• সূর্য সেনগুপ্ত

স্মরণে - সজনীকান্ত দাস ও শনিবারের চিঠি





শনিবারের চিঠি, একটি মাসিক/সাপ্তাহিক পত্রিকা, এমন কি আনন্দবাজার পত্রিকার এক পাতা জুড়ে প্রতি শনিবার প্রকাশিত হয়েছে – সংগ্রাম করে প্রকাশনা চালিয়ে গেছে ও অবশেষে বাংলা সাহিত্য-পত্রিকার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে।


১৯২৪ সালে ‘প্রবাসী’ খ্যাত রবীন্দ্র-বান্ধব রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সুযোগ্য পুত্র অশোক চট্টোপাধ্যায় এই পত্রিকাটিকে স্থাপন করেন। তখন বিখ্যাত বাংলা সাহিত্য, সমালোচনা পত্রিকা ‘কল্লোল’ খ্যাতি অর্জন করে চলেছে। শনিবারের চিঠি তার প্রতিযোগী হিসেবে বাংলার সাহিত্য মহলে প্রবেশ করে। শনিবারের চিঠির সঙ্গে সজনীকান্ত দাশের নাম ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে। যোগানন্দ দাশের সম্পাদনায় শনিবারের চিঠি যাত্রা শুরু করে। সেই সময় অসংখ্য উদীয়মান সাহিত্যিকগণের রচনার ধারক হয়ে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের আদর্শ প্রচারের নিমিত্ত একের এক পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে, যেমন সন্ধ্যা, বন্দেমাতারম, নারায়ণ (চিত্তরঞ্জন দাশ স্থাপিত), বিজলী, আত্মশক্তি, ধূমকেতু, বাংলার কথা, সবুজ পত্র (প্রমথ চৌধুরী দ্বারা স্থাপিত ও রবীন্দ্র স্নেহধন্য), প্রগতি, কল্লোল প্রভৃতি। শনিবারের চিঠির প্রাথমিক যাত্রা ছিল বন্ধুর। পত্রিকা আকারে শনিবারের চিঠিকে চালানো গেল না। তাই ১৯২৬ সালে শনিবারের চিঠি প্রতি শনিবারের আনন্দবাজার পত্রিকার একটি পাতা জুড়ে প্রকাশিত হতে লাগল। এই অবস্থা কাটে বেশ সপ্তাহ কয়েক ধরে। তারপর ১৯২৭ সালে শনিবারের চিঠি পুনরায় পত্রিকার আকারে প্রকাশিত হতে শুরু করে। সম্পাদক যোগানন্দই ছিলেন। সেই সময় সজনীকান্ত সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন এবং শুরু হয় এক সাংবাদিক ও এক পত্রিকার সুদীর্ঘ ও বিরল ঘনিষ্ট সম্পর্ক।


১৯০০ সালে সজনীকান্ত’র জন্ম হয়। তিনি ছিলেন এক বিরল প্রতিভাসম্পন্ন সাহিত্যমনস্ক মানুষ। কিন্তু তারই পাশাপাশি তিনি ছিলেন এক মহা বিতর্কিত চরিত্র। সমকালীন সাহিত্যের রস, রীতি, শৈলী সম্বন্ধে যেমন ছিল তার তীক্ষ্ণ জ্ঞান, তেমনি সাহিত্যের সামাজিক ভূমিকা নিয়ে তিনি ছিলেন অতি সচেতন। তিনি যেমন সবার লেখার সমালোচনা করতেন, কখনও কন্সট্রাকটিভ, কখনও আক্রমনাত্মক, তেমনি তাঁর সমসাময়িক খুব কমই লেখক ছিলেন যাঁরা তাঁর গুণগ্রাহী ছিলেন না, তাঁকে নিয়ে লেখেন নি, যেমন তারাশঙ্কর, অচিন্ত্যকুমার, সুশীল রায়, পরিমল গোস্বামী, জগদীশ ভট্টাচার্য, ক্ষেত্র গুপ্ত ইত্যাদি আরও অনেকে। তিনি জনপ্রিয় ছিলেন এবং তাঁর ইন্টেলেকচুয়াল শ্রেষ্ঠত্ব সবাই মেনে নিয়েছিলেন।

