ঊষার আভাস । কিছু পরে আলো ফুটতে রেখা দেখল একটা বেশ মোটা কান্ডযুক্ত ইউক্যালিপটাস গাছের গোড়ায় কিছুটা ঢিবিযুক্ত পাথুরে জমির ওপর ওরা দুজনে বসে রয়েছে । ক্ষিদেয় পেটে কষ্ট হচ্ছে ।

গতকাল দীপক আর তিমির দুপুরবেলা জলের বোতল ভরে দিয়ে তড়িৎকে বলেছিলো " তোরা দুজনে এই ইউক্যালিপটাস গাছটার গোড়াতেই থাকবি । কোথাও যাবিনা । তোদেরদুজনেরই শরীরের অবস্থা ভাল নয় । আমরা দেখছি কাছাকাছি গাছগুলো থেকে খাওয়ার মতো ফল কিছু পেড়ে আনা যায় কি না । এছাড়াও , ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের কোনো লোকজন বা গাড়ি যদি দেখতে পাই , তবে ছুটে এসে তোদের খবর দেব । পথ ভুল করে আমরা যে একটা বনের মধ্যে ঢুকে পড়েছি , সেতো বোঝাই যাচ্ছে । যাই হোক না কেন , ঘাবড়াবি না । একঘন্টার মধ্যে ফিরে আসবো । একথা বলার পরে দীপক আর তিমির দুজনেই ফলের গাছের সন্ধানে একই দিকে রওনা দিয়েছিলো । বনপথের দুধারে সন্ধানী চোখ মেলে এগোতে থাকলো ।

এগোতে এগোতে ওরা প্রায় এক কিলোমিটার পথ পার হয়ে গেল । কিন্তু একটাও ফলের গাছ নজরে পারলনা । অধিকাংশই শাল আর শিমূল, আর কিছু পলাশ ফুলের গাছ ফুলে ছেয়ে আছে । উন্মুক্ত বনভূমিতে তার শোভাই আলাদা । দুজনেই দেখে মুগ্ধ । হঠাৎ দীপকের সম্বিৎ ফিরতে তিমিরকে বলল " এই , আমরা অনেকটা দূরে চলে এসেছি ওদেরকে ছেড়ে । অনেকক্ষণ হল ।এবার ফিরে যাওয়া দরকার "।

এমন সময় তিমির বলল "ঐ দ্যাখ, গাছটায় পেয়ারা হয়েছে ।" দীপক উৎসুক দৃষ্টি মেলে দেখল, সামনে একটা পেয়ারা গাছে বেশ ফল ধরেছে । দীপক বলল -------"চাল তিমির , পেয়ারা পাড়ি ।" দুজনে মহানন্দে উনিশ কুড়িটা পেয়ারা পাড়লো । বেশ সুস্বাদু , ক্ষিদের মুখে কিছু পেয়ারা খেল । তারপর বাকি পেয়ারাগুলো গামছায় বেঁধে ফেরার পথ ধরল।

বিশ পঁচিশ মিটার পার হয়ে এসে হঠাৎ দীপক দেখল , প্রায় দশ ফুট লম্বা একটা গোখরো সাপ পথ জুড়ে শুয়ে আছে । তিমিরকে দেখিয়ে সাবধান করল । এই অবস্থায় পথ পার হওয়া যাবেনা বলে দুজনে চুপ -চাপ দাঁড়িয়ে রইল প্রায় পনেরো মিনিট । কিন্তু সাপটা নড়েও না চড়েও না । এদিকে বিকেল হয়ে গেছে , তড়িতদের কাছে ফিরতে হবে । তাই দীপক আর তিমির সাপটাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য কোনাকুনি জঙ্গলের ভেতরে ঢুকল । ঐভাবে সাপটাকে অতিক্রম করে ফেরার পথে ওঠার পর দুজনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল । আবার ফিরতে শুরু করল । কিন্তু ভয় , উত্তেজনা , আবেগের ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে দুজনের কেউই লক্ষ্য করেনি যে সামনের পথে ঘন কাদাজল রয়েছে । সে পথে পা পড়তে দুজনেই পিছলে পড়ল । দীপক সম্পূর্ণ চিৎ হয়ে এমনভাবে আছাড় খেল যে ওর শিরদাঁড়ার গোড়ায় এবং কোমরে প্রচণ্ড আঘাত লাগল ।

অসহ্য যন্ত্রনায় দীপক ছটফট করতে লাগল । তিমির পাক খেয়ে পাথুরে জমির ওপড় এমনভাবে পড়ল যে ওর ডান পায়ের হাঁটুতে প্রচণ্ড আঘাত লাগল । ব্যথায় কুঁকড়ে গেল তিমির । কে কাকে দেখে, কে কাকে সেবা করে, তার নেই ঠিক । এভাবে যন্ত্রনায় কাতর অবস্থায় প্রায় এক ঘন্টা জঙ্গলের মাটিতেই পড়ে রইল দুজনে । কে কার ছোখের জল মোছায় ? শরীরের অবশিষ্ট শক্তি এক করে কোনোক্রমে দুজনে ‘তড়িৎ’, ‘রেখা’ বলে চার পাঁচবার ডাকাডাকি করল । কিন্তু প্রায় এক কিলোমিটার দূরে থাকা তড়িৎ বা রেখার কানে সে ডাক পৌঁছালো না ।

যন্ত্রনায় অজ্ঞান অবস্থা । যখন জ্ঞান ফিরল , তখন রাত্রির অন্ধকার নেমে এসেছে । দুজনেরই মোবাইলএর চার্জ ফুরিয়ে গেছিল । অগত্যা, যা হবার হয়ে যাক , এইরকম ভেবে দুজনে মরার মতো পড়ে রইল । কখন যে চোখে ঘুম এসে গেছিল টের পায়নি । ঐভাবেই সারারাত ওরা মাটিতে পড়েছিল । ওই অবস্থায় ওরা অনেক বিপদে পড়তে পারত । কিন্তু , ভাগ্য আর কতদিক দিয়ে মারবে ? যখন ভোরের আলো ফুটছে , তখন হাজার হাজার পাখির কলতানে ওদের ঘুম ভাঙলো । দুজনেই একটু একটু করে উঠে বসল।এখন আকাশ একদম পরিষ্কার হয়ে গেছে । দিনের আলো স্পষ্ট । হঠাৎ তিমির দেখে একটু দূরে দাঁড়িয়ে একটা মাঝবয়সী হতদরিদ্র লোক ওদের চেয়ে দেখছে । তিমির আন্দাজ করল যে লোকটা একজন স্থানীয় গ্রাম্য মানুষ, সহজ সরল গোছের হবে । ও মনে একটু বল পেল । দীপক বসে বসে ঝিমুচ্ছিল ।

দীপককে একটু ঠেলা মারতে, ওর দৃষ্টি পড়ল সোজা ওই লোকটার ওপর। দীপক বলল “এখানকারই লোক মনে হচ্ছে ? ডাক না ?” ওরা দুজনেই লোকটাকে হাত নেড়ে কাছে ডাকলো । লোকটাও ওদের কাছে চলে এল । জল-কাদায় মাখামাখি গামছার ভেতর থেকে দুটো বড় পেয়ারা বার করে তিমির লোকটার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল । লোকটাও হাসি হাসি মুখে এসে ফলদুটো হাত পেতে নিল । লোকটা ওর ভাষায় ওদের দুজনকে কিছু বলল , যা ওদের কাছে দুর্বোধ্য ঠেকলো ।

এবার দীপক আর তিমির দুজনেই হাতজোড় করে লোকটাকে বলল "থোড়া সহায়তা করো না ? বাহার নিকালনেকা রাস্তা কিধার হ্যায় ?" লোকটা ওদের কথার মানে কিছুই বুঝতে পারলনা । অবাক দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে রইল ।

এদিকে দিনের আলো স্পষ্ট হতে তড়িৎ আর রেখা খুবই ব্যাকুল হয়ে পড়েছিল , দীপক আর তিমিরের জন্য । দীপক আর তিমির গতকাল ফলের গাছের সন্ধানে যে দিক ধরে গিয়েছিল, সেদিক ধরেই অবসন্ন শরীর নিয়ে তড়িৎ আর রেখা ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে থাকল ।

ওপাশে দীপক আর তিমির অনুভব করল যে সাধারণভাবে দক্ষিণ ভারতীয় মানুষদের সঙ্গে হিন্দিভাষায় কথা বললে যে সমস্যা হয় , এই লোকটার সঙ্গেও সেই সমস্যা হচ্ছে । তাই অন্য কোনো উপায় জানা নেই দেখে , ওরা দুজনে হাতজোড় করে লোকটাকে বলতে লাগল -----" হেল্প হেল্প "।

এবারেও লোকটা ভাষা বুঝতে পারলনা । তবে বোধহয় করুনার উদ্রেক হল । কাছে এসে দুহাত বাড়িয়ে দীপক আর তিমিরের এক একটা হাত চেপে ধরল । বিগত চার -পাঁচদিন ধরে লাগাতার উদ্বেগ , ভয় , ক্ষিদে , তেষ্টা , ক্লান্তি আর অভাবের তাড়নায় ক্ষত -বিক্ষত হওয়ার পর এই প্রথম একটা মানুষের স্নেহের স্পর্শ পেয়ে দুজনেই আবেগে ভেসে গেল । লোকটাকে জড়িয়ে ধরে হাউ - হাউ করে কেঁদে উঠল । জড়িয়ে ধরার সময় নিজেদের অজান্তেই ওরা দুজনে দাঁড়িয়ে উঠেছিল ।

হঠাৎ দূর থেকে ভেসে আসা একটা কান্নার আওয়াজ তাড়িত আর রেখার কানে এল । তড়িৎ বলে উঠল “গলার স্বরগুলো যেন চেনা চেনা লাগছে ? চল তো ?” একথা বলেই তড়িৎ যতটা সম্ভব উঁচু স্বরে ডাকতে লাগল “দীপক ! তিমির ! তোরা কোথায় ?” বার বার ডাকতে ডাকতে ওরা এগোতে থাকল ।

