• সত্যজিৎ দত্ত

গল্প - জানলা



এই সেই জানলা। ফ্রেমে বাঁধা আমার পৃথিবী। ভোর থেকে সারা দিন। সারা রাত। শেষ রাতে উল্টো দিকের ইমারতি জিনিসের আড়তে লরি এসে থামলে ইঞ্জিনের শব্দ, কুলিদের চাপা গলায় হাঁকাহাঁকি, ট্রাকের ডালা খোলার টং-টং, পাথর, বালি নামানোর ঝপ-ঝপ ঝুপ-ঝুপ আওয়াজে ঘুম ভাঙে। জানলার সামনে খাটের ওপরে উঠে বসি। বউ রাগ করে, বলে কী কুক্ষণেই যে ছেলেটা এখানে বাড়ি নিল। সকাল, দুপুর বিকেল কোনও সময়েই শান্তিতে থাকার জো নেই। এর পরেই ইস্কুলের ছেলেগুলোর হুটোপুটি, তাদের মা’দের গুলতানি। দুপুরভর বাজার দোকানের খদ্দেরদের দর কষাকষি। এর মধ্যে একটা ট্র্যাফিক জ্যাম হলেই হল। তখন এই গলি তো গলি নয়, বড়বাজার। সন্ধে হলেই পাড়ার ছেলেদের জটলা – লাগাতার বুথ ফেরত সমীক্ষা কিংবা চিরকালীন মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল তো আছেই।

বিছানায় উঠে বসতেই বউ বলে, ‘আবার উঠলে কেন? শুয়ে পড়ো।’

‘ঘুম আসছেনা।’ বললাম আমি। আওয়াজের দোহাই দিলাম বটে, কিন্তু আমি জানি অনেক আগে থেকেই আমি জেগে ছিলাম। এটা কেউ বুঝতে চায়না, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমার ঘুম চলে গেছে। আমি সাফ বুঝি, ঘুম আসছেনা মানে শরীরের ঘুমের প্রয়োজন নেই। শরীরের প্রয়োজন থাকলে হাজার আওয়াজও ঘুমের দরজা আগলে রাখতে পারবে না।

মাথার ওপর থালার মতো পূর্ণিমার চাঁদ। গলির মধ্যে আলোগুলো যেন তারই আলোয় কিছুটা ম্লান। কুলিগুলো মাল নামিয়েই চলে – খস-খস, ঘস-ঘস, ঝর-ঝর-ঝর...। আড়তটার পেছনের বাগানবাড়ির গাছ-গাছালি, তার ওপারের ফ্ল্যাট, সব কিছু পটে আঁকা ছবিটির মতো। টুক করে ফ্ল্যাটবাড়ির আড়তের দিকের জানলাটা খুলে যায়। জানলার পর্দার নীচ দিয়ে ছোট্ট মাথা গলিয়ে দেয় মেয়েটা। তারপর জানলার বক্সের মাথায় লাফ দিয়ে উঠে বসে পর্দা দিয়ে ঢেকে দেয় নিজের ছোট্ট শরীরটা। জানলার গ্রিল ধরে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে সেই ট্রাকের দিকে। কুলিদের ঘামে ভেজা শরীরগুলো জ্যোৎস্নায় চকচক করে। তারা কথা বলে নিজেদের মধ্যে।হাল্কা স্বরে। তবে, নিস্তব্ধতা ভেদ করে সেসব কথার অনেকটাই স্পষ্ট শোনা যায়। বেশির ভাগই কাজের কথা। বাড়ির কথা নেই। বউ ছেলেমেয়ের কথা নেই। ওরা কথা বললেই মেয়েটা কানটা আর একটু এগিয়ে দেয়। যেন তাদের কথা আরও ভালো করে শোনার চেষ্টা করে অনেকটা সঙ্গীতের আসরে বিভোর শ্রোতার মতো।

