• মুকুল বন্দ্যোপাধ্যায়

সময়ের অমেয় আঁধারে - মনোজ মিত্র



কথোপকথনে মনোজ মিত্র এবং মুকুল বন্দ্যোপাধ্যায়


( মনোজ মিত্র ভারতীয় অভিনয় জগতে এক লেজেন্ড এর নাম। নাটক, সিনেমা সবেতেই তাঁর স্বচ্ছন্দ গতিবিধি। তিনি নাটককার, নাট্যকর্মী, নির্দেশক, এবং নাট্য বিশেষজ্ঞ। তাঁর সঙ্গে একান্ত এবং এক্সক্লুসিভ আলাপচারিতায় অধ্যাপক শ্রীমতী মুকুল বন্দ্যোপাধ্যায়। শ্রীমতী বন্দ্যোপাধ্যায় প্রাক্তন বাংলাসাহিত্যের বিভাগীয় প্রধান, নিজে নাট্যকর্মী, নির্দেশক, নাট্যবিশেষজ্ঞ, সাহিত্যিক এবং সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমির প্রাক্তন জুরি সদস্য)


একটা ছোট্ট ভাইরাস বদলে দিলো সারা পৃথিবীটাকে, বদলে দিলো জীবন, বদলে দিলো মানুষীত কলতান। ক্রমশ গ্রাস করলো আত্মিক নৈরাজ্য,- মানবতাহীন, সাহচর্যহীন সামীপ্যহীন এক অজগর। কিন্তু মানুষের একান্ত প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া এর প্রভাব হল সুদূরপ্রসারী। কিছু শিল্প একেবারে মুখ থুবড়ে পড়লো- অন্যরা কম-বেশী। গোটা পৃথিবীতেই থিয়েটার বা মঞ্চশিল্প সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কেমন আছেন সেই সব শিল্পীরা? থিয়েটার যাদের রক্তে, তাঁরা এই ন’মাসের কর্মহীনতা কিভাবে সহ্য করছেন? এই নিয়ে কথা হচ্ছিলো মনোজ মিত্রের সঙ্গে- তাঁর সঙ্গে এই কথোপকথনের উপর ভিত্তি করে এই লেখা।