যাদের নাম ধরে এত ডাকাডাকি , তাদের কানেই পৌঁছাল সেই ডাক । তারা সমস্বরে হাঁক দিল " ওরে তোদের দেখতে পেয়েছি আমরা । সোজা চলে আয় এদিকে ।"

এবার হাঁফাতে হাঁফাতে তড়িৎ আর রেখা ওদের কাছে এসে পৌঁছাতেই দীপক আর তিমির বুকে জড়িয়ে ধরল তড়িৎকে । তাদের কান্না আর থামেনা । এবার তড়িৎ বলল " আমরা আর পারছি না রে ভাই ! কিছু খেতে দে ।" তখন তিমির গামছার ঝোলায় ভরা পেয়ারাগুলো তড়িৎকে দিল । তড়িৎ বলে উঠল রেখাকে "নাও নাও , খাও । খুব কষ্ট হয়েছে তোমার ।"


তার কাছে দুর্বোধ্য বাংলা ভাষায় এত ডাকা -ডাকি , হাঁকা -হাঁকি শুনে , এত আবেগের ঘনঘটা দেখে ওই গ্রাম্য লোকটা হতচকিত হয়ে গেল । সঙ্গে রেখাকে দেখে সে একেবারে অবাক । সে এটুকু নিশ্চিত বুঝল যে এরা পথ ভুল করে এই বনভূমিতে ঢুকে পড়েছে । এদের বনের এলাকার বাইরে নিয়ে যাওয়ার দরকার । লোকটা তখন ওদেরকে ইঙ্গিতে বলল ওকে অনুসরণ করতে । এমনকি একটু পিছিয়ে এসে লোকটা তড়িৎকে হাত ধরে ওর পথে টেনে নিল । এদিকে দীপক আর তিমিরের হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে দেখে , নিজেকে মাঝখানে রেখে আর দুই বন্ধুকে দুপাশে রেখে তড়িৎ বলল "তোরা আমার গলা জড়িয়ে ধর । আমি তোদের বগলে চেপে ধরি। এভাবে আস্তে আস্তে এগোলেই হবে ।" রেখার দিকে তাকিয়ে তড়িৎ বলল ------"তুমি যেভাবে পারো , আমাদের ব্যাগগুলো টেনে নিয়ে চল ।" ওদের যাত্রার এইরকম বন্দোবস্ত দেখে পথপ্রদর্শক দক্ষিণ ভারতীয় লোকটি দুবার মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল । এইভাবে পথচলা শুরু হল।



পথ চলতে চলতে তিন বন্ধু আর রেখার মানসপটে ভেসে উঠল উথাল-পাথাল দিনগুলোর স্মৃতি ।


" চাঁদ তুমি ঘুমাতে পার,

সে আছে চেয়ে মোর পানে "

(বাংলা আধুনিক গান -- শিল্পী : আল্পনা বন্দ্যোপাধ্যায় ।)



গত রবিবার অর্থাৎ ২২ শে মার্চ , ২০২০ যখন সবাই জনতা কার্ফু পালন করল , বিকেল পাঁচটার সময় যখন তড়িৎদের ফ্যাক্টরির অন্যান্য তামিল সহকর্মীরা সপরিবারে নিজের নিজের দোরগোড়ায় এসে হাততালি দিতে থাকল আর থালা বাজাতে থাকল , তখন ওরা তিন বন্ধু আর রেখা প্রথমে একটু অপ্রতিভ হয়ে পড়েছিল । তবে দ্রুত পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে , নিজেদের ছোট ফ্ল্যাটের দরজা খুলে বেরিয়ে এসে তিন বন্ধু মিলে হাততালি দিতে শুরু করল । তাই দেখে রেখাও যোগদান করল । একবার চাপাস্বরে তড়িৎকে জিজ্ঞাসা করেছিল "কেন গো ?" অপারলোকে বাংলা ভাষা বুঝবেনা এই ভরসায় , কিছুটা বিরক্তিভরা চাপাস্বরে তড়িৎ উত্তর দিয়েছিল "বিদেশ বিভুঁইতে এসে রয়েছ । চারপাশের পরিস্থিতির সম্বন্ধে একটু সজাগ থাকতে হয় তো ? যেসব ডাক্তাররা , নার্সরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা - রুগীদের চিকিৎসা করছেন, তাদের সম্মান জানাতে এই হাততালি । যেসব সাফাই কর্মীরা হাসপাতাল থেকে শুরু করে , রাস্তাঘাট রেলস্টেশন সব পরিষ্কার করে রাখছে , তাদের সম্মান জানাতে এই হাততালি ।"

সেই প্রথম রেখার চৈতন্য হলো যে করোনা ভাইরাস নামে এক অজানা রোগ এসে দেশসুদ্ধ মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছে ।

পশ্চিমবাংলার দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার অন্তর্গত বাসন্তী গ্রামের বাসিন্দা ওই তিন যুবক আসলে বাল্যবন্ধু । একটা কন্ট্রাক্টর কোম্পানির মাধ্যমে তামিলনাড়ুর দিন্দিগুল-এর এই ফ্যাক্টরিতে চাকরি পেয়েছিলো । মোটামুটি একটা চাকরি পাওয়ার পরে, তাও আবার অন্য প্রদেশে, যা হয় তাই হলো । পড়াশুনায় ছেদ পড়লো, গ্রাজুয়েশন করা আর হলোনা । ওদের ফ্যাক্টরির নাম ----' তিরুপতি সিন্টেক্স ফার্নিচার প্রাইভেট লিমিটেড '।

তাদের ব্যবসা হল প্লাষ্টিক ফার্নিচার, ফিটিংস, পিভিসি ডোর ইত্যাদি তৈরি এবং বিক্রি করা। যেহেতু তিরুপতি সিন্টেক্স ফার্নিচার এর প্রোডাক্টের চাহিদা বাজারে বেশ ভালো , তাই ব্যবসা ভালোই চলছিল । আয়ের নিশ্চয়তা রয়েছে দেখে তিন বন্ধু ওই ফ্যাক্টরির কন্ট্রাকচুয়াল ওয়ার্কারের চাকরিতে থিতু হয়ে গিয়েছিল । দিন্দিগুল - এর প্রকৃতি মনোরম এবং পরিবেশ ভদ্র -সভ্য দেখে, ফ্যাক্টরির কাছেই একটা ছোট দুকামরার স্বয়ংসম্পূর্ণ ফ্ল্যাট তিন বন্ধুতে মিলে ভাড়া করেছিল , বছর দেড়েক আগে । একটা কামরায় স্বামী - স্ত্রী মানে তড়িৎ আর রেখা আর একটা কামরায় দীপক আর তিমির । কমন মেসে রান্না বান্না সামলাত রেখা ।

দিনগুলো মন্দ চলছিলোনা । কারণ ওদের সহকর্মীদের সঙ্গে ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে কাজ চালিয়ে নেওয়া যাচ্ছিলো । সহকর্মীদের বৌদের সঙ্গে একটু একটু করে রেখার বন্ধুত্বও কুঁড়ি মেলছিলো ।

কিন্তু হটাৎ সেতারের তার ছিঁড়ে গেল । ওরা ওদের স্মার্ট ফোনের নেটওয়ার্ক থেকেই খবর পেয়ে গেল যে কেন্দ্র সরকারের নির্দেশ অনুসারে তামিলনাড়ু সরকার ঘোষণা করেছেন যে 'করোনা ভাইরাস ' রোগের সংক্রমণ রুখে দেওয়া নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ২৩ শে মার্চ, ২০২০ অর্থাৎ সোমবার থেকে পরবর্তী ৩১ শে মার্চ লকডাউন ' বলবৎ থাকবে । লকডাউন-এর সময় ইমার্জেন্সি সার্ভিস বাদে আর সবকিছু বন্ধ থাকবে । বিশেষ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাড়ির বাইরে বেরোতে পারবেনা । বেরোতে হলে নাক - মুখ মাস্কে ঢাকতে হবে । ঘন-ঘন সাবানজলে হাত ধুতে হবে । সাবধানতার কারণে গৃহবন্দী থাকতে হবে । পশ্চিমবঙ্গ সরকারও একই রকম নির্দেশ জারি করে ২৭ শে মার্চ পর্য্যন্ত 'লকডাউন ' ঘোষণা করে দিলেন । কেন্দ্রীয় সরকারও ঘোষণা করে দিলেন যে ২৩ শে মার্চ , সোমবার থেকে ৩১ শে মার্চ পর্য্যন্ত সাধারণ যাত্রীদের জন্য ট্রেন চলাচল এবং আন্তঃ রাজ্য বাস পরিবহণ ব্যবস্থা বন্ধ থাকবে । কেন্দ্রীয় বিমান পরিবহণ দপ্তর ঘোষণা করে দিলেন যে ২৪ শে মার্চ , মঙ্গলবার রাত ১২ টা থেকে ৩১ শে মার্চ রাত ১২ টা পর্য্যন্ত দেশের ভেতর কোনো বিমান উড়বেনা। ২৪ শে মার্চ , মঙ্গলবার রাত্রি ৮ টার সময় অন্য এক সহকর্মীর ফ্ল্যাটে তিন বন্ধুতে গিয়ে শুনল যে --দেশবাসীর উদ্দেশ্যে টেলিকাস্ট করা এক ভাষণের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীজি ২৫ শে মার্চ, বুধবার রাত ১২ টা থেকে ১৪ ই এপ্রিল পর্য্যন্ত দেশজোড়া লকডাউন ঘোষণা করে দিলেন ।

ঘোষণা শুনে ওরা স্তম্ভিত হয়ে গেল । কি আশ্চর্য , রাত্রি ৮ টার সময় সম্প্রচার করে মাত্র চার ঘন্টার নোটিশে ২১ দিনের দেশজোড়া লকডাউন ঘোষণা হয়ে গেল ! তিন বন্ধু ফ্ল্যাটে চুপ চাপ ফিরে এল, যেন বজ্রাহত ! ওদের অবস্থা দেখে রেখা জিজ্ঞাসা করল “তোমাদের চোখ মুখ এরকম থম থম করছে কেন ? নিশ্চয়ই খারাপ কোনো খবর আছে ? তোমরা বলো আমাকে, খুলে বলো ?" তড়িতের গলা শুকিয়ে গেছিল, ও চুপ করে মাথা নিচু করে রইল । দীপক আর তিমির, এক এক করে রেখাকে বুঝিয়ে বলল । সব শুনে রেখা ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল । এবার তড়িৎ রেখাকে বলল " মন শক্ত করো । আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি , এখানে আমাদের দিন ফুরিয়ে গেল । আমাদের আর এখানে চাকরি করা হবেনা , ভাগিয়ে দেবে । ব্যাগ পাত্র গুছিয়ে ফেল । অদ্যই শেষ রজনী ।"

গম্ভীর মুখে রাতের খাবার টুকু খেয়ে, যে যার মতো শুয়ে পড়ল । পরের দিন ২৫ শে মার্চ, বুধবার সকল পাঁচটার মধ্যেই সকলের ঘুম ভেঙে গেল । যে যার মতো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে নিল । একটু চা করে খেল । উদাস নয়নে চেয়ে চারজনেই ভাবছে কি হয়, কি হয় ?