ধীরে ধীরে পাখিরা জেগে উঠতে শুরু করে। চাঁদটাও ফিকে হয়ে আসে। তার আলো ভোরের আলোর মধ্যে মিলিয়ে যেতে থাকে। পাখির ডাক শুরু হয় একটা দোয়েল পাখির শিস দিয়ে। মেয়েটার মুখে হাসি ফোটে। শিউলি গাছটার দিকে তাকায় সে।দোয়েলটা ওখানেই বসে। বোধ হয় সে-ই সবচেয়ে ভোরে ওঠে। ছোট্ট শরীরটাকে পাতার আড়াল থেকে বার করে আনে। শিউলি গাছের শক্ত ডালের ওপর বসে গান গায়। তার শিস নতুন গানের দিন শুরু করার জন্য পৃথিবীর সব পাখির কাছে আহ্বান জানায়। জেগে ওঠে পাখির দল। কাক, শালিক, চড়াই, টিয়া আর নানান সব পাখি। তাদের ঐকতান রীতিমতো ঝঙ্কার তোলে। প্রাতঃভ্রমণ করতে দু’একজন বেরিয়ে পড়ে। ট্রাক খালি হ’য়ে গেলে ঘট-ঘটাং শব্দে ট্রাকের ডালা বন্ধ করে কুলিগুলো। তারপর ট্রাক নিয়ে নানান কসরৎ সেরে বেরিয়ে পড়ে। মেয়েটাকেও আর দেখা যায় না।

সারা দিনে হয়তো বা একবার কি দু’বার চোখে পড়ে সে। শিউলি গাছের ডালটা ফ্ল্যাটবাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে ঢুকে পড়ে অকাতরে ফুল বিলোয়। মেয়েটাও এক ফালি দূর্বার ওপর পড়ে থাকা সেইসব ফুল কুড়োয়। আমার চোখে চোখ পড়তে একটু হাসে মেয়েটা। ব্যালকনি ঝাঁট দিতে কখনও দেখা যায় তাকে। লোডশেডিং থাকলে নীচের টাইম কল থেকে জল আনতে দেখেছি।জানলার গ্রিলও মুছতে দেখেছি কখনো-সখনো । রেশন দোকানের লাইনে দেখেছি তাকে। লোকের কথাবার্তা ঝগড়াঝাঁটি সব শুনছে। মুখে মৃদু হাসি।দেখেছি মুদি দোকানের খদ্দেরদের ভিড়ে। দেখেছি স্কুলের বাচ্চাদের দিকে নির্নিমেষ আত্মমগ্ন তাকিয়ে। পৃথিবীর যতো আটপৌরে প্রাত্যহিকতা যতো কর্কশ শব্দ সব তার কাছে মধুর সঙ্গীত হয়ে ওঠে। নিজের জীবনের দারিদ্র্য, ট্রাকের কুলিদের ওপর ভয়ঙ্কর নিষ্পেষণ সব কিছুর ঊর্ধ্বে তাকে নিয়ে যায় সেই সঙ্গীত। আর সেই ছোট্ট মেয়েটা, দোয়েল পাখিটা আর শিউলি গাছের ত্রয়ী প্রভাত সঙ্গীত বুকে নিয়ে তাদের মতো করে দিন শুরু করে দেয়।

সে দিন এমনিতেই কাশির দাপটে ঘুমোতে পারছিলাম না। ট্রাক এল অন্য দিনের চেয়ে একটু আগে। খটাং করে ডালা খুললো ট্রাকের। মেয়েটা এল না। চাঁদের আলো গায়ে মেখে ঝর-ঝর-ঝুর শব্দে কুলিরা মাল খালাস করল; চাঁদের রঙ ফিকে হল, পাখিরা গাইল, প্রাতঃভ্রমণকারীরা বেরিয়ে পড়লেন, শিউলি ঝরল, মেয়েটা তবু এল না।

সকালের জলখাবার খাচ্ছি, বউ ডাকল, ‘এই শোনো শোনো – শিগগির ব্যালকনিতে এসো...’

ব্যালকনি থেকে দেখলাম, ফ্ল্যাটবাড়ির সামনে বেশ ভিড়। পুলিশ ভ্যানও রয়েছে। তাড়াতাড়ি নীচে এলাম।

উত্তেজিত ভিড়। ‘ছিঃ ছি:। এইটুকুনি বাচ্চা মেয়ে, তার সঙ্গে এমন খারাপ কাজ করতে তোদের বাধল না? হাতে পেলে... ’

‘কী হয়েছে দাদা?’

‘খুন।’ উত্তর দিলেন জড়ো হওয়া মানুষের একজন। ‘ওদের কাজের একটা বাচ্চা মেয়ে ছিল না? সেটাকে খুন করেছে।’

‘বলেন কী?’

‘কী আর বলব? শুধু খুনই করেনি, ওর ওপর পাশবিক অত্যাচারও করেছে।’

‘সে কি? ওইটুকুনি মেয়ের ওপর পাশবিক অত্যাচার!’ বললেন ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একজন। ‘আহা ভারী মিঠে মেয়েটা।’

‘সারাক্ষণ হাসত। কী যেন নাম?’

