• অনন্যা ব্যানার্জি

মায়ার খেলায়





বিধিসম্মত সতর্কীকরণ - এই গল্পটি প্রাপ্তমনস্ক পাঠকদের জন্য)



আজকাল অফিস থেকে ফিরে এক গ্লাস রঙীন পানীয় নিয়ে রোজ বসেন মন্দার গাঙ্গুলি। মন্দার গাঙ্গুলি এখন এক বড় নাম। তাঁর ব্যবসার খ্যাতি আজকাল ছড়িয়ে পড়েছে দেশে বিদেশে। সন্ধ্যার পরে স্বল্প আলোয় বসে সুরাপান করতে করতে সময়টা আয়েসে কাটিয়ে দিতে চান মন্দারবাবু। তাঁর ছেলে ও মেয়ে দুজনেই বড় হয়ে গেছে। ছেলে কৃশানুর স্বভাবটা ঠিক ওর মায়ের মতন। চাপা স্বভাবের আর চোখ দুটোতে অসীম ব্যাপ্তি। কিছু না বলেও অনেক কথা বলে যায় ওই চোখগুলো। ওই চোখ দুটোকে বড় ভয় পায় মন্দারবাবু। কেন জানি মনে হয় তা কিছু না বলেও মানুষের ভেতরটাও যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। অলোকার যোগ্য পুত্র সে। মায়ের মত মেধাবী ও রুচিশীল। আজ ও মা ছেলেতে গান গাইলে যেন এক অন্য জগতে পাড়ি দিতে হয়। কৃশানু দুবছর হল থাকে আইআইটি হস্টেলে। বাড়ি ফেরে সপ্তাহান্তে। তাতেও বাবা ও বাবার ব্যবসায় কখনো তার তেমন উৎসাহ চোখে পড়ে না। বেশীরভাগ সময় বসে থাকে দক্ষিণের ঘরটায় একটা গিটার হাতে। মায়ের সঙ্গে কিন্তু তার মিত্রতা খুব বেশি। আর মন্দারের ছোট মেয়ের নাম কৃষ্ণকলি। বাবার মত একটু কালো হলেও, মায়ের মত মুখশ্রী পেয়েছে মেয়ে। সুন্দর ছিপছিপে চেহারায় মেয়ে কিন্তু খুব মিশুকে স্বভাবের। কলেজে ফাস্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছে এ বছর। স্কুল কলেজ মিলিয়ে বন্ধুর মেলা তার আর সবসময় তাদের বাড়িতে এই ছেলে মেয়েদের আনাগোনা লেগেই থাকে। মেয়েও মায়ের ভক্ত কারণ অলোকাই সামলায় কলিকে সবসময়।


"বাবা, তোমার সঙ্গে একটু কথা ছিল।" - কলি এসে বসেছে আজ মন্দারের পাশে। বাবার বড় আদুরে কলি।

"হ্যাঁ, মা বলো। কি চাই?" - হেসে গ্লাসে চুমুক দিয়ে টিভির ওপরেই চোখ রেখে প্রশ্ন করে মন্দারবাবু।

"বাবা, আমি কি তোমার কাছে শুধু কিছু চাইতে আসি!! আই এম হার্ট" - ঠোঁট ফুলিয়ে বলে কলি।

"তা না, সোনা। সরি। বলো কি বলবে।" - টিভিটা মিউট করে মন্দারবাবু তাকান মেয়ের দিকে।

"আমি এই শুক্রবার বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করতে যেতে চাই ক্লাবে, প্লীজ। আমাকে মা অনুমতি দিচ্ছে না। তুমি প্লীজ মাকে বোঝাও।" - গলা নামিয়ে আবদার করে কলি।

"মা না বললে, কিন্তু আমি অনুমতি দিতে পারবো না, কলি। তুমি জানো।" - বলে মন্দারবাবু।


ঠিক তখন কলির পাশে এসে বসে তার এক বন্ধু। কলি পরিচয় করিয়ে দেয় -"বাবা, এটা কেয়া। আমার কলেজের বেস্ট ফ্রেণ্ড। ও আমাদের কলেজের টপার‌। ও যাচ্ছে পার্টিতে। আমাকেও দাও না অনুমতি, প্লীজ।"

