• দীপাঞ্জন মাইতি

স্মরণে - উপলক্ষ্য উত্তম



বয়স ঠিক কত মনে নেই - আমার দাদু তখন কলকাতায় কাছেই থাকতেন, এই ঘণ্টা আধেক পথ দূরত্বে। শনি রবিবার বাঁধা ছিল দাদুর আসা। আমাদের মত মধ্যবিত্ত বাড়িতে ঘর ছোট হলেও কখনো জায়গা কম পড়তে দেখি নি। আর দাদু আসা মানে ললিপপ, রাবড়ি বা দই আর এক বেলা খিচুড়ি বাঁধা। বাড়িতে একখানা সেই দরজা দেওয়া টিভি ছিল তাতে চ্যানেল বোধহয় একখানা বা দেড়খানা। মা বাবা কেউই তেমন টিভি দেখতো না তাই ছুটি ছুটি ছাড়া আর টিভি দেখার পারমিশন তখন ছিল না। আর দাদু এলে রবিবার বিকেলের বাংলা সিনেমার স্লটে আমার আর দিদির এন্ট্রি অ্যালাউ ছিল। তবে এক এক রবিবার মা বাবা দাদু দিদি আমি সবাই একসাথে টিভি সামনে জড়ো হতাম। সেইসব দিনগুলো আমার খুব মজা হতো। সে যেন এক উৎসব মত... মাঝে মাঝে কোনো মামা কাকারাও আসতেন। উপলক্ষ! উত্তমকুমার...



উত্তমকুমার যেন আমাদের তিন প্রজন্মের নায়ক... বাবার তো হলে দেখা সে সব সিনেমা। সাদা কালো ঠিক আছে তবে ঐ টুকু বাক্সে কি আর সেই গ্র্যান্ডর ধরা দেয়! দাদুর দৃষ্টিতে মুগ্ধতার থেকে তারিফের প্রকাশটাই বেশী থাকতো বলেই আমার এখন মনে হয়। আমার তখন তেমন বোধগম্য হত না বিশেষ তবে প্রতি রবিবার যাই পাতে পড়ে লুফে নিই মত সমস্ত যত সিনেমা দেখতাম তা থেকে এটুকু বুঝতুম - এই মানুষটার একটা যেন অউরা আছে। এক অদ্ভুত কনভিন্সিং ক্ষমতা। নিশ্চিত বলা মুশকিল প্রথম কোন সিনেমা দেখেছিলাম তবে যদ্দূর মনে পড়ে 'শাপমোচন' মনে হয় অথবা 'সাড়ে চুয়াত্তর'... মানুষটা না সিক্স প্যাক নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন না বাসের মাথায় নাচতে... পর্দায় যা করতেন তার সবটাই চেনা চৌহদ্দির যাপন-রীতি তবু উত্তমকুমারকে নায়ক বলে চিনতে পাঁচ বছরের একজনের কেন জানি অসুবিধা হতে না। তখন বুঝি নি তবে এখন মনে হয় খানিক উপলব্ধি করতে পারি বাবা কেন বলে 'অসাধারণ নয় নায়ক হতে সাধারণের একজন হতে হয়'।



যেহেতু একান্ত ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা তাই একখানা কথা বলেই ফেলি... বেশ একটা সময় পর্যন্ত আমার না মনে হতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠস্বরখানা আসলেই উত্তমকুমারের নিজের। ঘরে তখন সেই রিল ক্যাসেটে হেমন্ত, মান্না, শ্যামল, কিশোর... বড় হয়ে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি তে আমার ভুল ভাঙাতে একটু দুঃখ হয়েছিল বটে - তবে তা নিজের নির্বুদ্ধিতার চেয়ে হেমন্তবাবুর কণ্ঠস্বর যে উত্তমকুমারের নিজের নয় তার দরুন! সত্যি কি সব গান না! এখনো নিয়মিত শুনি।



বাঙালির আড্ডায় যেমন বিতর্ক একটা অভিন্ন পর্ব তেমনি কিন্তু শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপায়। মানে একজনকে এক কথায় সেরা বলে মেনে নেওয়া আমাদের ধাতে সয় না। আর আমার মাথায় না এমন সব পরিস্থিতিতে কোনো নিশ্চিত একক সমাধান কি হবে। ছোটো থেকে ফেলুদার অন্ধভক্ত আমি চৌরঙ্গীর স্যাটা বোসকে দেখে তো ফিদা। নতুন করে যেন এক আইডল পেলাম - এদিকে মাঝে মাঝেই দেখতাম মামা কাকাদের মধ্যে চরম বিতর্ক উত্তমকুমার না সৌমিত্র! এরই মাঝে কোথা থেকে তে রাজনীতি চলে আসতো কে জানে ! তবে আরেক'টু বয়স হতে বুঝলাম আমরা আসলে আমাদের পর্দার নায়কদের মধ্যে এক অধিনায়ক খুঁজি... এ পর্দা বইয়ের পাতাও হতে পারে। সত্যি বলতে এখন বিষয়টা একেবারেই সেলুলয়েডের থেকে যোজন-খানেক দূরে সরে গেছে। তবে একটা বয়সের পর যেন সমস্ত ছাপিয়ে গেলো 'নায়ক' এর অরিন্দম মুখার্জী... মহানায়ক যখন মহাপরিচালকের চিত্রপটে চরিত্র এবং চরিত্রাভিনেতা হয়ে ওঠেন ঠিক যেমনটা হয়...



আসলে এত কথা বলার তে সব খেই হারিয়ে এ'দিক ও'দিক ছুটে বেড়াচ্ছে। বাঙলার সর্বকালের সেরা অভিনেতা কি না, শ্রেষ্ঠ স্টাইল আইকন কি না বা একমাত্র মহানায়ক কি না ইত্যাদি সমস্ত বিতর্কের থেকে অনেক খানা দূরে উত্তমকুমার আমার তিন প্রজন্মের যোগসূত্র ... দীর্ঘ তিন প্রজন্ম ধরে ঘরের মানুষ।



নীড়বাসনা  বৈশাখ ১৪২৯