যে কন্ট্রাক্টর কোম্পানির অধীনে ওরা চাকরিটা করতো, তার নাম ' সার্ভিস প্রোভাইডার্স ইন্ডিয়া লিমিটেড '। এই ধরনের সার্ভিস প্রোভাইডার কোম্পানিগুলো দেশের বিভিন্ন সংস্থায় তাদের চাহিদা বা প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মী সরবরাহ করে থাকে । বিনিময়ে সংস্থা গুলোর কাছ থেকে মাসে মাসে থোক টাকা পায় । সেই মর্মে সার্ভিস প্রোভাইডার কোম্পানি গুলোর সঙ্গে এই সব সংস্থার চুক্তি হয় ।

এরকম পরোক্ষভাবে কর্মী পাওয়ার ফলে সংস্থাগুলোর বিরাট রকমের খরচ বেঁচে যায় এবং সেই কর্মীদের প্রতি সরাসরি কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না । প্রত্যক্ষ কর্মী হলে নিয়মিত মাইনে , মহার্ঘ্য ভাতা , বাড়ি ভাড়া , চিকিৎসা ভাতা ইত্যাদি অনেক কিছু যোগানোর আর্থিক দায় বহন করতে হত । উপরন্তু ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের চাপ সামলাতে হত । অন্যদিকে পরোক্ষ কর্মীদের যে কোনো সময় বসিয়ে দেওয়া যায় , ছাঁটাই করে দেওয়া যায় সম্পূর্ণ বিনা বাধায় । আমাদের মতো ক্রমবর্ধমান বেকারীর দেশে এখন এইরকমটাই চলছে । যে কোনো সংস্থায় সিকিউরিটি গার্ড নিয়োগ করা থেকে শুরু করে ব্যাঙ্কিং সেক্টরে কর্মী নিয়োগ পর্য্যন্ত । বাইরে থেকে কেউ টের পায় না । ঠাট বাঁটের আড়ালে সব সত্য চাপা পড়ে যায় ।


হঠাৎ খেয়াল পড়তে তিন বন্ধুই নিজের নিজের স্মার্টফোনে চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা করল । সকাল আটটার সময় বাড়িওয়ালা এসে ওদের বললেন "তোমাদের কারখানা আজ থেকেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । অতএব, তোমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফ্ল্যাট খালি করে দাও । সকাল নটায় ফ্যাক্টরির ওয়ার্কস ম্যানেজার ওদের ডেকে পাঠিয়ে জানালেন যে ' তিরুপতি সিন্টেক্স ফার্নিচার ' লে-অফ ঘোষণা করেছে এবং যে কন্ট্রাক্টরের অধীনে ওরা কাজ করত , তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে ওদের তিনজনকেই চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে । একথা শুনে তিনজনেই কান্নায় ভেঙে পড়ল । তখন সেই ওয়ার্কস ম্যানেজার ওদের সান্ত্বনা দিয়ে বললেন

" বিপদের সময় তোমরা মন শক্ত করো । এই পরিস্থিতিতে এরকমটাই হওয়া স্বাভাবিক, কারণ ব্যবসা - বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । মার্চ মাসের মাইনে বাবদ তোমাদের যা প্রাপ্য হয় , কন্ট্রাক্টরের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেই টাকা তোমাদের ব্যাঙ্ক একাউন্টে জমা করে দেবার ব্যবস্থা করব । এ ব্যাপারে আমার উপর ভরসা রাখতে পারো । তোমাদের কাজকর্ম আমার ভালো লাগতো । তাই আমার নিজের থেকে তোমাদের তিনজনকেই দু-হাজার টাকা করে দিচ্ছি । আমি আজ চেষ্টা করছি একটা সুমো গাড়ির ব্যবস্থা করার, যাতে করে আগামীকাল তোমাদের নিজেদের এলাকার উদ্দেশে রওনা দিতে পারো । তোমাদের জিনিষপত্র আজই গুছিয়ে নাও । যত দেরি করবে , পরিস্থিতি জটিল হয়ে যাবে । তোমরা তৈরি হয়ে এখানেই চলে এস । গাড়ি এখানেই পাবে ।"

ওয়ার্কস ম্যানেজারের কথামত তিনজনেই ফ্ল্যাটে ফিরে এলো । পরিস্থিতি আন্দাজ করে রেখা তৈরি হয়েই ছিল, ব্যাগ পাত্র গুছিয়ে রেখেছিলো ।

পরের দিন ২৬ শে মার্চ, বৃহস্পতিবার সকাল সাতটার সময় যেকজন সহকর্মীর সঙ্গে দেখা হল, তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, ব্যাগ পত্র নিয়ে চারজনেই ফ্যাক্টরির কাছে এসে উপস্থিত হল । একটা সুমো গাড়ি দাঁড় করিয়ে ওয়ার্কস ম্যানেজার অপেক্ষা করছিলেন । ওরা চারজন গিয়ে উপস্থিত হতে ড্রাইভারের সঙ্গে ওদের পরিচয় করিয়ে দিলেন । ড্রাইভারকে রোড রুট বুঝিয়ে দিলেন । এরপর ওরা ওয়ার্কস ম্যানেজারকে নমস্কার জানিয়ে গম্ভীর মুখে গাড়িতে উঠে বসল। দিন্দিগুল থেকে গাড়ি রওনা দিল, তখন সকাল সাড়ে সাতটা। সেই শুরু হল, অনিশ্চিতের পথে যাত্রা । কিন্তু এছাড়া তো উপায়ও ছিল না । চাকরি হারিয়ে , বাসস্থান হারিয়ে , কিই বা করবে ? নিজেদের গ্রামে, নিজেদের ঘরে ফিরতে পারলে তবু তো দুমুঠো অন্ন জুটবে ।

ঐভাবে দিন্দিগুল থেকে রওনা দিয়ে ওদের গাড়ি বেলা বারোটা নাগাদ কোয়েম্বাতুরে এসে পৌঁছায় । কোয়েম্বাতুরে তাদের গাড়ি জেরার জন্য আটকায় পুলিশ । ওরা গাড়ির ভেতর থেকে দেখতে পেলো , পথের ধারে দুটো বাসকেও পুলিশ আটকেছে , ড্রাইভারদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে । আর একটু তফাতে দাঁড়িয়ে আছে ৪০ - ৪২ জনের একটা দল । তাদের চেহারা দেখে বাঙালি বলেই মনে হচ্ছে । কৌতূহলী হয়ে তড়িৎ, রেখা, দীপক ও তিমির গাড়ি থেকে নেমে পড়ল । ইতিমধ্যে আর একজন পুলিশ এসে ওদের ভাড়া করা গাড়ির ড্রাইভারকেও জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল । গাড়ির কাগজপত্র দেখতে চাইল । তারপর গাড়ির কাগজপত্র হতে নিয়ে পুলিশটা ড্রাইভারকে ডেকে নিয়ে গেলো নিকটবর্তী এক অস্থায়ী পুলিশ ছাউনিতে।

তাই দেখে তড়িৎ বলল" ভালোয় ভালোয় আমাদের গাড়িটা ছেড়ে দিলে হয় !” ভালোই চালিয়ে আনছিল ড্রাইভারটা । কি যেন নাম ? সারাভানান । তাই শুনে দীপক বলল "জানিনা , এর মধ্যে আবার এক রাজ্য থেকে আর এক রাজ্যে মুভমেন্টের ওপড় রেস্ট্রিকশন জারী হয়ে গেছে কি না ?" তিমির বলল "নেটে তো এখনো সেরকম কিছু দেখতে পাইনি ?" সব শুনে রেখা তড়িতের কাছে এসে বলল " কি হবে গো তাহলে ?" তাইতে তড়িৎ বলল "ঘাবড়াচ্ছো কেন ? এই তো এতো বাঙালি ছেলে রয়েছে এখানে । সবাই মিলে আলোচনা করে, কিছু একটা উপায় নিশ্চই বার করা যাবে ।" এবার দীপক বলল " খানিক ক্ষণ ধৈর্য ধরে দেখ , কি হয় । আর যাই হোক না কেন , ওই পঙ্গপালের সঙ্গে ভিড়ে যাওয়া মোটেই ঠিক হবেনা । ওদের সম্বন্ধে কিছুই জানিনা আমরা । তাছাড়া , রেখার সুবিধে - অসুবিধের দিকটা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে ।" তিমির বলল " দীপক, তুই খুব বাস্তব কথা বলেছিস ।" এসবকথা শুনে রেখার মনে দীপক আর তিমিরের সম্বন্ধে খুবই সম্মানবোধ জাগলো । সত্যি কথা বলতে , এই যে প্রায় দেড় বছর ধরে রেনুগুনটার একটা ছোট ফ্ল্যাটের মধ্যে কষ্ট করে একটা ঘরে স্বামীর সঙ্গে রেখা, আর একটা ঘরে দীপক আর তিমির, এই ব্যবস্থায় দিন কাটিয়েছে, তাকে কেন্দ্র করে কোনো অশান্তি হয়নি । পরস্পরের প্রতি এমন একটা স্বাভাবিক সহানুভূতি আর অকৃত্রিম সম্মানবোধ ছিল যে কারোর মনের ওপর সামান্যতম চাপ সৃষ্টি হয়নি কখনো । দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার মথুরাপুর গ্রামের মেয়ে রেখা , জ্ঞান হয়ে থেকে কোনো সম্পর্কের টানাপোড়েন ওকে দেখতে হয়নি । গ্রামের সহজ সরল সম্পর্কের বুনিয়াদ নিয়েই স্বামীর সঙ্গিনী হয়ে এসেছিলো দিন্দিগুলে। সেখানেও ওর বুনিয়াদকে আরো সুবিস্তৃত করতে পেরেছিলো রেখা ।


