• মৃদুলা সেনগুপ্ত

ভ্রমণ - স্মৃতির সরণি বেয়ে মধ্যপ্রদেশে









করোনাকালে সবাই ঘরবন্দী। মন হু হু করে ছুটে চলে যেতে চাইছে দুরে-বহুদূরে কোথাও। এই মুহূর্তে স্মৃতিই সব। স্মৃতিতে ভর করে কোথাও হারিয়ে যেতে তো কোনও বাধা নেই। সেই স্মৃতিরোমন্থন করেই আজ একটু মধ্যপ্রদেশের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিলাম।


পরিধি অনুযায়ী ভারতের দ্বিতীয় বড় রাজ্য আর জনসংখ্যার নিরিখে পঞ্চম এই মধ্যপ্রদেশ, যার নামের মধ্যেই রয়েছে এক রহস্য। সেই রহস্যের অলিগলিতে হারিয়ে গেলে মন্দ লাগে না। বর্তমানের মধ্যপ্রদেশ অতীতে অবন্তী মহাজনপদ নামে খ্যাত ছিল। তার রাজধানী ছিল উজ্জ্বয়িনী। ইতিহাসে যা বিখ্যাত নগরায়নের দ্বিতীয় ঢেউয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়ার জন্য। এই গুরুত্বকে অনুভব করতে এ রাজ্যের কিছু জায়গা ঘুরে দেখার পরিকল্পনা নিয়েছিলাম আমরা।

মধ্যপ্রদেশ পৌঁছে প্রথমেই হাজির হওয়া গেল সাতনায়। আজকের এই গৃহবন্দী সময় মনে পড়ছে সেদিনের সেই অনুভূতি যখন দৈনন্দিন রোজনামচা থেকে চাইলেই একটু মুক্তি চুরি করে নেওয়া যেত। এই রাজ্যের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ বোধহয় খাজুরাহ , যার যাত্রা শুরু হয়েছিল সাতনা থেকে। যদিও ঠাণ্ডায় কাবু হচ্ছিলাম, তবুও সাতনার দিনটা মন্দ লাগল না ওখানকার পরিবেশ ও মানুষজনের আন্তরিকতার গুণে। সেখানে একরাত কাটিয়ে পরেরদিন খাজুরাহর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। এখানে আসতে আসতে শীতের পাতা ঝরা বেলার সবুজ প্রকৃতির সঙ্গে দেখলাম পান্না ফরেস্টের বিস্তার। খাজুরাহর পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে প্রধানত জৈন এবং শিব মন্দির অবস্থিত। পুরনোদিনের কারুকার্য ভরা মন্দিরগুলির সঙ্গে গাছপালা ভরা সবুজ প্রকৃতির সামঞ্জস্য এক অদ্ভুত মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি করে।



খাজুরাহর পশ্চিমদিকের মন্দিররাজির জন্যে পাক্কা একটা দিন বরাদ্দ রাখতে হয়। কোনওরকম যন্ত্রের ব্যাবহার ছাড়া অত উঁচুতে ওইরকম নিখুঁত কারুকাজ কি করে সম্ভব ! ওখানকার মূর্তিগুলো যেন জীবনের প্রতিচ্ছবি। এ যেন পাথরকোঁদা সাহিত্য। যৌনতা, যা স্বাভাবিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, তা এখানে মূর্তিমতী হয় উঠেছে। মানুষের শারীরিক চাহিদা যা প্রতিনিয়ত সৃষ্টির ছন্দকে ধরে রাখে, তাই এই শিল্পকলার প্রধান ও প্রাথমিক অনুপ্রেরণা। যা প্রাকৃতিক, তাই পবিত্র। দেবতার মন্দিরে তাই যৌনতা শৈল্পিক নৈপুণ্যে এক অপরূপ মাত্রা পেয়েছে- স্বর্গীয় সুষমায় পরিণত হয়েছে।




সেই সুষমাকে অনুভব করতে করতে প্রকৃতির কোলে ফিরে যাওয়া পাঁচমারীর পথ ধরে। এক ঘনায়মান সন্ধ্যায় আমরা পাঁচমারীর ডি.আই. বাংলো তে পৌঁছলাম। প্রথমে নির্জন নিশুতি পরিবেশ দেখে মন খুব খারাপ হয়ে গেছিল। কিন্তু রাতে বাংলোর মালকিন মিসেস সিং এর আপ্যায়ন ও মাতৃসুলভ আচরণ আমাদের মন ভরিয়ে তুলল। লাল রঙের খোঁচা খোঁচা চুলের দজ্জাল দর্শন মহিলার ব্যাবহারটি ভারি মিষ্টি। একা মহিলা তার উঠতি বয়েসের কন্যাটিকে নিয়ে এই নির্জন পরিবেশে অনেকদিন ধরে বসবাস করছেন। সবাই ওনাকে ভয় পায়। কিন্তু আমার বছর সাতেকের ছোট্ট মেয়েটা ভয় পায়নি, উল্টে আলুভাজা ও ডিম পাউরুটি আদায় করে ফেলেছে। পরদিন সকালে যখন ডি.আই. বাংলোর চারপাশে ঘুরছিলাম, তখন ভীষণ ভালো লাগছিল। নির্জনতার সঙ্গে সঙ্গে ভালো লেগে গেছিল মিসেস সিং এর সংসারকে, যেখানে তিনি মা। এই একটা জায়গায় বয়েস এবং ভাষার ফারাক সত্ত্বেও কোথায় যেন আমার সঙ্গে ওনার ভীষণ মিল পাই। উনিও ওনার কন্যার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। ওনার সংসারে আরও দুটি বিশেষ সদস্যের সঙ্গে আলাপ হল- স্নোয়ি নামক একটি কুকুর ও একটি গরু, যাদের মধ্যে একটা দুষ্টু মিষ্টি সম্পর্ক আছে। স্নোয়ি খুব মিশুকে, কিন্তু মিসেস সিং এর ওপরে তার আধিপত্য দেখার মতো।



