• পার্থ সেন

সম্পাদকের কলমে



“মা আসছেন”! কথাটা মনে আসা মাত্র আমাদের মনের আকাশটা যেন আরো নীল হয়ে যায়। শরতের মেঘ, কাশ ফুল, শিউলির গন্ধ, ঢাকের আওয়াজ আমাদের মনে প্রাণে ছড়িয়ে পড়ে আপনা আপনিই। সত্যি বলতে কি দূর্গাপূজা আমাদের জীবনে কি ভাবে জড়িয়ে আছে সেটা আর লেখার বা বলার অপেক্ষায় থাকেনা। আর এর সূচনা সেই মানবজাতির ইতিহাসের শুরু থেকেই। ভারতের ইতিহাসের সূচনা বলতে আমরা বুঝি সিন্ধু সভ্যতা। হরপ্পা বা মহেঞ্জোদারো থেকে যে সব দেবীমূর্তি উদ্ধার করা গেছে তার মধ্যে অন্যতম হল মাতা পৃথিবীর মূর্তি। আর তা থেকে এটা সহজেই অনুমান করা শস্য বা প্রাণশক্তি বা প্রজনন শক্তির প্রতীক রুপে ভারতবাসী কিন্ত দেবী পৃথিবীকেই কল্পনা করেছিল আর তা থেকেই যুগে যুগে ঈশ্বরকে নারীরুপেই দেখেছে। সেই নারীরূপের মধ্যে মাতৃরূপটি ছিল প্রধান। তাই ঈশ্বরভাবনার সেই উন্মেষলগ্ন থেকে ভারতবাসী নারীকে শক্তির উৎস বা প্রতীক হিসাবে দেখেছে। তাই মাতৃভাবে শক্তির পূজা ভারতবর্ষে সর্বজনীন।


আর আমাদের উৎসবের সিংহভাগ দূর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে। সব কিছুর সঙ্গে শারদ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ অবশ্যই বিভিন্ন পত্র পত্রিকার পূজাবার্ষিকী। আমাদের ছোটবেলা’র দিন গুলো থেকেই দেখতাম পুজোর সঙ্গে অবশ্যম্ভাবী ভাবে আসতো শারদীয়া সংখ্যা। পুজোর পত্রিকায় প্রকাশিত উপন্যাস গুলো বেশ মাস তিন চার মাস বাদে বইমেলার সময় বইয়ের আকারে রিলিজ হতো। সেই আগ্রহ, উদ্দীপনা আজও আছে। বানিজ্যিক উদ্দেশ্যের সাথে অনেকেই আজ অসংখ্য লিটল বা পূর্ণাঙ্গ পত্রিকা প্রকাশ করেন। বিভিন্ন পূজা কমিটি সাহিত্য ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেন যেগুলোর সাহিত্য মূল্য একেবারে অস্বীকার করা যায় না। বছর দুয়েক আগে আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি প্রতিবেদনে পড়েছিলাম সারা বিশ্বে এই দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত পত্র পত্রিকা প্রায় পাঁচ হাজারের কাছাকাছি। আর আজকের ইন্টারনেটের যুগে সে সংখ্যা হয়তো ছয় বা সাত হাজার ছাড়িয়েছে।


ইতিহাসে পড়েছিলাম ১৮৭৩ সালে প্রথম কেশব চন্দ্র সেন চালু করেছিলেন সার্বজনীন পুজো কেন্দ্রিক সাহিত্য সংখ্যা, নাম রেখেছিলেন ‘ছুটির সমাচার’। মূল্য নাকি ছিল এক পয়সা। তারপর ১৯১৩ সালে দুইশো পাতার শারদ সংখ্যা প্রকাশিত হয় ‘ভারতবর্ষ’ সাময়িক পত্রিকার সৌজন্যে। পরে বসুমতী, বঙ্গবাণী এঁরা শারদ পত্রিকা প্রকাশ করা শুরু করেন। বসুমতী নিয়মিত শারদ সংখ্যা প্রকাশ করা শুরু করেন ১৯২৫ সালে, তার এক বছর পর ১৯২৬ সালে শুরু করেন আনন্দবাজার। আনন্দবাজারের প্রথম শারদ সংখ্যার পৃষ্ঠা ছিল ৫৪ আর মূল্য ছিল নাকি দুই আনা। আনন্দবাজারের প্রথম শারদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শহরতলী’। পরের বছর আনন্দবাজারের শারদ সংখ্যায় লিখেছিলেন স্বয়ং কবিগুরু।

যাহোক ইতিহাসের কথা এই জন্য বললাম পূজাবার্ষিকী নিয়ে আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক স্মৃতি, অনেক উৎসাহ, অনেক ঐতিহ্য। তাই যখন এই বছরে একটা সুযোগ এসে গেল আমরা শুরু করে দিলাম তার প্রস্তুতি। আর আপনাদের সকলের সহযোগিতায় আশা করব আমরা সফল হব। আমরা অনেক নতুন লেখক, লেখিকাকে আমাদের সঙ্গে পেয়েছি, পেয়েছি অনেক নতুন পাঠক-পাঠিকা, আর পেয়েছি অনেক অনুপ্রেরণা, যা প্রতি মুহূর্তে আমাদের এগিয়ে যাবার সাহস জোগায়।


আমাদের সমস্ত লেখক, লেখিকা, পাঠক, পাঠিকা, চিত্রশিল্পী, সহযোগী এবং শুভানুধ্যায়ী সকল বন্ধুকে জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ এবং শুভেচ্ছা, আর ধন্যবাদ আমাদের সমস্ত পাঠক বন্ধুদের। আপনাদের সবার খুব ভালো কাটুক উৎসবের দিনগুলো। আর হ্যাঁ, অতিমারীকে কেন্দ্র করে এখনো কিন্তু আমাদের সতর্ক থাকার দরকার আছে। আপনারা সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, নিরাপদে থাকুন। আর মূল্যবান মতামত জানিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করে তুলুন।

নীড়বাসনা  আশ্বিন ১৪২৮