• ঈপ্সিতা চক্রবর্তী ভাদুড়ি

প্রবন্ধ - মানসিক স্বাস্থ্যে করোনার প্রভাব







(ডাঃ ঈপ্সিতা চক্রবর্তী ভাদুড়ি ১৯৯২ সালে মেডিক্যাল কলেজ থেকে স্নাতক। ২০০৫ সাল থেকে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন হাসপাতালে কর্মরত। রয়াল কলেজ অফ সাইকিয়াট্রির মেম্বার। মনোরোগের বিভিন্ন শাখায় কাজ করেছেন- বর্তমানে ‘অ্যাডাল্ট সাইকিয়াট্রিতে বিশেষজ্ঞ হিসেবে লন্ডনের বিখ্যাত ইলিং হাসপাতালে কর্মরত।)


আমাদের বড়ো হয়ে ওঠার দিন গুলিতে একটা ছায়াছবির গান শুনেছিলাম- হিট গান বাংলা ছায়াছবি থেকে “ পৃথিবী বদলে গেছে, যা দেখি নতুন লাগে”। প্রেক্ষাপট একেবারেই আলাদা কিন্তু গানের এই কলি এখন ধ্রুব সত্য হয়ে উঠেছে। সত্যিই আপনার,আমার, বিশ্বজোড়া মানুষের পৃথিবীটা গত ছমাসাধিক কালে কি অসম্ভব বদলে গেছে! মাস্ক, বারবার হাতধোয়া, সামাজিক দূরত্ব এখন আমাদের জীবন কে ভীষণভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। ছোট্ট অদৃশ্য এক ভাইরাস- তার থেকে নিজেদের আর প্রিয়জনদের বাঁচিয়ে রাখার তাগিদ আমাদের অহর্নিশ ছুটিয়ে বেড়াচ্ছে। করোনা বা

কোভিড ১৯ নামটি এখন সদ্য কথা বলতে শেখা শিশুটির মুখেও শোনা যায়। নিঃসন্দেহে পৃথিবীর নানা ভাষায় সর্বোচ্চারিত সর্ববিশ্লেষিত নাম।


ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি বহুলপ্রচলিত বাক্য “ There is no health without mental health ” অর্থাৎ আমাদের সার্বিক সুস্থতা নির্ভর করে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর। কথাটির সত্যতা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। একজন মানুষ শারীরিক দিক দিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ হতে পারেন, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্য এবং শারীরিক স্বাস্থ্য একে অন্যের পরিপূরক না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত পৃথিবী চুড়ান্ত স্বাদহীন, গন্ধহীন বর্নহীন হয়ে দাঁড়ায়।সুতরাং দেখে নেওয়া যাক যে এই নৃশংস অভূতপূর্ব, অকল্পনীয় সময়ে কি ভাবে আমরা নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে একটু বেশী নজর রাখতে পারি।

যদিও সমাজে মানসিক রোগ সম্পর্কে সচেতনতা আগের থেকে বহুগুণ বেড়েছে, তবুও আজও যেন অনেকটাই না জানা, অল্পজানা, অজানা ভয় এবং অনেকটাই ট্যাবু হয়ে আছে- মানসিক রোগ যেন প্রকাশ্যে আলোচনা না হয়। আসলে মানুষের অজ্ঞানতা থেকেই জন্ম নেয় ট্যাবুর - এখানেও তাই হয়েছে। সমাজের বহু মানুষ এখনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার আগে কয়েকবার ভাবেন। অন্য অনেক রোগের সময় সরাসরি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করতে দেরি করেন না, কিন্তু মানসিক রোগের জন্যে অনেক সময় বেশ দেরি করেই ডাক্তারের পরামর্শ নেন।


শারীরিক ব্যাধি যেমন নানা প্রকার, মানসিক ব্যাধিও তাই। সাধারণতঃ যে সব মানসিক রোগের সঙ্গে আমরা পরিচিত সেগুলো হল মানসিক অবসাদ এবং চিন্তা (Depression, anxiety and related disorder) , সাইকোটিক ডিসর্ডার এবং স্কিজোফ্রেনিয়া- যেখানে মানুষ বাস্তবের সঙ্গে সংযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এছাড়া অন্যান্য নানা রকম রোগ আছে সেগুলো আজকের আলোচনার গণ্ডির বাইরে। কিন্তু কীভাবে মোকাবিলা করা যায় কোভিডের? এই ভয়ঙ্কর রোগের মোকাবিলা করার আগে প্রথমেই জানতে হবে করোনার বিপদটা ঠিক কোথায়? মানসিক স্বাস্থ্য এবং মানসিক রোগ কি সত্যি প্রভাবিত হয় এই চাপা টেনশনে? কয়েকটা পরিসংখ্যান দেখে নেওয়া যাক। সেই জানুয়ারি মাস থেকে গোটা পৃথিবীতেই গবেষণা চলছে জোর কদমে। কী পেলাম আমরা এইসব গবেষণা থেকে? ভারতের বিভিন্ন গবেষণা থেকে বলতে পারি ৭০-৮০% লোক স্বীকার করেছেন যে কোভিড ও লকডাউনের জন্য তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে। তাঁদের বেশীর ভাগ সর্বক্ষণ কোভিডের আশঙ্কায় ভুগছেন। ১২-১৫% লোক ঘুমের অসুবিধায় ভুগছেন। বর্তমানে মানসিক অবসাদ ও অতিরিক্ত চিন্তার শিকার প্রায় ৪০%। সাধারণত ২৫% লোক মানসিক অবসাদে ভোগেন- অর্থাৎ এখন তা বেড়েছে ১৫ শতাংশ। আত্মহহত্যার এবং মদ্যপানের হার প্রচুর বেড়ে গেছে। এই পরিসংখ্যাগুলো ভারতের হলেও আশ্চর্যজনকভাবে ইংল্যান্ডেও এই রকমই পরিসংখ্যান দেখতে পাচ্ছি। খুবই চিন্তার বিষয় যে কোভিডের সময় কিন্তু কিশোর এবং তরুণদের মধ্যে মানসিক অবসাদ বেড়ে যাওয়ার এক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আমরা, যারা গবেষণায় নানাভাবে যুক্ত তারা জানি যে পৃথিবীর বহু দেশেই এই একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।