"প্লীজ!! হ্যাঁ বলুন।" - বন্ধু মেয়েটাও কলির সঙ্গে অনুরোধ জানায় মন্দারবাবুকে। মন্দারবাবুর দৃষ্টি এড়ায় না, কলির বন্ধু, কেয়ার চেহারা ও মুখশ্রী কিন্তু বেশ আকর্ষক। সদ্য যুবতী মেয়েটির শরীরের ভাঁজে ভাঁজে মাদকতা।


কেমন যেন মোহময় চেহারা মেয়েটির আর চোখ দুটো যেন খুব বেশী কথা বলে। গভীর দৃষ্টিতে মুহুর্তের জন্য ডুবে গিয়েই পর মুহুর্তে মন্দারবাবু বাস্তবে ফিরে আসেন।


বলেন -"ঠিক আছে। তুমি যাও। কিন্তু বেশি দেরী করবে না। আর তোমার ও তোমার বন্ধুদের ফোন নম্বরগুলো দিয়ে যেও আমাদের কাছে।"

"আমার নম্বরটা নিয়ে নিন।" - বলে হাসে মেয়েটি। কেয়ার নম্বরটা ফোনে সেভ করে নেন মন্দারবাবু।

তারপরেও অনেকক্ষণ বসে মেয়েটি গল্প করতে থাকে মন্দারবাবুর সাথে। কেন জানি মনদারবাবুর মনে হয় -"এত সুন্দর করে অনেকদিন পরে নানা বিষয়ে আলোচনা করলেন তিনি কারুর সঙ্গে।"


মেয়েটির বুদ্ধি ও জ্ঞানে মুগ্ধ হন তিনি বারবার। এই বয়সে ব্যবসার বুদ্ধিও খুব বেশি বলে মনে হয় মন্দারবাবুর। কিছুক্ষণ পরে কলি উঠে ঘরে চলে গেলেও, কেয়া কিন্তু বসে থাকে তার সঙ্গে। বিনা সঙ্কোচে আলোচনা করতে থাকে নানা বিষয়ে। তারপর একটু বেশি রাত হলে সকলকে বিদায় জানিয়ে মেয়েটি বাড়ি যেতে উদ্যত হলে, ড্রাইভারকে বলেন মনদারবাবু ওই মেয়েটিকে বাড়ি নামিয়ে দিতে।


খুব খুশি হয় কেয়া। "আপনাকে থ্যাঙকস জানানোর ভাষা নেই আমার কাছে। জানেন তো আপনার সঙ্গে কাটানো এই সন্ধ্যা অনেকদিন আমার মনের মণিকোঠায় উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।" - বলে আবার ও মিষ্টি হাসে কেয়া।


অলোকা রাতের খাওয়ার সময় মন্দারবাবু কলিকে ক্লাবে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে জেনে বেশ রাগ করে মন্দারবাবুর ওপরে। মন্দারবাবু বোঝান -"তোমার ছেলে মেয়ে তো আর এখন সেই ছোট্টটি নেই, যে ঘরে বসে থাকবে। ওদের স্বাধীনতায় বাধা দিলে ওরা তা লুকিয়ে করবে, বা হয়তো অন্য ভাবে বিরোধ করবে।"


অলোকাদেবী মুখ গোমড়া করে থাকেন খাওয়ার টেবিলে। কখনো কখনো এই মানুষটাকে বুঝতে বড় বেশি অসুবিধে হয় তার। ভাবে -" তার ছেলেটা তো বড়াবড়ের শান্ত স্বভাবের, বাদ্ধ। কিন্তু মেয়ের স্বভাব হয়েছে বাবার বসানো। সবসময় হৈ হুল্লোর, পার্টি, নাচ, আড্ডা।"

মায়ের মনে সবসময় তাই ভয় হয় আজকাল -"কি জানি কিছু অঘটন না ঘটে!! আর মেয়ে সন্তান।"