হঠাৎ সারাভানান ছুটতে ছুটতে এসে বলল " রুপীস টু থাউসেন্ড প্লিস । কুইক , কুইক !" তড়িৎ বলল " হোয়াই ?" সারাভানান বলে " প্লিস গিভ মি ।" তড়িৎ এক ঝলক দীপক আর তিমিরের মুখের দিকে তাকালো । দীপক " আশা করছি টাকাটা নিয়ে পুলিশ গাড়িটা ছেড়ে দেবে । কপাল ঠুকে দিয়ে দে ।" টাকা নিয়ে সারাভানান বলল " হোপ ফর দা বেস্ট ।" আবার ছুটতে ছুটতে পুলিশ ছাউনির দিকে চলে গেলো । তখন বেলা পৌনে বারোটা বাজে । সুমো গাড়িটার কাছাকাছি একটা গাছের ছায়ায় ওরা চারজন গিয়ে বসল । শুরু হলো ওদের মুহূর্ত গোনা, সারাভানান তো বলে গেলো “হোপ ফর দি বেস্ট” ।


সারাভানান এর ফিরেআসার পথ চেয়ে বসে থাকতে থাকতে ওদের তন্দ্রা এসে গেলো । এরকমভাবে চুপ চাপ আধঘন্টা কাটার পর হঠাৎ তিমিরের তন্দ্রা কাটলো । দেখলো তড়িৎ, রেখা আর দীপক নিজের নিজের ব্যাগএ হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে । ওদের ঘুম না ভাঙিয়ে, তিমির নিজের ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে পায়ে পায়ে সেখানে গেলো যেখানে বাসন্তী থেকে আসা লোকেরা দল বেঁধে শুয়ে বসে আছে । তিমির আসলে পরিস্থিতিটা বুঝতে গেছিলো । এক পাশে গিয়ে তিন চারটে ছেলের সঙ্গে আলাপ জমালো । নিজের পরিচয় দিল বাসন্তীর ছেলে বলে । ওদের কাছে দেশের হাল হাকিকত কিছু শুনল ।

যেমন ------(ক) এখনো পর্য্যন্ত দেশে করোনা ভাইরাসএর সংক্রমণ ধরা পড়েছে ৭২৪ জনের । তাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের । (খ ) পশ্চিমবাংলায় সংক্রমণ ধরা পড়েছে ১৫ জনের । তাদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১ জনের । (গ) গোটা বিশ্বে করোনা মহামারীতে আক্রান্ত ৫৫৫৯৭০, আর মৃত পঁচিশ হাজারের বেশি । (ঘ ) দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চাষবাসের কাজ আর কলকারখানার কাজে যুক্ত ঠিকা শ্রমিক ও মজুররা মূলত খেতে না পাওয়ার আশঙ্কায় ভিন রাজ্যে নিজেদের কাজের জায়গা ছেড়ে নিজের নিজের রাজ্যের উদ্দেশে দলে দলে যাত্রা করছে । এইসব করতে গিয়ে ওই সব মজুররা বহু মানুষের সংস্পর্শে আসছে । ভারত সরকার এতে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন । কারণ এরকম সংস্পর্শ চলতে থাকলে, করোনা ভাইরাসের গোষ্ঠী সংক্রমণ আটকানোর সমস্ত চেষ্টা বরবাদ হয়ে যাবে । কেউ কেউ বলছিলো চীন দেশ আর সেখানকার সরকারই দায়ী, রোগটা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার জন্য । এত কিছু শোনার পর তিমিরের শরীর আর মনের ভেতর অস্থির অস্থির লাগতে আরম্ভ করল । আর থাকতে না পেরে তড়িতদের কাছে চলে এলো । ইতিমধ্যে তড়িতদের ঘুম ভেঙে গেছিলো ।


তিমির আসাতে দীপক বলল "কোথায় গেছিলি তুই ? এই বিপদের সময় কাছছাড়া হচ্ছিস কেন ? এদিকেতো দুপুর একটা হলো ? সারাভানানএর তো কোনো পাত্তা নেই । আর কতক্ষণ এভাবে অপেক্ষা করব ? "

" সে কি ?"একথা বলেই নিজের ব্যাগটা নামিয়ে দীপকের কাছে রেখে তিমির ছুটলো পুলিশ ছাউনির দিকে । সেখানে সারাভানানএর দেখা না পেয়ে একজন পুলিশকর্মীকে হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করল যে সারাভানান নামে কোনো ড্রাইভার এখন পুলিশ ছাউনিতে চেকিংয়ের জন্য আটকে আছে কি না ? গম্ভীর স্বরে উত্তর এলো ----" নো " ।

তিমির তখন হাত তুলে গাড়িটার প্রতি পুলিশটার দৃষ্টি আকর্ষণ করালো এবং ভাঙা ভাঙা হিন্দি আর ইংরেজিতে বোঝানোর চেষ্টা করল যে একজন পুলিশ এসে ওই গাড়ির কাগজপত্র চেকিং -এর জন্য নিয়ে গেছিলেন এবং সারাভানান তার সঙ্গে পুলিশ ছাউনিতে গেছিলো । তারপর থেকে এক ঘন্টা পর হয়ে গেছে । আমরা সারাভানানএর জন্য অধীর অপেক্ষা করছি, ওই গাড়িতে করে ওয়েস্ট বেঙ্গল - এর উদ্দেশে যাত্রা করব বলে ! তিমিরকে থামিয়ে দিয়ে পুলিশটা গম্ভীর স্বরে বলল, " ইউ আর নট এলাউড টু প্রসিড। ইউমে গো ব্যাক টু দা প্লেস ইউ হ্যাভ কাম ফ্রম। " উত্তর শুনে তিমির হতবাক ।

তিমিরের পাশে থাকার দরকার মনে করে দীপকও ওর পিছু পিছু এসেছিলো । পুলিশটার ওই উত্তর শুনে দীপক এবার মরিয়া হয়ে প্রশ্ন করল "লেকিন ঊহ ড্রাইভারকে বিনা যাউঙ্গা ক্যায়সে ? ইয়ে মোটর কার কা চাবি উস্কে পাস্ হায় !" এবার পুলিশটা উত্তর দিল " দাট ইস ইওর প্রব্লেম । ডোন্ট ডিসটার্ব ।"

এরপর দীপক আর তিমির চার পাশে অনেক খোঁজাখুঁজি করল । চিৎকার করে সারাভানানএর উদ্দেশ্যে অনেক ডাকাডাকি করল । কিন্তু সারাভানানএর সন্ধান পাওয়া গেলো না । ব্যাপারটা পরিষ্কার যে সারাভানান টাকা নিয়ে গিয়ে গাড়ির কাগজপত্র উদ্ধার করে চম্পট দিয়েছে ।

তিমির আর দীপক অপেক্ষারত তড়িৎ আর রেখার কাছে ফিরে এলো । সব কথা জানাল । তড়িৎ বলল " এভাবে আটকেযাব সেতো ভাবতে পারিনি । তাই আগেভাগে বাড়িতে খবর দিইনি । কিন্তু এবার খবর না দিলেই নয় । তোরাও জানিয়ে দে ।"


সকলেরই বাড়িতে এবং আত্মীয় স্বজনের কাছে খবর পৌঁছে গেল । এক চরম উদ্বেগাকুল অবস্থা । এবার কোন পথে যাওয়া হবে তাই নিয়ে ভাবনা ।

এবার দীপককে তিমির বলল " বুঝেই তো গেছিস যে এই হাইওয়ে দিয়ে আমাদের মোটেই এগোতে দেবেনা । তোর ওই পঙ্গপালের দলের কয়েকটা ছেলের সঙ্গে আলাপ জমিয়েছি । স্থানীয় কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলে ওরা একটা অন্য পথের সন্ধান পেয়েছে । হাইওয়ের পাশ দিয়ে একটা পথ ধরে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার এগোতে হবে । সেপথে পুলিশ আটকাবেনা । তার পর একটাগ্রামের পথ পাওয়া যাবে । গ্রামের পথ ধরে আরো ষাট কিলোমিটার হেঁটে গেলে মূদুমালাই জঙ্গল। শুনে তড়িৎ বলল " কি বললি, মূদুমালাই জঙ্গল ? মূদুমালাই আর বান্দিপুর জঙ্গল তো চন্দন দস্যু বিরাপ্পানের ডেরা ছিল । " শুনে রেখা চমকে উঠলো ।

তিমির বলল " হ্যাঁ, ছিল । এখন নেই । বিরাপ্পান আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা তো কবে পুলিশের সঙ্গে এনকাউন্টারে মারা গেছে । সিনেমা দেখিসনি ? যাই হোক, ওই মূদুমালাই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে একটু দল বেঁধে গেলে, মূদুমালাই জঙ্গলে সাংঘাতিক কোনো অসুবিধা হবেনা । উপরন্তু ওখানে গাছের ফল, ঝর্ণার জল এসব পাওয়া যাবে । বিশ্রামও পাওয়া যাবে । "