এবার আমি আসব কোভিড এবং মানসিক রোগের আন্তঃর্সম্পর্কে। হঠাৎ করে আমাদের জীবনে যে পরিবর্তন এসেছে- কাজে যাওয়া বন্ধ, বাজার হাটও ভয়ে ভয়ে করতে হচ্ছে, সামাজিকতা প্রায় লুপ্ত। বাড়ির বাইরে বেরুতে হলে ভয় কখন করোনা ছোবল মারবে। সারাক্ষণ সামাজিক মাধ্যম, বৈদ্যুতিন আর খবরের কাগজে দুঃসংবাদ, ভ্যাক্সিনের অপেক্ষায় প্রহর গোনা- সব মিলিয়ে মানসিক চাপের কারণ অজস্র। প্রত্যেকেই কমবেশি আক্রান্ত এই চিন্তাজটে। কিন্তু যারা বেশী সংবেদনশীল, বা যারা আগে থেকেই কোন মানসিক রোগে ভুগছেন, তাদের কিন্তু মানসিক সাহায্য একটু আগে থেকেই লাগবে এবং হয়তো একটু বেশীই লাগবে। জাতি, ধর্ম, বয়স নির্বিশেষে সবাই কিন্তু মানসিক চাপ বা স্ট্রেসের শিকার। সারাক্ষণ এক অস্থিরতা, এক প্রবল চিন্তা আর ঘুমের অসুবিধার জন্ম হতে পারে এই মানসিক চাপ থেকে। এমন কি বেচে থাকার ইচ্ছাই চলে যায়।

কীভাবে মোকাবিলা করবো এই মানসিক চাপের? কিছু লোক কাজ করছেন বাড়ি থেকে, ছাত্র ছাত্রীরা ক্লাস করছে বাড়ি থেকে। টেকনোলজি না থাকলে কী হতো ভাবতেও আতঙ্ক হয়। সারাদিনের ফাঁকে সময় রাখতে হবে শরীরচর্চার জন্যে- একেবারে আলাদা করে। জিম বন্ধ হলে কি হবে, নিজেই ব্যায়াম করতে হবে বাড়িতে, বাগানে বা রাস্তায়- যোগাসন, ফ্রিহ্যান্ড বা দৌড়ানো- এর জন্যে অনেক সঙ্গীসাথীর দরকার হয় না। নিয়মিত শরীরচর্চা করলে মস্তিষ্কে রক্তসঞ্চার বেশী হবে। আর আমাদের কাছে এখন যথেষ্ট গবেষণালব্ধ প্রমাণ আছে যে নিয়মিত ব্যায়াম শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য দুইই ভালো রাখে।

শুধু শরীরচর্চা নয়, পুষ্টিকর খাবার এবং পর্যাপ্ত ঘুমের দিকে নজর দিতেই হবে। যথেষ্ট ঘুম মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আর সারাক্ষণ বাড়িতে থাকার জন্য আমাদের সারাক্ষণই একটা টুকিটাকি খাবার প্রবণতা বেড়ে যায়- এই মুহুর্তে আমরা সবাই জানি শরীরে চর্বি কিন্তু বিপজ্জনক- শরীর ও মন দুইয়ের জন্যই। খাওয়া এবং ঘুম দুইই আমাদের জৈবিক প্রক্রিয়ার অন্তর্গত এবং এর খুব বেশী তারতম্য হলে শরীরের উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতেই পারে। সহজপাচ্য খাবার এবং সন্ধ্যের পর চা কফি বা ঠাণ্ডা পানীয় না খাওয়া অবশ্যই ভালো ঘুমের জন্য উপকারী।

