• দীপাঞ্জন মাইতি

প্রবন্ধ - লাভ ইন দ্য টাইম অফ করোনা




কানপুরে অনাথ মেয়েটি অতিমারির সময়ে দাদা বৌদির দরিদ্র পরিবারে অতিরিক্ত বোঝা হয়ে উঠলো। যখন সারা পৃথিবী গৃহবন্দী – ঘর ছাড়া হল নীলম। ঠাঁই হলো সর্বহারা অভবী একদল মানুষের পাশে। করোনার সময় বহু মানুষকে আমরা আর্তের সেবায় এগিয়ে আসতে দেখেছি। তেমনি একজন কানপুরের লালতাপ্রসাদ নীলম সহ আরো বাকিদের রোজের খাবারের বন্দোবস্ত করেন এবং এই কাজের দায়িত্ব পড়ে তাঁর গাড়ির চালক অনিলের ওপর। এভাবেই পরিচয় আনিল এবং নীলমের। তারপর রোজের দেখা-সাক্ষাত... টানা প্রায় ৪৫ দিন। সেই থেকে প্রেম... পরিণয়। লকডাউনেই পরিবারের মতে দু’জনের দাম্পত্যজীবনের জয়যাত্রা শুরু হল... ঘর ফিরে পেল নীলম। করোনা অতিমারির প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে যখন সামাজিক দূরত্বই আমাদের সুস্থ থাকার উপায়... আমরা হয়ত সত্যিই উপলব্ধি করতে পেরেছি একে অপরের থেকে আসলে ঠিক কতটা দূরে সরে গেছি। এরকম সময় ঔচিত্যের বিতর্ক একপাশে সরিয়ে রেখে নীলম – অনিলের প্রেমের গল্পখানা রূপকথার মতই সুন্দর।


করোনা পর্বের অনস্বীকার্য চরম দুঃখজনক পরিণতির দিক থেকে খানিকটা নজর সরালে এই অতিমারির না হলেও এই অতিমারির সময়ের কিছু পজিটিভ প্রভাব চিহ্নিত করা সম্ভব। যেমন প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা দেখেছি পরিবেশ দূষণের মাত্রা অনেকখানাই কমেছিল। মনে হচ্ছিল করোনা একখানা রিসেট বাটনের মত কাজ করছে। হয়ত এই রিসেট বটনটা যতটা প্রকৃতির প্রয়োজন ছিল ঠিক ততটাই প্রয়োজন ছিল আমাদের প্রিয় সম্পর্কগুলোর। বহুদিন চোখের বড় কাছে থাকা সম্পর্কের সূক্ষ্মতাগুলো দৃষ্টির অগোচরে চলে গেছিল। ‘সাথে’, ‘পাশে’, ‘কাছে’ শব্দগুলো অতিব্যবহারে নিজস্বতা, স্বকীয়তা এবং গুরুত্ব হারাতে বসেছিল। যারা পরিবারের সাথে ছিলেন তারা অভূতপূর্ব এক সময়দৈর্ঘ্য পরিবারের সাথে কাটালেন, হয়ত ভাগ করে নিলেন আনন্দ, দুঃখ, উদ্বেগ, উত্তেজনা একে অপরের সাথে। যারা দূরে একলা ছিলেন তারা হয়ত জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষগুলোকে চিনে নিতে পারলেন। হয়ত সেরে উঠলো কিছু সম্পর্ক বা স্পষ্ট হলো কিছু দূরত্ব। আবহাওয়া ভারী হয়ে ওঠার আগে আমার বরং চট করে একটু সদ্য প্রেমে পড়া প্রেমিক প্রেমিকাদের কথা শুনে নিই – জেনে নিই কেমন চলছে ডেটিং।


একটা যুগ পিছিয়ে গেলে স্কুল কলেজের কোচিং বেলার প্রেমে করোনার ঘা এক ভীষণ ধাক্কা হত। সে সময় মোবাইল চালু হলেও ইনকামিংএও পয়সা কাটতো। মিস কলের সেযুগে কি যে হতো... যাক তবে এ যাত্রা অনলাইনে প্রেমগুলো টিকে গেলো আশা করি। ছোঁয়া না গেলেও দেখা তো গেলো... হাত ধরে না হলেও এক সাথে হাঁটা তো গেলো...। নিজের নিজের ঘরে বসে একসাথে ডিনার থেকে সকালে একসাথে মর্নিং ওয়াক, একসাথে ওয়ার্ক আউট অনেকটাই সামলানো গেছে। তবু ঐ যে ‘দিল মাঙ্গে মোর’। আপাতদৃষ্টিতা আমারো মনে হতো যারা দীর্ঘ সময় ধরে ডিস্টেন্স রিলেশনশিপে আছে তাদের কাছে এই পরিস্থিতি নতুন হলেও সম্পর্কের এই সেতুটা পরিচিত। কিন্তু কথা বলে বুঝতে পারলাম আমরা ঠিক কতটা সম্ভাবনা আর আশার দোলাচলে বেঁচে থাকি। দেখা হয় বা হয় না এর থেকে চাইলেই দেখা হতে পারে কি পারে না বোধটাই বেশী গুরুত্বপূর্ণ – আর সেই বিশ্বাসটাই বোধহয় বেঁধে রাখে আমাদের। সত্যি বলতে আজকের পৃথিবীতে কতটুকুই বা সমব একসাধে প্রিব মানুষটার সাথে কাটানো হয়! তবু ইচ্ছে করলে একটু সময় তো খুঁজে নেওয়া যায়। কিন্তু এই করোনার সময় অনেক যুগলকেই বাধ্য হয়ে দূরে থাকতে হয়েছে একে অপরের থেকে। কতটা দূরে সেটা মনের কথা মনই জানে।