তড়িৎ বলল " কিরে দীপক ? তোর কি মত ? "

দীপক " সব পথই যখন বন্ধ, তখন অগতির গতি মূদুমালাই জঙ্গল । আর সে পথেই যদি যেতে হয়, তবে আর দেরি করা চলবেনা । প্রায় বেলা তিনটে হল । তবে ওই পঙ্গপালের দলের থেকে একটু ডিসটেন্স মেইনটেইন করে চলার পক্ষপাতী আমি ।" তড়িৎ " ঠিক আছে, তাই হবে । " কথাগুলো শুনে রেখা একটু নার্ভাস হয়ে গেল । তড়িৎ ওর পিঠে হাত রেখে বলল " ভয় পেওনা, আমরা তো আছি । চলো, ঠাকুরের নাম করে আমরা রওনা দিই ।" এবার সকলে নিজের নিজের ব্যাগ পত্র নিয়ে রওনা দিলো । সামনের দিকে ঐ পঙ্গপালের দল । "

এভাবে আট ঘন্টার ওপড় হাঁটার পর ওরা একটা গ্রামের প্রাচীন মন্দির চত্বরে এসে উপস্থিত হল । তখন রাত্রি এগারোটা বেজে গেছে । সকলেই ক্ষুধার্ত , ক্লান্ত । ওই মন্দির চত্বরে সকলে বিশ্রাম নিলো ।

পরের দিন ২৭ সে মার্চ , শুক্রবার সকাল আটটার সময় আবার সকলে যাত্রা শুরু করল ।


এভাবে গ্রামের পথ ধরে একটানা প্রায় পাঁচ ঘন্টা হাঁটার পর ওরা আর একটা গ্রামে এসে পৌঁছালো যেখানে একটা বটগাছতলায় একটা পুকুর আছে । তখন দুপুর একটা বাজে । সেখানে স্নানাদি সেরে নিজের নিজের সঞ্চয়ের থেকে খেলো । তারপর আবার দুপুর পৌনে দুটোর সময় যাত্রা শুরু করল । দ্বিতীয় দফায় একটানা পাঁচ ঘন্টার ওপর হেঁটে রাত্রি সাতটার সময় ওরা একটা গ্রামে এসে পৌঁছালো যার থেকে অল্প দূরে মূদুমালাই জঙ্গল । গ্রামের লোকদের অনুমতি নিয়ে ওরা সেই রাতটা ওই গ্রামেই কাটালো ।

পরের দিন ২৮ শে মার্চ, শনিবার সকাল সাড়ে সাতটার সময় আবার সকলে যাত্রা শুরু করল । এভাবে আধ ঘন্টা হাঁটার পর সকলে মূদুমালাই জঙ্গলে এসে উপস্থিত হল । তখন আকাশ ঝকঝকে পরিষ্কার । চারপাশে পাইন, দেবদারু, শাল ইত্যাদি উঁচু উঁচু গাছ থাকায় জঙ্গল এলাকাটা কিছু দূর অন্তর ছায়াঘন । মধ্যে মধ্যে উন্মুক্ত প্রান্তর, জলাশয় । তার পাশে কোথাও কোথাও ফলন্ত কলাগাছ, জবা ফুলের গাছ ফুলে ভরে আছে । জলাশয়ের কিনারা জুড়ে অজস্র কলাফুলের গাছ বাসন্তী, কমলা আর ছিটে ছিটে লালচে ফুলের সমাহারে পরিবেশটাকে রঙ্গিন করে রেখেছে

এসবের মাঝখান দিয়ে চলেগেছে বনপথ । বনপথ ধরে এগোতে এগোতে হঠাৎ দেখা গেল দূর প্রান্তরে দুটো হরিণ ছুটোছুটি করছে । কেউ কেউ মোবাইল ফোনে ছবি তুললো । সবমিলিয়ে শুরুতে মূদুমালাই জঙ্গল তার উধাও সৌন্দর্যের ডালা মেলে ধরে সকলকে স্বাগত জানাল ।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সর্বদাই মানুষের শ্রান্তি ও ক্লান্তি অনেকটা মুছিয়ে দেয় । বছর পঁয়তাল্লিশের একটি লোক হঠাৎ নিজের খেয়ালে মান্না দের সেই বিখ্যাত গানটা গেয়ে উঠলো ----

“ আমি আগন্তুক , আমি বার্তা দিলাম ,

কঠিন অঙ্ক এক কষ্টে দিলাম ।------- “

মন্দ গাইছিলো না লোকটা । সকলেরই দৃষ্টি গিয়ে পড়ল তার ওপর । গানটা শেষ হতে ওর সমবয়সী আর একটি লোক বলল "কঠিন অঙ্কই বটে ! সারা দুনিয়া জুড়ে আন্দাজে চিকিৎসা চলছে । " মন্তব্যটা সকলকেই একটু ভাবিয়ে তুলল , পরিবেশটায় একটা মৌনতার ছায়া নেমে এল । বিরামহীন পথচলা । হাঁটতে হাঁটতে অনেকটাই পথ পর হয়ে এসেছে সকলে ।


তখন বিকেল প্রায় সাড়ে চারটে । হঠাৎ দেখা গেলো একটু দূরে একটা ঘন বাঁশবনের ভেতর থেকে একটা প্রকাণ্ড বড় হাতি , সঙ্গে একটু ছোট হস্তিনী আর দুটো বাচ্ছা হাতিকে নিয়ে বেরিয়ে এলো । বাচ্ছা হাতি দুটো একটু থমকে দাঁড়ালো । হাতিদের গায়ের রং ধূসর হলেও উজ্জ্বল ।

এও এক অনাবিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য , যা দেখে সকলের পথচলা থমকে গেছে । সকলেই নিশ্চুপ । একটি ছেলে চট করে মোবাইল ফোন বার করল । হাতিগুলোর ছবি তুলতে উদ্যত হল । সঙ্গে সঙ্গে একজন দাদা স্থানীয় বলে উঠল " কি করছিস ? মোবাইল ক্যামেরার ফ্ল্যাশ দেখতে পেলে হাতিগুলো খেপে যাবে । ওরা যদি আমাদের তাড়া করে , পালানোর পথ পাব না । শুঁড় দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে আছাড় মারবে । সাবধান ! "

সকলেই সাবধান হয়ে গেলো । সব মোবাইল ফোনে পকেটে ঢুকে গেলো । রুদ্ধশ্বাস দৃষ্টি মেলে সকলেই স্থির হয়ে লক্ষ্য করছে হাতিগুলো কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে । তড়িৎ হাত ধরে রেখাকে কাছে টেনে নিল । ঘর ঘুরিয়ে দেখে নিলো , তিমির আর দীপক কাছাকাছি আছে কি না । এভাবে তিন মিনিট কাটার পর হাতিগুলো রাজকীয় চালে পথ পর হয়ে উল্টোদিকের গভীর বনের মধ্যে ঢোকা শুরু করল , সামনে দুটো বাচ্চা হাতি , পিছনে হস্তিনী তার পর পুরুষ হাতিটা ।হাতির পাল রাস্তা পর হয়ে বানে ঢুকে যাওয়াতে সকলেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল । তারপর দ্রুত পায়ে হেঁটে চারপাশে নজর রাখতে রাখতে বাঁশবনটা অতিক্রম করে নিল ।

এই শুরু হলো চারপাশে নজর রাখতে রাখতে পথ চলা । এভাবে খানিকক্ষণ পথ চলার পর সামনে পড়ল একটা বিস্তৃত উন্মুক্ত প্রান্তর । সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ছটা বড় বড় উঁচু আমগাছ । গাছগুলোয় কিছু কিছু গুটি ধরেছে । কেউ কেউ বলল, এখানকার আমের স্বাদ ভীষণ টক হয় । শ্রান্ত ক্লান্ত শরীরে সকলেই গাছগুলোর গোড়ায় এসে বসল একটু বিশ্রাম নিতে । নজরে পড়ল পাশেই একটা জলাশয় । অনেকেই সেখানে গিয়ে হাত - পা - মুখ ধুয়ে নিল, মাথাও ধুয়ে নিল । তড়িৎ, রেখা, তিমির আর দীপক একটা গাছের নিচে পৃথকভাবে বসেছিল । দীপক আর তিমির আসার পথে কলাগাছ থেকে চার ছড়া কলা পেড়ে এনেছিল । ওদের দেখাদেখি অরে অনেক ছেলে কলা পেড়েছিলো । ক্ষিদের মুখে সেই কলাই কিছু কিছু খেল সকলে ।

তখন বিকেল পাঁচটা বাজে । বনভূমির এই অংশটা অনেক নিরাপদ দেখে অনেকেই মোবাইল ফোন নিয়ে ঘর - সংসার , আত্মীয় - স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা শুরু করেছে । এমন সময় তড়িতের বড়মামার ফোন কল এল " কেমন আছিস বাবা ? বৌমা কেমন আছে ? তোর মার কাছে শুনলাম, তোরা নাকি পথে পথে ঘুরছিস ? দিন্দিগুলে থাকতে দিল না তোদের ? কি নিষ্ঠূর ! কি নিষ্ঠূর ! হে ভগবান "। বলতে বলতে বড়মামা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন । তারপর গলা ঝেড়ে নিয়ে আবার ------"তা এখন কোথায় আছিস বাবা ? " তড়িৎ "

বড়মামা তোমার বয়স হয়েছে , শান্ত হও, মন শক্ত করো ।

বড়মামা "কেন, মন শক্ত করব কেন ? বৌমার কিছু হয়েছে না কি ? বল বাবা বল ? "

তড়িৎ " না বৌমার কোনো বিপদ হয়নি , ও আমার সঙ্গেই আছে । তবে আমরা দুজনে, আমার দুই সহকর্মী বন্ধু এবং আরো প্রায় ৪২ জন এখন মূদুমালাই জঙ্গলের মধ্যে আছি ।" বড়মামা "কি বললি, মূদুমালাই জঙ্গল ? তোর মা এখনই তোদের চিন্তায় নাওয়া-খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে । আমি দাদা হয়ে ছোটবোনকে কি করে বলব, যে তোরা জঙ্গলে আটকে রয়েছিস? একথা শুনলে তোর মা তো হার্টফেল করবে ! আমি ওকে কি করে খবর দেব ? কি বলব ? তা তোরা কিছু খেতে পেয়েছিস ? পানীয় জল ?" তড়িৎ "বড়মামা, এই জঙ্গলের মধ্যে বেশ কিছু কলাগাছ আছে । সেই কলা খেয়েছি। আমার এক বন্ধু কিছু পেয়ারা পেড়ে এনেছে । আর ঝর্ণার জল খেয়ে তেষ্টা মেটাচ্ছি । বুঝেছ ?"