এই করোনার সময়ে যে একটা উপকারী উপদেশ সমস্ত সভ্য দেশগুলোতে দেওয়া হচ্ছে সেটা হল একটা হবি বা শখ গড়ে তুলুন। মানুষ হিসেবে আমরা নিজেদের সবচেয়ে ভালো চিনি- কোন বিশেষ শখ পূরণ হয় নি সময়ের অভাবে- এবার অখণ্ড অবসর। সেই শখ পূরণের চেষ্টা করতে হবে। ডাকটিকিট জমাতেন ছোটবেলায়, আবার আরম্ভ করুন, বইপড়া, নতুন ভাষা শেখা, ছবি আঁকা, বাগান করা বা কবিতা লেখা- এই নতুন কিছু করার আনন্দ কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য একেবারে বিশল্যকরণী। একঘেয়েমি কাটায় আর এর অন্য উপকার হল যে মানুষকে নানারকম মদ্যপান বা ধূমপানের মতো বদ অভ্যেস থেকে দুরে রাখে।


মানুষ সামাজিক প্রাণী। হঠাৎ করে মানুষের দেখাসাক্ষাৎ বা মেলামেশা একেবারে বন্ধ। কিন্তু একেবারে বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপের মতো হয়ে যাবার কোন দরকার নেই- সঙ্গে আছে স্মার্টফোন- ভিডিও কল করতে হবে, টেকনোলজি যেমন আধুনিক যুগে আমাদের নিয়ন্ত্রন করছে- আমাদেরও এর পরিপূর্ন সদ্ব্যবহার করতে হবে। বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যেমন দরকার, ঠিক তেমনই বাড়ির লোকেদের বিশেষ করে ছোটদের সময় দিতে হবে নিশ্চয়।


কিছু মানুষ একটু সংবেদনশীল, তাদের প্রয়োজন হয়তো একটু বেশি, হয়তো একটু ভিন্ন। এতক্ষণ যাঁদের কথা বললাম, সে সবই সাধারণ মানুষের জন্য। এবার ভাবতে হবে যারা এই অতিমারীতে অধিক আক্রান্ত- বয়স্ক, অশক্ত, মানসিক বা শারীরিকভাবে কোনো ক্রনিক রোগে ভুগছে তাদের কথা। বা যারা ধরুন গার্হস্থ্য হিংসার শিকার। যারা আগে থেকেই কোনও মানসিক রোগে ভুগছেন, যেমন স্কিজোফ্রেনিয়া তাদের অসুবিধা কিন্তু প্রবল- এবং মানসিক রোগের সমস্যা হল সেটা বাইরের লোকের কাছে সবসময় দৃশ্যমান নয়। তাদের বহুবিধ সমস্যা আমরা রোজই দেখছি- পাঠক মনে রাখবেন এই সমস্যা কিন্তু দেশ কাল বা ভৌগোলিক পরিধির মধ্যে আবদ্ধ নয়।


আমাদের কথা বলতে হবে- পরস্পরের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে- প্রতিদানে সাহায্যের আশা না রেখে। বিশ্বভ্রাতৃত্বের বিশ্বমৈত্রীর এরকম কঠিন পরীক্ষায় আগে কোনদিন আমরা বসি নি । এই কথাগুলো কিন্তু গত ছমাসে প্রায় সকল সচেতন মানুষই জেনে গেছে- বৈদ্যুতিন মাধ্যমের জন্য। কিন্তু এটাই মানসিক চিকিৎসাবিদ্যার গোড়ার কথা। আত্মহত্যার সংখ্যা বিশ্বব্যাপী অনেক বেড়ে গেছে- এই চরম মানসিক অবসাদ কিন্তু একা একা রোখা যাবে না- এক সম্মিলিত প্রয়াস আজ আমাদের সবার দরকার- মানসিক চাপ, ডিপ্রেশন এগুলো কিন্তু সামাজিক প্রতিষ্ঠা দেখে না। যদি মনে হয় যে আপনার অসুবিধে একটু বেশী, তাহলে ডাক্তারের সাহায্য নিতে হবে- তার মানেই যে আপনার দুর্বলতা প্রকাশ পেলো, তা কিন্তু নয়। দরকার হলে সরকারি হেল্পলাইনে কথা বলতে হবে। মনে রাখবেন ইতিহাস বলছে যে কোন অতিমারী থাকে দেড় থেকে দু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থারও তাই অভিমত। মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এর প্রভাব কিন্তু সুদূরপ্রসারী। বছর। এই সময় ইউরোপের বহু দেশে আমরা দেখছি করোনা ঢেউ আছড়ে পড়েছে। করোনা অবসাদ মানুষকে কাবু করেছে প্রবলভাবে। এরই মাঝে আশার কথা যে গোটা পৃথিবী একজোট হয়ে চেষ্টা করছে প্রতিষেধক তৈরির কাজে। বিশ্বব্যাপী খারাপ খবরের মাঝে এ একটু আশার কথা বই কি! আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে মানুষ এই ভয়াবহ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারবো- এবং তা সম্ভব হবে সকলের সম্মিলিত প্রয়াসেই। নতুন ভোরের আলো আসবেই।





নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