• প্রদোষ সেন

রেনি ডে



আজ ভোরবেলা থেকেই আকাশের মুখ ভাড়। শুরু হয়েছে কাল বিকেল থেকেই। প্রথমে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। সঙ্গে ছিল অল্প ঝোড়ো হাওয়া। বৃষ্টিটা একটু থেমেছিল সন্ধ্যের দিকে। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস বলছে বঙ্গোপসাগরের ওপরে নাকি নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে, এটা তারই জের। এইরকম চলবে প্রায় দুদিন।

সকাল ছটা প্রায় বাজে। অন্যদিন এই সময় দিনের আলো বেশ ফুটে যায়, আজ মনে হচ্ছে পাঁচটাও বাজেনি।

দিনের আলো চোখে পড়লে সাধারণত ঘুম ভেঙে যায় অনন্যর। বহুদিনের অভ্যাস, ঘড়িতে অ্যালার্ম দেওয়ার দরকার পড়েনি কোনদিন। আজ একটু ব্যতিক্রম। ঘুমটা ভেঙে গেল দিনের আলো আসার আগেই। ঘুমটা আজ অন্যদিনের মত ভালো হয়নি। রাতে দু-একবার উঠতেও হয়েছে।

কপালে হাত দিয়ে একবার নিজের তাপমাত্রা দেখল। মনে হচ্ছে জ্বর এখন নেই। ডক্টর সরকারের ওষুধটা তাহলে কাজ দিচ্ছে।

যদিও এত তাড়াতাড়ি কিছু বলা মুশকিল। কারণ জ্বর এখন শুধু জ্বর নয়। টেস্ট করাও, অক্সিজেনের মাত্রা পরীক্ষা কর। ডাক্তার যদি বলেন তো সিটিস্ক্যানও করাতে হবে।

আর বাড়িতে চিকিৎসা করে ঠিক না হলে...না ওসব এখন ভাবতে চায় না অনন্য। আগে তো রিপোর্ট আসুক। আজ সন্ধ্যেবেলা রিপোর্ট দিয়ে যাওয়ার কথা, নাহলে কাল কোন সময় আসবে।

ও নিশ্চিত ওর ব্যাপারটা অতোদূর গড়াবে না। বাড়িতেই ঠিক হয়ে যাবে।

তবে চিন্তাও আছে। রক্তে শর্করার মাত্রাটা একটু বেশীর দিকে।

ডক্টর সরকার অত্যন্ত বিচক্ষণ এবং অভিজ্ঞ ডাক্তার। অনেকদিন ধরেই অনন্য ওর কাছে যায়। ফ্যামিলি ফিজিসিয়ন মত হয়ে গেছেন। কাল থেকেই কিছু ওষুধ লিখে দিয়েছেন আর ব্লাড-সুগারের ওষুধ যেন ঠিকমত খাওয়া হয় সেটা মনে করিয়ে দিয়েছেন। কথাগুলো স্ত্রী সুমনাকেও বলে দিয়েছেন।

ডাক্তারের পরামর্শ মত অনন্ত আজ থেকে একা এই ঘরে আছে। নিজেকে আলাদা করে রাখা।

সুমনা বলে দিয়েছে কোন দরকার হলে আমাকে ফোন করবে। আর আমি তোমাকে চা, খাবার দেওয়ার সময় দরজায় নক করে বলে দেব।

বৃষ্টির বেগটা এবার বাড়ছে। সঙ্গে ঝোড়ো বাতাস। জানলা দিয়ে বাইরে তাকালে যে কৃষ্ণচূড়া গাছটা দেখা যায় সেটার ডালপালাগুলো যেন হাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে উদ্দামভাবে নেচে চলেছে। নিম্নচাপের বৃষ্টি। তাই বোধহয় মেঘের গর্জন প্রায় নেই। শুধু ঝমঝম বৃষ্টির শব্দ।

জানলা দিয়ে বাইরের দিকে দেখতে দেখতে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল অনন্য।

এই বৃষ্টির দিনগুলোর সঙ্গে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে।

কিছু আবছা, মলিন হয়ে এসেছে। কিছু স্পষ্ট। এই যেন সেদিনের।

...