‘শিউলি।’

‘বাড়ির লোকজনকে খবর দিয়েছে?’

‘হ্যাঁ দিতে গিয়েছে, কিন্তু ওর বাবা কোথায় বেরিয়েছে, খুঁজে পাচ্ছে না।’

‘বেরিয়েছে মানে? কী করেন ওর বাবা?’

‘ট্রাকের কুলি!’

স্তম্ভিত হয়ে রইলাম।

সেদিন ভোর থেকেই কাঁই কিচির কাঁই কিচির। ব্যাপার কী? নতুন কার্ড দেওয়া হবে রেশন দোকানে। বউ বললে, ‘দেখেছ এদের কাণ্ড? ছুটির দিনে সকালবেলায় একটু যে ঘুমোব তার জো আছে?’ বললাম, ‘আমাদেরও তো কার্ড বদলাতে হবে...’ নেমে এলাম নীচে। দাঁড়ালাম সব্বার পেছনে। কালো তার চায়ের মেটাল ফ্লাস্ক নিয়ে এসে প্লাস্টিকের কাপ বার করে চা ঢেলে বিনা বাক্যব্যয়ে আমার দিকে এগিয়ে দিল। আমিও পকেট থেকে টাকা বার করতে করতে জিগ্যেস করলাম,‘কি অত চেঁচামেচি হচ্ছে রে?’কালো বলল, ‘এই লাইন নিয়ে আর কি। এদের ঘাড় ধরে লাইন থেকে বের করে দিতে হয়।দেখো না লোকটাকে; কখন চুকেবুকে গিয়েছে, এখনও চেঁচিয়ে যাচ্ছে।’

ঘাড়টা আর একটু সোজা করে দেখি, আরে! এতো সেই লোকটা। শিউলি মারা যাওয়ার ঘটনা আমাকে বলার সময় যার চোখের কোণে জল চিক চিক করছিল।

এবারে ঘাড়টা একেবারে আড়াআড়ি ঘোরালাম। এখান থেকে শিউলির জানলাটা একেবারে সামনাসামনি দেখা যায়। ঘাড় ঘোরাতে চোখে পড়ল সেই জানলা। শিউলি না?... আমার মনে হল মেয়েটা যেন ঘাড় কাত করে ঐ ভদ্রলোকের কথা শুনছে। ভদ্রলোক তখনও চিৎকার করে চলেছেন। কিন্তু সেই চিৎকার যেন হঠাৎ মিলিয়ে যাচ্ছে। সেই স্বর যেন সুরের মূর্ছনায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে। লাইনে দাঁড়ানো অন্যদের কথাও সেই সুরের সঙ্গে মিলেমিশে এক অদ্ভুত ঐকতান। আর শিউলি জানলা থেকে মাথাটা আরও একটু কাত করে শোনার চেষ্টা করছে সেই সঙ্গীত।

সেদিন ঘুম ভাঙলো ব্যান্ডপার্টির আওয়াজে। ‘বোম্বাই সে আয়া মেরা দোস্ত, দোস্তকো সেলাম করো...’ একরাশ বিরক্তি ছেয়ে গেল। উত্তরের জানলাটা খুললাম, কোনও একটা পুজো দিতে চলেছে কিছু মেয়ে পুরুষ। ব্যান্ডপার্টির পেছনেই ঝকমকে পোশাক পরা কয়েকজন। হাতে তাদের ফলের ডালা। আর ঠিক তার পেছনেই দণ্ডী কেটে চলেছেন দু’জন মহিলা। তাঁদের ঘিরে রয়েছে আরও কয়েকজন। কেউ জল দিচ্ছে তাঁদের গায়ে। কেউ বা শাঁখ বাজাচ্ছে। মনে মনে বললাম ‘এদের কোনও একটা সেন্স নেই। রেসিডেনশিয়াল এরিয়া। এলাকায় দু-দুটো স্কুল...।’

হঠাৎই চোখে পড়ল ক্লাসরুমের জানলা দিয়ে লাফিয়ে স্কুলের ঘেরা বারান্দায় পড়ল দু’তিনটে বাচ্চা। নাচতে লাগল বাজনার তালে তালে। কত বয়স হবে? শিউলির বয়সী কি? নাকি তার থেকে একটু ছোট? মনে পড়ে গেল, শিউলি এই বাচ্চাগুলোর দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকত। মুখে সেই মিষ্টি হাসি। কখনও স্কুলে পড়েছিল কি সে?

