• মনীশ সরকার

প্রবন্ধ - নীড় বাসনা

কাগজ কলম নিয়ে বসলেই লিখতে হবে এ আবার কেমন কথা! সামনে খাতা কলম নিয়ে বসে আছি আর নানান কথা

মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে সামনে খোলা বিরাট জানালা, আমগাছটা পাঁচ তলার জানলা দিয়ে উঁকি মারছে, পাকা পাকা আম ঝুলছে, নারকেল গাছটা আমার জানালা ছাড়িয়ে গেছে। রোজ এক ঝাঁক টিয়া এসে আক্রমণ করে, এখন আর কটা দিন, আম শেষ আর ওদের আশাও বন্ধ, আবার সেই পরের বার। সন্ধ্যেয় আবার বাদুড়ের উৎপাত। এরা সবাই দিনের বেলায় কোথায় যায়? জায়গাটা ঠিক মনে নেই, তবে দেখেছিলাম অনেক বাদুড় ঝুলে আছে। এত বাদুড় একসাথে আগে কখনো দেখিনি, গাছের পাতা দেখা যাচ্ছে না শুধুই বাদুড় উল্টো হয়ে ঝুলে আছে। ওদের মাথায় রক্ত চড়ে যায় না! দাদু তো আমাদের প্রায়ই বলতেন - ওরে বাবা ওরকম করিস না মাথায় রক্ত চড়ে যাবে। এটা কি সত্যি?

এই টিয়ার ঝাঁক বছরের অন্য সময় কোথায় যায়? আর কিছু জাতের পাখি বছরের নানা সময়ে আসে আবার চলে যায়। অনেকের নাম জানি আবার অনেককে আগে কখনো দেখিনি। সেদিন দেখি একটা মাছরাঙা হোম কেবলের তারের ওপর বসে দোল খাচ্ছে, হায়রে কপাল কোথায় গেল সেই জলের ধারে পাতলা ডালে বসে দোল খেতে খেতে জলে চোখ রেখে বসে থাকা আর মাছ দেখলেই ছোঁ মেরে মাছ ধরা। কিসের আশায় ও এখানে বসে আছে? প্রয়োজনের তাগিদে হয়তো বা মানুষ, পশু,পাখি নির্বিশেষে সবাইকেই জায়গা বদল করতে হয়। তাকালাম আকাশের দিকে, অনেক উঁচুতে চিলেরা গোল গোল করে উড়ছে, আবার কেউ কেউ উড়তে উড়তে নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করছে। এই জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকতেই বেশ সময় কেটে যায়, একটা চলমান দৃশ্য। তবে আজকাল আর এই জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতে ইচ্ছে করে না। তাকালেই পেছনে ঐ বিরাট বাড়িটা চোখে পড়ে। মাঝে মাঝে লোভ সামলাতে পারিনা।

জানলা দিয়ে উঁকি মারি. পোড়ো বাড়িটা অনেক দিন ধরে পড়ে আছে, আরে পোড়ো বলছি কেন? আসলে তো বাড়িটা নতুন তৈরি হচ্ছে, খানিকটা তৈরি হয়ে থেমে আছে। আমার জানলা দিয়ে দেখি কখনো কাকেদের মিটিং বসেছে সে মিটিং বিনা বাধায় অনেকক্ষণ ধরে জটলা চলল তারপর সবাই হই চই করতে করতে উড়ে গেল। কখন টিয়ার ঝাঁক, মাঝে মাঝে দুই একটা লোক ঠুক ঠাক করে দেখেও খানিকটা ভাল লাগে, যারা ঘর বুক করেছে নতুন আশিয়ানার আশায়। তাদের এই প্রতীক্ষার আট বছর হলো। ওদের কথা ভেবে আর পোড়ো বাড়ি কথাটা লিখতে ভালো লাগছে না।

যাদের বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি উঠেছে, অনেকেই আশপাশে বাড়ি ভাড়া নিয়েছেন, কয়েকজনের সাথে আলাপও হয়েছে। প্রথম প্রথম যখন বাড়িটা বেশ জোরকদমে তৈরি হচ্ছিল, ওঁদের সঙ্গে দেখা হলে বেশ হাসি মুখে শুভেচ্ছা বিনিময় হতো, মাঝে মাঝে কথা বাড়ানোর জন্যে জিজ্ঞেস করতাম, ওরা কত দিনে দেবে বলছে? খুব খুশি হয়ে বলতেন, বেশিদিন লাগবে না, পরের অক্টোবরই দেবে বলছে। ঘরটা আমাদের সাজাতেও তো কিছুটা সময় যাবে, মানে আরকি কারপেন্টারি, খানিকটা নিজের মতো করে ঘরগুলো রঙ করা, বেশী কিছু নয়।