ক্লাস সিক্সে পড়ে তখন।

সেই বছর সকালের স্কুল থেকে দুপুরের সিনিয়র সেকশনে উঠেছে অনন্য।

সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখল আকাশ মেঘাছন্ন। একটু পরেই শুরু হল বৃষ্টি। প্রথমে গুঁড়িগুঁড়ি, তারপর মুষলধারে। বৃষ্টির বেগ এত বেশী যে একটু পরে আর দেখাই যায়না চারদিকে। ঘণ্টাখানেকর ওপর এরকম চলল। তারপরে বৃষ্টির বেগ একটু কমল। কিন্তু ততক্ষণে রাস্তায় জলটল জমে একাকার। বাসট্রাম হয়ত অনেক রাস্তাতেই বন্ধ।

অন্যদিন হলে হয়ত বাবা-মা ওকে স্কুলে পাঠাতো না।

কিন্তু আজ ক্লাস টেস্ট। তাও আবার অঙ্কের।

ওর মা স্কুলে ফোন করে খবর নিলেন। আরও কিছু বন্ধুর মায়ের সঙ্গেও কথা হল।

কেউ পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারল না।

অতএব বাবা বললেন “স্কুলে যেতে হবে।“

কথাটা একদমই পছন্দ নয় অনন্যর। মনে মনে প্রার্থনা করছে বৃষ্টি যেন আরও কিছুক্ষণ হয়। অঙ্ক একদমই ওর পছন্দের বিষয় নয়। পরীক্ষাটা ভেস্তে গেলেই ভাল হয়।

পরীক্ষাটা আজ নাহলে কাল তো হবেই। এটা ভাবার মত পরিপক্কতা তখনও হয়নি।

শুধু একবার বলার চেষ্টা করল “আজ তো অনেকেই আসতে পারবে না। টেস্ট মনে হয় হবে না।“

ওর বাবা উল্টে বললেন “আমি তোকে গাড়িতে করে পৌঁছে দিয়ে অফিস যাব।“ তারপর ওর মাকে বললেন “আজ সকালে তোমার বেরোনোর দরকার নেই। বিকেলের দিকটা দ্যাখো কিভাবে ম্যানেজ করতে পারো।“

ব্যাস আর কিছু উপায় নেই। স্কুলে যেতেই হল।

সেদিন ক্লাসে মাত্র আট কি ন’জন এসেছে।

সংখ্যাটা এখনো মনে আছে কারণ ওদের ক্লাশটিচার আর একজন শিক্ষককে বললেন আমার ক্লাসে তো দু-অংকেও পৌঁছয়নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আর বুঝতে বাকি ছিল না যে আজ পরীক্ষা হবে না। হওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই। মনে একটা বেশ খুশী-খুশী ভাব। আজ শুধু গল্প আর মজা করার দিন।

খানিক পরেই ক্লাসে এলেন অংকের স্যার। শুভেন্দু স্যার।

অংক বিষয়টা যে অনেককে বেশ ভোগায় আর উনি সেই বিষয়ের শিক্ষক সেটা নিয়ে শুভেন্দু স্যারের একটা প্রছন্ন অহংকার ছিল। সেটা তখন না বুঝলেও একটু বড় হয়ে বুঝতে পেরেছিল। আর স্বভাব ছিল একটু টিপ্পনী কাটার। সুযোগ পেলে কাউকে ছাড়তেন না, বিশেষত যারা একটু কাঁচা।

অনন্য অংকে কাঁচাই। পারলে আজই ছেড়ে দেয়।

স্যার আজও ছাড়লেন না “বেঁচে গেলি আজ। বেঁচে পালাবি কোথায়? পরের সপ্তাহেই পরীক্ষাটা নেব।“

কথাগুলোর মধ্যে ভুল কিছু নেই। মুখ নিচু করে শুনতে হয়েছিল।

ভুলেও গিয়েছিল কিছুক্ষণ পরেই। স্কুলে ছুটির আনন্দ আর একটা রেনিডের মজা সব দুঃখকে ভুলিয়ে দিয়েছিল খুব অল্প সময়ই।

………

আর একদিনের কথা।


প্রতি বছরের মত সেবারেও গরমের সময় গেছে মামারবাড়ীতে। আদিসপ্তগ্রাম।

স্কুলে গরমের ছুটি পড়লে সপ্তাহখানেকের জন্য মামারবাড়িতে যাওয়া হতই। প্রতি বছর এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করে থাকত অনন্ত। আসলে কলকাতার কংক্রিটের জঙ্গলের ভিতর পায়রার খুপরির মত ফ্ল্যাটে থেকে প্রাণটা হাঁপিয়ে উঠত ওর। তখন তো এত বোঝার বা বলার বোধ ছিল না। কিন্তু তফাতটা বুঝতে পারত একবার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছলে।

