• সূর্য সেনগুপ্ত

স্মরণে - সিনেমার ঘাসের জমিতে উত্তমকুমার নামক মহীরুহকে চিনুন




এটা যদি আমরা মেনে নিই যে চলচ্চিত্র শিল্প যুগে যুগে সারা পৃথিবী জুড়ে সাহিত্যের মুকুর হয়ে জনসাধারণ্যে সাহিত্যকে পৌঁছে দিয়েছে, তাহলে, আমরা বাংলা সাহিত্যের তরফ থেকে, উত্তমকুমারের কাছে অনায়াসে কৃতজ্ঞ থাকতে পারি। না, আমি তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলির কথা বলছি না। তিনি যদিচ অসাধারণ দক্ষতায় রবীন্দ্রনাথের ‘রাইচরণ’ (খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন) ও ‘দক্ষিণাচরণ’(নিশীথে); শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ বিভূতিভূষণের অনঙ্গ (নিশিপদ্ম), শরদিন্দুর ‘ব্যোমকেশ’, বিমল মিত্রর ভূতনাথ (সাহেব, বিবি, গোলাম) আশুতোষ মুখার্জীর ‘ধীরাপদ’ (কাল তুমি আলেয়া), রমাপদ চৌধুরীর ‘উদাস’ (বনপলাশীর পদাবলী), শঙ্করের স্যাটা বোস (চৌরঙ্গী) ইত্যাকার ভিন্নমুখী কঠিন চরিত্রগুলি পর্দায় পরিস্ফুটিত করেছিলেন, অপিচ, এই কাহিনীগুলির নির্বাচনে তাঁর তেমন কোন ভূমিকা ছিল না, ধীরাপদকে ছাড়া। কথিত আছে ‘কাল তুমি আলেয়া’র প্রযোজক এবং পরিচালককে যখন আশুতোষ মুখোপাধ্যায় হাঁকিয়ে দিলেন, কারণ তিনি গল্পটা সিনেমার জন্য বেচবেন না, তখন উত্তমকুমার সোজা লেখকের বাড়ি গিয়ে হাজির হলেন এবং তাঁর মত আদায় করলেন।


আমি প্রযোজক উত্তমকুমারের কথা বলছি। তাঁর প্রযোজক হবার পেছনে দুই মার্কিন সাহেবের একটা ভূমিকা ছিল। ১৯৪১ সালে প্রকাশিত হল জেমস হিল্টনের জগত বিখ্যাত উপন্যাস র‍্যান্ডম হারভেস্ট। পরের বছরেই, ১৯৪২ সালে হলিউড উপহার দিল কাহিনীটির চিত্ররূপ। পরিচালনা মারভিন লে"রয়, নায়ক রোনাল্ড কোলম্যান, নায়িকা গ্রীয়ার গারসন। উত্তমকুমার একাধিক বার স্বীকার করেছেন যে কোলম্যান হলেন তাঁর প্রিয় অভিনেতা। গল্পটা ও কোলম্যানের অভিনয় মাথায় ঘুরছিল উত্তমের। তারপর ১৯৫৭ সালে যখন ছবি করবার কথা হল, তখন উত্তমকুমার আর অজয় কর মিলে ‘আলোছায়া প্রোডাকশন্স’ স্থাপন করে এই গল্পটার বঙ্গীয়করণ করে হারানো সুর বানালেন। অসাধারণ সাফল্য পেল ছবিটি – আর্থিক সাফল্য, জাতীয় পুরস্কার এবং সুচিত্রা-উত্তম জুটি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে গেল।