জানলাম তিনি আত্মজীবনী লিখছেন। ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে। বাংলা নাটকের জীবন্ত কিংবদন্তী মনোজ মিত্র আমার প্রিয় মাস্টারমশাই। তাঁর সঙ্গে প্রায়শই দীর্ঘ আলাপচারিতা হয় দূরভাষে। আধুনিক বাংলা নাটকের গতি প্রকৃতি নিয়ে অত্যন্ত মনোগ্রাহী আলোচনা হয় মাঝে মাঝেই। সেরকমই ধরা হল মনোজদাকে - বিষয়ঃ প্রেক্ষাগৃহ দর্শকহীন। তাঁর নতুন নাটক ‘দৈবকন্ঠ’ নিয়ে। হঠাৎ একদিন ‘জনতা কারফিউ’ নামের একটা দিন এলো। ছেদ পড়লো যুদ্ধস্তরীয় রিহার্সালে। ঠিক কয়েকদিন পরে ঘোষণা হল একুশ দিনের লকডাউনের। মনোজ মিত্র এবং তাঁর দল সুন্দরম চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে ডুবে গেলো। ‘দৈবকন্ঠ’ আরম্ভ হবে ২৮শে মার্চ, মধুসূদন মঞ্চে। নতুন নাটক। গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিসকে নিয়ে লেখা। বিপুল সে আয়োজন - সেট, পোশাকআশাক, অস্ত্রশস্ত্র। দমদমে সাতদিন রবীন্দ্রভবন ভাড়া নিয়ে রিহার্সাল হয়েছে। এবার স্টেজ রিহার্সাল ২৬ আর ২৭ তারিখে মধুসূদন মঞ্চে। কাউন্টারে টিকিট বিক্রি চলছে - দর্শক উদগ্রীব। এমন সময় নিভৃতবাস। মনোজদা এবং সুন্দরমের বিচলিত হওয়া স্বাভাবিক। তবুও সকলের বিশ্বাস, সকলেরই বিশ্বাস, যে মাত্র একুশদিন। তারপর সব স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে। আবার নতুন করে রিহার্সাল আরম্ভ হবে, আবার স্টেজ রিহার্সাল, নতুন করে টিকিট বুকিং। দলের সদস্যরা চায় অন্তত দূরভাষে রিহার্সাল হোক, কয়েকদিন পর মনোজদা বললেন “ছেলেখেলা”। বন্ধ হয়ে গেলো রিহার্সাল। একুশদিন পরে আরও পনেরোদিনের ফরমান। এবার মনোজদার অসহায়তা স্পষ্ট। ধীরে ধীরে অবসাদ যেন বাবুইপাখির মতো বাসা বাঁধছে তাঁর মনের ভিতরে- মাথার শিরা উপশিরায়। মুঠোর বালি-জীবন কেমন করে যেন পরিযায়ী হয়ে উঠেছে। মনোজদা ফরমায়েশি লেখক নন, আপন তাগিদেই সৃষ্টি করেন। তাঁর হতাশা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। “ এই অসুখটা কী অদ্ভুত অপচয়, তাই না?” আজকের এই দমবন্ধ সময়টা উঠে হয়তো যাবে, কিন্তু সুদূর ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য কী রেখে যাবে? একটা সুস্থির জীবন? মৃত্যুর ত্রাস থেকে, অন্ধকার বিবর থেকে আলোময় জীবন- প্রয়োজনমত স্পটলাইটের আলোয় উজ্জ্বল সেই মঞ্চের সমারোহ? দেবে না মুকুল, দেবে না। নাটক ছাড়া জীবনের তো মানেই খুঁজে পাচ্ছি না। আমার দলের অতোগুলো ছেলে- পরিবারের অসুবিধে করে হাজার বাধাবিপত্তি অগ্রাহ্য করে দলে আসে। শুধু আমার দল নয়, সব দলেরই এক অবস্থা। ওরা যে আসে তা কি শুধু টাকার জন্য? কটা টাকা? মন্দিরের চরণামৃতে কি পিপাসা মেটে? কতো ছেলে পার্মানেন্ট চাকরি নেয় নি, চাকরি তে প্রোমোশন নেয় নি- দল ছেড়ে চলে যেতে হবে বলে। টেলিভিশনের দুর্মর লোভও যারা হেলায় ত্যাগ করে স্টেজে নাটক করছে তাঁদের কী হবে যদি নাটকই না থাকে? কী হবে নাটকের ভবিষ্যৎ? মাস্ক পরে নাটক? দর্শক ছাড়া নাটক? না কি খোলা জায়গায়, খোলা মঞ্চে রাজনৈতিক নাটকের মতো, নুক্কড় থিয়েটারের মতো পথে নামবে নাটক? কী করে সম্ভব হবে? হয়তো বা দুচার জন দর্শক আসবে- দর্শক ছাড়া নাটক হবে কিভাবে?


- আমার প্রাণের মধ্যেটা তোলপাড় করে উঠল। মনোজদার মতো অতন্দ্র সাহিত্য ও শিল্পবৃত্তের এক স্রষ্টার অনুভুতিস্পন্দনে অনিশ্চিতের ছায়া- আশঙ্কার মেঘ। বলি, “ভাববেন না মনোজদা, আবার তো নাটক আরম্ভ হবে। এই অবস্থা কেটে যাবেই একদিন।”


- তুমি তো আমার রিহার্সাল দেখেছ। সক্রেটিসকে নিয়ে বিশাল প্রোডাকশন। এই প্রথম আমার গ্রীক প্রেক্ষাপটে লেখা নাটক। সেই অনুযায়ী সেট তৈরি করা। কী পরিশ্রম মুকুল, কতো যে অর্থব্যয়!