বেশ বড় দোতলা বাড়ি ছিল ওর দাদামশাইয়ের। তার থেকেও বড় ছিল চারপাশের বাগান, জমিজমা আর পুকুর। বাড়ীর পাশেই ছিল একটা দালান। যেটায় নাকি আগে দূর্গাপূজোও হত বলে শুনেছে।

দূর্গাপূজা ওখানে দেখা না হলেও, যা ছিল তা কম নয়।

আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, জামরুল, কালোজাম থেকে শুরু করে প্রচুর ফুলের গাছ, কলা গাছ – এইরকম বাগান অনন্য পরবর্তী জীবনে অনেক জায়গায় গেছে, কিন্তু কোথাও দেখেনি।

আর মজা ছিল পুকুরে মাছ ধরা দেখার।

ওরা গেলে দাদামশায় মাছ তোলাবার ব্যাবস্থা করতেন। জাল ফেলে মাছ ধরার দৃশ্য এখনো স্পষ্ট মনে আছে। মাঝারি সাইজের রুই, কাতলা তো আসতই, তার সঙ্গে কালবোস, চারাপোনা এসব। একবার একজন জেলে ওকে একটা জ্যান্ত মাছ হাতে দিয়েছে ধরতে। আর মাছটা একবার ঝাপটা দিতেই হাতের মুঠি খুলে দিয়েছে ও। মাছটা সোজা লাফিয়ে জলে পড়ে পালিয়ে গেল।

সেবার তখন মে মাসের মাঝামাঝি হবে।

মামার ছেলে আর মেয়েও সেবার ছিল ওর সঙ্গে। সময়টা এখনো মনে আছে কারণ তার কিছুদিন আগেই রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করা হয়েছে।

মামার ছেলের ডাকনাম ছিল পলু। পলুদা বলত।

সেদিন পলুদা ওকে জিগ্যেস করল “তুই ভূতে বিশ্বাস করিস?”

“হঠাৎ এইরকম জিগ্যেস করছ?”

“এইখানে একটা বাড়ি আছে। আমাদের গ্রামের লোক বলে ওটা ভুতের বাড়ি। যাবি দেখতে?”

“তুমি দেখেছো?”

“আমিও দেখিনি। যাবি তো বল। দুপুরের খাওয়া হয়ে গেলে বেরিয়ে যাব।“

“হ্যাঁ যাব। কত দূর?”

“বেশী দূর নয়। সন্ধ্যের মধ্যে বাড়ি এসে যাব।“

ব্যস কথামত কাজ।

লাঞ্চ সেরে “একটু স্টেশনের দিক থেকে ঘুরে আসছি” বলে পলু ওকে নিয়ে বেরোল। সাইকেল চালাচ্ছে পলুদা, পিছনে অনন্য। গ্রামের রাস্তাগুলো পলুদার মত ভালোভাবে না চিনলেও একদম অচেনা নয়। রেললাইনের দিকে যে রাস্তাটা এঁকেবেঁকে চলে গেছে সেটা দিয়ে খানিকটা যাওয়ার পর বাঁদিকে একটা মাটির রাস্তায় ঘুরল সাইকেলটা। ঠিক ঘোরবার মুখেই একটা বাঁশঝাড়। দুপাশ থেকে গাছগুলো এসে পড়েছে মাথার ওপর। জায়গাটায় স্বভাবতই দিনের আলো একটু কম। একবার ওপর দিকে তাকিয়ে দেখল অনি। পলুদা ওকে ওই নামেই ডাকত। না শুধু বাঁশ-ঝাড় বলে নয়। আকাশে বেশ মেঘ ঘনাচ্ছে।

ভূতের বাড়ি দেখার চাপা উত্তেজনা, তার সঙ্গে ভারী বৃষ্টির আভাস।

থাকতে না পেরে অনি জিগ্যেস করল “বৃষ্টি এসে গেলে কি করবে?”

“কি আর করব? একটু ভিজতে হবে।...এখন বাঁদিকে দ্যাখ ওই পুকুরটা” পলুদা ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইল -“ওটা হচ্ছে মুখার্জি-বাড়ীর পুকুর। পুকুরের ওপাশ দিয়ে ঘুরে আমাদের যেতে হবে। আর একটু এগোলেই বাড়িটা দেখতে পাবি।“

ঠিকই বলেছে পলুদা।

আরও খানিকটা যেতেই চোখে পড়ল একটা পাঁচিল আর লোহার বেশ বড় গেটের ভগ্নাবশেষ। তার সামনে এসে সাইকেলটা দাঁড় করিয়ে ওকে নামতে বলল পলুদা।

এই দিকটায় লোকজন সেরকম চোখে পড়ছে না। ফাঁকা ফাঁকা, বেশ গা ছমছমে পরিবেশ।

পলুদা দেখে সেরকম কিছুই মনে হচ্ছে না।

লোহার গেটটা সেকেলে, ভেঙ্গেচুরে গেলেও বেশ ভারী। সেটাকে দুজনে মিলে ঠেলে খানিকটা ফাঁক করল। সাইকেলটা ভিতরে ঢুকিয়ে পলুদা ওকে বলল “কিরে ভয় করছে?”