এখন দেখা হলে আমতা আমতা করে বলেন, সব কিছু উল্টো পাল্টা হয় গেছে, আপনারা তো দেখতেই পাচ্ছেন.... আর কোন প্রশ্ন করতে পারিনি নিজেই কাজের অজুহাত দেখিয়ে ওখান থেকে সরে গেছি।

সেদিন হঠাৎ করেই সকাল বেলায় দেখি আটকে থাকা বাড়িতে অনেক লোক কাজ করছে আমারও বেশ ভালো লাগলো। কিছু লোকের নতুন ঘর পাবার আশা পূর্ণ হবে।

বিকেল গড়িয়ে এলো সবাই কাজ শেষ করে ঘরে ফিরে গেছে। হঠাৎ মনে হলো কিছু কথাবার্তার আওয়াজ পাচ্ছি, অনেক চেষ্টা করেও কাউকে দেখতে পেলাম না, অনেক কষ্টে চোখে পড়ল দুটো চিল বসে আছে একেবারে বাড়িটির মাথায়।

আমার মনে হলো ওরাই কথা বলছে, চিল বলল : এবার বোধহয় আমাদের এই জায়গাটা ছাড়তে হবে...লম্বা একটা শ্বাস নিল ।

চিলনী : কেন কি হয়েছে..! সবেত কাজ শুরু হয়েছে, এমন তো কত বার কাজ শুরু হয়েছে বন্ধও হয়েছে.... এখনো সময় আছে তুমি ভেব না...

চিল: না না আর সময় নেই, ওরা বলাবলি করছিল এবার বেশি লোক লাগিয়ে মাস খানেকের মধ্যেই কাজ শেষ করে দেবে....

চিলনী : বাসা বাঁধলাম, ডিম পাড়লাম এখন বাচ্চা বড় না করে আমি এখান থেকে যাব না, বলে দিলাম কিন্তু...

চিল: আরে বাবা তাইতো ভাবছি এখন কি করা উচিত হবে.....

চিলনী : তোমাকে তো প্রথমেই বলে ছিলাম ‌ ওই তাল গাছটায় বাসা বাঁধি, কিন্তু তুমি নানান অজুহাত দেখিয়ে এখানে বাসা বাঁধলে. এখন কি হবে? এদেরকেও বলিহারি যাই এত দিন পড়ে রইল আর কটাদিন থামতে পারল না।

হঠাৎ যেন সব গোলমাল হয় যাচ্ছে-- আমি কার কথা ভাববো - যারা সন্তানের আশায় ঘর বেঁধেছে না যারা নতুন ঘর পাবার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর আশার আলো দেখছেন। সব কিছু ওলটপালট হয় যাচ্ছে । এক দিকে নিরাশা অন্য দিকে আশার আলো নতুন ঘরের আশা।

সত্যি মনটা বেশ বিচলিত হল, একটাই ঘটনা একজনকে আশা দেয় অন্য জনকে হতাশা। কি অদ্ভুত এক অনুভূতি অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার সূচনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ে চিল ও চিলনী। তাদেরকে সহানুভূতি জানাব না যাদের মুখের হাসি হারিয়ে গিয়েছিল তাদের আনন্দে যোগ দেব।

কতক্ষণ এই ভাবে বসে ছিলাম জানিনা, হঠাৎ মনে হলো আমিও তো কাজের আশায় ঘরছাড়া হয় বেরিয়ে পড়ে ছিলাম ।নতুন ঘর, নতুন শহরে নতুন লোক, পাহাড়প্রমান অনিশ্চয়তা।

সেদিন কিন্তু বেশ সহজ ভাবেই নিয়ে ছিলাম। আজ ভাবতে গিয়ে মনে হচ্ছে কত কঠিন ছিল সব কিছু কাজ হল, ঘর হল সংসার হল। এখন সে সব ইতিহাস। এখন খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে দেখি, এত কঠিন, এত ঝুঁকি, এত ভাঙ্গা গড়া কি করে সম্ভব হল এত সহজে কি ভাবে নিলাম লোকেরাও তো নেয়। একটাই উত্তর পেলাম এ সব শক্তির উৎস মনের কোনে লুকিয়ে থাকা নীড় বাসনা!

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