রাতে শুতে এসে অলোকাদেবীকে জানান মন্দারবাবু -"অলোকা, তুমি চিন্তা করছো কেন? ওইদিন আমিও নয় ক্লাবে যাব। দূর থেকে নজর রাখবো এইসব ছেলে মেয়েগুলোর ওপরে।"

"ঠিক আছে। তাই করো।" - একটু খুশি হয় অলোকাদেবী, স্বামীর শেষ কথাগুলোয়।


অলোকাদেবীকে ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন মন্দারবাবু। কিন্তু তারপর জীবনে ধন সম্পত্তি ও নামের মোহে এতটাই নিমজ্জিত ছিলেন তিনি, তাদের সম্পর্কটায় ও যেন একটু হলেও দূরত্ব এসে গেছে। আগে অন্ততঃ বিবাহ বার্ষিকী বা জন্মদিনে দুজনে মিলে কোথাও ঘুরতে যেতেন, কিছুটা সময় কাটাতেন এক সঙ্গে। কিন্তু ছেলে মেয়ে হওয়ার পরে সেসব ও কতদিন বন্ধ হয়ে গেছে। তাছাড়া অলোকা আগে চেষ্টা করেছে কাছে আসার, কিন্তু কখনো ক্লান্তি, কখনো ব্যবসার চিন্তার অজুহাতে এতটাই বড় পাঁচিল উঠেছে দুজনের মধ্যে যে আজকাল এক ছাদের তলায় থেকেও তাদের যেন দুজনে ভিন্ন ভিন্ন অস্তিত্ব। আজকাল শরীরের ইচ্ছেগুলোকেও দমিয়ে রাখেন মন্দারবাবু, পাছে সেই ইচ্ছে প্রকাশে কোন বিপত্তি দেখা দেয় সম্পর্কে। রাতে বিছানায় শুয়েও দুজনে দুজনকে পিঠ দেখিয়ে অপেক্ষায় থাকে কখন ঘুম নেমে আসবে চোখে। আর কখনো কখনো তো কাজে এত ব্যস্ত থাকেন মন্দারবাবু যে বাড়ি ফিরতে বা শুতে আসতেও দেরী হয়ে যায়। ততক্ষণে সারা দিনের ক্লান্তির পরে ঘুমে তলিয়ে পড়েছে অলোকা। মাঝে মাঝে সকালে স্নান সেরে গরম চায়ের কাপটা নিয়ে আসে যখন অলোকা, ইচ্ছে হয় ওকে বুকে টেনে নেন। একবার করতে গিয়ে ঠিক তখন ই ঘরে ঢুকেছিল কৃশানু আর মা বাবাকে দেখে লজ্জায় লাল হয়ে বেড়িয়ে যায় ছেলে। অলোকা খুব রাগ দেখিয়েছিল সেদিন আর বলে -"তোমার কোন কাণ্ডজ্ঞান নেই। বড় ছেলে মেয়েদের সামনে এসব কি করো, তুমি!!"


মাঝে মাঝে অফিসের কাজে বাইরে গেলে অনেক মেয়েদের দেখে মুগ্ধ হয়েছেন মন্দারবাবু। তার খ্যাতি প্রতিপত্তির কারণে সেসব মেয়েরাও কখনো কখনো কাছে আসতে চেয়েছে, কিন্তু সেই মোহকে জয় করেছেন তিনি। কাজের সঙ্গে কখনো কোন আপোস করেননি মন্দারবাবু আর কখনো কারুকে পছন্দ হলেও বারবার চোখের সামনে ভেসে এসেছে অলোকার মুখ। পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে তখন কোন চাকরি না পাওয়া স্বত্ত্বেও মন্দারবাবুকে বিয়ে করেছিল অলোকাদেবী। সেই শক্তিটা চিরদিন তাই স্বপ্নকে ছুঁয়ে থাকতে সাহায্য করেছে মন্দারবাবুকে। কখনো কামের বশীভূত হয়ে অলোকা ও পরিবারের প্রতি কোনরকম অন্যায় করতে পারেনি মানুষটা, শুধু সংসার ও ছেলে মেয়ের কথা ভেবে।