অনি মাথা নেড়ে না বলায়, পলুদা বলতে লাগল “এটা হচ্ছে মুখার্জিদের বাড়ি। এদের ফ্যামিলির নাম শুনেছিস বোধহয় দাদুর কাছে। একটা সময় প্রচুর পয়সাকড়ি, রমরমা অবস্থা ছিল। তারপর যা হয়। এই বাড়ি ঠিকভাবে রক্ষন করতে যা খরচ সেটা বোধয় এদের পক্ষে আর সম্ভব নয়। তারপর আস্তে আস্তে এই অবস্থা হয়েছে। কিন্তু এটাই সব নয়। এটা ভুতের বাড়ি কেন নাম হল সেটা তোকে বলি।”

“বেশ কয়েক বছর আগে এই বাড়ীর এক ছেলে, নামটা কি ছিল মনে করতে পারছি না, এখানে আসে কিছু কাজের জন্য। বাড়ি বা জমিজমা সংক্রান্ত কোন কাজেই হবে। রাতটা থেকে পরেরদিন ফিরে যাওয়ার কথা। কিন্ত আর ফিরতে পারেনি। তার ডেডবডি পাওয়া যায় পরেরদিন। ন্যাচারেলি পুলিশি তদন্তও হয়। কিন্তু কোন সমাধান হয়নি। এরপর দু-চারজন গ্রামের লোক, পুকুরে চান করতে এসে অনেক রকম জিনিস দেখে যা থেকে সবাইকার ধারণা হয় এটা ভূতের বাড়ী। আমি অবশ্য ওইসব কথা কোনদিনই বিশ্বাস করিনি। তবে গ্রামের ব্যাপার তো বুঝতেই পারছিস, জিনিসটা এমনভাবে রটে যায় যে সন্ধ্যের পর পুকুরে আর খুব একটা কেঊ আসে না।“

ঠিকই। অনির মনে হল আসার সময় পুকুরে সেরকম কাউকে চোখে পড়েনি।

এদিকে বড় বড় ফোঁটায় শুরু হল বৃষ্টি।

পলুদা তাড়া লাগাল।

“চল তাড়াতাড়ি বাড়ীর মধ্যে ঢোক। বড় ফোঁটার বৃষ্টি তো, মনে হয় বেশীক্ষণ হবেনা। তার মধ্যে দেখে নিয়ে ফিরতে হবে।“ বাড়িতে ঢুকেই একটা বড় দালান। পুরনো আমলের বড় বড় থামওয়ালা। বহুদিনের অযত্ন আর রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে সেগুলো এখন মলিন হয়ে এসেছে। আসল রং কি ছিল বোঝা মুশকিল। ওপরে কড়ি-বরগা গুলোর অবস্থাও বেশ খারাপ। পায়রা, বাদুড় আরও কত কি বাসা বেঁধেছে বলা শক্ত। দিনের আলো থাকলেও তা বেশ কমই। তাই সবকিছু পরিষ্কারভাবে দেখাও যায় না।

প্রথম দালানটা পেরিয়ে পরের দালান। তার মুখে একটা সময় হয়ত দরজা বসানো ছিল, এখন আর কিছু অবশিষ্ট নেই।

ভয় যে করছিল না তা নয়। ভূত বলে কিছু আছে কিনা অনি জানেনা, কিন্তু গল্পে পড়েছে এইরকম বাড়িতেই ভুতেরা থাকে।

একবার পিছন ফিরে দেখল। বৃষ্টির জোর আরও বেড়েছে। বাইরে বেরনো এখন সম্ভব নয়, এসে যখন পড়েছে দেখে নিয়ে বেরোবে। আর পলুদা তো সঙ্গেই আছে।

