• পার্থ সেন

হোটেল ক্যালিফোর্নিয়া




গল্পটা আগেও কয়েক জনকে বলার চেষ্টা করেছি, এবারে লিখেই ফেললাম। আগেই বলে রাখলাম, গল্পের নামটা কিন্তু আমার এক শ্রোতারই দেওয়া।



নব্বই দশকের শেষের দিকের কথা, আমি তখন তৎকালীন বিহার, আজকের ঝাড়খন্ডের এক ইস্পাতনগরী তে কাজ করি। সে ছিল আমার প্রথম চাকরী, স্বাধীন জীবন, আর সাথে ছিল প্রথম নিজের চলমান বাহন, সপ্তাহান্তে বাবাকে এক-দু বার এসটিডি করা ছাড়া সংসারের ওপর মিনিমাম দায়িত্ব, সে স্বর্ণযুগের কথা ভুলি কি করে? তো সেখানে দেবজিত ছিল আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু, আসলে আমরা দুজনে এক কলেজ থেকে পাশ করে সেখানে চাকরী শুরু করেছিলাম। ঘটনাচক্রে আমাদের দুজনের ডিপার্টমেন্টও ছিল এক, থাকতামও এক হোস্টেলে, আবার শিফটের সময়ও দুজনের এক, দুজনের উইকলি অফও ছিল এক দিনে। দেবজিতের জন্য অবশ্য সেই সময়টা ছিল আরো ঘটনা বহুল, আরো এক্সাইটিং, কারন দেবজিত আবার তখন সদ্য সদ্য প্রেম করা শুরু করেছে। প্রতি উইকলি অফের দিনে ৪৮ কিলোমিটার পেরিয়ে পুরুলিয়ার টাউনশিপে দেবজিত যেত প্রেমালাপ করতে। আর আমি কাছাকাছি কোন সিনেমা হলে ঢুকে পড়ে সিনেমা দেখতাম। সারা সপ্তাহে হাড় ভাঙ্গা খাটুনী যেত তো একটা দিন বেশ হৈ হৈ করে কেটে যেত। এখন কি করে যে পুরুলিয়ার টাউনশিপে দেবজিতের এই সম্পর্ক তৈরি হল আর কেনই বা আমি মোটর সাইকেল চালিয়ে ৪৮ কিলোমিটার পেরিয়ে তার সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে পুরুলিয়া যেতাম সে বলতে গেলে অন্য একটা গল্প বলা হয়ে যাবে। সেসব কথা বরং এখন থাক! আর এটাও বলে রাখা দরকার এটা কিন্তু প্রেমের গল্প নয়, সুতরাং অন্য কথা বলে বাজে সময় নষ্ট করব না। আসলে ব্যাকগ্রাউন্ড টা দিয়ে রাখা দরকার তো! তাই! তা এই রকম একটা দিনের কথা।



১৯৯৯ এর আগস্ট মাসের শুরুর দিকে এক প্রবল বর্ষণস্নাত শুক্রবারের কথা। আমরা বিকেলে যখন পুরুলিয়া পৌঁছেছি তখন কিন্তু খটখটে শুকনো, বৃষ্টিটা নামল সন্ধ্যের দিকে। দেবজিত নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে আর আমিও মহুয়া থিয়েটার। আমার চিরকালীন ফেভারিট হিরোর সিনেমা রিলিজ করেছে, অজয় দেবগনের বাবা আবার মুভিটা বানিয়েছেন, সুতরাং সেটা দেখার জন্য আমার যথেষ্ট ইন্টারেস্টও ছিল। যা হোক তিন ঘন্টার সিনেমা শেষ হলে বেরোলাম, সমস্যাটা আমি বুঝলাম থিয়েটারের পার্কিং লটে পৌঁছে। বাইকের সামনের চাকা চুপসে গেছে, সেটা নিয়ে কোনভাবে আর এগোনোর উপায় নেই। এদিকে তখন তো এখনকার মতো মোবাইল ছিল না, সুতরাং দেবজিতকে এই ব্যাপারটা জানানোরও কোন সহজ উপায় নেই। কি যে করি? বেশ মিনিট পনের কুড়ি এদিক ওদিক উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘোরাঘুরির পর একজন দরদী মানুষকে পেলাম। যিনি নিজে কিছু করলেন না তবে আমাকে একটা উপায় বলে দিলেন। তারপর বেশ খানিকটা হেঁটে খানিকটা অটোয় চেপে একটা বাইকের চাকা সারানোর জায়গা খুঁজে পেলাম, একজন মেকানিকও জোগাড় হলেন। বৃষ্টি ভালোই হচ্ছিল, বাইক সারাতে সারাতে মোটামুটি ভালোই ভিজে গেছিলাম আমি। তা সব নিয়ে কাজ যখন শেষ হল, তখন আমার হাতের ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছে রাত দশটা চুয়ান্ন।