শুক্রবার সন্ধ্যায় ফোন করে অলোকা মনে করায় -"আজ কিন্তু ক্লাবে যেও তুমি। কলিকে নিয়েই রাতে বাড়ি ফিরো।"

মন্দারবাবু ড্রাইভারকে বলে -"ক্লাবে যাবো আজ।"

ক্লাবে পৌঁছে ঢোকার মুখে একটি মেয়ের সঙ্গে ধাক্কা লাগে তাঁর। কোনরকমে সামলে নিয়ে দেখেন মেয়েটি আসলে কেয়া, তার মেয়ের প্রিয় বান্ধবী। লাল জামায় আজ আরো রূপবতী লাগছে তাকে। মিষ্টি হেসে সে বলে -"সরি!! থ্যাঙ্কস। আপনার অনুমতি না পেলে আজ আসা হতো না আমাদের পার্টিতে।"


"নো মেনশন" - বলে বেড়িয়ে যাবেন মন্দারবাবু, তখন মেয়েটি একটু কাছে এসে বলে -"আপনি কিন্তু কলির বাবা লাগেন না একদম। এখনও কলির বন্ধু বা দাদা বলে চালিয়ে দেওয়া যায় অনায়াসে।"


অন্য সময় হলে হয়তো একটু বিরক্ত হতো মন্দারবাবু। কেন জানিনা মেয়েটার মায়ামাখা চোখ দুটো দেখে আর রাগ প্রকাশ করতে পারেনা মন্দারবাবু। হেসে বলেন -"থ্যাঙ্কস ফর দা কমপ্লিমেন্ট‌।"


তারপরে অভ্যাসমত সুইমিং পুলের পাশের একটা টেবিলে গিয়ে বসেন মন্দারবাবু। পরিচিত ওয়েটারকে তার পছন্দের পানীয় ও স্ন্যাক্স আনতে অনুরোধ করেন। অনতিদূরে চলছে কলি ও তার বন্ধুদের পার্টি।

মন্দারবাবু ভাবেন -"আজকালকার ছেলে মেয়েরা একটু বেশি স্বচ্ছন্দ সব ব্যাপারে। তাইতো বয়স, জাতি, ধর্ম কোন কিছুর গণ্ডিই যেন মানতে চায়না তারা।"

কলি একটা গ্লাসে ড্রিংক নিয়ে বসেছে একটি সমবয়সী ছেলের সাথে। কেয়া কিন্তু একা বসে একটি টেবিলে। দূর থেকে যেন মন্দারবাবুকে দেখছে এক দৃষ্টিতে।

"কি যেন একটা মোহমাখা সেই দৃষ্টি।" - ভাবে মন্দারবাবু আর না চাইলেও তার দৃষ্টিও চলে যাচ্ছে একাকী মেয়েটার দিকে।

মন্দারবাবু ভাবেন -"কি এমন দেখছে মেয়েটা তার ভিতরে। সেদিন আলাপ করার সময় ও যেন এক অপরিসীম মুগ্ধতা ছড়িয়ে ছিল তার চোখে মুখে আর আজকের কথাগুলো না চাইলেও যেন বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে মন্দারবাবুর।


রাত একটু গাঢ় হয়ে এসেছে। বসে বসে একটু বেশি সুরাপান হয়ে গেছে মন্দারবাবুর। হঠাৎ চোখ তুলে দেখেন সামনে বসে কেয়া।


"এ কি তুমি তোমার পার্টি ছেড়ে এই বুড়ো লোকটার কাছে এলে কেন?" - একটু হেসে ব্যাপারটা হাল্কা করতে চান মন্দারবাবু‌।

কেয়া হঠাৎ মন্দারবাবুর হাতটা ধরে বলে -"জানেন তো আমার এইসব বন্ধুদের ভাল লাগে না। খুব বেশি ইমমেচিওর্ড লাগে এদের সকলকে। আপনার মত সুন্দর কথা বলতে পারা ও সব পরিস্থিতি বোঝার মত কাউকে আমি এ জীবনে দেখিনি। তাইতো আপনাকে দেখে বারবার চুম্বকের মত চলে আসি আপনার কাছে।"