পলুদাকে দেখল নির্বিকার।

দালান পেরিয়ে কয়েকটা ঘর। তারই প্রথমটাতে ঠেলতেই খুলে গেল দরজাটা। এটা বোধহয় বিশ্রাম নেওয়ার বা অতিথিদের বসার ঘর ছিল। দেওয়ালে একটা ভাঙ্গা আয়না, একটা বহু পুরনো ডিজাইনের বেতের চেয়ার আর একটা ছবি টাঙ্গানো রয়েছে। ছবিটার ওপর ধুলোর মোটা আস্তরণ পড়েছে, তাও একবার দেখার চেষ্টা করল অনি। একজন পুরুষ আর মহিলার ছবি, খুব সম্ভবত স্বামী-স্ত্রীই হবে। দুজনের দাঁড়ানোর ভঙ্গি দেখে তাই মনে হয়।

পিছন থেকে শুনতে পেল পলুদার গলা।

“এদের একটা সময় শুনেছি অনেক প্রতিপত্তি ছিল। এখন তো দেখছি সব খালি। হতে পারে বেশীরভাগ জিনিস এখান থেকে নিয়ে কোলকাতা চলে গেছে। কিছু হয়ত চুরিও হয়ে গেছে, বাড়ি তো এভাবে খোলাই পড়ে থাকে।“ পলুদা হয়ত আরও কিছু বলত। কিন্তু কথায় ছেদ পড়ল।

কাছাকাছি কোথাও প্রচণ্ড আওয়াজের একটা বাজ পড়ল।

বাড়িটা কেঁপে উঠেছিল। মনে হল এবার ভেঙেই পড়বে। নিজের অজান্তে পলুদার হাতটা শক্ত করে ধরেছিল অনি।

বাড়ি ভেঙে না পড়লেও সেটার অবস্থা দেখে আর বেশীক্ষণ থাকার সাহস হয়নি ওদের কারুরই। বিশেষত শোওয়ার ঘরে ঢোকার পর। ঘরের অবস্থা তো সঙ্গিন বটেই, একটা দেওয়ালে ফাটল ধরেছে। সেটা দিয়ে স্রোতের মত জল ঢুকছে।

পলুদা বলল “চল ভাই, আর এখানে থাকা ঠিক নয়।“

বৃষ্টির জোর ইতিমধ্যে আরও বেড়েছে। সঙ্গে আকাশে বিদ্যুতের ঝলকানি আর মেঘের গর্জন। তার মধ্যেই খানিকটা দৌড়ে ওই বড় গাছতলাটায় পৌঁছল যেখানে সাইকেলটা রেখে এসেছিল।

এবার ওদের অবাক হওয়ার পালা।

গাছতলা ফাঁকা। সাইকেল নেই।

প্রথমে ভেবেছিল ঝড়ে হয়ত এদিক ওদিক পড়ে যেতে পারে। কিন্তু না, কোথাও নেই। এই ঘটনার সঙ্গে ভুতুড়ে বাড়ীর কোন সম্পর্ক নেই তো? দিনের আলো বেশ কমে এসেছে। তাছাড়া সাইকেল ছাড়া এই বৃষ্টির মধ্যে এখান থেকে ফিরবে কিভাবে? অনির এবার প্রকৃতই একটু ভয় ভয় করছে।

পলুদা কিন্তু বলল “নিশ্চয় কেউ চুরি করে পালিয়েছে। আমারও ভুল হয়েছে, একটু ভিতর দিকে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করানো উচিত ছিল।“

সে যাই হোক, সেদিন ওই বৃষ্টির মধ্যে প্রায় হেঁটেই বাড়ি ফিরেছিল ওরা। কাকভেজা হয়ে।

সেদিনের কথা ভোলেনি ওরা কেউই। অনেকদিন পরেও যখন দেখা হয়েছে ওই দিনটার কথা এসে পড়েছে। একথা সেকথায়।

পলুদা এখন সপরিবারে অস্ট্রেলিয়ায় থাকে। বেশ কয়েক বছর দেখাসাক্ষাত আর হয় নি।

এরকম ভাবে হারিয়ে গেছে অনেকেই। হারায়নি শুধু স্মৃতিগুলো। খোলা জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ভাবতে থাকে থাকে অনন্য।

বৃষ্টি থামার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।




ঘরের দরজায় দুবার আওয়াজ করে অল্প করে ফাঁক করল সুমনা।

“কাল রাতে ঘুম হয়েছে?” জিজ্ঞাসা করল।

অনন্য মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলাতে বলল “জ্বর এখন আছে নাকি?”

