• শুভায়ু বন্দ্যোপাধ্যায়

সম্পাদকীয়





একটা বছর কেটে গেলো অতিমারির সময়ে -আশায় আর আশঙ্কায়। লক্ষ লক্ষ লোক মারা গেছে এ বছর- প্রাণের নিদারুণ অপচয়। বছরের প্রারম্ভে যখন চীনে এই রোগ দেখা গিয়েছিল, তখন সবার মনে হয়েছিল চীনে হচ্ছে তাতে আমার কী? যেন চীনেই আটকে থাকবে এই রোগ। এক জীবনে এক অতিমারির অভিজ্ঞতা হয় না, একশো বছরে হয় একবার। পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার মুখে একটা গোটা প্রজন্ম- কতো শিশু বেড়ে উঠবে দাদু, ঠাকুমার কাছ থেকে গল্প না শুনে। এই নিদারুণ সময়ের কথা আগে শুধু গল্প উপন্যাসেই পড়া যেত, কিন্তু এখন ঘটছে আমাদের চোখের সামনে। এই অতিমারির সময়ে আমরা দেখেছি মানুষের অসহায়তা, আমরা দেখেছি বীভৎসতা, আমরা দেখেছি স্বজনের শেষ সময়ে পাশে না দাঁড়াতে পারার শোক আবার মৃত্যুপথযাত্রীর চরম একাকীত্ব। আমাদের সবার জীবনেই ের চেয়ে কঠিন সময় আর আসেনি।

কিন্তু এর সঙ্গে দেখেছি অনেক আশ্চর্য ঘটনা। এই প্রথম গোটা পৃথিবী কেঁপেছে -একসঙ্গে, এই প্রথম গোটা পৃথিবী লড়েছে- একসঙ্গে, এই প্রথম গোটা পৃথিবী একসঙ্গে দেখেছে কীভাবে অসহায় হয়ে পড়ে মানুষ এক সামান্য ভাইরাসের কাছে। কীভাবে প্রতিটা দেশের অর্থব্যবস্থা দুমড়ে মুচড়ে একাকার হয়ে গেছে। এই সময়ে মানুষ দেখেছে সমস্ত পৃথিবীর লোক একসঙ্গে প্রার্থনা করেছে প্রতিষেধকের জন্য। বৈজ্ঞানিকরা কাজ করেছেন একযোগে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। রেকর্ড সময়ে আবিষ্কার হয়েছে প্রতিষেধক।

দূরে সরিয়ে রাখি কন্সপিরেসি থিয়োরি, তা দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে তুফান তোলা যায়, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কোন সিরিয়াস আলোচনার অঙ্গ হিসেবে যুক্ত করা যায় না। একটা ছোট্ট ভাইরাস যা পেরেছে, তা মানুষ কোনদিন করে উঠতে পারেনি। দুদুটো বিশ্বযুদ্ধ, দু দুটো অ্যাটম বোমা, এতো হানাহানি, জেনোসাইড, অলিম্পিক গেমস, বিশ্বকাপ ফুটবলও তা করতে পারে নি। একটা ভাইরাস যে বিশ্বভ্রাতৃত্বের যে বোধ জাগিয়ে তুলেছে সেটা মানুষ এতো উন্নত হয়েও নিজের চেষ্টায় করতে পারে নি। এই প্রথম দেখলাম আমরা বিভিন্ন বিখ্যাত লোক, অভিনেতা এগিয়ে এসেছেন সাধারণ লোকের উন্নতিকল্পে- কখনো পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য, কখনো গৃহহীন সম্বলহীন লকেদের জন্যে - বলিউডের অভিনেতারা এগিয়ে এসেছেন সংবাদমাধ্যমে প্রচারের তোয়াক্কা না করে।

আজ প্রতিষেধক যে শুধু উন্নত দেশগুলোর লোক পাবে তা নয়, তাঁদের নিজেদের স্বার্থেই গোটা পৃথিবীর লোক কে দিতে হবে- কৌতুক এখানেই। “ তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জিথা” - সবাই না পেলে এই প্রতিষেধক গুরুত্বহীন। মার্ক্স লেনিন গোটা পৃথিবীতে যে সোশ্যালিজম আনতে ব্যর্থ, একটা ছোট ভাইরাস তা এনেছে অনায়াসে।

আলব্যের কামু বলছেন তাঁর প্লেগ বইতে “... plague bacillus never dies or disappears for good; that it can be dormant for years in furniture and linen-chests, that it bides in time in bedrooms, cellars, trunks, and bookshelves; and that perhaps the day would come when, for the bane and the enlightening of meb, it roused up its rats again and sent them forth to die in a happy city. ”

এই সংখ্যাটিকে আমরা এই সময়ের আমাদের অস্থির সময়ের দলিল হিসেবে রাখতে চেয়েছি। আজ থেকে অনেক বছর পর যদি কোন ইতিহাসের ছাত্র যদি পরে তাহলে যেন অনুভব করতে পারে আজ আমাদের উৎকণ্ঠা, বিপন্নতা, আজ আমাদের হতাশা কীভাবে আমাদের মানসিক এবং শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। কয়েক দশক পরে ফিরে তাকালে যেন আমাদের এই সংখ্যা আর্থ সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিত তুলে ধরতে সমর্থ হয়। ভবিষ্যতে যখন আবার অতিমারি আসবে, আসবেই যে তা নিশ্চিত, তখন যেন আমাদের এই সংখ্যা পাঠক কে এক দিগনির্দেশ করতে সমর্থ হয়, মনে করিয়া দিতে পারে যে রাজনীতি নয়, ধর্ম নয়, সমগ্র পৃথিবী নতজানু হয়ে প্রার্থনা করেছিল বিজ্ঞানের কাছে- প্রতিষেধকের আশায়।


পরিশেষে ধন্যবাদ জানাই সকলকে যারা অসম্ভব পরিশ্রম করে লেখা দিয়েছেন, এই সংখ্যাটিকে বাস্তবায়িত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। এই সংখ্যা ভালো লাগলে আমাদের পরিশ্রম সার্থক হবে। সমালোচনা করুন, জোরালো সমালোচনা করুন- তাহলেই ভবিষ্যতে আরও ভালো সংখ্যা করার রসদ পাওয়া যাবে।





নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