বাচ্চাগুলো নেচে চলেছে। ক্লাসের দরজা দিয়ে অমনি স্কেল হাতে বেরিয়ে এলেন টিচার। নাচের কন্টিনিউইটি প্রায় বজায় রেখেই লাফ দিয়ে দিয়ে আবার ক্লাসে ঢুকে গেল বাচ্চাগুলো। ফুসমন্তরে উবে গেল সব বিরক্তি।

নীচে স্কুলের মুখোমুখি বাড়ির রোয়াকে স্কুলের বাচ্চাদের মায়েদের জোর আড্ডা চলেছে। কোনও মতে ঘরকন্নার কাজ গোছগাছ করে দিয়ে ছেলেমেয়েদের ইস্কুলে নিয়ে আসে তারা। ছেলেমেয়েরা স্কুলে ঢুকে গেলে তারা রোয়াকে বসে অপেক্ষা করে স্কুল ছুটির জন্য। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা করে। কার হোমটাস্ক বাকি পড়েছে, কোন দিদিমণি একেবারেই ছাত্রছাত্রীদের দেখেন না, ভালো ছাত্রছাত্রীর খাতা ধার করা, সেসব তো আছেই--- তার সঙ্গে এইটুকু ফুরসত চেটেপুটে নিয়ে নেয় তারা। সব্জিওয়ালার ঠেলা থেকে পেঁয়াজ আর শসা কেনে। সেসব কেটে-কুটে বড় একটা খবরের কাগজে মুড়ি মাখে। তারপর দৈনন্দিনতার কত কথা উঠে আসে। স্বামীর ব্যস্ততা, শাশুড়ির ঘরকন্না, ভাই বোন, ননদ, ভাসুর, দেওর... বিষয়ের শেষ নেই। ‘ওঃ, সকাল থেকেই এরা যা ক্যাঁচরম্যাচর লাগায়...।’ স্কুল ছুটির ঘণ্টা বাজে... মুহূর্তে বদলে যায় পৃথিবী। স্বপ্নের খেয়ায় ভাসতে ভাসতে তারা চলে যায়।

নীচে নেমেছি মুদির দোকান থেকে কয়েকটা জিনিস নেব বলে। এই স্কুল ছুটির পরেই জিনিস কেনাটা সবচেয়ে সেফ। না হলে এক যন্ত্রণা। স্কুলের বাচ্চা আর তাদের মায়েদের ভিড়। টিফিন কেনার ধুম। কেউ বাপুজি কেক নেবে তো কেউ চিপস, কারুর পছন্দ কুড়কুড়ে। অনেকে আবার ঠিক করতে পারে না। ‘কেক দাও।... আচ্ছা না-না, কাকু তুমি বরং একটা ক্যাডবেরি দাও।’ এই সময় জিনিস কিনতে গেলে মুদি বিরক্ত হয়। বলে ‘আপনারা এই সময়ে আসেন কেন? এটা স্কুল টাইম। দেখছেন তো কি অবস্থা। আপনাকে জিনিস দিই কী করে বলুনতো?’

আমার পাশে দাঁড়ানো মহিলা হঠাৎ প্রশ্ন করলেন ‘কী বৌদি এত দেরি যে?’

তাঁর চোখের দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখি, এক মহিলা তাঁর বাচ্চাকে নিয়ে ফিরছেন। বললেন, ‘ওই যে, টিচার ডেকেছিলেন, তাই কথা বলে এলাম। তা, তোমার লক্ষ্মী কোথায়? তাকে তো আর দেখিনা।’

‘ও এখানে নেই বৌদি। ওকে কাজে লাগিয়ে দিয়েছি।... আর টানতে পারছিলাম না। ইস্কুলের এত খরচ... ওর বাবা বাড়ি থাকলে পারতাম না। তা সে কাজ নিয়ে গেছে মধ্যপ্রদেশ... আমিও দেখলাম এই হচ্ছে সুযোগ...।’