১৯৬০ সালে তারাশঙ্কর বাঁড়ুজ্জের ‘সপ্তপদী’ নিয়ে এলো আলোছায়া। উত্তমকুমার প্রযোজিত দ্বিতীয় ছবি। সপ্তপদী কাহিনীটি যে সময়কালের কথা বলেছিল, তার থেকে ১৮ বছর পর ছবিটি তৈরি হয়েছিল। ধর্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ পিতার গ্রাম্য সন্তান কলকাতায় এসে প্রেম ও সংস্কারের সংঘাতের মাঝে পড়েছিল, তার প্রতিফলন তখনো বেশ প্রাসঙ্গিক ছিল, হয়তো আজও আছে। আবার অসাধারণ ব্যবসায়িক সাফল্য পেল ছবিটা। তারপর তাঁর প্রযোজনায় একটার পর একটা ছবি বেড়িয়ে এলো – ‘৬৩তে ভ্রান্তিবিলাস – মূল কাহিনী উইলিয়াম শেক্সপীয়ার, বঙ্গায়ন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর; ৬৪তে জতুগৃহ, সুবোধ ঘোষের ছোটগল্প, পরিচালনা তপন সিংহ; ৬৭তে গৃহদাহ – শরৎচন্দ্রের স্মরণীয় উপন্যাসের চিত্ররূপ –উত্তম কুমার মহিম, সুরেশ প্রদীপকুমার, অচলা সুচিত্রা সেন ও নীহাররঞ্জন গুপ্তের নাটকীয় কাহিনী “উত্তরফাল্গুনী”। ছবিতে সুচিত্রা সেন ছিলেন দ্বৈত ভূমিকায়। এতে উত্তম অভিনয় করেন নি, । সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি উত্তর দেন, “বাংলার দর্শক সহ্য করতে পারবে না যে সুচিত্রা সেন উত্তমকুমারকে “কাকু” বলে ডাকছে।” সেই ৬৭তেই হিন্দি ছবি “ছোটি সি মুলাকাত” - আ ফাইনান্সিয়াল ডিসাস্টার! এই বিপর্যয় শুধু যে তাঁর প্রযোজনা কর্মে ইতি টেনেছিল তা নয়, যে বিশাল ঋণ জমেছিল তা পরিশোধ করবার জন্য তাঁকে একের পর এক খারাপ ছবিতে অভিনয় করে যেতে হয়েছিল।


বাংলা ছবির প্রথম টকি মুক্তি পাবার (১৯৩১) আন্দাজ ১৭ বছর পর উত্তম চলচ্চিত্রে আসেন (১৯৪৮)। এই সময়টাতে সিনেমার অভিনয়ে যে আলাদা একটা ধারা আছে, স্কুলিং আছে সেটা খুব একটা কেউ মেনে চলত না। প্রমথেশ বড়ুয়ার মত দু-একজন শিক্ষিত অভিনেতারা ছাড়া বাকিরা এন্তার মেলোড্রামা চালিয়ে যেত, যেটা হাতিবাগানের পেশাদার মঞ্চ থেকে সোজা পর্দায় উঠে এসেছিল। একাধারে একজন শহুরে নায়ক ও একজন গ্রাম্য আদর্শবাদীকে উত্তমই প্রথম বাংলা সিনেমাতে বাস্তবানুগ করে তোলেন এবং ফলস্বরূপ চলচ্চিত্র নির্মাতা ও দর্শকদের কাছে সমান ভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। আজ ওনার জন্মদিন। বেঁচে থাকলে ৯৫ বছর বয়স হত। হয়ত ওঁকে নিয়ে স্ক্রিপ্ট লেখা হত যেমন হচ্ছে বচ্চন সাহেবকে নিয়ে। তবু যেন মনে হয় এই ভাল হয়েছে। কিম্বদন্তী হয়ে আছেন বেশ কয়েক প্রজন্ম ধরে ছেলে-মেয়ে, মাঝারি, বুড়ো বাঙালির হৃদয়ে। একধারে একজন ম্যাটিনি আইডল ও অন্যদিকে একজন সেরেব্রাল অভিনেতা। সত্যজিৎ রায় উত্তমের মৃত্যুর পর মুক্ত কন্ঠে বলেছিলেন, “I must say working with Uttam turned out to be one of the most pleasant experiences of my film making career


নীড়বাসনা  বৈশাখ ১৪২৯