খুবই সামান্য অবস্থায় সজনীকান্তর সাহিত্য তথা সাংবাদিক জীবন শুরু হয়। শনিবারের চিঠিতে যোগদান করবার পূর্বে সজনীকান্ত রবীন্দ্রনাথের পুস্তক ‘পশ্চিমযাত্রীর ডাইরি’র শ্রুতিলিখনের কাজ করেন। তারপরই তিনি একাধারে প্রবাসী (বাংলা) ও মডার্ন রিভিউ (ইংরাজি) পত্রিকার সহ-সম্পাদক নিযুক্ত হন। এই কর্ম তিনি বেশীদিন করেন নি। প্রবাসীর কাজ ছেড়ে তিনি হিস মাস্টার্স ভয়েস ও মেগাফোন কোম্পানীর রেকর্ডের গানের জন্য কথা লিখতে শুরু করেন। সেই সময় তাঁর সাথে নলিনীকান্ত সরকারের আলাপ হয়। নলিনীকান্ত’র প্রয়াসে সজনীকান্ত বেতারে ‘শনিমণ্ডলের আসর’ নামক অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে শুরু করেন। তারপরই স্বনামধন্য সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় সজনীকান্তকে ‘দৈনিক বসুমতী’তে কর্ম করবার জন্য আহ্বান জানান। সজনীকান্ত বসুমতীর সম্পাদকীয় স্তম্ভে সাময়িক প্রসঙ্গ লিখতে শুরু করেন। কিন্তু, কিয়ৎকাল পরেই তিনি নারীহরণ বিষয়ক এক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন ও বসুমতি দণ্ডিত হয়। সজনীকান্তকে এই কাজটি পরিত্যাগ করতে হয়।

সাময়িক পত্রিকা জগতের সাথে সজনীকান্তের নতুনতর সম্পর্ক নির্মিত হতে থাকে। যে স্বল্প সময় তিনি সাময়িক প্রসঙ্গ লিখেছেন তা সাহিত্য/পত্রিকাপ্রেমীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁর জীবনীকার দেবজ্যোতি দাশ লিখেছেন, “...... ‘সাময়িক প্রসঙ্গে’ বঙ্কিমচন্দ্র সম্বন্ধে আলোচনা পাঠ করিয়া সচ্চিদানন্দ ভট্টাচার্য উক্ত প্রবন্ধের লেখক সজনীকান্ত সম্বন্ধে আগ্রহী হন এবং ১৩৩৯ (১৯৩২) বঙ্গাব্দের ৮ই অগ্রহায়ণ হইতে তিনি সজনীকান্তকে মাসিক ২০০ টাকা বেতনে তাঁহার সদ্যক্রীত ‘উপাসনা’ পত্রিকার সম্পাদক ও মেট্রোপলিটান প্রিন্টিং অ্যাণ্ড পাবলিশিং হাউসের কর্মাধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত করেন।

সজনীকান্ত উপাসনার নতুন নামকরণ করেন ‘বঙ্গশ্রী’ এবং পত্রিকাটি সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জগত উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব লাভ করে। কিন্তু, যা হবার তাই হল – সচ্চিদানন্দর সঙ্গে সজনীকান্তর মতানৈক্যর ফলে সজনীকান্ত বঙ্গশ্রী থেকে পদত্যাগ করলেন।

এই সময়ে সজনীকান্তর কর্মজীবনে শনিবারের চিঠির আবির্ভাব হয় এবং তাঁর বাকি কর্মজীবনব্যাপী শনিবারের চিঠি কখনও নিয়ত প্রকাশিত হয়েছে কখনো প্রকাশনা নানা কারণে থেমে গেছে, কিন্ত সজনীকান্তর তার সঙ্গে থেকেছে।

শনিবারের চিঠিতে বাংলার বিভিন্ন সাহিত্যিকদের রচনার, বিশেষ করে কাজি নজরুলের কাব্য ও সঙ্গীতের সমালোচনা নানা মহলে ব্যাপক তিক্ততা সৃষ্টি করেছিল। নজরুলের বিখ্যাত –

“বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল”

গানটির কেবলরাম গাজনদার বেনামে প্যারোডি করেন সজনীকান্ত -

‘জানালায় টিকটিকি তুই টিকটিকিয়ে করিসনে আর দিক। ও বাড়ির কলমি লতা কিসের ব্যথায় ফাঁক করেছে ঠিক। বহুদিন তাহার লাগি রাত্রি জাগি গাইনু কত গান। আজিকে কারে জানি নয়না হানি হাসল সে ফিকফিক।'

এছাড়াও সজনীকান্ত নজরুলের নানা সমালোচনা করেন। তিনি মনে করতেন নজরুলের রচনা, অভিব্যক্তির মধ্যে রিফাইন্ডনেসের অভাব আছে। মজার ব্যাপার, বুদ্ধদেব বসু ব্যঙ্গ সাহিত্য শীর্ষক একটি ছোট নিবন্ধ এই চিঠির (শনিবারের চিঠির এইটাই চলতি নাম ছিল) আক্রমণ প্রসঙ্গে রচনা করেন প্রগতি পত্রিকার চৈত্র, ১৩৩৪ সালের সংখ্যায়। এতে তিনি আপেক্ষ করে বলেন, নিন্দা করাই যাদের উদ্দেশ্য, তাদের আর কোনো ছল খুঁজতে হয় না।

নজরুল ঝগড়ুটে মানুষ ছিলেন না। তবু তাঁর বিখ্যাত কবিতা আমার কৈফিয়ৎ-তে লিখলেন,

গুরু ক’ন তুই শুরু করেছিস তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা!

প্রতি শনিবারী চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়িচাঁচা!’

আমি বলি, ‘প্রিয়ে হাটে ভাঙি হাঁড়ি!’

অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি।

(এখানে গুরু হলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, যিনি ব্রিটিশ সরকারের সাথে নজরুলের সরাসরি সংঘর্ষ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। শনিবারী চিঠি অবশ্যই হল শনিবারের চিঠি পত্রিকা। প্রেয়সী হল সজনীকান্ত (ব্যাঙ্গ করে এই নামে ডাকা) কিন্তু এই হাটে কোন হাঁড়ি ভাঙার কথা নজরুল বলেছিলেন, তা আমি আবিষ্কার করে উঠতে পারি নি।)




সজনীকান্ত ও শনিবারের চিঠির একযোগে সম্মুখ যাত্রা ক্রমশঃ বন্ধুর থেকে বন্ধুরতর হতে লাগল। সজনীকান্ত তখন প্রবাসীতে চাকরি করেন। ১৯২৯ সালে অশোক চট্টোপাধ্যায় ইউরোপ গমন করলে সজনীকান্ত শনিবারের চিঠির সত্ত্বাধিকারী হলেন। সজনীকান্ত প্রবাসী প্রেসে শনিবারের চিঠির ছাপার ব্যবস্থা করলেন। তিনি নিজেও প্রবাসী আপিসে বসতেন, কারণ শনিবারের চিঠির দপ্তরও প্রবাসীর আপিসে উঠে এল।। শনিবারের চিঠির মালিক হয়েই স্বভাবতই সজনীকান্ত শনিবারের চিঠির পাতায় নানা আক্রমনাত্মক সমালোচনার ঝড় তুলে দিলেন। তার প্রত্যক্ষ ফল স্বরূপ ‘প্রবাসী’ কতৃপক্ষ তাদের প্রেসে শনিবারের চিঠির ছাপা বন্ধ করে দেয়। শনিবারের চিঠির মুদ্রণ প্রবাসী প্রেস থেকে উঠে গিয়ে কার্ত্তিক প্রেসে হতে থাকে। শুধু তাই নয়, শনিবারের চিঠির কার্যালয়ও স্থানান্তরিত করতে বাধ্য হলেন সজনীকান্ত। সেটি সরে গেল কর্ণওয়ালিস স্ট্রীটে (বর্তমান বিধান সরণী)। নানা রকম অব্যবস্থার কারণে সজনীকান্ত শনিবারের চিঠি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন। তখনও ১৯২৯ সাল শেষ হয় নি। অক্টোবর মাস চলছে।