অনলাইনই যেহেতু উপায় অ্যাপ নির্ভর প্রজন্মের কাছে তার তো কোনো তাড়না থাকার কথা নয়! কিন্তু সমস্যা আছে একরাশ। কি সমস্যা! বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন সমস্যা। ডিজিটাল ক্লাসের নামে হাতে ফোন নিলেই বাবা - মা একেবারে পৃথিবী মাথায় তুলে নিচ্ছেন না ঠিকই তবে নজরদারি করার লোক আর সময় দু’টোই খানিক বেড়েছে বলে একটা সংগ্রাম কিন্তু রয়েই গেছে বলে জানাচ্ছে স্কুলের উঁচু শ্রেণীর প্রেমিক প্রেমিকা থুড়ি ছাত্র-ছাত্রীরা। কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের ক্ষেত্রে বিষয়টা অনেকখানা বিষয়ভিত্তিক। মানে বোঝা গেল না! বলছি। এই যেমন ধরুন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং মেডিকেলের প্রথম বর্ষের ছাত্রদের বক্তব্য অন্ধের কি বা দিন কি বা রাত্রি – মানে এমনিতেই ক্লাসে লিঙ্গ অনুপাত ব্যাচানুক্রমে বেশ খারাপই থাকে ফলে সিনিয়র সুপার সিনিয়রদেরই ক্ষতিটা বেশী হয়েছে। সিনিয়র এবং সুপার সিনিয়রদের বক্তব্যও এ বিষয়ে মোটমুটি একই রকম। ডিগ্রী কলেজের ক্ষেত্রে মূলত কলেজের প্রথম বছরটা ফসকে যাওয়াটাই সবচেয়ে আফশোষের – কারণ নবীন বরণের প্রথম দৃষ্টিবন্ধ... পূর্বরাগের এর চেয়ে তুখোড় সূচনা বোধহয় হয় না। তবে যা খোয়া গেলো ... গেলো... কি আর করা যাবে!


এমনিতে কথাই আছে যেথা চাষ সেথা বাস না করাই ভালো; কিন্তু প্রেম টেম মনের ব্যাপার সবসময় কি নিয়ম মেনে চলে! তা অতিমারিতে ওয়ার্ক ফ্রম হোম এ এমনিতেও বাসস্থানেই চাষ করা ছাড়া উপায়ই বা কি? না বসের কাজ দেওয়ার সময়ের সীমা আছে না সীমিত সময়ে হলেও প্রিয়জনের সাথে দেখা করার উপায় আছে। তার ওপর একা থাকলে ঘরে বাইরের সমস্ত কাজ সামলে অবশিষ্টটা মন্দ ভালোয় রাত দিনে স্ক্রীনে স্ক্রীনে বড় জোর কেটে যায় আর কি। অভিসার পর্যায়ে থেকে একধাপ পিছিয়ে এসে এ যেন এক দীর্ঘায়িত অনুরাগ পর্ব। আর প্রেমের কথা হলে পরকীয়ার কথা হবে না তা কি হয়! পাশের বাড়ির দাদাকে যেমন ঠিক নিয়ম মেনে গোধূলিবেলায় ফোন নিয়ে পায়চারি করতে করতে ছাদের প্রায় শ’চক্কর কাটতে দেখা গেছে, তেমনি বৌদির মনে ভিড় করেছে প্রেম বৈচিত্ত্য ও আক্ষেপানুরাগ। একদিকে হারানোর আশঙ্কা অন্যদিকে আর কখনো না পাওয়ার...