বড়মামা " হ্যাঁ বাবা, বুঝেছি তোমরা কত কষ্টে আছো । হে ঠাকুর, এ কি দুশ্চিন্তায় ফেললে আমাদের ?"

তড়িৎ "বড়মামা ? বড়মামা ? কি হলো তোমার ?" ফোনের কানেকশান কেটে গেলো, কারণ চার্জ ফুরিয়ে গেছে । রেখা উৎকর্ণ হয়ে শুনছিলো ফোনালাপ। একরাশ বিমর্ষতা ঘিরে ধরল ওকে ।

তখন বিকেল সাড়ে-পাঁচটা বাজে । বনভূমি যেন সূর্য্যাস্তের আয়োজন করছে । আকাশের এল কমে গেছে । আমগাছগুলোতে ঝাঁকে ঝাঁকে বিভিন্ন প্রজাতির পাখী কিচির-মিচির করতে করতে ফিরে আসছে । সেই আবহে ৪০ -৪২ বছরের একটি লোক চাপাস্বরে গেয়ে উঠলো

" সাঁঝের পাখীরা ফিরিল কুলায় ,

তুমি ফিরিলে না ঘরে " রেখার মনে পড়ে গেলো, এই নজরুলগীতিটা ওদের মথুরাপুরের প্রতিমা দিদি বেশ সুন্দর গাইতেন ।

তড়িতের সঙ্গে ফোনের যোগাযোগ কেটে যাওয়ার পরে বড়মামা আর একবার তড়িৎকে ফোনে ধারার চেষ্টা করেছিলেন । তাতে উত্তর এলো “দা নম্বর ইউ হ্যাভ ডায়াল্ড, ইস আউট অব রিচ” । বড়মামার বুক ধড়ফড় করতে লাগলো । উনি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না । খাতের ওপর শুয়ে পড়লেন । আধঘন্টা বিশ্রাম নেওয়ার পর একটু ধাতস্ত হলেন । তারপর , ওনার থেকে পাঁচ বছর পরে রিটায়ার করেছেন এমন এক প্রাক্তন শিক্ষক সহ-কর্মীকে ফোনে করে আসতে অনুরোধ করলেন । তিনিএকটু পরেই চলে এলেন বড়মামার কাছে । তখন বড়মামা তাকে শোনালেন নিজের ভাগ্নে, ভাগ্নেবউ, ভাগ্নের সহকর্মী দুজন এবং অন্যান্য সহযাত্রীদের অবর্ণনীয় দুর্দশার কথা। বড়মামা জানতেন যে তাঁর ঐ প্রাক্তন সহকর্মীর সঙ্গে একজন লোকসভা সদস্যের বিশেষ ঘনিষ্টতা আছে । বড়মামা তাই বললেন, তিনি যেন মাননীয় এম-পি মহাশয়কে অনুরোধ করেন, বিষয়টাকে পশ্চিমবঙ্গ এবং তামিলনাড়ুর রাজ্য প্রশাসনের গোচরে আনতে, যাতে করে মূদুমালাই জঙ্গল থেকে ওদের দ্রুত রেসকিউ করা যায় ।

বড়মামার সেই অনুরোধের মর্য্যাদা তিনি রেখেছিলেন । মাননীয় এম - পি মহাশয়ও অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ এবং তামিলনাড়ু রাজ্য -প্রশাসনের উচ্চতম পর্যায়ের নোটিসে আনেন ঐ সব পথভ্রষ্ট বাঙালি শ্রমিকদের বিপন্ন অবস্থার কথা । শুধু তাই নয় , ঐ এম-পি মহাশয় তাঁর নিজের রাজনৈতিক দলের যে সংগঠন আছে তামিলনাডুতে, তাদেরকেও অনুরোধ করেছেন তৎপর হতে --যাতে সাংগঠনিক স্তরে ঐ বিপন্ন শ্রমিকদের কাছে পৌঁছানো যায় ।


এদিকে মূদুমালাই জঙ্গলে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এলো । তার সঙ্গে এক অদ্ভুত শীতলতা । শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে । কিন্তু মন ? রাত্রির পদধ্বনি সোনার পর থেকে মন সদা সচকিত।সামান্য আওয়াজেও বিচলিত । ধীরে ধীরে আকাশে চাঁদ উঠলো । আজ চৈত্রমাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথি । চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় বনভূমির সে এক অদ্ভুত মায়াবী রূপ । এ মায়াবী রূপ মানুষকে মুগ্ধ করে, বিষ্ময়ে আবিষ্ট করে, সঙ্গে ভয়ও জাগায় ! তড়িৎ, দীপক আর তিমিরের দিকে একবার তাকিয়ে রেখা জিজ্ঞাসা করল " আজকের রাতটা কি তবে এই গাছতলাতেই কাটাতে হবে ? "

তড়িৎ " এছাড়া আর উপায় কি বলো ?"


রেখা ওর ব্যাগে করে একটা বিছানার চাদর নিয়ে এসেছিলো। সেটা বার করে, গায়ে চাপা দিয়ে, ব্যাগে হেলান দিয়ে তড়িতের পশে রেখা শুয়ে পড়ল । শুয়ে শুয়ে অতীত দিনের স্মৃতি রোমন্থন করতে থাকলো। সোনারপুর কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় তড়িতের সঙ্গে ওর আলাপ , তারপর প্রেম। তড়িতের সততা, সহজ সরল ভাব এবং বিধবা মায়ের প্রতি দায়িত্বশীলতা ওকে বরাবরই মুগ্ধ করেছে । রেখা লক্ষ্য করেছে যে তড়িতের মধ্যে দাবী বলতে একপ্রকার কিছুই নেই । তাই ওর মনের গভীরে তড়িতের জন্য এক শ্রদ্ধার আসন ও পেতে দিয়েছিলো। ওর মনে পড়ছে, তড়িৎ ভালো চাকরি -বাকরি করেনা বলে ওর মা তড়িতের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার একদম বিরুদ্ধে ছিলেন। এ নিয়ে মার সঙ্গে রেখার অনেক অশান্তি হয়েছিল। একথা জানতে পেরে তড়িৎ রেখাকে বলেছিলো যে, সেযেন বাবা-মার মাতা সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে না যায়। সে যেন তড়িৎকে মন থেকে মুছে ফেলে। একদিন এরকম কথার উত্তরে ও তড়িৎকে বলেছিলো "আমি তোমাকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবনা। তোমাকে বিয়ে করে, প্রয়োজন হলে গাছতলায় কাটাব ।" আজ ওর মুখের কথা বর্ণে বর্ণে মিলে গেছে । কি আশ্চর্য ! রেখার মনে পড়ছে, দুবছর আগে ওদের বিয়ের পর বড়মামা ওদেরকে আদ্যাপীঠের মন্দিরে নিয়ে এসেছিলেন, ঠাকুর দর্শন করাতে । সেদিন ছিল ঝুলনপূর্ণিমা তিথি। সেই উপলক্ষ্যে আদিষ্ট মন্দির সারাদিন খোলা ছিল । সিঁড়ি দিয়ে উঠে দর্শন মন্দির থেকে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব, আদ্যামা এবং রাধাগোবিন্দের যুগল মূর্তির খুব সুন্দর দর্শন পাওয়া গেছিলো । আর বড়মামা শুনিয়েছিলেন এইরকম এক ঝুলনপূর্ণিমা তিথির রাতে, যখন চাঁদের আলোয় চরাচর ভেসে যাচ্ছে , তখন লছমনঝুলার এক উন্মুক্ত প্রান্তরে অন্নদাঠাকুরকে প্রকট দর্শন দিয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণদেব । তার সঙ্গে আদেশ দিয়েছিলেন এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করার এবং তার অধীনে বিভিন্ন আশ্রম পরিচালনার । সংঘবদ্ধভাবে সেই আদেশকে রূপদান করার উদ্দেশ্যেই অন্নদাঠাকুর ' দক্ষিনেশ্বর রামকৃষ্ণসংঘ, আদ্যাপীঠ ' গঠন করেছিলেন । এইসব কথা ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমে চোখ জুড়িয়ে গেছে তা রেখা টের পায়নি । তড়িৎ, দীপক আর তিমিরও ততক্ষনে নিদ্রামগ্ন ।




পরদিন ২৯ শে মার্চ, রবিবার সকল পাঁচটা নাগাদ সহস্র পাখির কলতানে ওদের ঘুম ভেঙে গেলো । সকলেরই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে নেওয়া দরকার । কিন্তু ঐ 'পঙ্গপালের দলের 'অধিকাংশ ছেলেকেই দেখা গেলো পাশের জলাশয়টার কাছে ভিড় করে থাকতে । স্বাভাবিক ভাবেই তড়িৎ - রেখা এরা ঐদিকে পা বাড়ালো না ।