বাইকে স্টার্ট দিয়ে দেবজিতের বলে দেওয়া জায়গায় পৌঁছে দেখি যা ভেবেছি তাই, দেবজিত নেই। এদিকে খুঁজি কোথায়? পুরুলিয়ার সেই কো-অপারেটিভ টাউনশিপে সে সময়ে যারা গেছেন তাঁরা জানেন, সে জায়গা বড্ড তাড়াতাড়ি রাতে ঘুমিয়ে পড়ে। যেই রাত এগারোটা হল ব্যাস! সব লাইট নিভে যায়। রাস্তায় একটা লোক নেই, থাকার বলতে কয়েকটা কুকুর! তারা উৎসুক চোখে আমার দিকে চেয়ে থাকে। স্বাভাবিক, এসময়ে কোন ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে একজন মধ্য বয়স্ক পুরুষ মানুষ বাইক নিয়ে ঘোরাঘুরি করবেন, সেটা বোধহয় কুকুররাও খুব আশা করে না। কুকুর দেখে আমি আতঙ্কিত হলেও কিন্তু দেবজিতকে এখানে একা ফেলে আমি নিজের জায়গা ফিরে যাই কি করে? এখন উপায় একটাই, যেখানে সে যেত মানে যার বা যাঁদের বাড়ি সে যেত সেখানে একটা চেষ্টা করা। আগে কোনদিন যাই নি। কিন্তু আজ লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে সেখানেই বাধ্য হয়েই যেতে হল। সে বাড়িরও আলো নিভে গেছিল, দুবার কলিং বেল বাজাতে দরজা খুলল। জানতাম সেখানে সে থাকবে না, কিন্তু আমার জানার একটাই জিনিস ছিল যদি কোন খবর পাওয়া যায়। একটা হিন্ট পেলাম, বাস স্ট্যান্ড! আমাকে না পেয়ে সে হয়তো বাস স্ট্যান্ডে গেছে যদি সেখান থেকে কিছু পাওয়া যায়। অবশ্য সেখান থেকে সে বেরিয়ে গেছে প্রায় এক ঘন্টা পনের মিনিট আগে। তাই আর আর সময় নষ্ট করে সাথে সাথে দৌড়লাম।



বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে অবশেষে দেবজিতের দেখা পেলাম। প্রায় সাড়ে এগারোটা বেজে গেছে, ফেরার বাসও আর নেই। সেও আমার মতো ভিজে গেছে, উদভ্রান্তের মতো এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করছিল আমাকে দেখে তার মুখের যে কি অবস্থা হল সে আর বলছি না। খালি এইটুকু বলে রাখি তার মুখ দেখে এটা বেশ বুঝতে পারছিলাম আর কিছুক্ষন হলে সে হয়তো কেঁদেই ফেলত! তো যাক সে কথা। বাইক ঠিক হয়ে গেছে তো আর দেড় ঘন্টায় আমরা ম্যানেজমেন্ট ট্রেনী হোস্টেলে পৌঁছে যাবো। কিন্তু পৌঁছতে প্রায় একটা বাজবে, আর একটা জিনিস আমরা পাবো না সেটা হল রাতের খাবার! মেস বন্ধ হয়ে যাবে, সুতরাং আজ রাতে আর খাবার জুটবে না। অগত্যা পুরুলিয়ার বাস স্ট্যান্ড থেকে শহরের দিকে একটু এগোতে হল, যদি কোন হোটেল পাওয়া যায়। বেশীর ভাগ দোকানের ঝাঁপ বন্ধ হয়ে গেছে, রাস্তায় আলো খুব কম। এমনিতেই রাস্তায় আলো মানে স্ট্রীট লাইট তেমন নেই, আর দোকান গুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রাস্তায় আলো একেবারেই নেই। কতক্ষন মনে নেই, তবে আমরা শহরের মধ্যে বেশ খানিকটা আসার পর একটা রেস্টুরেন্ট খোলা পেলাম, দেবজিত বলল এই জায়গাটাকে ‘দেবারলি’ বলে। বাইরে থেকে রেস্টুরেন্টটাকে দেখে খুব ভালো মনে হল না, তবে খিদে এমন পেয়েছিল আর অন্য কিছু মাথায় আসেনি।



