• শর্মিষ্ঠা বসু

নাম-বিভ্রাট


শিল্প বিপ্লব, কৃষি বিপ্লব এসব বিপ্লবের কথা তো আমরা সকলেই জানি । কিন্তু রাজনীতিতে, সমাজে সর্বত্র বিপ্লব ঘটার সঙ্গে সঙ্গে বাঙালীর জীবনে আরেকটি ক্ষেত্রে নিঃশব্দে বিপ্লব ঘটেছে । এ বিপ্লব এমনই বিপ্লব যা ঘটেছে আমাদের সকলের চোখের সামনে অথচ আমরা কেউ তা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি। বিপ্লবটি ঘটেছে বাঙালীর নামকরণে। আজকাল ঘরে ঘরে বাঙালী ছেলেমেয়েদের অসাধারণ সব নাম – উন্মেচিতা, উন্মীলিতা, উচারম্ভা। কচি কচি মুখে যখন এসব নাম শুনি তখন আতঙ্কিত না হয়ে পারিনা। আহা: নামের বানান শিখতে, নামের বানান লিখতে কচি হাতে কতই না কষ্ট হবে।

আমাদের সময় নাম ছিল সহজ, সরল ছন্দময়- আমাদের জীবনটাই তেমন ছিল কিনা। এখন জীবনে চলার পথ কঠিন হয়েছে। মহাসমারোহে নারী-দিবস পালন হচ্ছে। নারীশক্তি, নারীবাদ এসব শব্দের ব্যবহার দৈনন্দিন জীবনে বৃদ্ধি পেয়েছে আর এসবেরই প্রতিফলন ঘটেছে বাঙালীর নামকরণে।

নাম নিয়ে যখন এত কথা বলছি তখন একটা গল্প বলি শোন। আমাদের পরিবারে নামকরণের একটা রীতি ছিল। পরিবারের সমস্ত পুরুষ সদস্যদের নামের শেষে থাকবে দুটি অক্ষর ‘শ্বর’। নকুলেশ্বর, যজ্ঞেশ্বর, পঞ্চেশ্বর, জ্ঞানেশ্বর, রত্নেশ্বর ইত্যাদি। এমনি একদিন দ্বিপ্রাহরিক মজলিশে বাড়ির গৃহিণীরা বাড়িতে আসা নবজাতকটির ‘শ্বর’যুক্ত নামকরণ নিয়ে যখন গবেষণায় ব্যস্ত তখন সমস্ত সমস্যার সমাধান করে দিল বাড়ীরই পঞ্চমবর্ষীয় এক সদস্য। দরাজ গলায় সে জানাল, ‘তোমরা ভাই-এর নাম নিয়ে এত ভাবছ কেন? আমি একটা নাম রাখতে পারি, ওর নাম রাখ দুধের সর’।

নাম নিয়ে আরও গল্প আছে। মাসখানেক আগে একটি সান্ধ্য অনুষ্ঠানে এক অষ্টাদশীর সঙ্গে পরিচয় হল। জিজ্ঞাসা করলাম ‘তোমার নাম কি ভাই?’ মিষ্টি হেসে বলল, আমার নাম জিজীবিষা। আমি খানিকটা ঢোঁক গিলে তারপর একটু সাহস সঞ্চয় করে বললাম, ‘নামের মানে কি ভাই?’ সদর্পে অষ্টাদশী জানাল জিজীবিষা অর্থ বেঁচে থাকার ইচ্ছা । আমার কৌতূহল পুরোপুরি মেটার আগেই অষ্টাদশী মোবাইলে প্রেমিকের সঙ্গে কথোপকথনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে । মুখ ফিরিয়ে নিলেও কথোপকথনের কিছু অংশ কানে এসে পৌঁছয় । কি শুনেছিলাম তা বলে পাঠককুলকে আর বিব্রত করতে চাইনা, তবে অনর্গল বাক্যবাণ ও বাক্যস্রোত শুনে মনে হয়েছিল জিজীবিষা নয় অষ্টাদশীর উপযুক্ত নাম জিঘাংসা।