এই সময় এক অসামান্য ঘটনা ঘটল। বাংলার সাহিত্য জগতে এই ঘটনা ইতিহাস হয়ে বেঁচে থাকবে। একজন ছোটগল্পকার তাঁর প্রথম উপন্যাস নিয়ে সজনীকান্ত কাছে এলেন। এনার নাম বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর প্রথম উপন্যাসটির নাম ‘পথের পাঁচালী’।

সজনীকান্ত গুণীর কদর জানতেন। মূলত ‘পথের পাঁচালী’ প্রকাশের জন্য তিনি উপরোক্ত কর্ণওয়ালিস স্ট্রীটের কার্যালয়ে তিনি ‘রঞ্জন প্রকাশালয়’ স্থাপন করেন।

পরম উদ্যমে সজনীকান্ত ছাপার মেশিন, হরফ ইত্যাদি ক্রয় করে বীডন স্ট্রীটের এক ভাড়া বাড়িতে ‘শনিরঞ্জন প্রেস’ চালু করেন। তাঁর এই নিজস্ব মুদ্রনালয়ে ১৯৩১ সালের অক্টোবর মাসে তাঁর নিজের সম্পাদনায় তিনি শনিবারের চিঠির পুনর্প্রকাশ শুরু করেন। এরপর শনিবারের চিঠি আর বন্ধ হয় নি। দীর্ঘ ত্রিশ বছর পর ১৯৬১ সালে সজনীকান্তর জীবনাবসান হয়। সেই বছরের মাঘ সংখ্যাই ছিল সজনীকান্ত সম্পাদিত শনিবারের চিঠির শেষ সংখ্যা।

সজনীকান্ত শুধু পত্রিকা, মুদ্রন ইত্যাদি নিয়েই শুধু ব্যস্ত থাকেন নি। তিনি ‘বঙ্গীয় মহাকোষ’ নামক এক এন্সাইক্লোপিডিক প্রয়াসের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৯৪৮ সালে রাজশেখর বসুকে (পরশুরাম) সভাপতিত্বে বরণ করে যে পরিভাষা সংসদ গঠন করেছিলেন সজনীকান্ত তার এক সদস্য ছিলেন। তার দীর্ঘদিন পরে ১৯৬১ সালে যখন সরকার সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়কে সভাপতি পদে মনোনীত করে পরিভাষা সংসদের পুনর্গঠন করেন সজনীকান্ত তারও সদস্যপদে মনোনীত হয়েছিলেন।

অনেকেই জানেন না যে প্রমথেশ বড়ুয়ার বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘মুক্তি’র কাহিনী, সংলাপ ও সাতটি গান সজনীকান্ত লিখেছিলেন। এরপর ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবির চিত্রনাট্য করেন, গান লেখেন। বোম্বের বিখ্যাত চিত্রপরিচালক নীতিন বসু সজনীকান্তকে বোম্বে নিয়ে যান এবং তাঁকে দিয়ে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস ‘নৌকাডুবি’র চিত্রনাট্য লেখান। ছবিটি বাংলা এবং হিন্দীতে নির্মিত হয় ও বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

সজনীকান্ত একে একে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রাধারাণী’, শরৎচন্দ্রে ‘মেজদিদি’ ও ‘শ্রীকান্ত’ ছবির চিত্রনাট্য ও গান লেখেন। এরপর পশ্চিমবঙ্গ সরকার যখন ফিল্ম সেন্সর বোর্ড স্থাপন করেন, সজনীকান্ত সেই বোর্ডের অন্যতম সদস্য হিসাবে নির্বাচিত হন।

তাঁর মৃত্যুর পর মাসিক বসুমতী শোক প্রকাশ করতে গিয়ে লেখেন, “বাংলা সাহিত্যের দুটি যুগের সন্ধিক্ষণে সজনীকান্তের আবির্ভাব – সে আবির্ভাব যেমনই গুরুত্বপূর্ণ, তমনি তাৎপর্যময়......। ¡

নীড়বাসনা  বৈশাখ ১৪২৯