“মনে তো হচ্ছে নেই।“

“মুখটা ধুয়ে নাও, চা বসিয়েছি।“ দরজাটা টেনে দিয়ে চলে গেল সুমনা।

এই যে সুমনা, সেকি হারিয়ে যায়নি? ইউনিভার্সিটিতে যেদিন প্রথম পরিচয় হল, এমনকি বিয়ের বেশ কয়েক বছর পরেও যে সুমনাকে ও চিনতো আজ কি তার সঙ্গে কোন মিল আছে? দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততার মধ্যে এগুলো নিয়ে কারুরই চিন্তা করার সময় নেই। অনন্যও সচরাচর করে না, কিন্তু আজ কোন কারণে মনে পড়ছে।


তবে আজকের সঙ্গে একটা মিল অবশ্যই আছে।

যেদিন সুমনার সঙ্গে পরিচয় হয় কোলকাতা ইউনিভার্সিটির ঐতিহাসিক দ্বারভাঙ্গা বিল্ডিং-এ, সেটাও ছিল একটা ভরা বর্ষার দিন। মাঝরাত থেকে অঝোরে বৃষ্টি হয়ে থেমেছে প্রায় বিকেলের দিকে। কলেজস্ট্রিটে এক হাঁটু জল। ট্রাম বন্ধ, বাস তখনো কিছু কিছু চলছে। বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে সন্ধ্যের মুখে অনন্য সিঁড়ি দিয়ে দোতলা থেকে নামছে বেরোবে বলে। হঠাৎই প্রফেসর অম্লান ঘোষের সঙ্গে দেখা। হঠাৎই বলতে হয়, কারণ ওনার ঘর বা ক্লাস কোনটাই এই তলায় নয়।

দু-একটা কথার পর জিগ্যেস করলেন “বাড়ি যাবে কি করে?”

“এই বেরোচ্ছি স্যার, বাস পেয়ে যাব নিশ্চয়।" “এই বৃষ্টির মধ্যে বাসের জন্য কতক্ষণ দাঁড়াবে? তুমি নর্থের দিকে থাকো না?”

“হ্যাঁ, বিডন স্ট্রীটের কাছে।“

“আমিও ওইদিকে যাব, তোমাকে ড্রপ করে দেব। চলে এস।“

অম্লান ঘোষের যে একটা পুরনো অ্যাম্বাসাডার গাড়ি আছে সেটা অনন্য জানত। সেটা করেই বোধহয় ফিরবেন। এই জলের মধ্যে গাড়ি যাবে তো? আটকে গেলে মাঝরাস্তায় ঝামেলায় পড়তে হবে। তবু মুখের ওপর ‘না’ বলাটা ভালো দেখায় না।

অম্লানবাবুর বিখ্যাত কালো রঙের গাড়ি। ইউনিভার্সিটিতে এই গাড়ি চেনে না এরকম কর্মচারী খুব কম আছে। পোঁছতে ড্রাইভার গাড়ির দরজা খুলে দিলো।

পিছনের সীটে একটি অল্পবয়সী মেয়ে বসে আছে। অম্লানবাবুকে গাড়ির কাছে আসতে দেখে সেও নেমে দাঁড়ালো।

গাড়ি স্টার্ট নিয়ে একটু এগোতে অম্লানবাবু অনন্যকে জিগ্যেস করলেন “এই মেয়েটিকে চেন?”

অনন্য মাথা নেড়ে না বলাতে উনি বললেন “ও হচ্ছে আমার এক বন্ধুর মেয়ে। এখানে ভর্তি হচ্ছে জিওগ্রাফি নিয়ে। মাস্টার্স করবে।“

নাম জিগ্যেস করাতে নিজেই বলল “সুমনা।“

বেশ সপ্রতিভ। কথা বলতে পছন্দ করে।

অনন্যর এখনো মনে আছে সেইদিন কি কি কথা হয়েছিল।

এরপর থেকে ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে প্রায় রোজই দেখা। সম্পর্ক গাঢ় হয়। অনন্য ছিল এক বছরের সিনিয়র। পাশ করার পর রোজ সুযোগ না হলেও সপ্তাহে অন্তত দু-তিন দিন দেখা হতই। যে উচ্ছ্বাস, প্রাণবন্ত ভাব সুমনার মধ্যে সেদিন দেখেছিল অনন্য, সেটা যেন এখন কোথায় উবে গেছে। হয়ত জীবনের যান্ত্রিকতা ওকে গ্রাস করেছে। হতে পারে তার জন্য অনন্যই অনেকটা দায়ী।