বাঙালীর নাম শুনলে আজকাল সত্যই চমৎকৃত হই। কি সব নামের বাহার- চিত্রার্পিত, নবজাগরণী, খরস্রোতা। বেশ বুঝি বাঙালীর জীবনে নাম-বিপ্লবের জোয়ার এসেছে। পুরনো সব নাম – মধুমিতা, সুস্মিতা, ললিতা এসব নাম এখন সব ইতিহাসের পাতায়। নামের স্নিগ্ধতাটুকু বিপ্লবের জোয়ারে ভেসে গেছে। নারী শক্তিস্বরূপিনী – এমন স্নিগ্ধ নাম কি আর আজকাল চলে? বাঙালী জেগে উঠেছে, তাই নামকরণেও নবজাগরণের ছোঁয়া । বাঙালীর জীবন কঠিন থেকে কঠিনতর হয়েছে, নামও সেই একইসঙ্গে আকারে, পরিসরে, বানানে কঠিন হয়েছে। এও তো এক অসামান্য বিপ্লব। বাঙালী মধ্যবিত্তের জীবনে আগে ছিল ঋণের বোঝা , দায়িত্ব – কর্তব্যের বোঝা । সেসব আজ আর নেই। আধুনিক বাঙালীর জীবনে নতুন এক বোঝা – নামের বোঝা।

সেদিন উমাপিসির বাড়ি গেলাম, উমাপিসির নাতনী হওয়ার সুসংবাদটি পেয়ে। গোলগাল সহজ-সরল উমাপিসি সহাস্যে ভেতরে নিয়ে গেলেন। চা-মিষ্টির পর্ব মেটার পরেও নাতনীটির দেখা পেলাম না। বাধ্য হয়ে বললাম, ‘ও পিসি তোমার নাতনীটিকে একটু দেখি, এবার উঠবো যে। উমাপিসি ফিসফিস করে বললেন ‘এই রোদের মধ্যে বৌমা মেয়েকে ঘরের বাইরে বার করবে না রে। অবাক হয়ে বলি ‘কেন বল তো?’ সহজ-সরল উমাপিসি বেজার মুখে বললেন ‘রোদ লাগলে রং কালো হয়ে যাবে কিনা তাই’ । বাধ্য হয়ে বিরক্তি চেপে রেখে কথা ঘোরালাম । বললাম, ‘বেশ তো , তা নাতনীর নাম কি রাখলে বল?’ উমাপিসির মুখে আবার একগাল হাসি। আমার হাতটা ধরে বললেন, তা তুই তো একটু আধটু লিখিস-টিকিস, দে না আমার নাতনীটির একখানা সুন্দর নাম। মুখে হাসি এনে বললাম, ‘আচ্ছা, ভেবে জানাব’ । মনে মনে বেজায় চটেছিলাম তাই ভাবলাম তোমার নাতনীর নাম হওয়া উচিত অসূর্যম্পশ্যা – ঘর থেকে বেরোয় না কিনা।

নাম নিয়ে অনেকক্ষণ আমার ভাষণ শুনছ তোমরা। বিরক্ত হচ্ছ নিশ্চয় । কেউ কেউ তো ভয়ানক রেগে আছ বুঝতে পারছি। ভাবছ সবেধন নীলমণি আমার ঐ একরত্তি ছেলে বা ফুটফুটে মেয়ে, তার নাম রেখেছি আমার ইচ্ছেমত তাতে তোমার এত মাথাব্যথা কেন বাপু। তাতো বটেই , একথা তো ঠিকই। সুকুমার রায়ের অনুপ্রেরণায়, জোর গলায় তোমরা বলতেই পার –

নামকে বল তোমার আমার – নাম কি কার ও কেনা?

নামের আমি, নামের তুমি, তাই দিয়ে যায় চেনা।

নীড়বাসনা আষাঢ় ১৪২৮