দীপক ইতিমধ্যে জালের বোতল হাতে নিয়ে জলের খোঁজে গিয়ে উল্টোদিকে একটা ছোট ঝর্ণা আবিষ্কার করে ফেললো । সেখানে একটা কলাগাছের আবডাল আছে । তাই ওর নির্দেশ মতো গিয়ে সেই ঝর্ণার জলে বাকি তিনজন পরিষ্কার হয়ে নিল । সঙ্গে ফল যা ছিল, তার থেকে কিছু নিয়ে চারজন ভাগাভাগি করে খেলো ।

জলাশয়টার দিকে নজর পড়তে তিমির হঠাৎ দেখলো যে ওদিকে বেশ কয়েকটা ছেলে মাটিতে শুয়ে কাতরাচ্ছে । সেদিকে দীপকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিমির বলল-"চল তো গিয়ে দেখে আসি, কি হয়েছে ।" দীপক রাজি হলো । যাওয়ার সময় তড়িৎকে বলল "তোরা দুজনে এখানেই থাক । আমরা খোঁজ নিয়ে আসছি ।"

দীপক আর তিমির সেখানে গিয়ে শুনলো যে ওদের গ্রুপটার কিছু ছেলে গতকাল কিছু বুনো ফল কুড়িয়েছিল, যেগুলো কালোজামের মতো দেখতে । সেই ফল খেতে খুব একটা খারাপ ছিল না, সামান্য কষা ছিল । কিন্তু যারাই ঐ ফল খেয়েছে তাদেরই গত রাত থেকে বমি আর পেটের যন্ত্রনা শুরু হয়েছে । দীপকের মনে হলো, এ বোধহয় কলেরার লক্ষণ । এদের থেকে দূরে সরে থাকাই ভালো । তও ভদ্রতার খাতিরে একজনকে বলল "আপনারা তাহলে এখান থেকে যাবেন কি করে ? আর কখন রওনা দেবেন ?" তিনি উত্তরে বললেন "দেখতেই তো পাচ্ছেন আমাদের অনেক কটা ছেলের এই অবস্থা । ধাতস্ত না হওয়া পর্য্যন্ত তো আমাদের রওনা দেওয়া ঠিক হবেনা । যাইহোক আমরা তো অনেকজন আছি, সবাই মিলে যা হোক করব । আপনারা বরঞ্চ সুস্থভাবে এগিয়ে যান ।"

দীপক আর তিমির ফিরে এসে তড়িৎ আর রেখাকে সব কথা বলল । তা শুনে তড়িৎ বলল "তাহলে আমাদের এখনই রওনা দেওয়া উচিত ।" এই কথা আলোচনার পর ওরা চারজনই বনপথ ধরে এগোতে থাকলো । সেই থেকে ওদের পৃথক যাত্রা শুরু হলো । সকাল সকাল শরীরে এনার্জি ছিল, আবহাওয়া মনোরম ছিল। তাই চারজনে অনেকটাই এগিয়ে গেলো । কিন্তু এভাবে এগোতে এগোতে এক জায়গায় এসে দেখলো সামনে গভীর বন আর বনপথ সরু হয়ে আসছে । চতুর্দিক নিঝুম । ওদের খুব ভয় হলো । থমকে দাঁড়ালো । তারপর এদিক ওদিক তাকিয়ে এক পশে একটা অপেক্ষাকৃত আলোকিত এবং খোলা জায়গা দেখতে পেলো । ওরা সেখানে এসে উঠলো । ওরা বুঝতে পারলে যে ভুল পথে আসা হয়ে গেছে । কাছেই দেখলো একটা মোটা কান্ডযুক্ত খুব উঁচু গাছ ।

চারজনে মিলে গাছটার গোড়ায় এসে বসল । উদ্বেগে আর ভয়ে ওদের গলা শুকিয়ে গেছে । দৃষ্টিও যেন আচ্ছন্ন হয়ে আসছে । এমন সময় তিমির বলে উঠলো "আর যে পারছি না রে ভাই !" দীপক উত্তরে বলল " এরকমভাবে ভেঙে পড়লে হবে ? মন শক্ত কর ।" তখন তড়িৎ বলে উঠলো "কোয়েম্বাটুরে যখন পুলিশের লোকজন দেখলো যে প্রচুর বাঙালি শ্রমিক বাড়ি ফেরার জন্য দল বেঁধে বেরিয়ে পড়েছে, তখন কি ওদের উচিত ছিলনা তামিলনাড়ু সরকারকে খবর দেওয়ার ? যাতে করে সাময়িক ভাবে হলেও ঐ শ্রমিকগুলোকে একটা আশ্রয় শিবিরে রাখা যায় ? কিছু খাদ্য পানীয় দেওয়া যায় বাঁচিয়ে রাখার মতো ?" তাই শুনে তিমির উত্তেজিত হয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠলো "অবশ্যই উচিত ছিল । আর সেটা করলে আমরা এই বিপদে পড়তাম না ।" দীপক ছুটে এসে তিমিরকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল "শান্ত হ ভাই, শান্ত হ ।"

রেখা চুপ করে গাছতলায় বসে ছিল । আপনমনে কয়েকটা ঝরে পড়া পাতা হাতে তুলে নিয়ে রগড়াতে লাগলো । হঠাৎ তার থেকে টাটকা গাওয়া ঘিয়ের মতো গন্ধ পেলো । রেখা চমকিত হলো । কয়েকটা শুকনো পাতা তুলে এনে তিমিরের হাতে দিয়ে বলল " রগড়ে দেখো তিমিরদা । কি সুন্দর ঘিয়ের মতো গন্ধ ।" তিমির পরখ করে দেখলো, সত্যি তো ঘিয়ের মতো গন্ধ । প্রকৃতির এই অকৃপণ দান তিমিরের বিক্ষুব্ধ প্রাণে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিলো ।

হঠাৎ ঐ গাছের থেকে সামান্য দূরে এক পাস্ দিয়ে তিনটে বুনো হরিণ তীর বেগে ছুটতে ছুটতে ওদের কাছটায় চলে এলো । হরিণগুলোর চনমনে ছটফটে ভাব আর সৌন্দর্য দেখে ওদের বেশ আনন্দ হল । কিন্তু হরিণগুলোর ছুটে আসার সময় দীপক লক্ষ্য করেছিল যে হরিণগুলো কিছুটা উঁচু জায়গা থেকে নেমে এলো ।জায়গাটা কেমন তা পরখ করে দেখার জন্য দীপক ওর গামছা দিয়ে গাছটার সঙ্গে নিজের কোমরটা বেঁধে ফেলল । এবার গাছের কাণ্ডটা দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে মাটি থেকে সাত ফুটের মতো ওপরে উঠলো । ঐ উচ্চতায় উঠে দীপক পরিষ্কার দেখতে পেলো যে উঁচু জায়গাটা বিপরীত দিকে ঢালু হয়ে নেমে গেছে একটা প্রশস্ত উন্মুক্ত প্রান্তরে । সেখানকার পরিবেশ এখানকার মতো দম বন্ধ করা নয় । সেখানে কিছু দূরে দূরে দেবদারু, পাইন, শাল এইসব গাছ রয়েছে । একটা ঝর্ণাও দেখা যাচ্ছে । দীপক ধীরে ধীরে গাছ থেকে মাটিতে নেমে এসে গামছার বাঁধন খুলে ফেলল ।

তারপর তিনজনকে বলল "দেখলাম ওপাশের পরিবেশটা অনেক ভালো । এই উঁচু ঢিবিটা সাবধানে পার হতে পারলেই সেখানে পৌঁছে যাব । চলা আমরা সবাই ওপারে যাই ।" তারপর সবাই সাবধানে ধীরে ধীরে ওপারে চলে গেলো । এতক্ষনকার দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে মুক্তি পেয়ে সকলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো । একটু বিশ্রাম নিয়ে মোবাইল ফোনে দেখলো দুপুর একটা বাজে । তারপর ধীরে ধীরে গিয়ে একটা ই ইউক্যালিপটাস গাছের গোড়ায় সকলে জড়ো হলো ।


ঐ গাছের গোড়ায় তড়িৎ আর রেখাকে অপেক্ষায় বসিয়ে রেখে দীপক আর তিমিরের প্রায় ২৪ ঘন্টার মতো অদর্শনে চলে যাওয়া এবং সেই বন্ধু - বিচ্ছিন্ন অবস্থায় যাতনা ভোগের কথা পরস্পর আদানপ্রদান করল আজ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পথ চলার সময় ।

ওদের চারজনের মানসপটে ভেসে ওঠা উথাল - পাথাল দিনগুলোর স্মৃতি আপাতত এই পর্য্যায়ে এসে থমকে দাঁড়ালো । ওরা অনুভব করল যে স্মৃতির ভার কি বিষম বস্তু !