সুমনার বরাবরই ইচ্ছে ছিল একটু ভালভাবে বাঁচার, জীবনকে একটু উপভোগ করার।

আর অনন্য অনেকটাই উল্টো। সুমনার ভাষায় “তোমার অ্যামবিশন কিছু নেই। খুবই আশ্চর্য লাগে তোমাকে দেখে।“

জানে সুমনার কথাগুলোয় খুব ভুল কিছু নেই।

বাবা সাধ করে নাম রেখেছিলেন অনন্য। কিছু আশা, আকাঙ্ক্ষা তো ছিলই। তার কিছুই ও পূরণ করতে পারেনি।

কলকাতায় একটা সাধারণ চাকরির সামান্য মাইনেতে জীবনের এতগুলো বছর কাটিয়ে দিয়েছে অনন্য। সঙ্গে সুমনার স্কুলের চাকরিটা ছিল। মধ্যবিত্ত জীবনের যেটুকু চাহিদা সেটা ভালভাবেই মিটেছে দুজনের ওই উপার্জনে। তাই নতুন করে অ্যামবিশনের কোন কারণ খুঁজে পায় না অনন্য। আর সেটা ওর কোনদিন ছিলও না।


কথায় কথায় একদিন সুমনা বলেই ফেলল “চাকরিটা আছে তাই বেঁচে আছি। দুচারটে লোকের মুখ দেখতে পাই। নাহলে এই বাড়ীর চার-দেওয়ালের মধ্যে থেকে পাগল হয়ে যেতাম।“

অনন্য মুখে কিছু বলেনি। একটু হেসে ব্যাপারটাকে হাল্কা করতে চেয়েছিল।

তারপর সুমনার একদম কাছে এসে বলল “আগে তো আমরা খুব অল্পেই সন্তুষ্ট ছিলাম। তাহলে আজ এগুলো কেন মনে হচ্ছে?”

সুমনা বলল “লাইফে না অনেকগুলো স্টেজ থাকে। তখনকার দিনগুলো তখনকার মত কেটেছে। আজকের দিনগুলো লাইফের অন্য একটা সময়। তাই তখনকার সঙ্গে আজকের তুলনা কর না।“

কথাগুলো প্রাসঙ্গিক, কোন সন্দেহ নেই।

তাও কোথায় যেন অনন্যের মনে হয় সুমনা হারিয়ে গেছে।

যা হারাবার তা হারাবেই। অহেতুক ভেবে লাভ নেই। স্মৃতিটুকু শুধু থাক। ভাবতে ভাবতে বিছানা ছেড়ে উঠে পরে অনন্য।

উঠে দাঁড়াতে মাথাটা যেন একটু ঘুরে উঠল।

খাটের কোণটা ধরে সামলে নেয় অনন্য।



…………

এর পরের ঘটনা সংক্ষিপ্ত।

সময়মত ব্রেকফাস্ট করে নিল ওরা।

ডক্টর সরকার খাবারের ব্যাপারে বিশেষ কোন বিধিনিষেধ আরোপ করেননি। শুধু বলেছেন হাল্কা খাবার খেতে। ভাজা, তেল এগুলো কম।

সেইমতই সুমনা ব্যবস্থা করেছিল।

একবার মনে করিয়ে দিলো ওষুধগুলো যেন ঠিকমত খেয়ে নেয়।

খেয়াল হল ফোনটা বাজছে। ”হ্যালো” বলতে ওপাশ থেকে অমিতের পরিচিত গলা। “আপনার রিপোর্টটা এসে গেছে, আপনার ছেলেকে দিয়ে দিচ্ছি।“

“ওকে। রিপোর্ট কি ঠিক আছে?”

“না, ঠিক নেই। পসিটিভ এসেছে।“

আর কিছু জিগ্যেস করার আগেই অমিত লাইন কেটে দিয়েছে। একটা কথা বেশী বলারও সময় কারুর নেই। কথাটা শুনে একটু টেনশনে পড়ে গেল অনন্য। চিন্তার কথা।

মিনিট দশেক পরে সুমনা দরজাটা একটু ফাঁক করে একই খবর দিলো। হাতে রিপোর্টটা ধরা।

“আমি ডক্টর সরকারের সঙ্গে কথা বলছি। দেখি কি বলেন।“ ডাক্তার আবার কি বলবেন কে জানে? হাসপাতালে ভর্তি হতে বললেই হল। এখন তো আর কেউ রিস্ক নিতে চাইছে না। সত্যিই খুব চিন্তা হচ্ছে। এই বয়সে এত চাপ আর নিতে পারে না। তাও যতটা স্বাভাবিক ভাবে পারা যায় বসে রইল অনন্য।