"তুমি আমার মেয়ের মত। তোমার আমাকে ভাল লাগে জেনে খুব ভাল লাগলো। এই বয়সে এমন হয় অনেকসময়।" - বলে কথাটা এড়িয়ে যেতে চান মন্দারবাবু।


এর মধ্যে ড্রাইভার এসে জানায় বাড়িতে একটা বিশেষ দরকারে তাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে হবে।

মন্দারবাবু উঠে পড়েন। কেয়াকে বলেন -"একটু কলিকে ডেকে আনো প্লীজ। বলো বাড়ি যেতে হবে।"

কলি বাড়ি যেতে না চাইলেও, একটু বকাবকি করে গাড়িতে গিয়ে বসেন মন্দারবাবু মেয়ে ও কেয়াকে নিয়ে। কেয়াকে বাড়িতে নামিয়ে নিজের বাড়ি ফিরে যাবেন ঠিক করেন।


হঠাৎ রাস্তায় বাড়ির কাছাকাছি এসে অসতর্কতায় গাড়িটি একটা এক্সিডেন্ট করলে, একটা ক্যাব বুক করে কেয়াকে বাড়ি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন মন্দারবাবু। তখন কলি বলে, "বাবা, তুমি কেয়াকে ছেড়ে এসো। আমি বাড়ি ঢুকে যাবো।" ড্রাইভার যায় পুলিশ স্টেশনে ঘটনা সামাল দিতে।


কেয়ার সঙ্গে ক্যাবে বসলে, হঠাৎ মেয়েটা মন্দারবাবুর গায়ের কাছে এসে বসে। চেপে ধরে ওনার হাতখানা। আর তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল।


মন্দারবাবু একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাতটা ছাড়াতে গেলে, মেয়েটি বলে -"আমার বাবা মা অনেক ছোটবেলায় মারা গেছেন। আমি বড় হয়েছি মামার কাছে। আপনার মত একটা লোকের সান্নিধ্য পেলে আমি হয়তো সত্যি জীবনে কিছু একটা করে দেখাতে পারবো সকলকে। জানেন তো আমার দুর্ভাগ্য যে আপনার মত কারুর সঙ্গে আগে পরিচয় হয়নি আমার।"

বাড়ির কাছে নেমে কেয়া বলে -"একবার ভেতরে আসবেন না?"

কি জানি কেন মেয়েটার দুঃখের কথা শুনে ওর অনুরোধটা ফেলতে পারেনা মন্দারবাবু। ভেতরে গিয়ে সোফাতে বসলে মেয়েটি বলে -"এই জীবনে অনেক প্রতারণার শিকার হয়েছি। তাই আজ একা থাকার এই জীবন বেছে নিয়েছি আমি।"

"কেমন প্রতারণা? তুমি তো এখনো বেশ ছোট!!" - বলেন মন্দারবাবু।


"পৃথিবীটা খুব বেশি ভয়াবহ এই বয়সেই তা বুঝে গেছি। যাদের বিশ্বাস করেছি তারাই প্রতারণা করেছে আমার সঙ্গে।" - কান্নাভরা গলায় বলে কেয়া -"সেসব অনেক কথা। একদিন না হয় সময় করে আপনাকে বলবো।" কথা বলতে বলতে মেয়েটি একটি ওষুধ মুখে দেয়।