" বাহিরে অন্তরে ঝড় উঠিয়াছে ,

আশ্রয় যাচি হায় কাহার কাছে ।"

নজরুলগীতি


ঐ মধ্যবয়সী দরদী তামিল ব্যক্তিটি দীপক - তিমির এবং তড়িৎ - রেখার মুখের ভাষা বুঝতে পারেননি । কিন্তু তাদের হৃদয়ের ভাষা বুঝতে পেরেছিলেন । তিনি ঐ চারজন বঙ্গসন্তানকে ধীর পায়ে বনপথ অতিক্রম করিয়ে এনে একটি পাকা রাস্তার ধারে এনে দাঁড় করালেন ।

সময়কাল ৩০ শে মার্চ, সকাল সাড়ে দশটা । আবার অপেক্ষা, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট- এর কেউ যদি সেখানে একবারের জন্য এসে উপস্থিত হন । বেলা ১১ টার কিছু পর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট-এর একজন অফিসার তাঁর জীপ্ গাড়ি নিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন । পথের ধারে তামিল ব্যক্তিটির সঙ্গে ভিনদেশি তিনজন যুবক এবং একজন স্ত্রীলোক দেখে তিনি গাড়ি দাঁড় করালেন । তামিল ব্যক্তিটির কাছে এদের পরিচয় জানতে চাইলেন । দুই দক্ষিণ ভারতীয়ের মধ্যে তামিল ভাষায় কথাবার্তা হলো । তারপর অফিসারটি ঐ জিপে চার বঙ্গসন্তানকে উঠে বসতে বললেন । তিমির আর দীপককে কোলে করে গাড়িতে ওঠালো তড়িৎ ।

রেখা হঠাৎ ওর ব্যাগ থেকে একটা দুশো টাকার নোট বার করে সেই দরদী তামিল ব্যক্তিটির হতে দিল এবং তাঁর পায়ে হাত দিয়ে সজল নয়নে প্রণাম করল । মধ্যবয়সী লোকটার চোখে তখন জল টলটল করছে । দৃশ্য দেখে ফরেস্ট অফিসার হতচকিত হয়ে গেলেন।তারপর তড়িৎ আর রেখা গাড়িতে উঠে বসল ।

ড্রাইভার জিপের ইঞ্জিনে স্টার্ট দিতে অফিসারটি তড়িতের দিকে তাকিয়ে বললেন --" আই শ্যাল টেক ইউ টু দি পুলিশ স্টেশন "। তড়িৎ উত্তর দিল " ও কে, স্যার । "

তড়িতের বড়মামার কল্যাণে এবং তাঁর বন্ধুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রশাসনিক মাধ্যমে এবং রাজনৈতিক পথে পুলিশ স্টেশনের অফিসার -ইন -চার্জের কাছে আগেই সব খবর পৌঁছে গেছিলো ।

ওদের চারজনকে ফরেস্ট অফিসার থানার অফিসার -ইন - চার্জের কাছে নিয়ে হাজির করালেন এবং কি অবস্থায় উনি ঐ চারজনকে পেয়েছেন তাঁর বিশদ বিবরণ দিলেন ।

তারপর থানার ও-সি একজন পুলিশ কর্মীকে নির্দেশ দিলেন ওদের চারজনের নাম - ধাম - মোবাইল ফোনে নম্বর , পরিচয় ইত্যাদি যাবতীয় তথ্য রেকর্ড করতে । সেই পর্ব সমাপ্ত হতে একজন আর্দালিকে নির্দেশ দিলেন ওদের চারজনকে গরম চা এবং হালকা জলখাবার দিতে ।

আপ্যায়নপর্ব মেটার পর যখন ওরা শরীরে একটু বল পেল তখন তড়িৎ ভাঙা ভাঙা হিন্দি আর ইংরেজিতে ও-সি কে জানালো যে প্রায় ৪০ -৪২ জন পশ্চিমবাংলার শ্রমিক এখনো মূদুমালাই জঙ্গলে আটকে আছে, যাদের থেকে ওরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছিলো । অনুরোধ করল, তাদেরকেও যেন উদ্ধার করা হয় । উত্তরে ও-সি বললেন " ডোন্ট ওয়ারী, উই শ্যাল সি টু ইট । "

তারপর ও-সি র নির্দেশ অনুযায়ী ওদের চারজনকে একজন ডাক্তারের কাছে পাঠানো হলো স্ক্রিনিং টেস্ট-এর জন্য । স্ক্রিনিং টেস্টে তড়িতদের একজনেরও করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ধারা পড়ল না । তা সত্বেও, যেহেতু ওরা সোশ্যাল ডিস্ট্যানসিং-এর বিধিনিষেধ একেবারেই মানেনি সেহেতু ডাক্তার ওদের চারজনকেই পার্শবর্তী একটি কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে দুসপ্তাহের জন্য পাঠিয়ে দিলেন । অবশ্য এরই সঙ্গে ঐ ডাক্তার দীপকের কোমরের চোট এবং তিমিরের হাঁটুর চোটেরও সুচিকিৎসা করলেন । এইভাবে ওরা চারজনে একসঙ্গে একটা নিরাপদ, নিশ্চিন্ত আশ্রয়, খাদ্য, পানীয়, ওষুধ এবং বিশ্রাম পেলো ।

কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে গিয়ে প্রত্যেকেই নিজের নিজের মোবাইল ফোনে চার্জ দিলো, তারপর বাবা-মা আত্মীয় স্বজনদের খবর দিয়ে নিশ্চিন্ত করল ।

তড়িৎ যখন বড়মামাকে ফোনে করে খবর দিলো, তখন তিনি প্রথমে আনন্দে কেঁদে ফেললেন এবং জেনে নিলেন মাকে খবর দেওয়া হয়েছে কি না । তারপর বললেন --" শুধু ঠাকুরের কৃপাতেই শুভ যোগাযোগ হয়েছে, তাই তোমরা বেঁচে ফিরেছ । একথা সব সময় মনে রেখো । আর একটা কথা, আমার প্রাক্তন সহকর্মী বন্ধুটি কিন্তু তোমাদের জন্য এই লক ডাউন-এর সময়েও প্রচুর খেটেছে ।

ঐ এখানকার এম - পি কে অনুরোধ করে তাঁর পলিটিকাল ইনফ্লুয়েন্স কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক মহলে এবং দুটো রাজ্যের প্রশাসনের উচ্চ স্তরে সাড়া ফেলার গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করেছিল । আমি সে সব রিপোর্ট এখানকার খবরের কাগজে পড়েছি । তোমার মাকেও প্রত্যেকটা সংবাদ দিয়েছি। যাই হোক, সাবধানে থেকো, সুস্থ থেকো । আর যোগাযোগ রেখো ।"

বড়মামার মাথার ওপর থেকে এক মস্ত দুশ্চিন্তার বোঝা নেমে গেলো । উনি গিয়ে নিজের খাটে শুয়ে পড়লেন ।

বড়মামা জীবনে ৩৫ বছরের ওপর শিক্ষকতা করেছেন । ওনার বিচার ধারা খুব যুক্তি শৃঙ্খলা নির্ভর । কোথাও যদি কোনো ভুলভ্রান্তি দেখেন বা অব্যবস্থা দেখেন, তাহলে যিনি ভুল করেছেন বা যিনি অব্যবস্থা করেছেন সেই ব্যক্তির দোষ উনি দেখেন না কখনো । ওনার প্রথমেই মনে হয়, সেই ব্যক্তিটির কোথাও কন্সেপচুয়াল ক্ল্যারিটির অভাব হচ্ছে বা কোনো বিষয়কে বোঝার ভুল হচ্ছে । ঠিক যেমনটা ওনার ছাত্রদের সঙ্গে করেছেন বরাবর ।

বড়মামার মনে এবার একটা প্রশ্ন জাগলো, আচ্ছা ভারত তো একটি কল্যাণকামী রাষ্ট্র।আর ভারতের সংবিধানের মুখবন্ধে এবং প্রস্তাবনায় এই কল্যানভাবনাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে । তবে ভারতবাসীকে বারবার কেন এত উদ্বেগ, কেন এত বেদনার আবর্তে পড়তে হয় ? শাসনযন্ত্রের পরিচালনার কাজে যাঁরা যুক্ত, তাঁদের কি কোথাও কন্সেপচুয়াল ক্ল্যারিটির অভাব হচ্ছে ? যুগে যুগে, কালে কালে ? হবেও বা ? আর শুধু রাষ্ট্রীয় জীবনে কেন, সামাজিক জীবনেও তো বরাবর দেখা যাচ্ছে কে কাকে কত সূক্ষ্মভাবে উদ্বেগে আর চাপে রাখবে তাই নিয়ে পরষ্পরের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে ধারাবাহিকভাবে ।

কিন্তু এর সমাধান কোথায় ?

উল্টোদিকের তাকে অনেক বই সাজিয়ে রাখা । নজর পড়ল ' শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ' বইটার ওপড় । বিছানা ছেড়ে উঠে বইটা পেড়ে মাথায় ঠেকিয়ে নমস্কার করলেন । বড়মামার বিপুল আশা যে ' গীতার ' মধ্যে নিশ্চই একটা সমাধান পাওয়া যাবে । বইটা নিয়ে পড়ার টেবিলে চলে গেলেন । পরিপূর্ণ সিরিয়াসনেস নিয়ে পড়তে থাকলেন একটার পার একটা অধ্যায় । প্রতিটি শ্লোক, অন্বয়, টীকা, ব্যাখ্যা সব ।


এমনি করে এসে পৌঁছালেন গীতার দ্বাদশ অধ্যায় ' ভক্তিযোগ ' - এ । যখন ১৫ নম্বর শ্লোকটা পড়লেন, তখন ওনার দৃঢ ধারণা হল যে প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছেন ।

নোটবুকে শ্লোকটা সন্ধিবিচ্ছেদ করে লিখলেন ---------------

যস্মান্নোদ্বিজতে ( যস্মাদ + ন + উদ্বিজতে ) লোকো

লোকান্নোদ্বিজতে ( লোকদ + ন + উদ্বিজতে ) চ য: ।

হর্ষ (আনন্দের উছ্বাস ) + অমর্ষ (অভিলষিত বস্তুর অপ্রাপ্তিতে অসহিষ্ণুতা)

+ভয় + উদ্বেগই: + মুক্ত

য: স চ মে প্রিয়: ।

অর্থ উদ্বিজতে ( উদ্বিগ্ন করা অথবা উদ্বিগ্ন করেন )

যস্মাদ (যাহার দ্বারা অথবা যাহার থেকে )

লোকাত ( লোকের দ্বারা অথবা লোকের থেকে )

য়: চ (এবং যিনি ) , স (তিনি ) , ন (না ), মে ( আমার )

সম্পূর্ণ অর্থ : যাহার দ্বারা লোকে উদ্বিগ্ন হন না (অথবা যিনি কাহাকেও উদ্বিগ্ন করেন না ), লোকের দ্বারা যিনি উদ্বিগ্ন হন না এবং যিনি আনন্দের উচ্ছ্বাস, অভিলষিত বস্তুর অপ্রাপ্তিতে অসহিষ্ণুতা, ভয় ও উদ্বেগ হতে মুক্ত তিনি আমার প্রিয় ভক্ত ।




নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