নাম-ধাম দেখিনি, ভেতরে ঢুকে পড়লাম, আলো আঁধারিতে মেশা রেস্টুরেন্ট, রাত সাড়ে এগারোটা সুতরাং পারমিশান নেওয়ার দরকার নেই। একটা পাশ ঘেঁসে টেবিলে মুখোমুখি দুজনে বসে পড়লাম। চারপাশে চোখ গেল, কাছের টেবিল গুলো খালি তবে একটু দূরের দুটো টেবিল ভর্তি লাগল। ওয়েটার চোখে পড়ল না, তবে বুঝতে পারছি একটু দূরে একজন দুজন হাঁটা চলা করছে। আমাদের টেবিলের ওপর একটা মেনু কার্ড রাখা ছিল, সেটাতে চোখ বোলাচ্ছিলাম। তখন রেস্টুরেন্টে সিগারেট খেতে গেলে ‘স্মোকিং’ জোনে যেতে হতো না। তো দেবজিত সিগারেট ধরাল, আমিও ধরালাম! তিন চারটে সুখটান দিয়েছি, হঠাৎ খেয়াল হল আমার বাঁদিকে টেবিলে কে যেন আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। আমি বাঁদিকে মুখ ঘোরালাম কেউ নেই। কয়েক সেকেন্ড গেল, এবারে সিগারেটে আর একটা টান দিয়েছি এবারে মাথার পেছনে ঘাড়ের কাছে একটা ঠাণ্ডা হাওয়ার স্পর্শ পেলাম, চকিতে মাথা ঘোরালাম কেউ নেই, এবারে দুরের যে টেবিলটা এতক্ষন ভর্তি লাগছিল সেটা থেকে কেমন যেন একটা দুটো অবয়ব নড়তে দেখলাম।

আমি খানিকটা হতভম্ব হয়ে গেছি, বেশ বুঝতে পারছি হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে, ঘোর ভাঙ্গল দেবজিতের গলায় – “আরে এখান থেকে পালা!”


চেয়ার সরানোর আওয়াজ এলো আর আমার পাশ দিয়ে দেবজিতের ছয় ফিটের চেহারা টা যেন ১০০ মিটার স্প্রিন্ট শেষ করার স্পীডে ছিটকে বেরোলো, আমি তখনো স্থানুর মতো চেয়ারে বসে। আশেপাশের অবয়ব গুলোর নড়াচড়া বেশ ফিল করছি, নজর স্থির করে দেখার শক্তি নেই, আর কিছু করারও শক্তি বা বুদ্ধি কোনটাই নেই। ঘোর ভাঙ্গল আমার ডান হাতের একটা আঙ্গুলে যেন কিসের ছ্যাকা লাগল। মাথা কাজ করল এবারে, বুঝলাম অসাবধানে সিগারেটের আগুনে আমার হাতে একটা ছ্যাকা লেগেছে। আমি এবারে উঠে পড়লাম, দেবজিতের পিছু পিছু দৌড়। আর কিছু ভাবা নয়, যেমন করে হোক আমাদের সেই রেস্টুরেন্ট থেকে বেরোতে হবে। বেশ বুঝতে পারছি পেছনে কিছু শব্দ আসছে তবে মুখ ঘুরিয়ে দেখার শক্তি নেই। সমস্ত শক্তিকে এক করে দৌড় লাগালাম। দেবজিত ততক্ষনে দরজার কাছে পৌঁছে গেছে। দরজা দিয়ে বেরোতে গেল, বেরোতে গিয়ে কেমন যেন বসে পড়ল, তারপর এক প্রকান্ড লাফ মারল।


এবারে আমার পালা, আমার বুকের মধ্যে কে যেন হাতুড়ি পিটছে, আমিও পৌঁছে গেছি দরজার কাছে। আর কয়েক সেকেন্ড! তাহলেই রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে গিয়ে পড়ব রাস্তায়, আর এবারে সেই মুহূর্ত। একা একা অন্ধকার রাতে সেই কথা যখন মনে পড়ে আমার শিরদাঁড়া দিয়ে কেমন যেন একটা কনকনে স্রোত বয়ে যায়।


দরজাটা পেরোতে যাবো, এবারে আমার কাঁধে যেন কেউ হাত রাখল। জোরে নয় তবে কেমন যেন গতি রোধ করার চেষ্টা! মুখ ঘোরালাম, এক মুহূর্তে আমার পুরো শরীর যেন রক্তশূন্য হয়ে গেল, কেউ নেই তবে কাঁধে হাতের ছোঁয়া যেমন ছিল তেমনই রয়েছে। তাহলে আমার কাঁধে হাত রাখল কে? ভয়, আতঙ্ক, বিস্ময় আমাকে ভেতর থেকে খানখান করে দিচ্ছে, আমি যেন কেমন করে নিজে নিজেই বসে পড়লাম। বেরোনোর সময় দেবজিতের পোজ টা মনে ছিল হয়তো। আর তাতে হাতটা যেন নিজে থেকেই আমার কাঁধ ছেড়ে দিল। এবারে সেই দেবজিতের মতো প্রকান্ড লাফ মেরে একেবারে রাস্তায়। তারপর দৌড়!




আমার জুতো ছিঁড়ে গেছিল। খালি পায়ে কোনমতে বাইক নিয়ে হোস্টেলে ফিরেছিলাম তখন রাত দুটো। বেশ মনে আছে সারা রাস্তা আমি আর দেবজিত কোন কথা বলি নি, খাওয়া তো দূরের কথা। তারপর আরো বারো বার পুরুলিয়ায় গেছি তবে দেবারলির রাস্তায় কখনো নয়।



নীড়বাসনা  আশ্বিন ১৪২৮