- এই সময়টা জটিলতায় দীর্ণ,নির্জনতার দুরধিগম্য, গোলকধাঁধায় অমোঘ এ কথা ঠিক, এ কথাও ঠিক যে সাহিত্য শিল্প সাময়িকভাবে থেমে গেছে, বন্ধ হয়ে গেছে সিনেমা থিয়েটার, কিন্তু একটা ভাইরাস সমগ্র শিল্প সংস্কৃতিকে হননমেরুতে নিয়ে যেতে পারে না। আপনি আপনার নাটকে কখনো এনেছেন ইতিহাস, কখনো বর্তমান- এই সময়টা প্রোডাকশন সম্ভব না হলে, নাটক লেখার কাজে খরচ করেন তাহলে দু একটা ক্লাসিক নাটক আমরা পেতেই পারি। মানুষের অনায়াস আশ্রয়, শুশ্রূষার আর ক্ষমতার আশ্রয় তো শেষ পর্যন্ত সাহিত্য। আপনার সৃষ্টি শতাধিক। আপনাকে বলার ধৃষ্টতা নেই আমার, কিন্তু অন্ধকার সময়ও তো আলোকময় সাহিত্য-সৃষ্টিতে অনুপ্রাণিত করে। আপনার ‘ ‘সাজানো বাগান’ , ‘অলকানন্দার পুত্রকন্যা’ , ‘ জাদুবংশ’ - প্রতিটাই তো শ্রেষ্ঠসাহিত্য ধরা যায় মনোজদা।


- বুঝলে, নাটক তো শুধু ঘটনার বিবরণ নয়, শুধু গল্প বলে চলা নয়, এটা একটা পাল্টা জীবন। আমার সবসময় মনে হয় যে থিয়েটার হল জীবনের উপাদান আর দেশ কাল, মানে স্পেস আর টাইমের সূত্র নিয়ে অন্য একটা জীবন গড়ে তোলা। নাটক দেখার আর কাহিনী-কথনের অনুভূতির প্রেক্ষিত প্রতিমূহুর্তের বিনিময়ে স্থির করে নিতে পারে তার সতর্ক বহিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে নান্দনিক শিল্পের বিন্যাস।

আর নতুন নাটকের কথা বললে তো? পুজোয় একটা নাটক লিখলাম ছোটদের সঙ্গে, কিন্তু প্রত্যয় নেই, সে নাটক আদৌ মঞ্চস্থ হবে কি না কোন দিন।মাঝে মাঝে আইডিয়া আসে যখন, লিখে ফেলি। দুটো চরিত্র নিয়ে লেখার তাগিদ অনুভব করছি এই সময়- বুদ্ধদেব আর শ্রীরামকৃষ্ণ। এরকমই অনেকদিন আগে একবার বাংলাদেশ গিয়ে একজনের বাড়িতে উঠেছি। তাঁর বাড়িতে একটা বই দেখলাম- হেকিমি বই। গোলাপ পাপড়ি দিয়ে কুষ্ঠ সারানোর কথা লেখা আছে তাতে। বিদ্যুৎচমকের মতো একটা আইডিয়া এলো মাথায়। ফিরে এসে লিখে ফেললাম ‘গল্প হেকিমসাহেব।’


- কিন্তু অন্য শিল্পও তো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিল্পমাত্রেই কিন্তু চিন্তার আদানপ্রদানের প্রয়োজন আছে। এখন সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে, মুখে মুখোশ পরে, চূড়ান্ত টেনশনে কোন সার্থক শিল্পের জন্ম হতে পারে কি?