আমার চোখ গেল শিউলির শূন্য জানলায়...অজান্তেই। আমার বুকটা মোচড় দিল।শিউলিকে দেখতে পেলাম। দেখলাম সে ঘাড় হেলিয়ে পৃথিবীর যত আওয়াজ শুনছে। তার শ্রবণের পরশমণির ছোঁয়ায় সেই সব আওয়াজ সঙ্গীত হয়ে উঠছে। ওপরে উঠে এসে ব্যালকনিতে দাঁড়ালাম। সেখান থেকে আর সরতে পারলাম না। ভাগ্যি ভাল। বউ বাপের বাড়ি গিয়েছে। ছেলের নাইট ডিউটি। দিন গড়িয়ে রাত এল। সঙ্গীতের মূর্ছনা গ্রাস করে নিল আমাকে।

আবারও ট্রাক আসে। চাঁদের আলো গায়ে মেখে কুলিরা মাল খালাস করে। ঘস-ঘস, ঝপ-ঝপ, ঝুর-ঝুর, ঠং-ঠং করুণ মহাসঙ্গীত রচনা করে।সে সঙ্গীত আমি কান পেতে শুনি। দেখতে দেখতে দোয়েলটা ডেকে ওঠে। তারপর কাক, টিয়া, চড়াই, কোকিল আরো কত পাখি যোগ দেয় গানে। টুকটাক কথা বলতে বলতে খস খস পায়ের আওয়াজ তুলে প্রাতঃভ্রমণকারীরা বেরিয়ে পড়েছে। শিউলি শুনছে সেই আওয়াজ। সেই আওয়াজ সঙ্গীত হয়ে আকাশ ছুঁয়ে ফেলছে। আমি কী করে এই ব্যালকনি থেকে সরি! বউ-ছেলে এই সহজ কথাটা বোঝেনা।

ওই তো মায়েদের হাত ধরে স্কুলের ছেলেরা আসতে শুরু করেছে।প্রাত্যহিকতার যন্ত্রণা অবলীলায় মুছে দিচ্ছে কোন সঙ্গীতের মূর্ছনা। ভিড় বাড়ছে গলিতে। দোকানেও খদ্দেরদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। রেশন দোকানের লাইন বাড়ছে। ব্যালকনিতে বসে তা-ই দেখছি, বউ বলল, ‘বলিহারি যাই তোমার। এখনও লাইনের ওই ক্যাঁচরম্যাচর শুনতে ভালো লাগছে?’

‘ক্যাঁচরম্যাচর আর কোথায়। লোকে গল্পগুজব করছে।’

‘খাবে এসো।’

শিউলি চোখ পেতে দিয়েছে। ওই তো শুরু হয়েছে সঙ্গীতের মূর্ছনা। যাব কেমন করে?

আজ চান করা, খাওয়া কিছুই হল না। তা নিয়ে ছেলের সঙ্গে ছোটখাটো একটা ধ্বস্তাধস্তিই হয়ে গেল।

বিকেলে ডাক্তার যখন বলল, ‘কাকু, কাজ আছে, ভেতরে চলো।’ তখন তাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলাম – এখুনি হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলটায় ছুটি হবে। ও সেসব মানতেই চাইলনা। পাড়ার ছেলে কিনা।

বললে, ‘আরে বাবা, তোমার কাজ নয়, আমার কাজ। ভেতরে এসো না। এক্ষুনি ছেড়ে দেব।’

ভেতরে যাওয়া মাত্রই ও আর ছেলে দুজনে মিলে ধরাধরি করে কী একটা ইঞ্জেকশন দিল। আবছা হয়ে আসছে সব কিছু। ডাক্তার বললে, ‘ও কিছুনা। শক্ পেয়েছে। একটু ঘুমোলেই সব ঠিক হয়ে যাবে...।’

কে জানে কতক্ষণ ঘুমিয়েছি, কিংবা এখনও হয়তো ঘুম থেকে উঠিনি। স্বপ্ন দেখছি...।

আমার জানলার ফ্রেমে আঁটা পৃথিবী তার নিজের নিয়মেই চলছে। ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছি।ওপারের বন্ধ জানলাটা খুলে গিয়েছে। আবারও এসেছে ট্রাক। চাঁদের আলো গায়ে মেখে কুলিরা মাল খালাস করছে। ঘস-ঘস, ঝপ-ঝপ, ঝুর-ঝুর, ঠং-ঠং। চোখ যায় সেই জানলায়।মেয়েটা বসে রয়েছে ঘাড় কাত করে। ট্রাকের আওয়াজ রচনা করছে মহাসঙ্গীত। পরিব্যাপ্ত করে দিচ্ছে আকাশ-বাতাস।

হু-হু হাওয়ায় একরাশ শিউলি ফুল উড়ে এসে পড়ছে কুলিদের মুখে-পিঠে।...

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