যাইহোক পাঁচমারীর সুন্দর সকালের ঝলমলে আবহাওয়া সবকিছু উপভোগ্য করে তুলেছিল। সারাদিন ধরে কতকিছু দেখলাম- জটা শঙ্কর গুহা, পাণ্ডব উদ্যান, গুপ্ত মহাদেব, বি ফলস, বড়া মহাদেব, হাণ্ডি খো বা সুইসাইড পয়েন্ট, প্রিয়দর্শিনী পয়েন্ট, মিউজিয়াম, রাজেন্দ্রপ্রসাদ গার্ডেন প্রভৃতি। পাণ্ডব উদ্যানে নানা রঙের বড় বড় গোলাপগুলিতে রোম্যান্টিক প্রকৃতি উপচে পড়ছিল আর শুনিয়ে যাচ্ছিল অফুরন্ত ভালবাসার গল্প- জীবনকে ভালবাসার কথা।

পাঁচমারীর নির্জনতা জীবনের একঘেয়েমিকে দূর করে মনে প্রাণে অনাবিল আরাম এনে দেয়। সেই আরামের আবেশ নিতে নিতে এসে পড়া গেল মধ্যপ্রদেশের জবল্পুর জেলার জব্বল্পুর নামের এক ঘিঞ্জি নগরে। বলা হয় জবালি ঋষির নামে জব্বল্পুর নামটা এসেছে। এখানে এসে পাঁচমারীর স্মৃতিরোমন্থন করে চলেছি আর মনে হচ্ছিল প্লানিং টা উলটো হলে খুব ভালো হত। তাহলে পাঁচমারীকে নিরবচ্ছিন্ন স্মৃতিমেদুরতায় ভাসানো যেত আর মনের মধ্যে আরও কিছুক্ষণ লালন করা যেত তার শান্তিকে। তবুও জব্বল্পুরে কয়েকটি ঘোরার জায়গা আছে। যুগ যুগ ধরে ব্যালান্সের ওপর থাকা ব্যালান্সিং রক, ধুঁয়াধার জলপ্রপাত আর মারবেল রকস। মারবেল রকস এক কথায় অনবদ্য। ভেদাঘাটে নৌকাবিহার করতে করতে দুপাশে মারবেলের পাহার আর তাতে প্রকৃতিগত ভাবে হয়ে যাওয়া নানা ছবি বা নকশা সত্যিই অদ্ভুত লাগে। আমাদের দেশের প্রকৃতি কত সুন্দর !

এটাই আমার দেশ। ঘিঞ্জি শহরের ফাঁকেও প্রকৃতি জাদুর ছোঁওয়া দিয়ে যায় যেনতেন প্রকারেণ। দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়ে ছন্দ থেকে নিজেকে মুক্তির আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা বিফলে গেল না ভ্রমণের শেষ মুহূর্তে। এলাম অমরকণ্টক। বিন্ধ্য, সাতপুরা, মাইকাল পর্বতের একত্রে মিলিত হওয়া, আর অন্যদিকে নর্মদা, শোন আর যোহিলা নদী মোহনায়ে মিশে যাওয়াতে প্রকৃতি নিজের শান্ত সমাহিত রূপের দ্বারা মনের ওপর প্রভাব ফেলে যায়। হ্যাঁ, এটা একটা ধর্মস্থান। কোনও বিশেষ ধর্ম নয়, এক মহাশক্তির উপস্থিতিকে অনুভব করা যায়।



এখানে এসে মিস্টার ও মিসেস সেন আর তাঁদের ছোট্ট ছেলেটির সঙ্গে আলাপ হল। বেশ একটা পিকনিকের আমেজ নিয়ে এখানকার টুরিস্ট বাংলোতে সময়টা কাটল ভালো। অমরকণ্টকে ট্রেকিং করলাম। শারীরিক ক্লান্তি মনকে ক্লান্ত করেনা যখন থাকে খোলামেলা আড্ডা আর উষ্ণ আতিথেয়তা।

এবার ঘরে ফেরার পালা। বিলাসপুর থেকে ট্রেনে চেপে কলকাতা। কোভিডকালে স্মৃতিরোমন্থন গৃহবন্দী একঘেয়েমিকে দূরে সরিয়ে জীবনকে একটু হলেও সতেজ সজীব করে তুলেছে।



Credit of the images used with the text: Google

Source of images:

· https://timesofindia.indiatimes.com/travel/destinations/khajuraho-temples-are-more-than-just-erotic-here-are-some-interesting-facts/as70192795.cms

· https://en.wikipedia.org/wiki/Vishvanatha_Temple,_Khajuraho

· https://en.wikipedia.org/wiki/Pachmarhi

· https://timesofindia.indiatimes.com/travel/destinations/discovering-the-marble-rocks-of-bhedaghata-hidden-treasure-of-madhya-pradesh/as66709707.cms

· https://en.wikipedia.org/wiki/Amarkantak

· https://www.tripadvisor.in/LocationPhotoDirectLink-g1508510-d3913303-i74511605-Narmada_Udgam_Temple-Amarkantak_Anuppur_District_Madhya_Pradesh.html




নীড়বাসনা  বৈশাখ ১৪২৯