খানিক পরেই আবার সুমনার গলা। দরজাটা অল্প করে ফাঁক হল।

“কথা বললাম। উনি আরও কিছু ওষুধ দেবেন। খানিকক্ষণের মধ্যে সেগুলোর নাম লিখে আমাকে পাঠাচ্ছেন। আর বললেন অক্সিজেনটা প্রতি ঘণ্টায় একবার করে চেক করতে।“

সুমনার কথায় একটু হাঁপ ছেড়ে বাঁচে অনন্য। বাড়িতে থেকেই তাহলে চিকিৎসা হবে। এটা একটা বিরাট স্বস্তি। হাসপাতালগুলোর যা অবস্থা, নিজের চোখে না দেখলেও খবরের কাগজে পড়ছে। সুস্থ লোক অসুস্থ হয়ে পড়বে।

কথামত ডক্টর সরকার ওষুধগুলোর নাম, কখন খেতে হবে ইত্যাদি পাঠিয়ে দিয়েছেন। আর এও বলেছেন সন্ধ্যের পরে ফোন করে জানাতে পেশেন্ট কেমন আছে! দুপুরের খাওয়ার পর থেকেই নতুন ওষুধ শুরু হয়ে গেছে। এমনিতে শরীরে কোন অসুবিধে নেই, যদিও জ্বরটা এখনো ছাড়েনি। মাঝে মাঝেই আসছে।

বিছানায় বসে নিজের মোবাইলে মেসেজগুলো দেখছিল অনন্য। অনেকেই “তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে ওঠ” ধরণের মেসেজ পাঠিয়েছে। অনেকে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথাও লিখেছে। সেগুলো একে একে উত্তর দিতে হচ্ছে।

অক্সিমিটার-টা পাশের ড্রয়ার থেকে বের করে আঙুলে লাগাল একবার।

সব ঠিকই আছে, তাও ডাক্তার যখন বলেছেন একবার দেখে নেওয়া ভালো।

একি!

একটু কম দেখাচ্ছে কেন?

আরও দুবার অন্য হাতের আঙুলে পরীক্ষা করল। না একই দেখাচ্ছে, চুরানব্বই থেকে খানিকটা নিচে। কি করে হচ্ছে? এবার উত্তেজনা বাড়তে শুরু করেছে অনন্যর। এখনই কি বলবে সুমনাকে? তাহলে ওরাও টেনশনে পরে যাবে। না আর কয়েকবার নিজে দেখবে, তারপর জানানোই ভালো।

বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যের মুখে বলতেই হল সুমনাকে।

অক্সিজেনের মাত্রা তখন আরও কম দেখাচ্ছে। তার সঙ্গে শুরু হয়েছে কাশি আর অল্প শ্বাসকষ্ট। খুব তাড়াতাড়ি শরীরটা খারাপ হচ্ছে মনে হচ্ছে। হতে পারে এটা হয়ত খানিকটা মানসিক চাপ থেকেও।

ডক্টর সরকার কোন রিস্ক নিলেন না।

“আজই দিশায় ভর্তি করে দিন, আমি বলে দিচ্ছি। বেড পেতে অসুবিধা হবে না। রিপোর্টের কপিটা সঙ্গে নিয়ে যাবেন।“

“আজ যদি না হয়, কাল অবধি ওয়েট করা যাবে?“ সুমনা একবার জানতে চাইল।

“না আজই করে দিন। অনেক সময় পেশেন্টের অবস্থা তাড়াতাড়ি খারাপ হয়ে যাচ্ছে, তাই আমি রিস্ক নেব না।“

অনন্যর মনে পড়ল, আজও একটা ‘রেনি ডে’। কিন্তু আগেরগুলোর থেকে আলাদা। যেরকম মধুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে ওগুলোর সঙ্গে আজকেরটা সম্পূর্ণই বিপরীত। কিন্তু সবদিন একরকম যায় না।

গ ল্প বরাবরই ও আশাবাদী। আর এখন শরীরের অবস্থাও সেরকম কিছু খারাপ হয়নি। কিন্তু তাও কেন মনে হচ্ছে আর ফিরতে পারব কি? হয়ত খানিকটা মানসিক চাপ থেকে। আর কিছু ভাবতে পারছে না। যা হওয়ার তা হবে।


সাইরেন বাজিয়ে দ্রুত গতিতে দৌড়তে থাকা অ্যাম্বুলেন্সের জানলা দিয়ে বাইরে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে অনন্য।

নীড়বাসনা  আশ্বিন ১৪২৮