• কৌশিক মণ্ডল

মুক্তগদ্য - কবিতার প্রসবকথা




কবি -

বাঃ। আজ সকালটা তো বেশ। স্বপ্নে ছিলাম গভীর জঙ্গলে, হেঁটেঁ চলেছিলাম হনহন করে, হাতে ধরা খাতা আর পেন, যেন খুঁজছি কিছু - কোনো গল্পের গাছ, কোনো অসময়ের ফুল বা বিষাক্ত লতা, নাকি আরও দুষ্প্রাপ্য কিছু, যা একবার নজরবন্দী হলেই ঘসঘস করে লিখতে বসে যাবো, এক পাহাড় পিঁপড়ের ঘাড়ে চড়ে লিখে ফেলব পাতার পর পাতা। এক দল বুনো হাতি আপনতালে, ছানাপনা সমেত সামনে দিয়ে গাছপালা পটাপট মটমট ভাঙতে ভাঙতে হেঁটে চলে গেল। চকিতে ঘুরেও দেখলো না এই অযাচিত অধমকে।

এমন অবজ্ঞার মুহূর্তে পাখির কলরবে ঘুমটা ভাঙল।


মন বলছে আজ কবিতার দিন। এমন দিনে ভয় করে।

ওই আসছে ওরা শত্রু সীমানা পেরিয়ে পঙ্গপালের দল। একবার শব্দগুলোর নাগাল পেলেই ছিঁড়েখুঁড়ে ছারখার করে দেবে নষ্ট করে দেবে সব ফসল। কবিতাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, লুকিয়ে রাখতে হবে। অন্তত আজকের মত।


কবিতা -

সাততাড়াতাড়ি উঠে পড়লে যে? আবার একটা নতুন স্বপ্ন দেখলে নাকি?


কবি -

ছিল স্বপ্ন হয়ে গেল দুঃস্বপ্ন।

পায়ের তলায় পিঁপড়ে, আকাশে পঙ্গপাল।

বোঝো কপাল!


কবিতা -

আবার আবোলতাবোল?

লক্ষীটি আর এসব ছাইপাঁশ লিখো না।

কবিতা কবিতা করে তোমার মাথাটাই চুলোয় গেল।

এই যন্ত্রণা আর নিতে পারছি না।

এবার আমাকে রেহাই দাও।


কবি-

এই তোমার বিড়ম্বনা। সেই বুড়ো ঠাকুরের গাওয়া - "এ মণিহার আমায় নাহি সাজে" র মতন। আমার মস্তিষ্কের এলোমেলো ভাবনা, আমার বুকের এলোপাথাড়ি ধুকপুকানি, কাগজের ওপর কলমের আদিম আঁচড় - এ ছাড়া তোমার অস্তিত্বই নেই, তবু আমার এই সব কেরামতিতেই তোমার যত জ্বালা। তুমি কিছুতেই বোঝোনা যে তোমাকে না ভেঙ্গে মাঝদরিয়ায় না বিসর্জন দিয়ে আমি তোমায় গড়তে পারি না কণামাত্রও। তোমার ইতিকথাতেই যে তোমার নিয়ত অকালবোধন। তোমার থেকে এই সত্য তো আর কারও বেশি জানার কথা নয় - কবিতা।


কবিতা-

তুমি কি আমার প্রশংসা করলে না তাচ্ছিল্য?


কবি-

সূর্য্য তো রোজ উদয় হয়

বল তবু কেন নতুন লাগে?

সোনালি আগুনে

রক্তিম লাবণ্যে

আলতা সিঁদুরে?

তাকেও যে রোজ মরতে হয়

অস্তাচলের আকাশে

গোধূলি লগনে

অপেক্ষার অশোককাননে

শাখাপলা ভেঙ্গে

জ্যোৎস্নাসাজে


কবিতা-

তবু আমি কেন নিজেকে উৎসর্গ করবো তোমার এই বেপোরোয়া উশৃঙ্খলতার কাছে?


কবি-

যদি বলি শুধু আগামীর জন্য - সে কি যথেষ্ট নয়?

আমি তো নিজেকে নিঃশেষ করে দিতেই এসেছি তোমার দ্বারে। উন্মোচন করো এবারে। অক্ষরের সাথে শব্দের। শব্দের সাথে অর্থের-অনর্থের। ভাবের ও অভাবের। সুর ও স্বরের। ভিক্ষার সঙ্গে ভালোবাসার। সঙ্গম হোক। প্রসব হোক। নতুন প্রজন্মের নতুন কবিতা।

নীড়বাসনা  আশ্বিন ১৪২৮