প্রেমে বার্তার ভূমিকা বড় গুরুত্বপূর্ণ। শেক্সপিয়ারের রোমিও জুলিয়েট নাটকে ফ্রায়ার লরেন্সের পাঠানো বার্তাবাহক মড়কে আক্রান্ত হয়ে নির্জনবাসে চলে গেলেন। ফলে যে জুলিয়েটের বেঁচে থাকার কধা লেকা চিঠিখানা রোমিওর কাছে পৌঁছলই না, রয়ে গেল বার্তাবাহকেরই কাছে। তারপর কি হয় সে কথা তো সবারই জানা। ভাগ্যিস আমাদের এরকম সময়ের সম্মুখীন হতে হয় নি। ফোন ম্যাসেজ হোয়াটস্অ্যাপে মনের ইচ্ছে মত যোগাযোগ করা যায়, কথা বলা যায়, ভিডিও কলে দেখাও হয়ে যায় কিন্তু বার্তা! না বলা না লেখা... লিখে মুছে ফেলা কথার ভিড় বাড়তে থাকে। আর কথার ভিড় বাড়লে বার্তা হারিয়ে যায়। বিভিন্ন ডেটিং অ্যাপের সমীক্ষায় দেখা গেছে আনাগোনা বেড়ে গেছে বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন পেশার পুরুষ এবং নারীদের। অনলাইনেও ব্লাইন্ড ডেটের বন্দোবস্ত করেছে বেশ কিছু অ্যাপ। পছন্দ অপছন্দের অঙ্ক মিলিয়ে বন্ধু বেছে নিচ্ছেন অনেকেই। একদিকে ডেটিং অ্যাপের পাশাপাশি ব্যবহার বেড়েছে টেলি কলিং এর মাধ্যমে বন্ধুত্বের সাইট এবং অ্যাপের। এই সব থেকে একটা কথা বেশ স্পষ্ট বোঝা যায়... মানুষ কতটা একা হয়ে পড়েছে। তবে এ সমস্যা অতিমারির প্রকোপে স্যোশাল ডিস্টেনসিং মানতে গিয়ে যে হয় নি সে কথা বেশ নিশ্চিতভাবে বলা যায়। বরং এই বাধ্য হয়ে বন্দী থাকার সময়ে মানুষের ধৈর্য্য কি বেড়েছে খানিক ? অ্যাপ সমীক্ষায় সঙ্গী বদলের হ্রাসপ্রাপ্ত প্রবণতা থেকে তো তাই মনে হয়।

অতিমারির সময় প্রেমের কথা বলতে গেলে কলম্বিয়ান নোবেল জয়ী লেখক গ্যাব্রিয়াল গার্সিয়া মার্কেজ রচিত ‘লাভ ইন দ্য টাইম অফ কলেরা’ র উল্লেখ হবে না তা কি করে হয়! যদিও প্রেমের দিগন্তে অতিমারির ব্যাপ্তিতে সীমিত নয় তবু ভালোবাসা নিয়ে কথা বলতে গেলে এই উপন্যাসের কথা না বললেই নয়। কলম্বিয়ার মেডেলিন শহরে অতিমারির প্রকোপে লাইব্রেরীগুলো বন্ধ হয়ে গেলে বিবিয়ানা আলভারেজ সেই মার্কেজ রচিত ‘লাভ ইন দ্য টাইম অফ কলেরা’ র থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘লাভ ইন দ্য টাইম অফ করোনা ভাইরাস’ নামে একটি উদ্যোগ নেন। মিস অ্যলভারেজ এবং তাঁর সহ উদ্যোক্তারা শহরবাসীদের চিঠি পাঠাতে বলেন... আশার কথা ভালোবাসার কথা ভরা চিঠি। সেই চিঠি উদ্যোক্তারা সাজিয়ে গুছিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন অতিমারির সময় নির্জনবাসে থাকা শহরবাসীদের কাছে। প্রেরক প্রাপক এক অপরকে না চিনলেও একে অপরকে ভরসা দিয়েছেন এক সুস্থ আগামীর, আশার কথায় বেঁধেছেন আলোকিত এক ভোরের উন্মেষ প্রতিশ্রূতি।


একদম শেষ পর্বে এসে গেছি আমার লেখার। শুরু করেছিলাম অতিমারির সময়ে জন্ম নেওয়া এক প্রেমের গল্প নিয়ে যা যাপনের পথে পাড়ি দিয়েছে। আরো অনেক এরকম ঘটনার কথা আমরা সবাই শুনেছি। কখনো ভালোবাসার জন্ম নির্জনবাসকেন্দ্রে হয়েছে দুই আক্রান্তের মধ্যে এবং পরিণতি পেয়েছে সুস্থ হয়ে ওঠার পর। তবে আমি শেষ করবো এমন এক গল্প দিয়ে যার শেষে আরো একবার প্রেমের অমরত্বের দাবী প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০ শে এপ্রিল রাতে ব্র্যাডফোর্ড রয়্যাল ইনফর্মারির কোভিড-১৯ ওয়ার্ডের দায়িত্বে ছিলেন ব্রিটিশ না্র্স সোফি ব্রায়ান্ট-মাইলস। ওয়ার্ডে ভর্তি করোনা আক্রান্ত রুগীদের মধ্যে এক যুবকের অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে সন্দেহ হচ্ছিল রাতটুকুও তার কাটবে না। কিছু পরে সেই যুবকের প্রেমিকার সাথে কথা হয় সোফির। সোফি জানতে পারেন বিভিন্ন কারণে যুগলের বিয়ে করার পরিকল্পনা সফল হয় নি এবং যুবতীটি জানিয়েছিল এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় আফশোষ। সেই রাতেই সোফির চেষ্টায় আইনত না হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে হসপিটাল সংলগ্ন গির্জার যাজক জো ফিল্ডারের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয় সেই যুগলের বিয়ে। আশঙ্কা মত সেই রাতেই মৃত্যু হয় ঐ যুবকের।




নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