- দেখো থিয়েটার কিন্তু সাহিত্য, সঙ্গীত বা পেন্টিং এর মতো একক শিল্প নয়। আমরা চাই দর্শক। প্রেক্ষাগৃহের প্রতিটি কোন থেকে দর্শক দেখবে আমাদের হাসি কান্না দুঃখ বিষাদ, মান- অভিমান। তার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া ফুটে উঠবে মুখের রেখায়, চোখের জলে দর্শকদের হাততালি, কিংবা অট্টহাসিতে। আমাদের আরও উদ্দীপ্ত করবে। সত্যজিৎ রায়ের একটা ডায়লগ ছিল- একশটা সিনেমা যা তৃপ্তি দেয়, একটা নাটক তার চেয়ে বেশী আনন্দ বেশী তৃপ্তি দেয়। কারন এখানে সরাসরি গিভ অ্যান্ড টেক। আমি যা দিচ্ছি, তা সরাসরি ছড়িয়ে পড়বে প্রেক্ষাগৃহের কোণে কোণে। এই অতিমারী থিয়েটারকে ধুলিসাৎ করে দিয়ে যাবে। আগামী দিনে এই পৃথিবীতে সাহিত্য থাকবে, শিল্প থাকবে, সঙ্গীত থাকবে- থাকবে না শুধু থিয়েটার? মনে পড়ে যাচ্ছে সোফোক্লেসের একটা নাটকের কথা- ‘ইডিপাস রেক্স’ বা ‘ কিং ইডিপাস’। ইডিপাসের অভিশাপের গল্প, নিয়তির গল্প আরম্ভই করলেন সোফোক্লেস এক মহামারী দিয়ে। নিজের অজান্তেই রাজা ইডিপাস যে পাপ করেছেন, তার শাস্তি ভোগ করছে গোটা গ্রীস।চারিদিকে মৃত্যু , মৃতদেহ ছড়িয়ে আছে রাস্তায়। অ্যাপোলোর অভিশাপ নিয়ে জন্মেছে ইডিপাস - তার দুর্ভাগ্য তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে, অসহায় মানুষগুলো এই মৃত্যু মিছিল দেখতে দেখতে প্রহর গুনছে। আমার সক্রেটিসকে নিয়ে লেখা নাটক বন্ধই হয়ে গেলো। সব উদ্যম, সব পরিশ্রম...। এ নিয়তি ছাড়া আর কি? ভ্যাক্সিন কবে আসবে মুকুল? কবে আমাদের থিয়েটার আবার প্রাণ পাবে?


- এর উত্তর তো আমার কাছে নেই মনোজদা।আমার মনে হয় না এ পৃথিবীতে কারুর কাছে আছে। আপনার কথায় মনে পড়ে গেলো এই নিঃসঙ্গ দিনগুলোকে টপকাতে টপকাতে গ্রীক সভ্যতার এমন সুন্দর শহর থীবস কেমন করে ঢুকে যাচ্ছিল মৃত্যুর গহ্বরে তিল তিল করে। আমাদের দেশও দেখেছে দু দুটো মহাযুদ্ধ, দেখেছে দুর্ভিক্ষ, প্লেগ, দেশভাগ। আবার ফিরে এসেছে নিজের ছন্দে। আশা নয় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় একদিন নিশ্চয় থেমে যাবে এই আতঙ্ক, নিশ্চয় কেটে যাবে এই মৃত্যুভয়, তখন খুলবে নিশ্চয় প্রেক্ষাগৃহ। বিলম্বিত লয়ে হয়তো মনোজদা, কিন্তু খুলবে আমি নিশ্চিত। দর্শকও নিশ্চয় আসবেন।


অভ্যেস মতো হারিয়ে যায় তাঁর কথা। কিছু ভাবনায় ডুবে যান। মনোজদা সন্দিহান হবেন না। তিমিরহননের গান আমরা নিশ্চয় গাইব। প্রেক্ষাগৃহ আবার গমগম করবে দর্শকে। হলের প্রতিটি কোন থেকে দর্শকদের প্রতিক্রিয়া আবারও আসবে। কবি গল্পকার, নাটককার পরিচালক এবং অভিনেতা আমাদের প্রিয় একজন মানুষ মনোজ মিত্রের আশাহত হবার কোন কারন দেখি না। ভালো থাকুন মনোজদা, স্বপ্নে থাকুন, সৃজনে থাকুন। প্রশ্রয়ভূমি হয়ে থাকুন মানুষের ব্যর্থতার।



নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