"আমাকে আপনার ছোট মনে হয়? একবার কাছে এসে তো দেখুন।" - বলে জোর করে মন্দারবাবুকে কাছে টেনে নেয় ওই মেয়েটি। আজ সন্ধ্যায় অনেকটা ড্রিংক করে ফেলায় যেন নিজের ওপরেও কোনরকম নিয়ন্ত্রণ থাকে না মন্দারবাবুর। আর মেয়েটি এইসব খেলার মাঝে, ওই ওষুধটি কোনভাবে মন্দারবাবুর মুখে দিয়ে দেয়। কিছুক্ষণের জন্য মেয়েটির ঠোঁটের নরম অনুভূতিতে হারিয়ে যান তিনি। মেয়েটির চুলের মিষ্টি গন্ধ এক মাদকতা সৃষ্টি করে, যেখানে বয়সের ব্যাবধান যেন নিমেষে হারিয়ে যায়। দুটো শরীর মেতে ওঠে এক অনন্য খেলায়। ওই ড্রাগ ট্যাবলেট ও মদের নেশা তখন মন্দারবাবুকে পুরোপুরি বশীভূত করেছে। অনেক বছর পরে যেন কাম রিপুর দাসত্ব স্বীকার করেছেন মন্দারবাবু, কিছুটা বুঝে আর কিছুটা নেশায়। ততক্ষণে তিনি নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন নিজের ওপরে।


কিছুক্ষণ পরে জ্ঞান এলে দেখে তিনি সোফা কাম বেডে পড়ে আছেন সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায়। পাশে নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে কেয়া। পাশে রাখা তার জামা কাপড়। নিজের ভুল বুঝে তাড়াতাড়ি কেয়ার শরীরে তিনি টেনে দেন চাদর। কয়েক মুহুর্তে নিজের জামা পরে রাস্তায় বেড়িয়ে আসেন তিনি।দরজাটা টেনে লক করে দেন। এখন রাত দুটো। একটা ক্যাব নিয়ে সোজা চলে আসেন গঙ্গার ধারে। বাড়ি ফেরার সাহস আজ আর সঞ্চয় করতে পারেন না তিনি। ওখানে বসে কান্নায় ভেঙে পড়ে মন্দারবাবু। নেশা ও মোহের বশে আজ তিনি যে অন্যায় করেছেন, কোনভাবে আর অলোকা ও নিজের ছেলে মেয়েকে ও মুখ দেখাতে পারবেন না তিনি। তারায় সজ্জিত খোলা আকাশের নীচে বসে নিজেকে বড় দোষী মনে হয় আজ তার জীবনে প্রথমবার, বারবার প্রশ্ন জাগে -"এতবছরের দৈহিক স্প্রিহা এর জন্য দায়ী, না কি দায়ী ওই মেয়েটি যে এক দেখায় মুগ্ধ হয়ে তার সব সমর্পণ করেছে এ তার বাবার বয়সী একটি লোকের কাছে? না কি দায়ী ড্রাগ ও সুরা? একেই বোধহয় বলে মোহ!! আজ চারটে জীবন নষ্ট করার পেছনে হাত তার নিজে্র।" কথাটা ভেবেই আঁতকে ওঠে মন্দারবাবু। মুক্ত আকাশের নীচে বসে তার কান্নার আওয়াজ আলোড়িত করতে থাকে রাতের নিস্তব্ধতাকে।




এইসব চিন্তার কারণে নিজেকে বড় ঘৃণ্য লাগতে থাকে তাঁর। উঠে রাস্তার ধার ধরে আনমনে হাঁটতে থাকেন, এইসব চিন্তায় মত্ত হয়ে। কিছুতেই যখন পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করতে পারছেন না, তখন হঠাৎ একটা মালবহ বিশাল ট্রাক এসে ধাক্কা দেয় তাকে। ছিটকে পড়ে মানুষটা একটু দূরে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে রক্ত।


নিজের দোষের শাস্তি বরণ করে নিয়ে আজ চিরনিদ্রায় আচ্ছন্ন মন্দারবাবু রাস্তার ধারে। পরেরদিন সকালে খবর ছড়িয়ে পড়লে ছুটে আসবে হয়তো সকলে - অলোকা, কলি, কৃশানু। কেউ জানবে না আজ রাতে তার ঘৃণ্য কাজের কথা আর। সেটা হারিয়ে যাবে সময়ের সাথে। ক্ষমা চাওয়াটা যে সত্যি এতোটা কঠিন!





নীড়বাসনা  আশ্বিন ১৪২৮